এবারের ইগ নোবেল

২০১৬ সালের ‘ইগ নোবেল’ পুরস্কার ঘোষণা করা হয় গত সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ। ১৯৯১ সাল থেকে ‘প্রথমে হাসুন আর তারপর ভাবুন’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতি বছর বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে আজব ও অদ্ভুত আবিষ্কারের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। ‘ইগ নোবেল’ শব্দটি ইংরেজি ‘Ignobel’ আর ‘Nobel Prize’ এর মিশ্রণ থেকে এসেছে।

মূলত নোবেল পুরস্কারের প্যারোডি হিসেবে এ পুরস্কারের প্রচলন শুরু করে দ্বিমাসিক রঙ্গ-ব্যাঙ্গ সাময়িকী ‘Annals of Improbable Research’ এর সম্পাদক ও যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা মার্ক আব্রাহামস। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটারে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা শাস্ত্রসহ দশটি ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০১৬ সালে ছাব্বিশতম বছরে পা রাখলো ‘ইগ নোবেল’ পুরস্কার।


পুরস্কারের অর্থমূল্য ধরা হয় দশ ট্রিলিয়ন জিম্বাবুয়ান ডলার! এখানেও আছে ব্যাঙ্গাত্মক ইঙ্গিত। জিম্বাবুয়ান ডলারের মূল্যমান অনেক কম। জিম্বাবুয়ের দশ ট্রিলিয়ন ডলার শুনতে অনেক বিশাল মনে হলেও এর সমমানের মার্কিন ডলার খুব বেশি হবে না।
এ বছরের বিভিন্ন শাখায় দেয়া ইগ নোবেল নিয়ে আলোচনা করা হলো।

প্রজননঃ

মিশরের প্রয়াত আহমেদ শফিক এবারের ইগ নোবেল জিতে নেন এই বিভাগে। পলিস্টার প্যান্ট ইঁদুরের যৌন জীবনে কী ভূমিকা রাখে সে বিষয়ে গবেষণা করার জন্য এই পুরষ্কারে ভূষিত হন তিনি। পলিস্টার, সুতি আর পশমি প্যান্ট পরিয়ে ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালান তিনি। পরে মানুষের উপরও একই গবেষণা করেন। এ বিষয়ে ১৯৯৩ সালে ‘জার্নাল কন্ট্রাসেপশন’-এ তার দুটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশিত হয়।
পদার্থবিজ্ঞানঃ হাঙ্গেরি, স্পেন, সুইডেন আর সুইজারল্যান্ডের নয়জন বিজ্ঞানী তাদের দুটি আবিষ্কারের জন্য ইগ নোবেল পুরষ্কার বাগিয়ে নেন পদার্থবিজ্ঞানে। কেন সাদা কেশরওয়ালা ঘোড়াই কেবল ‘হর্সফ্লাই’কে দূরে রাখতে সক্ষম হয় এবং ‘গঙ্গা-ফড়িং’ কেন কালো সমাধিফলকের প্রতি আকৃষ্ট হয় এ বিষয়ে পরীক্ষা চালান তারা। গবেষকরা হাঙ্গেরির এক কবরস্থানে গিয়ে দেখেন, পাঁচ রকমের গঙ্গা-ফড়িং পলিশ করা কালো সমাধি-ফলকের প্রতি আকৃষ্ট হয়। মূলত এ ধরনের গঙ্গাফড়িংগুলো গাঢ় যেকোনো রঙয়ের প্রতিই আকৃষ্ট হয়। সেই হিসেবে পানি পৃষ্ঠেও এরা আকর্ষণ লাভ করে। গঙ্গা ফড়িংয়ের শূককীট আর নিম্ফ তাদের জীবনচক্র পানিতেই সম্পন্ন করে।

রসায়নঃ

এই বিভাবে ইগ নোবেল দেয়া হয় চমকপ্রদ এক আবিষ্কারের জন্য। পরীক্ষাগারে গাড়ির বায়ুদূষণের পরিমাণ কম দেখানোর জালিয়াতির কৌশল আবিষ্কার করে জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগন! তবে এজন্য তাদেরকে জরিমানাও গুনতে হয়েছে। গাড়িতে সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম দূষিত বায়ু নির্গমনের এ পদ্ধতি বের করার জন্য কোম্পানিটি ১৪.৭ বিলিয়ন ডলার গচ্ছা দিয়েছে। যদিও রাস্তায় তাদের গাড়ি বায়ুদূষণের নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশিই দূষণ করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে জার্মানির পাঁচজন বিজ্ঞানীকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। তারা গবেষণা করে বের করেছেন, যদি কারো শরীরের বাম পাশে খোসপাঁচড়া হয় আর তারা আয়নায় তাকিয়ে ডান পাশে চুলকান তবে ফল পাওয়া যায়! এটাকে তারা ‘mirror scratching’ বলে অভিহিত করেন। এ পাঁচ বিজ্ঞানী হলেন ক্রিস্টফ হেলমশেন, ক্যারিনা পালজার, থমাস মুনেট, সিল্কে অ্যান্ডার্স আর আন্দ্রেজ স্প্রেঙ্গার।
মনস্তত্ববিদ্যায় এক দারুণ গবেষণার জন্য এবারের ইগ নোবেল বাগিয়ে নেন পাঁচজন গবেষক। তারা ৬ থেকে ৭৭ বছর বয়স্ক ১,০০০ জন মানুষের মিথ্যা কথা বলার উপর ভিত্তি করে এ গবেষণা করেন। একজন মানুষ সমগ্র জীবনকালে কখন কতবার মিথ্যা বলেন এবং বয়সের সাথে সাথে এর প্রভাব কীভাবে পরিবর্তিত হয় সে ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করেন। তারা লক্ষ্য করেন, মিথ্যা বলার দক্ষতা শৈশবে বেড়ে তরুণ বয়সে পরিপক্কতা অর্জন করে। পরে বয়সকালে তা ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। এ ব্যাপারে গবেষকগণ ‘এক্টা সাইকোলজিকা’ জার্নালে তাদের গবেষণা প্রকাশ করেছেন।
অর্থনীতিতে এবারের পুরস্কার দেয়া হয় বিক্রয় ও বিপণনের দৃষ্টিকোণ থেকে পাথরের ব্যক্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করার জন্য! তিনজন গবেষক- মার্ক এভিস, সারাহ ফোর্বস আর শেলাগ ফার্গুসনকে যৌথভাবে এ সম্মাননা দেয়া হয়। তারা ২০১৪ সালে ‘মার্কেটিং জার্নাল’-এ জেনিফার আকের-এর প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখিত ‘ব্যান্ড পার্সোনালিটি’ বা বিপি স্কেলের উপর ভিত্তি করে পাথরের ব্যক্তিত্ব নিয়ে আলোকপাত করেন। এই বিপি পাঁচটি মাত্রা দ্বারা বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। মাত্রাগুলো হলোঃ আন্তরিকতা, উত্তেজনা, যোগ্যতা, বিশুদ্ধতা আর দৃঢ়তা। এক্ষেত্রে তারা পাথর বেছে নিয়েছেন। কারণ তারা মনে করেন, প্রতিটি পাথরেরই একটি স্বতন্ত্র বিপি রয়েছে এবং পাথরের ব্যক্তিত্ব মাঝে মাঝে আশ্চর্যজনকভাবে বিকশিত হয়!
শান্তিতে পুরস্কার দেয়া হয় ফাঁকা বুলি নিয়ে গবেষণা করার জন্য! গর্ডন পেনিকক, জেমস অ্যালেন চেইন, নাথানিয়েল বার, ডেরেক কোহলার এবং জোনাথন ফুগেনস্যাং এ বিষয়ে গবেষণা করার জন্য এ পুরস্কার জয় করে নেন। তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ‘ফাঁকা বুলির অভ্যর্থনা এবং ছদ্ম-গভীরতা শনাক্তকরণ’। তারা বলেন, আপাত দৃষ্টিতে চিত্তাকর্ষকভাবে যেসব তথ্যকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, সেগুলোর অন্তর্গত অর্থ আসলে শূন্য। এ নিয়ে তারা ‘জার্জমেন্ট এন্ড ডিসিশন মেকিং’ জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। বিজ্ঞানীরাও মাঝে মাঝে তাদের বাক্যে গাম্ভীর্যপূর্ণ ফাঁকা বুলি ব্যবহার করেন যার আসলে কোনো অর্থই হয় না। মানুষের সংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের উপর নির্ভর করে তারা এসব বুলি গ্রহণ করবে নাকি করবে না।
উপলব্ধি বিষয়ে পুরস্কার পান জাপানের আতসুকি হিগাশিয়ামা এবং কোহেই আদাচি। তারা তদন্ত করে বের করেন, স্বাভাবিকভাবে মানুষ যা দেখে, দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে তা ভিন্নভাবে দেখা যায়। তাদের গবেষণার বিস্তারিত তথ্য ‘ভিশন রিসার্চ’ জার্নালে ২০০৬ সালে প্রকাশ করেন। তাদের ভাষায়- যেকোনো বস্তু দু পায়ের ফাঁক দিয়ে উল্টো হয়ে দেখলে তা বেশি উজ্জ্বল এবং স্পষ্টভাবে দেখা যায়!
জীববিজ্ঞানে ইগ নোবেল দেয়া হয় কিছু প্রাণী যেমন- ছাগল, হরিণ ইত্যাদিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য। দুজন বিজ্ঞানী এ পুরস্কার বাগিয়ে নেন। বিজ্ঞানী চার্লস ফস্টার বন্য পরিবেশে বিভিন্ন প্রাণীর অনুকরণ করে দেখান। তিনি হরিণ, ভোদঁড়, শেয়াল ও পাখির মতো জীবনযাপন করেন। আরেকজন বিজ্ঞানী থমাস থয়াইটসন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছাগলের সাহচর্যে চার হাত-পা বাড়িয়ে ছাগলের অনুকরণ করেন। তিনি তার ‘Goat Man: How I Took a Holiday from Being Human’ বইতে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখেন। তিনি ‘ছাগল মানব’ হিসেবে বেশ পরিচিতিও পান। অন্যদিকে মিস্টার ফস্টার তার বুনো জীবনযাপনের তথ্য ‘Being a Beast’ বইতে লিপিবদ্ধ করেন।

সাহিত্যে এ সম্মাননা পান ফ্রেডেরিক সোবার্গ নামক এক ব্যক্তি। তিনি তার তিন খণ্ডের আত্মজীবনীমূলক বইতে মৃত মাছি এবং এখনো মৃত নয় এমন মাছির সংগ্রহ দেখান। তার প্রথম খণ্ডের নাম ‘Fly Trap’ এবং শেষ খণ্ডের নাম ‘The Path of a Fly Collector’।

তথ্যসূত্র

 https://en.wikipedia.org/wiki/Ig_Nobel_Prize
 http://somewhereinblog.net/blog/lollipopman/29948552
 http://livescience.com/56228-ig-nobel-prize-winners.html

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *