দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- ছোট যদি হতে চাও, বড় হও আগে

আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা ইতোমধ্যেই টুক টাক জানতে শুরু করে দিয়েছি। আমরা ইতোমধ্যেই কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধে কিছুটা জানি, আর এবার জানবো দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন সম্বন্ধে।

প্রথমেই আমরা জেনে নেই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুসারে যদি কোন বস্তু তোমার সাপেক্ষে স্থির অবস্থায় থাকে তখন তার দৈর্ঘ্য মাপলে তুমি যে মান পাবে যদি, বস্তুটি তোমার সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল হয় তবে তার দৈর্ঘ্য মাপতে গেলে দেখবে যে বস্তুটির দৈর্ঘ্য কমে গেছে। বস্তুটি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যাক বা, কাছেই আসতে থাকুক না কেন সবসময়ই দেখবে যে বস্তুটি বড় থেকে সমবেগে গতিশীল হওয়ার পরপরই ছোট হয়ে গেছে। আমরা আগেও দেখেছি ইথার ধারণাকে বাঁচানোর জন্য ফিটজগোরাল্ড প্রথম এই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। আর লরেন্টজ সেই সঙ্কোচনের পরিমাণটিকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন।

length_cont2

আমরা কাল দীর্ঘায়নের বাস্তব উদাহরণে দেখেছি যে, বায়ুমন্ডলে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট হওয়া মিউওন মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড টিকে থাকে। সেই মিউওনগুলোর বেগ অনেক বেশি হয়ে থাকে, প্রায় আলোর বেগের কাছাকাছি। কিন্তু এত বেগ নিয়েও ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের যাওয়ার কথা মাত্র ৬৬০ মিটারের মত। কিন্তু এরপরও মিউওন কিন্তু অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসে। এর কারণ হল মিউওনের বয়স মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড হলেও আমাদের কাছে তা কাল দীর্ঘায়নের ফলে আমাদের কাছে ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড। এই বেগে মিউওন অতিক্রম করবে প্রায় ১৯ কি.মি. পথ। যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসার জন্য যথেষ্ট দূরত্ব।

Image result

কিন্তু কাল দীর্ঘায়নের হিসেব মতে মিউওন নিজে কিন্তু তার সময় ঠিকই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড দেখবে। এ সময়ে যদি সে ১৯ কি.মি. দূরত্ব অতিক্রম করে তবে তার বেগ আলোর বেগের প্রায় ২৯ গুন হতে হবে। কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে তো কিছু যেতে পারে না। তাহলে এই ১৯ কি.মি. দূরত্ব মিউওন অতিক্রম করল কিভাবে? একটা অসাধারণ প্যারাডক্স বা, ধাঁধা তৈরি হয়ে গেল দেখা যাচ্ছে। তাহলে এখন চলো এই প্যারাডক্সটির সমাধান করে ফেলা যাক।

পৃথিবী থেকে আমরা দেখব মিউওনের আসতে সময় লেগেছে t=৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড(কাল দীর্ঘায়নের ফলে)। বায়ুমন্ডল থেকে পৃথিবী পৃষ্ঠের দূরত্ব কিন্তু বিজ্ঞানীরা মেপে রেখেছেন। যদি ধরে নেই মিউওন কোনভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠে এসেই রুপান্তরিত হয়ে যায় তাহলে ধরে নিতে পারি এ দূরত্ব হল  =১৯ কি.মি.।

তাহলে মিউওনের বেগ v হলে বেগ=দূরত্ব/সময় অনুসারে আমরা লেখতে পারি,

v= /t ………………………………………………(1)

আবার মিউওন দেখবে পৃথিবীটাই মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের কাছে চলে গেছে। তাহলে মিউওন তার সময় মাপবে,
মাইক্রোসেকেন্ড। এই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের মনে হবে পৃথিবীটা v বেগে (পৃথিবীর কাছে মিউওনের বেগ

যত, মিউওনের কাছেও পৃথিবীর বেগ তত! আপেক্ষিকতা!) তার কাছে চলে গেছে। এ সময় পৃথিবী অতিক্রম করেছে L দূরত্ব। তাহলে,

v=L/vbn(2)

আমরা লক্ষ্য করি যে, দুবার আমরা দৈর্ঘ্যের জন্য দুইরকম সঙ্কেত ব্যবহার করেছি। একবার  আরেকবার L. কারণ আমরা আগেই দেখেছি রিলেটিভিটির হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে সময়ই আপেক্ষিক হয়ে যায়। তাই দৈর্ঘ্যও আপেক্ষিক হতে পারে এই সন্দেহ থেকেই এই কাজটি করা। দৈর্ঘ্য যদি আপেক্ষিক না হয় তাহলে একটু পরেই আমরা হয়ত দেখব যে,  ।

তাহলে এখন, (1) এবং (২) নং সমীকরণ থেকে পাই,

                                                                                                                 ……………………………………………..….(3)

আমরা কাল দীর্ঘায়নের সূত্র থেকে জানি,

                                                                                                                   ..…………………………………….………..(4)

 

(3) এবং (4) নং সমীকরণ থেকে পাওয়া যায়,

বা,

বা,

এটিই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র।  হল স্থির অবস্থায় মাপা কোন কিছুর দৈর্ঘ্য, আর L হল সেই কোন কিছুর গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্য। কোন কিছুই আলোর বেগে চলতে পারেনা। তাই এই সমীকরণের  এর মান সর্বদাই ১ এর চেয়ে বেশি হবে (লব ছোট আর হর বড় হওয়ার কারণে)। আবার  এর মানও ১ এর চেয়ে ছোট কিন্তু ধনাত্মক একটি দশমিক সংখ্যা হবে। স্থির অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যকে এই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করলে আমরা যে গুনফল পাব সেটিই হবে গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যের সমান।  সবসময় ১ এর চেয়ে ছোট বলে এই গুনফলও সর্বদাই  এর চেয়ে কম হবে। তাই গতিশীল অবস্থায় আমাদের কাছে মনে হবে সবকিছুই তার দৈর্ঘ্যের দিক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। মিউওনের কাছেও পৃথিবীর দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়াই সে ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডেই পৃথিবীতে এসে পৌঁছে গেছে বা, পৃথিবী তার কাছে পৌঁছে গেছে। সুতরাং দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত করে ফেললেই কিন্তু মিউওনের প্যারাডক্সটি সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে যায়।

 এই সূত্রটিই হল দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র। এর আগেও ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টজ যে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র দিয়েছিলেন সেই সূত্র আর এটি কিন্তু হুবুহু এক। শুধু পার্থক্য হল তারা পদার্থের নিজেদের সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন আর আইনস্টাইন তার স্পেশাল রিলেটিভিটিতে স্পেস বা, স্থানের নিজেরই সঙ্কোচনের কথা বললেন।

Image result

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন দেখতে পাইনা। এর কারণ হল, আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু এর প্রভাবটা আমাদের চোখে পরে। তখন এ সঙ্কোচনের মান অনেক বেশি হয়ে যায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেসব বেগ দেখি তা আলোর বেগের তুলনায় এতই কম যে এর ফলে দৈর্ঘ্যের সঙ্কোচন ঘটলেও তা আমাদের সূক্ষাতিসূক্ষ যন্ত্র দিয়েও আমরা তা ধরতে পারবো না। তাই আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিষয়টি আসলে বুঝতেও পারবো না। আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু বিষয়টি আমরা বুঝতে পারব। যদি কোন কিছু আলোর ৮৭% গতিতে চলত তাহলে আমরা দেখতাম স্থির অবস্থার চেয়ে তার দৈর্ঘ্য একদম অর্ধেক হয়ে গেছে!! আর যদি তা আলোর গতিতে চলতে পারতো তবে তা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখতাম! কিন্তু কোন কিছু একদম শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া তো আর সম্ভব নয়। আর এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, কোন কিছুই আসলে আলোর বেগে চলতে পারে না।

3 Replies to “দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- ছোট যদি হতে চাও, বড় হও আগে”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *