মহাকাশে নারী মহাকাশচারীর ঋতুস্রাব জটিলতা

নাসার শুরুর দিকের কাহিনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নাসার প্রকৌশলীদের কাছে নারী মহাকাশচারীদের পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব ছিল বড় ধরনের এক চিন্তার বিষয়। স্যালী রাইড ছিলেন আমেরিকার প্রথম নারী মহাকাশচারী যিনি ১৯৮৩ সালে মহাশূন্যে ভ্রমণ করেন। সাধারণত মহাকাশ ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্য অসংখ্য বিষয় মাথায় রাখতে হয়। অসংখ্য বিষয়ের মাঝে ছিল না নারী সংক্রান্ত বিষয়। যেমন টেমপন (তুলার পট্টি) বা স্যানিটারী ন্যাপকিনের বিষয়টি কেবল তখনই মাথায় আসে যখন দেখা যায় মহাকাশচারী একজন নারী। ঠিক করা হলো স্যালি রাইডের এ মিশনের জন্য স্যানিটারী প্যাডের একটা বিশাল সরবরাহ পাঠানো হবে (এক সপ্তাহের জন্য ১০০ টেমপন)। কারণ প্রকৌশলীরা জানতেন না মহাশূন্য নারীর ঋতুস্রাব কেমন আচরণ করবে।

Image result for sally ride
স্যালি রাইড

নাসার মেডিকেল কর্মকর্তারা অনেক সন্দিহান ছিলেন মধ্যাকর্ষণ বল পিরিয়ডের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। কী ঘটবে যখন মহাকাশে অবস্থানরত নারীর ঋতুস্রাব হবে? কী কী সম্ভাব্য অসুবিধা ও জটিলতা তৈরি করতে পারে সেখানে? এত ভাবনা ও প্রস্তুতির পর দেখা গেল, পৃথিবীতে ঋতুস্রাব আর মহাকাশে ঋতুস্রাবের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। যুগ যুগ ধরে এখন নারী মহাকাশচারীরা শূন্যে অবস্থান ও কাজ করে আসছেন কোনো ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা ছাড়াই।

তবে একটি সমস্যা কিন্তু রয়েই গিয়েছে। আজ পর্যন্ত যত মহাকাশ ভ্রমণ এবং এ সম্পর্কিত তথ্য রয়েছে সবই অল্প দূরত্বে ভ্রমণের ক্ষেত্রে। গবেষকরা এখন নতুন চিন্তায় পড়েছেন যখন দীর্ঘ যাত্রা হবে তখন কী হবে? ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঋতুস্রাবের রক্ত নেয়ার মতো পরিকল্পনা করে বানানো নয়। কারণ এখানের টয়লেট সিস্টেম Water Reclamation System এর সাথে সংযোগ করা। যেখানে প্রস্রাবকে রিসাইকেল করে আবার খাবার উপযোগী পানিতে পরিবর্তন করা হয়।

Water Reclamation System in space

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাও এখানে খুব একটা উপযোগী নয়। কারণ এখানে নেই গোসলের সুব্যবস্থা, নেই পানির অফুরন্ত যোগান। সুতরাং পৃথিবীর মতো উপায়ে মহাকাশে চিন্তা করলে চলছে না। যার কারণে নারী মহাকাশচারীরা গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট বা বড়ি খাওয়ার দিকেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এর ফলে মহাকাশ ভ্রমণ এবং প্রশিক্ষণ উভয় সময়েই তাদের ঋতুস্রাব বন্ধ থাকে।সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ট্যাবলেটগুলোর মাঝে অন্যতম হলো প্রোজেস্টেরন ট্যাবলেট।

দ্বিতীয় ব্যবহারবহুল পদ্ধতিটি হচ্ছে IUCD (Intra Uterine Contraceptive Device)। যেটি একজন ডাক্তারের সাহায্যে জরায়ুতে স্থাপন করা হয় এবং ৩-৫ বছর সহজেই সমস্যাবিহীন ভাবে জরায়ুতে থাকতে পারে। তবে সেটি পিরিয়ড বন্ধ করবে কিনা তা নির্ভর করে কোন ধরনের IUCD ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপর। ২ ধরনের IUCD রয়েছে। ১) হরমনবিহীন; ও ২) হরমোনযুক্ত। হরমোনযুক্ত IUCD ব্যবহার করলে তা পিরিয়ড বন্ধ রাখতে সক্ষম।

 

এরপর আছে ইনজেকশন পদ্ধতিতে। বিশেষ করে ডেপো শট। ‘ডেপো প্রভেরা’ নামক একটি ইনজেকশন রয়েছে যা প্রজেস্টেরনের সমকক্ষ। এটি প্রতি ১২ সপ্তাহে একবার করে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে দিতে হয় এবং ২-৩ বছর পর্যন্ত সমস্যাবিহীনভাবে ব্যবহার করা যায়। ফ্লোরিডার গাইনী বিশষজ্ঞ ‘ক্রিস্টিন জ্যাকসন’-এর মতে বিশেষ ক্ষেত্রগুলোতে পিরিয়ড বন্ধ রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো জন্মনিরোধক পিল অথবা IUCD। তিনি বলেন, “মেয়েদের পিরিয়ড বন্ধ রাখার এ দুটিই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। অসংখ্য মেয়েরা তাদের পিরিয়ডের সময় অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং এর এমন কোনো জরুরী কারণ নেই যে প্রতি মাসেই একজন মেয়ের পিরিয়ড হতে হবে”

তবে কোন পদ্ধতিটি অন্য পদ্ধতির তুলনায় ভালো, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ প্রতিটি নারীই একজন আরেকজন থেকে আলাদা। যা একজনের উপর ভালোভাবে কাজ করে তা আরেকজনের উপর নাও করতে পারে। আবার ক্ষেত্র বিশেষে পদ্ধতির পরিবর্তন হয়। যেমনঃ ডেপো শট যারা ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা যায়। মহাকাশে অবস্থানরত ব্যাক্তিদের মধ্যে হাড় ক্ষয়ে যাওয়া এমনিতেই একটি চিন্তার বিষয়, তার উপর কেউ যদি ডেপো শট ব্যবহার করে তাহলে তা আরো বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। তাই মহাকাশচারীদের ক্ষেত্রে ডেপো শট ব্যবহার না করাই ভালো।

লন্ডনের কিংস কলেজের একটি গবেষণাপত্রে লেখক Varsha Jain বলেন, “সামরিক বাহিনীতে যেসব মহিলা কর্মরত থাকেন, তারাই তাদের মিশন বা প্রশিক্ষণের সময় পিরিয়ড বন্ধ রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আর মহাকাশচারীদের ব্যাপার, যেখানে জীবন খুব সুবিধার না সেখানে এটি বন্ধ করতে চাওয়া খুবই স্বাভাবিক”

আরেক দল গবেষক আরেকটি সমস্যা খুঁজে বের করলেন। তিন বছরের সরবরাহের জন্য এতগুলো জন্মনিরোধক ট্যাবলেট বহন করে শূন্যে নিয়ে যাওয়া কিন্তু সহজ বিষয় নয়। তিন বছরের জন্য কম করে হলেও এক হাজার ট্যাবলেট প্রয়োজন এবং সেগুলোর প্যাকেজিং করতে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসপত্র লাগবে। তাছাড়া জন্মনিরোধক পিলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়। সুতরাং মহাকাশচারী নারীদের জন্য IUCD বা Implant সবচেয়ে ভাল ও কার্যকর উপায়। এগুলোর কোনো অতিরিক্ত ঝামেলা নেই। মহাকাশ মিশনের আগে আগে এগুলো করে ফেললে পৃথিবীতে ফিরে না আসা পর্যন্ত আর কোনো চিন্তাও নেই।

মহাকাশে হাড় ক্ষয়ে যাওয়া বা হরমোনের প্রভাব আরো ভাল করে বোঝার জন্য আরো গবেষণা দরকার। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, এ সম্পর্কে যত তাড়াতাড়ি জানা যায় ততোই ভাল। তাহলে হয়ত মানুষ নতুন একটি পৃথিবীতে বসবাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরো একধাপ এগিয়ে যেতে পারবে।

তথ্যসূত্র: সায়েন্স এলার্ট

 

One Reply to “মহাকাশে নারী মহাকাশচারীর ঋতুস্রাব জটিলতা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *