খাবার কেন পচে?

খাদ্য যে খাওয়ার অযোগ্য বা নষ্ট হয়ে গেছে তা খাবারের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ প্রভৃতি দেখে সহজেই আঁচ করা যায়। কোনো খাবার তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়, কোনোটা আবার অনেকদিন ভালো থাকে। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই ঘটে। কেন হচ্ছে এরকম পচনশীলতার তারতম্য? বুঝতে হলে চিনতে হবে সৃষ্টির সেই অংশকে যাদের একটি বড় অংশ আমাদের খালি চোখে সাধারণত দৃশ্যমান নয়।

বিভিন্ন অণুজীব খাবার নষ্টের জন্য দায়ী। খাবারে যেসব পুষ্টি উপাদান থাকে এরা সেগুলোকে ভেঙ্গে ফেলে ছোট ছোট অংশে। এসব খাবারের ক্ষুদ্রাংশ সহজেই তাদের কোষ প্রাচীরের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে। এতে খাবারের স্বাভাবিক গঠন আর আগের মতো থাকে না। এ প্রক্রিয়ার ফলে যেসব উপজাত তৈরি হয় সেগুলোই মূলত দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে এবং খাবারকে বিস্বাদ করে একেবারেই খাওয়ার অনুপযোগী করে তোলে।

অণুজীবগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক (ঈস্ট, মোল্ড) ইত্যাদি। খাবারে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে মোল্ড। মোল্ডের সূক্ষ্ম শাখাতন্তু হাইফির বর্ধিষ্ণু অগ্রভাগে একপ্রকার এনজাইম তৈরি হয় যা সেলুলোজ বা স্টার্চ এর মতো মজবুত অণুকে ভেঙ্গে কম মজবুত নরম পদার্থে রূপান্তর করে। খাবারের গায়ে বা ওপরে যে দাগ এবং স্তর দেখা যায় তা প্রকৃতপক্ষে জালের মতো পরষ্পর সংযুক্ত বৃহৎ হাইফি কলোনি, যা খাদ্য দ্রব্যের পৃষ্ঠদেশের উপরে থেকে বেড়ে চলে।

ঈস্ট এবং ব্যাকটেরিয়াও খাবার নষ্টের ব্যপারে কম যায় না। খাবারের বারোটা বাজাতে ঈস্ট বেছে নেয় গাঁজন প্রক্রিয়া। আচারের উপর আমরা যে শুকনো স্তর জমতে দেখি তা মহামান্য ঈস্টেরই কাণ্ড। বিভিন্ন স্পোর এবং নন-স্পোর গঠনকারী ব্যাকটেরিয়াও খাদ্যকে অখাদ্য বানাতে কম ভূমিকা রাখে না।

কিছু কিছু খাবার যেমন- দুধ, মাংস, মাছ প্রভৃতি খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। আবার কিছু কিছু ফল, শস্য এবং সবজি অনেকদিন ভালো থাকে। এর কারণ হলো অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য পূরণ হওয়া চাই কিছু শর্ত- সঠিক তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অক্সিজেনের উপস্থিতি, পুষ্টি, খাদ্যদ্রব্যের ভেদ্যতা ইত্যাদি। ৪০-১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল। কিছু কিছু ফল বা সবজির বহিরাবরণ অণুজীবের জন্য দুর্ভেদ্য। তাই সেগুলো দেরিতে পচে। আবার খাবারে পানির পরিমাণ বেশি হলে সেটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কেননা এ পানিকে অণুজীব তাদের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার রসদ হিসেবে ব্যবহার করে।

শুকনো শস্য বা খাবারে পানি কম থাকায় সেটি অনেক দিন ভালো থাকে। অনুরূপভাবে অক্সিজেনের উপস্থিতি পচনকে ত্বরান্বিত করে। শুষ্ক ফল ও উচ্চমাত্রায় চিনি বা লবণযুক্ত খাবার অনেকদিন ভালো থাকে। কেননা শুষ্ক ফলে পানি খুবই কম থাকে আর উচ্চমাত্রার চিনি, এসিড কিংবা লবণযুক্ত খাবারে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় অণুজীবের কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করার কারণেই ৫ হাজার বছর পুরনো মিশরীয় ফারাওয়ের পিরামিড থেকে আবিষ্কৃত মধু অদ্যাবধি অক্ষত আছে!

খাবার পচানোর একচ্ছত্র অধিপতি কিন্তু অণুজীব নয়, খাদ্যের ভেতরের এনজাইমসমূহের নানা কার্যক্ষমতাও খাবার পচাতে ভূমিকা রাখে। যেমন- কলা কেটে রাখলে তার সাথে বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় মেলানিন, যা কলার গায়ে বাদামী রঙ সৃষ্টির জন্য দায়ী। আপেল কুচির বাদামী হয়ে যাওয়ার নেপথ্যেও রয়েছে অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া।

এতক্ষণে কি দুষতে শুরু করেছেন ‘খলনায়ক’ অণুজীবদের? এই বেলা অণুজীবদের নায়কোচিত অবদানের কথা দিয়ে শেষ করছি। অণুজীবগুলোর মহান কীর্তিকলাপে খাবার নষ্ট হলেও এই অণুজীব ব্যবহার করেই তৈরি করা যায় সুস্বাদু সব খাবার। দই থেকে শুরু করে সয়া সস কিংবা মুখরোচক পনির থেকে শুরু করে দামি ওয়াইন, বিয়ার সবই তৈরি হয় অণুজীবের সাহায্যে। সুস্বাদু বেকারী পণ্য থেকে শুরু করে জিভে জল আনা চকলেট তৈরিতেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র

১। https://www.leaf.tv/articles/how-does-food-decompose/

২। http://www.wonderpolis.org/wonder/why-does-food-rot/

৩। https://www.reference.com/food/food-rot-b4d00189173c0c70

৪। http://www.eng.buffalo.edu/shaw/student/m2_design/01_home/ksb/ KSB_S2/old_FoodSpoilage.htm

মোশন সিকনেসের কারণ

আপনি হয়তো একটা দারুণ লং ড্রাইভ অথবা লং জার্নির পরিকল্পনা করলেন। হয়তো ঘুরতে যাচ্ছেন কোথাও কিংবা যাচ্ছেন জরুরী কোনো কাজে। বাস বা প্রাইভেট কারে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো অস্বস্তি। বমি থেকে শুরু করে ঘাম, মাথা ব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদ- দীর্ঘ সময় এভাবে ভ্রমণ করলে বেশিরভাগ মানুষেরই কমবেশি এ সমস্যা হয়ে থাকে যা ‘মোশন সিকনেস’ বা ‘কার সিকনেস’ নামে পরিচিত। এ সমস্যার পেছনে মূলত দায়ী আমাদের মস্তিস্ক।

ভ্রমণের সময় মস্তিষ্ক মনে করে, তাকে হঠাৎ তীব্র মাত্রার বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। মূলত কার সিকনেস আমাদের চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের অপারগতার একটি ফল। ভেঙে বললে, ভ্রমণের সময় আমাদের চোখ এবং কানসহ অন্যান্য সংবেদনশীল অংশগুলো মস্তিষ্কে যে সিগনাল পাঠায় সেগুলো পরষ্পর বিরোধী হয়ে থাকে। ফলে মস্তিষ্ক দ্বিধান্বিত হয়ে যায় যেমনটা অনেক সময় বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

বাসে বা গাড়িতে চলাচলের সময় আমরা স্থির হয়ে বসে থাকি, ঐ সময় মস্তিষ্ক ও চোখ তা-ই বিশ্বাস করে। অনুভব করে যে আমাদের শরীর স্থির। তাই সে মস্তিষ্কে অনুরূপ বার্তাই পাঠায়। কিন্তু একই সময়ে ভ্রমণের গতিজনিত ঝাঁকি আমাদের অন্তঃকর্ণের ভেতরে যে তরল পদার্থ সম্বলিত টিউব রয়েছে, সেসব তরল পদার্থে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অর্থাৎ অন্তঃকর্ণের অভ্যন্তরীণ এই তরল পদার্থ যা শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত, সেটি গতিশীলতার জানান দেয়। আবার শরীরের অন্যান্য সংবেদী অঙ্গও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জানান দেয় যে শরীর স্থির অবস্থায় বিরাজমান। একই সময়ে একবার স্থিরতা আর একবার গতিশীলতার এতগুলো সিগন্যাল পেয়ে ঘাবড়ে যায় বেচারা মস্তিষ্ক! কোনটা সঠিক সেটা না বুঝতে পারায় বিচলিত মস্তিষ্কের গোবেচারা থ্যালামাস সিদ্ধান্ত নেয় সে অসুস্থ কিংবা বিষাক্ততার শিকার। কাজেই সে সেসব অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ করে।

2

এখন প্রশ্ন হলো- এ বিড়ম্বনা লাঘবের উপায় কী? এর থেকে নিস্তার পেতে হলে মস্তিষ্ককে বোঝাতে হবে সে আসলে কোনো অবস্থায় আছে। যেমন বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মস্তিষ্ককে বোঝানো যায় যে সে গতির মধ্যে আছে। ফলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দোটানা কমে গিয়ে কার সিকনেস কমে যায়। উপরন্তু বই পড়লে বা কোনো একটা কিছু (যেমন ম্যাপ) খুঁটিয়ে দেখার সময় এটা বেড়ে যায়। কেননা এগুলো আমাদের মস্তিষ্কে বেশি বেশি শারীরিক স্থিরতার বার্তা পাঠায়। অনেক সময় পছন্দসই গান শুনলেও কার সিকনেস দূর হয়। বিশুদ্ধ বাতাসে শান্ত হয়ে লম্বা শ্বাস নিলেও সেটা কাজে দেয়। আপনি নিজে যখন চালকের আসনে থাকেন, তখন মোশন সিকনেস আপনাকে খুব একটা কুপোকাত করতে পারে না। কারণ প্রথমত উইন্ডশিন্ড এবং জানালার বাইরের দৃশ্য আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে জানান দেবে যে, আপনি গতিশীল। তেমনি নিজেই গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করায় আপনি নিজের গতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৫-১২ বছরের শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধদের মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি। এটি ব্যক্তিভেদে কমবেশি হয়ে থাকে। এর পেছনে বিবর্তনের একটি ভূমিকা আছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। বেশিরভাগ মানুষ, যাদের ভারসাম্যজনিত সমস্যা বা মাইগ্রেনের উপদ্রব রয়েছে, তারা বেশি তাড়াতাড়ি মোশন সিকনেসে আক্রান্ত হন।

মোশন সিকনেসের জন্য কিছু মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট এবং আদা, পেপারমিন্ট, চা এর ব্যবহার কিংবা আকুপ্রেশার ট্রিটমেন্টের চল আছে যা কিছু ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ। বর্তমানে এর উপরে আরও গবেষণা হচ্ছে যেন গাড়িতে চড়লেই আর অস্বস্তিতে না পড়তে হয়।

তথ্যসূত্র

১) www.sciencealert.com/here-s-why-you-get-car-sick-your-brain-thinks-it-s-being-poisoned

২) www.webmd.com/cold-and-flu/ear-infection/tc/motion-sickness-topic-overview

৩) www.medicinenet.com/motion_sickness_sea_sickness_car_sickness

৪) www.nhs.uk/conditions/motion-sickness/pages/introduction.aspx

 

লেখকঃ অনন্যা আজাদ
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিচিত্র প্রাণীর অদ্ভুত খাদ্যাভ্যাস

পৃথিবীতে প্রায় ৮.৭ লক্ষ প্রজাতি বিদ্যমান। এদের যেমন ভিন্নতা রয়েছে গড়নে, তেমনি বৈচিত্র্যও আছে খাবারে। এদের কেউ তৃণভোজী, কেউ মাংসাশী, কেউ বা সর্বভুক। এদের খাদ্যাভ্যাস যেমন আলাদা হয়ে থাকে, তেমনি কখনো কখনো তা অদ্ভুতুড়েও হয়ে থাকে। প্রায় অজানা-অচেনা এসব প্রাণী অপেক্ষা করছে আপনার জন্য, যাদের উদ্ভট খাদ্যাভ্যাস যেমন তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে আপনার মনোযোগ কাড়তে সক্ষম।

অশ্রুপানকারী মথ

মজার ব্যাপার হলো, বেচারা পাখি কিন্তু তাতে কোনো বিরক্তি দেখায় না। কেননা পাখি ঘটনা টেরই পায় না! পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এমনভাবে ম্যাগপাই রবিন, নিউটোনিয়া প্রভৃতি পাখির ঘাড়ে বসে এই মাদাগাস্কান টিয়ার ড্রিংকিং মথ প্রায় ৩৫ মিনিট ধরে অশ্রুপান করে যেতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় বটে।কষ্ট পেলে অশ্রু বিসর্জন করা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এমন কি কখনো শুনেছেন যে, পরের দুঃখকে খাবার বানিয়েও বেঁচে থাকা যায়?

চিত্রঃ অশ্রুপাণরত মাদাগাস্কান মথ।

ঘটনা পুরোপুরি এরকম না হলেও ২০০৬ সালে মাদাগাস্কারে আবিষ্কৃত এক প্রকার মথের খাদ্যাভ্যাস প্রায় এর মতো। প্রবোসসিস নামক একটি অঙ্গ ঘুমন্ত পাখির চোখের অভ্যন্তরে প্রবেশ করায় এবং প্রবোসসিস এর অগ্রভাগে লাগানো কাঁটার খোঁচায় পাখির চোখ থেকে নির্গত অশ্রু আনন্দের সাথে পান করে।

চিত্রঃ অশ্রুপানে ব্যবহৃত হার্পুন আকৃতির প্রবোসসিস।

কেন তারা এভাবে পরের দুঃখকে ভোজনের উপলক্ষ্য বানায়, তা নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব আছে। এদের মাঝে সবচেয়ে প্রচলিত তত্ত্বটি হচ্ছে- মথগুলো তাদের সোডিয়ামের ঘাটতি পূরণ করতে এই পদ্ধতি বেছে নেয়। তাদের কাছে লবণ তেমন সুলভ নয়। শারীরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ড ও বংশবৃদ্ধিতে সোডিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রয়োজনীয় কিন্তু তাদের জন্য সহজলভ্য নয়, তাই অদ্ভুত এই উপায়কেই বেছে নিতে হয় তাদের।

লিফ-কাটার অ্যান্ট

এই মহাশয় মোটেই তেমন অশ্রুচোষা নয়। পোকামাকড়দের মাঝে এরাই একমাত্র প্রজাতি, যারা নিজের খাবার নিজেই চাষাবাদ করে। তাদের শক্তিশালী চোয়াল ব্যবহার করে পাতা কাটে এবং কাটা পাতা বাসা পর্যন্ত নিয়ে যায়। তারপর পাতাগুলোকে চিবিয়ে ছোট ছোট টুকরোয় বিভক্ত করে এবং সেগুলোকে বাসার ‘ফাঙ্গাল চেম্বার’ নামক বিশেষ স্থানে সংরক্ষণ করে। পাতাগুলো পচনশীল। এই পাতার সাথে নিজেদের মল ও লালা মিশিয়ে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে।

চিত্রঃ লিফ কাটার অ্যান্ট।

মল, লালারস এবং আর্দ্রতা এক প্রকার ছত্রাকের বেড়ে উঠার জন্য আদর্শ পরিবেশ। এখানে বেড়ে উঠা ছত্রাকদেরকেই তারা খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। একেকটি লিফ কাটার প্রজাতির পিঁপড়ে নিজের ওজনের প্রায় দশগুণ বেশি ভার বহন করতে পারে।

ওমাটোকোইটা

চিত্রঃ গ্রীনল্যান্ড হাঙরের চোখে ওমাটোকোইটা পরজীবী।

যে হাঙরের চোখে বাসা বানায় সেগুলো মূলত ‘গ্রীনল্যান্ড হাঙর’। এদের চোখে এই পরজীবী উপস্থিত থাকায় অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এরা হাঙ্গরটির জন্য শিকার আকর্ষণে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে এরা পরস্পরের উপকারী মিথোজীবী। পরজীবীটি সারা জীবন ধরে হাঙরের অন্তচক্ষু আহার করে যায়।

অন্যদিকে হাঙ্গরের শিকারের কাজও সহজ করে দেয়।ওমাটোকোইটা ইলঙ্গেটা একটি সামুদ্রিক পরজীবী যা হাঙরের মতো জাঁদরেল শিকারীকে তার শিকার বানায়। লম্বায় প্রায় ৩ – ৫ সেন্টিমিটার। নিজেকে সরাসরি হাঙরের চোখের কর্নিয়ার আশেপাশের টিস্যুর সাথে সংযুক্ত করে নেয়। চোখের ভেতরে থাকা জেলী সদৃশ পদার্থকেই এরা আহার করে।

সিসিলিয়ান

সিসিলিয়ানরা দেখতে কেঁচোর মতো হলেও এরা আসলে উভচর। স্ত্রী সিসিলিয়ান বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে জন্মের পর বাচ্চাগুলো মায়ের শরীরের চামড়া খেয়ে বড় হয়।

চিত্রঃ সিসিলিয়ান।

মজার ব্যাপার হলো- সন্তানকে নিজের চামড়া খাওয়ালেও মা সিসিলিয়ানের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং সন্তানকে খাওয়ানোর জন্য প্রতি তিন দিনে একবার মা সিসিলিয়ান অতিরিক্ত পুষ্টিযুক্ত একটি বহিঃত্বক গঠন করে, যা সহজে খুলে আসে এবং শিশু সিসিলিয়ানরা তা নিয়ে মহাভোজে মেতে উঠে।নবজাতকদের অত্যন্ত ধারালো দাঁত এবং শরীরের তুলনায় বড় মুখ আছে যা দিয়ে জন্মের পরপরই মা এর শরীরের চামড়া খাবার জন্য হুলস্থুল বাধিয়ে দেয়। এমনকি তারা এক টুকরো চামড়া নিয়ে একে অপরের সাথে কাড়াকাড়িও লেগে যায়। এই কাড়াকাড়ি, মারামারি করে খাদ্যগ্রহণ ততদিন পর্যন্ত চলে যতদিন না তারা নিজেরাই শিকার ধরতে সক্ষম হয়।

সাইমোথোয়া এক্সিগুয়া

সাইমোথোয়া এক্সিগুয়া আইসোপড শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত একটি ক্ষুদ্র পরজীবী। এরা সামুদ্রিক। এরা মোটেই সুস্বাদু আকাঙ্ক্ষিত কিছু নয়। বরং মাছের জন্য এরা এক দুঃস্বপ্নেরই নাম। এরা যে শুধু মাছের মুখে ঢুকে এর জ্বিহ্বা ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে তা-ই নয়, মাছের শরীরের ভেতর বংশবৃদ্ধিও করে!

এ পরজীবীরা লার্ভাদশায় সুস্বাদু মাছের সন্ধানে সাগরে ভেসে বেড়ায়। পছন্দসই মাছ পেয়ে গেলেই কানকোর মাধ্যমে ঢুকে পেছনের পা ব্যবহার করে জিহ্বার গোড়ায় জেঁকে বসে। অতঃপর থাবা দিয়ে জ্বিহ্বা ক্ষতবিক্ষত করে তার রক্ত খেতে শুরু করে।

পরজীবী যত বড় হতে থাকে জ্বিহ্বায় রক্ত সংবহন তত কমতে থাকে এবং একসময় তা বিকল হয়ে যায়। তখন পরজীবীটি নিজেকে জ্বিহ্বার পেশীগুলোতে আটকে মেকী-জিভ বা ছদ্মবেশি জিভ (pseudo tongue) হিসেবে কাজ করে।

যারা জিহ্বাভুক, তারা পুরুষ হয়। যদি কোনো পুরুষ পরজীবীযুক্ত মাছে নতুন করে কোনো পুরুষ পরজীবী প্রবেশ করে, তাহলে পুরনো পরজীবীটি তার লিঙ্গ পরিবর্তন করে স্ত্রী সাইমোথোয়া হয়ে নবাগত পুরুষ সাইমোথোয়ার সাথে মিলিত হয়। এই মিলনের ফলে সৃষ্ট লার্ভা বেড়িয়ে যায় নতুন মাছের খোঁজে।

পরজীবী জ্যাগার

চিত্রঃ স্কুয়া বা জ্যাগার।

এরা পাখিদের এমনভাবে তাড়া করে যে, পাখি তার খাওয়া খাবার বমি করে উগরে দেয়। উগরে দেয়া অর্ধগলিত খাদ্যই স্কুয়ারা খাবার হিসেবে খায় যা তাদের শীতকালীন খাদ্যের শতকরা ৯৫ ভাগের যোগান দেয়। মাছ, পোকা-মাকড় এবং ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীকেও এরা তাড়া করে। চুরি করে পাখির ডিমও খায়। অনেক সময় বড় শিকারকে কাবু করতে এরা দলবেঁধে হানা দেয়। খাবার কাড়তে একঘেয়েমি চলে আসলে দলগতভাবে নিজেদের শিকারকে ধারালো চঞ্চু দিয়ে হত্যা করে।পরজীবী জ্যাগার বা আর্কটিক স্কুয়া হলো পৃথিবীর অন্যতম হিংস্র সামুদ্রিক পাখি। এরা অন্যান্য প্রজাতির কাছ থেকে খাবার চুরি করে খায়। বিশেষ পদ্ধতিতে এরা টার্ন, পাফিন, গাংচিল প্রভৃতি পাখির কাছ থেকে মাছসহ অন্যান্য খাবার কেড়ে নেয়। অ্যাসাসিন বাগ

চিত্রঃ অ্যাসাসিন বাগ

প্রকৃতি যেন এদেরকে খুনী হিসেবেই তৈরি করেছে। বিষ ও শক্তিশালী পা দিয়ে তারা তাদের চেয়ে আকারে বড় কীটকেও পরাজিত করতে পারে। এদের মুখ থেকে একপ্রকার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বের হয়, যা শিকার ধরার পর শিকারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে দেয়। সামনের পা দিয়ে শক্ত করে ধরে প্রবেশ করানোর কাজটি সম্পন্ন করা হয়। বিষক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহ তরল হয়ে যায় এবং অ্যাসাসিন বাগ তা আনন্দের সাথে পান করে নেয়।

ল্যামপ্রে

বিকট দর্শন এ মাছ অন্য মাছের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। এদের হুকের মত ভেতরের দিকে বাঁকানো দাঁত থাকে।

ড্রাকুলা অ্যান্ট

চিত্রঃ ড্রাকুলা অ্যান্ট।

ডাং বিটলনাম থেকেই আচ করা যায় এই প্রজাতির পিঁপড়ে কেমন হতে পারে। বলা যায় ভ্যাম্পায়ারের মতোই। বোলতার মতো দেখতে এই পিঁপড়া নিজের লার্ভারই প্লাজমা খায়। এরা তাদের সন্তানদের প্রথমে খেতে দেয়, তারপর তাদের চিবোতে থাকে যতক্ষণ না ভেতর থেকে প্লাজমা বের হয়। তারপর নির্গত প্লাজমা পান করে ফেলে। এই প্লাজমা তাদের ক্ষেত্রে এনার্জি ড্রিংক এর মতো কাজ করে। এত ঝাক্কির পরও কিন্তু লার্ভাগুলো মরে না। শরীজুড়ে অজস্র ক্ষত নিয়ে তারা ঠিকই বেঁচে থাকে।

চিত্রঃ ডাং বিটল।

এ সকল ভিন্ন প্রাণীর বিচিত্র খাদ্যাভ্যাসের ধরণ ও প্রকরণ প্রকৃতির আজব খেয়ালেরই অংশ। এগুলো যেমন আকর্ষণ ও আগ্রহের খোরাক তেমনি এখানে গবেষণারও অবকাশ আছে আছে প্রচুর।এরা অন্য প্রাণীর মল খেয়ে বেঁচে থাকে। দিনের শুরুতে পছন্দসই গন্ধযুক্ত মলের দলার খোঁজে উড়ে বেড়ায়। তৃণভোজী প্রাণীদের মল বেশি পছন্দ করে। লার্ভাগুলি মলের অপাচ্য দৃঢ় অংশ খায়, পূর্ণ বয়স্করা খায় তরল অংশ। পুরুষরা মহিলা বিটলদের মলের তৈরি দুর্গন্ধযুক্ত বল দিয়ে প্রস্তাব দেয়। এদের বংশবিস্তার এবং জীবন মল ও মাটিকে ঘিরেই।

তথ্যসূত্র

১) wonderlist.com/10-lesser-known-animals-bizarre-dietary-behaviors/

২) newscientist.com/article/dn10826-moths-drink-the-tears-of-sleeping-birds/

৩) kids.sandiegozoo.org/animals/insects/leaf-cutter-ant

৪) cracked.com/article_19073_the-8-most-terrifying-diets-in-animal-kingdom.html

৫) elasmo-research.org/education/topics/lh_somniosus.htm

featured image: campeche.com

খাবার কেন পচে?

খাদ্য যে খাওয়ার অযোগ্য বা নষ্ট হয়ে গেছে তা খাবারের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ প্রভৃতি দেখে সহজেই আঁচ করা যায়। কোনো খাবার তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়, কোনোটা আবার অনেকদিন ভালো থাকে। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই ঘটে। কেন হচ্ছে এরকম পচনশীলতার তারতম্য? বুঝতে হলে চিনতে হবে সৃষ্টির সেই অংশকে যাদের একটি বড় অংশ আমাদের খালি চোখে সাধারণত দৃশ্যমান নয়।

বিভিন্ন অণুজীব খাবার নষ্টের জন্য দায়ী। খাবারে যেসব পুষ্টি উপাদান থাকে এরা সেগুলোকে ভেঙ্গে ফেলে ছোট ছোট অংশে। এসব খাবারের ক্ষুদ্রাংশ সহজেই তাদের কোষ প্রাচীরের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে। এতে খাবারের স্বাভাবিক গঠন আর আগের মতো থাকে না। এ প্রক্রিয়ার ফলে যেসব উপজাত তৈরি হয় সেগুলোই মূলত দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে এবং খাবারকে বিস্বাদ করে একেবারেই খাওয়ার অনুপযোগী করে তোলে।

অণুজীবগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক (ঈস্ট, মোল্ড) ইত্যাদি। খাবারে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে মোল্ড। মোল্ডের সূক্ষ্ম শাখাতন্তু হাইফির বর্ধিষ্ণু অগ্রভাগে একপ্রকার এনজাইম তৈরি হয় যা সেলুলোজ বা স্টার্চ এর মতো মজবুত অণুকে ভেঙ্গে কম মজবুত নরম পদার্থে রূপান্তর করে। খাবারের গায়ে বা ওপরে যে দাগ এবং স্তর দেখা যায় তা প্রকৃতপক্ষে জালের মতো পরষ্পর সংযুক্ত বৃহৎ হাইফি কলোনি, যা খাদ্য দ্রব্যের পৃষ্ঠদেশের উপরে থেকে বেড়ে চলে।

ঈস্ট এবং ব্যাকটেরিয়াও খাবার নষ্টের ব্যপারে কম যায় না। খাবারের বারোটা বাজাতে ঈস্ট বেছে নেয় গাঁজন প্রক্রিয়া। আচারের উপর আমরা যে শুকনো স্তর জমতে দেখি তা মহামান্য ঈস্টেরই কাণ্ড। বিভিন্ন স্পোর এবং নন-স্পোর গঠনকারী ব্যাকটেরিয়াও খাদ্যকে অখাদ্য বানাতে কম ভূমিকা রাখে না।

কিছু কিছু খাবার যেমন- দুধ, মাংস, মাছ প্রভৃতি খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। আবার কিছু কিছু ফল, শস্য এবং সবজি অনেকদিন ভালো থাকে। এর কারণ হলো অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য পূরণ হওয়া চাই কিছু শর্ত- সঠিক তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অক্সিজেনের উপস্থিতি, পুষ্টি, খাদ্যদ্রব্যের ভেদ্যতা ইত্যাদি। ৪০-১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল। কিছু কিছু ফল বা সবজির বহিরাবরণ অণুজীবের জন্য দুর্ভেদ্য। তাই সেগুলো দেরিতে পচে। আবার খাবারে পানির পরিমাণ বেশি হলে সেটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কেননা এ পানিকে অণুজীব তাদের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার রসদ হিসেবে ব্যবহার করে।

শুকনো শস্য বা খাবারে পানি কম থাকায় সেটি অনেক দিন ভালো থাকে। অনুরূপভাবে অক্সিজেনের উপস্থিতি পচনকে ত্বরান্বিত করে। শুষ্ক ফল ও উচ্চমাত্রায় চিনি বা লবণযুক্ত খাবার অনেকদিন ভালো থাকে। কেননা শুষ্ক ফলে পানি খুবই কম থাকে আর উচ্চমাত্রার চিনি, এসিড কিংবা লবণযুক্ত খাবারে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় অণুজীবের কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করার কারণেই ৫ হাজার বছর পুরনো মিশরীয় ফারাওয়ের পিরামিড থেকে আবিষ্কৃত মধু অদ্যাবধি অক্ষত আছে!

খাবার পচানোর একচ্ছত্র অধিপতি কিন্তু অণুজীব নয়, খাদ্যের ভেতরের এনজাইমসমূহের নানা কার্যক্ষমতাও খাবার পচাতে ভূমিকা রাখে। যেমন- কলা কেটে রাখলে তার সাথে বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় মেলানিন, যা কলার গায়ে বাদামী রঙ সৃষ্টির জন্য দায়ী। আপেল কুচির বাদামী হয়ে যাওয়ার নেপথ্যেও রয়েছে অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া।

এতক্ষণে কি দুষতে শুরু করেছেন ‘খলনায়ক’ অণুজীবদের? এই বেলা অণুজীবদের নায়কোচিত অবদানের কথা দিয়ে শেষ করছি। অণুজীবগুলোর মহান কীর্তিকলাপে খাবার নষ্ট হলেও এই অণুজীব ব্যবহার করেই তৈরি করা যায় সুস্বাদু সব খাবার। দই থেকে শুরু করে সয়া সস কিংবা মুখরোচক পনির থেকে শুরু করে দামি ওয়াইন, বিয়ার সবই তৈরি হয় অণুজীবের সাহায্যে। সুস্বাদু বেকারী পণ্য থেকে শুরু করে জিভে জল আনা চকলেট তৈরিতেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র

১। https://www.leaf.tv/articles/how-does-food-decompose/

২। http://www.wonderpolis.org/wonder/why-does-food-rot/

৩। https://www.reference.com/food/food-rot-b4d00189173c0c70

৪। http://www.eng.buffalo.edu/shaw/student/m2_design/01_home/ksb/ KSB_S2/old_FoodSpoilage.htm

মোশন সিকনেসের কারণ

আপনি হয়তো একটা দারুণ লং ড্রাইভ অথবা লং জার্নির পরিকল্পনা করলেন। হয়তো ঘুরতে যাচ্ছেন কোথাও কিংবা যাচ্ছেন জরুরী কোনো কাজে। বাস বা প্রাইভেট কারে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো অস্বস্তি। বমি থেকে শুরু করে ঘাম, মাথা ব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদ- দীর্ঘ সময় এভাবে ভ্রমণ করলে বেশিরভাগ মানুষেরই কমবেশি এ সমস্যা হয়ে থাকে যা ‘মোশন সিকনেস’ বা ‘কার সিকনেস’ নামে পরিচিত। এ সমস্যার পেছনে মূলত দায়ী আমাদের মস্তিস্ক।

ভ্রমণের সময় মস্তিষ্ক মনে করে, তাকে হঠাৎ তীব্র মাত্রার বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। মূলত কার সিকনেস আমাদের চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের অপারগতার একটি ফল। ভেঙে বললে, ভ্রমণের সময় আমাদের চোখ এবং কানসহ অন্যান্য সংবেদনশীল অংশগুলো মস্তিষ্কে যে সিগনাল পাঠায় সেগুলো পরষ্পর বিরোধী হয়ে থাকে। ফলে মস্তিষ্ক দ্বিধান্বিত হয়ে যায় যেমনটা অনেক সময় বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

বাসে বা গাড়িতে চলাচলের সময় আমরা স্থির হয়ে বসে থাকি, ঐ সময় মস্তিষ্ক ও চোখ তা-ই বিশ্বাস করে। অনুভব করে যে আমাদের শরীর স্থির। তাই সে মস্তিষ্কে অনুরূপ বার্তাই পাঠায়। কিন্তু একই সময়ে ভ্রমণের গতিজনিত ঝাঁকি আমাদের অন্তঃকর্ণের ভেতরে যে তরল পদার্থ সম্বলিত টিউব রয়েছে, সেসব তরল পদার্থে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অর্থাৎ অন্তঃকর্ণের অভ্যন্তরীণ এই তরল পদার্থ যা শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত, সেটি গতিশীলতার জানান দেয়। আবার শরীরের অন্যান্য সংবেদী অঙ্গও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জানান দেয় যে শরীর স্থির অবস্থায় বিরাজমান। একই সময়ে একবার স্থিরতা আর একবার গতিশীলতার এতগুলো সিগন্যাল পেয়ে ঘাবড়ে যায় বেচারা মস্তিষ্ক! কোনটা সঠিক সেটা না বুঝতে পারায় বিচলিত মস্তিষ্কের গোবেচারা থ্যালামাস সিদ্ধান্ত নেয় সে অসুস্থ কিংবা বিষাক্ততার শিকার। কাজেই সে সেসব অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ করে।

2

এখন প্রশ্ন হলো- এ বিড়ম্বনা লাঘবের উপায় কী? এর থেকে নিস্তার পেতে হলে মস্তিষ্ককে বোঝাতে হবে সে আসলে কোনো অবস্থায় আছে। যেমন বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মস্তিষ্ককে বোঝানো যায় যে সে গতির মধ্যে আছে। ফলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দোটানা কমে গিয়ে কার সিকনেস কমে যায়। উপরন্তু বই পড়লে বা কোনো একটা কিছু (যেমন ম্যাপ) খুঁটিয়ে দেখার সময় এটা বেড়ে যায়। কেননা এগুলো আমাদের মস্তিষ্কে বেশি বেশি শারীরিক স্থিরতার বার্তা পাঠায়। অনেক সময় পছন্দসই গান শুনলেও কার সিকনেস দূর হয়। বিশুদ্ধ বাতাসে শান্ত হয়ে লম্বা শ্বাস নিলেও সেটা কাজে দেয়। আপনি নিজে যখন চালকের আসনে থাকেন, তখন মোশন সিকনেস আপনাকে খুব একটা কুপোকাত করতে পারে না। কারণ প্রথমত উইন্ডশিন্ড এবং জানালার বাইরের দৃশ্য আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে জানান দেবে যে, আপনি গতিশীল। তেমনি নিজেই গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করায় আপনি নিজের গতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৫-১২ বছরের শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধদের মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি। এটি ব্যক্তিভেদে কমবেশি হয়ে থাকে। এর পেছনে বিবর্তনের একটি ভূমিকা আছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। বেশিরভাগ মানুষ, যাদের ভারসাম্যজনিত সমস্যা বা মাইগ্রেনের উপদ্রব রয়েছে, তারা বেশি তাড়াতাড়ি মোশন সিকনেসে আক্রান্ত হন।

মোশন সিকনেসের জন্য কিছু মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট এবং আদা, পেপারমিন্ট, চা এর ব্যবহার কিংবা আকুপ্রেশার ট্রিটমেন্টের চল আছে যা কিছু ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ। বর্তমানে এর উপরে আরও গবেষণা হচ্ছে যেন গাড়িতে চড়লেই আর অস্বস্তিতে না পড়তে হয়।

তথ্যসূত্র

১) www.sciencealert.com/here-s-why-you-get-car-sick-your-brain-thinks-it-s-being-poisoned

২) www.webmd.com/cold-and-flu/ear-infection/tc/motion-sickness-topic-overview

৩) www.medicinenet.com/motion_sickness_sea_sickness_car_sickness

৪) www.nhs.uk/conditions/motion-sickness/pages/introduction.aspx

 

লেখকঃ অনন্যা আজাদ
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

খাবার কেন পচে?

খাদ্য যে খাওয়ার অযোগ্য বা নষ্ট হয়ে গেছে তা খাবারের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ প্রভৃতি দেখে সহজেই আঁচ করা যায়। কোনো খাবার তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়, কোনোটা আবার অনেকদিন ভালো থাকে। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই ঘটে। কেন হচ্ছে এরকম পচনশীলতার তারতম্য? বুঝতে হলে চিনতে হবে সৃষ্টির সেই অংশকে যাদের একটি বড় অংশ আমাদের খালি চোখে সাধারণত দৃশ্যমান নয়।

বিভিন্ন অণুজীব খাবার নষ্টের জন্য দায়ী। খাবারে যেসব পুষ্টি উপাদান থাকে এরা সেগুলোকে ভেঙ্গে ফেলে ছোট ছোট অংশে। এসব খাবারের ক্ষুদ্রাংশ সহজেই তাদের কোষ প্রাচীরের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে। এতে খাবারের স্বাভাবিক গঠন আর আগের মতো থাকে না। এ প্রক্রিয়ার ফলে যেসব উপজাত তৈরি হয় সেগুলোই মূলত দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে এবং খাবারকে বিস্বাদ করে একেবারেই খাওয়ার অনুপযোগী করে তোলে।

অণুজীবগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক (ঈস্ট, মোল্ড) ইত্যাদি। খাবারে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে মোল্ড। মোল্ডের সূক্ষ্ম শাখাতন্তু হাইফির বর্ধিষ্ণু অগ্রভাগে একপ্রকার এনজাইম তৈরি হয় যা সেলুলোজ বা স্টার্চ এর মতো মজবুত অণুকে ভেঙ্গে কম মজবুত নরম পদার্থে রূপান্তর করে। খাবারের গায়ে বা ওপরে যে দাগ এবং স্তর দেখা যায় তা প্রকৃতপক্ষে জালের মতো পরষ্পর সংযুক্ত বৃহৎ হাইফি কলোনি, যা খাদ্য দ্রব্যের পৃষ্ঠদেশের উপরে থেকে বেড়ে চলে।

ঈস্ট এবং ব্যাকটেরিয়াও খাবার নষ্টের ব্যপারে কম যায় না। খাবারের বারোটা বাজাতে ঈস্ট বেছে নেয় গাঁজন প্রক্রিয়া। আচারের উপর আমরা যে শুকনো স্তর জমতে দেখি তা মহামান্য ঈস্টেরই কাণ্ড। বিভিন্ন স্পোর এবং নন-স্পোর গঠনকারী ব্যাকটেরিয়াও খাদ্যকে অখাদ্য বানাতে কম ভূমিকা রাখে না।

কিছু কিছু খাবার যেমন- দুধ, মাংস, মাছ প্রভৃতি খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। আবার কিছু কিছু ফল, শস্য এবং সবজি অনেকদিন ভালো থাকে। এর কারণ হলো অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য পূরণ হওয়া চাই কিছু শর্ত- সঠিক তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অক্সিজেনের উপস্থিতি, পুষ্টি, খাদ্যদ্রব্যের ভেদ্যতা ইত্যাদি। ৪০-১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল। কিছু কিছু ফল বা সবজির বহিরাবরণ অণুজীবের জন্য দুর্ভেদ্য। তাই সেগুলো দেরিতে পচে। আবার খাবারে পানির পরিমাণ বেশি হলে সেটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কেননা এ পানিকে অণুজীব তাদের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার রসদ হিসেবে ব্যবহার করে।

শুকনো শস্য বা খাবারে পানি কম থাকায় সেটি অনেক দিন ভালো থাকে। অনুরূপভাবে অক্সিজেনের উপস্থিতি পচনকে ত্বরান্বিত করে। শুষ্ক ফল ও উচ্চমাত্রায় চিনি বা লবণযুক্ত খাবার অনেকদিন ভালো থাকে। কেননা শুষ্ক ফলে পানি খুবই কম থাকে আর উচ্চমাত্রার চিনি, এসিড কিংবা লবণযুক্ত খাবারে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় অণুজীবের কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করার কারণেই ৫ হাজার বছর পুরনো মিশরীয় ফারাওয়ের পিরামিড থেকে আবিষ্কৃত মধু অদ্যাবধি অক্ষত আছে!

খাবার পচানোর একচ্ছত্র অধিপতি কিন্তু অণুজীব নয়, খাদ্যের ভেতরের এনজাইমসমূহের নানা কার্যক্ষমতাও খাবার পচাতে ভূমিকা রাখে। যেমন- কলা কেটে রাখলে তার সাথে বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় মেলানিন, যা কলার গায়ে বাদামী রঙ সৃষ্টির জন্য দায়ী। আপেল কুচির বাদামী হয়ে যাওয়ার নেপথ্যেও রয়েছে অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া।

এতক্ষণে কি দুষতে শুরু করেছেন ‘খলনায়ক’ অণুজীবদের? এই বেলা অণুজীবদের নায়কোচিত অবদানের কথা দিয়ে শেষ করছি। অণুজীবগুলোর মহান কীর্তিকলাপে খাবার নষ্ট হলেও এই অণুজীব ব্যবহার করেই তৈরি করা যায় সুস্বাদু সব খাবার। দই থেকে শুরু করে সয়া সস কিংবা মুখরোচক পনির থেকে শুরু করে দামি ওয়াইন, বিয়ার সবই তৈরি হয় অণুজীবের সাহায্যে। সুস্বাদু বেকারী পণ্য থেকে শুরু করে জিভে জল আনা চকলেট তৈরিতেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র

১। https://www.leaf.tv/articles/how-does-food-decompose/

২। http://www.wonderpolis.org/wonder/why-does-food-rot/

৩। https://www.reference.com/food/food-rot-b4d00189173c0c70

৪। http://www.eng.buffalo.edu/shaw/student/m2_design/01_home/ksb/ KSB_S2/old_FoodSpoilage.htm

মোশন সিকনেসের কারণ

আপনি হয়তো একটা দারুণ লং ড্রাইভ অথবা লং জার্নির পরিকল্পনা করলেন। হয়তো ঘুরতে যাচ্ছেন কোথাও কিংবা যাচ্ছেন জরুরী কোনো কাজে। বাস বা প্রাইভেট কারে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো অস্বস্তি। বমি থেকে শুরু করে ঘাম, মাথা ব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদ- দীর্ঘ সময় এভাবে ভ্রমণ করলে বেশিরভাগ মানুষেরই কমবেশি এ সমস্যা হয়ে থাকে যা ‘মোশন সিকনেস’ বা ‘কার সিকনেস’ নামে পরিচিত। এ সমস্যার পেছনে মূলত দায়ী আমাদের মস্তিস্ক।

ভ্রমণের সময় মস্তিষ্ক মনে করে, তাকে হঠাৎ তীব্র মাত্রার বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। মূলত কার সিকনেস আমাদের চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের অপারগতার একটি ফল। ভেঙে বললে, ভ্রমণের সময় আমাদের চোখ এবং কানসহ অন্যান্য সংবেদনশীল অংশগুলো মস্তিষ্কে যে সিগনাল পাঠায় সেগুলো পরষ্পর বিরোধী হয়ে থাকে। ফলে মস্তিষ্ক দ্বিধান্বিত হয়ে যায় যেমনটা অনেক সময় বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

বাসে বা গাড়িতে চলাচলের সময় আমরা স্থির হয়ে বসে থাকি, ঐ সময় মস্তিষ্ক ও চোখ তা-ই বিশ্বাস করে। অনুভব করে যে আমাদের শরীর স্থির। তাই সে মস্তিষ্কে অনুরূপ বার্তাই পাঠায়। কিন্তু একই সময়ে ভ্রমণের গতিজনিত ঝাঁকি আমাদের অন্তঃকর্ণের ভেতরে যে তরল পদার্থ সম্বলিত টিউব রয়েছে, সেসব তরল পদার্থে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অর্থাৎ অন্তঃকর্ণের অভ্যন্তরীণ এই তরল পদার্থ যা শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত, সেটি গতিশীলতার জানান দেয়। আবার শরীরের অন্যান্য সংবেদী অঙ্গও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জানান দেয় যে শরীর স্থির অবস্থায় বিরাজমান। একই সময়ে একবার স্থিরতা আর একবার গতিশীলতার এতগুলো সিগন্যাল পেয়ে ঘাবড়ে যায় বেচারা মস্তিষ্ক! কোনটা সঠিক সেটা না বুঝতে পারায় বিচলিত মস্তিষ্কের গোবেচারা থ্যালামাস সিদ্ধান্ত নেয় সে অসুস্থ কিংবা বিষাক্ততার শিকার। কাজেই সে সেসব অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ করে।

2

এখন প্রশ্ন হলো- এ বিড়ম্বনা লাঘবের উপায় কী? এর থেকে নিস্তার পেতে হলে মস্তিষ্ককে বোঝাতে হবে সে আসলে কোনো অবস্থায় আছে। যেমন বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মস্তিষ্ককে বোঝানো যায় যে সে গতির মধ্যে আছে। ফলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দোটানা কমে গিয়ে কার সিকনেস কমে যায়। উপরন্তু বই পড়লে বা কোনো একটা কিছু (যেমন ম্যাপ) খুঁটিয়ে দেখার সময় এটা বেড়ে যায়। কেননা এগুলো আমাদের মস্তিষ্কে বেশি বেশি শারীরিক স্থিরতার বার্তা পাঠায়। অনেক সময় পছন্দসই গান শুনলেও কার সিকনেস দূর হয়। বিশুদ্ধ বাতাসে শান্ত হয়ে লম্বা শ্বাস নিলেও সেটা কাজে দেয়। আপনি নিজে যখন চালকের আসনে থাকেন, তখন মোশন সিকনেস আপনাকে খুব একটা কুপোকাত করতে পারে না। কারণ প্রথমত উইন্ডশিন্ড এবং জানালার বাইরের দৃশ্য আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে জানান দেবে যে, আপনি গতিশীল। তেমনি নিজেই গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করায় আপনি নিজের গতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৫-১২ বছরের শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধদের মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি। এটি ব্যক্তিভেদে কমবেশি হয়ে থাকে। এর পেছনে বিবর্তনের একটি ভূমিকা আছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। বেশিরভাগ মানুষ, যাদের ভারসাম্যজনিত সমস্যা বা মাইগ্রেনের উপদ্রব রয়েছে, তারা বেশি তাড়াতাড়ি মোশন সিকনেসে আক্রান্ত হন।

মোশন সিকনেসের জন্য কিছু মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট এবং আদা, পেপারমিন্ট, চা এর ব্যবহার কিংবা আকুপ্রেশার ট্রিটমেন্টের চল আছে যা কিছু ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ। বর্তমানে এর উপরে আরও গবেষণা হচ্ছে যেন গাড়িতে চড়লেই আর অস্বস্তিতে না পড়তে হয়।

তথ্যসূত্র

১) www.sciencealert.com/here-s-why-you-get-car-sick-your-brain-thinks-it-s-being-poisoned

২) www.webmd.com/cold-and-flu/ear-infection/tc/motion-sickness-topic-overview

৩) www.medicinenet.com/motion_sickness_sea_sickness_car_sickness

৪) www.nhs.uk/conditions/motion-sickness/pages/introduction.aspx

 

লেখকঃ অনন্যা আজাদ
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়