in

সেই বিজ্ঞানী যিনি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ এবং প্লুটো প্রায় আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন

পৃথিবীতে অনেক বিজ্ঞানীই রয়েছেন। কিন্তু অভাগা বিজ্ঞানী রয়েছেন কয়জন? সেই অভাগা বিজ্ঞানীদের একটা তালিকা করতে গেলে ভেস্টো মেলভিন সিলফারের নাম মনে হয় প্রথম দিকেই আসবে।

Vesto Melvin Slipher (1875-1969), one of astronomy's great unsung heroes. (Credit: Lowell Observatory)
ভেস্টো মালভিন সিলফার

আগের লেখাতে আমরা দেখেছি তিনিই গ্যালাক্সিগুলো যে দূরে সরে যাচ্ছে তা প্রথম পর্যবেক্ষণ করেন। তিনিই গ্যালাক্সির রেড শিফটের আবিষ্কর্তা। কিন্তু তিনি তার তথ্যগুলোকে নির্দিষ্ট কোন ছক বা, সূত্রে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন না, যা করতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানী হাবল। তাই ইতিহাস বিজ্ঞানী হাবলকে এক মহানায়ক হিসেবে মনে রাখলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভেস্টো মেলভিন সিলফারের কথা অনেক জ্যোতিপদার্থবিদরাও হয়ত জানেন না। বিষয়টাকে তার দুর্ভাগ্যই বলতে হবে।

আরেকবার মহানায়ক হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌছে গিয়েছিলেন সিলফার। এই কাজটি করতে পারলেও তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে যেতে পারতেন। আজ আমরা শুনব সেই কাহিনী।

বর্তমানে সবাই ক্লাইড ডব্লিউ টমবাউকে প্লুটোর আবিষ্কর্তা হিসেবে জানে। কথাটি সত্য। কিন্তু এর পেছনেও আছে লম্বা ইতিহাস।

সিলফার আসলে লয়েল অবজারভেটরিতে লয়েলের অধীনে কাজ করতেন। লয়েলের অনেক ইচ্ছা ছিল নেপচুনেরও পরে কোন গ্রহ খুঁজে বের করা। লয়েল ১৯১৬ সালে মারা যান। লয়েলের সম্মানে সিলফার ১৯২৯ সালে প্ল্যানেট এক্সের খুবই শৃঙ্খলাবদ্ধ খোঁজ শুরু করলেন। প্লুটোর খোজের জন্য আকাশের প্রতি ইঞ্চি ইঞ্চি জায়গার ছবির দরকার ছিল। এ ছবিগুলো প্রতি সপ্তাহে সংগ্রহ করা হত এবং একটা অস্পষ্ট কিন্তু গতিশীল বস্তু খোজা হচ্ছিল। তিন লাখ তারার মাঝে এমন ছবি তোলা খুবই পরিশ্রমের এবং ধৈর্য্যের কাজ ছিল। সুতরাং সিলফার  ক্লাইড ডব্লিউ টমবাউকে এ কাজের জন্য নিযুক্ত করলেন। টম্বাউ এর বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। সে খুবই নতুন জ্যোতির্বিদ ছিল। কিন্তু সে ছিল সঠিক ফলাফলের প্রতি খুঁতখুঁতে। তার ধৈর্য্যও ছিল অসীম। এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করেই সিলফার তাকে কাজটি দেন।

Image result
ক্লাইড ডব্লিউ টমবাউ

লয়েল বের করেছিলেন যে প্ল্যানেট এক্সকে যদি খুঁজে পাওয়া যায় অবে তাকে জেমিনি নক্ষত্রপুঞ্জের মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে। লয়েল যেসব যুক্তি ব্যবহার করে এটা বের করেছিলেন তা ছিল ভুলে ভরা। কিন্তু তিনি চরমমাত্রার ভাগ্যবান হিসেবে আবির্ভূত হলেন। ভুলভাল হিসাব নিকাশ আর যুক্তির পরও তার ধারণা সঠিক ছিল। সিলফার লয়েলের বলে দেয়া জায়গাটাতেই প্ল্যানেট এক্সকে খোঁজার কাজ শুরু করেন। টমবাউ ছবিগুলো নিত এবং সেগুলো পরীক্ষা করে দেখত। সিলফারের পদ্ধতিটি ছিল আকাশের একই জায়গার ভিন্ন সময়ের এক জোড়া ছবি বার বার দেখে কোন পার্থক্য পাওয়া যায় কিনা তা বের করা, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ব্লিঙ্কিং পদ্ধতি বলে। যদি কোন গ্রহ তারা গুলোর মাঝ দিয়ে ঘুরে বেড়ায় তাহলে তাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার অস্তিত্ব ধরা পড়ার কথা এ পদ্ধতিতে।

কিন্তু সিলফার তখন লয়েল অবজারভেটরির প্রধান ছিলেন। তার এর বাইরেও অনেক অনেক কাজ ছিল। তিনি বেশ কয়েক সপ্তাহ জেমিনি নক্ষত্রপুঞ্জের আশে পাশে প্ল্যানেট এক্সকে খুঁজে বেরালেন এবং অবশেষে অবজারভেটরির প্রধান হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্বের চাপে এক পর্যায়ে এসে প্ল্যানেট এক্সকে খোঁজা বাদ দিয়ে দিলেন। তিনি সম্পূর্ণ প্রজেক্টটি টমবাউ এর হাতে তুলে দিলেন। দায়িত্ব নিয়ে টমবাউ বুঝলেন সিলফার একটু দ্রুতই একের পর এক ছবি নিয়েছিলেন। এত দূরের অস্পষ্ট এক প্ল্যানেট এক্সকে খুঁজে বের করতে হলে আরো দীর্ঘ সময়ের বিরতিতে ছবি তুলতে হবে। টমবাউ আবার প্রথম থেকে ছবি নেয়া শুরু করলেন।

Discovery photos of Pluto, taken by Clyde Tombaugh under Vesto Slipher's direction. (Credit: Lowell Observatory)

১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩০। এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। টমবাউ প্লুটো আবিষ্কার করলেন। খুঁজে পেলেন সঊরজগতের নবম গ্রহ। সিলফার যেখানে গ্রহটি খুজছিলেন তার ঠিক কাছেই। অনেকেই বলে থাকে সিলফার আগেই গ্রহটি দেখেছিলেনও, কিন্তু আসলে বুঝতে পারেননি।

Image result
তৎকালীন পত্রিকায় প্লুটো আবিষ্কারের খবর

টমবাউ প্লুটোর আবিষ্কর্তা হয়ে গেলেন। সিলফার কিন্তু ব্যররথ হওয়াতে হতাশা বা, কোনরকম অনুশোচনা প্রকাশ করলেন না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি এ আবিষ্কারের কোনরকম আংশিক কৃতিত্বও দাবী করলেন না। তিনি জোর করে পুরো বিষয়টি কেড়েও নেননি। তিনি সহজেই এটা বলতে পারতেন যে টমবাউ তার নিযুক্ত সহকারি ছিল, যে তার প্রজেক্টে কাজ করছে মাত্র, যা পুরোপুরি সত্য একটি কথা। এমনকি সিলফার তখন বেশ বড় রকমের পদার্থবিদ হলেও টমবাউ ছিলেন মাত্র ২৪ বছরের এক তরুণ। সুতরাং প্লুটো আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিজের করে নেয়া খুব একটা কঠিন ছিল না সিলফারের জন্য।

কিন্তু সিলফার ছিলেন বেশ ভদ্র এবং সৎ লোক। অথচ প্লুটো আবিষ্কারে তার অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তারপরও মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ আর প্লুটো উভয় আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি থেকেও নিজেই সেটা ঠিকমত বুঝতে না পারায় সিলফার ইতিহাস থেকে প্রায় মুছে যাওয়া এক বিজ্ঞানীর নামই হয়ে আছে।

Written by Ahmed Estiak Bidhan

Student of Department of Physics, Shahjalal University of Science and Technology, Sylhet.

প্রাগৈতিহাসিক ওষুধপত্র

জীবন্ত শৈবালের বসতবাড়ি