জুলাই ২৭ তারিখে উপভোগ করুন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ আর মঙ্গলকে দেখুন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছ থেকে

চলতি মাস জুলাই আমাদের জন্য নিয়ে এসেছে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। এ মাসেই মঙ্গল গ্রহকে  দেখা যাবে অনেক কাছ থেকে আর অনেক উজ্জ্বলরূপে। শেষবার ২০০৩ সালে অর্থাৎ প্রায় ১৫ বছর আগে মঙ্গলকে পৃথিবীর এত কাছ থেকে এবং এত উজ্জ্বল ভাবে দেখা গিয়েছিল। এমনকি প্রায় ৪ ঘন্টা ব্যাপী চন্দ্রগ্রহণও ঘটতে চলেছে এ মাসেই।

ছবিসূত্রঃ The Christian Science Monitor
ছবিসূত্রঃ NDTV.com

মঙ্গল আসছে পৃথিবীর নিকটতম দূরত্বে

লাল এই গ্রহটি আর কিছুদিনের মধ্যেই পৌঁছে যাবে এর কক্ষপথের অপোজিশন নামক অংশে যেখানে পৃথিবীর সাপেক্ষে এর অবস্থান হবে সূর্যের ঠিক বিপরীতে। গত ১৫ বছরের মধ্যে এবারই মঙ্গলকে পৃথিবীর এত কাছ থেকে দেখা যাবে। সূর্যকে পৃথিবী ও মঙ্গল ২টি আলাদা কক্ষপথে আবর্তন করে। মঙ্গলের চেয়ে আবার পৃথিবীই সূর্যের অধিক নিকটবর্তী। তাই পৃথিবী মঙ্গলের চেয়ে দ্রুত বা কম সময়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পারে। ফলে প্রতি ২ বছরে অন্তত একবার করে সূর্য, পৃথিবী ও মঙ্গল একটি সরলরেখা বরাবর অবস্থান করে যাকে বলে অপোজিশন।

ছবিসূত্রঃ Phys.org

চলমান বছরে এই অপোজিশন হতে চলেছে জুলাই এর ২৭ তারিখে। আর পৃথিবী থেকে মঙ্গলকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখা যাবে জুলাই এর ৩১ তারিখে (সময় রাত ৩.৫০ EDT)। তাছাড়া মঙ্গলকে দেখা যাবে আরও উজ্জ্বলরূপে। ১৫ বছর আগে ২০০৩ সালে মঙ্গলকে বিগত ৬০,০০০ বছরের মধ্যে প্রথমবার এত উজ্জ্বলরূপে দেখা গিয়েছিল যখন এটি পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৪.৭ মিলিয়ন মাইল বা প্রায় ৫৬ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান নিয়েছিল। নাসা কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এবারে মঙ্গলের অবস্থান হবে পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৫.৮ মিলিয়ন মাইল বা প্রায় ৫৭.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার এবং এটি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি উজ্জ্বল হবে।

তবে EarthSky.org এ দেয়া তথ্য অনুযায়ী এখনও মঙ্গলকে দেখা যাবে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে ক্যাপ্রিকর্ন নক্ষত্রমণ্ডলের অভ্যন্তরে। আর জুলাইয়ের ২১ থেকে আগস্টের ৩ তারিখ পর্যন্ত একে দেখা যাবে এর সবচেয়ে উজ্জ্বলরূপে। তবে যদিও মঙ্গল এর সবচেয়ে উজ্জ্বল রূপ আমাদের সামনে আসতে যাচ্ছে, এটি ভাবার কোন কারণ নেই যে মঙ্গলকে দেখতে চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল লাগবে।

ব্লাড মুন

ছবিসূত্রঃ India Today

এই শতাব্দির সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণও পৃথিবীর অধিকাংশ স্থানকে কিছু সময়ের জন্য গাঢ় অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে আগমন করছে এই মাসেই। এই গ্রহণ ঘটতে চলেছে জুলাইয়ের ২৭ তারিখে এবং এর ব্যাপ্তি হবে প্রায় ৪ ঘণ্টা। ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্য প্রাচ্য থেকে এটি দেখা গেলেও যুক্তরাস্ট্র এবার এই চন্দ্রগ্রহণ উপভোগ করতে পারবে না। আবার পৃথিবীর অনেক স্থান থেকেই এই গ্রহণের কিছু অংশ দেখা গেলেও উত্তর আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু জায়গা থেকে এটির লালবর্ণ ধারণ করা থেকে পুর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া সম্পুর্ণটাই সবচেয়ে ভালভাবে অবলোকন করা সম্ভব হবে। এই পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণে পৃথিবীর ছায়া সমগ্র চাঁদকে ঢেকে ফেলবে এবং পৃথিবী সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে। একে বলা হয় টোটালিটি। এর ব্যাপ্তি হবে ১ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট।

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ কি?

ছবিসূত্রঃ TimeAndDate.com

চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন পৃথিবী সূর্যকে ও চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে এরা একটি সরলরেখা বরাবর অবস্থান নেয় এবং সূর্য ও চাঁদকে দুই পাশে রেখে মাঝখানে অবস্থান করে পৃথিবী। ফলে পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পরে। যখন এই ছায়া সমগ্র চাঁদকে ঢেকে ফেলে তখনই একে বলা পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ। পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় কখনও কখনও চাঁদ লাল বর্ণ ধারণ করে। নাসার তথ্য অনুসারে, এর কারণ হল পৃথিবীতে সূর্য ওঠা ও অস্ত যাবার সময় সূর্যের লাল আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কর্তৃক সামান্য প্রতিসরিত হয় তথা বেঁকে যায়। এই প্রতিসরিত লাল আলো আবার পৃথিবী দ্বারা প্রতিফলিত হয়ে চাঁদের ওপর পড়ে। ফলে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে রক্তবর্ণ তথা লাল দেখায়, আর একে বলা হয় ব্লাডমুন।

২০১৭ এর সূর্যগ্রহণের সময় আকাশ কয়েক মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল কারণ চাঁদ সূর্যের সামনে এসে পড়েছিল আর চাঁদের ছায়া পড়েছিল পৃথিবীর উপর। সূর্যগ্রহণ সাধারণত খুব অল্প সময়ের জন্য হয় কারণ চাঁদ সূর্যের তুলনায় খুব ছোট হওয়ায় চাঁদের ছোট্ট ছায়া পৃথিবীর অল্প জায়গার উপর পরে এবং সেটুকুই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়। অর্থ্যাৎ সূর্যগ্রহণ দেখতে হলে আপনাকে থাকতে হবে চাঁদের ছায়া যেখানে পড়ছে সেখানে, কিন্তু চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায় পৃথিবীর যে পৃষ্ঠে ঐ সময়ে রাত সেই পুরো অংশ জুড়েই।

তবে অনেকেই এই বিষয় নিয়ে চিন্তিত যে এই পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ খালি চোখে দেখা যাবে কিনা। বিজ্ঞানীদের মতে এই গ্রহণ খালি চোখে দেখা সম্পূর্ণ নিরাপদ। সূর্য গ্রহণের সময় সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো হয় বলে সূর্যরশ্মি দ্বারা চোখের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই এসময় সূর্যের আলো প্রতিরোধকারী চশমা ব্যবহার করতে বলা হয়। কিন্তু চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের দিকে তাকানো হয়, আর এর আলো প্রতিফলিত সূর্য রশ্মি যা চোখের কোন ক্ষতি করেনা। ফলে কোন আলো প্রতিরোধকারী চশমার প্রয়োজন হয় না।

আরেকটি মজার তথ্য হল একই দিনে অর্থাৎ জুলাইএর ২৭ তারিখে আপনি মঙ্গলকে দেখতে পাবেন এর উজ্জ্বলতম রূপে। আবার মিল্কি ওয়ে গ্যলাক্সিকেও খালি চোখেই দেখতে পাবেন অনেকটা স্পষ্টভাবে যা অন্য সময় সচরাচর দেখা যায় না।

এখানে একটি বিষয় বলে রাখা জরুরী। যদিও ৩১ জুলাই মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসবে, কিন্তু ২৭ জুলাইও মোটামুটি একই রকম দূরত্বে থাকবে মঙ্গল। উপরন্তু ২৭ জুলাই চন্দ্রগ্রহণের অন্ধকারে মঙ্গল গ্রহকে অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখাবে, যা ৩১ জুলাই চাঁদের আলোতে ভালোভাবে উপলব্ধি করা যাবে না।

আকাশ দেখা যাদের নেশা তাদের জন্য এই ৩ টি অভিনব সুন্দর মহাজাগতিক দৃশ্য একই সময়ে দেখতে পারা সত্যিই চমকপ্রদ ও সৌভাগ্যময় ঘটনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *