জানা অজানা

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবারের নোবেল

২০১৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল দেয়া হয় জাপানের কোষ জীববিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি’কে। ‘অটোফ্যাগি’ নামক এক ধরনের কোষীয় প্রক্রিয়া নিয়ে তার কাজের অবদান স্বরূপ তাকে এই সম্মাননা দেয়া হয়। ‘অটোফ্যাগি’ একটি গ্রিক শব্দ। auto এবং phagin এর অর্থ যথাক্রমে ‘স্ব’ বা ‘নিজ’ এবং ‘ভক্ষণ করা’। স্ব-ভক্ষণ বা আত্ম-ভক্ষণের মিলিত রূপই হলো ‘অটোফ্যাগি’।

অটোফ্যাগি একটি জটিল প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় কোষ নিজের অন্তঃস্থ উপাদানগুলোকে নিজে ধ্বংস করে এবং পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে তোলে। কোষীয় অনাহারের সময় কোষের দীর্ঘজীবী প্রোটিন এবং অপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলো ভেঙ্গে যায় এবং সেগুলো পুনরায় ব্যবহারের মাধ্যমে কোষ শক্তি উৎপাদন করে থাকে। এ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে কোষগুলো বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াকেও ধ্বংস করে। তাছাড়া কোষের ক্ষতিগ্রস্ত গঠনতন্ত্র ঠিক করতেও এ প্রক্রিয়া সহায়তা করে।

অটোফ্যাগি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষকে রুখে দেয়া, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, অনাক্রম্যমূলক রোগের প্রতিকার করা সম্ভব। এ প্রক্রিয়ার থেমে যাবার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বয়সের ছাপ স্পষ্ট হবার সাথে সম্পর্ক রয়েছে।

ড. ওসুমি ২৭ বছর আগে ঈস্ট কোষে অটোফ্যাগি প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি এর সাথে জিনের সম্পর্ক, রোগ প্রতিরোধে এর ভূমীকা এবং এর স্বাভাবিক ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে জানতে পারেন।

তার এর আবিষ্কারের সাথে সূত্র খুঁজতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে গত শতকের পঞ্চাশের দশকে। সেই সময় বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষায়িত কোষীয় অঙ্গাণু খুঁজে পান যাতে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট এবং লিপিড (ফ্যাট) বিদ্যমান। গবেষকরা পরবর্তীতে জানতে পারেন যে, বিস্ময়জনকভাবে ‘লাইসোসোম’ নামক একটি কোষীয় অঙ্গাণুতে ঠিক একই রকম সব উপাদান রয়েছে। তারা ধরে নেন যে, এ অপেক্ষাকৃত বড় অঙ্গাণুটির সাথে মূল কোষের একটি পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে। এ পরিবহণকারী মাধ্যমগুলোকে বলা হয় ‘অটোফ্যাগোসোম’। এরা কোষীয় প্রয়োজনীয় উপাদানকে লাইসোসোমে বয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু মূল রহস্য হলো কীভাবে এ অঙ্গাণু জটিল প্রোটিন ও অন্যান্য বস্তুকে ভেঙ্গে পুনরায় ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে। আর এখানেই ডঃ ওসুমির গবেষণা মূল ভূমিকা পালন করে।

ওসুমি বলেন, “কোষীয় ভ্যাকুওলের কোষের বর্জ্য পদার্থ হিসেবে ভাবা হতো এবং কোনো গবেষকই এ ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখান নি। তাই আমি ভাবলাম, ভ্যাকুওলের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করলে ভালো হয়। এ কাজে তেমন প্রতিযোগিতাও ছিল না।”

ওসুমি মানুষের দেহকোষের লাইসোসোমে অটোফ্যাগি প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন। ঈস্টকে মানবকোষের যথার্থ মডেল ধরা হলেও ঈস্ট আকৃতিতে ছিল ছোটো। তিনি ঈস্ট কোষের অন্তর্বর্তী কার্যক্রম দেখার জন্য একটা পথ খুঁজে বের করলেন। অটোফ্যাগি চলার সময় ভ্যাকুওলের অবনয়ন কিংবা ক্ষয় প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করা গেলে অটোফ্যাগোসোমগুলো ভ্যাকুওলকে স্তুপাকারে জমা করে। আর তখন ভ্যাকুওলগুলো মাইক্রোস্কোপের নীচে দৃশ্যমান হয়।

অবনয়ন প্রক্রিয়ার কারণে কোষে এনজাইম কমে যায়। আর সেই কম এনজাইমযুক্ত পরিবর্তিত ঈস্টে অটোফ্যাগি প্রক্রিয়া ভালোভাবে দেখতে পান ড. ওসুমি। তিনি ধ্বংস না হওয়া ছোট ছোট ভেসিকলযুক্ত ভ্যাকুওল দেখতে পান এবং প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, ঈস্ট কোষে অটোফ্যাগি হয় এবং সেই সাথে এ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত জিন শনাক্ত করতে পারেন।

অটোফ্যাগি প্রক্রিয়াটি কোষের টিকে থাকা এবং সঠিকভাবে কোষীয় কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তিনি যদিও ঈস্ট কোষে অটোফ্যাগি জীণ এবং এর মেটাবলিক পথ আবিষ্কার করেন তবুও এটি উন্নততর কোষ যেমন মানবকোষেও একই পদ্ধতিতে কাজ করে। এ সকল জীনে মিউটেশন ঘটলে রোগাক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও থাকে। ইউশোনারির এ কাজ পৃথিবীর অনেক গবেষকের জন্য অনুপ্রেরণার যোগান দেয় এবং সেই সাথে এ বিষয়ে আরো অধিক গবেষণা চালাবার নতুন পথ খুলে দেয়। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর প্যাথোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শিউংমিন ওয়াং জানান, ”ডঃ ওসুমি বাদে জীববিজ্ঞানের এ শাখাটির কথা চিন্তাই করা যায় না।”

চিত্রঃ নোবেল বিজয়ী ইয়োশিনোরি ওসুমি

ডঃ ওসুমি ১৯৪৫ সালে জাপানের ফুকোকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় হতে পি.এইচ.ডি সম্পন্ন করেন। প্রথম জীবনে রসায়ন নিয়ে কাজ করতে চাইলেও সুযোগ ও সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে তিনি জীববিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে সচেষ্ট হন। কিন্তু তার পি.এইচ.ডি গবেষণা ততটা ফলপ্রসূ ছিল না বলে চাকরি পেতে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। এরপর তার পরামর্শক তাঁকে নিউয়র্কের রকফেলার ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করতে পরামর্শ দেন যেখানে তিনি ইঁদুরের ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন নিয়ে কাজ করেন।

২০১২ সালে ‘জার্নাল অব সেল বায়োলজি’কে তিনি জানান, “সেই সময় আমি বেশ হতাশ ছিলাম।” পরবর্তীতে তিনি ঈস্টের ডিএনএর দ্বিতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন। এ কাজ তাঁকে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে জুনিয়র প্রফেসর হিসেবে নিয়োগ পেতে সহায়তা করে। সেখানেই তিনি মাইক্রোস্কোপ নিয়ে ঈস্টের কোষ নিয়ে গবেষণা চালান। সেই সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৪৩ বছর। আর আজ এতো বছর পর সে কাজেরই স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ পুরস্কার নোবেল দেয়া হলো। জাপানিজ টেলিভিশিন NHK-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নোবেল পাবার পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “আমি শুধু এটাই বলতে পারি যে, এ পুরস্কার আমার জন্য অনেক সম্মানের। তরুণদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে, যে কেউ বিজ্ঞান নিয়ে সফলতা অর্জন করতে পারবে। কিন্তু সেজন্য তাকে চ্যালেঞ্জ নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।” তিনি বর্তমানে টোকিও ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে অনারারি প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রথা অনুযায়ী আগামী ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে অন্যান্য নোবেল বিজয়ীদের সাথে তার হাতে নোবেল পদক এবং পুরস্কারের অর্থমূল্য তুলে দেয়া হবে।

তথ্যসূত্রঃ

১/https://www.nobelprize.org/nobel_prizes/medicine/laureates/2016/

২/http://www.livescience.com/56349-japanese-scientist-wins-nobel-prize-in-medicine.html

৩/https://www.newscientist.com/article/2107747-medicine-nobel-prize-goes-to-discovery-of-how-our-cells-recycle/
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top