মহাকাশ

বিগ ব্যাং এর আগের সময়ঃ জনপ্রিয় কিছু তত্ত্ব

সময়ের কি শুরু আছে? শেষ? আমাদের কাছে থাকা তথ্য উপাত্ত নির্দেশ করে যে আমাদের মহাবিশ্ব সারাজীবন এমন ছিল না। অর্থাৎ, পদার্থবিদরা এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত যে, মহাবিশ্ব সম্বন্ধে হয়েলের স্টেডি স্টেট থিওরি আসলে একটি ভুল। আমাদের মহাবিশ্ব আগেও এমন ছিল, এখনও তেমনি আছে, ভবিষ্যতেও এমনই থাকবে হয়েলের এ তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শত্রু হল তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র। তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র আমাদের বলে এনট্রপি বা, বিশৃঙ্খলা সর্বদা সময়ের সাথে সাথে বাড়ে। যা হয়েলের স্টেডি স্টেট তত্বের সরাসরি বিরুদ্ধে যায়।

আমাদের মহাবিশ্বের একটি শুরু ছিল। প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল। ১৪ বিলিয়ন একটি বিশাল সংখ্যা। এক বিশাল সময়। আমাদের মহাবিশ্বের একটা শুরু ছিল, এটাই সম্ভবত জ্যোতিপদার্থবিদ্যার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এটাই এখন সর্বজনস্বীকৃত। আমাদের মহাবিশ্বের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বিশেষ করে আপনি যদি এ পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের পরের সময়কালের সাথে তুলনা করতে যান।

পদার্থবিদরা এ সম্বন্ধে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই জানেন যে বিগ ব্যাং এর পরে আমাদের মহাবিশ্বে কি কি ঘটেছে। কিন্তু বিগ ব্যাং এর আগে কি ছিল? বিগ ব্যাং কি করে হল? এ সম্বন্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য থিওরি বা, তত্ত্বগুলো কি বলে?

বিগ ব্যাং ঘটার বিষয়ে সবচেয়ে আধুনিক তত্ত্ব বলে এক ধরণের কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান থেকে এক ধরণের ইনফ্লেশান বা, অতি দ্রুত গতির সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমাদের গোটা মহাবিশ্বের উদ্ভব।

Image result for inflationary universe

চিত্রঃ ইনফ্লেশনারি ইউনিভার্স

২০১৩ সালে বাইসেপ-২ এমন একটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন যা আমাদের আদি মহাবিশ্বের ইনফ্লেশানের প্রমাণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু পরবর্তিতে তাদের সেই পরীক্ষার ফলাফলে ভুল ধরা পড়ে। যদি ইনফ্লেশানের ধারণা সত্য হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে, আমাদের মহাবিশ্ব একটি আরো বড় মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র অংশ।  এছাড়াও ইনফ্লেশান থিওরির সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখাটি হল ইটারনাল ইনফ্লেশান যা আমাদের বলে মহাবিশ্ব প্রতি নিয়ত সৃষ্টি হয়ে চলেছে বা, প্রতিনিয়ত বিগ ব্যাং ঘটেই চলেছে। আমাদের মহাবিশ্ব শুধুমাত্র সেই বহু বিগব্যাং এরই একটির ফলাফল।

Image result for eternal inflation

 

আরেকটি বিকল্প ধারণা হল আমাদের মহাবিশ্ব একটা ব্ল্যাকহোল বা, কৃষ্ণ গহবরের থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এ ধারণা সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ব্ল্যাকহোল কি? অতি ভর সম্পন্ন কোন নক্ষত্র (সূর্যের চেয়ে ৩-৫ গুন) যখন তার জীবন কালের শেষ পর্যায়ে পাউলির বর্জন নীতি অগ্রাহ্য করতে সক্ষম হয় তখন তা নিজেই নিজের মহাকর্ষের আকর্ষণ বলে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যেতে থাকে এবং এক সময় আয়তনহীন বিন্দুতে পরিণত হয়। একে বলা হয় ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি। এ সিঙ্গুলারিটিতে শক্তির ঘনত্ব অসীম। কারণ, আমরা জানি, ঘনত্ব= ভর/আয়তন । এখানে নক্ষত্রটির আয়তন শূন্য । তাই এ সিঙ্গুলারিটি অবস্থায় ব্ল্যাকহোলের ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়। এ অসীম ঘনত্বের জন্য তার মহাকর্ষ বলও অত্যন্ত বেশি থাকে। জেনারেল রিলেটিভিটি আমাদের বলে কোন স্থানে ভর যত বেশি থাকবে সেখানকার স্থান-কালে তত বেশি বক্রতার সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় বললে ভারী কোন বস্তুর বা, বেশি ঘনত্বের কোন বস্তুর আশে পাশে সময় ধীরে চলতে শুরু করবে। তাহলে অসীম ঘনত্বের কোন বস্তুর স্থান-কালের অবস্থা কেমন হবে? সেখানে আসলে স্থান বা কাল বলে কোন কিছুই থাকবে না। সেখানে সময় একদম স্থির হয়ে যাবে। ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে বা, সিঙ্গুলারিটিতেও সময় একদম স্থির।

স্থান-কালের এই একই রকম অবস্থা বিগ ব্যাং এর সময়ও দেখা যায়। বিষয়টি বুঝতে হলে বিগ ব্যাং থিওরির পক্ষের প্রথম চাক্ষুষ প্রমাণ হাবলের সম্প্রসারণের দ্বারস্থ হতে হবে আমাদের। ১৯২৯ সালে হাবল তার টেলিস্কোপ দ্বারা গ্যালাক্সিগুলোর লাল অপভ্রংশ বা, রেড শিফটের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে, আমাদের মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো আসলে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।

আমাদের মহাবিশ্ব যদি এখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে বা, প্রসারিত হতে থাকে তাহলে এর একটাই অর্থ হতে পারে, আর তা হল আমরা যদি সময়কে উলটো দিকে চালনা করি তাহলে দেখতে পাব আমাদের মহাবিশ্বের সব কিছু এক সময় একসাথে খুব ক্ষুদ্র জায়গায় অবস্থান  করছিল। যা বিগ ব্যাং থিওরির দিকে আমাদের নির্দেশ করে। এভাবে সময়ের চাকাকে উলটো দিকে চালাতে চালাতে এমন এক সময় পাওয়া যাবে যার আগে আর সময় বলে কিছু ছিল না। সব কিছু অতি ক্ষুদ্র এক বিন্দুতে ঘন সন্নিবেশিত ছিল। এ অবস্থার সাথে কি উপড়ের ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটির অবস্থার মিল পাওয়া যায়? হ্যাঁ, এ অবস্থাকে বিগ ব্যাং এর সময়ের সিঙ্গুলারিটি অবস্থা বলা হয়, যা ব্ল্যাক হোলের সিঙ্গুলারিটি অবস্থার অনুরুপ। উভয় সিঙ্গুলারিটিতেই সময় শূন্য।

বিগ ব্যাং এর সিঙ্গুলারিটি আসলে একটি ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি ছিল এমন ধারণা থেকেই আসলে ব্ল্যাকহোল থেকে মহাবিশ্ব উদ্ভবের তত্ত্বের উৎপত্তি।

Image result for black hole

 

এ তত্ত্ব আমাদের বলে আমাদের এ মহাবিশ্বের আগেও অনেক মহাবিশ্ব ছিল। আমাদের মহাবিশ্বকে যদি আমরা n তম মহাবিশ্ব বলি তাহলে n-1 তম মহাবিশ্বটি বিগ ক্রাঞ্চ বা, এমন কোন উপায়ে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়েছিল আর সেই ব্ল্যাকহোল থেকেই আমাদের আজকের এই n তম মহাবিশ্বের উৎপত্তি। একসময় হয়ত বিগ ক্রাঞ্চের মাধ্যমে আমাদের মহাবিশ্বও সঙ্কুচিত হতে শুরু করবে এবং একটি অসীম ভরের ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে। আর সেখান থেকেই n+1 তম মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটবে।

আজ আমরা বিগব্যাং এর আগে কি ছিল বা, বিগ ব্যাং কিভাবে হয়েছিল এ বিষয়ক সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি তত্বের বিষয়ে খুবই সংক্ষেপে জানলাম। ভবিষ্যতে এ তত্বগুলোর বিষয়ে এবং তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর বিষয়ে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top