ভয়েজার মহাকাশযানের আদি-অন্ত

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে অবস্থান করেই শত আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেছেন। কিন্তু মানুষের প্রেরিত কোনো বস্তু সেই তুলনায় খুব অল্প দূরত্বই অতিক্রম করতে পেরেছে। মানুষের প্রেরিত কোনো বস্তুর মাঝে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছে মহাকাশযান ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২। এ দুটি যান সৌরজগতের সীমানা শেষ করে এখন অনন্ত নক্ষত্রবীথির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

ভয়েজার আজ সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শুরুতে এর উদ্দেশ্য একদমই এরকম ছিল না। বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভয়েজার-১ কে আগস্ট ১৯৭৭ সালে ও ভয়েজার-২ কে একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে উৎক্ষেপণ করা হয়।

মার্চ ১৯৭৯ সালে ভয়েজার-১ বৃহস্পতি গ্রহ ও নভেম্বর ১৯৮০ সালে শনি গ্রহ অতিক্রম করে। জুলাই ১৯৭৯ সালে ভয়েজার-২ বৃহস্পতি গ্রহ ও আগস্ট ১৯৮১ সালে শনি গ্রহ অতিক্রম করে। পরবর্তীতে এটি প্রথম মহাকাশযান হিসেবে ১৯৮৬ সালের জানুয়ারিতে ইউরেনাস এবং ১৯৮৯ সালের আগস্টে নেপচুন পর্যবেক্ষণ করে।

মিশন দুটির সাফল্যও অনেক। এ পর্যন্ত তাদের যাত্রাপথে ২৫ টি নতুন উপগ্রহ শনাক্ত করেছে, বৃহস্পতির চাঁদে আগ্নেয়গিরি আবিষ্কার করেছে, চারটি গ্রহের (বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন) বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক ও ভূত্বাত্তিক গঠনের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছে এবং সূর্য হতে নির্গত চার্জিত কণা যা সোলার উইন্ড নামে পরিচিত, সেটির বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছে। এসকল তথ্য আমাদের নতুন ধারণা দেয়।

এতো সাফল্যের পরও সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যটি এখনো আসেনি। সেটি হলো ভিন গ্রহের প্রাণীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা। ১৯৯০ সালে ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ কে সৌরজগতের বাইরের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য নতুন মিশনে যুক্ত করা হয়। দুটি মহাকাশযানকে দুই ভিন্ন দিকে পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য আমরা যেন সৌরজগতের বাইরের বিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারি এবং যদি কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে তাদেরকে যেন আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে জানাতে পারি।

দুটো মহাকাশযানের ভেতরেই স্বর্ণের ডিস্কের ভেতর সুরক্ষিত গ্রামোফোন রেকর্ড আছে। এতে বাংলা সহ ৫৪ টি ভাষায় শুভেচ্ছা, বিভিন্ন সংষ্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন যুগের কিছু গানের নমুনা এবং পৃথিবীতে সৃষ্ট প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট শব্দ অন্তর্ভূক্ত করা আছে। এছাড়াও ১১৭ টি ছবি সংযুক্ত আছে যেখানে পৃথিবী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দেয়া আছে। এই ডিস্কে কিছু ইলেকট্রনিক তথ্যও দেয়া আছে যেন উন্নত প্রযুক্তির প্রাণী থাকলে তারা সেগুলোকে ডায়াগ্রাম ও ছবিতে রূপান্তর করতে পারে।

চিত্রঃ ভয়েজারে স্বর্ণের আবরণ; image source: smithsonianmag.com

ডিস্কগুলো স্বর্ণের প্রলেপ যুক্ত এলুমিনিয়ামের আবরণে সুরক্ষিত। মহাকাশের ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাতে যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সেজন্য এই ব্যবস্থা। এছাড়াও আবরণের ভেতর ও বাইরে রেকর্ড বাজানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডায়াগ্রাম অংকিত আছে। বাইরের ডায়াগ্রাম সময়ের সাথে ক্ষয় হয়ে যেতে পারে, তাই এই ব্যবস্থা। চাইলে ভয়েজারে প্রদত্ত ছবি ও রেকর্ডগুলো সকলেই দেখতে ও শুনতে পারবে। তার জন্য এই ঠিকানায় যেতে হবে http://voyager.jpl.nasa.gov/

১৯৯৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে ভয়েজার-১ সূর্য হতে ১০.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। এটি মানুষের তৈরি কোনো বস্তুর জন্য প্রথম অতিক্রান্ত সর্বোচ্চ দূরত্ব। মগায়াজিনটি হাতে নিয়ে আমরা ১ থেকে ৩ বলার সাথে সাথে ভয়েজার-১ প্রায় ৫২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফেলছে।

এটি সূর্যের সাপেক্ষে সেকেন্ডে প্রায় ১৭.৩ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে। সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে ভয়েজার-২ সূর্য হতে প্রায় ১৬.৮২ বিলিয়ন কিলোমিটার এবং ভয়েজার-১ প্রায় ২০.৪১ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। সৌরজগৎ থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টারিতে পৌছাতে ভয়েজার-১ এর ৭০ হাজার বছর সময় লাগবে!

সৌরজগতে যতদূর পর্যন্ত সূর্যের প্রভাব আছে সেই অঞ্চলকে বলা হয় Heliosphere। এই অঞ্চল প্লুটোর কক্ষপথ থেকেও আরো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে নাসা ঘোষণা করে, ভয়েজার-১ Heliosphere থেকে বের হয়ে গেছে। সেই থেকে এটি আমাদের সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে অনন্ত নক্ষত্রবীথির পাণে ধাবমান। মানবজাতির জন্য এটি অবশ্যই একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

তথ্যসূত্র

  1. http://voyager.jpl.nasa.gov/
  2. http://www.heavens-above.com
  3. http://en.wikipedia.org/wiki/Heliosphere

featured image: irishtimes.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *