জানা অজানা

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাধার

পৃথিবী বসবাসযোগ্য গ্রহ হবার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পানি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণের সব দিককে প্রভাবিত করছে পানি। পানি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী থাকতো না। বর্তমানে যেমন দেখতে তাই তার তুলনায় গ্রহটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ৭১% পানি দ্বারা আচ্ছাদিত, যার প্রায় ৯৬.৫% পানি সমুদ্রগুলো ধারণ করছে। এছাড়া নদীনালা, হ্রদ, বাতাসের জলীয় বাষ্প, হিমবাহ, মাটির আর্দ্রতা এবং আপনার-আমার মধ্যেও পানি রয়েছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধারের অবস্থান ভূপৃষ্ঠের উপরে কোথাও নয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মাইল অভ্যন্তরে এর অবস্থান।

পৃথিবীকে ভূতাত্ত্বিকভাবে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায় Crust, Mantle ও Core। এগুলোর মধ্যে Mantle স্তরটি খানিকটা জটিল। এর নিজেরই আবার স্বতন্ত্র চারটি স্তর রয়েছে- Lithosphere, Athenosphere, Upper mantle ও Lower mantle। এ স্তরগুলোর মধ্যেও আবার বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়। এগুলোর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। Mantle এর শেষোক্ত দুইটি স্তরের মধ্যবর্তী অংশকে বলা হয় Transition zone। এ অংশেই রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধার।

যে জলাধারের কথা বলছি তা ভূ-পৃষ্ঠের উপরের জলাশয়গুলোর মতো নয় যেখানে আমরা মাছ চলাচল করতে দেখি। পানির যে তিনটি রূপের সাথে আমরা পরিচিত, এটি তার থেকে আলাদা। বলা যেতে পারে পানির চতুর্থ অবস্থা সেটি। ভু-অভ্যন্তরে এত গভীরে অত্যাধিক তাপমাত্রা ও চাপের কারণে পানি বিভাজিত হয়ে হাইড্রক্সিল মুলক (OH¯) আকারে থাকে যা এক ধরনের শিলার মধ্যে আণবিক স্তরে চাপা পড়ে আছে। এ শিলার নাম দেয়া হয়েছে Ringwoodite। শিলাটি অনেকটা পানি দ্বারা সিক্ত স্পঞ্জের ন্যায় আচরণ করে। শিলাটির বিশেষ স্ফটিক গঠন হাইড্রোজেনকে আকর্ষণ করে পানিকে আটকে ফেলতে পারে। Ringwoodite পানির এক সুবিশাল আধার। Transition zone এর এই শিলার যদি এক শতাংশও গঠনগতভাবে তরল পানি হয় তাহলে তার দ্বারা পৃথিবীর সমুদ্রগুলোকে প্রায় তিন বার প্রতিস্থাপিত করা যাবে।

ভূ-অভ্যন্তরে এই সুবিশাল জলাধারের সন্ধান পেয়ে বিজ্ঞানীদের এখন ধারণা, ভূপৃষ্ঠের এ বিশাল সমুদ্রগুলোর পানির উৎস আসলে ভূ-অভ্যন্তরে আটকে থাকা পানিই। যদিও পূর্বে সর্বাধিক স্বীকৃত ধারণা ছিল- প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন বছর আগে বরফতুল্য ধূমকেতু ও গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ থেকেই এ সমুদ্রগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। তবে এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভূতাত্তিক কার্যকলাপ এবং অত্যাধিক চাপের কারণে ভু-অভ্যন্তরের আটকে থাকা পানির অণুগুলো ভূপৃষ্ঠের দিকে উঠে এসে এই সমুদ্রগুলোর জন্ম দিয়েছে। এর থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা পানি চক্র কেবল ভূ-পৃষ্ঠ এবং বায়ুমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভু-অভ্যন্তরের অনেক গভীরে পর্যন্ত প্রসারিত। এছাড়াও ধারণা করা হয় ভু-অভ্যন্তরের এই পানিই বাফার হিসেবে ক্রিয়া করছে যার জন্য কোটি কোটি বছরেও সমুদ্রের উচ্চতার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

আমাদের সৌভাগ্য যে এই সুবিশাল জলরাশি পৃথিবীর অভ্যন্তরেই চাপা পরে আছে। নতুবা যদি তা সম্পূর্ণভাবে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসতো তাহলে আমরা স্থলভাগ বলতে কেবল পর্বতচূড়াগুলোকেই দেখতে পেতাম।

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top