মহাকাশ

তারার জন্ম-মৃত্যু

খালি চোখে রাতের আকাশে তাকালে আমরা প্রায় ১০ হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই। সংখ্যার হিসাবে এটা খুবই কম। শুধুমাত্র আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথেই নক্ষত্র আছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন (এক হাজার মিলিয়নে এক বিলিয়ন, দশ লক্ষে এক মিলিয়ন)। দৃশ্যমান মহাবিশ্বে নক্ষত্র আছে প্রায় একশত হাজার মিলিয়নের মতো! একটা সময় মানুষের ধারণা ছিল নক্ষত্রগুলো এখন যেমন আছে সবসময় তেমনই ছিল। নক্ষত্রদেরও যে জন্ম মৃত্যুর মতো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় সে ধারণা মোটামুটি নতুনই বলা যায়। এই বিপুল পরিমাণ নক্ষত্রদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রক্রিয়াগুলো নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ। সেই গল্পই বলবো আজকে।

মহাকাশের কোথাও যদি হাইড্রোজেন গ্যাসের বিশাল সমাবেশ তৈরি হয় তখন গ্যাসের অণুগুলো নিজেরা নিজেদের আকর্ষণে (মহাকর্ষ বলের কারণে) সংকুচিত হতে শুরু করে। গ্যাস যতই সংকুচিত হতে থাকে ততই এর তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। কোনো গ্যাসকে সংকুচিত করলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া খুব পরিচিত ঘটনা। তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছে গেলে কিছুলে অবাক করা ব্যাপার ঘটে।

গ্যাসের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া মানে হলো গ্যাসের অণুগুলোর গতিবেগ বেড়ে যাওয়া। অণুগুলোর গতিবেগ বেড়ে যেতে থাকেলে এরা প্রচণ্ড বেগে নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। হাইড্রোজেনের ভাণ্ডার যখন খুব বেশি সংকুচিত হয়ে যায়, তাপমাত্রা যখন খুব বেশি বেড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছে যায় তখন গ্যাস অণুগুলোর গতিবেগ এত বেশি বেড়ে যায় যে একটা হাইড্রোজেন পরমাণু আরেকটা হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে মিলে হিলিয়াম নামে নতুন একটা পরমাণু গঠন করে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলে নিউক্লিয়ার ফিশন। নতুন এই হিলিয়াম পরমাণুটার ভর আগের হাইড্রোজেন পরমাণু দুটির ভরের যোগফলের চেয়ে কিছুটা কম হয়। এই বাড়তি ভরটুক আইনস্টাইনের  সূত্র অনুযায়ী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে বেরিয়ে আসে। এ শক্তির কিছু অংশ আমরা তাড়িৎচুম্বক তরঙ্গ হিসেবে দেখতে পাই।

এতক্ষণ হাইড্রোজেনের বিশাল ভাণ্ডারটি মহাকর্ষের কারণে লাগামহীনভাবে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যে মুহূর্ত থেকে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয় সেই মুহূর্ত থেকে নির্গত শক্তিটুকু সংকোচনের উল্টোদিকে বা বাইরের দিকে একটা চাপ তৈরি করে। যে আয়তনে এলে হাইড্রোজেনের ভাণ্ডারের মহাকর্ষীয় চাপ আর বাইরের দিকে প্রসারণের চাপ সমান হয় সেই আয়তনে এসে স্থির হয় এবং হঠাৎ করে জ্বলে ওঠে। এতে করে জন্ম হয় একটা নক্ষত্রের। নক্ষত্রটি তার বাকি জীবন হাইড্রোজেনের এই ভাণ্ডারকে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করে পার করে দেয়। কিন্তু যখন এই বিশাল হাইড্রোজেনের ভাণ্ডারটুকু শেষ হয়ে যায় তখন?

একটা নক্ষত্র আকারে যত বড় হয় তার জ্বালানীর পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই বড় নক্ষত্রের জীবনকালও বড়ই হবার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে নক্ষত্র যত বড় হয় তার তাপমাত্রা এবং নির্গত শক্তির পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই বড় বড় নক্ষত্রগুলো বেশি পরিমাণ জ্বালানীও খুব দ্রুতই শেষ করে ফেলে। সেই তুলনায় মাঝারী এবং ছোট নক্ষত্রগুলোর জীবনকাল মোটামুটি দীর্ঘ। আমাদের সূর্যও এরকম একটা নক্ষত্র এবং এর জীবনকাল মোটামুটিভাবে ১০ বিলিয়ন বছর। কিন্তু নক্ষত্র যত বড় বা ছোটই হোক একসময় তার কেন্দ্রের হাইড্রোজেন এবং অন্যান্য জ্বালানী শেষ হয়ে আসে। যতক্ষণ জ্বালানী থেকে শক্তি উৎপন্ন হচ্ছিল ততক্ষণ এ শক্তি মহাকর্ষীয় সংকোচনকে ঠেকিয়ে রেখেছিল। যে মুহূর্তে নক্ষত্রের জ্বালানী শেষ হয়ে শক্তি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে সেই মুহূর্ত থেকে মহাকর্ষকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য আর কিছু থাকবে না এবং নক্ষত্রটা আবার মহাকর্ষের কারণে সংকুচিত হতে শুরু করবে।

জ্বালানী শেষ হয়ে যাবার পর মহাকর্ষের ফলে মৃত নক্ষত্রটির ভাগ্যে কী ঘটে তা নিয়ে প্রথম চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর, ১৯২৮ সালে। তিনি তখন ছাত্র, ক্যামব্রিজে পড়তে যাচ্ছেন জাহাজে চড়ে। জাহাজে বসেই তিনি ভেবে ভেবে বের করলেন, একটা নক্ষত্র ঠিক কতটুকু পর্যন্ত বড় হলে জ্বালানী শেষ হবার পর সেটা সংকুচিত হতে হতে এক জায়গায় এসে থেমে যাবে।

চন্দ্রশেখর হিসাব করে দেখলেন, কোনো নক্ষত্রের ভর যদি আমাদের সূর্যের ভরের দেড় গুণ বা তার কম হয় তাহলে তার মহাকর্ষের জন্য সংকোচন এত শক্তিশালী হবে যে সেই নক্ষত্রগুলো জ্বালানী শেষ করে ফেলার পর নিজেদের সংকোচন আর বন্ধ করতে পারবে না। এ ধরনের নক্ষত্রের ক্ষেত্রে এমন একটা অবস্থা হবে যে সংকুচিত হতে হতে এর পরমাণুগুলো একেবারে গায়ে গায়ে লেগে যাবে। পরমাণুগুলো গায়ে গায়ে লেগে গেলে তাদের ইলেকট্রনগুলোর মধ্যে এক ধরনের তীব্র বিকর্ষণ কাজ করে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনার একটা কটকটে নাম আছে, এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল। এই তীব্র বিকর্ষণের ফলে শেষ পর্যন্ত মৃত নক্ষত্রটার সংকোচন থেমে গিয়ে মোটামুটি স্থিতিশীল একটা অবস্থায় চলে আসে। এ ধরনের মৃত নক্ষত্রকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন- white dwarf (শ্বেত বামন)।

শ্বেত বামনে পরিণত হয়ে যাবার পর নক্ষত্রটার বাকি জীবন খুব সাদামাটা। এরপর কিছুদিন নক্ষত্রটা তার উচ্চ তাপমাত্রার জন্য অল্প পরিমাণে শক্তি বিকিরণ করবে, তারপর ধীরে ধীরে শীতল হতে হতে শক্তি বিকিরণ বন্ধ করে দিয়ে একসময় নিবে যাবে। শ্বেত বামন হিসেবে একটি নক্ষত্রের মৃত্যু মোটামুটি শান্তিপূর্ণ মৃত্যু।

চিত্রঃ Messiar 4 গ্যালাক্সিতে অবস্থিত কিছু শ্বতবামন তারকা।

কিন্তু নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের দেড়গুণ বা তার চেয়ে অল্পকিছু বেশি হয় তাহলে জ্বালানী শেষ করে ফেলার পর আগের নক্ষত্রটার মতো শুধুমাত্র ইলেকট্রনগুলোর তীব্র বিকর্ষণ এর সংকোচনকে বন্ধ করতে পারবে না। সেই প্রচণ্ড মহাকর্ষের চাপে সংকুচিত হতে হতে পরমাণুগুলোর ইলেকট্রনগুলো কেন্দ্রে থাকা প্রোটনের সাথে মিশে নিউট্রন হয়ে যেতে থাকবে। যেহেতু সব পরমাণুতে প্রোটন আর ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান সমান তাই ইলেকট্রনগুলো প্রোটনের সাথে মিশে যেতে যেতে একসময় নক্ষত্রটাতে থাকবে শুধুই নিউট্রন। এসময় নিউট্রিনো নামে একটা কণিকাও তৈরি হয়। এই নিউট্রিনোর গতিবেগ খুব বেশি তাই তারা দ্রুত নক্ষত্র ছেড়ে বেড়িয়ে আসে।

এই অবস্থায় আবার এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল কাজ করা শুরু করবে (আগেরবার এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল কাজ করেছিল ইলেকট্রনের মধ্যে। এবার এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল কাজ করবে নিউট্রনের মাঝে) এবং নিউট্রনের মাঝে প্রচণ্ড বিকর্ষণের ফলে মৃত নক্ষত্রটার সংকোচন বন্ধ হয়ে স্থিতিশীলতা চলে আসবে। এ ধরনের নক্ষত্রকে বিজ্ঞানীরা বলেন Neutron star। ঠিক যত সহজে Neutron star এর কথা বলে ফেলা হলো Neutron star ঠিক ততটাই বিস্ময়কর বস্তু। সূর্যের প্রায় দ্বিগুণ ভর নিয়েও এক একটা Neutron star এর ব্যাসার্ধ হয় মাত্র ১১-১৫ কিলোমিটার (প্রায় ৭-৮ মাইলের মতো)।

এত বিশাল পরিমাণ ভরকে এতো ছোট জায়গায় আঁটিয়ে ফেলতে গিয়ে এর ঘনত্ব হয় ভয়াবহ। যদি কোনো একটা Neutron star থেকে কোনোভাবে এক চা-চামচ পরিমাণ পদার্থ পৃথিবীতে নিয়ে আসা যেত তাহলে তার ভর হতো কয়েক বিলিয়ন টন। তবে তার চেয়েও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এর স্পিন বা ঘূর্ণন। প্রচণ্ড ভর নিয়ে এক একটা Neutron star সেকেন্ডে প্রায় ৭০০ বারের মতো করে ঘুরতে থাকে (মিনিটে ৪৩,০০০ বার)।

নিউট্রন তারকার মধ্যে শতকরা ১০০ ভাগ নিউট্রন থাকার কথা হলেও আসলে এর মধ্যে কিছু প্রোটন আর কিছু ইলেকট্রন থেকে যায়। এই চার্জযুক্ত কণিকাগুলোকে নিয়ে এত অকল্পনীয় বেগে ঘোরার কারণে এর চারিদিকে এত শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি হয় যে মহাবিশ্বে Neutron star এর মতো শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র আর কিছুতে নেই।

তাপমাত্রার জন্য Neutron star থেকে সারাক্ষণই দৃশ্যমান আলো, গামা রশ্মি সহ অন্যান্য শক্তিশালী বিকিরণ বের হতে থাকে। এই বিকিরণের কায়দাও সাধারণ নক্ষত্রদের মতো না, এর দুই মেরু থেকে অনেকটা জেটের মতো করে এসকল শক্তিশালী রশ্মি নির্গত হতে থাকে। সেইসাথে বেশিরভাগ নিউট্রন তারকাই তার অক্ষের সাথে কিছুটা কোনাকুনিভাবে প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকে। অনেকটা পৃথিবীর মতো। পৃথিবীও তার অক্ষের সাথে প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি কোণ করে ঘোরে যার জন্য আমরা ঋতুবৈচিত্র্য দেখতে পাই।

পৃথিবী থেকে অনেক অনেক অনেক দূরের কোনো নিউট্রন তারকা থেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী বিকিরণ হয়তো পৃথিবীকে আঘাত করে কিন্তু নিজের অক্ষের সাথে কিছুটা হেলে ঘুরার কারণে এই বিকিরণকে সারাক্ষণ পাওয়া যায় না। একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর এই বিকিরণ পৃথিবীকে আঘাত করতে থাকে। নির্দিষ্ট সময় পর পর এসকল নিউট্রন তারকা থেকে pulse পাওয়া যায় বলে এদেরকে বলে pulsar। এই সময়ের পার্থক্যটুক সবসময় একই থাকে এবং এটা এতটাই নির্ভুল যে প্রথম যখন বিজ্ঞানীরা একটা নিউট্রিন তারকা থেকে আসা বিকিরণ সিগনাল ধরতে পেরেছিলেন তারা বিশ্বাসই করতে পারেননি যে এটা কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা হতে পারে। তারা ভেবেছিলেন হয়তোবা কোনো মহাজাগতিক প্রাণী পৃথিবীর মানুষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছে!

কিন্তু নক্ষত্রের ভর যে সবসময় সূর্যের ভরের দ্বিগুণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে তেমন কোনো কথা নেই। সত্যি কথা বলতে আমাদের সূর্য খুব ছোট একটা বামন প্রজাতির নক্ষত্র এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে ভারী নক্ষত্রটা সূর্যের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ ভারী! এত ভারী নক্ষত্রের মৃত্যু, অল্প ভরের নক্ষত্রের মতো সরল সোজা হয় না। সেই মৃত্যু প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিস্ময়কর।

সূর্যের দ্বিগুণের বেশি ভরসম্পন্ন নক্ষত্রগুলো যখন তাদের সব হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে পরিণত করে করে শেষ করে ফেলে তখন তাদেরও মহাকর্ষীয় সংকোচনকে আর ধরে রাখার মতো শক্তি থাকে না। ভর বেশি হওয়াতে তাদের সেই মহাকর্ষীয় আকর্ষণটাও হয় অনেক বেশি। সেই প্রচণ্ড আকর্ষণে সংকুচিত হতে হতে নক্ষত্রটার তাপমাত্রা এত বেড়ে যায় যে এর ভেতরে আরেকবার নিউক্লিয়ার ফিউশান বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এবারে হিলিয়াম থেকে কার্বন, কার্বন থেকে লোহা পর্যন্ত ভারী মৌলগুলো তৈরি হয় এবং বাড়তি ভরটুক শক্তি হিসেবে বেরিয়ে আসে।

নক্ষত্র যদি সূর্যের ৬ গুণের চেয়ে বেশি ভারী হয় তবে তার কেন্দ্রের প্রচণ্ড ভর বাইরের স্তরের সাথে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে না। যার কারণে প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে এর বাইরের স্তরটা

মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের এই স্তরের সাথে সাথে নক্ষত্রে তৈরি হওয়া ভারী মৌলগুলোও মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের রক্তে যে আয়রন, হাড়ের ক্যালসিয়াম এসব ভারী মৌলগুলো একসময় কোনো না কোনো নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হয়েছিল। তাই বলা যায় আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো নক্ষত্রের অংশ! এই বিস্ফোরণটাকে বিজ্ঞানীরা বলেন সুপারনোভা।

চিত্রঃ সুপারনোভার পর এক্স-রে, অবলাল আর দৃশ্যমান আলোতে কেপলারের অবশেষ।

সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের ভারী কেন্দ্রটি এর ভরের জন্য ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। যতই সংকুচিত হয় ততই এর ভর অল্প জায়গার মধ্যে এঁটে যেতে থাকে। যার কারণে এর মহাকর্ষ বল আরও শক্তিশালী হতে থাকে। আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি থেকে আমরা জানি কোনো বস্তুর ভর খুব বেশি হলে তা স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে, যার কারণে তার পাশ দিয়ে আলো আসার সময় বেঁকে যায়। এ কারণে দেখা যায় সূর্যগ্রহণের সময় দূরের নক্ষত্র থেকে আসা আলো সূর্যের মহাকর্ষের কারণে বেঁকে যায়।

নক্ষত্রের কেন্দ্রটা যতই সংকুচিত হতে থাকে ততই এর মহাকর্ষ শক্তিশালী হতে থাকে, এই শক্তিশালী মহাকর্ষের জন্য কেন্দ্রটা আরও বেশি সংকুচিত হতে থাকে। এবারে আর ইলেকট্রন বা নিউট্রনের এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল এই ভয়াবহ সংকোচনকে আটকাতে পারে না। এভাবে সংকুচিত হতে হতে একসময় কেন্দ্রটার মহাকর্ষ এতই বেড়ে যায় এবং তা স্থান-কালকে এতো বেশি বাঁকিয়ে ফেলে যে এর থেকে আর আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। বাইরে থেকে দেখলে দেখা যাবে নক্ষত্রের কেন্দ্রটি থেকে নির্গত আলোর পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসছে। কেন্দ্রটা যখন সংকুচিত হয়ে একটা নির্দিষ্ট আকারের চেয়ে ছোট হয়ে যাবে তখন আর কোনো আলোই বের হতে পারবে না। এরকম একটা অবস্থায় যখন পৌঁছে তখন তাকে বলে ব্ল্যাকহোল (কৃষ্ণবিবর)।

কৃষ্ণবিবর সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয়। তবে আশ্চর্যজনক হলেও একে বুঝতে হলে শুধুমাত্র ভর, চার্জ এবং কৌণিক ভরবেগ এই তিনটা রাশি জানাই যথেষ্ট! সব ব্ল্যাকহোলের চার্জ এবং কৌণিক ভরবেগ থাকতে হবে তা নয় কিন্তু সকল ব্ল্যাকহোলেরই ভর আছে। বেশি ভরের কারণেই আসলে ব্ল্যাকহোলটা সৃষ্টি হয়েছিল। তাই একটা ব্ল্যাকহোলকে বুঝতে হলে আসলে শুধু তার ভরটা জানলেই চলে!

চিত্রঃ একটা গ্যালাক্সি আর আমাদের দৃষ্টিসীমার মাঝে যদি একটা ব্ল্যাকহোল চলে আসে তবে আলো বাঁকিয়ে অনেকটা এমন দেখাবে।

ব্ল্যাকহোলের চারিদিকে যে ব্যাসার্ধের ভেতর থেকে এমনকি আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না তাকে বলে ঘটনা দিগন্ত। একটা ব্ল্যাকহোল যদি সূর্যের তুলনায় দশগুণ ভারী হয় তবে তার ঘটনা দিগন্তের পরিধি হবে মাত্র ১৮৫ কিলোমিটার। সেটা কত কম তা বোঝার জন্য বলা যায় যদি এর সম্পূর্ণ ভরটুকু ঘটনা দিগন্তের

ভেতরে সুষমভাবে ছড়ানো থাকতো তবে এর প্রতি সিসি (কিউবিক সেন্টিমিটার) আয়তনের ভর হতো ২০০ মিলিয়ন টন!

তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপারটা হলো ব্ল্যাকহোলের এই বিশাল পরিমাণ ভরটা কিন্তু ঘটনা দিগন্তের ভেতরে সুষমভাবে ছড়ানো থাকে না। যদি ব্ল্যাকহোলটা ঘূর্ণায়মান না হয় তবে ভরটা একটা অত্যন্ত ছোট বিন্দুর মধ্যে সংকুচিত হয়ে থাকে যার আকার  সেন্টিমিটারের মতো। সংখ্যাটা কতটা ছোট তা বোঝার জন্য বলা যায় পরমাণুর আকার  সেন্টিমিটার প্রায়, যা  থেকে একশো বিলিয়ন বিলিয়ন গুণ বড়। দশটা সূর্যের সমান ভর কী করে এত ছোট জায়গায় সংকুচিত হয়ে থাকে তার চেয়ে বড় বিস্ময় কি আর দুটো আছে? এই অত্যন্ত ছোট বিন্দুটার নাম সিঙ্গুলারিটি। অবশ্য ব্ল্যাকহোল ঘূর্ণায়মানও হতে পারে। সেক্ষেত্রে সিঙ্গুলারিটি বিন্দুর মতো না হয়ে রিংয়ের মতো হবে কিন্তু আকারের ক্ষেত্রে সেই একই ব্যাপার!

চিত্রঃ ঘূর্ণায়মান নয় এমন ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি।

চিত্রঃ ঘূর্ণায়মান ব্ল্যাকহোলের রিঙের মতো সিঙ্গুলারিটি।

যেহেতু ব্ল্যাকহোল থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না সেহেতু ব্ল্যাকহোলকে সরাসরি দেখার কোনো উপায় নেই। কিন্তু কোথাও যদি একটা ব্ল্যাকহোল থাকে তবে তার প্রচণ্ড আকর্ষণে চারদিকের ধূলিকণা, গ্যাসের অণু-পরমাণু সব তার দিকে আকৃষ্ট হতে থাকবে। এসব ধূলিকণা, অণু-পরমাণু যতই ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি যেতে থাকে ততই তাদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। যার কারণে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। তাপমাত্রা বাড়লে তার থেকে শক্তিটা আলো হিসেবে বের হয়ে আসে। বাল্বের ফিলামেন্ট, গরম লোহা ইত্যাদি তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।

এই তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে যখন কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে যাবে তখন এখান থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী আলোক রশ্মি (এক্স-রে) বের হতে থাকবে যা খালি চোখে দেখা যায় না। ব্ল্যাকহোলের কাছ থেকে বেরিয়ে আসা এক্স-রে দেখে বিজ্ঞানীরা প্রথম পৃথিবী থেকে প্রায় ছয় হাজার আলোকবর্ষ দূরে সিগনাস এক্স ওয়ান (Cygnus X-I) নামে একটি ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করেছিলেন।

চিত্রঃ Cygnus X-I ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়ে আসা এক্স-রে।

এছাড়াও কিছু কিছু ব্ল্যাকহোল প্রচণ্ড শক্তিশালী এক্স রশ্মি জেটের মতো করে মহাকাশে নিক্ষেপ করে। M 87 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে এমন একটা ব্ল্যাকহোল রয়েছে যেটা মহাকাশে প্লাজমা জেট নিক্ষেপ করে। এই জেটটা দৈর্ঘে প্রায় ৫০০ আলোকবর্ষ বিস্তৃত!

দুটি নক্ষত্র যদি একে অপরকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তবে পুরো সিস্টেমটাকে বলা হয় বাইনারি সিস্টেম। কোনো একটা বাইনারি সিস্টেমের একটা নক্ষত্র যদি মৃত্যুর পর ব্ল্যাকহোল হয়ে যায় তবে বাকি নক্ষত্রটার সেই ব্ল্যাকহোলটার প্রবল আকর্ষণ থেকে রক্ষা নেই। ব্ল্যাকহোলটা তখন সেই দুর্ভাগা নক্ষত্রটা থেকে সকল পদার্থ টেনে নিতে থাকে। এই অবস্থায় একটা ব্ল্যাকহোলকে শনাক্ত করা বেশ সহজ।

বিজ্ঞানীদের ধারণা বড় বড় গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্রে অকল্পনীয় ভরসম্পন্ন ব্ল্যাকহোল রয়েছে। সূর্যের ভরের বিলিয়ন গুণ ভরসম্পন্ন এসব ব্ল্যাকহোল সম্পূর্ণ গ্যালাক্সিকে ধরে রাখে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যে ব্ল্যাকহোলটা রয়েছে যার ভর সূর্যের ভরের ৪ মিলিয়ন গুণ!

চিত্রঃ বাইনারি সিস্টেমের অপর নক্ষত্রটাকে ব্ল্যাকহোল গ্রাস করে ফেলছে।

সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো ব্ল্যাকহোলের আশ্চর্যজনক সব কাণ্ডকারখানা আমরা শুধুমাত্র বাইরে থেকেই দেখতে পারি কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ভেতরে সিঙ্গুলারিটিতে কী হয় তা আমরা কখনো জানতে পারবো না। আপেক্ষিকতার বিশেষ থেকে আমরা জানি কোনোকিছুই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না। যেহেতু আলোও ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্ত থেকে বাইরে বেরোতে পারে না, সেহেতু কেউ যে একটা মহাকাশ যান নিয়ে ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের ভেতরে ঢুকে সিঙ্গুলারিটিতে কি হচ্ছে দেখে আসবে তার কোনো উপায় নেই। ঘটনা দিগন্ত পার হয়ে ভেতরে ঢোকা মাত্র চিরদিনের জন্য বাইরের মহাবিশ্বের সাথে সকল যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাবে।

আমরা মাঝে মাঝেই বিজ্ঞান কল্পকাহিনী পড়ে পুলকিত হই। সত্যিকারের প্রকৃতি যে কল্পকাহিনির চেয়েও একশগুণ বেশি পুলক নিয়ে অপেক্ষা করছে তা কি আমরা মনে রাখি? [নক্ষত্রদের আরো কিছু জীবন বৈচিত্র্য নিয়ে আরেকদিন কথা হবে]

তথ্যসূত্র

  1. http://www.skyandtelescope.com/astronomy-resources/how-many-stars-are-there/
  2. http://www.esa.int/Our_Activities/Space_Science/Herschel/How_many_stars_are_there_in_the_Universe
  3. https://www.youtube.com/watch?v=EuC-yVzHhMI
  4. http://www.nasa.gov/audience/forstudents/5-8/features/nasa-knows/what-is-a-supernova.html
  5. http://hubblesite.org/gallery/album/star/supernova/titles/true/
  6. http://space-facts.com/m87-galaxy/
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/R136a1
  8. http://www.nasa.gov/feature/goddard/2016/nasa-s-hubble-finds-universe-is-expanding-faster-than-expected/
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_most_massive_stars
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top