আজ ২৭ জুলাই শুক্রবার দেখা যাবে শতাব্দীর দীর্ঘতম রেকর্ড চন্দ্রগ্রহণ

আসন্ন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হবে একবিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম গ্রহণ

কখনো কি লক্ষ্য করেছেন, কোনো চন্দ্রগ্রহণ বা সৌরগ্রহণ একটি আরেকটির সপ্তাহ দুয়েক আগে-পরে সংঘটিত হয়েছে? মাঝে মাঝে আমরা এর চেয়েও অবাক করা ব্যাপারের সম্মুখীন হব। আমরা একমাসের মধ্যেই এমন তিনটি গ্রহণ পেয়ে যেতে পারি।

ঠিক এমনই একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে আজ। এই মাসেই ১৩ জুলাইতে একটি আংশিক সৌরগ্রহণ প্রত্যক্ষ করা হয়েছে, যদিও বিরল জনবসতি এন্টার্কটিকা, তাসমানিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এলাকায়। পরবর্তী আংশিক সূর্যগ্রহণটি হবে ১১ই আগস্টে, দেখা যাবে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে। ইউরোপ ছাড়া মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বেশ বড় অংশ সে সুযোগ পাবে। এমনকি উত্তর ও পূর্ব কানাডার অধিবাসীদেরও খানিক সম্ভাবনা আছে সূর্যোদয়ের সময় গ্রহণের অভিবাদন পাবার।

আর এ দুই সৌরগ্রহণের মাঝে অবস্থান করে নিয়েছে একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ আজ ২৭ জুলাইতে। এ শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘকালীন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ।

আজ চাঁদ অতিক্রম করবে অয়নবৃত্ত। অয়নবৃত্ত হল সূর্য পৃথিবীর আকাশ দিয়ে যে পথ বরাবর এগিয়ে চলে। তাই হিসেব করে দেখা গেছে, যখন চাঁদ পূর্ণিমায় অয়নবৃত্ত অতিক্রম করে আমরা একটা পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ পেয়ে যাই। আবার যখন নতুন চাঁদ অয়নবৃত্ত অতিক্রম করে আমরা একটা সৌরগ্রহণ পেয়ে যাই। এ কারণেই সূর্যের বার্ষিক পরিক্রমণ পথ— অয়নবৃত্তকে আরেক নামে ডাকা হয় গ্রহণবৃত্ত।

যখন পূর্ণ বা নতুন চাঁদ এই গ্রহণবৃত্ত বা অয়নবৃত্তকে চাঁদের কক্ষপথের একপাশ দিয়ে অতিক্রম করে, এটি অপরপাশ দিয়েও অয়নবৃত্তকে অতিক্রম করবে। আর দুই অতিক্রম হবে দুই সপ্তাহ আগে বা দুই সপ্তাহ পরে। যেকারণে, এই গ্রহণের পর্যায়কালটাকে আমরা বলে থাকি “গ্রহণ মৌসুম”।

সাধারণত, একটা গ্রহণ মৌসুমে আমরা দুটো গ্রহণ পেয়ে থাকি। কিন্তু পূর্ববৎ, এই মৌসুমের ক্ষেত্রে আমরা তিনটি গ্রহণ পেয়ে যাচ্ছি ২৯.৫৩ দিনের মধ্যে— যতটা সময় লাগে এক চাঁদ থেকে আরেক চাঁদের সময় শুরু হতে।

আজ ২৭শে জুলাই শুক্রবারের আসন্ন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয় হতে যাচ্ছে এ কারণে যেহেতু উপগ্রহটি ঠিক উত্তর দিক দিয়ে পৃথিবীর ছায়া অতিক্রম করবে। কার্যত, চাঁদ এর কক্ষপথের অধোগামী বিন্দুতে পৌঁছে যাবে। কক্ষপথের এই বিন্দুটি হচ্ছে যেখান থেকে চাঁদ আবার তার কেন্দ্রের বস্তুর দিকে এগুবে— এর ১৩৮ মিনিটের মাথায় চাঁদ পূর্ণ দশায় অবস্থান করবে।

এর কারণে, দুই নতুন চাঁদ যার মাঝে পড়েছে ২৭ জুলাই। আর আগের ও পরের দুই সপ্তাহের মাথায় চাঁদ প্রায় ঠিক ঠাক এমন অবস্থানে পৌঁছে যায় যে সূর্যের গ্রহণের জন্য যথেষ্ঠ হয়। এই সুযোগে আমরা পেয়ে যাচ্ছি গ্রহণের ত্রয়ী।

ক্ষুদ্র, ধীরতর চাঁদ + দীর্ঘ ছায়া = একটি দীর্ঘ চন্দ্রগ্রহণ

চাঁদের আশপাশ এবার পৃথিবীর ছায়া বেশ দীর্ঘ সময় ধরে ঘিরে ফেলবে যা সাধারণত বিরল। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি হওয়ার অবশ্য কারণ চাঁদই। আজ গ্রহণের সময় পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূর দিয়ে অতিক্রম করবে যেটিকে বলে অপভূ (Apogee)— ৪০৬,২২৩ কিলোমিটার দূর দিয়ে। আবার আরেক ব্যাপার, সবচেয়ে দূর বিন্দু দিয়ে যাওয়ার সময় চাঁদ অতিক্রম করে সবচেয়ে ধীরগতিতে।

সে হিসেবে দূর ও ধীর মিলিয়ে এবারের চন্দ্রগ্রহণ বিজ্ঞানের মহিমায়ই দীর্ঘতম। এর ফলে চাঁদকে গড় আকারের চেয়ে ক্ষুদ্রতর দেখাবে। কার্যত, আরো তথ্য হল, ২০১৮ এর ক্ষুদ্রাকার পূর্ণচন্দ্রও আজই। এ গ্রহণ সংঘটিত হতে যাচ্ছে পৃথিবী অপসূর বিন্দু অতিক্রম করার তিন সপ্তাহেরও পর। অপসূর (Aphelion) বিন্দু হচ্ছে সূর্য থেকে কোন কিছুর দূরতম বিন্দু, এ সময়ে পৃথিবীর প্রচ্ছায়া কৌণিকভাবে সবচেয়ে বড় থাকে।

তো, সবকিছু  হিসেব করে দাঁড়াচ্ছে যে, আমরা একটি ক্ষুদ্রাকার চাঁদ দেখতে পাব— যদিও পূর্ণচন্দ্র, স্বাভাবিকের চেয়ে ধীরতর বেগে ছোটা চাঁদ যা অতিক্রম করবে প্রায় সোজাসুজি পৃথিবীর ছায়ার মাঝ দিয়ে। যে ছায়া কিনা আবার স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও প্রলম্বিত। ফলে এই চন্দ্রগ্রহণের স্থিতিকাল হবে ১ ঘন্টা ৪৩ মিনিট। উল্লেখ্য, তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব সবচেয়ে দীর্ঘতম চন্দ্রগ্রহণের চেয়ে মাত্র ৪ মিনিট কম এই স্থিতিকাল।

যারা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব রাখেন বা পছন্দ করেন তাদের জন্য আরেকটু বাড়িয়ে জানাই। চাঁদ সৃষ্টির পর থেকে খুবই অল্প মাত্রায় পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে গ্রহণের এই সর্বোচ্চ সময়টা বিশ্বজনীন সময়ের মাপকাঠিতে না। এটি হিসেব করা হয়েছে ৫০০০ বছরের সীমায় (খ্রিস্টপূর্ব ১৯৯৯ থেকে ৩০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের অবসরপ্রাপ্ত এমেরিটাস আমেরিকান জ্যোতিঃপদার্থবিদ ফ্রেড এস্পেনাক এবং বেলজিয়ান আবহাওয়াবিদ ও অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী জাঁ মিয়াসের বিবৃতি অনুযায়ী আজকের গ্রহণটি ৯জুন, ২১২৩ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘতম।

একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের গড় স্থিতিকাল প্রায় ৫০ মিনিট।

উত্তর আমেরিকা, ঘুমিয়ে থাকো!

যারা উত্তর আমেরিকায় বা মধ্য আমেরিকায় রয়েছে তাদের জন্য অবশ্য দুঃসংবাদ। কোনো গ্রহণই তারা অবলোকন করতে পারবে না। এমনকি পূর্ণ গ্রহণ হলেও ঘটনার আংশিকও দেখতে পাবে না— কারণ, পুরো ঘটনা ঘটার সময় আমেরিকা মহাদেশে দুপুর এবং বিকেল, পূর্ণচাঁদ থাকে এসময় দিগন্তের নিচে।

ইউরোপ, আফ্রিকা অথবা এশিয়ায় এ ঘটনা দেখার সুযোগ থাকছে। এদিকে পূর্বে থাকা জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া চাঁদকে দেখতে পাবে যখন প্রায় পুরোটা পৃথিবীর ছায়ায় ঢেকে যাবে। মধ্য এবং পূর্ব আমেরিকায় চাঁদকে উঠতেই দেখা যাবে সম্পূর্ণ গ্রহণ হয়ে যাবার পর।

বাংলাদেশ থেকে চন্দ্রগ্রহণ আরম্ভ হবে রাত ১১টা ১৪ মিনিটে এবং শেষ হবে আগামীকাল ভোর ৫টা বেজে ২৮ মিনিটে। পূর্ণ গ্রহণের সময় রাত ২টা ২১ মিনিটে। সময়ের টিক টক মেপে গ্রহণের পূর্বাভাস দেখুন এখানে

মঙ্গলকে ভুলে যেও না!

চাঁদ পূর্ণগ্রহণের সাথে আকাশে আরো কিছু চমক রয়েছে। মঙ্গলকে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের দিন পাওয়া যাবে সূর্যের ঠিক বিপ্পরীত দিকে অবস্থান করতে। চিলিক ছড়াবে হলুদাভ-কমলা দ্যুতিতে। আকাশে মঙ্গলকে দেখা যাবে চাঁদ থেকে ৬ ডিগ্রি নিচে। গ্রহণ দেখতে প্রত্যাশীরা আকাশে পাবেন অন্ধকারে ডুবে যাওয়া চাঁদের সাথে অত্যুজ্জ্বল মঙ্গলকে। ঠিক এমনিভাবে গ্রহণের দিনে উজ্জ্বল মঙ্গলের সাথে পৃথিবীর মানুষের দেখা হয়েছিল গত শতাব্দীতে— ১৯৭১ এর ৬ আগস্টে। দীর্ঘকাল ধরে গ্রহণের পিছে ছোটা অনেক প্রবীণ হয়ত মিলিয়ে দেখে নিতে পারবে পুরনো সময়ের সাথে।

তাত্ত্বিকভাবে পৃথিবীর সাথে মঙ্গলের সর্বনিম্ন দূরত্ব হওয়া সম্ভব ৫৪.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার। আজকে মঙ্গলের দূরত্ব থাকবে ৫৭.৭ মিলিয়ন কিলোমিটার। অর্থাৎ, একে তো নিকটবর্তী আবার তারপর গ্রহণের সময়— দুইয়ে মিলে মঙ্গলকে আজ উজ্জ্বলতায় দেখার অপেক্ষা।

আবার কবে…

পরবর্তী পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হবে আগামী বছর ২০১৯ এর ২০ জানুয়ারি, রোববার। উত্তর আমেরিকাবাসী যেহেতু এ সামার শো’তে গ্রহণ দেখতে পারছে না, তাই পরবর্তী চন্দ্রগ্রহণ পশ্চিমাংশে জোরালো হবে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা থেকে শুরু-শেষ পরিপূর্ণভাবে সে গ্রহণ তখন দেখা যাবে। এছাড়া, পূর্ণভাবে ঢাকা চাঁদকে শীতের আকাশে খাড়া উপর থেকে দেখা যাবে।

এ গ্রহণ উদযাপনের জন্য জাতীয় দিনপঞ্জিও দর্শকদের পক্ষে থাকবে। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের স্মরণে তিনি দিনের ছুটি চলবে তখন আমেরিকায়। বলা যায়, ১৯৭৫ এর পর কোনো ছুটিতে চন্দ্রগ্রহণ না পাওয়া আমেরিকানদের কাছে এটি বেশ সাড়া জাগাবে, জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

সকলের জন্য শুভেচ্ছা রইল, আশা করি আবহাওয়া আপনার এলাকায় সদয় হবে এ শতাব্দীর দীর্ঘতম গ্রহণটির সাক্ষী হতে।

 

— Scientific American অবলম্বনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *