একই নক্ষত্রে সাতটি প্রাণবান্ধব গ্রহের সন্ধান

জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূচনালগ্ন থেকেই মহাকাশ অনুরাগীদের মনে একটা প্রশ্ন বারবার উঁকি দিয়ে গেছে, এই অনন্ত মহাবিশ্বে আমরা কি একা? মহাবিশ্বের কোনো এক অজানা প্রান্তের নীল সবুজ গ্রহটিতেই কি প্রাণের স্পন্দন সীমাবদ্ধ?

এসকল প্রশ্ন আসলে নিজেদেরই অস্তিত্বের প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্যই বছরের পর বছর বিজ্ঞানীরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারই ফলশ্রুতিতে সন্ধান মিলল TRAPPIST-1 নামক এক অনুজ্জ্বল লোহিত বামন নক্ষত্র যার চারপাশে আবর্তন করছে একটি নয় দুটি নয় সাত সাতটি গ্রহ। এদের প্রত্যেকটিতেই প্রাণের সঞ্চারণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান। এর মধ্যে অন্তত তিনটি গ্রহে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা প্রবল। সহজেই বোঝা যাচ্ছে এই আবিষ্কারের খবর বিজ্ঞান মহলে কতটা উন্মাদনার সৃষ্টি করেছে।

এক্সোপ্লানেট বা বহির্গ্রহের সন্ধান পাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক যুগে অসংখ্য বহির্গ্রহের সন্ধান মিলেছে। ওপেন এক্সোপ্লানেট ক্যাটালগ অনুযায়ী সন্ধান পাওয়া প্রাণবান্ধব গ্রহের সংখ্যা ৩ হাজার ৪০০। এমনকি গত বছরেই সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টারির পাশেই পাওয়া গিয়েছিল দুটি বাসযোগ্য গ্রহ।

তবে TRAPPIST-1 এর মতো একসাথে এতোগুলো প্রাণবান্ধব গ্রহের সন্ধান এই প্রথম মিললো। TRAPPIST-1 একটি অনুজ্জ্বল ও তীব্র শীতল লোহিত বামন নক্ষত্র যা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। মাইলের হিসেবে সেটি হবে প্রায় ২৩৫ ট্রিলিয়ন মাইল। আকারে বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে সামান্য বড় এই নক্ষত্রের ভর সূর্যের ভরের প্রায় ৮ শতাংশ। আর এর উজ্জ্বলতা সূর্যের প্রায় ০.০৫ শতাংশ। নক্ষত্রের উপরিতলের গড় তাপমাত্রা ৪ হাজার ১৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট।

TRAPPIST-1 নিয়ে সর্বপ্রথম কাজ করে একই নামের একটি রবোটিক টেলিস্কোপ যা চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত। ট্রাপিস্ট এর পূর্ণরূপ Transiting Planets & Planetesimals Small Telescope। পরবর্তীতে নাসার স্পিটজার স্পেস টেলিস্কোপ এই নক্ষত্র ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা শুরু করে। এ ধরনের বামন নক্ষত্রের সংখ্যা গ্যালাক্সিতে সর্বাধিক। তাই বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান করার সময় এই নক্ষত্রগুলোর দিকে নজর দেয়াই সবচেয়ে ফলপ্রসূ।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্পিটজার টেলিস্কোপ একটানা প্রায় ২০ দিন এই ছোট্ট নক্ষত্রটির উপর নজরদারি করে অসাধারণ কিছু ফলাফল পায়। ২০ দিনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নক্ষত্রটির আলো কিছু সময় পর পর একবার উজ্জ্বল একবার অনুজ্জ্বল হচ্ছে।

এরকম ঘটনা ঘটলো প্রায় ৩৪ বার। এর মানে হচ্ছে নক্ষত্রকে আবর্তনকারী কোনোকিছু একটু পরপর নক্ষত্র থেকে আলো আসতে বাধা দিচ্ছে। গবেষকরা এ থেকে ধারণা করেন যে একের অধিক গ্রহ এই নক্ষত্রটিকে ঘিরে আবর্তন করছে। এরাই আলোর এই উঠানামার জন্য দায়ী।

চিত্র: উজ্জ্বল-অনুজ্জ্বল। প্রাথমিক অবস্থায় টেলিস্কোপের চোখে
যেমন ছিল গ্রহগুলোর রূপ।

প্রথম অবস্থায় তিনটি গ্রহের ধারণা করা হলেও গত ২২ ফেব্রুয়ারী ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধে ৭টি গ্রহের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। সাতটি গ্রহই আকারে প্রায় একইরকম এবং এরা স্বল্প ব্যাসার্ধের উপবৃত্তাকার পথে নক্ষত্রটির চারপাশে ঘোরছে।

গ্রহগুলোর বর্ণালী বিশ্লেষণের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নক্ষত্রের নিকটতম দুটি গ্রহের কোনোটির বায়ুমণ্ডলেই হাইড্রোজেন গ্যাসের পুরো বলয় নেই। এই তথ্য থেকে ধারণা করা যায়, গ্রহ দুটি গ্যাসীয় অবস্থায় নেই। তাদের রয়েছে পৃথিবীর মতো পাথুরে ভূমি। কেন্দ্র থেকে চতুর্থ, পঞ্চম এবং ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা তিনটি গ্রহই নক্ষত্রটির “হেবিটেবল জোন” বা প্রাণ গঠণের জন্য উপযুক্ত অবস্থানে অবস্থিত। এমনও হতে পারে, তিনটি গ্রহের প্রত্যেকটিরই রয়েছে পৃথিবীর মতো সমুদ্র, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেনের সমন্বয়ে তৈরি বায়ুমণ্ডল। এসব উপাদানগুলোই প্রাথমিক অবস্থায় পৃথিবীতে প্রাণ সঞ্চারণের জন্য দায়ী ছিল।

গ্রহগুলোর উপবৃত্তাকার পথ খুব ছোট হওয়ায় তাদের আবর্তনকালও খুব সংক্ষিপ্ত। ভেতরের দিকে সবচেয়ে কাছের গ্রহটির আবর্তনকাল মাত্র ১.৫ দিন আর সবচেয়ে দূরে অবস্থিত গ্রহটির জন্য তা মাত্র ২০ দিন। নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করার কারণে গবেষকরা ধারণা করছেন যে প্রতিটি গ্রহই নক্ষত্রটির সাথে গ্র্যাভিটেশনালি লকড। অর্থাৎ তাদের একটা পাশ সর্বদাই নক্ষত্রটির দিকে মুখ করে থাকে। ঠিক যেমনটা পৃথিবী আর চাঁদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। চাঁদের কিন্তু এক পিঠই আমরা সবসময় দেখতে পাই। অপর পিঠ কখনোই দেখা যায় না।

এরকম হলে গ্রহগুলোর ঐ দুই পৃষ্ঠের সামগ্রিক আবহাওয়ায় ব্যাপক পার্থক্য থাকতে পারে যা প্রাণ গঠনের জন্য অনুকূল নাও হতে পারে। তবে গবেষকরা আশার বাণী দিয়েছেন যে, যদি পৃথিবীর মতো সুগঠিত বায়ুমণ্ডল থাকে তবে ঐ বায়ুমণ্ডলই তাপ পরিবহনের মাধ্যমে গ্রহগুলোর উভয় পৃষ্ঠে তাপীয় ভারসাম্য বজায় রাখবে।

কেউ যদি ঐ গ্রহগুলোর কোনো একটিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায় তাহলে সে চাঁদের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ আকারের আরো ৬টি উজ্জ্বল গ্রহ দেখতে পাবে। কী অদ্ভুত সুন্দর! TRAPPIST-1 নিয়ে আশাবাদী হবার আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে এর দীর্ঘ আয়ুষ্কাল। যেখানে আমাদের সূর্যের আয়ু আর মাত্র ১০ বিলিয়ন বছর সেখানে TRAPPIST-1 বেঁচে থাকবে আরো প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন বছর!

ট্রাপিস্ট- ১ এর সাতটি গ্রহ আবিষ্কারের মাধ্যমে মহাবিশ্বে প্রাণের সন্ধান নতুন করে বেগ পেলো। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো এই অভিযান খুব দ্রুততর হচ্ছে না, তবে প্রতি মুহুর্তেই তা একটু একটু করে নতুন উদ্যম পাচ্ছে। আগামী বছরেই নাসা তাদের বহুল আলোচিত জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ প্রক্ষেপণের পরিকল্পনা নিয়েছে।

এই শক্তিশালী টেলিস্কোপ ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করে তথ্য পাঠাতে সক্ষম, যা বামন নক্ষত্র এবং বাহ্যগ্রহ থেকে আসা ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে আরো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে পারবে। জেমস ওয়েব, হাবল স্পেস টেলিস্কোপ সহ আরো অসংখ্য প্রযুক্তির সমন্বয় আমাদের দৃষ্টি সহায়ক হয়ে মহাবিশ্বে প্রবল আকাঙ্খিত সেই প্রাণ স্পন্দনের সন্ধানে নতুন দিগন্তের উন্মেষ ঘটাবে। এখন শুধুই অপেক্ষার পালা। কে জানে, ৪০ আলোকবর্ষ দূরে কেউ কেউ হয়ত আমাদের সন্ধানে বসে আছে।

তথ্যসূত্র

নিউ ইয়র্ক টাইমস

দ্য গার্ডিয়ান

IFLScience

featured image: sciencealert.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *