মহাকাশ

কাল্পনিক এক মাধ্যম ইথারের গল্প

বিজ্ঞানীরা তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে আগেই দেখেছিলেন শব্দই হোক বা, পানির তরঙ্গই হোক তার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। আলোও এক প্রকার তরঙ্গ। কিন্তু ভন গুইরিকের পরীক্ষা থেকে দেখা গেলো যে শব্দ শূন্য মাধ্যমে চলাচল করতে না পারলেও আলো কিন্তু শূন্য মাধ্যমেই চলাচল করছে। শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়েও যে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা ঠিক মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য?

বিজ্ঞানীরা আলো শূন্য মাধ্যমে চলতে পারে এটা মানতে পারলেন না। তাই তারা এক নতুন রকম মাধ্যমের কল্পনা করলেন যা সারা মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থান জুড়ে বিস্তৃত। এ মাধ্যমে কম্পন সৃষ্টি করেই আলো চলাচল করে। এ কাল্পনিক মাধ্যমের নাম দেয়া হল ইথার। ইথারের ধারণা কিন্তু নতুন ছিল না। অ্যারিস্টোটল প্রথম ইথারের কথা বলে গিয়েছিলেন। পরবর্তিতে আলোর শূন্য মাধ্যমে চলার ব্যাখ্যা দিতে সেই ইথার ধারণাটিরই পুনর্জন্ম ঘটাতে হল বিজ্ঞানীদের। বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন ইথার সম্বন্ধে বলেছিলেন, ইথার এক রকমের পদার্থ যা বাতাসের চেয়ে কম হালকা। বাতাস ইথারের চেয়ে মিলিয়ন, মিলিয়ন এবং আরো মিলিয়ন গুন বেশি ঘনত্ব সম্পন্ন। এর দৃঢ়তা এর ঘনত্বের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। ইথার সম্ভবত সেকেন্ডে চারশ মিলিয়ন-মিলিয়ন বার কম্পন সৃষ্টি করতে পারে। এর ঘনত্ব খুব কম হওয়ার জন্য এর ভেতর দিয়ে যখন কোন কিছু যায় তখন ইথার তার গতিতে এতটুকুও বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনা।

Image result for aristotle aether

প্রথম ইথারের কথা বলেছিলেন অ্যারিস্টোটল

অর্থাৎ, ইথার হল খুবই শক্ত কিন্তু খুবই কম ঘনত্বের এক কাল্পনিক মাধ্যম। যা স্বচ্ছ এবং ঘর্ষণবিহীন। এ মাধ্যম রাসায়নিকভাবেও নিষ্ক্রিয় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল এই ইথারই আমাদের সর্বদা ঘিরে রেখেছ।

 

এখন শুরু হল ইথার খোঁজাখুঁজির কাজ। কারণ বিজ্ঞানীদের শুধু কল্পনা করলেই চলে না তাদের কল্পনাকে প্রমাণও করে দেখাতে হয়। ইথার খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগে আমরা আলো যদি আসলেই ইথারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় তাহলে কি ঘটবে সেটা একটু বোঝার চেষ্টা করি।

ধরুন একটি গাড়ি আপনার দিকে এগিয়ে আসছে। আপনিও গাড়িটির দিকে দৌড়ে গেলেন। তাহলে কি ঘটবে? আপনাদের মধ্যে যারা একটু দুষ্ট বুদ্ধির অধিকারি তারা চট করে বলে দেবেন যে, কি আর ঘটবে, দুর্ঘটনা ঘটবে। আচ্ছা ধরুন গাড়িটি অনেক দূরে আছে। তাহলে? গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার কথা চিন্তা করুন তো? হ্যাঁ, গাড়িটির বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যে বেগ মনে হত তার চেয়ে কিছুটা বেশি মনে হবে। আবার গাড়ি যেদিকে যাচ্ছে আপনি যদি সেই একই দিকে হঠাৎ করে ভোঁ দৌড় শুরু করেন তাহলে আপনার কাছে গাড়ির বেগ আপনি স্থির অবস্থায় গাড়ির যে বেগ দেখতেন তার চেয়ে কম মনে হবে।

এবার গাড়ি থেকে তরঙ্গে যাই আমরা। ধরুন কোন একটি স্থান থেকে মাইকের মাধ্যমে গান বাজানো হচ্ছে। আপনি সেই স্থানটির দিকে যদি দৌড়িয়ে যান তাহলে কি হবে? হ্যাঁ, শব্দের বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যা মনে হত তার চেয়ে বেশি মনে হবে আর উল্টো দিকে দৌড় দিলে শব্দের বেগ তার চেয়ে বেশি মনে হবে। আলোর ক্ষেত্রেও কি এ কথাটি সত্য নয়?

এ প্রশ্নটি প্রথম ভালভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন স্যার ম্যাক্সওয়েল। তিনিই প্রথম তাত্ত্বিকভাবে দেখিয়েছিলেন যে আলো একরকম তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। তিনি চিন্তা করলেন আলোও যেহেতু শব্দের মত একটি তরঙ্গ তাই কেউ যদি ইথারের মধ্য দিয়ে আলোর উৎসের দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে (অনেকটা বাতাসের মধ্য দিয়ে মাইকের দিকে দৌড় দেয়ার মত) তাহলে তার কাছে আলোর বেগ বেশি মনে হবে। আর কেউ যদি আলোর উৎসের বিপরীত দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে তবে তার কাছে আলোর বেগ কম মনে হবে।

Image result for maxwell aether

এখন আমাদের মহাবিশ্বের সর্বত্র ইথার বিদ্যমান। অর্থাৎ, আমাদের হাত-পা থেকে শুরু করে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীটিও ইথারের মাঝে নিমজ্জিত আছে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরাঘুরি করে। জানুয়ারি মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে তার ৬ মাস পরে অর্থাৎ, জুলাই মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ তার বিপরীত দিকে থাকে। ঠিক তেমনি এপ্রিল মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে অক্টোবর মাসে ঠিক তার বিপরীত দিকে থাকে। বেগের দিক সম্পূর্ণ উলটো হওয়ার কারণে ৬ মাস পর পর পৃথিবী থেকে আলোর বেগ মাপলে পৃথিবীর সাপেক্ষে সেই আলোর বেগের একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা। এই বিষয়টিই লক্ষ্য করলেন ম্যাক্সওয়েল। ম্যাক্সওয়েল তার এই চমৎকার ধারণার কথা রয়্যাল সোসাইটির এক জার্নালের প্রধানকে জানান। কিন্তু সেই সম্পাদক তার ধারণাকে একরকম হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে ম্যাক্সওয়েল পাকস্থলির ক্যান্সারে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৮ বছর।

Image result for maxwell aether

ম্যাক্সওয়েলের এই ধারণাকে বাস্তবে রুপ দেয়ার জন্য এগিয়ে এলেন আমেরিকার প্রথম নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। আলবার্ট মাইকেলসন। মাইকেলসনের বয়স যখন কেবল ২৫ তখনই তিনি আলোর বেগ নির্ণয় করেন যার মান ছিল, ২,৯৯,৯১০±৫০ কি.মি./সেকেন্ড। আলোর বেগের এই মানটি পূর্বের যেকোন মান থেকে ২০ গুন বেশি সঠিক ছিল।

মাইকেলসন পৃথিবীর ঘূর্ণনের জন্য আলোর বেগে যে তারতম্য পাওয়ার কথা তা খুঁজে বের করার জন্য একটি পরীক্ষার কথা কল্পনা করলেন। এ পরীক্ষায় যদি আলোর বেগের মাঝে তারতম্য পাওয়া যায় তবে ইথারের অস্তিত্ব কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি না পাওয়া যায়? তাহলে হয়ত ইথারের ধারণা নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা শুরু করতে হবে। মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি কিন্তু নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে কাঙ্খিত তারতম্য ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যররথ পরীক্ষা নামেই পরিচিত। তার সেই ব্যররথতার গল্প পরবর্তি কোন এক লেখায় তুলে ধরা হবে। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

কাল্পনিক এক মাধ্যম ইথারের গল্প
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top