শনির হিম শীতল চাঁদ এনসেলেডাস

পানির অপর না হয় জীবন। কিন্তু প্রাণের অপর নাম কী? প্রাণের জন্য কি কি প্রয়োজন? আমরা যেটা প্রাণ বলে ধরে থাকি তার জন্য তিনটি আবশ্যক জিনিস প্রয়োজন। আর তা হচ্ছে পানি, শক্তি এবং রসায়ন বা রাসায়নিক বন্ধন। যদি বলি এগুলো পৃথিবী ছাড়াও পাওয়া গেছে এবং তা আমাদের খুব কাছেই তাহলে খুব অবাক হবেন? অবাক না হয়ে বরঞ্চ চলুন ঘুরে আসি, শনি গ্রহের হিম শীতল চাঁদ এনসেলেডাস থেকে।

নাসার স্পেসক্রাফট ক্যাসিনি নিশ্চিত করেছে যে, শনির এই চাঁদে প্রাণের জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবই পাওয়া যাবে। ক্যাসিনি যখন শনির চারপাশে ঘুরছিল তখন এর সেন্সর এনডেসেলাসের দক্ষিণ মেরুতে গ্যাসের উষ্ণ প্রস্রবণের উৎক্ষেপণ শনাক্ত করে। বিশ্লেষণ করে জানা গেছে এর ভেতরে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল যেমন কার্বন ডাই-অক্সাইড, অ্যামোনিয়া এবং মিথেেনের উপস্থিতি রয়েছে।

কেউ যদি এগুলো দেখে মনে করেন সেখানে গিয়ে আরামসে ছুটি কাটিয়ে আসবেন তাহলে ভুল করবেন। এর বরফের তৈরি খোলসে নিচে রয়েছে তরল সমুদ্র। অক্সিজেনের পরিমাণও খুব কম। আর বরফের নিচে পুরটাই অন্ধকার, কারণ এর বরফের খোলস সূর্যের অধিকাংশ আলো প্রতিফলন করে ফিরিয়ে দেয়।

এনসেলেডাসের গঠন; image source: www.nasa.gov

উপরের পৃষ্ঠ হাড় কাঁপানো হিম শীতল ঠাণ্ডা হলেও এর নিচের পানির তাপমাত্রা ৮৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে অনুমান করছেন বিজ্ঞানীরা। যদিও এর আবহাওয়া খুবই নেতিবাচক, জীবনের জন্য তবুও সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এখানে সেই সকল জীব বেঁচে থাকতে পারবে যা পৃথিবীর কঠিনতম পরিবেশে থেকে অভ্যস্ত। অস্ট্রিয়া এবং জার্মানির একদল গবেষকদের নতুন রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, পৃথিবীতে সমুদ্রের নিচে যেসকল আগ্নেয়গিরি আছে তাদের চারপাশে বেঁচে থাকা প্রাণীরা এনসেলেডাসের পরিবেশ সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারবে।

“আমরা গবেষণাগারে এনডেসেলাসের মতো পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেছি”, বলেন অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনারর আর্কিয়া অণুজীব গবেষক সাইমন রিটম্যান। আর্কিয়া হলো এককোষী অণুজীব। মাইক্রোস্কোপের নিচে তাদেরকে দেখতে অনেকটা ব্যাকটেরিয়ার মতো লাগে। তবে ব্যাকটেরিয়ার মতো মনে হলেও তারা আলাদা। পানির নিচের আগ্নেয়গিরির আশেপাশে এরা থাকে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান তাদের খাদ্য।

আর্কিয়ার গঠন; image source: http://4.bp.blogspot.com

রিটম্যান এবং তার সহকর্মীরা বেশ কয়েকটি চেম্বারে এনসেলেডাসের মতো পরিবেশে তৈরি করে সেখানে তাদের পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে তারা আবার সকল কেমিক্যাল এবং আনবিক হাইড্রোজেন রেখেছিলেন। বিজ্ঞানীরা এ পরীক্ষা করতে গিয়ে এনসেলেডাসের অনিশ্চিত পরিবেশের কথা চিন্তা করে পরীক্ষার বিভিন্ন উপাদানের তারতম্য করেছেন। যেমন আনবিক হাইড্রোজনের পরিমাণ বাড়িয়ে বা কমিয়ে দিয়েছেন,পানির ক্ষারত্ব পরিবর্তন করেছেন অথবা গ্যাসের পরিমাণের পরিবর্তন করেছেন।

রিটম্যান বলেন, “আমরা যতটা সম্ভব পরিবেশের পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। কারণ আমরা আসলেই জানি না যে এনসেলেডাদের বরফের নিচে কী আছে।” তিনি আরো বলেন, “আর এই কারণেই আমরা যতটা সম্ভব সাবধান হওয়ার চেষ্টা করেছি।”

এই পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন হয়ে গেলে এনসেলেডাসে Methanothermococcus okinawensi প্রজাতির আর্কিয়ন পাঠানো হবে। বিজ্ঞানীরা এই প্রজাতিটিকে জাপানের ওকিনাওয়ায় পানির ৩০০০ ফিট নিচে আবিষ্কার করেছেন। এই প্রজাতিটি কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং আণবিক হাইড্রোজেন দুটোই গ্রহন করে। এনডেসেলাসের কোনো অনুজীবেরও এরকম উপাদানই গ্রহণ করার কথা। এ প্রজাতিটি এরকম পরিবেশে শুধু লড়াই করে বেঁচে আছে তা কিন্তু নয়। এর ওপরে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করেও দেখা হয়েছে এতে তার কোনো সমস্যাই হয়নি উল্টো সে মিথেন গ্যাস তৈরি করে ফেলেছে। এনডেসেলাসে এই ধরনের একই প্রজাতি হয়ত বলতে পারবে কেন এই উপগ্রহে মিথেন সহজলভ্য।

এত কিছুর পরেও কিছু বাঁধা থেকেই যায়। নাসার স্পেসক্রাফট ক্যাসিনি এনসেলেডাসে ফরমালডিহাইড এর উপস্থিতি লক্ষ্য করেছে যা সবচেয়ে কঠিন পরিবেশে বেঁচে থাকা আর্কিয়ার জীবনচক্রে বাঁধা দিয়ে বসবে। M. okinawensi কিছু মাত্রা পর্যন্ত ফরমালডিহাইড সহ্য করতে পারে। কিন্তু ক্যাসিনি এনসেলেডাসে যেই মাত্রায় দেখেছে সেই মাত্রা প্রয়োগ  করার পর এই প্রজাতিটি বেঁচে থাকতে পারেনি। রিটম্যান মনে করেন এটা শুধুই একটা ধারণা। সেখানে পানির নিচে অন্যরকম হাইড্রোথার্মাল ব্যবস্থা থাকতে পারে যেখানে হয়ত প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব।

তিনি আরো বলেন আমরা যেগুলো চিন্তা করছি সেগুলো শুধু চিন্তাই হতে পারে। এমনও হতে পারে যে এনসেলেডাসে যেই মিথেনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে তা জৈবিক কারনে তৈরি নাও হতে পারে। অজৈবিক অনেক উপায়ে মিথেন তৈরি হওয়া সম্ভব। তাই এ ব্যাপারে চাই আরো বড় পদক্ষেপ। আরো বড় পরীক্ষা। সবাই দেখতে চায়-জানতে চায় আসলে কি আছে এই অন্ধকার সমুদ্রের নিচে।

featured image: phys.org

সঙ্গীর হাতে হাত রেখে কমে যেতে পারে শরীরের ব্যথা

বলা হয়ে থাকে ভালোবাসলে কোনো কষ্টকেই আর কষ্ট মনে হয় না। আসলেই কি তাই? আপনি যাকে ভালোবাসেন তার হাত ধরলে শুধুমাত্র ভালো লাগার অনুভুতিই হবে এমন নয়। পাশাপাশি আরো বেশি কিছু হয়, এমনটাই বলছে সাম্প্রতিক গবেষণা। এমনকি সঙ্গীর হাত ধরা শরীরের ব্যথা লাঘবেও সহায়তা করে। শুনে অবাক লাগলেও এটা কিন্তু পরীক্ষালব্ধ ফলাফল। ২২ জন দম্পতির ওপরে এক পরীক্ষা চালানোর পর দেখা গেছে যে শুধু হাত ধরা ছাড়াও আরো বিভিন্ন পদ্ধতি আছে যা হলে আমাদের শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একে অপরের মধ্যে ছন্দ সমতায় চলে আসে।

তবে এর আগেও এক গবেষক এ বিষয়ের উপর আগ্রহী হন। তার জীবনের এক ঘটনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এই গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার। তিনি হচ্ছেন কলোরাডো বোল্ডার ইউনিভার্সিটির প্যাভেল গোল্ডেস্টেইন। তার স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সময় তিনি সার্বক্ষণিক হাত ধরে ছিলেন। পরবর্তীতে তার স্ত্রী বলেছিলেন এতে তার প্রসব বেদনা কিছুটা লাঘব হয়েছিল। “আমি এটা ল্যাবে পরীক্ষা করতে চেয়েছি। দেখতে চেয়েছি কীভাবে স্পর্শের মাধ্যমে ব্যথা কম লাগা সম্ভব। আর যদি এটা সত্যিও হয় তাহলে তার কারণ কী তা দেখাও ছিল আমার উদ্দেশ্য” বলেন গোল্ডেস্টাইন।

এ গবেষণার জন্য ২২ জন দম্পতিকে বেছে নেয়া হয়েছিল। এদের বয়স ২৩ থেকে ৩২ এর মধ্যে এবং তারা কমপক্ষে ১ বছর ধরে একসাথে আছেন। তাদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম ইলেক্ট্রো-এনসেফালোগ্রাফি (ইইজি) ক্যাপ এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়। বেশ কয়েকটি পরিস্থিতিতে রেখে এটি বারবার করা হয়। দম্পতিকে একই রুমে রেখে পর্যবেক্ষণ করা হয় যে তারা একে অপরকে স্পর্শ করে এবং না করে তাদের মস্তিষ্কে কী ধরনের পরিবর্তন আসে। দেখা যায় পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি ছিল যখন তারা একে অপরের হাত ধরে রেখেছিল এবং সে মুহূর্তে কোনো নারী কোনো ব্যথা পেয়েছিল।

সঙ্গীর হাত ধরলে দুজনের মধ্যে ছন্দসমতা তৈরি হয়; image source: pexles.com

যেসব ক্ষেত্রে নারীরা ব্যথায় ভুগছিলেন কিন্তু হাত না ধরে এমনি এমনি তার সঙ্গীর সাথে বসে ছিলেন সেসব ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ছন্দসমতা ছিল কম। যার ফলে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় ব্যথা লাঘবের ক্ষেত্রে একসাথে বসে থাকাই যথেষ্ট নয়। ব্যথা লাঘবের ক্ষেত্রে প্রয়োজন একে অপরের স্পর্শ বা হাত ধরে থাকা। “দুজনের ছন্দসমতার মধ্যে শারীরিক ব্যথা বাধা দেয়, আর স্পর্শ সেই ব্যথাকে সরিয়ে দিয়ে ছন্দসমতা ফিরিয়ে আনে” বলেন গোল্ডেস্টাইন। আরো আশচর্যের ব্যাপার হচ্ছে যখন পুরুষ সঙ্গীটি নারী সঙ্গীর ব্যথার প্রতি বেশী সহাভূতিশীল হচ্ছে তখন দুজনের মস্তিষ্কের মধ্যে ছন্দসমতা আরো বেড়ে যাচ্ছে এবং ব্যথাও দ্রুত লাঘব হচ্ছে।

এটা এখনই বলা যাচ্ছে না যে কেন এমনটা হচ্ছে। সেজন্য আরো বেশি গবেষণার প্রয়োজন। এমন হতে পারে যে, আমরা একে অপরের ব্যথা ভাগ করে নিচ্ছি বলে অনুভব করার কারণে এমন মনে হয়। তবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে এখনও অনেক বাকি।

image source: unsplash.com

নতুন এ গবেষণায় একই লিঙ্গের ক্ষেত্রে বা অন্য কোনো সম্পর্কের মধ্যে কোনো পরীক্ষা করা হয়নি, যেমন পিতা ও পুত্রের মধ্যে সম্পর্কের বেলায় এর ফলাফল কী পাওয়া যাবে তা পরীক্ষা করা হয়নি। “আমাদের এই পরীক্ষালব্ধ প্রমাণই বলে দেয় মানুষের একে অপরের মধ্যে সংস্পর্শে আসা কতটা জরূরী” বলেন গোল্ডেস্টেইন। যান্ত্রিকতায় ছুটে হয়তো আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের আপন মানুষের সংস্পর্শ কিন্তু ভালো থাকার জন্য এই সংস্পর্শের কোনো বিকল্প নেই।

fetaured image: pexels.com

চাঁদের যত নাম

রাতের আকাশে তাকালে আমরা বেশীরভাগ সময় একটি বস্তু কে দেখতে পাই। আর তা হল হল চাঁদ। ব্ল্যাক মুন, ব্লু মুন, ব্লাড মুন, সুপারমুন- এরকম অনেক চাঁদের নাম আমরা শুনে থাকি বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু এই নামকরণের কারণ কি? এদের মধ্যে পার্থক্য কি? চলুন জেনে নেওয়া যাক। তার আগে আমাদের একটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চাঁদের এই নামকরণ এর ক্ষেত্রে বিশাল কোনো মহাকাশীয় তাৎপর্য নেই। বরং এই নামকরণ এর পিছনে অবদান রয়েছে চাঁদের অবস্থান এবং গেগ্রিয়ান  ক্যালেন্ডারের।

ব্ল্যাক মুন

ব্ল্যাক মুন একাধিক অর্থ বহন করে। সাধারণত মাসের ২য় নতুন চাঁদ কে ব্ল্যাক মুন বলা হয়। চাঁদ বেশ কিছু ধাপের মধ্যে দিয়ে একটি পূর্ণ চন্দ্র কলা সম্পন্ন করে এবং পূর্ণিমাতে চাঁদের পুরো গোলক দৃশ্যমান হয়। নতুন চাঁদের শুরুতে চাঁদের এই গোলকের কোনো অংশই দেখা যায় না, কারণ সূর্যের আলো চাঁদের দূরবর্তী অংশে পড়ে এবং ফলাফল হিসাবে চাঁদের অন্ধকার অংশ পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে। তিনি আরো বলেন, যদি কোন মাসে নতুন কোন চাঁদ দেখা না দেয় তাহলে সেটাকেও ব্ল্যাক মুন বলা যায়। কার্‌ চন্দ্র কলা ২৯.৫ দিনের, আর এই ক্ষেত্রে কোন সময় সম্ভবনা থাকে যে ফেব্রুয়ারি মাসে কোন নতুন চাঁদ বা পূর্নিমা দেখা যাবে না। অনেক বিজ্ঞানী আবার অমাবস্যাকেই ব্ল্যাক মুন বলে থাকেন।

ব্ল্যাক মুন; image source: blogs.discovermagazine

 

ব্লু মুন

ব্লু মুন এর নাম দেখে বিভ্রান্ত হয়ে মনে করবেন না যে চাঁদের রঙ নীল হয়ে যায়। বরং একমাসে যদি দুইবার পূর্ন চাঁদ বা পুর্নিমা হয় তবে দ্বিতীয় বার যেই পুর্নিমা হয় তাকেই বলা হয় ব্লু মুন। ব্লু মুন কিন্তু দেখতে একটু বড়ও লাগে।  সাধারণত বছরে ১২ টি পুর্নিমা হয়। তবে এমনও হয় যে কোন মাসে তিনটি পুর্নিমা হয়। এটি গড়ে প্রায় ২.৭ বছর পর পর হয়। গত ২১শে মে ২০১৬ এবং ৩১ শে জানুয়ারি ২০১৮ তে ব্লু মুন হয়েছিল। পরবর্তী ব্লু মন দেখা যাবে ২০১৮ সালে ৩১ শে মার্চে।

ব্লু মুন; image source: hellogiggles.com

 

ব্লাড মুন

ব্লাড মুন দেখা যায় পূর্ন চন্দ্রগ্রহণের সময়। চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মধ্যে চলে আসে। ফলে চাঁদে সূর্যের আলো যেতে পারে না। কিন্তু আলো একেবারে পৌঁছায় না এমনাটাও কিন্তু হয় না। কিছু আলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের ধার ঘেঁষে চাঁদে যেয়ে পড়ে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ঘেঁষে আলো যাওয়ার সময় পৃথিবী নীল বর্ণ জাতীয় রঙ বেশীরভাগ শোষণ করে নেয়। অবশিষ্ট থাকে কমলা, এবং লালচে আলো।  এই আলোই চাঁদে পৌছানোর পর চাঁদ লাল বর্ণ ধারণ করে। ফলে চাঁদ কিছুটা লাল দেখায়। রেড মুন নিয়ে আছে দেশে দেশে কুসংস্কার। অনেক মনে করেন রেড মুন হচ্ছে পৃথিবী ধ্বংসের সংকেত। আবার অনেকের কাছে রেড মুন মানেই অশুভ শক্তির উদয়। কিছু কিছু হলিউড মুভিতে কাল্পনিক প্রানী ওয়ারউলফ এর জন্য এই ব্লাড মুনকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখানো হয়। যদিও বিজ্ঞান কখনোই এইসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না, কিন্তু তবুও মানুষের মধ্যে এগুলো যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।

ব্লাড মুন; image source: nasa.gov

 

সুপারমুন

চাঁদ যখন পৃথিবীর খুব কাছাকাছি চলে আসে এবং সেই অবস্থায় পুর্নিমা হয় তখন তাকে বলা হয় সুপারমুন। সাধারণ মানুষের চোখে একটু বড় লাগে বলেই এই নামকরণ করা হয়েছে। পৃথিবী থেকে চাঁদের  গড় দূরত্ব ৩,৮৫,০০০ কিলমিটার। কিন্তু সুপারমুনের সময় তা ৫০,২০০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসে।

সুপারমুন এবং মাইক্রোমুন এর মধ্যে পার্থক্য; image source: moon.nasa.gov

মাইক্রোমুন

মাইক্রোমুন হচ্ছে সুপারমুন এর ঠিক উল্টো। সুপারমুন এর সময় চাঁদ যেমন পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি চলে আসে, তেমনি মাইক্রোমুন এর সময় চাঁদ পৃথিবী থেকে সবচাইতে দূরে অবস্থান করে। গড় দূরত্ব ৩,৮৫,০০০ কিলোমিটার হলেও মাইক্রোমুন এর সময় তা বেড়ে ৪০৫,৬৯৬ কিলোমিটারে তা পৌঁছায়। ফলে চাঁদ স্বাভাবিক এর চাইতে একটু ছোটো লাগে দেখেতে। যদিও মাইক্রোমুন খালি চোখে অতটা বোঝা যায় না।

গত ৩১ শে জানুয়ারি ২০১৮ তে তিনটি মহাজাগতিক ঘটনা একই সাথে ঘটে। পূর্ন চন্দ্রগ্রহন, ব্লাড মুন এবং ব্লু মুন। এরকম মহাজাগতিক ঘটনা সচরাচর ঘটে না। অনুরুপ মহাজগতিক ঘটনা এর পূর্বে প্রায় ১৫০ বছর আগে হয়েছিল। তাই এবার যারা এটি দেখতে পারেননি তাদের জন্য ব্যাপারটি না দেখা হতাশারই বটে।

featured image: pbs.org

পৃথিবীর মতো অণুজীব পাওয়া যেতে পারে লাল গ্রহে

হেল অন আর্থ। কখনো শুনেছেন এরকম ? দক্ষিন আমেরিকার পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে একটি বৃহৎ মরুভূমি আছে, যাকে পৃথিবীর নরক বলা হয়। কিন্তু এই নরকের সাথে আরেকটি লাল রঙে আচ্ছাদিত এক স্থানের মিল দেখে বিজ্ঞানীরা একই সাথে উত্তেজিত এবং চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

চিলির আটাকামা মরুভূমি হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্কতম স্থানের মধ্যে অন্যতম। এই মরুভূমি এতই শুষ্ক যে কোনো কোনো সময় কয়েক দশক বা শতক ধরেও এখানে কোনো বৃষ্টির দেখা যায় না। আর এই প্রতিকূল স্থানকে আমরা পৃথিবীর মধ্যে এক টুকরো মঙ্গল গ্রহ বলতে পারি এবং বিজ্ঞানীরা এই স্থানের ব্যাপারে এক মস্ত আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

চিলির আটাকামা ম্রুভূমি; image source: dailygalaxy.com

এই প্রথমবাবের মত গবেষকরা আটামাকার অস্বাভাবাবিক শুষ্ক মরুভূমিতে মাইক্রোবায়াল প্রাণীকে বেঁচে থাকতে দেখেছেন। শুধু তাই নয়, এই শুষ্ক এবং অত্যন্ত গরম পরিবেশে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাদের একটি নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রও আছে। তাই মঙ্গল গ্রহের প্রাণের আবিষ্কারের পূর্বে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি আবিষ্কার।

“এটা আমাকে সবসময়ই অবাক করে দেয় যে, মানুষ যেখানে চিন্তাও করত পারে না এইরকম একটা স্থানে কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে সেইরকম পরিবেশেও দেখা যায় যে জীবন ঠিকই সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বেঁচে আছে।” বলেন ওয়াশিংটন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহ বিজ্ঞানী ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক।

তিনি আরো বলেন যে, “জীবন যদি পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্ক পরিবেশে লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে বেশ একটা ভালো সম্ভাবনা আছে যে, একইভাবে মঙ্গল গ্রহেও জীবনের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।”

যদিও এর আগে বিজ্ঞানীরা আটাকামা মরুভূমিতে জীবাণু খুঁজে পেয়েছিলেন। পূর্বের গবেষণায় বলা হয়েছিল যে, বালিমাটিতে যে সকল প্রাণের আবিষ্কার হবে তা হয় আগেই মারা গেছে বা, মৃতপ্রায় টেকসই কোষের অবশিষ্টাংশ হঠাৎ বায়ুমন্ডলীয় প্রক্রিয়ায় জমা থাকবে।

কিন্তু এইবার তারা আসলেই প্রমাণ পেয়েছেন দলবদ্ধ এবং বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় এক ধরনের জীবাণুর যারা বর্ধনশীল বা অন্তত টিকে থাকার চেষ্টা করছে প্রতিকূল পরিবেশে।

২০১৫ সালে ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক এবং তার সাথে গবেষকারা আটাকামা মরুভূমিতে পৌঁছানোর কিছু পরেই আকাশে বৃষ্টির দেখা দেয় যা কিনা খুবই দূর্লভ ঘটনা। এতটাই দূর্লভ যে ৪০ বছর আগেও মনে হয় এত বৃষ্টিপাত হয়নি বা তা রেকর্ড করা হয়নি।

এই অভাবনীয় বৃষ্টিপাতের পর পরই গবেষকরা মরুভূমির মাটিতে অস্বাভাবিক জীবত্বাত্তিক বিস্ফোরণ দেখতে পান। তারা অন্তত ৮ টি যায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন এবং একই ফলাফল দেখতে পান।

এর পর তারা ফিরে আসেন এবং পর পর ২০১৬ ও ২০১৭ সালে আবার অনুসন্ধান চালান। কিন্তু পরবর্তীতে তারা কোনো রকম বৃষ্টির দেখা পাননি এবং জীবন এর চিহ্ন পরবর্তী নমুনা গুলোতে ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছিল।

আটাকামা মরুভূমিতে গবেষনায় ব্যাস্ত বিজ্ঞানীরা; image source: sciencealert.com

তবুও তারা জীনগত এবং কিছু রাসায়নিক পরীক্ষা করেন এবং টেস্টের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে বলেন যে, এই জীবাণুরা এই বিশেষ পরিবেশে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল।

এইসকল কষ্টসহিষ্ণু ব্যাক্টেরিয়া দলবদ্ধভাবে মরুভূমির মাটির বেশ কয়েক হাত নিচে অনেক দিন পর্যন্ত পানি ছাড়া ঘুমিয়ে থাকে এবং যখন আবার বৃষ্টিপাত হয় তখন তাদের বিপাকীয় কার্যক্রম আবার চালু হয়ে যায়।

“আটাকামার মরুভূমির মত এত প্রতিকূল পরিবেশে এত অটলভাবে বেঁচে থাকা কোনো জীবকে এই প্রথম কেউ খুঁজে পেল” বলেন ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক।

তিনি আরো বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি এই সকল অণুজীব যেভাবে শত শত এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় চিলির নরকের মতো মরুভূমিতে বেঁচে থাকতে পারে ঠিক তেমনি মঙ্গল গ্রহেও এরকম অণুজীব পাওয়া সম্ভব যারা অনেক বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।”

কিন্তু আমাদের একটা কথা মাথায় রাখা উচিত যে চিলির আটাকাম মরুভূমি যতই রুক্ষ প্রকৃতির হোক না কেন মঙ্গল গ্রহ তার চাইতে কল্পনাতীত বেশি রুক্ষ এবং ঠান্ডা।

আটাকামা মরুভূমি এবং মঙ্গল গ্রহের মধ্যে সাদৃশ্য; image source: sciencealert.com

তারপরেও যদি বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহে প্রাণের আশা করে থাকেন তবে চিলির মরুভূমিতে আবিষ্কৃত অণুজীব গুলোই হবে মানদণ্ড স্বরূপ, কেননা মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ হয়তবা এরকম কোন অনুজীবকে হয়ত বাঁচতে দিবে তার মাটির কয়েক স্তরের নিচে।

নাসার বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রমাণ পেয়েছেন যে ৪,০০,০০০ বছর আগেও মঙ্গল গ্রহে বরফ যুগ ছিল । এখনো মঙ্গলের মাটির নিচে বরফ আছে বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছে এবং তা আছে এই গ্রহের দুই মেরুতে।

“আমরা জানি যে মঙ্গলের মাটিতে পানি জমাট বেঁধে আছে এবং সাম্প্রতিক গবেষণায় রাতের বেলায় মঙ্গলে বরফ পড়ে তার একটা শক্ত ধারণা আমরা পেয়েছি। ফলে রাতের বেলায় এই লাল গ্রহের মাটিতে আর্দ্রতা সম্পৃক্ত ঘটনা ঘটে যার ফলে আমাদের আশংকা যে এখনো এখানে হয়ত মাটির নিচে পাওয়া যেতে পারে পৃথিবীর মতোই কিন্তু পৃথিবীর চাইতে কয়েক গুন বেশী সহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন অণুজীব।” বলেন ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক ।

যদি কখনো মঙ্গলে প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায় তবে তা হয়ত রুক্ষ-শুষ্ক মাটির নিচের আরেকটি স্তরে পাওয়া যাবে। আর তখন এসব গবেষণায় হয়ে থাকবে পথিকৃৎ।

featured image: the-martian.wikia.com

হারিয়ে যাওয়া অ্যান্টিম্যাটার বা, প্রতিপদার্থের খোঁজে

মহাবিশ্বে যা কিছু আছে, তা হোক কোনো ছায়াপথ বা, গ্রহ বা, হোক তা নক্ষত্র সবকিছুই এক অপরিহার্য উপাদান দিয়ে তৈরি। আর তা হচ্ছে বস্তু। ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাংগ হওয়ার সাথে সাথে মহাবিশ্বে বস্তু (matter) এবং বস্তুর বিপরীত সত্ত্বা প্রতিবস্তু (antimatter) সমান ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বস্তু এবং প্রতিবস্তুর ধর্মই ছচ্ছে তারা একে অপরকে ধ্বংস করবে। তাই সে হিসাবে সদ্য নির্মিত তৎকালীন মহাবিশ্বে শুধু শক্তি ছাড়া আর কিছুই থাকার কথা না, কারণ বস্তু এবং প্রতিবস্তুর সংঘর্ষে শক্তি নির্গত হয়। কিন্তু এই ভারসাম্য মহাবিশ্ব তার প্রারম্ভিক দিকে ধরে রাখতে পারেনি এবং দুই স্বত্বার মধ্যে থেকে সে বস্তু কে বেছে নেয়।

কিন্তু কেনো এই পক্ষপাতিত্ব? তা জানার জন্যই বিজ্ঞানীরা অতিপারমাণবিক কণা নিউট্রিনো নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন। যদি নিউট্রিনো তার নিজের প্রতিবস্তু হয় তাহলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে মহাবিশ্ব কেনো বস্তুর পক্ষ বেছে নিয়েছিল তার উত্তর এখান থেকেই পাওয়া যাবে।

তাই বিজ্ঞানীরদের অক্লান্ত চেষ্টাটাও শুরু হয়ে গেছে এটা প্রমাণ করার জন্য। এ পর্যন্ত চারটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়ে গেছে কিন্তু তারা কোনো আশার আলো দেখতে পাননি। তবুও তারা দমে যাওয়ার পাত্র নন। ইতোমধ্যে তারা আরো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে তাদের লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছেন। আর নতুন এই পরীক্ষার নামকরণ করা হয়েছে, KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY

বস্তু এবং প্রতিবস্তুর উভয়ের রয়েছে একে অপরের বিপরীত ইলেক্ট্রিক বা, বৈদ্যুতিক চার্জ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইলেকট্রনের প্রতিবস্তু বা, প্রতিপদার্থ হচ্ছে পজিট্রন এবং প্রোটনের প্রতিবস্তু হচ্ছে অ্যান্টিপ্রোটন। কিন্তু এই নিয়ম খাটে না নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে, যার কোনো ইলেক্ট্রিক চার্জ নেই। নিউট্রিনো পদার্থবিজ্ঞানী জেসন ডেটউইলার বলেন, “নিউট্রিনো হচ্ছে একটি অদ্বিতীয় অতিপারমাণবিক কণা যার মতো অন্য কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না।”

যেভাবে কাজ করে  KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY

সাধারণ বেটা ডিকে ঘটার সময় (বামের চিত্র) একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা নিউট্রন প্রোটনে পরিণত হয় এবং একটি ইলেক্ট্রন (নীল) এবং একটি অ্যান্টিনিউট্রিনো (লাল) ছেড়ে দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাবল বেটা ডিকে ঘটে থাকে বা, বেটা ডিকে একই সময়ে দুইবার ঘটে। কিন্তু যদি নিউট্রিনো নিজের প্রতিবস্তু হয় তাহলে বেটা ডিকের সময় উৎপন্ন হওয়া নিউট্রিনো দুটি নিজেদের কখনো কখনো ধ্বংসও করে ফেলবে, যার ফলে কোনো কোনো ডাবল বেটা ডিকেতে আমরা শুধু দেখবো নিউক্লিয়াস দুটি ইলেক্ট্রন ছেড়ে দিচ্ছে। কোনো অ্যান্টিনিউট্রিনো নেই।

যেভাবে কাজ করে KamLAND-Zen neutrino-less double beta decay ; image source: www.sciencenews.org

কিন্তু এই পরীক্ষা টি এত সহজ নয় কারণ এর জন্য অনেক দূষ্প্রাপ্য আইসোটপের প্রয়োজন হয়।

আগের পরীক্ষাগুলোতে KamLAND-Zen পানিতে নিমজ্জিত Xenon-136 আইসোটোপ এর ক্ষয় পর্যবেক্ষন করত। কিন্তু এখন KamLAND-Zen এ নতুন এবং অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে যেখানে আগের চাইতে ২ গুন Xenon ব্যবহার করা হবে যার ফলে আরো দূর্লভ ক্ষয়ের সন্ধান হয়ত পাওয়া যাবে।

নতুন সন্ধানের খোঁজে

নতুন ধরণের আইসোটোপ, যা থাকবে পরিষ্কার, ধুলাবালি থেকে মুক্ত এমন কিছুই খুজছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু তার জন্য আরও বৃহৎ গবেষণা হওয়া উচিত। “আমরা যেই আইসোটোপের ক্ষয় খুঁজছি তা খুবই, খুবই, খুবই, খুবই দূর্লভ”,বলেন ইটালির পাওডা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিকার্ডো ব্রাগনেরা। খুবই ছোট একটি ব্যাপারও এরকম পরীক্ষার ফলাফল বদলে দিতে পারে। KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY এখন পর্যন্ত সফল না হলেও তার দেখাদেখি অনেক বিজ্ঞানীরাই আরো বড় পরিসরে এই পরীক্ষাগুলো নতুন করে চালাতে চাচ্ছেন। তার মধ্যে বড় একটি প্রজেক্ট হচ্ছে LEGENDএই নতুন প্রজেক্টে নতুন বিজ্ঞানীরা ছাড়াও আগের প্রজেক্টেরও বেশ কয়েকজন থাকবেন।

KamLAND-Zen এর একটি ডিডেকটর যা Xenon-136 এর Double Beta Decay পর্যবেক্ষন করে; image source: https://www.sciencenews.org

 

বদলে যেতে পারে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ধারণা

যদি বিজ্ঞানীরা এটা প্রমাণ করে ফেলতে পারেন যে, নিউট্রিনোরাই তাদের নিজদের প্রতিবস্তু, তাহলে অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিবস্তু কেন এত দূর্লভ তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এছাড়া নিউট্রিনো কেনো অন্যান্য অতিপারমাণবিক কণার চেয়ে হালকা সেটাও বোঝা যাবে। “এক ঢিলে দুই পাখি মারার মত আবিষ্কার হবে এটি”, বলেন কনরাড নামক বিজ্ঞানী।

তাত্ত্বিক পদার্থবিদরা ধারণা করেন যে, নিউট্রিনোরা যদি নিজেরা নিজেদের প্রতিবস্তু হয় তাহলে দেখতে না পাওয়া ভারী নিউট্রিনো হয়ত হালকা নিউট্রনের (যা আমরা দেখতে পাই) সাথে জোড়ায় থাকে। কিন্তু যদি এটা প্রমানিত হয়ে যায় যে নিউট্রিনোরা নিজেরা নিজেদের প্রতিবস্তু তাহলে তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের অনেক তত্ত্বই আর টিকবে না।

কনরাড বলেন, “মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো যে কে এই অ্যান্টিম্যাটার বা, প্রতিবস্তুগুলোকে চুরি করল। এর চাইতে বড় চুরি আর কখনো হয়নি।”

featured image: socratic.org

যে গভীরতায় এভারেস্টও হার মানে

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ একটি অর্ধচন্দ্রাকার খাঁদ, যা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়াম অঞ্চলের মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের কাছে অবস্থিত। এর আশাপাশের পরিবেশ কিন্তু বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম খাঁদটি মারিয়ানা ট্রেঞ্চে অবস্থিত। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের দক্ষিন অংশের নাম হচ্ছে চ্যালেঞ্জার ডিপ এবং এটিই মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম বিন্দু। এর একদম সঠিক গভীরতা নির্ণয় করা একটু কষ্টসাধ্যই বটে, কিন্তু আধুনিক পরিমাপক দ্বারা নিখুঁত মাপ পাওয়া না গেলেও অনেকাংশে সঠিক পরিমাপ বের করা সম্ভব হয়েছে।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের ভৌগলিক অবস্থান; image source: earth.google

২০১০ সালে চ্যালেঞ্জার ডিপের গভীরতা ৩৬,০৭০ ফিট (১০,৯৯৪ মিটার) পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছিল শব্দের কম্পন/প্রতিধ্বনি দ্বারা এবং জরিপটি করেছিল National Oceanic and Atmosphere Administration (NOAA)। বিখ্যাত মুভি ডিরেক্টর জেমস ক্যামেরন ২০১২ সালে তার গভীর সমুদ্রের অভিযান হিসাবে চ্যালেঞ্জার ডিপের উদ্দেশ্যে গমন করেন এবং তিনি ৩৫,৭৫৬ ফিট (১০,৮৯৮ মিটার) পর্যন্ত পৌঁছান। ২০১৪ সালে ইউনিভার্সিটি অফ হ্যাম্পশায়ারের কিছু গবেষক সমুদ্রের তলদেশের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন এবং চ্যালেঞ্জার ডিপ ৩৬,০৩৭ ফিট (১০,৯৮৪ মিটার) বলে ঘোষণা দেন। মহাসাগরের দ্বিতীয় গভীরতম স্থানটিও মারিয়ানা ট্রেঞ্চেই অবস্থিত যার নাম দ্য সিরেনা ডিপ। এটি চ্যালেঞ্জার ডিপ থেকে ১২৪ মাইল (২০০ কিলোমিটার) পূর্বে অবস্থিত এবং ৩৫,৪৬২ ফিট (১০,৮০৯ মিটার) গভীর। যদি মাউন্ট এভারেস্টের সাথে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তুলনা করা হয় তাহলে মাউন্ট এভারেস্ট অনায়াসে হেরে যাবে। কারণ মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ২৯,০২৯ ফিট, আর অপর দিকে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ ৩৬,০৭০ ফিট গভীর। ফলে এভারেস্টকে যদি মারিয়ানা ট্রেঞ্চে নিমজ্জিত করা হয় তাহলে তার চূড়ারও খোঁজ পাওয়া যাবে না।

এভারেস্ট বনাম মারিয়ানা ট্রেঞ্চ; image source: thinglink.com

রক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ ১,৫৮০ মাইল (২,৫৪২ কিলোমিটার) দীর্ঘ যা ৫ টি গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চাইতেও বড় কিন্তু প্রস্থে মাত্র ৪৩ মাইল (৬৯ কিলোমিটার)। যেহেতু গুয়াম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন এবং ১৫ টি মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথের সাথে যুক্ত তাই আইনগতভাবে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীন। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিও বুশ মারিয়ানা ট্রেঞ্চকে জাতীয় সামুদ্রিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসাবে ঘোষণা দেন। যার ফলে ১,৯৫,০০০ বর্গ মাইল (৫,০৬,০০০ বর্গ মিটার) পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশে এবং পানির চারপাশের বিছিন্ন দ্বীপগুলো সুরক্ষিত সামুদ্রিক রিজার্ভের আওতায় পড়ে যায়। এর মধ্যে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের বেশীরভাগ দ্বীপ এবং পানির নিচের ২১ টি আগ্নেয়গিরিও অন্তর্ভুক্ত।

কিভাবে তৈরি হয়েছিল এই খাঁদ?

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ তৈরি হয়েছিল এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যা সাবডাকশন বলয়ে ঘটে থাকে। (নোটঃ সাবডাকশন বলয় হচ্ছে এককেন্দ্রমুখি প্লেট, যেখানে অন্তত একটি টেকটনিক প্লেট হচ্ছে সামুদ্রিক ভূ-ত্বকের।) সাবডাকশন বলয়ে একটি সামুদ্রিক প্লেটকে অপর প্লেটের সাথে চাপ দেওয়া হয়, ফলে একটি প্লেট আরেকটি প্লেটের নিচে চলে যায়  এবং সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।  যেখানে এই সংঘর্ষটি হয় সেখানে বিশাল খাঁদের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগরের প্লেটটি ফিলিপাইনের প্লেটের সাথে চাপ লেগে বেঁকে যাচ্ছে। খাঁদ গভীর হলেও সেটা যে পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকবে এমনটা কিন্তু নয়। যেমন ইকুয়েটর অঞ্চলে পৃথিবী হচ্ছে স্ফীত আর মেরু অঞ্চলের প্লেট পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি, তাই চ্যালেঞ্জার ডিপ গভীর হলেও তা কিন্তু পৃথিবীর কাছাকাছি নয়।খাঁদের তলদেশে পানির চাপ অত্যাধিক বেশি, প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে প্রায় ৮ টন (৭০৩ কিলোগ্রাম প্রতি বর্গ মিটারে)। এটি সমুদ্রের পৃষ্ঠের চাপের চাইতে প্রায় ১০০০ গুন বেশি বা, ৫০ টি জাম্বো জেট প্লেন একজন মানুষের উপর স্তুপ করে রাখার সমান।

যেভাবে তৈরি হয়েছিল এই খাঁদ; image source: worldbeneaththewaves.com

অস্বাভাবিক আগ্নেয়গিরি সমূহ

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সারিবদ্ধ যেসব আগ্নেয়গিরি সমুদ্রের উপর মাথা তুলে আছে তারাই অর্ধচন্দ্রাকৃতির মারিয়ানা দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও সমুদ্রের নিচে কিছু অদ্ভুত আগ্নেয়গিরি দেখা যায়, যেমন – এইফুকু সমুদ্রগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরি তরল কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত করে। যে তরল এখান থেকে বের হয়ে আসে তার তাপমাত্রা ১০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দাইকোকু সমুদ্রগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরি বিগলিত সালফার নির্গমন করে, যা আর পৃথিবীর কোথাও দেখেতে পাওয়া যায় না।

খাঁদে যাদের বসবাস

সাম্প্রতিক কিছু অভিজানের পর অবাক করে দেওয়া বিচিত্র জীবনযাত্রার খোঁজ পাওয়া গেছে খাঁদের কঠিন পরিবেশে। যেসকল জীব মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীর অঞ্চলে বসবাস করে তারা অত্যাধিক চাপ এবং নিকষ কালো অন্ধকারে থাকে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চে খাবার খুবই সীমিত, কারণ পানির উপরিভাগের খাবার এত গভীরে পৌঁছাতে পারে না। তাই পানির নিচে জীবাণু ও ছোট প্রাণীরা রাসায়নিক পদার্থ, যেমন: মিথাইন বা সালফার এর ওপর নির্ভর করে থাকে। সাধারণত তিন ধরণের জীব দেখা যায় মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে, সেগুলো হল – জেনোফাইওফোরস, অ্যাম্ফিপডস এবং সি কিউকাম্বার।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের প্রধান তিন ধরণের প্রানী; image source: zmescience.com,pinterest.com,deepseanews.com

জেনোফাইওফোরস হচ্ছে এককোষী কিন্তু বৃহৎ আকারের অ্যামিবা এবং তারা আশেপাশে যা পায় তাই খায়। অ্যাম্ফিপড হচ্ছে চকচকে কিছুটা চিংড়ি মাছের মতো দেখতে এবং তারা ময়লা আবর্জনা খেয়ে বেঁচে থাকে। এদেরকেই মূলত খাঁদে বেশি দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা দুইশতাধিক বিভিন্ন ধরণের অনুজীবের সন্ধান পেয়েছেন সেখান থেকে কাদা তুলে আনার পর। এছাড়াও ২০১২ সালের জেমস ক্যামেরন এর অভিযানের সময় বিজ্ঞানীরা মাইক্রোবায়াল ম্যাট সনাক্ত করেন চ্যালেঞ্জার ডিপে। মাইক্রোবায়াল ম্যাট হাইড্রোজেন এবং মিথাইন শোষণ করে বেঁচে থাকে। সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা কিছু অদ্ভুত ধরণের মাছও এখানে দেখতে পাওয়া যায় এবং এরাই কিন্তু এখানে খাদ্য শিকল এর উপরের স্তরে রয়েছে। এই সকল জীব সাধারণত ২৬,২০০ ফিট (৮,০০০ মিটার) গভীরে দেখতে পাওয়া যায় যেখানে সূর্যের আলো একদমই পৌঁছায় না। এ কারণেই এরা দেখতেও অদ্ভুত এবং এদের শারীরিক কাঠামোও আলদা।

এই গভীরেও রয়েছে দূষন

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এই গভীর খাঁদেও পাওয়া গেছে মানুষের তৈরি দূষণের চিহ্ন। ১৯৭০ সালে যে সকল ক্ষতিকর রাসায়নিক নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তা এখনো সমুদ্রের গভীরতম অংশে ওঁত পেতে আছে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ থেকে নিয়ে আসা অ্যাম্ফিপড পরীক্ষা করার সময় একদল বিজ্ঞানী এরমধ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অস্তিত্ব খুঁজে পান। এই সব রাসায়নিক ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ব্যবহার হয়েছিল এবং পরে তা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।

“এত গভীর এবং এত দুর্ভেদ্য অঞ্চলে মানুষের তৈরি অতিমাত্রার দূষণ খুঁজে পাওয়া খুবই দুঃখজনক এবং এটার একটা বিধ্বংসী প্রভাব পড়বে সমগ্র মানবজাতির উপরে দীর্ঘ সময়ের জন্য” বলে মন্তব্য করেন নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লেখক জেইমসিন।

গবেষকরা বলছেন যে, পরবর্তী ধাপ বুঝে কাজ করতে হবে এবং আগে যা কিছু হয়েছে তার ফলাফলের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ এটি আমাদের বাস্তুতন্ত্রের একটি অংশ।

featured image: eoimages.gsfc.nasa.gov

সৌরজগতের সবচেয়ে বড় ঝড়ের জীবনকাল শেষ হয়ে আসছে

আপনি যদি বৃহস্পতি গ্রহের গ্রেট রেড স্পট না দেখে থাকেন তাহলে আপনার জন্য রয়েছে দুঃসংবাদ। গ্রেট রেড স্পট, যা আসলে বৃহস্পতি গ্রহে চলমান বৃহৎ ঝড়, তা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে এবং তা আপনার জীবদ্দশাতেই হয়ত হারিয়ে যাবে।

নাসার ১ বিলিয়ন ডলারের জুনো প্রোব জুলাই ২০১৭ তে গ্রেট রেড স্পটের বেশ কিছু অনিন্দ্য সুন্দর ছবি তুলেছিল বেশ কাছ থেকে। এই ছবিগুলোর বিস্তারিত দেখে বিজ্ঞানীরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন কারণ তারা এর আগে এত কাছ থেকে এবং এত পরিষ্কারভাবে কখোনই গ্রেট রেড স্পটকে দেখেননি।

জুনোর চোখে গ্রেট রেড স্পট; image source: sciencealert.com

বৃহস্পতির এই ভয়ানক ঝড় পৃথিবীর ঝড়ের চেয়ে বেশ কয়েকগুন বড়। ঝড়টি সম্ভবত ১৬০০ সাল থেকে ঘুরেই চলেছে। তার তুলনায় পৃথিবীর সবচাইতে বড় ঝড় ছিল হ্যারিকেন জন, যা হয়েছিল ১৯৯৪ সালে এবং এর স্থায়িত্ব ছিল ৩১ দিন।

জুনো মিশনের দলের সদস্য এবং নাসার গ্রহ বিজ্ঞানী গ্লেন অরটনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেন বৃহস্পতির ঝড় এত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। উত্তরে তিনি বলেন, “ঝড় গুলো এত দীর্ঘ সময় ধরে থাকে না, অন্তত সবগুলো নয়।”

তিনি আরো বলেন, “ধরুন গ্রেট রেড স্পট হচ্ছে একটা ঘুর্ণায়মান চাকা যা চলতেই থাকে কারণ এটি দুটো বেল্টের মধ্যে আটকা পড়েছে যা পরস্পর বিপরীত দিকে চলছে। আর এ কারনেই গ্রেট রেড স্পট ঘুরতেই থাকে। কারণ তা অবিরাম চলমান বেল্টের মতো জায়গাতে আটকা পড়ে গেছে।”

বৃহস্পতির বাতাসের দমকা হাওয়ার বেগ প্রায় ৩০০ মাইল প্রতি ঘন্টা বা, ৫০০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। ফলে তা যখন কোনো ঝড়ের সাথে যুক্ত হয় তখন তা বড় ধরণের একটা প্রভাব ফেলে। ফলে দ্রুত গতিতে চলা এই গ্রহের বিপরীত দিকে ঘুরতে থাকা এই ঝড় কখনোই বন্ধ হয় না।

জুনো পরবর্তীতে এই দানব ঝড়কে দেখতে পাবে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে, তারপর আবার ২০১৯ সালের জুলাই এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু তবুও ২০১৭ সালে যত কাছে এবং যত বিস্তারিতভাবে দেখা গিয়েছিল সেইভাবে আর দেখেতে পাবে না জুনো। ফলে বিজ্ঞানীদের কাছে এই ছবিগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি।

কখন হারিয়ে যাবে এই দানব ঝড় ?

পৃথিবীতে কখনোই বৃহস্পতির মত শত শত বছর ধরে ঝড় চলতে পারবে না। কারণ বৃহস্পতি গ্রহে পৃথিবীর মত সুবিন্যস্ত স্থলভাগ বা সাগর নেই। ফলে ঝড় বাধা দেওয়ার মত কিছুই নেই।

অন্যদিকে আমাদের গ্রহের ভূ-গঠন আলাদা হওয়ার কারনে ঝড় বেশিদিন টিকতে পারে না। এছাড়াও আমাদের গ্রহের ঘূর্ণন অনেক আস্তে, যেখানে পৃথিবী প্রতি ২৪ ঘন্টায় নিজের অক্ষের ওপর একবার ঘোরে সেখানে বৃহস্পতি নিজের অক্ষের ওপরে ১০ ঘন্টায় একবার ঘোরে।বৃহস্পতির এইসব গুনাবলি আমাদের গ্রহে নেই বলেই দমকা হাওয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে না।

কিন্তু যার শুরু আছে তার শেষও আছে। গ্রেট রেড স্পট এবং বৃহস্পতি গ্রহের কোনো কিছুই চিরকাল থাকবে না। গ্রেট রেড স্পটও দীর্ঘ সময় ধরে আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে।

১৮০০ শতকের শেষের দিকে এই ঝড়টি সম্ভবত ৩০ ডিগ্রী দ্রাঘিমাংশের সমান অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। যা প্রায় ৩৫,০০০ মাইল (৫৬,০০০ কিলমিটার) এবং এটা পৃথিবীর চাইতে প্রায় চার গুনেরও বেশি বড়। তাই যদি ভুল করেও পৃথিবী এই গ্রেট স্পটের কবলে পড়ে তবে আর রক্ষা নেই। যদিও এটা কখনোই হওয়া সম্ভব নয়।

পৃথিবী এবং গ্রেট রেড স্পটের তুলনা; image source: universetoday.com

নিউক্লিয়ার শক্তিতে চালিত মহাকাশযান ভয়েজার-২ যখন ১৯৭৯ সালে বৃহস্পতি গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল তখন এই গ্রেট রেড স্পটের আয়তন হয়তবা পৃথিবীর দ্বিগুনের চাইতে একটু বড় ছিল।

এখন তা ১৩ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশের সমান প্রশস্থ এবং তা পৃথিবীর চাইতে মাত্র ১.৩ গুন বড়। অর্থাৎ, এই ঝড়ও চিরদিন থাকবে না।

নেপচুন গ্রহেরও একটি বিশেষ ঝড় আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যা হাবল টেলিস্কোপে ধরা পড়েছে। এই ঝড়টির আকারও নেহাত কম ছিল না। পৃথিবীর একটি মহাদেশের সমান এই ঝড়টিও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে একেবারে বিলীন হয়ে যাবে।

বৃহস্পতির গ্রেট রেড স্পটেরও সময়ও ফুরিয়ে আসছে। অরটন বলেন, “গ্রেট রেড স্পট আগামী এক বা দুই দশকের মধ্যে গ্রেট রেড সার্কেলে পরিণত হবে এবং তার পরবর্তিতে থাকবে শুধুই গ্রেট রেড মেমোরি”

বৃহস্পতি গ্রহ; image source: nasa.gov

কিন্তু নাসা গডার্ড ফ্লাইট সেন্টারের এমি সাইমন্স বলেন যে, “এটা হয়ত একসময় হারিয়ে যাবে, কিন্তু তা যে হবেই তা কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না।”

কারণ হিসাবে তিনি বলেন, যে কারণে এই দানবীয় ঝড়টি এতদিন ধরে টিকেছিল তা যদি আবার শক্তি যোগায় তাহলে হয়ত তা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে না। একটা নির্দিষ্ট আয়তন জুড়ে হয়ত আরো কিছুদিন থাকতে পারে। তাই এখন সময়ই বলে দেবে যে কি হতে চলেছে এই গ্রেট রেড স্পটের ভাগ্যে।

featured image: nasa.com

 

সাইবেরিয়ার ২,০০,০০০ বছরের পুরোনো পাতালপুরীর দরজা

এটি এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাইবেরিয়ার ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চল পাতলা বরফ দ্বারা আবৃত। এই অবস্থা জায়গাভেদে এতই মারাত্বক আকার ধারণ করেছে যে, বিশাল বিশাল গর্ত হঠাৎ করে জেগে উঠছে। স্থানীয় ইয়াকুশান লোকদের কাছে এই এলাকার সবচেয়ে বড় খাঁদটি “পাতালপুরীর দরজা” হিসেবেই পরিচিত এবং তা এত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যে বরফের নিচ থেকে ২,০০,০০০ বছরের পুরোনো জঙ্গল, পশুপাখির মৃতদেহ বেরিয়ে আসছে।

 

ব্যাটাগাইকা খাঁদ; image source: sciencealert.com

ব্যাটাগাইকা খাঁদ নামে পরিচিত হলেও অফিশিয়ালি এগুলোকে বলা হয় “মেগাস্লাম্প” বা “থারমোকার্স্ট”।

সাম্প্রতিক সময়ে এরকম বেশকিছু মেগাস্লাম্প সাইবেরিয়া জুড়ে দেখা গেলেও, গবেষকদের ধারণা ব্যাটাগাইকা এই অঞ্চলের মেগাস্লাম্পগুলো অন্য গুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক। এই অঞ্চলটি ইয়াকুটস্ক শহরের ৬৬০ কিলোমিটার (৪১০ মাইল) উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত।

এই খাঁদ টি যে শুধুই বড় তা কিন্তু না। প্রায় ১ কিলোমিটার লম্বা এবং ৮৬ মিটার (২৮২ ফিট) গভীর এই খাঁদটি ক্রমবর্ধমান।

২০১৬ সালের একটি গবেষনায় জার্মানির আলফ্রেড ওয়েজেনার ইনস্টিটিউট এর ফ্র্যাঙ্ক গানথার প্রকাশ করেন যে, গত এক দশকে এই খাঁদটি প্রতি বছরে গড়ে প্রায় ১০ মিটার করে বেড়ে চলছে এবং অপেক্ষাকৃত গরম সময়ে প্রতি বছরে এর বৃদ্ধি ৩০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে।

তিনি আরো আশংকা করেন, ভবিষ্যতে উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রার বৃদ্ধির জন্য খাঁদের আকার বৃদ্ধি পেতে পারে এবং তা পার্শ্ববর্তী উপত্যকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বরফের উপরে তৈরি হওয়া ভূমির ধ্বস হতে পারে।

বিবিসি হতে আগত মেলিসাকে গানথার বলেন,“গড়ে অনেক বছর আমরা এমনও দেখেছি যে খাঁদ এর বৃদ্ধির হার খুব বেশি বাড়েও নি আবার কমেও নি, কিন্তু এর গভীরতা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।”

প্রতিবছর ই বেড়ে চলেছে এই খাঁদ; image source :eoimages.gsfc.nasa.gov

আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য এটি খুব ভালো সংবাদ নয়। এই খাঁদের গঠন প্রথম শুরু হয় ১৯৬০ সালে নিকটবর্তী বিশাল অরন্যের বিনাশ ঘটানোর পরে।

২০০৮ সালে ভয়াবহ বন্যা এই বরফের গলনকে আরো ত্বরান্বিত করে এবং খাঁদের বৃদ্ধিতে অবদান রাখে।

এই এলাকার অস্থায়িত্ব শুধুমাত্র স্থানীয়দের জন্য বিপজ্জনক নয়। উদ্বেগের বিষয় যে, এই খাঁদ যত গভীর হবে তত এটি কার্বনের ভান্ডার উন্মুক্ত করে দেবে, যা হাজার হাজার বছর ধরে চাপা পড়ে ছিল।

বিবিসিকে গানথার বলেন, “বায়ুমন্ডলে যে পরিমান কার্বন রয়েছে তা সমগ্র ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চল এ চাপা পড়ে থাকা কার্বনের সমান।”

খাঁদের বরফ যত গলতে থাকবে ততই এটি বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউস গ্যাস ছাড়তে থাকবে এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরো বেড়ে যাবে।

“এটাকেই আমরা বলি ধনাত্নক প্রতিক্রিয়া”, যোগ করলেন গানথার। “উষ্ণতা বাড়ায় উষ্ণতা, এবং এই প্রতিক্রিয়া অন্যান্য স্থানেও হতে পারে।”

কিন্তু সব খারাপ খবরের মধ্যেও কিছু ভালো খবর আছে।  ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি তে এক গবেষণায় বলা হয় যে, খাঁদে যেসকল লেয়ার আবিষ্কার হয়েছে বা হচ্ছে তাতে ২০০,০০০ বছরের পুরোনো আবহাওয়ার তথ্য সংরক্ষিত আছে।

এছাড়াও এখানে বরফে জমে থাকা অনেক পুরোনো বন-জঙ্গল, পরাগরেণুর নমুনা এবং এমনকি ষাঁড়, ম্যামথ এবং ৪,৪০০ বছর পুরোনো ঘোড়ার অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে।

জুলিয়ান মুরটনের আবিষ্কৃত গাছের গুড়ি; image source : sciencealert.com

এই রিসার্চ টি ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্স এর জুলিয়ান মুরটন করেছিলেন, যিনি বলেছেন এইসকল আবিষ্কৃত পলিমাটি আমাদের বুঝতে সহায়তা করবে যে সাইবেরিয়ার আবহাওয়া পূর্বে কিভাবে পরিবর্তন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা কিভাবে হবে।

যেখানে বিগত ২০০,০০ বছরে পৃথিবী উষ্ণ এবং ঠান্ডা উভয় অবস্থার মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করেছে সেখানে সাইবেরিয়ার আবহাওয়ার ইতিহাস একেবারেই অজানা।

কিন্তু মুরটন এর ভাষ্যমতে সাইবেরিয়ায় শেষ এই ধরনের স্লাম্পিং হয়েছিল প্রায় ১০,০০০ বছর আগে যখন পৃথিবী তার শেষ বরফ যুগ থেকে বের হয়ে আসছিল।

বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউজ গ্যাসের মাত্রা সেই সময়ের চাইতে এখন অনেক বেশি। আমরা ৪০০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) কার্বন-ডাই-অক্সাইড পার করে ফেলেছি যেখানে সর্বশেষ বরফ যুগ যখন শেষ হয় তখন তা ছিল ২৪০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম)।

ব্যাটাগাইকার এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বরফের লেয়ার রয়েছে যেখানে দুইটি পুরু বন-জঙ্গলের আস্তরন আছে যা পুর্বের উষ্ণ থেকে উষ্ণতর আবহাওয়ার নির্দেশ করে বর্তমান সময়ের আবহাওয়ার চাইতে।

ওপরের বন-জঙ্গলের আস্তরনটি আরেকটি পুরোনো মাটির আস্তরনের উপর আছে যা সম্ভবত পূর্বে যখন আবহাওয়া উষ্ণ হয়েছিল তখন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গলে গিয়েছিল। তবে গলে কি হয়েছিল তা জানতে পারলে হয়ত আমরা পরবর্তীতে যখন এরকম হবে তার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারবো।

কাছে থেকে ব্যাটাগাইকা খাঁদ দেখতে যেমন; image source : inhabitat.com

কিন্তু এ বিষয়ে আরো গবেষনা দরকার, “কারণ খাঁদে আবিষ্কৃত পলিমাটির সঠিক বয়স আমরা এখনো জানি না” বলেন মুরটন।

তিনি এখন এই অঞ্চলে গর্ত খনন করার চিন্তা করছেন, এতে করে তিনি প্রাপ্ত পলিমাটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝতে পারবেন অতীতে আসলেই কি হয়েছিল এখানে।

“সর্বশেষভাবে, আমরা আসলে দেখতে চাচ্ছি সাইবেরিয়াতে শেষ বরফ যুগে যা হয়েছিল তা উত্তর অ্যাটলান্টিক এর সাথে মিল আছে কি না।” – মুরটন ।

সাইবেরিয়ার ব্যাটাগাইকা খাঁদেই হয়ত হাজার বছরের পুরোনো পৃথিবীর রহস্য লুকিয়ে আছে। এখন শুধু তা সবার সামনে আসার অপেক্ষা করছে মাত্র।

featured image: news.nationalgeographic.com