মহাকর্ষ যেভাবে শ্রোডিংগারের বিড়ালকে ধ্বংস করে

অনেকের কাছে বিড়াল বেশ আদুরে। পদার্থবিজ্ঞানেও একটি আদুরে বিড়াল আছে। পৃথিবীর আর সব বিড়ালের সাথে পার্থক্য এটাই যে এর কোনো ভৌত অস্তিত্ব নেই। গালভরা নাম- শ্রোডিংগারের বিড়াল। এই উপমা নিহিত বিড়ালটি পদার্থবিজ্ঞানের চমৎকার শাখা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আচরণ বোঝাতে বর্ণনা করা হয়।

অস্ট্রিয় পদার্থবিদ আরভিন শ্রোডিংগার বিখ্যাত এই মানস-পরীক্ষণের ব্যাখ্যাকার। বিড়াল যদি কোয়ান্টাম তত্ত্বানুযায়ী আচরণ করে, তাহলে এটি একইসাথে একাধিক দশায় অবস্থান করবে। একইসাথে জীবিত এবং মৃত হিসেবে থাকবে। পর্যবেক্ষণ না করে নিশ্চিতভাবে কখনোই বলা সম্ভব না বিড়ালটি কোন দশায় আছে। এই ঘটনাটি অণু-পরমাণুর জগতে ঘটে, যা বাস্তব জগতের একটি বস্তু দিয়ে বোঝানো হয় কোয়ান্টাম জগতে এর আচরণ কেমন।

প্রাত্যহিক জীবনে এমন বিড়াল দূরে থাক, বিড়ালের লেজও তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু কেন পাওয়া যাবে না তার উত্তর কী? দৈনন্দিন পৃথিবীতে কোয়ান্টাম সুপারপজিশন না দেখতে পাওয়ার জন্য পদার্থবিজ্ঞানীরা কারণ হিসেবে আঙুল তুলেন পরিবেশে বিদ্যমান ঘটনার ব্যতিচারকে। সুপারপজিশন? এর মানে হলো কোনো বস্তু একই সময়ে দুটি ভিন্ন স্থানে অবস্থান করা।

ঘটনার ব্যতিচার হচ্ছে যখন দুটো ঘটনা একটি আরেকটিকে নাকচ করে দেয়। যখনই কোনো কোয়ান্টাম বস্তু কোনো বিক্ষিপ্ত বা ইতস্তত পরিভ্রমণরত কণার সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে তখন প্রকৃতি কেবল একটি দশাকে বেছে নেয়। আমাদের দৈনন্দিন দৃষ্টিভঙ্গির আদলে কেবল একটি দশাই ফলাফল হিসেবে থাকে। বিড়ালের বাক্স খুলে ফেলা হলো মিথষ্ক্রিয়ার উপমা। বাক্স খোলামাত্র বিড়ালকে একটি দশায় পাওয়া যাবে, কিন্তু খোলার আগে কোনো দশাই নিশ্চিত নয়।

কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা যদি কোনো বৃহৎ বস্তুকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করতে পারতেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে, এরপরও সেটি একটি দশায় গিয়ে ঠেকবে। ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার গবেষকেরা বলেন, আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে কোয়ান্টাম সংলগ্নতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোথাও শ্রোডিংগারের বিড়ালের হয়তো একটি সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু পৃথিবী বা কোনো নিকট গ্রহে সেরকম কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। গবেষক ইগোর পাইকোভস্কি বলেন এর কারণ, মহাকর্ষ।

বিজ্ঞানের সেরা জার্নাল নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে পাইকোভস্কি[] এবং তার সহকর্মীদের এ ধারণা বর্তমানে গাণিতিক যুক্তিতর্কের অধীনে রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের পরীক্ষণ-পদার্থবিদ হেন্ড্রিক আলব্রিক্ট এর পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টার আশাবাদ করেন। তিনি এই গবেষণাপত্রের নিরীক্ষণের দায়িত্বে আছেন। তবে পরীক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করতে এক দশক সময় লেগে যেতে পারে।

অভিকর্ষ কীভাবে বিড়ালকে নাকচ করে দেয়?

সিনেমাপ্রেমী দর্শক যারা ইন্টারস্টেলার মুভিটি দেখেছেন তারা এই গবেষণাপত্রের মূলনীতির সাথে সহজে পরিচিত হতে পারবেন। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের কাছে যাওয়া যাক। যদি কোনো অতিকায় ভরবিশিষ্ট বস্তুর কাছাকাছি কোনো ঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে সেটা খুব ধীরে চলবে। শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেবে।

ইন্টারস্টেলার মুভিতে দেখা যায় অভিযাত্রীরা কৃষ্ণবিবরের কাছে এক গ্রহে অবতরণের পর সেখানকার এক ঘণ্টায় পৃথিবীতে সাত বছর পেরিয়ে যায়।[] শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র সেখানকার সময়কে শ্লথ করে দিয়েছে। এই সময় শ্লথের বিষয়টি যন্ত্র-নিরপেক্ষ। কাঁটার ঘড়ি হোক, ডিজিটাল ডিসপ্লের ঘড়ি বা কোনো সিজিয়াম পরমাণুর কম্পন দিয়েই মাপা হোক সময়ের পরিমাপ শ্লথই পাওয়া যাবে।

বাস্তবিকভাবেই অত্যন্ত সূক্ষ্মতর স্কেলে পৃথিবীপৃষ্ঠের নিকটে স্থাপিত কোনো অণু পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে দূরে স্থাপিত কোনো অণুর সাথে সময়ের ধীরলয় পাওয়া গেছে।

পাইকোভস্কির দল ধরতে পারে যে, স্থান-কালের উপর মহাকর্ষের প্রভাবে অণুর অন্তঃশক্তি প্রভাবিত হয়। অণুতে কণাসমূহের কম্পনের মাধ্যমে সময়ের সাপেক্ষে সেটা প্রকাশ পাবে। এবার আসছি আসল রাস্তায়- যদি কোনো অণুকে দুটো কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে রাখা যায়, এদের অবস্থান এবং অন্তঃশক্তির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক, দ্বৈততাকে ভেঙে দেবে যাতে অণু একটি অবস্থান বা পথ বেছে নিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো বাহ্যিক কারণে অসঙ্গতি ঘটে থাকে কিন্তু এখানে অন্তঃকম্পন মিথষ্ক্রিয়া করছে অণুর নিজস্ব গতির সাথেই।

একটি বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা

উৎসের অসঙ্গতির কারণে কেউই এখনো এই প্রভাবকে পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি। যেমন চৌম্বকক্ষেত্র, তাপীয় বিকিরণ এবং কম্পন- এই বিষয়গুলো গতানুগতিকভাবে মহাকর্ষের চেয়ে শক্তিশালী। এর ফলে এরা কোয়ান্টাম প্রক্রিয়াগুলোকে বিলীন করে দেয় মহাকর্ষের প্রভাবকে ছাপিয়ে। কিন্তু পরীক্ষণবিদরা চেষ্টা করতে আগ্রহী।

ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার পরীক্ষণ-পদার্থবিদ মার্কাস আর্ন্ডট ইতোমধ্যেই পরীক্ষা করে ফেলেছেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশন পর্যবেক্ষণ করা যাবে কিনা। তিনি কণা-তরঙ্গ (দ্বৈত চরিত্র) ইন্টারফেরোমিটারের মধ্য দিয়ে এমন প্রক্রিয়ায় বড় আকারের অণু পাঠিয়েছেন যেন প্রতিটি অণু চলার পথে দুটো ভিন্ন পথ পায়। চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, একটি অণু কেবল একটি পথেই পরিভ্রমণ করে। কিন্তু একটি কোয়ান্টাম অণু কার্যত উভয় পথেই পরিভ্রমণ করে এবং নিজের সাথেই ব্যতিচার ঘটায়। ছবিতে ব্যতিচারের বৈশিষ্ট্যসূচক তরঙ্গের প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে।

চিত্র: জটিল ও বড় অণু ব্যবহার করে প্রাপ্ত ব্যতিচার

কোয়ান্টাম আচরণ ভেঙে দিতে মহাকর্ষের সক্ষমতা পরীক্ষায় অনুরূপ পরীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। উল্লম্ব ইন্টারফেরোমিটারের সাথে তুলনা করলে এক পথের সাথে অন্য পথের সাপেক্ষে সময়-প্রসারণের ফলে সুপারপজিশন অসঙ্গত হয়ে পড়বে। ইন্টারফেরোমিটার হচ্ছে ব্যতিচার (Interference) ব্যবহার করে দুটো আলোক রশ্মির সূক্ষ্ম মাপজোখ করার যন্ত্রবিশেষ।

গত বছর যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (যা খুবই সূক্ষ্ম) পাওয়া গিয়েছিল তা খুঁজে পেতেও ইন্টারফেরোমিটার ব্যবহার করা হয়েছিল। মহাকর্ষের প্রভাব পেতে ইন্টারফেরোমিটারের আনুভূমিক সেট আপে সুপারপজিশন দেখা যেতে পারে। আর্ন্ডট ৮১০ পরমাণু বিশিষ্ট বড় অণু পর্যন্ত এই প্রভাব পরীক্ষা করেছেন।[]

বড় অণুগুলো মহাকর্ষীয় প্রভাব পরীক্ষণে সুবিধাজনক। কেননা তারা অধিক সংখ্যক কণা ধারণ করে যারা অন্তঃশক্তিতে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সূক্ষ্মতর পরীক্ষণগুলোর সতর্কতাও রাখতে হয় তুঙ্গে। এ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে যে শুধু বাহ্যিক পরিবেশের প্রভাবককেই দমিয়ে রাখতে হবে তা নয়। তাদের পরীক্ষণে দুটো পথের দূরত্ব রাখা হয় মাইক্রোমিটার সীমায়, হয় এই সীমাকে মিটারে নিয়ে যেতে হবে নয়তো ১০ লক্ষ গুণ বড় অণু ব্যবহার করতে হবে। দুটো বিষয়ই একে অপরের প্রতিকূল বলে এক্সপেরিমেন্ট এগিয়ে নেয়া খুব চ্যালেঞ্জিং।

যদি মহাকর্ষের প্রভাব পৃথিবীতে কোয়ান্টাম আচরণের সীমা টেনে দিতে পারে, বড় বস্তুর জন্য কোয়ান্টাম বাস্তবতা আমাদেরকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র

[১] http://www.nature.com/news/how-gravity-kills-schr%C3%B6dinger-s-cat-1.17773

[২] http://interstellarfilm.wikia.com/wiki/Gargantua

[৩] http://pubs.rsc.org/en/Content/ArticleLanding/2013/CP/c3cp51500a

featured image: phys.org

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *