মহাকাশ

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result

মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top