in

প্রতিবেশী গ্যালাক্সির খোঁজে

১৭৮১ সালের শুরুর দিকে চার্লস মেসিয়ের নামে একজন ফরাসী জ্যোতির্বিদ ও ধূমকেতু পর্যবেক্ষক ছিলেন। তিনি ধূমকেতুর মতো দেখতে ১০৩টি নাক্ষত্রিক বস্তুর তালিকা করেন যেন অন্যান্য ধূমকেতু পর্যবেক্ষকরা এদেরকে ধূমকেতু বলে ভুল না করে।

কারণ ধূমকেতু যখন সূর্যের কাছাকাছি থাকে তখন তার লম্বা লেজ বা পুচ্ছ দৃশ্যমান থাকে। ফলে তাদেরকে চেনা যায় সহজে। সূর্য থেকে দূরে অবস্থান করলে লেজ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক তাদেরকে ভুলভাবে নক্ষত্র বলে ধরে নেয়। তৎকালীন সময়ে উন্নত যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই তিনি এমন চমৎকার কাজ করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে উইলিয়াম হার্শেল, জন হার্শেল, লুই ড্রেয়ার প্রভৃতি বিজ্ঞানীরা এই তালিকার উন্নয়ন করেন

মেসিয়েরের তালিকার অনেকগুলো বস্তু ছিল আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কি ওয়ের ভেতরের। তবে মেসিয়েরের তালিকার অনেক বস্তুই ছিল মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির বাইরের। তাদের মাঝে একটি হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। পরিষ্কার আকাশে খালি চোখেই একে দেখা যায়। দেখতে অনেকটা অস্পষ্ট কুয়াশাচ্ছন্ন বস্তু বলে মনে হয়।

৯৬৪ সালে পারস্যের জ্যোতির্বিদ আব্দুর রহমান আল-সুফি তার একটি বইয়ে এর কথা উল্লেখ করেন। বইতে একে ‘একটি ক্ষুদ্র মেঘ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। বইয়ের নাম কিতাব সুয়ার আল কাওয়াকিব (Book of Fixed Stars)। পরে জানা যায় এই মেঘটি আমাদের গ্যালাক্সির মতোই আরেকটি গ্যালাক্সি এবং আকৃতির দিক থেকেও এটি আমাদের মিল্কিওয়ের মতোই সর্পিল। আমাদের গ্যালাক্সির সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীও এটিই।

চিত্র: আব্দুর রহমান আল সুফি তার এক বইয়ে এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কথা উল্লেখ করেছিলেন।

মেসিয়ের, হার্শেল ও ড্রেয়ার কর্তৃক তৈরিকৃত নেব্যুলির প্রকৃতি সম্বন্ধে ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে এবং বিংশ শতকের শুরুর দিকে বড় ধরনের বিতর্ক বিদ্যমান ছিল। কেউ কেউ মনে করতো তাদের তালিকার নাক্ষত্রিক বস্তুর সবগুলোই আমাদের গ্যালাক্সিতে অবস্থিত অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করতো তালিকার কোনো কোনো বস্তুর অবস্থান আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে।

১৭৫৫ সালের দিকে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেওছিলেন যে, কোনো কোনো গ্যালাক্সির অবস্থান অবশ্যই আমাদের আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে। তিনি আরো বলেছিলেন এসব নেব্যুলির কোনো কোনোটির আকৃতি বৃত্তাকার ডিস্কের মতো। অনেক দূরে অবস্থান করে বলে তাদেরকে অনুজ্জ্বল দেখায়।

১৯২০ ও ১৯৩০ সালের মাঝামাঝিতে আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এডউইন পাওয়েল হাবল (১৮৮৯ – ১৯৫৩)-এর মাধ্যমে এই বতর্কের অবসান ঘটে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন অধিকাংশ নেব্যুলির অবস্থানই আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে। তিনি এমন অকাট্যভাবে তা প্রমাণ করেছিলেন যে তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার বা কোনো বিতর্ক তৈরি করার কোনো অবকাশ থাকেনি। তার মাধ্যমে মানুষের মনে মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিস্তৃত একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়। তিনি যুগান্তকারী এই প্রমাণটি করেছিলেন নেব্যুলির লাল সরণ (Red Shift) পরিমাপ করে।

চিত্র: এডউইন হাবল। ছবি: নাসা

এ সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলস শহরের কাছে মাউন্ট উইলসনে একটি ১০০ ইঞ্চি টেলিস্কোপের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। বিজ্ঞানী এডউইন হাবল ঐ সময় এটিকে ব্যবহার করার সুযোগ পান। শক্তিশালী এই টেলিস্কোপটি ব্যবহারের মাধ্যমেই তিনি প্রথমবারের মতো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির প্রকৃতি উদ্ঘাটন করেন। এই গ্যালাক্সিটিতে তিনি একটি সর্পিল আকৃতি খুঁজে পান। উল্লেখ্য আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি যে তা তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এন্ড্রোমিডার সর্পিল গঠনের অংশগুলোতে তিনি কিছু বিষম তারার দেখা পান। কিছু কিছু তারা আছে যাদের উজ্জ্বলতা একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিতভাবে পরিবর্তিত হয়। এধরনের তারাকে বলা হয় বিষম তারা বা Variable star। এরকম তারা অবশ্য আমাদের গ্যালাক্সিতে আরো আগেই আবিষ্কৃত হয়েছিল। এদেরকে সেফিড ভ্যারিয়েবল (Cepheid Variable) নামে ডাকা হতো। এদের মধ্যে বিশেষ কয়েকটিকে বলা হতো ডেলটা সেফাই (Delta Cephei)।

এন্ড্রোমিডার সর্পিল গঠন। ছবি: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এ ধরনের তারার উজ্জ্বলতা বাড়ে-কমে। কেউ যদি সময়ের বিপরীতে উজ্জ্বলতার লেখ চিত্র অংকন করে তাহলে নীচের চিত্রের একটি আকৃতি তৈরি হবে। উজ্জ্বলতার হ্রাস-বৃদ্ধির একটি স্পষ্ট চক্র। সম্পূর্ণ একটি চক্রকে বলা যেতে পারে পর্যায়কাল বা Period।

সময়ের সাথে বিষম তারার উজ্জ্বলতার পরিবর্তন হয়। লেখ থেকে বোঝা যাচ্ছে দ্রুত সময়ে উজ্জ্বল হয় এবং অনুজ্জ্বল হয় তুলনামূলকভাবে ধীর সময়ে। ছবি: TUFOTU

হেনরিয়েটা সোয়ান লেভিট এবং হার্লো শেপলি নামের দুজন আমেরিকান জ্যোতির্বিদ সেফিড তারার প্রকৃত উজ্জ্বলতা ও দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার চক্রের মাঝে পারস্পরিক একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। প্রকৃত উজ্জ্বলতা বা Intrinsic brightness হলো সেফিড তারার মূল উজ্জ্বলতা। বিজ্ঞানের ভাষায় প্রকৃত উজ্জ্বলতাকে ‘এবসোলুট লুমিনোসিটি’ বলেও ডাকা হয়।

কোনো একটি নাক্ষত্রিক বস্তু সকল দিকে যে পরিমাণ আলো বিকিরণ করে তাকে বলা হয় এবসোলুট লুমিনোসিটি। কিছু কারণবশত আমাদের চোখে এসব তারার মূল উজ্জ্বলতা ধরা দেয় না। এধরনের নাক্ষত্রিক বস্তু আমাদের চোখে আপেক্ষিকভাবে যে পরিমাণ উজ্জ্বল বলে প্রতীয়মান হয় তাকে বলে ‘এপারেন্ট লুমিনোসিটি’। টেলিস্কোপের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে নক্ষত্র থেকে যে পরিমাণ আলো এসে আপতিত হয় তাকে বলে এপারেন্ট লুমিনোসিটি বা দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা।

বিজ্ঞানী লেভিট ও শেপলি প্রকৃত উজ্জ্বলতা ও দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার মাঝে যে সম্পর্ক খুঁজে পান তা লেখচিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করলে অপর পৃষ্ঠায় উল্লেখিত পরবর্তী চিত্রের মতো একটি অবস্থা পাওয়া যাবে। লেখটি একদমই সরল।

লেখ থেকে দেখা যাচ্ছে, কেউ যদি কোনো বিষম তারার উজ্জ্বলতার হ্রাস বৃদ্ধি চক্রের সময় (পর্যায়কাল) সম্পর্কে জানে তাহলে সহজেই এর প্রকৃত উজ্জ্বলতা বের করে নিতে পারবে। বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই পদ্ধতিতেই এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে বিষম তারার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় লেভিট-শেপলি সম্পর্ক।

এখন কেউ যদি কোনো মহাজাগতিক বস্তুর দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা এবং প্রকৃত উজ্জ্বলতা সম্পর্কে জানে তাহলে সেখান থেকে বস্তুটির দূরত্বও নির্ণয় করতে পারবে। কারণ দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা কত হবে তা নির্ভর করে দূরত্বের উপর। বস্তুর দূরত্ব যত বেশি হবে তার উজ্জ্বলতা তত কম হবে।

এই পদ্ধতি ব্যবহার করে হাবল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি ৯ লক্ষ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থিত। এত বেশি পরিমাণ দূরত্বে থাকলে তার অবস্থান অবশ্যই আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে হবে। কেননা আমাদের সবচেয়ে দূরে যে বস্তুটি অবস্থিত তার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ দূরে অবস্থিত এটি। উল্লেখ্য আমাদের গ্যালাক্সির বিস্তৃত ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ আলোক বর্ষ।

পর্যায়কালের বিপরীতে উজ্জ্বলতার লেখ (সোজা ঢালু রেখাটি)। P যদি হয় উজ্জ্বলতার হ্রাস-বৃদ্ধি চক্রের পর্যায়কাল তাহলে সেখান থেকে অক্ষরেখার উপর লম্ব টেনে তারাটির প্রকৃত উজ্জ্বলতা কত তা বের করা সম্ভব। ছবি: IUFOTU

পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের শেষ দিকে এবং পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে জার্মান বংশোদ্ভব আমেরিকান জ্যোতির্বিদ ওয়াল্টার বেইড (১৮৯৩ – ১৯৫০) এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন এধরনের বিষম তারা আসলে দুই প্রকার। এরা দুই ধরনের নিয়মনীতি মেনে চলে। লেভিট-শেপলি সম্পর্কের আওতার বাইরেও অনেক বিষম তারা আছে। যদিও এই সম্পর্কের মাধ্যমেই এন্ড্রোমিডার দূরত্ব পরিমাপ করেছিলেন এডউইন হাবল, কিন্তু তার পর্যবেক্ষণকৃত বিষম তারা এবং লেভিট কর্তৃক পর্যবেক্ষণকৃত বিষম তারার প্রকৃতি আসলে এক নয়।

হাবল এক্ষেত্রে পর্যায়কাল ও উজ্জ্বলতার ভুল সম্পর্ক ব্যবহার করেছিলেন। যার জন্য তার হিসেবেও ভুল ফলাফল এসেছে। পরবর্তীতে জানা যায় এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির প্রকৃত দূরত্ব দুই মিলিয়ন আলোক বর্ষ, যেখানে হাবল বলেছিলে এই দূরত্ব ৯ লক্ষ আলোক বর্ষ। তবে হিসেবে ভুল হলেও হাবলের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, এন্ড্রোমিডা নেব্যুলা আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে অবস্থিত।

তথ্যসূত্র- Islam, Jamal N. (1983), The Ultimate Fate of the Universe, Page 13-16, Cambridge University Press থেকে অনুবাদকৃত। 

featured image: outerplaces.com

নীল আর্মস্ট্রংদের বাংলাদেশ সফর

যেভাবে এলো বি-কোষ এবং টি-কোষ