মহাকাশ

বিগ ব্যাং এবং আমাদের মহাবিশ্বের বিক্ষিপ্ত কিছু কথা

মানুষ! পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র জীব। সেই পৃথিবী আবার এ বিশাল সৌরজগতের এক ছোট্ট গ্রহ। আমাদের এই সৌরজগৎ আবার এই সৌরজগত বিশাল মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। আর এমন কোটি কোটি গ্যালাক্সির সমন্বয় এ মহাবিশ্ব। আমাদের এ অসীম, অনন্ত এবং একই সাথে রহস্যময় মহাবিশ্ব তাহলে কিভাবে সৃষ্টি হল? কোথা থেকে এলাম আমরা, আমাদের পৃথিবী, সূর্য আর অন্যান্য গ্রহ?

রাতের তারাঘেরা আকাশের দিএক তাকিয়ে কত হাজার রাত্রি মানুষ হয়ত কাটিয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে সন্ধানে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের একটা যৌক্তিক উত্তর মানুষের হাতে এসে ধরা দেয় গত শতাব্দির মাঝামাঝির দিকে। পাঠকরা এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গিয়েছেন কি সেই উত্তর!

হ্যাঁ, উত্তরটি আপনাদের অনুমিত “বিগ ব্যাং”ই!!

 

Image result for big bang space

আমাদের এ মহাবিশ্বটি অত্যন্ত গরম এবং ঘন এক অবস্থার থেকে উৎপত্তি হয়েছে। অনেকেই বিগ ব্যাং এর এ অবস্থাকে সিঙ্গুলারিটি হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। আমাদের এ মহাবিশ্ব যখন সবেমাত্র প্লাঙ্ক টাইম  সেকেন্ড) অতিক্রম করছিল যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক সময় তখন এটি এক অস্বাভাবিক প্রসারণের মধ্য দিয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা এখন ইনফ্লেশান বলেন। বলা হয়ে থাকে এ সময় স্পেস বা, স্থান নিজেই আলোর চেয়ে বেশি গতিতে সম্প্রসারিত হতে থাকে (যারা খাঁটি পদার্থবিদ তারা আমার এ কথায় কিছুটা রাগ করতে পারে। হ্যাঁ, এ ঘটনাটি আসলে ঘটেছিল স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কোন নিয়ম ভঙ্গ না করেই।)

Image result for inflation universe

 

চোখের পলকে আমাদের মহাবিশ্বটি একটি ইলেক্ট্রনের আকার থেকে একটি গলফ বলের আকারের মত হয়ে যায়। এ ইনফ্লেশানের সময়ে কমপক্ষে ৯০ বার আমাদের মহাবিশ্ব তার আকার দ্বিগুন করে ফেলে। সময়কে পিছিয়ে যেহেতু বিগ ব্যাং এর সময়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই এসবই কিন্তু বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছেন তাদের পর্যবেক্ষণ আর গাণিতিক জটিল জটিল সব সমীকরণের সমাধানের মাধ্যমে।

ইনফ্লেশান পরবর্তি সময়েও কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে যায় নি। কিন্তু অনেক ধীর হয়ে যায়। এ সম্প্রসারণের ফলে আমাদের মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যেতে থাকে এবং পদার্থের সৃষ্টি হতে থাকে। আর সে সময়ের প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর পরে এসে আপনি আজ মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া সৌরজগতে অবস্থান করে আমার এ লেখাটি পড়ছেন।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগেও আমাদের বিজ্ঞানীরা রাতের আকাশ সম্বন্ধে মনে করতেন আমরা যা দেখি, তাই সত্য। অর্থাৎ, তারা ভাবতেন আমাদের মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাওয়া পদার্থ বা, ব্যারিয়নিক পদার্থ দিয়েই তৈরি। কিন্তু এখন তারা জানেন সম্ভবত তাদের সেই জানাটা সঠিক ছিল না।

সর্বশেষ তথ্য-প্রমাণ আমাদের বলছে যে, আমাদের মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অংশ এমন পদার্থ দিয়ে তৈরি যা আমরা দেখা তো দূরের কথা ছুঁতেও পারি না। আদর করে এই রহস্যময় কিন্তু অদৃশ্য এই পদার্থের নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার। আমাদের মহাবিশ্বে পদার্থ আর শক্তি মিলিয়ে যা কিছু আছে এর ৪.৬% হল ব্যারিয়নিক পদার্থ বা, স্বাভাবিক পদার্থ। আর ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ শুনলে তো চোখ কপালে উঠে যায়। আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ২৩% ই হল এ রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার। এ ডার্ক ম্যাটারের বাইরেও এমন নক্ষত্র আছে যা আমরা চোখে দেখতে পাই না। এসব  নক্ষত্র থেকে আলোও বের হয়ে আসতে পারে না। এই নক্ষত্রগুলোকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল বা, কৃষ্ণ গহবর।

ডার্ক ম্যাটারেই কাহিনী থেমে থাকেনি। আমাদের মহাবিশ্ব যে প্রসারিত হচ্ছে তা বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু ১৯৯০-২০০০ সালের দিকে তারা আবিষ্কার করতে শুরু করলেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, তার প্রসারণের হার আসলে বাড়ছে। অর্থাৎ, আমাদের মহাবিশ্বের প্রসারণের একটি ত্বরণ আছে। এ ত্বরণের ব্যাখ্যা দিতে যেয়ে বিজ্ঞানীদের নিয়ে আসতে হল নতুন এক কাল্পনিক শক্তি “ডার্ক এনার্জি”। আর আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ৭২% ই হল এ ডার্ক এনার্জি।

 

Image result for now you are doing mathematics like physicist meme dark number

মহাবিশ্বের এ সম্প্রসারণের কারণে এমন অনেক গ্যালাক্সি আছে যা আলোর চেয়েও বেশি বেগে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর অর্থ এ গ্যালাক্সিগুলো থেকে কোন আলো কখনই আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবেনা। এ সব গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান কোন সভ্যতা থেকেও থাকে তবুও তারা কখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না। তাহলে এলিয়েনদের আমাদের সাথে যোগাযোগ না করার কারণ কি এটাই? ভেবে দেখার মত একটি বিষয়।

উপড়ের আলোচনা যদি কোন পাঠক মন দিয়ে পড়ে আসেন তাহলে তিনি খুব সহজেই এটা বুঝতে পারবেন যে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ কত উন্নত হয়েছে। কিন্তু এখানেই কি শেষ? না। এমন অনেক বিষয় আছে যা আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বলছে।

এমন অনেক অনেক বিখ্যাত পদার্থবিদ রয়েছেন যারা খুব শক্তভাবে বিশ্বাস করেন যে, আমাদের মহাবিশ্বই একমাত্র মহাবিশ্ব নয়। আরো অনেক অনেক মহাবিশ্ব রয়েছে। আমাদের মহাবিশ্ব আসলে একটা বহু মহাবিশ্ব বা, মাল্টিভার্সের ক্ষুদ্র অংশ। আমরা আগেই ইনফ্লেশান তত্বের নাম শুনেছি। এই ইনফ্লেশান তত্বের জনক হলেন অ্যালান গুথ। পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পদার্থবিদদের ছোট্ট থেকে ছোট্ট তালিকা করতে গেলেও তার নাম অনায়াসেই চলে আসবে। তিনি বলেছেন-“এমন একটি ইনফ্লেশনারি মহাবিশ্বের মডেল করা খুবই দূরুহ যা প্রাকৃতিকভাবেই মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্ব তৈরি করে না।

আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন আমাদের মহাবিশ্ব যে বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে সেটিই আসলে প্রথম বিগ ব্যাং ছিল না। এর আগেও অনেকবার বিগব্যাং হয়েছে আর পরেও হবে। মহাবিশ্বগুলো একবার প্রসারিত হয় আবার সঙ্কুচিতও হয় এবং তারা বিশ্বাস করেন এটি একটি নিয়মিত চক্র।

দেখতেই পাচ্ছি বিগব্যাং থেকে শুরু করে আমাদের এ বর্তমান মহাবিশ্ব, বহু মহাবিশ্ব, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাক হোল, ইনফ্লেশান এসবই অত্যন্ত রহস্যঘেরা। আমি চেষ্টা করব এ সব বিষয়েই ধীরে ধীরে যতটা বিস্তারিতভাবে বলা যায় বলার। আজ এই পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top