ডাচ দুর্ভিক্ষ ও আমাদের জিনের গল্প

১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়। নেদারল্যান্ডসের রেলওয়ে শ্রমিকেরা নাৎসি বাহিনীর এগিয়ে যাওয়া ঠেকাতে রেলপথ অবরোধ ঘোষণা করে। শাস্তিস্বরূপ, নাৎসি বাহিনী নেদারল্যান্ডসে বিশেষ করে পশ্চিম নেদারল্যান্ডসে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ৬ সপ্তাহ পর খাদ্য নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও বিধ্বস্ত রেলওয়ে ব্যবস্থা, জার্মান বাহিনীর খাদ্য বাজেয়াপ্তকরণ, আগের চার বছরের বিরূপ আবহাওয়া- সব মিলিয়ে নেদারল্যান্ডস মুখোমুখি হয় কিছুটা প্রাকৃতিক, কিছুটা মানবসৃষ্ট এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের।

১৯৪৫ সালে নাৎসি বাহিনীর কাছ মুক্তির আগে এই দূর্ভিক্ষে ততদিন পর্যন্ত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা পরিচিত Hunger winter (The Dutch famine, 1944-45) নামে।

কিছু অপ্রত্যাশিত কারণে এই ডাচ দুর্ভিক্ষ বেশ অনন্য। এর শুরু এবং শেষ বেশ আকস্মিক ছিল। যার কারণে একে তুলনা করা যায় জনস্বাস্থ্যের উপর ঘটে যাওয়া এক অপরিকল্পিত পরীক্ষা হিসেবে। গর্ভবতী মহিলারা এসময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। দুর্ভিক্ষের শিকার এই মায়েদের গর্ভ থেকে জন্মানো শিশুরা সারাজীবন এর ছাপ বয়ে বেড়িয়েছে।

চিত্র: ডাচ দুর্ভিক্ষের এক অসহায় শিকার

বিস্ময়কর ব্যাপার হলেও সত্য, খাদ্যাভাবে জন্মানো এই শিশুরাই তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবন এসে গড়পড়তা মানুষের তুলনায় কয়েক পাউন্ড বেশি ওজন বহন করেছে। মধ্য বয়সে এসে রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাদের।

মাতৃগর্ভ থেকে দুর্ভিক্ষের প্রভাবে বড় হয়ে উঠা এসব মানুষের মধ্যবয়স কেটেছে মোটাপন, ডায়াবেটিস, সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ মোকাবেলা করে। এই ঘটনার উপর গবেষণা চালানোর জন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে বেছে নিলেন, Retrospective research পদ্ধতি, অর্থাৎ পেছনে ফিরে গিয়ে এখন পর্যন্ত লিপিবদ্ধ তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে উপসংহারে পৌঁছানো।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এল এইচ লুমেই ১৯৪০ সালে জন্মানো মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানালেন, এই দুর্ভিক্ষের সময়ে জন্মানো মানুষের মাঝে স্বাভাবিকের তুলনায় মৃত্যুহার বেশি। তবে তা ৬৮ বছর বয়স পেরোনোর পর।

কিন্ত কীভাবে একজনের শরীর তার মাতৃগর্ভের পরিবেশ মনে রেখে দিতে পারে? শুধু মনে রেখে দিতে পারে তা-ই নয়, কীভাবে এর প্রভাব এত বছর পরেও পড়তে পারে? ড. হেইমেন, ড. লুমেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে জিন সাইলেন্সিং (Gene silencing)-এর মধ্যে।

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে একইরকম জিন থাকে। সব কোষের জিনের ভেতরকার গঠন একইরকম। অর্থাৎ ধরুন, আপনার চোখের কোষের জিনের একটি অংশ বলছে, তার গঠনের সজ্জা ATCCCGTA। আবার, হাড়ের কোষের একটি জিনের একটি অংশের গঠন ATCCCGTA। একইরকম। কিন্তু তারপও চোখের কোষ আর হাড়ের কোষ তো এক নয়। কেন তবে এই পার্থক্য? এক হয়েও কেন এক নয়?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে এপিজেনেটিক্সের মধ্যে। আমাদের দেহের ডিএনএ কিন্তু খুব সহজ-সরল লাঠির মতো আমাদের দেহে শুয়ে নেই। বরং তাদের অবস্থা অনেকটা স্প্রিংয়ের কুণ্ডলীর মতো। আমরা যখন বলি অমুক কোষে এই জিন প্রকাশিত নয়, তখন আসলে কী বোঝানো হয়? এই জিনের expression নেই বা এই জিন silenced বলতে আমরা বোঝাই এই জিন কোনো প্রোটিন তৈরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। Gene silencing অথবা expression অনেকভাবেই হতে পারে, যার মধ্যে একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে, ডিএনএ মিথাইলেশন।

ধরে নেওয়া যাক, এক একটি মিথাইল (CH3-) গ্রুপ এক একটি পাথরের মতো (পরবর্তী পৃষ্ঠার চিত্র খেয়াল করুন)। DNA-র জায়গায় জায়গায় এই পাথর বসতে পারে। যখন DNA-র উপর এই পাথর চেপে বসে তখন এই কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা DNA-র কুণ্ডলী কিছুটা খুলে যায়। ফলে বাইরের প্রোটিনের সাথে আর যোগাযোগ করতে পারে না। এই যোগাযোগহীনতার ফলশ্রুতিতে DNA বাইরের কিছু বিশেষ প্রোটিনের সাথে মিলেমিশে আর কাজ করতে পারে না। তাই আর নতুন প্রোটিনও তৈরী হয় না।

আবার ফিরে আসি ডাচ দুর্ভিক্ষের গল্পে। বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারে কাজ করতে শুরু করেছিলেন সেই ১৯৯০ সাল থেকে। ড. লুমেই ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় জন্মানো তৎকালীন মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের কাছ থেকে রক্ত নিলেন। তুলনামূলক পরীক্ষার জন্য আরো রক্ত নিলেন দুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মানো তাদের ভাইবোনদের। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রক্ত থেকে ডিএনএ নিয়ে তারা মনোযোগ দিলেন DNA-র কোথায় কেমন মিথাইলেশন ঘটেছে তা দেখায়।

তারা খুঁজছিলেন এমন কোনো জায়গায় কোনোভাবে মিথাইলেশন হয়েছে কিনা যা দুর্ভিক্ষের সময় জন্মগ্রহণকারীদুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মগ্রহণকারীর মধ্যে আলাদা। পেয়েও গেলেন তারা এরকম। যেমন- দুর্ভিক্ষের সময় জন্ম নেয়া লোকদের মাঝে এক মিথাইল গ্রুপ পাওয়া গেলো যারা PIM3 জিনের প্রকাশে বাধা দেয়। এই PIM3 জিন শরীরের ক্যালরি খরচে কাজ করে, এই জিন কাজ করতে না পারার ফলে ক্যালরি খরচ হয় না এবং ওজন বেড়ে যায়।

চিত্র: উপরের অংশে দেখা যাচ্ছে কুণ্ডলী পাকানো ডিএনএ কিছুটা খুলে এক বিশেষ প্রোটিন (সবুজ বর্ণের, RNA polymerase II) এর সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। ফলে জিনের প্রকাশ বা ট্রান্সক্রিপশন ঘটছে। ফলে RNA এবং পরবর্তীতে প্রোটিন তৈরী হবে।

নীচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে মিথাইলেশনের কারণে (ছোট ছোট গাঢ় ডট) DNA খুব শক্তভাবে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে, ফলে কোনো প্রোটিন (ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর) তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। যার কারণে কোনো RNA এবং প্রোটিন তৈরি হচ্ছে না।

তাই তত্ত্ব এই দাঁড়ালো যে, ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মায়ের গর্ভে থাকা শিশুর PIM3 জিনে মিথাইলগ্রুপ যোগ হয়, যা PIM3 জিনকে কম সক্রিয় বানায় এবং যা চলতে থাকে পুরো জীবন জুড়ে। ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় প্রচুর গর্ভপাত, অকাল মৃত্যু ঘটেছে। হয়তোবা যেসব শিশু তখন সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ করতে পেরেছে তাদের জিনে এই এপিজেনেটিক্স বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু বদল ঘটাতে পেরেছিল যার কারণে তাদের এই বেঁচে থাকা সম্ভব হয়েছে।

যেমন- যদি আপনি কম খাদ্য পান তবে কি কম ক্যালরি খরচ করতে পারা নাকি স্বাভাবিকভাবে ক্যালরি খরচ করতে পারা হবে আপনার জন্য সুবিধাজনক? ভেবে দেখুন।

তবে এখনো এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এখনো আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম এ ব্যাপারে নতুন সংবাদ শোনার জন্য।

তথ্যসূত্র

https://nytimes.com/2018/01/31/science/dutch-famine-genes.html

featured image: myajc.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *