বায়েস থিওরির বিশ্ব জয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যাদের একটু নাড়াচাড়া আছে তারা বায়েস তত্ত্ব সম্পর্কে জানবেই জানবে। গণিত, পরিসংখ্যান, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, বাণিজ্য, কম্পিউটার বিজ্ঞান, পূরকৌশল– সকল প্রধান বৈজ্ঞানিক শাখাতে বায়েস থিওরী প্রয়োগ আছে। এর প্রায়োগিক ক্ষমতা প্রমাণিতও হয়েছে। কিন্তু, এ তত্ত্বটিকে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক কাঠখর পোহাতে হয়েছিল। আনুমানিক ১৫০ বছর লড়াই করার পর, বিংশ শতকে এসে তত্ত্বটি মোটামুটি সবার কাছে গৃহীত হয়। কিন্তু, কেন এত সময় লাগলো?

বায়েস তত্ত্ব খুবই মৌলিক কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে। যেমনঃ কীভাবে আমরা প্রমাণ বিশ্লেষণ করি, পুরনো তথ্যের সাথে কীভাবে নতুন তথ্য সংযোজন এবং সেখান থেকে নতুন আরও তথ্য পেতে পারি, এবং অনিশ্চয়তার মুখে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে পারি? ছোট্ট এক লাইনের একটা সমীকরণ এতসব তথ্য দিতে পারে।

বায়েস তত্ত্বের প্রথম শর্ত হচ্ছে ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমাদেরকে সে বিষয়ের পূর্ব প্রমাণ সম্পর্কে জানতে হবে। ইংল্যান্ডে ১৭৪০ সালের দিকে বায়েস তত্ত্বটির উদ্ভব। এটি আবিষ্কার করেন ইংলিশ গণিতবিদ রেভারেনড থমাস বায়েস (১৭০১ – ১৭৬১)। তার জীবদ্দশায় সূত্রটি সম্পর্কে কেউ জানতো না। তার মৃত্যুর পর তারই বন্ধু রিচার্ড প্রাইস (১৭২৩ – ১৭৯১) তার সমস্ত কাজ প্রকাশ করেন। মূলত প্রাইসের কারণেই বায়েস সবার কাছে পরিচিতি পান।

বায়েস থিওরিকে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করেন আরেক বিখ্যাত ফরাসী গণিতবিদ পিয়েরে সাইমন লাপ্লাস। বর্তমানে বায়েস থিওরির যে রূপ দেখতে পাই তা মূলত লাপ্লাসের অবদান। এ সূত্র ব্যবহার করে তিনি প্রমাণ করেন যে ছেলেদের জন্মহার মেয়েদের থেকে বেশী।

image source: probabilisticworld.com

লাপ্লাসের মৃত্যুর পর পরবর্তী ১০০ বছর বায়েস থিওরির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং কিছু কিছু প্রভাবশালী বিজ্ঞানীরা লাপ্লাসের কাজকে অনেক বেশী বৈষয়িক (Subjective) বলে মনে করেন। সবচেয়ে বেশী সমালোচনার শিকার হয় এই প্রেক্ষিতে যে কেন এখনকার বা ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্যতা নির্ণয়ের জন্য পূর্ব প্রমাণ প্রয়োজন হবে? তবে কিছু কিছু গণিতবিদ বাস্তব জরুরী সমস্যার সমাধানের জন্য বায়েস থিওরি ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

বায়েস তত্ত্বের সবচেয়ে বড় বিজয় তখনই সাধিত হয় যখন বিখ্যাত ইংরেজ গণিতবিদ এলান টিউরিং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নেভির গোপন সঙ্কেত এনিগমা কোড ভাঙ্গার জন্য বায়েস তত্ত্ব ব্যবহার করেন। এ সময়টাতেই রুশ বিজ্ঞানী আন্দ্রেই কলমোগরভ এবং মার্কিন ক্লড শেনন যুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই তত্ত্বটি ব্যবহার করেন।

বায়েস থিওরির আরো কিছু নমুনা ইতিহাস থেকেই পাওয়া যাবে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের বীমা ক্ষতিপূরণের হিসাব মেলানোর বিষয়ে বায়েস ব্যবহার করা হয়। জার্মান U-Boat শনাক্তকরণে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র বের করতে এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরে গলিত লোহার শনাক্তকরণেও বায়েস তত্ত্ব সফলতার সাথে প্রয়োগ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার স্নায়ু যুদ্ধের সময় বায়েস থিওরি প্রয়োগ করে সাবমেরিন, এইচ বম্ব শনাক্ত করা হয়। পারমাণবিক চুল্লীর নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা হয়, ধূমপানের কারণে যে ক্যান্সার হতে পারে সেটি গাণিতিকভাবে বায়েস থিওরি দিয়ে প্রমাণ করা হয়। চ্যালেঞ্জার শাটল দুর্ঘটনার জন্য ফাইনম্যান যে  O– ring কে দায়ী করেন সেটি তিনি বায়েস থিওরি প্রয়োগ করে বের করেছিলেন। এনরিকো ফার্মি, রিচার্ড ফাইনম্যানদের মতো বিজ্ঞানীরা তাদের পদার্থবিজ্ঞানের কাজে এ তত্ত্ব সফলতার সাথে ব্যবহার করেছিলেন।

image source: theguardian.com

বায়েস তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এটি কম অথবা বেশী দুই ধরনের ডাটা নিয়ে কাজ করতে পারে। এবং তা থেকেই নতুন তথ্য বের করে আনতে পারে। আরেকটি সুবিধা হচ্ছে বায়েস খুবই সূক্ষ্মতার সাথে সম্ভাব্যতা বের করে আনতে পারে। বায়েস প্রয়োগ করার পর এর সঠিকতা যাচাই করার জন্য accuracy rate, false alarm rate বের করা হয়। যেকোনো বিষয়তেই দেখা গেছে অন্যান্য পদ্ধতির থেকে বায়েস সঠিকভাবে যে কোনো ডাটা থেকে তথ্য বের করে আনতে পারে।

বর্তমানে বায়েস তত্ত্ব ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা হচ্ছে। মেশিন লারনিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে বায়েস তত্ত্ব এখন এক অনিবার্য বিষয়। বায়েস তত্ত্ব এখন অনেক বেশী আধুনিক রূপ নিয়েছে। এর অনেকগুলো শাখা তৈরি হয়ে গেছে। যেমনঃ বায়েসিয়ান নেটওয়ার্ক, বায়েসিয়ান পরিসংখ্যান, বায়েসিয়ান প্যাটার্ন রেকগনিশন, বায়েসিয়ান বিলিফ, বায়েসিয়ান এ আই ইত্যাদি।

গত ২০ বছরে Intelligent Transportation Sector-এ এক নতুন বিষয় অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যার নাম Real-time crash prediction model (RTCPM)। গাড়ি দুর্ঘটনা নিত্য বিষয়ে পরিণত হয়ে গেছে।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য ট্রান্সপোর্ট বিজ্ঞানীরা আগেভাগে দুর্ঘটনা যেন বোঝা যায় এমন কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন। এই গবেষণায় বায়েস থিওরি ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। কম্পিউটার বিজ্ঞান, ইলেকট্রনিক বিজ্ঞান, আধুনিক ডিটেক্টর, পরিসংখ্যান, রবোটিক্স, ট্রান্সপোর্ট সায়েন্স এসবের সম্মিলিত প্রয়োগে এই ফিল্ডে গবেষণা করা হয়।

image source: gainweightjournal.com

জাপানের Tokyo Institute of Technology-তে এ বিষয়ে প্রথম গবেষণা করেন ড. মইনুল হোসেন। বর্তমানে বাংলাদেশের গাজীপুরের Islamic University of Technology (IUT)-তে তিনি এবং তার দল এ বিষয়ে গবেষণা শুরু করেছেন।

Loughborough University এর ড.কুদ্দুস প্রথম Real-time Crash Prediction Model for Autonomous Vehicle– তার PhD ছাত্রকে দিয়ে বের করেন যেখানে তিনি Dynamic Bayesian Network ব্যবহার করেন। গুগল যে সেলফ ড্রাইভিং কার তৈরি করেছে সেইটা পুরোপুরি কাজ করে বায়েস থিওরি ব্যবহার করে।

যেকোনো দিক থেকে বিবেচনা করলেই দেখা যাবে বায়েস থিওরি অত্যন্ত প্রায়োগিক এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

featured image: bbc.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *