বৃহস্পতির কেন ৭৯টা উপগ্রহ যেখানে পৃথিবীর মাত্র একটা

পৃথিবীর সবেধন নীলমণি উপগ্রহ কেবল চাঁদ, অথচ বৃহস্পতির? ডজনকে ডজন উপগ্রহ! বৃহস্পতি অবশ্য সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ। মজার ব্যাপার এখনো বৃহস্পতির উপগ্রহ আবিষ্কার করা হচ্ছে। এইতো কদিন আগেই (১৬ জুলাই ২০১৮) কার্নেগি ইন্সটিটিউট ফর সায়েন্স এর বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করলেন বৃহস্পতির আরো ১২ টি উপগ্রহ রয়েছে যেগুলো আমরা জানতাম না।

যে অনুসন্ধানকারী দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন স্কট শেপার্ড। তবে তারা কাজ করছিলেন সৌরজগতের দূরতম কাইপার বেল্টে নতুন কোনো বস্তু পাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। কাইপার বেল্ট নেপচুন কক্ষপথের বাইরে অবস্থিত যা হচ্ছে দীর্ঘাকার রিঙ। মূলত এর উপাদান সৌরজগত সৃষ্টির ধ্বংসাবশেষ। কাজের একটা বিরতি হিসেবেই তারা মূল উদ্দেশ্য কাইপার বেল্ট থেকে মোড় ঘুরিয়ে জুপিটারকে দেখার চিন্তা করল। আর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই পেয়ে গেল গ্যালিলিওর চাঁদের নতুন সঙ্গী!

১৬১০ খ্রিস্টাব্দে, মহান জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিও গ্যালিলেই সর্বপ্রথম চারটি স্বর্গীয় বস্তু প্রত্যক্ষ করেন জুপিটারকে ঘিরে ঘুরছে। সেগুলোর নামকরণ করা হয় আয়ো, ইউরোপা, গ্যানিমিড এবং ক্যালিস্টো নামে। এগুলোই ছিল জুপিটারের বড় চাঁদ— একই সাথে প্রথম আবিষ্কৃত চাঁদও। গ্যালিলিওর এই পর্যবেক্ষণই ছিল মানবজাতির জন্য ভিনগ্রহের প্রথম উপগ্রহ। তারাদেখার প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নয়নের সাথে, এটা স্পষ্ট হয়ে যায় জুপিটারের চৌহদ্দি কেবল ঐ চার উপগ্রহকে নিয়েই নয়। ২০১৮ এর জুলাইয়ের পূর্ব পর্যন্তও জুপিটারের আবিষ্কৃত উপগ্রহ ছিল ৬৭টি। এখন হিসেব দাঁড়াল জুপিটারের ৭৯টি গ্রহ বের করতে মানুষের লেগে গেল চারশ বছরের অধিক সময়।

এই মহাসমাহার সৌরজগতের আর কোনো গ্রহ করতে পারে নি, আপাতত পারবেও না। রানার আপ শনির রয়েছে ৬২টি উপগ্রহ আর তৃতীয় অবস্থানে ইউরেনাস রয়েছে ২৭টি উপগ্রহকে ঘিরে। নেপচুনের ১৪টি এবং আমাদের প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গলের দুটি উপগ্রহ— ডিমোস এবং ফোবোস। অন্যদিকে পৃথিবীর মাত্র ১টি উপগ্রহ থাকলেও শুক্র আর বুধের কোনো উপগ্রহই নেই।

বৃহস্পতির অনেকগুলো উপগ্রহ থাকার কারণ এক কথায় মহাকর্ষ। কিন্তু শুধু এই কারণ দিয়ে পুরো ব্যাপারটা ধরা যাবে না। অন্যান্য কিছু শর্ত জুড়ে দিলে তারপর মহাকর্ষকে বহু উপগ্রহ থাকার ক্ষেত্রে প্রধান কারণ বলা যাবে।

বৃহস্পতির মহাকর্ষের প্রভাব

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের গ্রহগুলোকে দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন এদের গড়নের ভিত্তিতে। সূর্যের নিকটতম চারটি গ্রহকে বলা হয় ভূসদৃশ গ্রহ— বুধ, শুক্র, পৃথিবী এবং মঙ্গলকে। অর্থাৎ যেগুলোর কঠিন অভ্যন্তরভাগ রয়েছে। এজন্য এদের পাথুরে গ্রহও বলা হয়। আরেক ধরণের হল গ্যাসীয় দানব: বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুন।

দুইদলের গ্রহগুলোর আকারের পার্থক্যও ভাগ করার বৈশিষ্ট্যসূচক হিসেবে নেয়া যেত। গ্যাসীয় দানবের সবচেয়ে ছোট সদস্য ইউরেনাসও ভূসদৃশ গ্রহদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পৃথিবীর চেয়ে ১৫গুণ বিশাল। আর অতিকায় জুপিটারের কাছে তো পাথুরে গ্রহের বাকিরা সে হিসেবে নস্যি! বৃহস্পতির সমান ওজনদার হতে পৃথিবীর সমান আরো তিনশোরও বেশি গ্রহ লাগবে। গ্রহ হিসেবে এটি একেবারে আদর্শ দানব।

সৌরজগতের গ্যাসীয় গ্রহ চারটি যদি সূর্যের সাথে ছবি তুলত তবে যেমন দেখাত; image source: NASA & Wikipedia User HalloweenNight

আইজ্যাক নিউটনের পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া যায়, কোনো বস্তুর ভরের সাথে ঐ বস্তুর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের শক্তিমত্তা জড়িত। যেহেতু গ্যাসীয় গ্রহগুলো অতিকায়, অর্থাৎ ভারী, সুতরাং তারা অধিকসংখ্যক উপগ্রহকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।

তবে এটিই একমাত্র কারণ নয় জুপিটারের মত বড় গ্রহের অধিক উপগ্রহ থাকার ক্ষেত্রে। আমাদের সৌরজগতের গ্যাসীয় গ্রহগুলো সূর্য থেকে দূরে, অর্থাৎ বাইরের দিকে অবস্থিত। কিন্তু সৌরজগতের বাইরে আমরা এমন অনেক নক্ষত্রকে যাদের জুপিটারের মত উপগ্রহ রয়েছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে দেখা যাবে সে গ্যাসীয় দানবগুলো তাদের নক্ষত্রের খুব নিকট দিয়ে অতিক্রম করে। ব্যাপারটা কেমন তা কল্পনা করা যেতে পারে বুধের জায়গায় শনিকে সূর্যের পাশে বসিয়ে।

২০১০ সালে এক ফরাসি জ্যোতির্বিদ, ফাথি নামোনি রীতিমত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যে জুপিটারের মত গ্রহদের উপগ্রহ বলতে গেলে থাকেই না। ধরা হয়ে থাকে এমন অতিকায় গ্রহগুলো এদের নক্ষত্র সিস্টেমের বাইরে সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে নক্ষত্রের কাছাকাছি চলে আসে। আর আসার পথে যেহেতু নিজে ভারী, যথেষ্ঠ মহাকর্ষ শক্তিওয়ালা তাই বহু উপগ্রহ ধরা পড়ে এর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের প্রবলতায়।

গ্যাস দানব বড়, কিন্তু নক্ষত্র তো বড়োর চেয়েও বড়— বিশাল। একারণে তাদের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রও ব্যাপক মাত্রায় প্রবল হবে। তাই যখন কোনো জুপিটারের মত গ্রহ উপগ্রহ ভিড়িয়ে কাছে চলে আসে, নক্ষত্র উপগ্রহদের গিলে ফেলে।

উপগ্রহময় গ্রহরাজ বৃহস্পতি; image source: ROBERTO MOLAR-CANDANOSA/CARNEGIE INSTITUTION FOR SCIENCE

নক্ষত্র থেকে যত দূরে যাওয়া যায় বস্তুর প্রতি এর আকর্ষণ বলও কমতে থাকে। মহাকর্ষের প্রাবল্যের গণিত বলে দূরত্ব দ্বিগুণ হলে শক্তি কমে যায় চারগুণ, দূরত্ব তিনগুণ হলে শক্তি কমে যায় ৯ গুণ। মানে একই পরিমাণ দূরত্ব বৃদ্ধির জন্য মহাকর্ষের প্রাবল্য হ্রাস ঘটছে বেশি বেশি করে, যত দূরে যাওয়া হচ্ছে। সে অনুসারে নামোনিই সঠিক, জুপিটারের ৭৯টা উপগ্রহ থাকার প্রথম কারণ এর মহাকর্ষ বল প্রবল। আর এই ৭৯টা উপগ্রহই জুপিটারের কাছে টিকে থাকার কারণ, জুপিটার সূর্য থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে।

বড় পরিবার, বৃহস্পতি পরিবার

জুপিটারের উপগ্রহগুলো শিলাময়। উপগ্রহ আয়ো সক্রিয় আগ্নেয়গিরিময়, ইউরোপাতে গুপ্ত আছে মহাসাগর এবং গুরুত্বপূর্ণ গ্যানিমিড যা কিনা এই সৌরজগতের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক উপগ্রহ। গ্যানিমিড মঙ্গলের দুই তৃতীয়াংশ এমনকি বুধের চেয়েও বড়।

অনুমান করা হয় এই তিন উপগ্রহ, ক্যালিস্টো আর বৃহস্পতি নিজে সম্ভবত পরপর একই সাথে গঠিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ গ্যাসের চাকতি আর ধুলা মিলেমিশে আজকের বৃহস্পতিকে গঠন করে। যখন জুপিটার আকার গঠন করে ফেলে, অন্যান্য পদার্থ এর চারপাশে পাক খাচ্ছিল যা জমে চারটি উপগ্রহে পরিণত হয়। গ্যালিলিও প্রথম এই উপগ্রহ চারটি দেখতে পান বলে এগুলোকে গ্যালিলিওর চাঁদ বলা হয়।

এই চারটি উপগ্রহই বলতে গেলে জুপিটারের উপগ্রহগুলোর ভরসমষ্টির সবটা। এই চারটি বাদে বাকিগুলো মিলে উপগ্রহগুলোর মোট ভরের মাত্র ০.০০৩%।

শনি গ্রহও এই প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে থাকবে কিছুটা। অনুকল্প (হাইপোথিসিস) করা হয় যে, আদি বৃহস্পতি শনির কিছু কক্ষপথ বিচ্যুত উপগ্রহকে নিজের কক্ষপথে টেনে নেয়। অন্যান্য উপগ্রহগুলো এমন যে বৃহস্পতির জন্মের সাথে তাদের জন্ম সংগতিপূর্ণ মনে হয় না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন বৃহস্পতির বহু চাঁদগুলো গঠিত হয়েছে এর মহাকর্ষের প্রভাবে ছুটতে থাকা পাথরের খন্ডগুলোর এক হওয়ার মাধ্যমে।

সব কথা শেষ করার আগে চাঁদের আচরণ নিয়ে কিছু জানাতে হবে। বৃহস্পতির অনেকগুলো উপগ্রহ বৃহস্পতি যেদিকে পাক খায় সেভাবেই বৃহস্পতিকে একই দিক ধরে প্রদক্ষিণ করে। আবার কতকগুলো বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করে। নতুন আবিষ্কৃত গ্রহগুলোর মধ্যেও দুটো বিপরীত দিকে ঘোরে। বিপরীত দিকে ঘোরার ক্ষেত্রে ঝুঁকি হল দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যেকোন সময় একটি আরেকটির সাথে সংঘর্ষ ঘটতে পারে। বহু উপগ্রহ বহুদিকে প্রদক্ষিণ করায় সংঘর্ষ এড়ানোই কঠিন ব্যাপার হবে। আর এক উপগ্রহ আরেক উপগ্রহের উপর আছড়ে পড়লে বৃহস্পতি সেই সুযোগে পেয়ে যেতে পারে নতুন উপগ্রহ। এটাও বহু উপগ্রহ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

HowStuffWorks অবলম্বনে।

featured image: express.co.uk

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *