মহাকাশ

বিগ ব্যাং এর সাবেক প্রতিদ্বন্দীঃ স্টেডি স্টেট থিওরি

আমাদের মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরি হয়েছে এ প্রশ্ন সব যুগেই মানুষকে ভাবিয়েছে। এ চিন্তা-ভাবনার চূড়ান্ত রুপ আমরা দেখতে পাই গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে এসে। আমাদের মহাবিশ্ব বিষয়ক একই সাথে দুটি চমৎকার থিওরি এ সময় বীর দর্পে তাদের জৌলুস দেখিয়েছে। এ দুই থিওরির একটি ছিল বিগ ব্যাং। আরেকটি হল স্টেডি স্টেট থিওরি।

আধুনিক যুগের এই দুই তত্ত্বের মাঝে যুদ্ধ আমাদের যেনো প্রাচীনকালের সূর্যকেন্দ্রিক নাকি পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব দুটির মাঝের যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিগ ব্যাং সম্বন্ধে তো আজ আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু কি বলে স্টেডি স্টেট থিওরি? চলুন জেনে নেয়া যাক স্টেডি স্টেট থিওরি আমাদের কি বলে এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মহাবিশ্বের এ মডেলটি তৈরি করেছিলেন হারমান বন্ডি, থমাস গোল্ড এবং ফ্রেড হয়েল। স্যার হারমান বন্ডি ছিলেন একজন গণিতবিদ এবং জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির উন্নতিতেও বেশ অবদান রেখেছিলেন।

Image result for Hermann Bondi

চিত্রঃ হারমান বন্ডী

থমাস গোল্ড ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন। স্টেডি স্টেট থিওরির আরেক জনক ছিলেন ফ্রেড হয়েল। তিনিও একজন জগৎবিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর হয়েল আর বন্ডী ক্যাম্ব্রিজে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে থমাস গোল্ডও ক্যাম্বিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে কাজ শুরু করেন। গোল্ড সেখানেই হয়েল আর বন্ডীর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। তারা রেড শিফট বা, লাল অপভ্রংশ আর হাবলের নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। এ আলোচনায় তাদের তিনজনকেই একই বিন্দুতে এনে মেলাল। তিন জনই জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং থিওরিকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন।

Image result for thomas gold astronomer

চিত্রঃ থমাস গোল্ড

Image result for fred hoyle

চিত্রঃ ফ্রেড হয়েল

যেই ভাবা সেই কাজ। পদার্থবিদদের তো আর বসে থাকলে চলে না। শুধু ভুল ধরলে বা সন্দেহ করলেই তো চলে না। আরেকটি বিকল্প তত্ত্বও তো দিতে হবে!! তারা লেগে গেলেন সেই কাজে। ১৯৪৮ সালেই বিগ ব্যাং থিওরির বিকল্প হিসেবে দুটি পেপার পাবলিশ হয়ে গেল। জন্ম হল “স্টেডি স্টেট থিওরি”র। একটি পেপার ছিল গোল্ড আর বন্ডির, আরেকটি হয়েলের লেখা।

আজ তাদের সেই তত্ত্বের মূল কথা বলেই শেষ করব। হাবলের নীতি থেকে তারা জানতেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং তাদের দেয়া মডেলও এই পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। তাই গোল্ড আর বন্ডি বললেন যদিও মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু তা দেখতে কোন রকম পরিবর্তন হচ্ছে না। সবসময় একই রকম থাকছে। মহাবিশ্বের কোন শুরুও নেই, কোন শেষও নেই। তারা “পার্ফেক্ট কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপল” নামে একটি নীতির প্রস্তাব করলেন। তাদের এই নীতি বলে আমাদের এ মহাবিশ্ব “হোমোজেনিয়াস” এবং “আইসোট্রপিক”। সোজা বাংলায় বললে আমাদের মহাবিশ্ব সব জায়গায়, সব দিকে একই রকম (বড় স্কেলে)। এটিকে দেখতে আজ যেরকম লাগছে বিলিয়ন বছর আগেও এমনই ছিল, আর বিলিয়ন বছর পরেও এমনই থাকবে। তাই এ তত্ত্বের নাম স্টেডি স্টেট থিওরি।

বিষয়টা বুঝতে গেলে আমরা একটি রুপক ব্যবহার করব। আমাদের মহাবিশ্বকে আমরা একটা প্রবাহমান নদীর মত চিন্তা করতে পারি। নদীর পানির অণুগুলো কিন্তু দূরে সরে যাচ্ছে, তারপরও নতুন পানির অণু এসে সেই স্থান পূরণ করে ফেলে। আর আমাদের কাছে নদীটিকে সবসময় সবদিক থেকে দেখতে একই রকম লাগে। ঠিক যেনো স্টেডি স্টেট থিওরির প্রস্তাবিত মহাবিশ্বের মত।

এখন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, হাবলের নীতি বলে আমাদের এই মহাবিশ্ব সর্বদাই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব একই রকম থাকে কেমন করে? এটারও একটা সমাধান দেন বন্ডি, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ী। তারা বলেন আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু এর ঘনত্ব সবসময় একই রকম থাকছে। অর্থাৎ, সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট হওয়া ফাঁকা স্থানে সর্বদাই আগের পরিমাণে পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সবসময় একই রকম থাকছে।

Image result for steady state theory vs big bang theory

বিষয়টা এমন যে, আমরা একটা বালতিতে কিছু পানি নিলাম। তারপর এতে কিছু চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু শরবত তৈরি করলাম (আমাদের মহাবিশ্ব অবশ্যই শরবতের মতই সুস্বাদু)। মহাবিশ্বের প্রসারণকে আমরা বালতিতে বাইরে থেকে পানি ঢালার সাথে তুলনা করতে পারি। মহাবিশ্বের প্রসারণ হওয়ার অর্থ শরবতে আরো পানি যোগ করা। ফলে শরবতের ঘনত্ব কমে লঘু হয়ে যাবে। হাবলের নীতি সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বেরও পদার্থের ঘনত্ব কমার কথা।কিন্তু স্টেডই স্টেট থিওরির মতামত হল আমাদের মহাবিশ্বের ঘনত্ব সর্বদা একই থাকবে।  স্টেডি স্টেট থিওরি বলল মহাবিশ্বের প্রসারণের সময় আসলে দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে নতুন গ্যালাক্সির তৈরি হয়।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, আপনি শুধু শরবতে পানিই যোগ করছেন না, এর সাথে সাথে আগের অনুপাতেই চিনিও যোগ করে চলেছেন। ফলে শরবতের মিষ্টতা এবং ঘনত্ব আগের মতই আছে।

আমরা আজ স্টেডি স্টেট থিওরির মূল কথা এবন এর সাথে জড়িত বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে জানলাম। পরবর্তিতে আমরা এ বিষয়ে আরো কিছু জানার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top