ইতিহাস

প্রজেক্ট সীলঃ সমুদ্রের বুকে মানবসৃষ্ট সুনামী

২০০৪ সালের কথা। তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সেদিন খবর দেখতে টিভি চালু করেই বেশ বড় রকমের ধাক্কা খেলাম। স্ক্রিনের নীচে ভেসে চলা ব্রেকিং নিউজে দেখাচ্ছে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামির খবর। একটু পরেই ঢেউয়ের তোড়ে গাড়ি-বাড়ি-নৌকা-মানুষ ভেসে যেতে দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষমতা যে এত ভয়াবহ হতে পারে সেদিন স্বচক্ষে দেখেও যেন তা বিশ্বাস হচ্ছিল না। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ সংঘটিত সেই দুর্যোগের জন্য দায়ী ছিল ৯.১ – ৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্প, যার ফলশ্রুতিতে মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২ লক্ষ ৩০ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৮০ হাজারের মতো। নীচের ছবিগুলো দেখলেই সুনামিটির ভয়াবহতা আঁচ করা সম্ভব।

‘সুনামি’ একটি জাপানী শব্দ যার অর্থ পোতাশ্রয়ে ঢেউ। ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, সমুদ্রের তলদেশে কোনো বিষ্ফোরণ, আগ্নেয়গিরির উদ্‌গীরণ ইত্যাদির প্রভাবে নদী, সাগর প্রভৃতি জলাধারে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসকে বলে সুনামি।

প্রজেক্ট সীলের শিরোনামে কেন সুনামির কথা বলছি? এর উত্তর কিছু দূর গেলেই পাওয়া যাবে। তার আগে প্রাসঙ্গিক আরেকটি বিষয় সম্পর্কে জেনে নেই। ‘টেকটোনিক ওয়েপন’ এটি এমন একটি হাইপোথেটিক্যাল যন্ত্র বা প্রক্রিয়া যার সাহায্যে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে চাহিদামতো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্ম দেয়া যাবে! ১৯৯২ সালে রুশ বিজ্ঞান একাডেমির অ্যালেক্সে সেভোলোভিদিচ নিকোলায়েভ এটির সংজ্ঞা

দিয়েছিলেন এভাবে- “A tectonic or seismic weapon would be the use of the accumulated tectonic energy of the Earth’s deeper layers to induce a destructive earthquake”।

‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ এই শব্দ দুটি কানে গেলেই মানসপটে দু’জোড়া শব্দ ভেসে ওঠে- ‘অ্যাডল্‌ফ হিটলার’ এবং ‘পারমাণবিক বোমা’। হিটলার কিংবা পারমাণবিক বোমা যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরই প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে তা বোধহয় না বললেও চলে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানুষ তার স্বজাতির উপর কত রকম অমানবিক অত্যাচার, নির্যাতন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে তার ইতিহাস কম-বেশি আমাদের সবারই জানা। আবার এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করতে আশ্রয় নিয়েছিল নানান রকমের কৌশলের। পাশাপাশি উদ্ভাবন করেছিল ভয়ানক সব মারণাস্ত্র। প্রজেক্ট সীল ছিল তেমনই এক মারণাস্ত্র উদ্ভাবনের পরিকল্পনা।

প্রায় ৭০ বছর আগেকার কথা। ১৯৪৪ সালের দিকে মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার ই. এ. গিবসন এক অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন, সাগরের পানিতে ডুবে থাকা বিভিন্ন প্রবাল প্রাচীর দূরীকরণে যে বিষ্ফোরণ ঘটানো হয় তার ফলে বেশ বড় রকমের ঢেউয়ের উৎপত্তি ঘটে। এখান থেকেই তার মাথায় অন্য এক পরিকল্পনা জন্ম নিল- আচ্ছা, এ ঢেউকে কাজে লাগিয়ে কি শত্রুপক্ষের কোনো নির্দিষ্ট এলাকাকে ভাসিয়ে দেয়া যায় না? যেমন চিন্তা তেমন কাজ। সাথে সাথেই যোগাযোগ করলেন নিউজিল্যান্ডের চিফ অব জেনারেল স্টাফ স্যার এডওয়ার্ড পুটিকের সাথে, খুলে বললেন তার বিস্তারিত পরিকল্পনা। গিবসনের পরিকল্পনাটি মনে ধরলো পুটিকের। তাই তিনি যুদ্ধ পরিষদের পরবর্তী সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। সেখানেও প্রস্তাবটিকে সমর্থন করে সবাই। ফলে সিদ্ধান্ত হলো আমেরিকা এবং নিউজিল্যান্ড যৌথভাবে নিউ ক্যালিডোনিয়ায় প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে।

এখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রজেক্ট সীল। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল- ‘আক্রমণের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে তৈরী জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে প্লাবন তৈরির সম্ভাব্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করা’।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণাগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস লীচ। গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হচ্ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার কমান্ডার অ্যাডমিরাল হ্যালসিকে। হ্যালসি প্রাথমিক পরীক্ষার ফলাফলে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, নিউজিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষকে তিনি অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রজেক্টটি যথাসম্ভব এগিয়ে নিতে। তিনি চাইছিলেন মানবসৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে শত্রুপক্ষের বিভিন্ন স্থাপনা যতদূর সম্ভব ভাসিয়ে দিতে। এজন্য তিনি লিখেছিলেন- “আমার মতে- এ পরীক্ষাগুলোর ফলাফল বলছে যে, উভচর যুদ্ধে শত্রুপক্ষের এলাকা প্লাবিত করে দেয়া বেশ সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী এক সম্ভাবনময় আক্রমণাত্মক যুদ্ধাস্ত্র হতে পারে।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণামূলক কাজগুলো বেশ দ্রুততার সাথেই এগোচ্ছিল। ১৯৪৪ সালের ৫ মে নিউজিল্যান্ডের যুদ্ধ পরিষদে হ্যালসির প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রফেসর লীচের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অ্যারে রিসার্চ ইউনিট, যার কাজ ছিল একেবারেই নতুন ঘরানার এ বোমাটি নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো। প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই ইউনিটটি। তাদের কাজের জন্য ঠিক করা হয়েছিল হ্যাঙ্গাপারাওয়া উপদ্বীপে অবস্থিত একটি দূর্গ। এখানেই গোপনীয়তার সাথে এগিয়ে চলেছিল প্রজেক্ট সীলের কাজকারবার। এগোচ্ছিল স্বজাতিকে শেষ করার আরো কার্যকরী পদ্ধতি উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা। প্রজেক্টের কাজগুলো মূলত নিউজিল্যান্ডের প্রকৌশলীরাই করতেন কিন্তু বিষ্ফোরক সরবরাহ করা কিংবা আদেশ দেয়ার কাজটি করে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রই।

প্রজেক্টটি সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে বিপুল পরিমাণ বিশেষায়িত উপকরণের প্রয়োজন ছিল। এগুলোর মাঝে ছিল রিমোট-ওয়েভ রেকর্ডিং ডিভাইস, রেডিও কন্ট্রোল্‌ড ফায়ারিং মেকানিজম, মেরিন এক্সপ্লোসিভ ইত্যাদি। ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীদেরও সমুদ্রে বিষ্ফোরণ ঘটানোর এ মহাযজ্ঞ নিয়ে আগ্রহের কমতি ছিল না। তাই একদল ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল প্রজেক্টটির অগ্রগতি দেখে যাবার জন্য।

নতুন আঙ্গিকে গঠিত হবার পর প্রজেক্ট সীলের প্রথম পরীক্ষামূলক বিষ্ফোরণটি ঘটানো হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ৬ জুন। আর এটি চলেছিল পরের বছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।

প্রজেক্ট সীলের পুরো সময়কাল জুড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টি সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। বোমাগুলো দিয়ে কৃত্রিমভাবে সুনামির মতো পরিস্থিতি তৈরি করাই ছিল উদ্দেশ্য, তাই এগুলোর এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। বোমাগুলোতে বিষ্ফোরকের পরিমাণ কয়েক গ্রাম থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত পরিবর্তন করে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। বিষ্ফোরক হিসেবে মূলত টিএনটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে কখনো কখনো নাইট্রো-স্টার্চ কিংবা গেলিগনাইটও ব্যবহার করা হতো।

শুরুতে অবশ্য প্রজেক্ট সীলের গবেষকেরা ভুল উপায়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। ব্রিটিশরাও সমুদ্রের তলদেশে বিষ্ফোরণ নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল। তাদের কাজ থেকে ধারণা করা হচ্ছিল যে, বোমটি সমুদ্রের যত তলদেশে থাকবে, বিষ্ফোরণের ফলে সৃষ্ট গ্যাসের বুদবুদ ততটাই কার্যকর উপায়ে নির্ধারিত এলাকায় প্লাবন ঘটাতে সক্ষম হবে। অবশ্য পরবর্তীতে প্রজেক্ট সীলের অনেক অনেক গবেষণার পর ব্রিটিশদের সেই তত্ত্বটি বাতিল হয়ে যায়। তারা দেখান, বোমটি সমুদ্রপৃষ্ঠের যত কাছাকাছি থাকবে, এটি ততই কার্যকর ঢেউ তৈরি করে প্লাবনের উদ্ভব ঘটাতে সক্ষম হবে। গবেষকেরা সেই সাথে বুঝেছিলেন, মাত্র একটি বোমার বিষ্ফোরণ দিয়ে সৃষ্ট ঢেউয়ের সাহায্যে কেবল ঢেউয়ের বুকে সার্ফিং করাই সম্ভব, শত্রুর স্থাপনা ভাসিয়ে নেয়া তো বহু দূরের কথা। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন একসাথে অনেকগুলো সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানোর।

এজন্য প্রায় ২০ লক্ষ কেজি বিষ্ফোরক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। বিষ্ফোরককে সমান ১০ ভাগে ভাগ করে সমুদ্র উপকূল থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে বিষ্ফোরিত করলেই তা সমুদ্রের বুকে ভয়াবহ আলোড়ন তুলতে সক্ষম হবে। এর ফলে ১০ – ১২ মিটার উচ্চতার যে ঢেউ তৈরি হবে সেটিই ভাসিয়ে দিবে শত্রুর সব স্থাপনা। তবে এখানেও সমস্যা ছিল। গবেষকরা দেখেছিলেন, সমুদ্রের কতটা তলদেশে বোমটি রাখা হচ্ছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। কারণ উচ্চতার সামান্য হেরফেরও ঢেউয়ের শক্তি অনেকখানি কমিয়ে দিচ্ছিল।

প্রজেক্ট সীল যখন শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে যাচ্ছিল, তখন একে পারমাণবিক বোমার বিকল্প হিসেবেই ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে এসে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে। তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মিত্রপক্ষের আধিপত্য বিস্তার পেতে শুরু করে। এর ফলে ধীরে ধীরে প্রজেক্ট সীলের মাধ্যমে তৈরি সুনামি বোমার সাহায্যে কৃত্রিম সুনামী তৈরির প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৮ জানুয়ারি প্রজেক্টটি বন্ধই করে দেয়া হয়। তখন পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য কোনো সুনামী বোমা বানানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি, সবই ছিল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। তাই বাস্তবক্ষেত্রে এ বোমাটির কার্যকারিতা কেমন হতে পারে তা আসলে কেউই আর বলতে পারবে না।

প্রজেক্ট সীলের আয়ু ফুরিয়ে গেলেও ১৯৫০ সালে অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের চল্লিশের দশকের সেই প্রজেক্টটি নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে দেখা গেছে। রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল- The Generation of Waves by Means of Explosives।

১৯৯৯ সালে নিউজিল্যান্ডের মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স এন্ড ট্রেড প্রজেক্ট সীলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কিত তথ্য সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। বর্তমানে এ সংক্রান্ত তথ্যাদি ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের জাতীয় আর্কাইভে এবং ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোতে অবস্থিত স্ক্রিপ্‌স ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফি আর্কাইভসে রাখা আছে।

এতক্ষণ ধরে একবারও বলিনি ঠিক কোনো দেশকে আক্রমণ করতে এ বোমাটি বানানো হচ্ছিল। প্রতিবার শুধু ‘শত্রুপক্ষ’ কথাটি লিখেই পার পেয়ে গেছি। আসলে ১৯৯৯ সালে যে গোপন নথিগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল, সেখানেও বিশেষ কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছিলেন তখন বেঁচে থাকা প্রজেক্ট সীলেরই এক সদস্য। ১৯৯৯ সালে তার বয়স ছিল ৮৭ বছর।

তার মতে, প্রজেক্টটিতে কাজ করা সবাই জানতো যে এই বোমা জাপানকে ভাসিয়ে দিতেই তৈরি করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র

 (১) en.wikipedia.org/wiki/Tsunami_bomb
 (২) nbr.co.nz/article/best-kept-secret-world-war-two-—-project-seal-tsunami-bomb-ck-134614
 (৩) cnsnews.com/news/article/new-details-emerge-world-war-ii-tsunami-bomb-project
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top