in ,

বিগ ব্যাং নয়, সৃষ্টির শুরুতে হয়েছিল বিগ বাউন্স: দুই দল পদার্থবিদদের নতুন দাবী

বর্তমান আদর্শ জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিগ ব্যাং তত্ত্ব মহাবিশ্বের সৃষ্টির তত্ত্ব হিসেবে নিজের আসন প্রায় স্থায়ী করেই নিয়েছে। জ্যোতিপদার্থবিদরাও এই তত্ত্বকেই মহাবিশ্বের শুরুর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হিসেবে মেনে নিয়েছেন। এর বিপরীতের মহাবিশ্বের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব সেই বহুদিন আগেই হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ইনফ্লেশান তত্ত্বকেও বিগব্যাঙ্গের ভেতরেই ধরা হয় এবং বিগ ব্যাং এর শুরুটা এই ইনফ্লেশান তত্ত্ব দিয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। ইনফ্লেশানের ফলে আমাদের মহাবিশ্ব অতি ক্ষুদ্র সময়ে অস্বাভাবিক রকম বৃহৎ আকার ধারণ করেছিল।

সময়ের স্কেলে ইনফ্লেশান এবং বিগ ব্যাং; image source: map.gsfc.nasa.gov

যদিও ইনফ্লেশান তত্ত্বের ইনফ্লেশানের শুরু নিয়ে এর বিপক্ষেও বেশ কিছু মতবাদ রয়েছে এবং সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে এর সপক্ষে এখনো কোন প্রমাণ জোগাড় করা যায়নি। তাই বিগত বেশ কিছু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা অন্যরকম ব্যাখ্যার নতুন কোন তত্ত্ব খোঁজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর তারই ফলাফলস্বরুপ তাদের নতুন এক প্রস্তাবনা হলো বিগ বাউন্স মডেল।

তবে বিগ বাউন্সের সমর্থনকারী জ্যোতিপদার্থবিদরাও এর প্রকৃতি নিয়ে মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। এদের একদল পদার্থবিদ মনে করেন আমাদের মহাবিশ্বটি আমাদের দেহের ফুসফুসের মতো একবার বড় হয় আবার একবার ছোট হয় এবং এই চক্রটি চলতেই থাকে। তবে আমাদের মহাবিশ্ব এই চক্রে ছোট হতে হতে কখনোই একদম শূন্য হয়ে যায় না। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ছোট হওয়ার পর আমাদের মহাবিশ্বটি আবার প্রসারিত হতে শুরু করে। আরেক দল পদার্থবিদ মনে করেন, আমাদের মহাবিশ্বটি বার বার নয় এর আগে শুধু একবারই সঙ্কুচিত হয়েছিল আর তা একটি নির্দিষ্ট আকারে ছোট হওয়ার পর আবার প্রসারিত হতে শুরু করেছে এবং সারা জীবন প্রসারিত হতেই থাকবে।

তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দিয়ে হয়তবা খুব দ্রুতই এই বিতর্কের অবসান করা যাবে। সামনের কয়েক বছরের মাঝেই আমাদের টেলিস্কোপগুলো মহাজাগতিক ইনফ্লেশানের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে যেতে পারে। তবে এ জন্য আমাদের বিগ ব্যাঙ্গের সময় তৈরি হওয়া কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানে এক ধরনের হালকা ঘূর্ণন বা, পাক সনাক্ত করতে পারতে হবে। তবে যদি সামনের কয়েক দশকেও এই প্রমাণ আমরা না দেখতে পাই তারপরও কিন্তু ইনফ্লেশান তত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণ হয়ে যাবে না। কারণ এই কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানের এই পাক বা, ঘূর্ণনটি খুবই হালকা কোন যন্ত্রের মাধ্যমে সনাক্ত করার জন্য। তবে ইনফ্লেশানের পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পাওয়া গেলে যুক্তিযুক্তভাবেই বিগ বাউন্সের মডেলটি আরো শক্ত ভিত্তি পাবে। কারণ এই মডেল কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানে কোনো রকম পাক বা, ঘূর্ণনের ভবিষ্যৎবাণী করে না।

গত বছরই পদার্থবিদরা দুটি নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন যেভাবে বিগ বাউন্স ঘটে থাকতে পারে। এর মাঝে একটি পেপার জার্নাল অভ কসমোলজি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোপার্টিকেল ফিজিক্সে খুব দ্রুতই প্রকাশিত হবে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্না ইজ্জাস এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল স্টেইনহার্ডট এই পেপারটি লিখেছেন। পল স্টেইনহার্ডট বিগ বাউন্সের পক্ষের একজন পরিচিত জ্যোতিপদার্থবিদ।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্না ইজ্জাস; image source: quantamagazine.org

তবে মজার বিষয় হলো, বিগ বাউন্স তত্ত্ব নিয়ে আরো একটি পেপার ফিজিক্যাল রিভিউ ডি’তে প্রকাশ হওয়ার জন্য গৃহীত হয়েছে। এই পেপারটির লেখক পদার্থবিদদের এক বিখ্যাত ত্রিরত্ন পিটার গ্রাহাম, ডেভিড কাপলান এবং সুরজিত রাজেন্দ্রন। তারা মূলত কণা পদার্থবিজ্ঞানের একটি প্রশ্নের দিকে মনোযোগ নিবিষ্ট করেছিলেন, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাদের সমাধান বিগ বাউন্সের দিকে ইঙ্গিত করে।

(বাম থেকে) পদার্থবিদদের এক বিখ্যাত ত্রিরত্ন পিটার গ্রাহাম, ডেভিড কাপলান এবং সুরজিত রাজেন্দ্রন; image source: quantamagazine.org

পদার্থবিদ স্টেইনহার্ডট মনে করেন, বিগ বাউন্স আমাদের মহাবিশ্বের বিভিন্ন ঘটনা বেশ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে। আমাদের মহাবিশ্বের সর্বত্র যে পদার্থের ঘনত্ব প্রায় একই তা বিগ বাউন্স তত্ত্ব থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব এমন একটি পেপার স্টেইনহার্ডট আরো তিনজন পদার্থবিজ্ঞানীর সহায়তায় ২০০১ সালে প্রকাশ করেছিলেন।

আবার বিগ বাউন্সের প্রতিদ্বন্দী ইনফ্লেশান তত্ত্বেরও কিছু বিষয় বেশ বিতর্কিত রয়েছে। ১৯৮০ সালে অ্যালেন গুথ এবং আন্দ্রে লিন্ডে মূলত ইনফ্লেশানের এই তত্ত্ব প্রদান করেন। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে বিগ বাউন্স তত্ত্বের সমর্থক স্টেইনহার্ডটও সেসময় ইনফ্লেশান তত্ত্বের উন্নয়নে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু ইনফ্লেশান তত্ত্ব আসার পরপরই ইনফ্লেশানের ফলাফল হিসেবে মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্বের ধারণা আসলো এবং দেখা গেলো যে, ইনফ্লেশান সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বের বাইরেও আরো অসংখ্য মহাবিশ্ব থাকতেই হবে। এ বিষয়টা অনেক পদার্থবিদই কিছুটা বাড়াবাড়ি বলে মনে করলেন। স্টেইনহার্ডটও তাদেরই একজন ছিলেন, যে কারণে তিনি ইনফ্লেশান তত্ত্ব থেকে বিগ বাউন্স তত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

image source: quantamagazine.org

আমাদের মহাবিশ্ব যে সঙ্কুচিত হতে পারে এই ধারণা ১৯৬০ সালের দিকে বিজ্ঞানীদের মাথায় প্রথম আসতে থাকে। এ সময় ব্রিটিশ পদার্থবিদ রজার পেনরোজ এবং স্টেফেন হকিং ‘সিঙ্গুলারিটি থিওরেম’ নামের একটি থিওরেম প্রমাণ করেন। তারা দেখান, খুব সাধারণ পরিবেশে সঙ্কুচিত হতে থাকা পদার্থ এবং শক্তিগুলো অবধারিতভাবে সিঙ্গুলারিটি নামের একটি অসীম ঘনত্বের বিন্দুতে পরিণত হয়। এই কথাটি শুধু ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রেই সত্য নয়, আমাদের মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেও সত্য। তাই আমাদের মহাবিশ্ব সঙ্কুচিত হতে থাকলে তা একসময় সিঙ্গুলারিটি অবস্থার তৈরি করার কথা, যে অবস্থায় আলবার্ট আইনস্টাইনের মহাকর্ষের তত্ত্ব ভেঙ্গে পড়ে এবং আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞান আর কাজ করে না। এখানে আমাদের অবশ্যই কোয়ান্টাম মহাকর্ষের নতুন তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে, যা আমাদের এখনো অজানা।

নতুন আসা বিগ বাউন্সের দুটি মডেলই এই সিঙ্গুলারিটি ধারণার ভেতরে থাকা একটি ছিদ্র বা, সিঙ্গুলারিটি পরিহারের উপায়গুলো নিয়ে নিয়ে কাজ করেছে।

বিগ বাউন্সের পক্ষের জ্যোতিপদার্থবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে, সিঙ্গুলারিটি পরিহার করে বিগ বাউন্স সম্ভব যদি আমাদের মহাবিশ্বের ভেতরে ঋণাত্মক শক্তির উপস্থিতি বা, ঋণাত্মক চাপের কোনো উৎস থেকে থাকে। এই ঋণাত্মক চাপ বা, ঋণাত্মক শক্তি মহাকর্ষের প্রভাবে সবকিছুর যে সঙ্কোচন ঘটে তাকে বাঁধাগ্রস্থ করবে এবং সবকিছুকে সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছানোর পূর্বেই দূরে সরিয়ে দেবে। এভাবে বিগ বাউন্স মডেল সিঙ্গুলারিটিকে ফাঁকি দিয়ে তার সঙ্কোচন প্রসারণ অব্যাহত রাখে। বিগ বাউন্স মডেলের সমর্থকরা বহুদিন ধরেই সিঙ্গুলারিটি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এই পথ অবলম্বনের চেষ্টা করে আসছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তাদের মডেল অনুসারে আমাদের মহাবিশ্বে ঋণাত্মক শক্তি যোগ করলে আমাদের মহাবিশ্ব খুব বেশি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, যা আমাদের মহাবিশ্বের অস্তিত্বকেই হুমকির মাঝে ফেলে দেয়। উপরন্তু ২০১৬ সালে এসে রাশিয়ান পদার্থবিদ ভ্যালেরি রুবাকোভ এবং আরো কয়েকজন পদার্থবিদ মিলিতভাবে ‘নো গো থিওরেম’ নামে একটি থিওরেম প্রমাণ করে দেখান, যা বিগ বাউন্সের প্রস্তাবিত মডেলগুলোর মাঝের অনেকগুলোকেই সরাসরি বাতিল করে দেয়।

এরপর গত বছর পদার্থবিদ ইজ্জাস এমন এক বিগ বাউন্সের মডেল খুঁজে পান যা ভ্যালেরি রুবাকোভের ‘নো গো থিওরেম’কে ফাঁকি দিতে পারে। আর তার এই মডেল থেকে সৃষ্টি হওয়া মহাবিশ্বও বেশ স্থিতিশীল হয়। যা বিগ বাউন্স মডেলের সমর্থকদের জন্য বেশ স্বস্তিদায়ক এক বিষয়। এখনো পর্যন্ত এই মডেলকেই বিগ বাউন্সের সবচেয়ে সেরা মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আর বিগ বাউন্সের নতুন দুটি প্রস্তাবনার ক্ষেত্রেই যে বিষয়টি একই তা হলো দুটি প্রস্তাবনাই সিঙ্গুলারিটিকে ফাঁকি দিতে পারে, যার অর্থ আমরা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি বা, মহাকর্ষের সাধারণ তত্ত্ব দিয়েই এই বিগ বাউন্সকে ব্যাখ্যা করতে পারি। মহাকর্ষের কোয়ান্টাম চরিত্র নিয়ে চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

এখন দেখার বিষয় পদার্থবিদদের সবচেয়ে পছন্দের এবং এখনো পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব ইনফ্লেশান ভবিষ্যতে সত্য প্রমাণিত হয় নাকি বিগ বাউন্স মডেল সত্য হিসেবে আবির্ভূত হয়।

featured image: quantamagazine.org

Written by Ahmed Estiak Bidhan

Student of Department of Physics, Shahjalal University of Science and Technology, Sylhet.

বাংলাদেশে তৈরি হলো প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত কিবোর্ড

কাগজের আঘাতে আঙুল কেটে গেলে তা কেন অধিক পীড়াদায়ক?