তরল পানির হ্রদের দেখা মিলল মঙ্গলে

অশেষ জল্পনা কল্পনা আমাদের মঙ্গলকে ঘিরে। মঙ্গলে পানি পাওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়ে বহু অনুমান করা হয়। মঙ্গলে পানি তরল দশায় পাওয়া যেতে পারে সে প্রকল্প (Hypothesis) ৩০ বছর আগে প্রথম করা হয়েছিল। আন্দাজ করা হত, মঙ্গলের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে এই পানির হ্রদ থাকতে পারে বরফের নিচে যা প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত।

অতীতে সম্পন্ন গবেষণাগুলো অনিয়ত পানির প্রবাহের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছিল মঙ্গলপৃষ্ঠে। কিন্তু বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য নিয়মিত অবস্থান করা পানির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিওরোসিটির মাধ্যমে এমন হ্রদগুলোয় ইতিপূর্বে পানির ঐতিহাসিক উপস্থিতির লক্ষণ আবিষ্কৃত হয়েছিল। মঙ্গলের জলবায়ু আগের চেয়ে শীতল হয়েছে। প্রথমত এর আবহাওয়া মণ্ডল অত্যন্ত পাতলা। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ পানি বরফের নিচেই আটকে আছে।

এ আবিষ্কার সম্পন হয়েছে ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির মার্স এক্সপ্রেস অরবিটারের একটি রাডার যন্ত্রের সাহায্যে যেটির নাম মার্সিস। যারপরনাই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত এ আবিষ্কারে।

আবিষ্কৃত হ্রদটি অবস্থিত মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে; image source: NASA

ইতালীয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এস্ট্রোফিজিসিস্টের প্রফেসর রবার্তো ওরোসেই বলেন, এটা সম্ভবত খুব বেশি বড় নয়। মার্সিস হ্রদে পানির অস্তিত্ব চিহ্নিত করতে পারলেও এর গভীরতা বা পুরুত্ব নির্ণয় করতে পারে নি। অবশ্য গবেষক দল অনুমান করছেন ১ মিটার গভীরতা হতে পারে এর।

প্রফেসর ওরোসেই এর মতে, এ গভীরতা হ্রদ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। কারণ, এটি পাহাড় আর বরফের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গায় বরফ গলা পানির মাধ্যমে সৃষ্ট নয় যেমনটা পৃথিবীতে তুষারস্রোতের কারণে হয়ে থাকে।

শিল্পীর কল্পনায় মঙ্গলের চারদিকে পরিভ্রমণরত মার্সিস রাডারের কার্যক্রম; image source: ESA

কিভাবে খুঁজে পাওয়া গেল এই হ্রদ?

রাডারের কাজ করার নীতি হচ্ছে একটা তরঙ্গ প্রেরণ করা কোনো দিকে এবং সে তরঙ্গ কোনো বস্তু বা পৃষ্ঠে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসার পর সে তরঙ্গ গ্রহণ করা। মার্সিসও এমনই এক রাডার, এটি মঙ্গলের পৃষ্ঠ এবং উপপৃষ্ঠে তরঙ্গসংকেত প্রেরণ করে। আর ফিরে আসা তরঙ্গ পরীক্ষা করে বাধা দেয়া পৃষ্ঠের প্রকৃতি নির্ণয় করা হয়।

রাডারের ফল থেকে পাওয়া নিয়মিত দাগগুলো দক্ষিণ মেরুস্থ স্তরীভূত বরফের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাদা পেস্ট্রি মতন দেখতে বরফ, পানি এবং ধুলোর মিশ্রণের হিমশীতল পৃষ্ঠের ১.৫ কিলোমিটার নিচে অস্বাভাবিক কিছু চিহ্নিত করেন। নীল আলোয় দেখা যায় তলানির প্রতিফলন এর পৃষ্ঠের প্রতিফলনের চেয়ে তীব্র। এ থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করে নেন বরফের তলায় পানির অস্তিত্ব।

বিশ্লেষিত চিত্রপটে গাঢ় নীল রঙ পানির অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা; image source: bbc.com

মঙ্গলে জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে এ ঘটনা কিছু বলে কিনা?

এর সোজাসুজি উত্তর এখনো পর্যন্ত জীবনের উপস্থিতির ব্যাপারে কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। ওপেন ইউনিভার্সিটির ড. মানিশ প্যাটেল ব্যাখ্যা করেন: “আমরা দীর্ঘসময় ধরেই যেহেতু জানি মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠ জীবন ধারণের জন্য অনুপযোগী, সুতরাং মঙ্গলে জীবনের চিহ্ন খঁজায় আমাদের লক্ষ্য হবে এর তলদেশ।”

এর যৌক্তিক কারণ ভূপৃষ্ঠের নিচে ক্ষতিকর বিকিরণের অনুপস্থিতি আর তাপমাত্রা ও চাপের ভারসাম্য অনুকূল মাত্রায় রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলতে গেলে, এই বৈশিষ্ট্য তরল পানির পরিবেশ যোগান দেয় যা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়।

জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানের জন্য এই নীতি অনুসরণ করা, জীবনের অস্তিত্ব গবেষণায় একটি প্রধান সম্ভাব্যতা। যেহেতু পৃথিবীর জীবনের সৃষ্টির পেছনের কারণই আমাদের অভিজ্ঞতার পাথেয়। তাই, যখনই কোথাও পানি পাওয়া যায়, নিশ্চিত করে অন্য কিছু বলে ফেলা যায় না।

ড. প্যাটেলের মতে, আমরা জীবন চিহ্নিত করার ধারে কাছে নেই সত্য। তবে এই আবিষ্কার আমাদের বলে দিচ্ছে মঙ্গলের কোথায় আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত। অনেকটা ধন ভাণ্ডার লুকিয়ে থাকা কোনো মানচিত্রে সম্পদের নিশানাযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়া।

পৃথিবীর নোনাপানির হ্রদগুলোয় কিভাবে প্রাণের কার্যক্রম কাজ করছে তা সাহায্য করতে পারে মঙ্গলের জন্য অনুসিদ্ধান্ত তৈরিতে; image source: Science Photo Library

পানির তাপমাত্রা এবং রাসায়নিক পরিবেশও একটি সমস্যা হতে পারে যেকোনো সম্ভাব্য মঙ্গলীয় জীবদেহের জন্য। এই শীতল পরিবেশে সেখানের তাপমাত্রা হতে পারে -১০ থেকে -৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পানিতে দ্রবীভূত থাকতে পারে বিবিধ ধরণের লবণ, ফলে ঘন হয়ে নিম্ন তাপমাত্রায়ও তরল থাকবে পানি।

অতিরিক্ত শীতল এবং নোনা পরিবেশ প্রাণের জন্য খুবই বৈরী পরিস্থিতির হবে বলে ব্যাখ্যা করেন ড. ক্লেয়ার কাজিন্স, যিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট এন্ড্রুজের একজন জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানী।

এরপর কী?

মঙ্গলে প্রাণের দেখা পেতে বিজ্ঞানীরা বারবার আশার দোলাচলে দুলেছেন। যখনই কোনো সম্ভাবনার দেখা মিলেছে, অতীত বা বর্তমানে প্রাণের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে তথ্য ও আরো গভীর গবেষণা চিরন্তন চাহিদাই ছিল। বরাবরের মত, এই হ্রদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একই। এ হ্রদের বৈশিষ্ট্য, ধর্ম যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে।

ওপেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ম্যাট বাম বলেন, বর্তমান করণীয় হল একই ধরণের মাপজোখ, জরিপ অন্যান্য স্থানগুলোতেও করা, একই ধরণের সংকেত খুঁজে বের করা, এমনকি সম্ভব হলে, অন্যান্য সকল ব্যাখ্যা পরীক্ষা করা এবং একে একে সেগুলোর যাচাইয়ে এই আবিষ্কারের সন্দেহ ছেঁটে ফেলা।

হয়ত এর ফলে মঙ্গলে অভিযানের ক্ষেত্রে এই পানিকূপে খননের প্রকল্প উদ্ভাসিত হতে পারে। এমনটা ইতিমধ্যে পৃথিবীতে এন্টার্কটিকায় করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের অবাক করে দেয় যখন এন্টার্কটিকার চাপা পড়া ভস্টোক হ্রদে ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই খননের পূর্ব পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও অনুমান সেখানে প্রাণের অস্তিতে থাকার বৈধতা দিত না। তবে, মঙ্গলের ক্ষেত্রে এ ধরণের খনন যথেষ্ঠ উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকল্প হবে।

মঙ্গলে পৌঁছানো এবং চূড়ান্তভাবে প্রামাণ্য নজির বের করা চারটিখানি কথা নয়। এখানে শুধু অভিযানই যথেষ্ঠ নয়, মঙ্গলের পরিবেশে রবোট খনন কাজ চালানোর জন্য যথেষ্ঠ মাত্রার প্রযুক্তি দক্ষতাও আমাদের অর্জন করতে হবে।

দক্ষিণ মেরুর ভস্টোক হ্রদ, পৃথিবীর সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গা প্রাণ পাওয়ার ক্ষেত্রে; image source: extremetech.com

এন্টার্কটিকার সেই ভস্টোক হ্রদের কথা বলার কারণ, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রার এলাকা। এর 3.5 কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত খনন করে ৩৫০০ প্রজাতির প্রাণের দেখা পাওয়া গিয়েছিল। এত চরমতাপমাত্রার এলাকায় যদি নৈরাশ্যে ফল পেতে পারি, তবে মঙ্গলে কেন নয়?

 

বিবিসি এবং সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *