চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের গল্প

স্ট্যান্ডার্ড মডেলে(১)  বস্তুর গঠনের জন্য দায়ী কণা তথা ম্যাটার পার্টিকেলের মাঝে অন্যতম হলো কোয়ার্ক। ফার্মিয়ন শ্রেণির এই কোয়ার্ক কণাদের সর্বমোট ৬টি ভিন্ন ভিন্ন ফ্লেভার আছে। এদের নাম হলো আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক, চার্ম কোয়ার্ক, স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক, টপ কোয়ার্ক ও বটম কোয়ার্ক। আজকে আমারা চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সম্পর্কে জানবো। চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক নিয়ে প্রথমেই বলে রাখা ভাল, নামকরণে এদের নামের ইংরেজি অর্থ ভূমিকা রাখে না। এগুলো পরিচয়জ্ঞাপক নাম মাত্র।

কণা-পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে দেখা যায় চার্ম ও স্ট্রেজ কোয়ার্ক ২য় প্রজন্মের(২) কোয়ার্ক কণা। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সালের মাঝে যখন এইট-ফোল্ড তত্ত্ব(৩) গঠিত হয় এবং তা থেকে বিজ্ঞানী মারি গেলম্যান হ্যাড্রনদের(৪) নতুন একটি গাঠনিক মডেল প্রকাশ করেন। তখন কোয়ার্কের ৬টি ফ্লেভারের কথা কেউ জানতো না। মনে করা হতো, সকল হ্যাড্রন কণাই আপ ও ডাউন কোয়ার্ক সমৃদ্ধ এবং কিছু কিছু কণাতে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক রয়েছে।

এইট ফোল্ড তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ১৯৬৪ সালে মারি গেলম্যান ও জর্জ জিউগ সর্বপ্রথম এই কণার তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী করেন। এইট ফোল্ড তত্ত্বের এই ভবিষ্যদ্বাণী অনুসরণ করে ১৯৬৮ সালে স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার একসিলারেটর সেন্টার (SLAC) আপ, ডাউন এবং স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন। স্ট্রেঞ্জ কণার ভবিষ্যদ্বাণীতে কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস নামক একটি ধর্মের কথা স্মরণীয়। চার্জ, ভর বা স্পিন যেমন কণাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য তেমনি স্ট্রেঞ্জনেসও কণাদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

চিত্র: স্ট্যান্ডার্ড মডেলে চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অবস্থান। বাম দিক থেকে ২য় কলামে, উপরের দুটি।

স্ট্রেঞ্জনেস ধর্মকে একটি ফ্লেভার কোয়ান্টাম সংখ্যার সাহায্যে বর্ণনা করা যায়। একে s দ্বারা প্রকাশ করা যায়। কোনো কণার স্ট্রেঞ্জনেস বলতে বোঝায়, ঐ কণার অন্তর্গত স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণার সংখ্যা থেকে অ্যান্টি-স্ট্রেঞ্জ কণার সংখ্যা বিয়োগ করে বিয়োগফলের ঋণাত্বক মান।

যেমন, কোনো একটি হ্যাড্রনে xটি স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণা ও zটি অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণা থাকলে, ঐ কণার স্ট্রেঞ্জনেসের (s) মান হবে, s = -(x – z) অর্থাৎ কণাটিতে যদি স্ট্রেঞ্জনেসের মান ধনাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি।

আর যদি স্ট্রেঞ্জনেস ঋণাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। যেমন: একটি স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের স্ট্রেঞ্জনেস হচ্ছে -১ আবার অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের স্ট্রেঞ্জনেস হচ্ছে +১। একটি প্রোটন বা নিউট্রন, উভয়েরই স্ট্রেঞ্জনেস ০। কেননা স্বাভাবিক অবস্থায় প্রোটন বা নিউট্রনে কোনো স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক বা অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক থাকে না।

স্ট্রেঞ্জনেস নামক কণাদের এই ধর্মের ধারণা প্রদান করেন মারি গেলম্যান ও কাজুহিকো নিশিজিমা। কণাদের বিভিন্ন সংঘর্ষ ও মিথস্ক্রিয়ায় উৎপন্ন কায়ন, হাইপারন, সিগমা ডি মেসন ইত্যাদি কণার আচরণ ব্যাখ্যায় ১৯৫৫ সালের দিকে গেলম্যান-নিশিজিমা সূত্র গঠন করা হয়। এসব কণারা যখন সবল নিউক্লিয় বলের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া করে তখন তাদের আয়ু হয় অনেক কম। কিন্তু সেই একই কণা যদি দুর্বল নিউক্লিয় বলের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া করে তখন তাদের আয়ু হয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

এই ঘটনা ব্যাখ্যায় কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস ধর্মের উৎপত্তি। যাই হোক, স্ট্রেঞ্জনেস ধারণার পর স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ অ্যান্টিকোয়ার্কের ধারণা আসলেও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সমৃদ্ধ যৌগিক কণা দেখা যায় অনেক আগেই। ১৯৪৭ সালেই কসমিক রশ্মিতে কায়ন কণার অস্তিত্ব দেখা যায়। স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক আবিস্কারের পর জানা যায়, কায়ন কণা মূলত স্ট্রেঞ্জ কণা দ্বারা গঠিত।

চিত্রঃ কোয়ার্ক মডেল, এইটফোল্ড ওয়ে, স্ট্রেঞ্জনেসসহ কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের গ্রুপ প্রতিসাম্য ভাঙনের সফল ব্যাখ্যাদানকারী বিজ্ঞানী মারি গেল ম্যান।

স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের চার্জ -১/৩ e এবং স্ট্রেঞ্জনেস -১। এই কণার আইসোস্পিন(৫) ০, ব্যারিয়ন সংখ্যা(৬) +১/৩ এবং স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা +১/২। স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের ভর ৯৫ MeV/c2 অর্থাৎ ভরের দিক থেকে এই কণা ৬টি কোয়ার্কের মাঝে ৪নং স্থানে আছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেলে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অবস্থান চার্ম কোয়ার্কের ঠিক নিচেই।

আবিষ্কারের দিক থেকে চার্ম কোয়ার্ক চতুর্থ নম্বর এবং ভরের দিক থেকে ৩ নম্বর। বহুদিন ধরে ভাবা হতো এই ৩টি কোয়ার্কই মৌলিক কণা। কিন্তু চার্ম কোয়ার্ক আবিষ্কার হবার পর এই ধারণা ভেঙে যায়। চার্ম কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক উভয়টিই ২য় প্রজন্মের কোয়ার্ক বলে তাদের বেশ কিছু ধর্মের সাদৃশ্য বিদ্যমান। চার্ম কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের মোট কৌণিক ভরবেগ, আইসোস্পিন, স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা ও ব্যারিয়ন সংখ্যা একই। আলাদা হলো ভর ও চার্জ। চার্ম কোয়ার্কের ভর ১২৭৫ MeV/c2 এবং চার্জ হলো +২/৩ e।

“ফ্লেভার পরিবর্তক নিরেপেক্ষ প্রবাহ” (Flavor-Changing Neutral Current) নামে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বে একটি টার্ম আছে। এটি দ্বারা বোঝায় কোনো একটি ফার্মিয়নের(৭) বৈদ্যুতিক চার্জ ঠিক রেখে শুধু ফ্লেভারের পরিবর্তন করা। এটি প্রকৃতিতে ঘটে না। যদিও ল্যাগ্রাঞ্জিয়ান মিথস্ক্রিয়া অনুসারে এটি ঘটার কথা।

এই FCNC ঘটার কথা থাকলেও কেন ঘটে না তার ব্যাখ্যা দিতে মঞ্চে আসে GIM মেকানিজম। ১৯৭০ বিজ্ঞানী শেলডন গ্লাসো, জন ইলোপুলাস ও লুচিয়ানো মায়ানি এই GIM মেকানিজম দ্বারা দেখান যে, কেন FCNC প্রাকৃতিকভাবেই দমিত থাকে।

কিন্তু GIM মেকানিজম সত্যি হতে হলে ৩টি কোয়ার্ক কণা যথেষ্ট ছিল না। আরেকটি কোয়ার্কের তাত্ত্বিক অস্তিত্ব চলে আসছিল। এর কিছুদিন পরেই ১৯৭৪ সালে ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী স্যামুয়েলটিঙ ও স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার একসিলারেটর সেন্টারের বিজ্ঞানী বার্টন রিখটার কর্তৃক চার্ম কোয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।

চিত্রঃ Stanford Linear Accelerator Center

কণাদের স্ট্রেঞ্জনেসের মতো চার্মনেস বলেও একটি পরিভাষা আছে। তবে একে ঠিক চার্মনেস না বলে চার্ম বলা হয়। অর্থাৎ কোয়ার্কের নামও চার্ম এবং ধর্মের নামও চার্ম। স্ট্রেঞ্জনেসের সাথে চার্ম ধর্মের কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন, কোনো একটি হ্যাড্রনে xটি চার্ম কণা ও zটি অ্যান্টিচার্ম কণা থাকলে, ঐ কণার চার্ম (c) মান হবে, c = x – z অর্থাৎ কণাটিতে যদি চার্ম মান ধনাত্মক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় চার্ম কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি। আর যদি চার্ম মান ঋণাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় অ্যন্টিচার্ম কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি।

অর্থাৎ চার্ম ধর্ম স্ট্রেঞ্জনেসের পুরো উলটো। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। একটি চার্ম কোয়ার্কের চার্ম মান হচ্ছে +১ আবার অ্যান্টিচার্ম কোয়ার্কের চার্ম মান হচ্ছে -১। একটি প্রোটন বা নিউট্রন, উভয়েরই চার্ম মান ০। স্ট্রেঞ্জনেসের বেলায় একটি মাইনাস চিহ্ন থাকে, যেটি চার্ম মানের বেলায় থাকে না।

এর কারণ হলো, প্রথাগতভাবে ফ্লেভার চার্জ তথা স্ট্রেঞ্জনেস, চার্ম মান, বটমনেস, টপনেস, আইসোস্পিন ইত্যাদি এবং বৈদ্যুতিক চার্জ- এই দুই চার্জের চিহ্ন একই রাখা হয়। এই নিয়ম মানতে গিয়ে স্ট্রেঞ্জনেস ও বটমনেসের আগে মাইনাস চিহ্ন আসলেও টপনেস ও চার্ম মানের আগে মাইনাস চিহ্ন আসে না।

চার্ম কোয়ার্কযুক্ত হ্যাড্রন কণাদেরও চার্ম কোয়ার্ক আবিষ্কারের আগেই পাওয়া গিয়েছিল। ডি মেসন, জে বাই সাই মেসন, চার্মড সিগমা মেসন ইত্যাদি মেসন কণাতে চার্ম কোয়ার্ক আছে। মেসন কণা বাদেও ব্যারিয়ন কণাতেও চার্ম কোয়ার্ক পর্যবেক্ষিত হয়েছে। চার্ম কোয়ার্কের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই কোয়ার্কের কোয়ার্কোনিয়াম(৮) অবস্থা অনেকগুলো।

অর্থাৎ একটি চার্ম কোয়ার্ক ও আরেকটি চার্ম অ্যান্টিকোয়ার্ক মিলে অনেকগুলি অবস্থা সৃষ্টি করে। যেমন, জে বাই সাই, চার্মড ইটা (1s), সাই (৩৬৮৬), সাই (৩৭৭০) ইত্যাদি। তবে চার্মোনিয়াম এর (একটি চার্ম ও একটি অ্যান্টিচার্ম কোয়ার্ক) ভূমি অবস্থা বা গ্রাউন্ড স্টেট হলো জে বাই সাই মেসন।

চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ- এই দুই কোয়ার্ক কণার আবিস্কার ছিল কণা পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী। কেননা এই দুই কোয়ার্ক কণা একটি নতুন প্রজন্মের কোয়ার্ক কণার যুগ সূচনা করেছিল। একসময় মনে করা হতো সকল কণায় আপ ও ডাউন কোয়ার্কের বিভিন্ন অবস্থার এবং বিভিন্ন অনুপাতের সংমিশ্রণ। আসলে সেটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে এই চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক আবিষ্কারের মাধ্যমেই।

আমরা এখন জানি, অধিকাংশ কণাই আপ ও ডাউন কোয়ার্ক সমৃদ্ধ হলেও কিছু কণা চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সমৃদ্ধ। প্রোটন ও নিউট্রনে শুধু আপ ও ডাউন কোয়ার্ক কণাই রয়েছে- এই তথ্যটিও ভুল প্রমাণ হয়েছে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক নিয়ে গবেষণার ফলে।

একটি প্রোটনে দুইটি আপ ও একটি ডাউন কোয়ার্ক ছাড়াও আরো যেকোনো সংখ্যক স্ট্রেঞ্জোনিয়া (স্ট্রেঞ্জোনিয়ামের বহুবচন) থাকতে পারে। প্রোটন ও নিউট্রন দেখতে ঠিক কেমন ও প্রোটন-নিউট্রনের ভেতরের কাহিনী নিয়ে আরেকদিন লেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করছি। আজকে চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের কাহিনী বলে কোয়ার্কের জগতের সৌন্দর্য অনুধাবন করার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিলাম।

পাদটীকা

(১) মহাবিশ্বের কণাসমূহের মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যা প্রদানকারী একটি তত্ত্বের নাম স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

(২) স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কণাসমূহকে ৩টি প্রজন্মে ভাগ করা যায়। এই ৩টি প্রজন্মকে কীসের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে, তা এখনও অমিমাংসিত।

(৩) মেসন ও ব্যারিয়ন কণাগুলোকে তাদের বিভিন্ন ধর্ম যেমন চার্জ, স্ট্র্যাঞ্জনেস, স্পিন ইত্যাদির ভিত্তিতে অষ্টকরূপে বিন্যাস করা যায়। য্যুভ্যাল নিম্যান ও মারি গেল ম্যান কর্তৃক প্রদত্ত এই বিন্যাসকে এইট-ফোল্ড তত্ত্ব বলে।

(৪) কোয়ার্ক ও লেপটন মিলে যে যৌগিক কণা তৈরি করে তাকে হ্যাড্রন বলে। হ্যাড্রন ২ প্রকার। হ্যাড্রনের মাঝে যেখানে একটি কোয়ার্ক ও একটি যেকোনো অ্যান্টিকোয়ার্ক থাকে, তাকে মেসন বলে। অন্যপ্রকার হ্যাড্রনে ৩টি কোয়ার্ক থাকে। একে ব্যারিয়ন বলে।

(৫) আইসোস্পিন একটি এককবিহীন কোয়ান্টাম সংখ্যা। সবল নিউক্লিয় বলের মিথস্ক্রিয়ায় এই কোয়ান্টাম সংখ্যাটি অপরিবর্তিত থাকে।

(৬) একটি কণার অন্তর্গত মোট কোয়ার্ক সংখ্যা থেকে প্রতিকোয়ার্ক সংখ্যার বিয়োগফলের এক-তৃতীয়াংশকে ব্যারিয়ন সংখ্যা বলে। একটি কোয়ার্কের ব্যারিয়ন সংখ্যা +১/৩ এবং অ্যান্টিকোয়ার্কের ব্যারিয়ন সংখ্যা -১/৩

(৭) যেসব কণারা ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন মেনে চলে তথা যাদের স্পিন পূর্ণসংখ্যা নয়, বরং ভগ্নাংশ, তাদের ফার্মিয়ন বলে। সকল কোয়ার্ক ও লেপটন মিলে ফার্মিয়ন শ্রেণি গঠিত।

(৮) একটি কোয়ার্ক কণা ও ঐ কোয়ার্কেরই প্রতিকণা মিলে যে যৌগিক কণা তৈরি হয়, তাই কোয়ার্কোনিয়াম।

তথ্যসূত্র

  1. http://en.wikipedia.org/wiki/Book:Quarks
  2. http://en.wikipedia.org/wiki/Quark
  3. http://en.wikipedia.org/wiki/Charm_quark
  4. http://en.wikipedia.org/wiki/Strange_quark
  5. http://en.wikipedia.org/wiki/Book:Particles_of_the_Standard_Model
  6. http://en.wikipedia.org/wiki/Eightfold_Way_(physics)
  7. http://en.wikipedia.org/wiki/Quarkonium
  8. http://en.wikipedia.org/wiki/Strangeness
  9. http://en.wikipedia.org/wiki/Charmness
  10. http://en.wikipedia.org/wiki/Flavor-changing_neutral_current

মেসন তত্ত্ব ও একজন ইউকাওয়া

কল্পনা করুন আপনার হাতে দুইটি লোহার দণ্ড আছে। যদি দণ্ড দুটি হাত থেকে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে কী হবে? যদি সেগুলো বেঁধে রাখা না হয় তাহলে আলাদা হয়ে নীচে পড়ে যাবে। কিন্তু সেই লোহার দণ্ডের পরিবর্তে যদি এবার চুম্বকের দণ্ড নেয়া হয় তবে কী ঘটবে? এবার কিন্তু আর আলাদা হয়ে যাবে না। চুম্বকদ্বয় পরস্পর আকর্ষণ বলের সাহায্যে একত্রে লেগে থাকবে। অর্থাৎ কোনোকিছুকে একত্রে রাখতে হলে অবশ্যই একটি আকর্ষণ বলের প্রয়োজন। এবার কল্পনার পরিসীমা বিবর্ধিত করে কোয়ান্টাম জগতে যাওয়া যাক।

কণা হিসেবে পরমাণু হলো নিরপেক্ষ এবং স্থায়ী। এর মাঝে আছে ধনাত্মক নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে এর চারিদিকে ঋণাত্মক ইলেকট্রন প্রদক্ষিণ করছে। ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস বিপরীত চার্জে চার্জিত বলে তারা পরস্পরকে আকর্ষণ বলে আকর্ষণ করছে। ইলেকট্রন এ কারণেই তার গতির জন্য ছিটকে পরমাণুর বাইরে চলে আসতে পারে না, নিউক্লিয়াসের আকর্ষণে বাঁধা থাকে। কিন্তু নিউক্লিয়াস কোনো মৌলিক কণা নয়। এর মাঝে আছে প্রোটন ও নিউট্রনের সমাহার।

এদের মাঝে নিউট্রন নিরপেক্ষ কণা, আর প্রোটন ধনাত্মক কণা। যেহেতু সমধর্মী চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে সেহেতু দুটি প্রোটনের মাঝে প্রচণ্ড বিকর্ষণ বল কাজ করে। এতে নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব নষ্ট হবার কথা। কিন্তু তা দেখা যায় না বরং ভারী কিছু নিউক্লিয়াস ছাড়া প্রায় সব নিউক্লিয়াসই দীর্ঘস্থায়ী। বিজ্ঞানীরা নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেকদিন ধরে নাকানি-চুবানি খেয়ে অবশেষে ১৯৩২ সালে পরিত্রান পান।

১৯৩২ সালে বিজ্ঞানী চ্যাডউইক কর্তৃক আরেকটি নিউক্লিয়ন (নিউট্রন) আবিষ্কার হবার পর নিউক্লিয়াসের গঠন সম্পর্কেও বিজ্ঞানীরা কিছুটা স্পষ্ট হতে পেরেছিলেন। এর কিছু সময় পরেই এশীয় বিজ্ঞানী হিদেকী ইউকাওয়া তার বিখ্যাত ‘মেসন তত্ত্বে’র মাধ্যমে নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব ব্যাখ্যা করেন। নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের জন্য কোনো একধরনের বল দায়ী এবং সেই বলের বাহক কণা হিসেবে কোনো কণা কাজ করে। এই তথ্য ধীরে ধীরে জানা যায়। তবে মেসন তত্ত্ব প্রমাণিত হতে আরো ১৫ বছর সময় লেগে যায়।

১৯০৭ সালের ২৩ জানুয়ারি বিজ্ঞানী হিদেকী ইউকাওয়া জাপানের কিয়োটো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে অবশ্য তার নাম হিদেকী ইউকাওয়া  ছিল না, ছিল হিদেকী ওগাওয়া। স্কুল জীবনে তেমন ভালো ছাত্র না হলেও গণিতের প্রতি হিদেকীর অপার আগ্রহ ছিল। তবে কলেজ পর্যায়ে এসে হিদেকীর গণিতের উপর বিতৃষ্ণা চলে আসে।

একবার তিনি ভিন্ন নিয়মে অঙ্ক করাতে তার শিক্ষক সেটা কেটে দেয়। এতে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে হিদেকী গণিত পড়ার বা গণিতবিদ হবার ইচ্ছা বাদ দেন। আবার কলেজ পর্যায়েই একদিন বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন যার জন্য তাকে ভৎসর্না শুনতে হয়েছিল। তাই রাগ করে ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যা নিয়েও কাজ করবেন না বলে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন।

চিত্রঃ বিজ্ঞানী ইউকাওয়া।

অসম্ভব মেধাবী এবং খামখেয়ালী এই বিজ্ঞানী কোনোমতে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর ঝুঁকে পড়েন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে। ১৯৩২ সালে বিয়ে করার পর নিজের পারিবারিক নাম ‘ওগাওয়া’ থেকে ‘ইউকাওয়া’তে পরিবর্তন করেন এবং ‘হিদেকী ইউকাওয়া’ রূপে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত নিবিড় গবেষণা করে তিনি তার মেসন তত্ত্ব তৈরি করেন। এর মাধ্যমে নিউক্লিয়নের মাঝে আকর্ষণ বল কীরূপে কাজ করে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে কণা-পদার্থবিদরা জানতে পারে নতুন এক শ্রেণির কণার নাম।

নিউক্লিয়াসে পরমাণু ভেদে অনেক সংযুক্তির প্রোটন থাকে এবং কোনো এক অদৃশ্য আকর্ষণ বলের প্রভাবে তারা স্থির বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বলের বিপরীতে কাজ করতে পারে। এই বলের মাধ্যমে তারা একত্রে থাকতে পারে। এই বলকে বলে রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বল। আরো একপ্রকার সবল নিউক্লীয় বল আছে যা কোয়ার্ক-গ্লুয়ন এর মধ্যে কাজ করে। উল্লেখ্য কোয়ার্ক-গ্লুয়নের অবস্থান প্রোটন ও নিউট্রনের মাঝে। এখানে বিদ্যমান সবল বলের নাম মৌলিক সবল নিউক্লীয় বল।

নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের সাথে মৌলিক সবল নিউক্লীয় বলের কোনো সম্পর্ক নেই। আছে নিউক্লীয়নের উপর কাজ করা রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বলের। হিদেকী ইউকাওয়া দেখেছিলেন এই রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বলের বাহক কণার ভর ইলেকট্রন ও প্রোটনের ভরের মাঝামাঝি হবে। তাই গ্রীক শব্দ ‘মেসো’ অর্থ মাঝামাঝি থেকে এই বাহক কণার নামকরণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘মেসোট্রন’ কণা। পরবর্তীতে কণা পদার্থবিজ্ঞানের আরেক দিকপাল বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ কর্তৃক কণাটির নাম সংশোধিত হয়ে হয়। তিনি এর পরিবর্তিত নাম প্রদান করেন ‘মেসন’ (Meson) কণা।

মেসন কিন্তু একক কোনো কণা নয়। এটি মূলত কণাদের একটি শ্রেণি। মেসন শ্রেণির কণাদের মাঝে অনেক কণা আছে। যেমনঃ পাই মেসন (পায়ন), কায়ন, রো মেসন ইত্যাদি। হিদেকী ইউকাওয়ার দেয়া মেসন তত্ত্ব বর্তমানে এসে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক ধারণা মতে সকল মেসন কণারা যেহেতু বল বাহক কণা এবং তাদের সংখ্যায়ন বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়নের সাথে মিলে যায় তাই তারা বোসন শ্রেণির কণা। অর্থাৎ সকল মেসনই বোসন, তবে সকল বোসন মেসন নয়।

বোসন কণারা বলবাহক কণা, অর্থাৎ তারা বল বহন করে। যেকোনো ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা থেকে সর্বদাই অগণিত বোসন কণা নির্গত হচ্ছে এবং তা পুনরায় ঐ ফার্মিয়ন কর্তৃকই শোষিত হচ্ছে। কিন্তু যখন একটি ফার্মিয়ন কণার পাশে আরেকটি ফার্মিয়ন কণা চলে আসে তখন এক ফার্মিয়ন কর্তৃক নিঃসৃত বোসন কণা আরেক ফার্মিয়ন কর্তৃক শোষিত হয়। এই সময়ই আকর্ষণ-বিকর্ষণের ঘটনা ঘটে।

নিউক্লিয়াসের প্রতিটি প্রোটন থেকে সর্বদাই মেসন কণা নিক্ষিপ্ত হয়, যে মেসন কণা পুনরায় অপর প্রোটন কর্তৃক শোষিত হয়। ফলে তাদের মাঝে একটি আকর্ষণ বল কাজ করে। সকল পরিস্থিতিতে এরকম হলে দুটি প্রোটনকে কখনোই আলাদা করা যেত না। কিন্তু এরকম হয় না।

প্রোটন-প্রোটনের এই আকর্ষণ বল খুবই অল্প পরিসরে বিরাজমান থাকে। শুধুমাত্র নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরেই এই আকর্ষণ বল কাজ করে। প্রোটন দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব যখন নিউক্লিয়াসের ব্যাসের চেয়ে বড় হয়ে যায় তখন আর এই আকর্ষণ বল কাজ করে না। ঐ পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড বিকর্ষণ বল কাজ করবে। কারণ তখন কুলম্বের স্থির বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বল কাজ করবে।

মেসন শ্রেণির কণাদের আয়ু খুবই কম। এ ধরনের কণা এক প্রোটন হতে নির্গত হয়ে বেশি দূর যেতে পারে না। তাই এদের আয়ুষ্কালে এরা যত দূর যেতে পারে অন্য প্রোটনটি যদি সেই সীমার মাঝে থাকে তবেই আকর্ষণ বল কার্যকর হয়। অন্যথায় এই আকর্ষণ বল কাজ করে না।

আবার প্রশ্ন জাগতে পারে, যখন নিউক্লীয়নগুলো আকর্ষিত হয় তখন কি বিকর্ষণ বল কাজ করে না? অবশ্যই করে। কিন্তু আকর্ষণ বলের মান বিকর্ষণ বলের চেয়ে অনেক বেশি বলে বিকর্ষণ বল লোপ পেয়ে আকর্ষণ বলই সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ লব্ধির দিক থেকে আকর্ষণ বল জয়ী হয়।

যেহেতু এই আকর্ষণ বল বিশাল একটি বিকর্ষণ বলের বিরুদ্ধে থেকে নিজের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করে তাই এখান থেকে সহজেই বোঝা যায় এই আকর্ষণ বল কতটা শক্তিশালী। একারণেই এর নাম সবল নিউক্লীয় বল। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত সকল মৌলিক বলগুলির মাঝে এই বল শক্তিশালী।

চিত্রঃ প্রোটন ও নিউট্রনের আভ্যন্তরীণ গঠন।

আধুনিক ধারণা মতে মেসন কণা একটি কোয়ার্ক কণা ও একটি অ্যান্টি-কোয়ার্ক কণা দ্বারা গঠিত। যেমনঃ পায়ন কণা একটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। আবার কোয়ার্কোনিয়ামগুলোও একপ্রকার মেসন কণা।

কোয়ার্কোনিয়াম হচ্ছে একটি কোয়ার্ক ও ঐ কোয়ার্কেরই অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। যেমনঃ একটি বটম কোয়ার্ক ও একটি বটম অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা যে বটমোনিয়াম গঠিত হয় তার নাম এপসিলন মেসন। ইউকাওয়া যে বাহক কণা কল্পনা করেছিলেন তার ভর তিনি ধরেছিলেন ১০০ MeV/c2 এর কাছাকাছি। বর্তমানে দেখা গেছে, সবচেয়ে হালকা মেসনের ভর ১৩৪.৯ MeV/c2 এবং সবচেয়ে ভারী মেসন হলো ৯.৪৬০ GeV/c2 ভরের।

১৯৩৪ সালে আবিষ্কৃত হবার পর ইউকাওয়া কর্তৃক ভবিষ্যদ্বাণীকৃত মেসন কণার খোঁজ শুরু হয়। সর্বপ্রথম ১৯৩৬ সালে কার্ল অ্যান্ডারসন কর্তৃক মিউয়ন কণা আবিষ্কৃত হয়। এর ভর মেসন কণার ভরের কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই একে মেসন মনে করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেছে এটি ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা ২য় প্রজন্মের একটি লেপটন মাত্র। তাই ঐতিহাসিকভাবে মিউয়নকে এখনো ভুল করে অনেকে মিউ মেসন বলে ডেকে থাকে।

সর্বপ্রথম প্রকৃত মেসন কণার খোঁজ পাওয়া যায় ১৯৪৭ সালে। প্রথম জ্ঞাত মেসন কণার নাম হচ্ছে পাই-মেসন। এই মেসন কণা পাবার পরপরই ১৯৪৯ সালে হিদেকী ইউকাওয়াকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

এশিয়ার বিজ্ঞানীদের মাঝে হিদেকী ইউকাওয়ার নাম অত্যন্ত স্মরণীয়। কণা-পদার্থবিদ্যায় হিদেকী ইউকাওয়ার হাত ধরেই উঠে এসেছে বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা জাপানি কণা-পদার্থবিদ। তন্মধ্যে ৩য় প্রজন্মের কোয়ার্কের ভবিষ্যদ্বাণী প্রদানকারী মাসাকাওয়া এবং কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস নিয়ে গবেষণাকারী বিজ্ঞানী নিশিজিমার নাম অন্যতম।

হিদেকী ইউকাওয়া জাপানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Yukawa Institute for Theoretical Physics যা এখনো কণা-পদার্থবিদ্যা, স্ট্রিং তত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিপদার্থবিদ্যা, নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যা, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তত্ত্বের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা বিদ্যমান। ১৯৮১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর হিদেকী ইউকাওয়া মৃত্যুবরণ করলেও বিজ্ঞানীদের নিকট এখনও তিনি একটি স্মরণীয় নাম।

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Meson
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_mesons
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Strong_interaction
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Nuclear_force
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Pion
  6. https://en. wikipedia.org/wiki/Hideki_Yukawa
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Yukawa_Institute_for_Theoretical_Physics
  8. http:// curtismeyer.com/material/lecture.pdf
  9. http://minimafisica.biodec.com/Members/k/machleidt-potentials.pdf

featured image: globalfirstsandfacts.com