জানা অজানা

অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব?

অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব? এ বিষয়ে সায়েন্টিফিক আমেরিকানের ব্লগ অংশে Scott Barry Kaufman এর একটা লেখা পড়লাম। তিনি বলছেন, সৃষ্টিশীল লোকেরা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো একটা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যাপারটা এমন নয়। তারা চেনা পথে না চলে নিজেদের জন্যে নতুন পথ তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানী এরিকসন ও পুলের মতে সঠিক অনুশীলন আপনাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা এনে দেবে। সঠিক অনুশীলন বলতে উদ্দেশ্য ঠিক করা, কাজগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে সম্পন্ন করা, নিজের আয়ত্তের জায়গা থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু করা। এ ধরনের অনুশীলন কাজে লাগতে পারে দাবা খেলায় কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানোতে।

যে ধরনের কাজে একই প্যাটার্ন বার বার ঘুরে ফিরে আসে সেখানে অনুশীলন খুবই কাজের। কিন্তু সব ক্ষেত্রে অনুশীলনের মাধ্যমে সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। কিছু কিছু কাজ আছে যেখানে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। ঐরকম ক্ষেত্রে একই কাজ বার বার করা সফলতার অন্তরায়ও হতে পারে! এ ধরনের কাজ হলো ছবি আঁকা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, লেখালেখি কিংবা কোনো সুর তৈরি করা। এক্ষেত্রে একই উপন্যাস বার বার লিখলে বা একই সায়েন্টিফিক পেপার বার বার লিখলে ঔপন্যাসিক কিংবা বিজ্ঞানী সফল হবেন না।

এজন্য সৃজনশীল মানুষদের উপর অনেক সময় নতুন কিছু তৈরি করার একটা মানসিক চাপ থাকে। সৃজনশীল কাজকে হতে হবে মৌলিক (original), অর্থপূর্ণ এবং চমকপূর্ণ! মৌলিক এই অর্থে কাজটিকে সাধারণের থেকে আলাদা হতে হবে। অর্থপূর্ণ এই অর্থে যে কাজটি কোনো বিষয়কে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করবে। তাই সৃজনশীল মানুষেরা ক্রমাগত তাদের কাজের মাধ্যমে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে বেড়ায়। আর চমকপূর্ণ এই অর্থে তা মানুষের সচারাচর ধারণার বাইরে হবে। যেমন গ্যালিলিও কিংবা লিউয়েন হুকের আবিষ্কার ছিল সকলের কাছে নতুন ও বিস্ময়কর।

সৃজনশীলতা কি শুধুমাত্রই অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব? এই যুক্তি খণ্ডনে স্কট ১২ টি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

সৃজনশীলতা অনেকটা অজানার পথে পা বাড়ানোর মতো। সৃজনশীল কাজটি মানুষজন গ্রহণ করবে কিনা তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। মানুষের রুচি বুঝার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা একটা বড় ভূমিকা রাখে। অভিজ্ঞতার সাথে এই মুহূর্তে কী করতে হবে তার একটা উপলব্ধি চলে আসে। এখন থিওরি লেখা হবে নাকি এক্সপেরিমেন্ট, কবিতা নাকি নাটক, পোট্রেট নাকি ল্যান্ডস্কেপ, সিম্ফনি নাকি অপেরা এসব সিদ্ধান্ত এই অনুভূতি থেকেই আসে। কিন্তু সৃজনশীলতা যদি নিছক অনুশীলন হতো তাহলে ছক বাধা রুটিন থেকে আগেই অনুমান করে জানা যেত ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে।

সৃজনশীল মানুষেরা নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগোয়। এমন অনেক প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন যারা তাদের মাস্টারপিস সৃষ্টির পরে খুব ভালো সৃষ্টিকর্ম রেখে যেতে পারেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শেক্সপিয়ার তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টিকর্মগুলো যখন করেন তার বয়স তখন আটত্রিশের কোটায়। তখন তিনি হেমলেটের মতো বিশ্ববিখ্যাত কাজ উপহার দেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকাশিত তার Trolius and Cressida খুব বেশি জনপ্রিয় হয়নি। সৃজনশীলতা শুধুমাত্র অনুশীলন হলে সময়ের সাথে সাথে তার মান বাড়তো। কিন্তু দেখা গেছে বেশিরভাগ মানুষ তাদের মধ্য বয়সে তাদের সৃজনশীলতার শীর্ষে উঠেছেন।

সৃজনশীল কাজের প্রতিক্রিয়া তৎক্ষণাৎ পাওয়া যায় না। এটা আপনি ওজন কমানোর প্রোগ্রামে কতটুকু সফল হয়েছেন তার জন্য ওজন চেক করার মতো নয়। একটা উপন্যাস লিখতে কিংবা গণিতের একটা সমীকরণ লিখতে একজনকে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়। আর যখন প্রতিক্রিয়া আসে তখন একেকজন সমালোচক একেকভাবে সমালোচনা করে। কোন সমালোচনা আসলেই কাজে লাগবে তখন তা বেঁছে নেয়া কঠিন হয়ে যায়। সৃষ্টিশীল কাজের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে। আজ যে বইটা বেস্ট সেলিং পরের প্রজন্মের কাছে সেটা জঘন্য মনে হতে পারে। এমন চেলেঞ্জিং পথে শুধুমাত্র অনুশীলন খুব একটা কাজে দিবে না।

একটা মিথ আছে, সৃজনশীলতার বিকাশের জন্যে কমপক্ষে দশ বছর সময় দরকার। কথাটি সত্য নয়। কিছু কিছু সুরকারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে তারা দশ বছরের আগেই তাদের কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু অনেকের দশ বছরের বেশি লেগেছে। সৃজনশীলতার কোনো এক্সপায়ার ডেট নেই। সৃজনশীল কাজ তখনই হবে যখন সময় তার জন্যে প্রস্তুত।

সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে প্রতিভার ভূমিকা আছে। কিছু মানুষ অন্যদের চেয়ে তাড়াতাড়ি শিখতে পারে। তবে কোনো কিছুতে দক্ষতা অর্জন করাই মূল লক্ষ্য নয়। একজন সৃজনশীল মানুষ বাহ্যিক সকল জ্ঞান গ্রহণ করে যেন সে বাহ্যিকভাবে পৃথিবীতে যা নেই তা সে সৃষ্টি করতে পারে!

ব্যক্তিত্ব সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। একেকজন মানুষ একেক রকম। গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীল মানুষের মাঝে নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা, স্বাধীনচেতা, নানা ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন, ঝুঁকি নেয়া এমনকি সামান্য মনোরোগও দেখা যায়। সৃজনশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তার নিজস্ব এক্স ফ্যাক্টর আছে। যেমন পদার্থবিজ্ঞানে শিল্পকলার চেয়ে বেশি আইকিউ দরকার।

জিনও সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। তবে তার মানে এই নয় যে জিন আমাদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে। তবে তাতে জিনের প্রভাব রয়েছে এটুকু বলা যায়। সিমনটনের মতে, সৃজনশীলতার উপর জিনের প্রভাব এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশের মতো।

সৃজনশীলতার উপর পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাব রয়েছে। সামাজিক, আর্থিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক অবস্থা এই পারিপার্শ্বিকতার অন্তর্ভুক্ত। শিশুরা তার শৈশবে রোল মডেল হিসেবে কাকে পাচ্ছে এবং বেছে নিচ্ছে তাও এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।

সৃজনশীল মানুষদের আগ্রহের জায়গাটা ব্যাপক। যেমন যিনি সুরকার তিনি হয়তো শিল্পকলা পছন্দ করেন, হয়তোবা লেখালেখিও করেন। গ্যালিলিওর পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলা, সাহিত্য এবং সঙ্গীতে বিশেষ আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এটা শুধুমাত্র অনুশীলন হলে অন্য ক্ষেত্রে আগ্রহের দরকার ছিল না।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অতিমাত্রায় অনুশীলন সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন প্রয়োজনের অতিরক্ত জ্ঞান আহরণ করলে ফিকশন লেখালেখিতে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।

নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের বহিরাগতরাও সৃজনশীল হতে পারে। সৃজনশীলতা যদি শুধুমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতে হতো তাহলে তারা সৃজনশীল কাজ করতে পারতো না। কারণ বহিরাগতরা সুযোগ সুবিধা কম পান। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে সুরকার Irving Berlin কিংবা চলচ্চিত্রকার Ang Lee এর কথা।

সৃজনশীল মানুষেরা বাকিদের জন্যে নতুন পথ উন্মোচন করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় গ্যালিলিওর কথা। তার আবিষ্কার ছিল প্লেটো এবং এরিস্টটলের জ্যোতির্বিজ্ঞান মডেলের সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন গ্যালিলিও যদি তার পূর্বে তৈরি পথে কঠোর অনুশীলন করতেন তাহলে তিনি এই নতুন সত্য জগতের সামনে মেলে ধরতে পারতেন না। তিনি যা করেছেন তা তখনকার বিজ্ঞানীরা কেউ মেনে নেয়নি। কিন্তু তার সেই তৈরি পথেই পরবর্তীতে অনেক প্রতিভাবান মানুষেরা পৃথিবীকে নিত্যনতুন জ্ঞান উপহার দিয়েছে।

সৃজনশীলরা তাদের পাগলামির মাধ্যমে জগতকে এমনভাবে দেখেন যেটা আগে কেউ দেখেনি। সৃজনশীলতাকে তাই আমাদের সঠিকভাবে বুঝা উচিত যেন আমরা প্রকৃতিকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি আর এর মূল্য কতটুকু তার উপলব্ধি সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে দিতে পারি।

তথ্যসূত্র

সায়েন্টিফিক আমেরিকান ব্লগ (blogs.scientificamerican.com/beautiful-minds/creativity-is-much-more-than-10-000-hours-of-deliberate-practice)
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top