in

প্লুটোর রয়েছে বালিয়াড়ি— তবে বালির নয়

প্লুটোর চাঁদ ক্যারন এবং প্লুটো থেকে সূর্য যেমন দেখতে (ছবি শিল্পী কর্তৃক অনুপ্রাণিত); image source: European Southern Observatory.

প্লুটো প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্বলিত এক ভুতুড়ে উপত্যকাময় জগত। প্লুটোর পাহাড়গুলো দেখলে পৃথিবীর কথা ভেবে ভ্রমও হতে পারে।

নাসার নিউ হরাইজন মিশন, যেটি কিনা ২০১৫ এর জুলাইতে এই বামন গ্রহের কাছ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল তখন বহু উচ্চমানের ছবি পাঠায়। উল্লেখ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রই হল ছবি। সে ছবিগুলোতে দেখা গিয়েছিল প্লুটো যেন পর্বতময়, তবে কিন্তু পাথরের পর্বতের পরিবর্তে বরফ-পর্বত। রয়েছে জমাট নাইট্রোজেনের বিস্তীর্ণ সমভূমি এবং নীল রঙের আকাশ যার অধীন ধোঁয়াশাময় বায়ুমণ্ডল। প্লুটোর বায়ুমণ্ডলে তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রায় অক্সিজেনও রয়েছে। প্লুটোর আকাশ নীল হওয়ার কারণ, নাইট্রোজেন, মিথেন এবং অ্যাসিটিলিনের উপস্থিতি।

বালিয়াড়ি বা ঢিবি হচ্ছে সমতল অপেক্ষা উঁচু এমন জায়গা যা বায়ুপ্রবাহে ক্রমাগত ক্ষয় হতে থাকে। প্লুটোর ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে তেমন তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে প্লুটো ঢিবিময়। কিন্তু এ ঢিবিগুলোর পারিপার্শ্বিক বায়ুপ্রবাহ বরফের। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লুটোর আবহাওয়া এবং ভূমিপৃষ্ঠ এমনভাবে আচরণ করে যেন ভূতাত্ত্বিক হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে। মনে হবে যেন ভূপৃষ্ঠটাই বদলে গেছে।

যেখানে পর্বত মিশেছে সমভূমির সাথে

ইংল্যান্ডে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব প্লেমাউথের ভৌত ভূগোলবিদ্যার অধ্যাপক ম্যাট টেফলার এবং তার সহকর্মীরা নিউ হরাইজনের তোলা ছবিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। তারা প্লুটোর স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়া অববাহিকায় মিশ্র ঢাল লক্ষ্য করেন। ঢালটি প্রায় ১০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়া হচ্ছে প্লুটোর বরফাচ্ছাদিত এলাকা। এই ঢাল গঠিত নাইট্রোজেনের বরফে যা কিনা প্লুটো বিখ্যাত “হৃদপিণ্ড” (Heart shape region) এলাকার বাম দিকে অবস্থিত।

স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়া অঞ্চল প্লুটোর যেখানে; image source: NASA.

এই ঢেউ খেলানো ঢিবিগুলো স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়ার পশ্চিম তীর দিয়ে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার প্রশস্ত, যেখানে সমভূমি থেকে আল-ইদ্রিসি মন্টেস পর্বতের উচ্চতা পরিসর ৫ কিলোমিটার। নতুনভাবে শনাক্ত করা ঢিবিগুলোর বৈশিষ্ট্য  দেখে মনে হচ্ছে এগুলো বায়ুপ্রবাহের কারণে ঢিবির আকার পেয়েছে।

এই বালিয়াড়ি বা ঢিবিগুলো পৃথিবীরগুলোর চেয়ে বেশ সরল বরং। কারণ বরফের তৈরি হলেও পৃথিবীতে যেমন জমাট বরফের স্রোত তৈরি (Glacial Movement) খুব নিয়মিত এখানে তেমনটা নয়।  অবস্থান, বিন্যস্ততা, দিকমুখিতা এবং এলাকা ভিত্তিক পরিবর্তন আর ফাঁকা স্থান সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে এরা বহুকাল ধরে এই এলাকাতেই থিতু রয়েছে।

পর্বতের ঢাল থেকে মিথেন এবং নাইট্রোজেন গ্যাসের উর্ধ্বপাতনের ফলে খাদ তৈরি হতে পারে সূর্যকিরণের প্রভাবে। যথেষ্ঠ পরিমাণ বরফ জাতীয় পদার্থ যদি তাপের কারণে কঠিন দশা থেকে গ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তাহলে সে ধরণের খাদ তৈরি হতে পারে। নিউ হরাইজনের ছবিসমূহে প্রতীয়মান হয় এমন সহস্র অবনমন রয়েছে স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়ায়। আর লাইন ধরে ধারাবাহিক খাদগুলো ঢিবি বৈশিষ্ট্যের জন্য সবচেয়ে শক্ত ব্যাখ্যা দেয়।

গবেষকরা ঢিবির জন্য উর্ধ্বপাতনকে ধরছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে। কম্পিউটারে অনুরূপ মডেল তৈরি করে সিমুলেশন করে দেখা গেছে প্লুটোর এই দুর্বল বায়ুপ্রবাহও বালিয়াড়ি বা ঢিবি তৈরি জন্য যথেষ্ঠ। প্লুটোর বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর মত এত পুরু নয়। এ কারণে এর বায়ুচাপ খুবই কম। আবার প্লুটোর অভিকর্ষও কম, পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ৬ শতাংশ।সূর্যের অধিক দূরত্বে থাকার প্রভাব। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের চল্লিশগুণ দূরে অবস্থিত এই বামন গ্রহ। অতএব, পৃথিবীর তুলনায় প্লুটোতে সূর্যের তাপ হবে ১৬০০ গুণ কম! এরই সাথে চাপ কম হওয়ায় এর পরিবেশ উর্ধ্বপাতনসুলভ। [উল্লেখ্য, প্লুটোর তাপমাত্রা -২২৫° সেলসিয়াস থেকে -২৪০° সেলসিয়াস]

যে বায়ুপ্রবাহ বয়ে যায় সেটি মূলত জমাট মিথেনের দানা। সাথে নাইট্রোজেনের উপস্থিতি থাকাও স্বাভাবিক। মিথেনের জমাট দানা উর্ধ্বপাতিত হয়েছে নিকটবর্তী পর্বত এলাকা থেকে।

আমরা চাঁদের গায়ে অনেক গর্ত দেখে থাকি যেগুলো মহাকাশ থেকে পড়া উল্কাপিণ্ডের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়ায় তেমন গর্ত দেখা যায় না। চাঁদের ভূমির সাথে বায়ুমণ্ডলের কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে প্লুটোর ঐখানে গর্ত না থাকা ভূপৃষ্ঠে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আর ঢিবিগুলো সেখানে বিগত পাঁচ লক্ষ বছরে গঠিত হয়েছে বলে গবেষক দল জানিয়েছে।

প্লুটোর বালিয়াড়ি বা ঢিবি কেন চমকে দিল বিজ্ঞানীদের

বালিয়াড়ি বা ঢিবি গঠিত হবার প্রক্রিয়া সৌরজগতজুড়ে একই। এধরনের প্রক্রিয়ায় পৃথিবী, মঙ্গল, শুক্র, শনির বিশাল চাঁদ টাইটানে ঢিবির গঠন পাওয়া গিয়েছে। গ্রহ-উপগ্রহ ছাড়াও চুরিওমোভ গেরাসিমেঙ্কো ধূমকেতুতেও ঢিবির দেখা পাওয়া গিয়েছে। সেটা ধরা পড়েছিল ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত পরিচালিত ইউরোপের রোজেটা মিশন থেকে।

কিন্তু প্লুটোর ক্ষেত্রে এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল দুর্বল অভিকর্ষক্ষেত্র, পাতলা বায়ুমণ্ডলের কারণে। এ দুইয়ে মিলে প্লুটোর বায়ুচাপ দাঁড়ায় মাত্র ১ প্যাসকেল, অর্থাৎ প্লুটোয় প্রতি বর্গমিটারে বায়ু মাত্র ১ নিউটন চাপ দেয়। আর পৃথিবীর তুলনায় সেটা ১ লক্ষ গুণ কম। এ গবেষণার সাথে যুক্ত নন এমন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলেকজান্ডার হায়েস মনে করেন এই বিশ্লেষণ আমাদের দৃষ্টিকোণকে আরো গভীর করে তুলবে। কারণ, এই নিয়ামকগুলো দিয়ে আমরা ধরে নিয়েছিলাম সেখানে এ ধরনের পরিবেশ থাকা সম্ভব নয়। অথচ পরবর্তীতে একই নিয়ামকগুলো দিয়ে কারণ যাচাই করা গিয়েছে।

ছবির একেবারে নিচের দিকে অল্প যেটুকু সমতল জায়গা দেখা যাচ্ছে সেখানে খেয়াল করলে কিছু আঁচড়ের মত মনে হবে। দূর থেকে ঢিবিগুলোকেই এমন দেখা যাচ্ছে; image source: NASA/Jet Propulsion Labratory.

টেফলার এই বিশ্লেষণের গণিতের কথা স্মরণ করেছেন। কারণ কম্পিউটার সিমুলেশন না করে এটা কল্পনা করা কঠিন ছিল যে এরা কিভাবে বায়ুপ্রবাহের প্রভাব তৈরি করতে পারে। তবে হায়েস মনে করেন এ নতুন গবেষণা প্লুটোর ঢিবির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

তার মতে, প্রকৃতি চায় বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সরলতর গঠন এবং নকশায় রূপ নিতে। অনুরূপভাবে, এই গবেষণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে যথেষ্ঠ পরিমাণ কাজ বাকি রয়েছে। বিশেষ করে, ঢিবিগুলোর উচ্চতা ঠিক কত, সেগুলো কখন সবচেয়ে সক্রিয় ছিল, তারা পরিবর্তন হয় কি না, হলে কী হারে ইত্যাদি বিষয় সূক্ষ্ম যাচাই প্রয়োজন।

ইতোমধ্যে নিউ হরাইজন বেশ দূরে চলে গেছে। নিউ হরাইজনের পরবর্তী লক্ষ্যের নাম ২০১৪ এমইউ৬৯ যেটি প্লুটো থেকে ১ বিলিয়ন মাইল (১৬০ কোটি কিলোমিটার) দূরে।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://www.scientificamerican.com/article/pluto-has-dunes-but-theyre-not-made-of-sand/
  2. https://news.nationalgeographic.com/2018/05/pluto-dunes-methane-winds-new-horizons-space-science/
  3. http://science.sciencemag.org/content/360/6392/992.full

Written by Shahriar Kabir Pavel

Senior Year, Department of Physics, Shahjalal University of Science and Technology.

বাইপোলার ডিজঅর্ডার বা, দ্বিমেরু ব্যাধিঃ ভিন্ন রকম এক মানসিক সমস্যা

দুধ সাদা, কিন্তু সাদা দুধের মাখন কেন হলুদ