সৌরজগতের সবচেয়ে বড় ঝড়ের জীবনকাল শেষ হয়ে আসছে

আপনি যদি বৃহস্পতি গ্রহের গ্রেট রেড স্পট না দেখে থাকেন তাহলে আপনার জন্য রয়েছে দুঃসংবাদ। গ্রেট রেড স্পট, যা আসলে বৃহস্পতি গ্রহে চলমান বৃহৎ ঝড়, তা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে এবং তা আপনার জীবদ্দশাতেই হয়ত হারিয়ে যাবে।

নাসার ১ বিলিয়ন ডলারের জুনো প্রোব জুলাই ২০১৭ তে গ্রেট রেড স্পটের বেশ কিছু অনিন্দ্য সুন্দর ছবি তুলেছিল বেশ কাছ থেকে। এই ছবিগুলোর বিস্তারিত দেখে বিজ্ঞানীরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন কারণ তারা এর আগে এত কাছ থেকে এবং এত পরিষ্কারভাবে কখোনই গ্রেট রেড স্পটকে দেখেননি।

জুনোর চোখে গ্রেট রেড স্পট; image source: sciencealert.com

বৃহস্পতির এই ভয়ানক ঝড় পৃথিবীর ঝড়ের চেয়ে বেশ কয়েকগুন বড়। ঝড়টি সম্ভবত ১৬০০ সাল থেকে ঘুরেই চলেছে। তার তুলনায় পৃথিবীর সবচাইতে বড় ঝড় ছিল হ্যারিকেন জন, যা হয়েছিল ১৯৯৪ সালে এবং এর স্থায়িত্ব ছিল ৩১ দিন।

জুনো মিশনের দলের সদস্য এবং নাসার গ্রহ বিজ্ঞানী গ্লেন অরটনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেন বৃহস্পতির ঝড় এত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। উত্তরে তিনি বলেন, “ঝড় গুলো এত দীর্ঘ সময় ধরে থাকে না, অন্তত সবগুলো নয়।”

তিনি আরো বলেন, “ধরুন গ্রেট রেড স্পট হচ্ছে একটা ঘুর্ণায়মান চাকা যা চলতেই থাকে কারণ এটি দুটো বেল্টের মধ্যে আটকা পড়েছে যা পরস্পর বিপরীত দিকে চলছে। আর এ কারনেই গ্রেট রেড স্পট ঘুরতেই থাকে। কারণ তা অবিরাম চলমান বেল্টের মতো জায়গাতে আটকা পড়ে গেছে।”

বৃহস্পতির বাতাসের দমকা হাওয়ার বেগ প্রায় ৩০০ মাইল প্রতি ঘন্টা বা, ৫০০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। ফলে তা যখন কোনো ঝড়ের সাথে যুক্ত হয় তখন তা বড় ধরণের একটা প্রভাব ফেলে। ফলে দ্রুত গতিতে চলা এই গ্রহের বিপরীত দিকে ঘুরতে থাকা এই ঝড় কখনোই বন্ধ হয় না।

জুনো পরবর্তীতে এই দানব ঝড়কে দেখতে পাবে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে, তারপর আবার ২০১৯ সালের জুলাই এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু তবুও ২০১৭ সালে যত কাছে এবং যত বিস্তারিতভাবে দেখা গিয়েছিল সেইভাবে আর দেখেতে পাবে না জুনো। ফলে বিজ্ঞানীদের কাছে এই ছবিগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি।

কখন হারিয়ে যাবে এই দানব ঝড় ?

পৃথিবীতে কখনোই বৃহস্পতির মত শত শত বছর ধরে ঝড় চলতে পারবে না। কারণ বৃহস্পতি গ্রহে পৃথিবীর মত সুবিন্যস্ত স্থলভাগ বা সাগর নেই। ফলে ঝড় বাধা দেওয়ার মত কিছুই নেই।

অন্যদিকে আমাদের গ্রহের ভূ-গঠন আলাদা হওয়ার কারনে ঝড় বেশিদিন টিকতে পারে না। এছাড়াও আমাদের গ্রহের ঘূর্ণন অনেক আস্তে, যেখানে পৃথিবী প্রতি ২৪ ঘন্টায় নিজের অক্ষের ওপর একবার ঘোরে সেখানে বৃহস্পতি নিজের অক্ষের ওপরে ১০ ঘন্টায় একবার ঘোরে।বৃহস্পতির এইসব গুনাবলি আমাদের গ্রহে নেই বলেই দমকা হাওয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে না।

কিন্তু যার শুরু আছে তার শেষও আছে। গ্রেট রেড স্পট এবং বৃহস্পতি গ্রহের কোনো কিছুই চিরকাল থাকবে না। গ্রেট রেড স্পটও দীর্ঘ সময় ধরে আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে।

১৮০০ শতকের শেষের দিকে এই ঝড়টি সম্ভবত ৩০ ডিগ্রী দ্রাঘিমাংশের সমান অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। যা প্রায় ৩৫,০০০ মাইল (৫৬,০০০ কিলমিটার) এবং এটা পৃথিবীর চাইতে প্রায় চার গুনেরও বেশি বড়। তাই যদি ভুল করেও পৃথিবী এই গ্রেট স্পটের কবলে পড়ে তবে আর রক্ষা নেই। যদিও এটা কখনোই হওয়া সম্ভব নয়।

পৃথিবী এবং গ্রেট রেড স্পটের তুলনা; image source: universetoday.com

নিউক্লিয়ার শক্তিতে চালিত মহাকাশযান ভয়েজার-২ যখন ১৯৭৯ সালে বৃহস্পতি গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল তখন এই গ্রেট রেড স্পটের আয়তন হয়তবা পৃথিবীর দ্বিগুনের চাইতে একটু বড় ছিল।

এখন তা ১৩ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশের সমান প্রশস্থ এবং তা পৃথিবীর চাইতে মাত্র ১.৩ গুন বড়। অর্থাৎ, এই ঝড়ও চিরদিন থাকবে না।

নেপচুন গ্রহেরও একটি বিশেষ ঝড় আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যা হাবল টেলিস্কোপে ধরা পড়েছে। এই ঝড়টির আকারও নেহাত কম ছিল না। পৃথিবীর একটি মহাদেশের সমান এই ঝড়টিও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে একেবারে বিলীন হয়ে যাবে।

বৃহস্পতির গ্রেট রেড স্পটেরও সময়ও ফুরিয়ে আসছে। অরটন বলেন, “গ্রেট রেড স্পট আগামী এক বা দুই দশকের মধ্যে গ্রেট রেড সার্কেলে পরিণত হবে এবং তার পরবর্তিতে থাকবে শুধুই গ্রেট রেড মেমোরি”

বৃহস্পতি গ্রহ; image source: nasa.gov

কিন্তু নাসা গডার্ড ফ্লাইট সেন্টারের এমি সাইমন্স বলেন যে, “এটা হয়ত একসময় হারিয়ে যাবে, কিন্তু তা যে হবেই তা কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না।”

কারণ হিসাবে তিনি বলেন, যে কারণে এই দানবীয় ঝড়টি এতদিন ধরে টিকেছিল তা যদি আবার শক্তি যোগায় তাহলে হয়ত তা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে না। একটা নির্দিষ্ট আয়তন জুড়ে হয়ত আরো কিছুদিন থাকতে পারে। তাই এখন সময়ই বলে দেবে যে কি হতে চলেছে এই গ্রেট রেড স্পটের ভাগ্যে।

featured image: nasa.com

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *