মহাকাশ

আইনস্টাইনও চিন্তা করেছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরির কথা

আমার শেষ পোস্ট যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় স্টেডি স্টেট তত্ত্বের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। সেখানে তো স্টেডি স্টেট তত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ীর কথা জেনেছি। আজ জানবো তাদেরও আগে যারা মহাবিশ্বের একই রকম বা, প্রায় কাছাকছি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে।

স্যার জেমস হপউড জিনস একজন ইংরেজ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ছিলেন। যারা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা অনেকেই রেইলে-জিনসের নীতি বা, ‘ল’ পড়েছেন। এই স্যার জেমস হপউড জিনস হলেন সেই নীতির জিনস নামক বিজ্ঞানী। তিনিই ১৯২৮ সালে তার “অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড কসমোলজি” বইয়ে এমন এক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন যেখানে প্রতিনিয়ত পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি গাণিতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন নি। তিনি শুধু তার ধারণার কথা বলেছিলেন।

Image result for James Hopwood Jeans

স্যার জেমস হপউড জিনস

আরেকজন ব্যক্তি যিনি এই তত্ত্বের কথা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর ১৭ বছর আগেই চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন স্যার মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন। স্থির মহাবিশ্বের কথা পদার্থবিদরা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করতেন। প্রথম এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিল বিগ ব্যাং। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেও স্থির মহাবিশ্বই সমর্থন করতেন। যদিও তার দেয়া সূত্র থেকেই বিগ ব্যাং ধারণার জন্ম হয়েছিল। হাবল যখন গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারণশীল তখন আইনস্টাইন বিগ ব্যাং মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তার মনে তখনও ছিল অবিশ্বাস। এ বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি ২০১৪ সালে এসে।

আলবার্ট আইনস্টাইন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে ১৯৩১ সালে, এডউইন হাবল (মাঝখানে) এবং ওয়াল্টার অ্যাডামসের সাথে

আইনস্টাইনের অনেক কাজ জেরুজালেমের আলবার্ট আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে। এতদিন সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও ২০১৪ সালে এসে একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান তার একটা খসড়া পেপার, যা তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন না তাতে গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের কথায় যেনো বলা আছে। তাও ১৭ বছর আগে। গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের মূল কথা ছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে নতুন নতুন পদার্থ একদম শূন্য থেকে তৈরি হওয়া।

আইনস্টাইন তার সেই খসড়ায় লিখেছিলেন “মহাবিশ্বের পদার্থসমূহের ঘনত্ব সমান হওয়ার জন্য এতে নিশ্চিতভাবেই নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হতে হবে”। যা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট মহাবিশ্বের কথারই মূল সুর। এ থেকেই বোঝা যায় হয়েলদের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব একদম মনগড়া কিছু ছিল না।

আইনস্টাইন তার ভুল গাণিতিক হিসাব সংশোধন করেছেন কাটাকাটি করে

যদিও পর্যবেক্ষণগত দিক থেকে হয়েলদের তত্ত্ব পরবর্তিতে বাতিল হয়ে যায় কিন্তু গাণিতিক দিক থেকে এটা সঠিক ছিল। তারা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটু পরিবর্তিত রুপ ব্যবহার করেছিলেন তাদের নতুন পদার্থ সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে। কিন্তু আইনস্টাইনের খসড়া থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন প্রথমে ভেবেছিলেন যে এভাবে নতুন পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব তার সমীকরণের কোনরকম পরিবর্তন না করেই। কিন্তু তারপর তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তিনি আর তার থিওরির কোন রকম পরিবর্তন চিন্তা করেন নি এবং ধারণাটি বাতিল করে দেন। ফলে এ বিষয়ক কোন পেপারও তিনি আর প্রকাশ করেন নি। পরবর্তিতেও তিনি এ বিষয়ে কখনই কিছু বলেন নি। তবে তার এ কাজ থেকে বোঝা যায় তিনি তখনও বিগ ব্যাং থিওরিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমদিকে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্বকে একবার জঘন্যও বলেছেন।

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব নিয়ে একটি মজার ঘটনাও আছে। যা এর আগের পোস্টে বলা হয় নি। স্টেডি স্টেট থিওরির ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে গল্পটি বলেছিলেন ফ্রেড হয়েল।১৯৪৭ সালের একদিনে হারমান বন্ডী, টমি গোল্ড আর ফ্রেড হয়েল একটি সিনেমা দেখতে গেলেন। তারা তিনজনই তিনজনজনকে আগে থেকেই চিনতেন কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা রাডারের একই বিষয়ক গবেষণা করছিলেন। সিনেমাটি ছিল একটি ভূতের সিনেমা। সিনেমাটি যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই শেষ হয়। এ বিষয়টিই তিনিজনকে একই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করল, এক অপরিপর্বতনীয় কিন্তু গতিশীল মহাবিশ্বের কথা। মহাবিশ্বটির শুরু আর শেষ একই রকম, যার কোন পরিবর্তন নেই। হয়েল বলেন, “মানুষ সাধারণত অপরিবর্তনীয় বলতে ধরেই নেয় তা স্থির, কিন্তু ভূতের সিনেমাটি আমাদের এ ভুলটি ভেঙ্গে দিল। অনেক কিছুর পরিবর্তনের পরও একজনের অবস্থা ঠিক আগের মতই আবার হয়ে যেতে পারে সেটি আমাদের দেখালো। অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত”। আর কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারণের পরও অপরিবর্তিত ছিল তার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে বেশি দেরি হলনা তাদের। সেখান থেকেই প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে একদম শূন্য থেকেই পদার্থের সৃষ্টির তত্ত্ব দিয়ে বসলেন তারা।

(বাম থেকে) টমি গোল্ড, হারমান বন্ডী এবং ফ্রেড হয়েল, ১৯৬০ সালে

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব অনুসারে খুব ধীর গতিতে একদম শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে ৬ ঘন কিলোমিটার আয়তনের কোন স্থানে প্রতি বছরে মাত্র ১ টা করে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হয়।

স্টেডি স্টেট তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটা বলে আমাদের মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে আছে, আর অসীম সময় ধরে থাকবে। অর্থাৎ, অসীমের যেমন কোন শেষ নেই, উলটো দিকে গেলে এর শুরুও পাওয়া যাবে না। তাই গাণিতিকভাবে আমাদের মহাবিশ্ব হঠাৎ তৈরি হওয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। এটা সবসময় এমনই ছিল। আবার স্টেডি স্টেট থিওরি অনুসারে আকৃতিগতভাবেও এর কখনই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অসীম কোন কিছুর প্রসারণ হলেও তা অসীমই থাকবে।

এ বিষয়গুলো হয়েলের খুব পছন্দের ছিল। হয়েল ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে থাকলে এটা কিভাবে সৃষ্টি হল এ প্রশ্ন আর ওঠে না। কারণ, অসীম সময় ধরে থাকার অর্থ আমাদের মহাবিশ্ব সবসময়ই ছিল। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রশ্ন আর আসে না। ফলে এর ধ্বংসেরও প্রশ্ন আসে না। কারণ এটা সারা জীবন এমনই থাকার কথা। বিগ ব্যাং এর মত এ তত্ত্বতে হঠাৎ করে মহাবিশ্ব তৈরি হয় না। তাই নাস্তিক হিসেবে ফ্রেড হয়েল এ তত্ত্বের বিষয়ে খুব খুশি ছিলেন।

যদিও পরবর্তিতে তাদের এ তত্ত্ব বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এবং বাতিল হিসেবে পরিগণিত হয়। সেসব চ্যালেঞ্জ আর কিভাবে এ তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেল তা না হয় অন্য কোন দিনের জন্য তোলা থাকল। ধন্যবাদ।

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top