ধূমকেতুতে পাওয়া আণবিক অক্সিজেন ধূমকেতুতে তৈরি হয় নি

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার রোসেটা মহাকাশযান ৬৭পি ধূমকেতুকে পর্যবেক্ষণ করে দীর্ঘসময়। আগস্ট ২০১৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত সূর্যের চারদিকে আবর্তন করছিল। ধূমকেতু ৬৭পি এর অপর নাম চুরিয়ুমোভ গেরাসিমেঙ্কো। আর রোসেটার অভিযানকাল ছিল দীর্ঘ ১২ বছর। রোসেটা এ ধূমকেতুর উপর একটি প্রোবও পাঠিয়েছিল যা পরিশেষে বিপর্যস্ত হয়ে এর পৃষ্ঠে ধ্বংস হয়।

রোসেটার তোলা ৬৭পি ধূমকেতুর ছবি। ছবিটি তোলা হয়েছিল সূর্যকে নিকট দিয়ে প্রদক্ষিণ করার সময়; Image Source: European Space Agency

যখন ধূমকেতু সূর্যের কাছাকাছি আসে তখন এর বরফ সূর্যের তাপে উর্ধ্বপাতিত হয়। উর্ধ্বপাতনের ফলে কোনো পদার্থ কঠিন থেকে সরাসরি গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর এই গ্যাস একটি আবহাওয়ামণ্ডল তৈরি করে ধূমকেতুর যেটিকে মনে হয় ধূমকেতুর মাথা। কখনো কখনো একে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসও বলে।

ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস বা মাথায় মূলত থাকে পানি, কার্বন মনোক্সাইড এবং কার্বন ডাই অক্সাইড। রোসেটার যন্ত্রপাতি কর্তৃক পর্যবেক্ষণের তথ্য বলছে এর মাঝে আণবিক অক্সিজেনও রয়েছে। আণবিক অক্সিজেন বলতে বোঝায় অক্সিজেন গ্যাসের মৌল দশা– কোনো যৌগে অন্য মৌলের সাথে যুক্ত থাকা অক্সিজেন নয়।

ধূমকেতুর বিভিন্ন অংশ যে নামে চিহ্নিত হয়; image source: Quora

এই আণবিক অক্সিজেন গঠিত হয় দুটো অক্সিজেন পরমাণু একে অপরের সাথে সমযোজী বন্ধনে যুক্ত হয়ে। পৃথিবীতে আমরা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বায়ুমণ্ডলে যে অক্সিজেন পাই তার উৎপাদন হয় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মত এত অক্সিজেন তো এখনো কোথাও পাওয়া যায় নি, যাও অল্পসংখ্যক স্থানে পাওয়া গেছে তাও খুব নগণ্য মাত্রায়। ইতিপূর্বে জুপিটারের কিছু বরফময় উপগ্রহে আণবিক অক্সিজেনের দেখা মিলেছে, কিন্তু কখনো ধূমকেতুতে পাওয়া যাবে এমনটা আশা করা হয় নি।

ধূমকেতুসহ আমাদের পুরো সৌরমণ্ডল গঠিত হয়েছিল অতিকায়, বিস্তৃত গ্যাসের মেঘ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে। অধিকাংশ পদার্থ মিলে গ্রহ তৈরি করেছিল, এছাড়াও কিছু ক্ষুদ্র দলা আকৃতির গ্যাস আর ধুলা জমাট বেধেছিল সৌরমণ্ডলের বাইরে। বাইরে হওয়ায় তাপমাত্রা যথেষ্ট কম ছিল যাতে বরফ গঠিত হতে পারে। আর ধূমকেতুর উপাদানগত কারণে এর অপর নাম কিন্তু ”নোংরা তুষারবল”।

রোসেটার বিজ্ঞানী দল তাদের প্রতিবেদনে প্রকাশ করে, এই অক্সিজেন ধূমকেতুর মূলদেহ বা নিউকিয়াসে গঠিত হয় নি। অর্থাৎ, আগে থেকেই এই আণবিক বা মৌলিক অক্সিজেনের অস্তিত্ব ছিল। সৌরমণ্ডলে ৪৬০ কোটি বছর আগে এটি গঠন হওয়ার সময়ই এতে অক্সিজেন উপস্থিত ছিল।

এই গবেষকদলের সাথে যুক্ত নয় এমন আরেকটি গবেষকদল অক্সিজেনের উৎসের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তারা মনে করে ধূমকেতুতে অক্সিজেন অন্য কোনো উপায়ে সঞ্চার হতে পারে। তারা একটি উপায়ও বাতলে দিয়েছে কিভাবে মহাশূন্যে আণবিক অক্সিজেন সৃষ্টি হতে পারে। বৈদ্যুতিকভাবে আহিত অণু বা শক্তিশালী আয়নের নির্দিষ্ট দিকে আলোড়নের মাধ্যমেও অক্সিজেন অণু গঠিত হতে পারে। অনেকটা নির্দিষ্ট দিকে আয়ন দিয়ে গুলি করার মত ব্যাপার।

তাদের প্রস্তাবনা ৬৭পি এর পৃষ্ঠের সাথে শক্তিশালী আয়নের বিক্রিয়ায় এই অক্সিজেন তৈরি হয়ে থাকতে পারে। মহাকাশে এমন শক্তিশালী আয়নের বিচ্ছুরণের ঘটনা নতুন কিছু নয়।

আর তাই রোসেটা বিজ্ঞানীদলের সদস্যরা ৬৭পি থেকে প্রাপ্ত তথ্য নতুন তত্ত্বের আলোয় বিশ্লেষণ করেছেন। নেচার কমিউনিকেশন্সে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তারা ধূমকেতুর পৃষ্ঠে অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়ার প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যে পরিমাণ অক্সিজেন পাওয়া গিয়েছে সে পরিমাণে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসে অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়া যথেষ্ট নয়। রোসেটা বিজ্ঞানীদলে কাজ করছেন ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের কতক পদার্থবিজ্ঞানী।

গবেষণাপত্রের শীর্ষ লেখক ইম্পেরিয়াল কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের কেভিন হেরিটায়ার বলেন, ৬৭পি এর মাথায় প্রথমবারের মত আণবিক অক্সিজেন আবিষ্কার একই সাথে ছিল চমক জাগানিয়া এবং উত্তেজনাকর। আমরা আণবিক অক্সিজেন তৈরির ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে দেখেছি। শক্তিশালী আয়ন, কণার বিচ্ছুরণের পরিমাণ ধূমকেতুর পৃষ্ঠে আপতিত হয়ে নতুন অক্সিজেন গ্যাস উৎপাদন করার হার থেকে আমাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অক্সিজেনের পরিমাণের সাথে গরমিল রয়েছে। শক্তিশালী আয়নের বিচ্ছুরণ কোনোভাবেই এ পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করার জন্য দায়ী হতে পারে না।

গবেষণাপত্রের সহলেখক ডক্টর ম্যারিনা গালান্ড যিনি একই কর্মস্থানে কাজ করছেন হেরিটায়ারের সাথে রোসেটা প্লাজমা কনসোর্টিয়ামে সহ-অনুসন্ধানকারী হিসেবে তিনি এ ব্যাপারে একই সুরে মত দেন। ধূমকেতুর পৃষ্ঠে আয়ন আপতিত হয়ে অণু গঠন সম্ভব কিন্তু সে পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ নয়।

নতুন বিশ্লেষণ এই গবেষক দলের মূল সারাংশের সাথে মিলে যায়, এই আণবিক দশার অক্সিজেন ধূমকেতু গঠনের সময়কার। অন্যান্য আরো তত্ত্ব প্রস্তাবিত হয়েছে যা এখনো একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় নি। তবে ধূমকেতু গঠনের সময়ই অক্সিজেনের সংযুক্তির তত্ত্ব এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে উপযোগী তত্ত্ব বলে মনে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক তত্ত্বসমূহ অন্ধকার মেঘ এবং আদি সৌরজগতের পরিবেশে আণবিক অক্সিজেনের উপস্থিতিকে সমর্থন করে। এই মডেলে আণবিক অক্সিজেন গঠনের পর জমে যায়, পরিণত হয় ক্ষুদ্র ধুলিকণায়। মহাকাশে হাজার হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার অজস্র নক্ষত্র থাকলেও বিশালতার কারণে মহাশূন্যের তাপমাত্রা খুবই কম, গড় তাপমাত্রা পরম তাপমাত্রার মাত্র তিন ডিগ্রি উপরে। তাই গ্যাস জমে দানা হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

অক্সিজেনের এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর সাথে আরো অন্যান্য উপাদান মিশে ক্রমে ধূমকেতু গঠন করে আর অক্সিজেন ধূমকেতুতে আটকা পড়ে থাকে। সূর্যের কাছে আসায় উত্তাপে জমাট অক্সিজেন ও অন্যান্য পদার্থ আবহাওয়ামণ্ডল তৈরি করে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস ঘিরে। উপরের ভিডিও ইলাস্ট্রেশন থেকে ব্যাপারটি লক্ষ্য করে থাকবেন পাঠক।

 

Sciencedaily অবলম্বনে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *