মাদকাসক্তির ভয়াবহতা এবং যেভাবে বন্ধ করা যেতে পারে এর বিস্তার

কোন কিছু অর্জন করতে সক্ষম হলে আমাদের ভাল লাগে। প্রকৃতপক্ষে খাদ্যগ্রহণ, শরীর চর্চা, প্রজনন কিংবা বিপদ থেকে বেঁচে ফেরা; জীবজগতে টিকে থাকার জন্য যাই করুন না কেন আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে তা করতে উৎসাহিত করবে এই “আনন্দের অনুভূতি” দিয়ে পুরস্কৃত করে।

প্রায় দুই লক্ষ বছর ধরে আধুনিক মানুষের বিবর্তনে এই প্রক্রিয়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।কিন্ত এখন আমরা এসব কিছু না করেই কীভাবে (যেমন ড্রাগ নিয়ে) এই পুরস্কার পাওয়া যায় তা জেনে গিয়েছি।এই অনুভুতির সহজলভ্যতা তাই এসব কাজ বারবার করার আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে,যা থেকে উৎপত্তি হয় আসক্তির।

এখন প্রশ্ন হল,এই আসক্তি আসলে কি?কেউ যদি বিনোদনের জন্য কোনো ড্রাগ(যেমন হেরোইন)নেয়,তাহলে কিছুদিন পরেই তার মধ্যে ঐ ড্রাগ নিয়মিত গ্রহণের দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা জন্মে।ফলে ঐ ব্যক্তি তখন আর ড্রাগ না গ্রহণ করে থাকতে পারে না,তাই নিজের এবং ড্রাগের পরিমাণের উপরেও কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

দীর্ঘকাল ধরে উচ্চমাত্রায় ড্রাগ গ্রহনে মস্তিষ্কের পরিবর্তন ঘটে,তখন স্বাভাবিকভাবে আনন্দিত হওয়া আর সম্ভব হয় না এবং আমাদের কোনো কিছু শেখা বা প্রেরণা পাওয়ার প্রক্রিয়াও ব্যহত হয়।“আসক্তি” বা addiction শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ addictus থেকে,যার অর্থ “বাধ্য হওয়া বা ক্রীতদাস হয়ে যাওয়া”,যা থেকে বুঝা যায় এই আসক্তি প্রকৃতপক্ষে কতটা শক্তিশালী।

আমাদের মস্তিষ্কের Limbic System,বা কেন্দ্রের একটি অংশ যা বিভিন্ন রাসায়নিক বার্তাবাহক(নিউরোট্রান্সমিটার)নিঃসরণ করে বিভিন্ন নিউরনের মধ্যে সংকেত পাঠিয়ে বা কোষগুচ্ছকে সক্রিয় করে আমাদের আবেগ এবং প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে;তা আসক্তির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।প্রকৃতপক্ষে এরকম প্রায় ১০০টি নিউরোট্রান্সমিটার রয়েছে যেগুলিকে দুটি বড় শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়।

১)Excitatory neurotransmitter বা উত্তেজক নিউরো-ট্রান্সমিটার,যা তাদের টার্গেট কোষসমূহকে উত্তেজিত করে তোলে(যেমন এন্ডোরফিন শ্রেণীর নিউরোট্রান্সমিটারসমূহ;যা আমরা যখন ব্যায়াম করি,ভীষণ মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করি বা প্রচণ্ড ব্যথা পাই তখন নিঃসৃত হয়ে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বা ব্যথা কমিয়ে ফেলতে সহায়তা করে)।

২)Inhibitory neurotransmitter বা দমনমূলক নিউরো-ট্রান্সমিটার,যা টার্গেট কোষসমূহকে শান্ত করে(যেমন সেরোটনিন;যা আমাদের মুড,খাওয়ার রুচি এবং ঘুমের সাইকেল নিয়ন্ত্রণ করে।)

এখন মানবমস্তিষ্কের Limbic System ডোপামিন নামক একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক বা নিউরোট্রান্সমিটার সিরেব্রালকর্টেক্স এর নিচে “নিউক্লিয়াস একাম্বেন্স”নামক স্থানে(যেখানে অনেকগুলি নার্ভকোষ রয়েছে) নিঃসরণ করলে আমরা আনন্দ অনুভব করি।আমাদের আনন্দের সাথে জড়িত বলে এই “নিউক্লিয়াস একাম্বেন্স”কে স্নায়ুবিজ্ঞানিগন Reward Centre of Brain বা “মস্তিষ্কের পুরষ্কার কেন্দ্র” হিসেবে অভিহিত করেন।

চিত্রঃ৩,৪-ডাইহাইড্রক্সিফিনইথাইলঅ্যামিন বা ৪-(২-অ্যামিনোইথাইল)-বেনজিন-১,২- ডাইঅল,সাধারণভাবে যা ডোপামিন নামে পরিচিত।এটি মানবদেহে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আমাদের মস্তিষ্ক যখন বিশ্বাস করে যে একটি কাজ মনে রাখা খুব জরুরি তখন তা ডোপামিন নিঃসৃত করে।এই নিউরোট্রান্সমিটার আমাদের আনন্দের অনুভূতি,কোন কিছু মনে রাখা,নতুন কিছু শেখা এবং বিপদের মুখোমুখি হলে বাঁচার চেষ্টা করা প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত।তাই ডোপামিনের নিঃসরণে আমরা যে উত্তেজনা অনুভব করি তা প্রকৃতপক্ষে আমাদেরটিকে থাকার জন্য উদ্দীপ্ত করে।

চিত্রঃমস্তিষ্কের পুরষ্কার কেন্দ্রকে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কিন্ত এই ডোপামিনই আসক্তির জন্য অনেকাংশে দায়ী।নিকোটিন থেকে শুরু করে হেরোইন পর্যন্ত সকল আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগই আমাদের মস্তিষ্কের নিউক্লিয়াস একাম্বেন্সে প্রচুর পরিমাণে ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটায়,ফলে আমাদের কিছু না করেই অস্বাভাবিক এবং দ্রুত পরিতৃপ্তি অর্জন করা সম্ভব হয়।এসময় সাথে সাথে হিপোক্যাম্পাস অংশও উদ্দীপ্ত হয় ফলে এ অনুভূতি আমাদের মস্তিষ্ক স্পষ্টভাবে মনে রাখতে পারে। আর সবশেষে অ্যামিগডালায় তার জন্য একটি প্রতিক্রিয়া (তীব্র আকাঙ্ক্ষা)সৃষ্টি হয়।

এখন বিজ্ঞানীগণ মনে করেন ডোপামিন প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছু চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি করে,কারণ কোনো কাজ করলে যদি তা নিঃসরিত হয় তবে মানুষ ঐ কাজ বারবার করতে উদ্ভুদ্ধ হয়। সুতরাং ডোপামিন নিঃসরণের সাথে আনন্দ অনুভবের সম্পর্ক থাকলেও তা যে তীব্র আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে,সম্ভবত সেকারণেই ড্রাগে আসক্ত মানুষ আর পরিতৃপ্তি না পেলেও নেশা চালিয়ে যায়।

এখন ডোপামিন নিঃসরণের ফলে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় বিধায় পুনরায় ভারসাম্য আনার জন্য মস্তিষ্ক বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।তাই দীর্ঘদিন কোনো নির্দিষ্ট ড্রাগ ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক নিউরোট্রান্সমিটার বা টার্গেটকোষে তার গ্রাহক বা রিসেপ্টর সংখ্যা কমিয়ে ফেলে,যার জন্য প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উদ্দীপনা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে যা Hypo-Reward System নামে পরিচিত।এজন্য ড্রাগ ব্যবহারকারীর আনন্দ অনুভবের ক্ষমতা কমে যায়,তাই সে ধীরে ধীরে বিষণ্ণ ও হতাশ হয়ে পড়ে।

স্বাভাবিকভাবে যা তাকে আনন্দ দিত তাতে আর সে খুশি হয় না এবং তাই ড্রাগের পরিমাণ বাড়িয়ে ফেলতে হয় শুধু মন স্বাভাবিক করতেই,যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে;কারণ দীর্ঘদিন ব্যবহারে সহনশীলতা বৃদ্ধি পায় বিধায় আগের চেয়ে আরও বেশি পরিমাণে ড্রাগ গ্রহণ করতে হয় একইরকম পরিতৃপ্তি পেতে।অবশেষে ক্রমাগত ড্রাগের অপব্যবহারে বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতার পাশাপাশি মৃত্যুও ঘটে যায়।

চিত্রঃমস্তিষ্কের পুরষ্কার কেন্দ্রকে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন ড্রাগ-আসক্তি আমাদের মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডকে দুই উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে-:

১)তারা এক বা দুইটি প্রাকৃতিক নিউরোট্রান্সমিটারের অনুরূপ গঠনের হতে পারে বা

২)তারা উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় কিংবা তাদের পুনঃশোষণ বাধাগ্রস্ত করে।

এখন হেরোইন কিংবা অন্যান্য অপিয়েট যেমন মরফিন বা কোডিন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগসমূহের অন্যতম এবং তাদের গঠন এন্ডোরফিনের অনুরূপ।তাই তারা এন্ডোরফিনের জন্য নির্দিষ্ট করা স্নায়ুকোষের বিভিন্ন রিসেপ্টরের সাথে বিশাল সংখ্যায় যুক্ত হয়,ফলে এন্ডোরফিনের ব্যাথানাশক প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং মনে তীব্র আনন্দের বা ইউফোরিয়ার সৃষ্টি হয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,মৃদু থেকে তীব্র ব্যাথায় এইসকল অপিয়েট ব্যবহৃত হয়;বিশেষ করে মরফিন, হাইড্রোকোডিন (প্যারাসিটামল বা অ্যাসপিরিনের সাথে একত্রে “ভাইকোডিন” নামে)এবং ক্ষেত্রবিশেষে হেরোইন কোনো অপারেশনের পরে ব্যাথা কমাতে রোগীকে দেওয়া হয়।

চিত্রঃ কোডিন চিত্রঃ হেরোইন চিত্রঃ হাইড্রোকোডিন চিত্রঃ মরফিন

অন্যদিকে,নিকোটিন এর গঠন অ্যাসিটাইলকোলিন নিউরোট্রান্সমিটারের অনুরূপ। এর জন্যও প্রচুর পরিমাণে ডোপামিন নিঃসৃত হয় যা পুনরায় সিগারেট এর জন্য আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে।এটি একই সাথে গ্লুটামেট নামক আরেকটি উদ্দীপক নিউরো-ট্রান্সমিটার নিঃসরণ করে যা স্মৃতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তাই তা এই সিগারেট গ্রহণের অভ্যাসকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

তৃতীয়ত,তা GABA নামক একটি দমনমূলক নিউরোট্রান্সমিটারও এতই অত্যাধিক পরিমাণে নিঃসরণ করে যে ২০ মিনিটের মধ্যে GABA এর রিসেপ্টরগুলো খুবই কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে,তাই মস্তিষ্ক নিজে থেকে প্রস্তুত করলেও কোনো প্রভাব পড়ে না।এসকল কারণেই ধূমপান ছেড়ে দেওয়া বেশ কঠিন।

চিত্রঃ নিকোটিন

এলকোহল (Ethanol, CH3CH2OH) মূলত মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য নষ্ট করে যার ফলে ব্রেন আর শরীরের একসাথে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তা উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটার,(যেমন অ্যাসিটাইলকোলিন)এবং একইসাথে দমনমূলক নিউরোট্রান্সমিটারের(যেমন সেরোটোনিন)জন্য নির্দিষ্ট করা রিসেপ্টর এর সাথেও যুক্ত হয়।একারণেই মদ খাওয়ার সময় প্রাথমিকভাবে উচ্ছ্বসিত হলেও পরবর্তীতে মানুষ চুপচাপ হয়ে যায় এবং একইভাবে মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্যে যোগাযোগও ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে পড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে অধিকমাত্রায় মদ সেবন করলে মস্তিষ্ক তাই চেষ্টা করে নিউরনের মধ্যে যোগাযোগ পুনরায় গতিশীল করতে এবং এজন্য প্রচুর পরিমাণে উত্তেজক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হতে থাকে। একারণেই মদ্যপানকারী ব্যক্তি যখন মদ খাওয়া ছেড়ে দেন তখন মস্তিষ্কের অতিরিক্ত উদ্দীপক নিউরো-ট্রান্সমিটারের প্রভাবে বেশ কিছুদিন তার হাত-পা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপতে থাকে,যা এলকোহলের অন্যতম প্রধান withdrawal symptom (প্রশ্ন হতে পারে,এই “উইথড্রয়াল সিম্পটম” আসলে কি?

প্রকৃতপক্ষে কোনো ড্রাগ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করলে দেহ-মন তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে,তাই হঠাৎ করে ছেড়ে দিলে নিজেকে আবার নতুন সমন্বয় করতে হয় এবং এজন্য ব্যবহারকারী বেশ কিছু অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়।এইটাই “উইথড্রয়াল” নামে পরিচিত।যেমন এলকোহলের ক্ষেত্রে হাত-পা এর অনিয়ন্ত্রিত কাঁপা,হ্যালুসিনেশন বা এমন কিছু দেখা বা অনুভব করা যা প্রকৃতপক্ষে বাস্তবে ঘটছে না ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য)।

আবার কিছু ড্রাগ রয়েছে যা Stimulant বা উত্তেজক হিসেবে কাজ করে,যেমন কোকেইন এবং বিভিন্ন অ্যাম্পফেটামিন।প্রকৃতপক্ষে আমাদের মস্তিষ্কে যখন ডোপামিন এবং অন্যান্য উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হয় তখন আমরা আনন্দিত ও একাগ্র হয়ে উঠি;যদিও কিছুক্ষণ পরেই সেগুলি পুনঃশোষিত হয়ে যায় বিধায় মস্তিষ্ক স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে।এতক্ষণ যেসকল ড্রাগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেগুলি মূলত বিভিন্ন উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটারের অনুরূপ গঠনের বিধায় ডোপামিন এর নিঃসরণ ঘটায়।

কিন্ত Stimulant সমূহ উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটারের অত্যাধিক নিঃসরণের পাশাপাশি তাদের পুনঃশোষণেও বাধা দেয়।যেমন কোকেনের প্রভাবে ডোপামিন এবং নোরেপিনেপফ্রিন(যার গঠন অ্যাড্রেনালিন এর অনুরূপ)এর শোষণ বাধাপ্রাপ্ত হয়,তাই “কোক” ব্যবহারকারী অত্যাধিক আনন্দ এবং কর্মশক্তি অনুভব করবে।কিন্ত এদের অত্যাধিক পরিমাণে মস্তিষ্ক দ্রুতই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তাই স্বাভাবিক উপায়ে খুশি বা কর্মক্ষম হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

চিত্রঃকোকেন চিত্রঃনোরেপিনেফ্রিন বা (R)-৪-(২-অ্যামিনো-১-হাইড্রক্সিইথাইল)বেনজিন১,২-ডাইঅল
চিত্রঃঅ্যাড্রেনালিন।লক্ষ্য করলে দেখা যাবে নোরেপিনেপফ্রিনের অ্যামিনো গ্রুপের একটি -H কে -CH3 দ্বারা প্রতিস্থাপিত করলেই এই নিউরোট্রান্সমিটার পাওয়া যায়।

আবার অ্যাম্পফেটামিন বিভিন্ন স্নায়বিক ব্যাধির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে থাকলেও এটি আসক্তি-সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে।বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বে MDMA বা Ecstasy, মেথাম্পফেটামিন বা ক্রিস্টাল মেথসহ আরও অনেক অ্যাম্পফেটামিন-জাতক (Derivative) দিয়ে নেশা করা হচ্ছে যেগুলির চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো ব্যবহার তো নেই-ই,বরং এগুলি প্রচণ্ড নেশা সৃষ্টি করে এবং অত্যন্ত বিষাক্ত।

কোকেনের উত্তেজনা ১ ঘণ্টা থাকলেও এগুলির জন্য তা ১২ ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত থাকতে পারে,যার প্রভাবে মস্তিষ্কের প্রভূত ক্ষতি হয়।এগুলি মূলত মস্তিষ্কে অস্বাভাবিকরকম বেশি পরিমাণে ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটায়,তাই ব্যবহারকারী প্রায় ঘোরের মধ্যে চলে যান।

কিছুদিন ব্যবহারের পরেই তাই মস্তিষ্ক বাধ্য হয় ঘাতক এনজাইম নিঃসরণ করে এই অতিরিক্ত ডোপামিন নষ্ট করতে,যার ফলে এই নিউরোট্রান্সমিটার উৎপাদনের ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যায়;যা একজন মানুষের শেখা,আনন্দ বা প্রেরণা পাওয়া এককথায় বেঁচে থাকাই প্রায় অসম্ভব করে তোলে।

চিত্রঃ অ্যাম্পফেটামিন(α-মিথাইলফিনইথাইলঅ্যামিন) চিত্রঃN-মিথাইলঅ্যাম্পফেটামিন বা ক্রিস্টাল মেথ
চিত্রঃ৩,৪-মিথিলিনডাইঅক্সিমেথাম্পফেটামিন (MDMA)

এরকম আরও বহু ড্রাগ রয়েছে যা আসক্তি সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে,যেগুলি একইভাবে মস্তিষ্ককে বোকা বানিয়ে রিওয়ার্ড সেন্টারে ডোপামিন এর নিঃসরণ ঘটায় বা পুনঃশোষণে বাধা দেয়।কিন্ত তবুও প্রশ্ন থেকে যায়,আসক্তি কেন এত তীব্র হবে যে মানুষ নিজের এবং তার ভালবাসার সবকিছু ধ্বংস করে নেশা করে যাবে?

১৯৩০ সালে যখন গবেষকগন সর্বপ্রথম এই বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন তখন তারাও মনে করেছিলেন যে যারা নেশা করে তাঁদের নৈতিকতায় ত্রুটি আছে কিংবা অথবা ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি রয়েছে।তাই তারা ড্রাগে-আসক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে বা নেশা ছাড়ার জন্য উৎসাহিত করেই দায়িত্ব শেষ করতেন।

কিন্ত বর্তমানে গবেষণায় জানা গিয়েছে যে ড্রাগের আসক্তি ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতই একটি মারাত্মক অসুখ যা মস্তিষ্কের গঠন ও কর্মকাণ্ডের আমূল পরিবর্তন ঘটায় এবং সামান্য কৌতূহল শেষ পর্যন্ত অদম্য আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়;যা থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

১৯৮৮ সালে ইটালির কাগিয়ারি ইউনিভার্সিটির পরীক্ষামূলক ঔষধবিজ্ঞান এবং বিষবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডি কিয়ারাজি এবং এম্পেরাতোর গবেষণা অনুযায়ী,ড্রাগ গ্রহনে স্বাভাবিক কোনো কাজের (যেমন খাওয়া) চেয়ে প্রায় ২ থেকে ১০ গুণ বেশি পরিমাণে ডোপামিন নিঃসৃত হয়।সুতরাং কোনো কষ্ট না করেই আমরা আনন্দ লাভের একটি শর্টকাট পেয়ে যাই এবং এইসকল উদ্দীপনায় মস্তিষ্ক তা ভাল করে মনেও রাখে এবং পুনরায় করার জন্য তীব্রভাবে আকাঙ্ক্ষাও করে।এজন্যই বিজ্ঞানীগন বলে থাকেন “ড্রাগের অপব্যবহার এমন এক কাজ যা আমরা খুবই ভালভাবে শিখে থাকি।”

প্রকৃতপক্ষে নানা কারণেই মানুষ আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগ গ্রহণ করে,যদিও বাকি জীবন নেশা করে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কেউ এই পথে আসে না।ড্রাগ গ্রহণে বিষণ্ণ মনে উদ্দীপনা আসে এবং তারপরে কিছু মুহূর্তের জন্য হলেও আত্ম-বিশ্বাস জন্মে,মানুষের উপরে তাই প্রাথমিক প্রভাব ইতিবাচক বলা চলে।কিন্ত ধীরে ধীরে এই ড্রাগ মনকে এমনভাবেই পরিবর্তন করে ফেলে যে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না;ফলে সৃজনশীলতা,কাজের জন্য প্রেরণা সব নষ্ট হয়ে যায়।

তাই ব্যর্থতা ভুলতে যে মানুষ নেশা শুরু করেছিল সে জীবনে আরও ব্যর্থ হয়,যা ভুলে থাকতে সে আরও নেশার দিকে পা বাড়ায় এবং এভাবে একসময় সে ড্রাগের দাসে পরিণত হয়,ফলে দুর্ঘটনা কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।২০০৫ সালে সারা বিশ্বের ট্রাফিক দুর্ঘটনার শতকরা ৩৯ ভাগ মদ খেয়ে গাড়ি চালানো বা রাস্তায় চলার কারণে হয়েছিল,ইংল্যান্ডে ঐ জন্য ৬৫৭০ জন এবং পরের বছরে ৮৭৫০ জন মারা গিয়েছিল;যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যাটা প্রায় ১৩,০০০ ছুঁয়েছিল ২০০৭ সালে।

প্রতি বছর প্রায় ১৪ লক্ষ লোককে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর জন্য গ্রেফতার করা হয়।শুধু তাই নয়,নেশাগ্রস্ত মানুষের হৃদরোগ, স্ট্রোক,ক্যান্সার এবং মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকগুণ বেশি।আবার অন্তঃসত্বা মহিলা ড্রাগ নিলে তার বাচ্চার উপরেও যেমন কুপ্রভাব পড়ে তেমনি ধূমপায়ীর কাছে থাকলেও হৃদরোগ আর ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় (সার্জন জেনারেল,২০০৬ রিপোর্ট)।

প্রায় ১২ শতাংশ এইডস রোগের জন্য ইনজেকশনের মাধ্যমে কোকেন,হেরোইন এবং ক্রিস্টাল মেথ সেবন দায়ী,এবং হেপাটাইটিস-বি বা সি এর ঝুঁকিও একারণে বাড়ে।এক হিসেবে দেখা যায় শুধু ধূমপানের কারণেই বর্তমানে প্রতি বছর সারাবিশ্বে ৫০ লক্ষ মানুষ মারা যায়,এবং উনবিংশ শতাব্দীতে এভাবে প্রায় ১০ কোটি মানুষ মারা গিয়েছে।

হেরোইন সেবনে শরীর অনেক দুর্বল হয়ে যায়, ফলে যক্ষ্মা ও আর্থাইটিস রোগের সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি পায়।এভাবে বিভিন্ন ড্রাগের প্রভাবে মানুষের মস্তিষ্ক,ফুসফুস,যকৃত,কিডনি,অগ্ন্যাশয়, স্নায়ুতন্ত্র,পাকস্থলি সহ সারা শরীরের ক্ষতি সাধন হয়।

তাহলে এই ভয়াবহ অসুখ থেকে বাঁচার উপায় কি?প্রথমত,ড্রাগে আসক্ত কেউই স্বীকার করতে চাননা তাঁদের কোনো সমস্যা রয়েছে।ড্রাগ পুনর্বাসন কেন্দ্রে তাই শুরুতেই তাঁদের এই ভুল ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।এরপরে যখন তারা স্বীকার করেন তাঁদের জীবনে ড্রাগ আসলেই একটি বড় সমস্যা,তখন নির্ণয় করা হয় ঠিক কোনো পরিস্থিতিতে তারা ড্রাগ নিতে প্রলুব্ধ হন।

এটা হতে পারে যখন তারা একটি নির্দিষ্ট বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘুরেন বা যখন তাঁদের কাজের চাপ অত্যাধিক হয়ে পড়ে।সবশেষে ডাক্তার এবং কাউন্সেলরগন চেষ্টা করেন কীভাবে এইরকম পরিস্থিতির মোকাবেলা করা যায়,এজন্য তারা গ্রুপ থেরাপি,কাউন্সেলিং এমনকি অন্য কোনো ঔষধও ব্যবহার করতে পারেন।

তবে নিরাময় তখনই সম্ভব যখন আসক্ত ব্যক্তি নিজেই তার জীবনে পরিবর্তন আনতে ইচ্ছুক হন।কিন্ত একজন মানুষ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেও তার সারাজীবনই পুনরায় ড্রাগ গ্রহণের প্রলোভনের সাথে যুদ্ধ করে যেতে হয়,যেমন একজন ধূমপায়ী ব্যক্তি দশ বছর পরেও সিগারেটে পুনরায় অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।

কিন্ত তবুও তো প্রতি বছরই ড্রাগে আসক্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।তাই সময় এসেছে আমাদের পুরো পরিস্থিতিই নতুন করে পর্যালোচনা করার।আমাদের ড্রাগে আসক্তি সম্পর্কে ধারণা এসেছে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের খুব সহজ একটি পরীক্ষা থেকে।

আপনি যদি একটি ল্যাব-ইঁদুরকে খাঁচার মধ্যে বন্দী করে তার সামনে দুইটি বোতলে পানি রাখেন যার মধ্যে একটিতে আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগ যেমন হেরোইন বা কোকেন মেশানো আর অপরটিতে শুধু পানি রাখা,তবে প্রায় প্রত্যেকবারই ইঁদুরটি ড্রাগ-মিশ্রিত পানি খেয়ে তাতে আসক্ত হয়ে যাবে এবং অত্যাধিক পরিমাণে গ্রহণে শেষপর্যন্ত মারাই যাবে।কিন্ত বিষয়টি কি এতই সহজ?

মনে করুন কোনো ব্যক্তি দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙ্গে ফেলেছেন।তাঁকে হাসপাতালে ব্যাথা কমানোর জন্য অপিয়েট ড্রাগ,যেমন মরফিন বা হেরোইন দেওয়া হবে।হাসপাতালে এই মুহূর্তেই বহু রোগীকে দিনের পর দিন এইসকল ড্রাগ দেওয়া হচ্ছে।শুধু তাই নয়,এগুলি অত্যন্ত উন্নতমানের ড্রাগ কারণ বিভিন্ন জায়গায় ড্রাগ ডিলাররা নানাকিছু দিয়ে এইসকল ড্রাগের ঘনত্ব কমিয়ে ফেলতে গিয়ে ড্রাগে বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে ফেলে, যেখানে হাসপাতালে দেওয়া অপিয়েট ড্রাগগুলিকে খুব যত্ন করে বিশুদ্ধ রাখা হয়। কিন্ত এত দীর্ঘ-মেয়াদী ব্যবহারের পরেও এসকল রোগীর কেউই কিন্ত এইসকল মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন না,যা ঐ পরীক্ষার ফলাফলের সাথে একদমই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

চিত্রঃ“র‍্যাট পার্ক” এর ধারণা ড্রাগ আসক্তির সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিতে পারে।

১৯৭০ সালে কানাডিয়ান সাইকোলজিস্ট অ্যালেক্সান্ডার ঐ পরীক্ষার একটি বড় ত্রুটি লক্ষ্য করেন।এই ইঁদুরগুলি খুবই সামাজিক জীব হলেও এখানে তাদের একা একটি খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং তাই তাদের ড্রাগ গ্রহণ ছাড়া আর কিছু করারও নাই।এই সমস্যা সমাধানে তিনি ইঁদুরদের জন্য একটি “পার্ক” নির্মাণ করেন যেখানে ১৫-১৬টি ইঁদুরের জন্য একটি বড় খাঁচা(যার আয়তন স্বাভাবিক খাঁচার চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ বেশি)রঙিন বল,টানেল (যার মধ্যে দিয়ে ইঁদুরগুলি খেলতে পারবে) দিয়ে সাজানো হয়।

এ পার্কে অনেক ইঁদুরকে একসাথে রাখা হয়, ফলে তারা নিজেরা খেলতেও পারবে আর মনের আনন্দে বংশ বৃদ্ধিও চালিয়ে যেতে পারবে – অর্থাৎ এই পার্কটিতে তিনি আসলে ইঁদুরদের জন্য একটি স্বর্গ বানিয়ে ফেলেন। তিনি লক্ষ করেন, এই ইদুরগুলি ড্রাগ মেশানো পানি প্রায় গ্রহণই করে না,বা করলেও তা দিয়ে নেশা করে না। পরবর্তীতে অবশ্য অন্যান্য গবেষকগণ এই পরীক্ষার ফলাফল পুনরূৎপাদন করতে ব্যর্থ হন।তবে আমরা কিন্ত এই ধারণা দিয়ে হাসপাতালে রোগীদের নেশা না হওয়া ব্যাখ্যা করতে পারি।

চিত্রঃ সাইমন-ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের কানাডিয়ান প্রফেসর এমিরেটাস ডঃ ব্রুস অ্যালেক্সান্ডার(১৯৩৯-)।

ইদুরের পার্ক নিয়ে তার প্রকল্প “সায়েন্স” এবং “নেচার” পত্রিকা প্রথমে প্রত্যাখ্যান করলেও ১৯৭৮ সালে “সাইকোফার্মাকোলজি” শাখায় প্রকাশ করে।এই ধারণা প্রথমে কেউ মানতে চায়নি;অবশেষে দীর্ঘদিন পরে তিনি ২০০৭ সালে আসক্তি নিয়ে তার কাজের জন্য “স্টারলিং প্রাইজ” পেয়েছেন।

আবার ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিষয়টি বিবেচনা করা যাক।ঐ সময়ে শতকরা ২০ ভাগ আমেরিকান সৈন্য অত্যাধিক পরিমাণে হেরোইন গ্রহণ করছিল,যার ফলে দেশের মানুষ বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়ে।কিন্ত যুদ্ধ শেষে শতকরা ৯৫ ভাগ সৈন্যই হেরোইন সেবন একদম ছেড়ে দেয়,এজন্য তাঁদের কোনো “উইথড্রয়াল” এর কষ্টকর অভিজ্ঞতাও হয়নি বা পুনর্বাসন-কেন্দ্রেও যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।

প্রকৃতপক্ষে কাউকে যদি বিদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাঠানো হয় এবং বাধ্য করা হয় অন্যকে হত্যা করতে,সে সময় কাটানোর জন্য ড্রাগ বেছে নিতেই পারে।কিন্ত আপনি যখন দেশে প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাবেন,তখন প্রকৃতপক্ষে তা হবে খাঁচা থেকে বের হয়ে “পার্কে” যাওয়ার অনুরূপ।ডঃ অ্যালেক্সান্ডার মনে করেন,ড্রাগ-আসক্তি কার্যত একটি সামাজিক সমস্যা এবং তাই যখন একটি সমাজব্যবস্থা নানা সমস্যায় ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে তখনই এই আসক্তি একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়।

মানুষ বিপর্যস্ত সমাজে মানিয়ে নিতে ড্রাগের দিকে ঝুঁকে পড়ে,কারণ আমাদের সহজাত চাহিদাই হল সমাজবদ্ধভাবে থাকা। এজন্য সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ তার প্রিয়জনদের সাথে একত্রে বাঁচতে চায়,কিন্ত নানা সমস্যায় মানুষ যখন একা হয়ে পড়ে তখন তারা এমন কিছু করে যা তার সমস্যা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেয়।এজন্য কেউ সামাজিক মাধ্যমে(যেমন ফেসবুক, টুইটার বা ইন্সট্রাগ্রাম)সময় কাটায়,কেউবা ভিডিও গেম বা জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে এবং অনেকেই ড্রাগ গ্রহণ শুরু করে।

প্রকৃতপক্ষে আসক্তি আমাদের নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার জন্যই সৃষ্টি হয়।যুক্তরাষ্ট্রের করনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৮৫ সাল থেকে আমেরিকানদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা কমতে কমতে মাত্র ২ জনে নেমে এসেছে।

শুধু তাই নয়,সমাজবিজ্ঞানী ডঃ ম্যাথিউ ব্রেশার ২০০০ জন মানুষের উপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন,শতকরা ৪৮ ভাগের মাত্র একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু রয়েছে, ১৮ ভাগের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ২ জন এবং মাত্র ২৯ ভাগের প্রিয় বন্ধুর সংখ্যা ২ জনের বেশি।সবচেয়ে দুঃখজনক হল, ৪ জন পাওয়া যায় যাদের কোনো ভাল বন্ধুই নেই।

১৯৭১ সালের ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগের বিরুদ্ধে “যুদ্ধ” ঘোষণা করেছিলেন,কিন্ত আজ প্রায় ৪৫ বছর পরে আমরা দেখতে পাচ্ছি এর জন্য বিশাল সংখ্যায় কারাদণ্ড প্রদান, দুর্নীতি,রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছুই হয় নাই,যদিও প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও ড্রাগের বিস্তৃতি থামানো যাচ্ছে না(US এ ২০১৫ সালে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ ডলার ব্যয় করা হয়েছিল এই খাতে,কিন্ত দেশে ড্রাগের বিস্তৃতি রোধে ড্রাগ এনফোর্সমেনট এজেন্সির সাফল্য ১% এর ও কম)।তাই সমাজ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে এবং এই “যুদ্ধের” ফলে মানুষ হত্যার পরিমাণ ২৫-৭৫% বেড়ে গিয়েছে।

মেক্সিকোতে প্রায় ১ লক্ষ ৬৪ হাজার মানুষ মারা গিয়েছে ড্রাগ-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় যা ঐ একইসময়ে ইরাক আর আফগান যুদ্ধে সম্মিলিত মৃত্যুর চেয়ে বেশি।যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১৯ সেকেন্ডে একজনকে গ্রেফতার করা হয় ড্রাগের সাথে সংশ্লিষ্টতার জন্য এবং তাই ঐ দেশে বিশ্বের ৫ ভাগ মানুষ থাকলেও ২৫ ভাগ কয়েদী বাস করে।

তাই ড্রাগে আসক্ত ব্যক্তিকে আমরা আজ সাহায্য করার বদলে একঘরে করে ফেলছি।তাদেরকে জেলে কয়েদ করা হচ্ছে,ফলে একদল অসুখী মানুষ আরও খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং নিজেদেরকেই ঘৃণা করছে আপন অবস্থার জন্য।

সুতরাং এখন আমাদের ড্রাগের প্রতি আসক্তি সমস্যার সমাধানে নতুন পথ বেছে নিতে হবে।সমাজের প্রতিটা স্তরে এই ভয়াবহ ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে,তাই স্বতন্ত্র আরোগ্যের বদলে চেষ্টা করতে হবে সমস্যাটিকে সামাজিকভাবে মোকাবেলা করার।

গোটা সমাজটাই আজ বিকৃত হয়ে গিয়েছে,ফলে মানুষও প্রিয়জন বা বন্ধুবান্ধবদের ভুলে ড্রাগে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে।এজন্য যদি আজ আবার নতুন করে অগ্রসর হতে হয় তবে এখনই সময় অস্বাভাবিক জীবনপদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়ে পরস্পরের সাথে একত্রে মিলেমিশে নতুন সমাজ গড়ে তোলার।ড্রাগে আসক্তির সমাধান তাই একা একা নেশা ছাড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া নয়,বরং সবাই মিলেমিশে বেঁচে থাকাই পারে এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে।

References:

  1. https://www.youtube.com/watch?v=ukFjH9odsXw&t=493s
  2. https://www.youtube.com/watch?v=ao8L-0nSYzg&t=3s
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Dopamine
  4. https://www.helpguide.org/harvard/how-addiction-hijacks-the-brain.htm
  5. http://www.universetoday.com/38125/how-long-have-humans-been-on-earth
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Neurotransmitter
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Drug_tolerance
  8. https://en.wikipedia.org/wiki/Heroin
  9. 9. https://en.wikipedia.org/wiki/Codeine
  10. 10. https://en.wikipedia.org/wiki/Hydrocodone
  11. https://en.wikipedia.org/wiki/Nicotine
  12. https://en.wikipedia.org/wiki/Opioid_use_disorder
  13. https://en.wikipedia.org/wiki/Addiction
  14. https://www.drugabuse.gov/publications/drugs-brains-behavior-science-addiction/drugs-brain
  15. https://www.drugs.com/health-guide/alcohol-withdrawal.html
  16. https://en.wikipedia.org/wiki/Cocaine
  17. https://en.wikipedia.org/wiki/Norepinephrine
  18. 18. https://en.wikipedia.org/wiki/Epinephrinehttps://www.youtube.com/watch?annotation_id=annotation_198404&feature=iv&src_vid=ukFjH9odsXw&v=DxR4PqPlgzQ
  19. https://en.wikipedia.org/wiki/Methamphetamine
  20. https://www.drugabuse.gov/publications/drugs-brains-behavior-science-addiction/addiction-health
  21. Di Chiara G, Imperato A. Drugs abused by humans preferentially increase synaptic dopamine concentrations in the mesolimbic system of freely moving rats. Proc Natl Acad Sci85:5274-5278, 1988.
  22. https://www.drugabuse.gov/publications/drugfacts/nationwide-trends
  23. http://www.rehabs.com/about/rehab-treatment/
  24. U.S. Department of Health and Human Services. The health consequences of smoking: a report of the Surgeon General. Atlanta, Georgia. U.S. Department of Health and Human Services, Centers for Disease Control and Prevention, National Center for Chronic Disease Prevention and Health Promotion, Office on Smoking and Health; Washington, DC, 2004.
  25. https://www.cdc.gov/hiv/statistics/index.html
  26. Alexander, B.K., Beyerstein, B.L., Hadaway, P.F. & Coambs, R.B. (1981). The effects of early and later colony housing on oral ingestion of morphine in rats. Pharmacology, Biochemistry, & Behavior, 15, 571-576.
  27. Alexander, B.K. (2000). The globalization of addiction. Addiction Research, 8, 501-526.
  28. http://www.livescience.com/16879-close-friends-decrease-today.html
  29. Potter, Ned. “More Facebook Friends, Fewer Real Ones, Says Cornell Study.” 8 November 2011.ABC News.1 December 2011. < http://abcnews.go.com/Technology/facebook-friends-fewer-close-friends-cornell-sociologist/story?id=14896994#.Ttfpzla8GSp>.
  30. https://www.youtube.com/watch?v=wJUXLqNHCaI&t=310s
  31. The U.S. federal government spent over $15 billion dollars in 2010 on the War on Drugs, at a rate of about $500 per second.Source:Office of National Drug Control Policy .State and local governments spent at least another 25 billion dollars. Source: Jeffrey A. Miron & Kathrine Waldock: “The Budgetary Impact of Drug Prohibition,” 2010.
  32. http://www.drugfreeworld.org/drugfacts/heroin/long-term-effects.html
  33. http://www.drugfreeworld.org/drugfacts/alcohol/international-statistics.html
  34. https://www.youtube.com/watch?v=sbQFNe3pkss
  35. “Chasing the Dream: The First and Last Days on the War on Drugs”-Johann Hari

featured image: palmerlakerecovery.com

বিভিন্ন ভিটামিনের নামকরণের বিচিত্র ইতিহাস

১৯১২ সালে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ঘোষণা করেন, তিনি লাল চাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটি খাদ্য উপাদান আলাদা করেছেন। এই উপাদানটি ছিল মানুষের আবিষ্কৃত প্রথম ভিটামিন। ভিটামিনগুলো এমন পদার্থ যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত দরকারি কিন্ত আমাদের শরীর তা প্রস্তুত করতে পারে না। এরপর একশো বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, এবং গোটা কুড়ি ভিটামিনের নাম জানা গেছে।

কিন্ত এই নামগুলো বেশ অদ্ভুত। ভিটামিন এ, বি, সি আর ডি শুনতে প্রথমে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও যখন জানবেন আট রকম ভিন্ন ভিটামিন বি রয়েছে কিন্ত নাম আছে ভিটামিন বি১২ পর্যন্ত এবং এফ, জি, এইচ বাদ দিয়ে কে (K) ভিটামিন আছে, তবে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্ত এই নামগুলো এরকম কেন? প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের মতো ভিটামিনের এই অদ্ভুত নামকরণের পেছনেও একটি বিচিত্র ইতিহাস আছে।

ভিটামিনের ধারণা প্রথম আসে ১৮৮১ সালে। রুশ সার্জন নিকোলাই লুনিন, জার্মান বিজ্ঞানী গুস্তাভ ফন বাঞ্জ এর অধীনে খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণা করার সময় লক্ষ্য করেন, যে সকল ইঁদুর দিনে দুধ পাচ্ছে তারা বেঁচে থাকলেও শর্করা, আমিষ, চর্বি এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থের কৃত্রিম মিশ্রণ খাওয়া ইঁদুর মারা যাচ্ছে। তাই তিনিই প্রথম বুঝতে পারেন প্রাকৃতিক খাদ্যে এসকল পুষ্টি উপাদান ছাড়াও বিভিন্ন অজানা পদার্থ আছে যা বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যক। কিন্ত অন্যান্য বিজ্ঞানী একই গবেষণা চালিয়ে ভিন্ন ফল পেলেন।

অন্যদিকে প্রায় কুড়ি বছর আগে ফরাসি রসায়নবিদ লুই পাস্তুর প্রমাণ করেন, বিভিন্ন রোগের জন্য প্রকৃতপক্ষে আণুবীক্ষণিক জীব দায়ী। ডাচ চিকিৎসক ক্রিশ্চিয়ান আইকম্যান যখন জাভায় ১৮৯০ সালে বেরিবেরি রোগের কারণ খুঁজতে গিয়েছিলেন তখন তিনিও ধরে নিয়েছিলেন এই রোগের জন্য জীবাণুই দায়ী। কিন্ত দীর্ঘদিন গবেষণা করেও তিনি কোনো জীবাণু পাননি।

অবশেষে ১৮৯৬ সালে লক্ষ্য করেন, তার গবেষণাগারে মুরগির বাচ্চার মধ্যে মড়ক লেগেছে। কিন্ত এই মড়ক অসুস্থ বাচ্চা থেকে সুস্থ বাচ্চার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, একদিন তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, বাচ্চাদের রোগ আপনা আপনিই সেরে যাচ্ছে।

তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, হাসপাতালের বাবুর্চি রোগীদের পথ্যের জন্য রাখা সাদা চাল খাওয়াতে শুরু করেছিলেন বাচ্চাদের। সাদা চাল প্রদানের ফলে মড়কের সূচনা ঘটে আর এই কাজ বন্ধ করা মাত্র বাচ্চাদের অসুখ ভাল হয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি ভুলভাবে মনে করেছিলেন যে, উচ্চ মাত্রার শর্করার বিষক্রিয়ায় বেরিবেরি হয়।

এরপরে আইকম্যানের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় তার গবেষণার দায়িত্ব পড়ে তার সহকারি গেহিত গ্রিঞ্জ এর উপর। ১৯০১ সালে লক্ষ্য করেন, শুধুমাত্র মাংস খাওয়ালেও মুরগীর বাচ্চাদের মধ্যে বেরিবেরি রোগের প্রাদুর্ভাব হয় এবং লাল চাল খাওয়ালে তারা সুস্থ্য হয়ে উঠে। এই প্রথম তার মনে হলো খাবারের কোনো উপাদানের অভাবেও রোগ হতে পারে।

এই উপলব্ধির পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এবার লাল চাল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই উপাদানকে শনাক্ত করে পৃথক করা এবং কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। এরই ফলশ্রুতিতে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ১৯১২ সালে ঘোষণা করেন চালের লাল আবরণ থেকে তিনি এই সক্রিয় উপাদান পৃথক করেছেন। এতে অ্যামিন গ্রুপ বিদ্যমান আছে।

তিনি ধারণা করেন সম্পূর্ণ নতুন গ্রুপের অ্যামিন যৌগ তিনি আবিষ্কার করেছেন। এদের নাম দেন ভাইটাল অ্যামিন। এই Vital amine থেকে এসেছে vitamin (ভিটামিন)। প্রকৃতপক্ষে সব ধরনের ভিটামিনই অ্যামিন যৌগ নয়। আর তিনিও আসলে প্রকৃত উপাদানটি পৃথক করতে পারেননি। বেরিবেরি রোগটি হয় থায়ামিন বা ভিটামিন বি-১ এর অভাবে। তিনি মূলত নিকোটিনিক এসিড বা ভিটামিন বি-৩ পৃথক করেছিলেন।

১৯৩৩ সালে রবার্ট রানেলস উইলিয়াম প্রায় ১২ শত কেজি লাল চাল থেকে মাত্র এক তুলা বা ১১.৬৬ গ্রাম বিশুদ্ধ থায়ামিন পৃথক করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে মাত্র এক কণা থায়ামিন কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে জানা গেল সকল ভিটামিনে অ্যামিন গ্রুপ থাকে না এবং তাই বিজ্ঞানি জ্যাক সিসিল ড্রামোনডের প্রস্তাবনা অনুযায়ী vitamine নামটির পরিবর্তে vitamin ব্যবহার করা শুরু হল। e বাদ দিয়ে দিলেন, ফলে এটি আর অ্যামিনের প্রতিনিধিত্ব করে না।

ইতিমধ্যে ১৯১২ সালে ফ্রেডরিক হপকিন্স ইঁদুরের উপর কেসিন, লারড, সুক্রোজ, স্টার্চ এবং বিভিন্ন মিনারেল নিয়ে গবেষণা করে দেখান, যেসকল ইঁদুর এসব উপাদানের সাথে সামান্য পরিমাণ দুধ খায় তাদের বৃদ্ধি ভাল হয়। দুধ না খেলে ইঁদুরের ভর কমতে থাকে। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন দুধে সামান্য পরিমাণে অজানা জৈব যৌগ রয়েছে যেটি ছাড়া স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। অবশ্য তিনি এ বিষয় নিয়ে আর কাজ করেননি।

এরপরে ১৯১৪ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানি এলমার ম্যাককলাম মাখনের ফ্যাট থেকে একটি ভিটামিন পৃথক করেন এবং নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর এ’। পরে চালের লাল আবরণ থেকে পৃথক করা ভিটামিনের নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর বি’। তবে এসব যৌগকে ‘ভিটামিন এ’ এবং ‘ভিটামিন বি’ হিসেবে প্রথম নামকরণ করেন ম্যাককলামের অধীনে গবেষণারত স্নাতকোত্তর ছাত্রী কর্নেলিয়া কেনেডি। কিন্ত দুঃখজনকভাবে অন্যান্য বিজ্ঞানী এমনকি ম্যাককলাম নিজেও এই নামকরণের কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেছেন।

image source: india.com

যে উপাদানের অভাবে স্কার্ভি হয় তার নাম ‘ভিটামিন সি’ রাখার প্রস্তাব রাখা হয় ১৯১৯ সালে। কিন্ত এর পরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন ভিটামিন এ এবং বি উভয়েই প্রকৃতপক্ষে একাধিক যৌগের মিশ্রণ। ম্যাককলাম ১৯২০ সালে ভিটামিন এ থেকে দুটি উপাদান পৃথক করেন। এদের মাঝে যেটি রাতকানা রোগের প্রতিরোধ করে তার নাম ‘ভিটামিন এ’ রেখে দেয়া হয়। আর অন্যটির নাম রাখা হয় ‘ভিটামিন ডি।

একই বছর বিজ্ঞানীরা দেখতে পান ইস্ট থেকে পৃথককৃত ‘ভিটামিন বি’ একইসাথে বেরিবেরি এবং পেলাগ্রা প্রতিরোধ করে। কিন্ত এই উপাদানটিকে উত্তপ্ত করলে তা আর পেলাগ্রা প্রতিরোধ করতে পারে না। তার মানে ভিটামিন বি’তে প্রকৃতপক্ষে একাধিক উপাদান রয়েছে। তারা দুটি উপাদানকে পৃথক করতে সক্ষমও হন।

কেউ কেউ এগুলোকে ‘ভিটামিন এফ’ এবং ‘ভিটামিন জি’ বলে অভিহিত করেন। কিন্ত বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই এদেরকে ‘ভিটামিন বি১’ এবং ‘ভিটামিন বি২’ নামে ডাকেন। কিন্ত ১৯২২ সালে তারা বুঝতে পারলেন ভিটামিন বি২ আসলে অনেকগুলো যৌগের মিশ্রণ। তাই তারা একে ‘ভিটামিন বি২ কমপ্লেক্স’ হিসেবে অভিহিত করেন।

১৯৩৩ সালে বিজ্ঞানী রিশার্ড খুন এবং ভাগনার এওয়ায়েগ এই কমপ্লেক্স থেকে রিবোফ্ল্যাভিন পৃথক করেন। এটিই ভিটামিন বি২। এটিই প্রথমে ভিটামিন জি নামে পরিচিত ছিল। এরপর ১৯৩৭ সালে আর্নল্ড এলভিহেম নিয়াসিন (ভিটামিন বি৩) শনাক্ত করেন।

পিরিডক্সিন (ভিটামিন বি৬) ১৯৩৪ সালে এবং ফলিক এসিড (ভিটামিন বি৯) ১৯৪১ সালে আবিষ্কৃত হয়। মাঝে বিজ্ঞানীগণ ভিটামিন বি৪ আবিষ্কার করেছেন বলে মনে করেন কিন্ত পরবর্তীতে দেখা যায় তা এডেনিন, কারটিনিন এবং কোলিনের মিশ্রণ। এদের কোনোটাই আমাদের খাবারের সাথে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। এজন্য ভিটামিন বি৪ বলে কিছু নেই। একই কারণে ভিটামিন বি৮, বি১০ এবং বি১১ এর অস্তিত্বও নেই।

১৯২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক ডাক্তার হার্বার্ট ইভান্স এবং তার সহকারী ক্যাথেরিন বিশপ লেটুস পাতার লিপিড অংশ থেকে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন ই আবিষ্কার করেন। ওদিকে আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বেনেট শিউর এক বছর আগেই এই ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তী দশ বছরে তারা আবিষ্কার করেন এই ভিটামিন আটটি ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছে আলফা, বিটা, গামা ও ডেলটা টকোফেরল এবং টকটোট্রাইইনল।

পরবর্তী ভিটামিন আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানীগণ। তারা এই বর্ণ-অনুক্রমিক ধারা মানতে রাজি হননি। এর বদলে তারা অন্য প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হন। যেহেতু এই ভিটামিন রক্ত জমাট বাঁধতে বা জার্মান ভাষায় koagulation করতে সহায়তা করে সেহেতু তারা একে ‘ভিটামিন কে’ নামে অভিহিত করেন। উল্লেখ্য শুধুমাত্র ও, এক্স, ওয়াই এবং জেড এই চারটি অক্ষরের জন্যই কোনো ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করা হয়নি।

featured image: gizmodo.com

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

১৭ জানুয়ারি, ১৯৯৪। স্থানীয় সময় ভোর ৪ টা ৫৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে ৬.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসে। এই ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৭০০ ছাড়িয়ে যায় আর মারা যায় কমপক্ষে ৫৭ জন। একইসাথে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিনষ্ট হয়, তাই মাত্র ১০-২০ সেকেন্ডের এই ভূমিকম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ হিসেবে স্থান পেয়েছে।

এই দুঃখজনক দুর্যোগের পরে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে, যখন ইমারজেন্সি নাম্বারে অস্বাভাবিক সংখ্যায় ফোন দিয়ে শত শত ব্যক্তি জানতে চান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে রাতের আকাশে যে বিশাল রুপালী মেঘের মতো দেখা যাচ্ছে তা কোনোভাবে এই ভূমিকম্পের জন্য দায়ী কিনা। তারা প্রকৃতপক্ষে মিল্কিওয়ে (আকাশ গঙ্গা) গ্যালাক্সির কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, কারণ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তারা জীবনে কোনোদিন আমাদের ছায়াপথ দেখেনি।

ইতালীয় বিজ্ঞানী এবং CieloBuio-Coordination for the protection of the night sky এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. ফ্যাবিও ফালকি পরিচালিত Light Pollution Science and Technology Institute এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা ষাট ভাগ ইউরোপিয়ান, আশি ভাগ উত্তর আমেরিকান এবং বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ রাতের আকাশে আপন গ্যালাক্সি দেখতে পারেন না।

১০ই জুন, ২০১৬ সালে প্রকাশিত National Oceanic and Atmospheric Administration(NOAA) এর পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের সম্পূর্ণ এবং কুয়েত, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আর্জেন্টিনার প্রায় সবটুকু আকাশ এতই উজ্জ্বল যে সেখানে কখনোই রাতে অন্ধকার নেমে আসে না। জার্মানি, হংকং, বেলজিয়ামের নানা অংশ এবং বোস্টন, লন্ডন, ওয়াশিংটন, প্যারিসের কোনো মানুষকে পরিষ্কার রাত দেখার জন্য ক্ষেত্র বিশেষে প্রায় ৫০০ থেকে ৮৫০ মাইল ভ্রমণ করতে হয়।

প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট আলোর বাধার জন্য গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে না পারাকেই যদি দূষণ (Light Pollution) বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বিশ্বের ৮০ ভাগ এবং পাশ্চাত্যের সম্পূর্ণ আকাশই দূষিত।

আলোক দূষণ বলতে আমরা অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর ক্ষতিকর প্রভাবকে বুঝে থাকি; যা অপর্যাপ্ত, অনিয়ন্ত্রিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নানা সমস্যাকে নির্দেশ করে। এসকল সমস্যার মধ্যে skyglow, light trespass, glare, clutter এবং over-illumination উল্লেখযোগ্য।

অরক্ষিত কিংবা ঊর্ধ্বমুখী আলোক উৎস থেকে আলো বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য কণার মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সম্পূর্ণ আকাশই অত্যন্ত উজ্জ্বল (skyglow) দেখায়, যা অনেক দূর থেকেও পরিলক্ষিত হয়।এই দীপ্তির কারণে রাতের আকাশ প্রায় দিনের মতোই উজ্জ্বল হয় এবং চাঁদ-তারা কিছুই দেখা যায় না। International Dark-sky Association এর গবেষণা অনুযায়ী লস এঞ্জেলেসের skyglow বায়ুমণ্ডলের ২০০ মাইল উচ্চতা থেকেও দেখা যায়। আকাশ মেঘলা হলে এই সমস্যা ১০,০০০ গুণ বেশি প্রকট হতে পারে।

চিত্রঃ রাতের মেক্সিকো সিটি। skyglow এর কারণে আকাশ এতই উজ্জ্বল যে চাইলে বাসার বাইরে রাতের বেলাও বই পড়া যায়।

আপনার বাসায় কিংবা জমিতে আলোর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ Light Trespass নামে পরিচিত। যেমন প্রতিবেশির ব্যবহৃত আলো জানালা দিয়ে আপনার ঘরে ঢুকতে পারে, যার ফলে শান্তিভঙ্গ কিংবা ঘুমের অসুবিধা হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে International Dark-sky Association এর সহায়তায় Light Trespass থেকে জনসাধারণের অধিকার রক্ষার্থে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ফেডারাল এজেন্সি অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারে।

আমাদের চোখে যদি হঠাৎ করেই অত্যুজ্জ্বল আলো (Glare) এসে পড়ে, (যেমন রাতের বেলায় রাস্তায় ছোট প্রাইভেট গাড়ি চালানোর সময় ট্রাককে মুখোমুখি অতিক্রম করতে গেলে ট্রাকটির হেড লাইটের আলো কিছুক্ষণের জন্য সরাসরি চোখে এসে পড়ে) তবে তা আমাদের দৃষ্টি ব্যাহত করতে পারে, দেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এমনকি ক্ষণিকের জন্য অন্ধও করে দিতে পারে।

চিত্রঃ গাড়ি চালানোর সময় Glare দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত করতে পারে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অতিরিক্ত আলোকিত এলাকা, যেমন Las Vegas Strip বা Manhattan এর রাস্তায় বিভিন্ন রঙের আলোর মাত্রাতিরিক্ত উজ্জ্বল এবং জমকালো সমাবেশকে Light Clutter (আলোক-বিশৃঙ্খলা) বলে। রাস্তার চারদিকে অত্যুজ্জ্বল বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড থাকলে কোনো ড্রাইভার বিভ্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। প্লেন চালানোর সময় পাইলট শহরের বাণিজ্যিক আলোক সমাবেশের সাথে সেফটি লাইট, যেমন রানওয়ের আলো গুলিয়ে ফেলতে পারে, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।

চিত্রঃ Las Vegas Strip এ নানা রঙের আলোর বিশৃঙ্খল সমাবেশ(Clutter)।

আলোর অত্যাধিক ব্যবহার Over-illumination নামে পরিচিত। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই দৈনিক প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল (১ ব্যারেল = ১৫৯ লিটার) তেল এজন্য নষ্ট হয়। Energy Data নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর জন্য যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহৃত হয় তার শতকরা ৩০-৬০ ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং U.S. Department of Energy( DOE) হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৯ সালেই এজন্য ৮১.৬৮ টেরাওয়াট বিদ্যুৎ নষ্ট হয়েছে।

আসলে শুধু over-illumination-ই নয়, সকল প্রকার আলোক দূষণেই বিপুল পরিমাণ শক্তির অপচয় হয়। ২০০৫ সালের হিসেব অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বের উৎপাদিত বিদ্যুতের এক চতুর্থাংশ শুধু আলো জ্বালাতেই ব্যয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু রাস্তা আর পার্কিং-লট আলোকিত করতে বছরে ১২০ টেরাওয়াট/ঘণ্টা শক্তি ব্যয় হয়, যা দিয়ে নিউইয়র্ক শহরের দুই বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

শুধু তাই নয়, কৃত্রিম আলোর জন্য যে শক্তি ব্যয় হয় তার প্রায় ত্রিশ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর তিন কোটি ব্যারেল তেল এবং ৮২ লক্ষ ব্যারেল কয়লার অপচয় ঘটে, ক্ষতি হয় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের এবং প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা শোষণ করতে সাড়ে ৮৭ কোটি গাছের প্রয়োজন।

২০০৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় কৃত্রিম আলো গ্রীনহাউজ গ্যাসের সবচেয়ে বড় (৩০-৫০%) উৎস। প্রায় ২ কোটি মানুষের জন্য ১০৩৫ গিগাওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় যার জন্য ২১ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার খরচ হয় এবং সেইসাথে প্রায় সাড়ে ১১ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।

চিত্রঃ একটি কসমেটিকস দোকান, যা প্রয়োজনের দ্বিগুণ আলো ব্যবহার করছে। ফলে হচ্ছে আলোক তথা শক্তির অপচয়।

আলোক দূষণের কুপ্রভাব মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ দেখলেই অনুধাবন করা যায়। সুবিশাল টুইন টাওয়ারের আলোর বিম Light Trespass এর জন্য দায়ী, আশেপাশের বিল্ডিংগুলোয় অহেতুক অত্যাধিক আলো ব্যবহৃত (Over-illumination) হয়েছে এবং এইসব দূষণের ফলে শহরের আকাশ অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে গেছে এবং কোনো নক্ষত্রই দৃশ্যমান নয় (skyglow)।

চিত্রঃ কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ।

আলোক দূষণের জন্য শুধু শক্তির অপচয়ই হয় না; তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যেমন মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে অনেক কঠিন করে তোলে। চারপাশে আলোর অত্যাধিক ব্যবহারে সম্পূর্ণ আকাশই উজ্জ্বল হয়ে যায়, ফলে কোনো অস্পষ্ট গ্রহ-নক্ষত্র দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এজন্যই নতুন দূরবীনগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করা হচ্ছে। আবার আমরা জানি, বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র কোনো নক্ষত্রের আলো কীভাবে বিভিন্ন রঙিন আলোক রেখায় ভেঙে যায় তা রেকর্ড করে।

প্রত্যেক মৌলেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী আছে, সুতরাং মহাবিশ্বের কোনো বস্তুর বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করে তার ভর, উপাদান, তাপমাত্রা, ঔজ্জ্বল্য ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায়। ফলে তা কি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, নিউট্রন-স্টার নাকি অন্যকিছু তা বুঝা সম্ভব হয়। জ্যোতির্বিদ্যায় এই যন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্ত কৃত্রিম আলো বর্ণালীতে উজ্জ্বল আলোক রেখার সৃষ্টি করে যা অন্যান্য লাইনকে ম্লান করে দেয়, যেমন পারদ-বাষ্প, সোডিয়াম-বাষ্প বা ধাতব-হ্যালাইড প্রদীপ তাদের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী সৃষ্টি করে যা আমরা যে বর্ণালী দেখতে চাইছি তাকে অস্পষ্ট করে ফেলে।

এজন্য জ্যোতির্বিদগণ ‘নেবুলা-ফিল্টার’ ব্যবহার করতে পারেন যা নেবুলায় সাধারণত যেসব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পাওয়া যায় শুধুমাত্র সেগুলোই দূরবীক্ষণ যন্ত্রে প্রবেশ করতে দেয়। তারা এছাড়া Light Pollution Filter (LPR) ব্যবহার করে থাকেন যা এসকল প্রদীপের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী প্রবেশ করতে দেয় না এবং ফলশ্রুতিতে আলোক দূষণের প্রভাব কমে যায়। তাই গ্যালাক্সি এবং নীহারিকার মতো ম্লান জগৎ দেখা সহজ হয়।

কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি এসকল ফিল্টার আলোক দূষণের কু-প্রভাব একেবারে নষ্ট করতে পারে না। যেহেতু এখানে পরীক্ষাধীন বস্তুর ঔজ্জ্বল্য কমিয়ে ফেলা হয় তাই ‘Higher magnification’ সম্ভব হয় না। তাছাড়া কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বাধা দেওয়ায় বস্তুর রঙের পরিবর্তন ঘটে এবং প্রায়ই সবুজ ছাপ পড়ে যায়। তাই অত্যাধিক দূষিত শহরে LPR Filter ব্যবহার করে শুধু উজ্জ্বল নীহারিকাই (Emission Nebulae) দেখা সম্ভব, কারণ অন্যান্য ম্লান গ্রহ-নক্ষত্র বস্তুত অদৃশ্য হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ কিংবা ছবি তোলার জন্য কোনো ফিল্টারই অন্ধকার আকাশের সমকক্ষ হতে পারে না। আমরা কোনো স্থানের রাতের আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপ করার জন্য Bortle Scale ব্যবহার করতে পারি। শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী John E. Bortle ২০০১ সালে এই স্কেলের প্রবর্তন করেন যা কোনো জায়গা থেকে কত ভালোভাবে গ্রহ-নক্ষত্র দেখা যায় এবং তা আলো দ্বারা কী পরিমাণ দূষিত তা পরিমাপ করে।

এই স্কেলে ‘১’ দ্বারা অসাধারণ অন্ধকার স্থান (যেখানে অত্যন্ত ম্লান তারকারাজিও দেখা সম্ভব, অবশ্য অন্যান্য উজ্জ্বল জগতের জন্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে) এবং ‘৯’ দ্বারা অত্যুজ্জ্বল শহর (যেখানে আকাশ কখনই অন্ধকার হয় না, চাঁদ এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ-নক্ষত্রই শুধু দেখা সম্ভব হতে পারে) বুঝায়।

এতক্ষণ ধরে লেখা পড়ে মনে হতে পারে, কৃত্রিম আলোর জন্যই আকাশ কখনো অন্ধকার হয় না, এটিই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সকল গবেষণাতে সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্ত প্রকৃত অর্থে আমাদের বায়ুমণ্ডল কখনোই সম্পূর্ণভাবে অন্ধকার হয় না, কারণ উপরের দিকে (সাধারণত মেসোস্ফিয়ারে) সূর্যের অত্যন্ত কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে আয়ন উৎপন্ন হয় এবং তারা বিভিন্ন কণার সাথে যুক্ত হলে ফোটন নির্গত হয় যা বাষ্পদ্যুতির (airglow) সৃষ্টি করে।

দিনে সূর্যের জন্য বাষ্পদ্যুতির প্রভাব বুঝা না গেলেও রাতে তা যথেষ্টই সমস্যার সৃষ্টি করে, এজন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে থাকা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র অনেক ম্লান তারাও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে যা ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব হয় না।

এছাড়া সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলে প্রতিফলিত হলেও তা মহাবিশ্বে বিভিন্ন ধুলিকণার মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আকাশকে রাতে উজ্জ্বল করে তোলে। তাই আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপের সময় Bortle Dark Sky Scale এ ‘১’ দ্বারাও প্রকৃতপক্ষে ‘সম্পূর্ণ অন্ধকার’ বুঝায় না।

চিত্রঃ Bortle Dark Sky Scale (The Scale ranges from 1 to 9)

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনেও আলোক দূষণের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে সকল প্রাণী উদ্ভিদ এবং পোকামাকড়ের জীবনযাত্রা, দিন-রাতের নিয়মিত আবর্তনের উপর নির্ভর করে বিবর্তিত হয়েছে, কিন্ত কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে বাস্তুতন্ত্রের এই ভারসাম্য আজ নষ্ট হতে চলেছে। আলোর প্রতি বিভিন্ন পোকামাকড়ের অদম্য আকর্ষণের বিষয়টিই বিবেচনা করা যাক।

জার্মানির Mainz বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের Gerhard Eisenbeis এর ২০০৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোর দিকে কীট-পতঙ্গের আকৃষ্ট হবার বিষয়টি তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, কিছু পোকা আলোর দিকে উড়ে গেলেও কিছুদূর গিয়ে থেমে যায় এবং সেখানেই সারারাত আটকে থাকে, যা fixated or capture effect নামে পরিচিত।

চিত্রঃ বায়ুমণ্ডলের উপরে অস্থিতিশীল অক্সিজেন পরমাণুর সবুজ বাষ্পদ্যুতি, International Space Station থেকে ছবিটি তোলা।

রাতের অন্ধকারের মাঝে কৃত্রিম আলোয় পোকাগুলি বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তারা সরাসরি গরম প্রদীপের উপরে উড়ে এসে পড়ে কিংবা সারারাত ধরে আলোর চারদিকে উড়তে থাকে। দুই ক্ষেত্রেই উত্তাপ আর অবসাদে পোকাগুলির মৃত্যু ঘটে। এছাড়া তারা আলোর প্রতি এমন অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করে যে সবকিছু ভুলে সারাক্ষণ আলোর চারপাশেই অবস্থান করে এবং পাখি, মাকড়সা বা বাদুড়ের সহজ শিকারে পরিণত হয়। ফলে বাস্ততন্ত্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

যেমন, সুইডেনের কিছু শহরে নতুন ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের অল্পদিনের মধ্যেই Europian Lesser Horseshow নামক বাদুঢ় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, কারণ আলোর প্রতি অধিক সহনশীল Pipistrell বাদুঢ় ল্যাম্পপোস্টের দিকে আকৃষ্ট পোকামাকড় শিকার করা শুরু করায় তাদের খাবারের অভাব ঘটে।

দ্বিতীয়ত, কীটপতঙ্গের চলার পথ আলোকিত হয়ে গেলে (যেমন রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করলে) তারা সেদিক দিয়ে আর যায় না, যা Crash Barrier Effect নামে পরিচিত। এভাবে আলোর প্রবর্তনের ফলে পোকামাকড়ের চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়।

সবশেষে Vacuum Cleaner Effect বিষয়টি বিবেচনা করা যায়, যা কৃত্রিম আলোর প্রভাবে নিজস্ব পরিবেশের পরিবর্তনের জন্য পোকামাকড়ের বিশাল সংখ্যায় মৃত্যুকে নির্দেশ করে। কৃত্রিম আলো বিপুল সংখ্যায় পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করে এবং খাদ্য অনুসন্ধান কিংবা বংশবৃদ্ধির পরিবর্তে তারা আলোর চারদিকে উড়তে থাকে, ফলে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে।

এক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ লক্ষ Mayfly এক রাতে কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং বংশবৃদ্ধি না করেই মারা গিয়েছিল, যা সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল।

মেফ্লাই হচ্ছে এক ধরনের জলজ পতঙ্গ যা জীবনের অধিকাংশ সময় মূককীট হিসেবে পানির নিচে থাকে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে শুধুমাত্র প্রজননের জন্য পানির উপরে উঠে আসে। এ সময় তাদের আয়ু মাত্র ৫ মিনিট থেকে একদিন হয় এবং মুখ ও পাকস্থলি না থাকায় শুধু বংশবৃদ্ধিই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়। গবেষকের মতে, রাস্তায় কৃত্রিম আলো ব্যবহারের জন্য এক গ্রীষ্মকালে ৬০ থেকে ১৩০ বিলিয়ন পোকা শুধু জার্মানিতেই মারা যায়।

বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যেও আলোর প্রতি এই অদ্ভুত আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তারা সার্চলাইট টাওয়ারের চারপাশে অবসাদে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত উড়তে থাকে। আলোর প্রতি এই অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আকর্ষণ Positive phototaxis নামে পরিচিত; এবং এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক মতবাদ থাকলেও কোনোটাই ত্রুটিমুক্ত না হওয়ায় এই আচরণের কারণ আজও অজানা।

আলোক দূষণের ফলে বিভিন্ন প্রাণীর বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। কৃত্রিম আলো থাকলে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ, জোনাকি ও ফড়িঙ প্রজননে অনুৎসাহিত হয়। যেমন Heliothis zea পোকা সম্পূর্ণ অন্ধকার না হলে কখনোই প্রজননে অংশ নেয় না। আলোর জন্য ডিম পাড়াও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়।

যেমন ১৯৩৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আলোর ফাঁদে আটকে পড়া স্ত্রী মথের শতকরা আশি ভাগই ডিম পাড়ার জায়গা খুঁজছিল। কৃত্রিম আলোতে গাছের পরাগায়নও হুমকির মুখে পড়ে। বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসের ফুল রাতের অন্ধকারে স্বল্প সময়ের জন্য ফুটে এবং প্রধানত বাদুঢ় ও মথের মাধ্যমে তাদের পরাগায়ন ঘটে, তাই চারপাশে আলোর পরিমাণ বেশি হলে পলিনেটরের অভাবে তাদের বংশবৃদ্ধি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গাছের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্যও আলোক দূষণ দায়ী। Purdue University এর Forestry and Natural Resource বিভাগের William R. Chaney এর ২০০২ সালের জুন মাসের গবেষণা অনুযায়ী, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য, ঔজ্জ্বল্য এবং দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের প্রভাব রয়েছে। তাই রাতে কৃত্রিম আলোর প্রবর্তনের ফলে পাতার আকৃতি, রঞ্জক পদার্থের সৃষ্টি, শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কুঁড়ির সুপ্তাবস্থা প্রভৃতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

রাতে কৃত্রিম আলোর প্রভাবে গাছের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, তাই ল্যাম্পপোস্ট থেকে 700nm-1mm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (লাল থেকে অবলোহিত) আলো নির্গত হলে গাছের ফুল ফোটার প্যাটার্নে পরিবর্তন ঘটতে পারে। গবেষকের মতে, যদি কৃত্রিম আলো কোনো গাছের ফটো পিরিয়ডিজমে পরিবর্তন ঘটায় তবে সেই গাছের জন্য সারা বছরই গ্রীষ্মকাল থাকতে পারে (কারণ কৃত্রিম আলোর প্রভাবে সেটার জন্য রাতের দৈর্ঘ্য সবসময়ই কম থাকছে) এবং গাছের সম্পূর্ণ বৃদ্ধি কখনই সম্ভব হয় না।

তিনি উদাহরণস্বরূপ একটা পাম গাছ সম্পর্কে লিখেছেন যাতে কখনই ফুল ধরে না। শীতপ্রধান দেশে তুষার জমে ডাল ভেঙে গিয়ে গাছের ক্ষতি হতে পারে এবং এজন্যই শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়। কিন্ত শীতকাল চলে আসলেও কৃত্রিম আলোর প্রভাবে পত্রঝরা গাছের পাতা ঝরে পড়ে না, যা গাছের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

পরিযায়ী পাখিদের মৃত্যুর জন্যও আলোক দূষণ অনেকাংশে দায়ী। বহু হাজার বছর ধরে পরিযায়ী পাখিরা চাঁদ-তারার আলো ব্যবহার করে রাতে শীতপ্রধান দেশ থেকে উষ্ণ স্থানে উড়ে যাচ্ছে, কিন্ত বর্তমানে কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে তারা আর পথ ঠিক রাখতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের Fish and Wildlife Service এর হিসেব অনুযায়ী, উঁচু টাওয়ার এবং বিল্ডিং এর আলোয় আকৃষ্ট হয়ে সংঘর্ষের ফলে প্রতি বছর ৪০-৫০ লক্ষ পাখির মৃত্যু ঘটে। Fatal Light Awareness Program এর নির্বাহী পরিচালক Michael Measure এর মতে, শুধু উত্তর আমেরিকাতেই ৪৫০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আলোকিত স্থাপনার সাথে সংঘর্ষের ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় Henslow’s Sparrow, cerulean warble-ও রয়েছে।

আবার সার্চলাইটের আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পাখিরা সারা রাত ধরে তার চারদিকে উড়তে থাকে যতক্ষণ না অবসাদে মৃত্যু ঘটে। যেমন ১৯৫৪ সালের ৭-৮ অক্টোবরে জর্জিয়ায় Warner Robin Air Force Base এর ceilometer (সার্চলাইট টাওয়ার) এর চারপাশে ৫৩ প্রজাতির অর্ধ লক্ষাধিক পাখি মারা গিয়েছিল। এছাড়া কৃত্রিম আলোর জন্য পাখিরা মনে করে বসন্ত চলে এসেছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যাত্রা শুরু করে যার ফলে তারা বাসা বাঁধা, প্রজনন এবং খাদ্য সন্ধানের আদর্শ সময় মিস করতে পারে।

আলোক দূষণ আজ বিভিন্ন সরীসৃপ, বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। সাড়ে ৬ কোটি বছরের পুরনো এই প্রাণী প্রায় দুইশ বছর বাঁচতে পারে, যার অধিকাংশ সময় পানিতে থাকলেও ডিম পাড়ার জন্য তারা শত শত মাইল সাঁতরে সমুদ্রসৈকতে উঠে আসে। একটি মা কচ্ছপ বালুর মধ্যে এক-দুই ঘণ্টা থেকে প্রায় শ’খানেক ডিম পাড়ে এবং ৭-১২ সপ্তাহের মধ্যে (সাধারণত রাতে) বাচ্চা জন্মায়। বাচ্চা কচ্ছপের জীবনের প্রথম মুহূর্তগুলো খুবই কঠিন, যখন তারা পাখি, কাঁকড়া ও অন্যান্য শিকারি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে দ্রুত সাগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা চালায়।

অবশ্য এই কচ্ছপগুলো এতই ছোট যে বালুর উপরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত মাথা তুলতে পারে। তাই সাগরে যাওয়ার জন্য প্রবৃত্তিগতভাবেই তারা তাদের অন্ধকার স্থান ছেড়ে নিচের দিকে সমতল আর উজ্জ্বল স্থানের দিকে ছুটে চলে। এই যাত্রা এতই বিপজ্জনক যে মাত্র দশ শতাংশ সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে এবং এক শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্ত বর্তমানের আলোক দূষণ তাদের এই সংগ্রামকে আরো কঠিন করে তুলছে।

প্রথমত, মা কচ্ছপ ডিম পাড়ার জন্য অন্ধকারতম সৈকতই বেছে নেয়, যা খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চা কচ্ছপের সাগর খুঁজে পাওয়ার জন্য আকাশ অন্ধকার হওয়া প্রয়োজন। Florida Atlantic University এর জীববিজ্ঞানী Dr. Michael Salmon এর ১৯৯৫ এবং ২০০৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে বাচ্চা কচ্ছপেরা সাগরের বদলে শহরের দিকে চলে আসে যা তাদের ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, পাখি বা অন্যান্য প্রাণীর সহজ শিকারে পরিণত হওয়া কিংবা গাড়ির আঘাতে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শুধুমাত্র ফ্লোরিডাতেই এই কারণে বছরে লক্ষ লক্ষ কচ্ছপ মারা যায়।

অন্যান্য প্রাণী, যেমন ব্যাঙ, সাপ আর স্যালাম্যানডার গভীর রাতে কিংবা ভোরের দিকে শিকার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর কারণে অন্ধকার নেমে আসতে দেরি হওয়ায় তারা কমপক্ষে এক ঘণ্টা পরে শিকারে বের হয়, ফলে তাদের খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

শুধু প্রাণী আর পোকামাকড় নয় বরং মানুষের উপরেও কৃত্রিম আলোর কুপ্রভাব রয়েছে। আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম (২৪ ঘণ্টায় শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত পরিবর্তনের যে চক্র সম্পন্ন হয়; যা শরীরের তাপমাত্রা, স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারা এবং বিভিন্ন হরমোনের সুষম নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে) বহাল রাখার জন্য আলো এবং অন্ধকারের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী।

উদাহরণস্বরুপ মেলাটোনিন হরমোনের কথাই বিবেচনা করা যাক। আমাদের মস্তিষ্কে অপটিক নার্ভের উপরে অবস্থিত Suprachiasmatic Nucleus (SCN) গ্রুপের স্নায়ুকোষ পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে মেলাটনিন হরমোনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। Antioxidant গুণাগুণ থাকার পাশাপাশি এই হরমোন ঘুমাতে সাহায্য করে, রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে, কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে এবং থাইরয়েড, প্যানক্রিয়াস, ওভারিস, টেসটিস এবং অ্যাডরিনাল গ্ল্যান্ডের কাজে সহায়তা করে। সুতরাং আমাদের সুস্থতার জন্য এই হরমোন নিঃসৃত হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

এই হরমোন অন্ধকারে নিঃসৃত হয়, তাই রাতে কৃত্রিম আলোর ব্যবহারে এই নিঃসরণ বন্ধও হয়ে যেতে পারে (মাত্র ৩৯ মিনিট আলোতে থাকলেই রক্তে মেলাটনিনের পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগ কমে যায়) যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান Paolo Sassone-Corsi এর মতে, সার্কাডিয়ান রিদম আমাদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আলোক দূষণে এই রিদমে যে ব্যাঘাত ঘটে তা বিষণ্ণতা, অনিদ্রা, স্থুলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, অবসাদ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উচ্চ-রক্তচাপ এবং কর্মদক্ষতা কমে যাবার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Plitnick and co. (2010) এর গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রাত জেগে কাজ করলে মানুষের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, ফলে সামান্য কারণেই মেজাজ খারাপ হয় এবং স্বাভাবিক তৎপরতাও কমে যায়। এছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তে প্রকাশিত বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোয় মানুষের অনুভূতিও তীব্র হয়ে থাকে,তাই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঝামেলা নিষ্পত্তি কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক পরিমাণ সূর্যালোক গ্রহণ করলে ছাত্রদের ক্লাসে দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং আলঝেইমার ডিজিজের সমস্যা কমে যেতে পারে।

Breast cancer এবং prostate cancer এর পেছনেও রাতে কৃত্রিম আলো ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০০৩ সালের ৪ জুন প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী যেসকল নার্স ১৫ বছর বা তারচেয়ে বেশি সময় ধরে মাসে কমপক্ষে ৩ বার রাতে ডিউটি পালন করেছেন তাঁদের ক্যান্সারের ঝুঁকি শতকরা ৩৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এজন্য ২০০৭ সালে World Health Organization (WHO) এর International Agency for Research on Cancer নাইটশিফট (বা অন্য কোনো শিফটে কাজ) যা সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত ঘটায়, তাকে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কৃত্রিম আলোর অনেক ক্ষতিকর দিক থাকলেও আশার কথা হলো, আমরা দৈনিক যেসকল দূষণের মুখোমুখি হই তাদের তুলনায় এই আলোক দূষণ সমস্যার সমাধান অত্যন্ত সহজ। আলোর ডিজাইন, উপকরণ এবং বিন্যাসে সামান্য পরিবর্তনই এই দূষণ অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে।

International Dark-sky Association এর গাইডলাইন অনুযায়ী আলোর উৎসকে ঢেকে রাখা যেন উপরের দিকে মুখ না করে থাকে। পারদ-বাষ্প, ধাতব হ্যালাইড বাষ্প কিংবা নীল আলোর এলইডি বাল্বের বদলে কমলা সোডিয়াম-বাষ্প ল্যাম্প ব্যবহার করা, টাইমার কিংবা সেন্সর যুক্ত বাতি ব্যবহার করা যাতে শুধুমাত্র ঘরে প্রবেশ করলেই আলো জ্বলে উঠে এবং আলোর ঔজ্জ্বল্য (লুমেন) কমিয়ে ফেলে সঠিকভাবে ব্যবহার করলেই এই সমস্যা অনেক কমে যাবে।

২০১৩ সালে ফ্রান্স আলোক দূষণ প্রতিরোধে অর্ডিন্যান্স জারি করেছে যার কারণে প্যারিসে এখন রাত ১ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত অফিস এবং দোকানের সামনে বাতি নিভিয়ে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, এসকল নিয়ম মেনে অ্যারিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফ, ওকক্রিক, সিডোনা শহর, স্কটল্যান্ডের কোল, কানাডার বন অ্যাকর্ড শহর সহ প্রচুর জায়গা International Dark-sky City উপাধি পেয়েছে, যা কীভাবে সহজেই এই সমস্যা সমাধান করা যায় তা দেখিয়ে দেয়।

চিত্রঃ ফ্ল্যাগস্টাফ শহরের সান ফ্রান্সিসকো থেকে মিল্কিওয়ের দৃশ্য। (চিত্রগ্রাহক Dan & Cindy Duriscoe)

উনিশ লক্ষ বছর আগে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে ১৮৭৮ সালে প্যারিসের রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলন, রাতের অন্ধকার দূর করতে আলো ব্যবহারের ইতিহাস বেশ অনেকদিনের পুরনো। কৃত্রিম আলো আজ আমাদের জীবনকে অনেক সহজ ও নিরাপদ করেছে, কিন্ত পাশাপাশি এই বৈদ্যুতিক বাতির যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য আর সর্বোপরি আমাদের স্বাস্থ্যের উপরে বিরূপ প্রভাবও বয়ে আনছে।

আর তাই এখন সময় এসেছে পানি, বায়ু বা শব্দের মতো আলো দূষণকেও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার, কারণ অল্প একটু সচেতনতা আর সামান্য একটু সমবেত প্রচেষ্টাই পারবে এই দূষণ দূর করে পরিবেশে আলোর সত্যিকারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে।

প্রকৃতপক্ষে, জীবনে আলোর পাশাপাশি অন্ধকারের ভূমিকাও অনস্বীকার্য, কারণ রাতের ঐ আপাত অন্ধকার আকাশের আসল বর্ণিল সৌন্দর্য অনুভব করতে সদা জীবন্ত, উজ্জ্বল শহরের চেয়ে অন্ধকার, শীতল কোনো মরু প্রান্তরই বেশি উপযুক্ত।

তাই আমরা যদি এসব নকল আলোর আবরণ সরিয়ে কোনো গভীর, একাকী রাতে উপরের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের জীবনের তুচ্ছ সমস্যাগুলোকে ভুলে এই মহাবিশ্বের বিশালত্বকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবো- আমাদের এই আত্মবিধ্বংসী মানবজাতির জন্য আজ যা খুবই দরকার।

তথ্যসত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/1994_Northridge_earthquake
  2. https://www.youtube.com/watch?v=_nlFcEj41Xk
  3. http://iflscience.com/space/one-third-of-humanity-cant-see-the-milky-way-in-the-night-sky/
  4. https://www.washingtonpost.com/news/energy-environment/wp/2016/06/10/light-pollution-keeps-much-of-humanity-from-seeing-the-night-sky/
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Lighting
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Light_pollution
  7. http://darksky.org/light-pollution/wildlife
  8. http://iflscience.com/environment/light-pollution-leads-baby-sea-turtles-astray-study-shows/
  9. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-environ.html
  10. http://lightpollutionanddarkskies.blogspot.com/
  11. http://darksky.org/light-pollution/energy-waste/
  12. https://en.wikipedia.org/wiki/Bortle_scale
  13. https://youtube.com/watch?v=te_H0Uo6YEA
  14. Ecological Consequences of Artificial Night Lighting. Catherine Rich & Travis Longcore (eds). 2006. Island Press. Covelo, CA. Pages 281-304,305-344
  15. nationalgeographic.com/news/2003/04/0417_030417_tvlightpollution_2.html
  16. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-Plants.html
  17. Salmon (2003).“Artificial night lighting and sea turtles” (PDF). Biologist 50: 163–168
  18. https://en.wikipedia.org/wiki/Ecological_light_pollution
  19. http://darksky.org/light-pollution/human-health/
  20. http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2627884/
  21. http://science.howstuffworks.com/environmental/green-science/light-pollution2.htm

featured image: need-less.org.uk

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

১৭ জানুয়ারি, ১৯৯৪। স্থানীয় সময় ভোর ৪ টা ৫৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে ৬.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসে। এই ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৭০০ ছাড়িয়ে যায় আর মারা যায় কমপক্ষে ৫৭ জন। একইসাথে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিনষ্ট হয়, তাই মাত্র ১০-২০ সেকেন্ডের এই ভূমিকম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ হিসেবে স্থান পেয়েছে।

এই দুঃখজনক দুর্যোগের পরে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে, যখন ইমারজেন্সি নাম্বারে অস্বাভাবিক সংখ্যায় ফোন দিয়ে শত শত ব্যক্তি জানতে চান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে রাতের আকাশে যে বিশাল রুপালী মেঘের মতো দেখা যাচ্ছে তা কোনোভাবে এই ভূমিকম্পের জন্য দায়ী কিনা। তারা প্রকৃতপক্ষে মিল্কিওয়ে (আকাশ গঙ্গা) গ্যালাক্সির কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, কারণ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তারা জীবনে কোনোদিন আমাদের ছায়াপথ দেখেনি।

ইতালীয় বিজ্ঞানী এবং CieloBuio-Coordination for the protection of the night sky এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. ফ্যাবিও ফালকি পরিচালিত Light Pollution Science and Technology Institute এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা ষাট ভাগ ইউরোপিয়ান, আশি ভাগ উত্তর আমেরিকান এবং বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ রাতের আকাশে আপন গ্যালাক্সি দেখতে পারেন না। ১০ই জুন, ২০১৬ সালে প্রকাশিত National Oceanic and Atmospheric Administration(NOAA) এর পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের সম্পূর্ণ এবং কুয়েত, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আর্জেন্টিনার প্রায় সবটুকু আকাশ এতই উজ্জ্বল যে সেখানে কখনোই রাতে অন্ধকার নেমে আসে না। জার্মানি, হংকং, বেলজিয়ামের নানা অংশ এবং বোস্টন, লন্ডন, ওয়াশিংটন, প্যারিসের কোনো মানুষকে পরিষ্কার রাত দেখার জন্য ক্ষেত্র বিশেষে প্রায় ৫০০ থেকে ৮৫০ মাইল ভ্রমণ করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট আলোর বাধার জন্য গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে না পারাকেই যদি দূষণ (Light Pollution) বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বিশ্বের ৮০ ভাগ এবং পাশ্চাত্যের সম্পূর্ণ আকাশই দূষিত।

আলোক দূষণ বলতে আমরা অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর ক্ষতিকর প্রভাবকে বুঝে থাকি; যা অপর্যাপ্ত, অনিয়ন্ত্রিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নানা সমস্যাকে নির্দেশ করে। এসকল সমস্যার মধ্যে skyglow, light trespass, glare, clutter এবং over-illumination উল্লেখযোগ্য।

অরক্ষিত কিংবা ঊর্ধ্বমুখী আলোক উৎস থেকে আলো বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য কণার মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সম্পূর্ণ আকাশই অত্যন্ত উজ্জ্বল (skyglow) দেখায়, যা অনেক দূর থেকেও পরিলক্ষিত হয়।এই দীপ্তির কারণে রাতের আকাশ প্রায় দিনের মতোই উজ্জ্বল হয় এবং চাঁদ-তারা কিছুই দেখা যায় না। International Dark-sky Association এর গবেষণা অনুযায়ী লস এঞ্জেলেসের skyglow বায়ুমণ্ডলের ২০০ মাইল উচ্চতা থেকেও দেখা যায়। আকাশ মেঘলা হলে এই সমস্যা ১০,০০০ গুণ বেশি প্রকট হতে পারে।

চিত্রঃ রাতের মেক্সিকো সিটি। skyglow এর কারণে আকাশ এতই উজ্জ্বল যে চাইলে বাসার বাইরে রাতের বেলাও বই পড়া যায়।

আপনার বাসায় কিংবা জমিতে আলোর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ Light Trespass নামে পরিচিত। যেমন প্রতিবেশির ব্যবহৃত আলো জানালা দিয়ে আপনার ঘরে ঢুকতে পারে, যার ফলে শান্তিভঙ্গ কিংবা ঘুমের অসুবিধা হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে International Dark-sky Association এর সহায়তায় Light Trespass থেকে জনসাধারণের অধিকার রক্ষার্থে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ফেডারাল এজেন্সি অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারে।

আমাদের চোখে যদি হঠাৎ করেই অত্যুজ্জ্বল আলো (Glare) এসে পড়ে, (যেমন রাতের বেলায় রাস্তায় ছোট প্রাইভেট গাড়ি চালানোর সময় ট্রাককে মুখোমুখি অতিক্রম করতে গেলে ট্রাকটির হেড লাইটের আলো কিছুক্ষণের জন্য সরাসরি চোখে এসে পড়ে) তবে তা আমাদের দৃষ্টি ব্যাহত করতে পারে, দেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এমনকি ক্ষণিকের জন্য অন্ধও করে দিতে পারে।

অতিরিক্ত আলোকিত এলাকা, যেমন Las Vegas Strip বা Manhattan এর রাস্তায় বিভিন্ন রঙের আলোর মাত্রাতিরিক্ত উজ্জ্বল এবং জমকালো সমাবেশকে Light Clutter (আলোক-বিশৃঙ্খলা) বলে। রাস্তার চারদিকে অত্যুজ্জ্বল বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড থাকলে কোনো ড্রাইভার বিভ্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। প্লেন চালানোর সময় পাইলট শহরের বাণিজ্যিক আলোক সমাবেশের সাথে সেফটি লাইট, যেমন রানওয়ের আলো গুলিয়ে ফেলতে পারে, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।

চিত্রঃ গাড়ি চালানোর সময় Glare দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত করতে পারে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আলোর অত্যাধিক ব্যবহার Over-illumination নামে পরিচিত। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই দৈনিক প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল (১ ব্যারেল = ১৫৯ লিটার) তেল এজন্য নষ্ট হয়। Energy Data নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর জন্য যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহৃত হয় তার শতকরা ৩০-৬০ ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং U.S. Department of Energy( DOE) হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৯ সালেই এজন্য ৮১.৬৮ টেরাওয়াট বিদ্যুৎ নষ্ট হয়েছে।

আসলে শুধু over-illumination-ই নয়, সকল প্রকার আলোক দূষণেই বিপুল পরিমাণ শক্তির অপচয় হয়। ২০০৫ সালের হিসেব অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বের উৎপাদিত বিদ্যুতের এক চতুর্থাংশ শুধু আলো জ্বালাতেই ব্যয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু রাস্তা আর পার্কিং-লট আলোকিত করতে বছরে ১২০ টেরাওয়াট/ঘণ্টা শক্তি ব্যয় হয়, যা দিয়ে নিউইয়র্ক শহরের দুই বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

শুধু তাই নয়, কৃত্রিম আলোর জন্য যে শক্তি ব্যয় হয় তার প্রায় ত্রিশ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর তিন কোটি ব্যারেল তেল এবং ৮২ লক্ষ ব্যারেল কয়লার অপচয় ঘটে, ক্ষতি হয় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের এবং প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা শোষণ করতে সাড়ে ৮৭ কোটি গাছের প্রয়োজন। ২০০৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় কৃত্রিম আলো গ্রীনহাউজ গ্যাসের সবচেয়ে বড় (৩০-৫০%) উৎস। প্রায় ২ কোটি মানুষের জন্য ১০৩৫ গিগাওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় যার জন্য ২১ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার খরচ হয় এবং সেইসাথে প্রায় সাড়ে ১১ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।

চিত্রঃ Las Vegas Strip এ নানা রঙের আলোর বিশৃঙ্খল সমাবেশ(Clutter)।

আলোক দূষণের কুপ্রভাব মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ দেখলেই অনুধাবন করা যায়। সুবিশাল টুইন টাওয়ারের আলোর বিম Light Trespass এর জন্য দায়ী, আশেপাশের বিল্ডিংগুলোয় অহেতুক অত্যাধিক আলো ব্যবহৃত (Over-illumination) হয়েছে এবং এইসব দূষণের ফলে শহরের আকাশ অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে গেছে এবং কোনো নক্ষত্রই দৃশ্যমান নয় (skyglow)।

চিত্রঃ একটি কসমেটিকস দোকান, যা প্রয়োজনের দ্বিগুণ আলো ব্যবহার করছে। ফলে হচ্ছে আলোক তথা শক্তির অপচয়।

আলোক দূষণের জন্য শুধু শক্তির অপচয়ই হয় না; তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যেমন মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে অনেক কঠিন করে তোলে। চারপাশে আলোর অত্যাধিক ব্যবহারে সম্পূর্ণ আকাশই উজ্জ্বল হয়ে যায়, ফলে কোনো অস্পষ্ট গ্রহ-নক্ষত্র দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এজন্যই নতুন দূরবীনগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করা হচ্ছে। আবার আমরা জানি, বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র কোনো নক্ষত্রের আলো কীভাবে বিভিন্ন রঙিন আলোক রেখায় ভেঙে যায় তা রেকর্ড করে।

প্রত্যেক মৌলেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী আছে, সুতরাং মহাবিশ্বের কোনো বস্তুর বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করে তার ভর, উপাদান, তাপমাত্রা, ঔজ্জ্বল্য ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায়। ফলে তা কি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, নিউট্রন-স্টার নাকি অন্যকিছু তা বুঝা সম্ভব হয়। জ্যোতির্বিদ্যায় এই যন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত কৃত্রিম আলো বর্ণালীতে উজ্জ্বল আলোক রেখার সৃষ্টি করে যা অন্যান্য লাইনকে ম্লান করে দেয়, যেমন

চিত্রঃ কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ।

পারদ-বাষ্প, সোডিয়াম-বাষ্প বা ধাতব-হ্যালাইড প্রদীপ তাদের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী সৃষ্টি করে যা আমরা যে বর্ণালী দেখতে চাইছি তাকে অস্পষ্ট করে ফেলে।

এজন্য জ্যোতির্বিদগণ ‘নেবুলা-ফিল্টার’ ব্যবহার করতে পারেন যা নেবুলায় সাধারণত যেসব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পাওয়া যায় শুধুমাত্র সেগুলোই দূরবীক্ষণ যন্ত্রে প্রবেশ করতে দেয়। তারা এছাড়া Light Pollution Filter (LPR) ব্যবহার করে থাকেন যা এসকল প্রদীপের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী প্রবেশ করতে দেয় না এবং ফলশ্রুতিতে আলোক দূষণের প্রভাব কমে যায়। তাই গ্যালাক্সি এবং নীহারিকার মতো ম্লান জগৎ দেখা সহজ হয়।

কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি এসকল ফিল্টার আলোক দূষণের কু-প্রভাব একেবারে নষ্ট করতে পারে না। যেহেতু এখানে পরীক্ষাধীন বস্তুর ঔজ্জ্বল্য কমিয়ে ফেলা হয় তাই ‘Higher magnification’ সম্ভব হয় না। তাছাড়া কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বাধা দেওয়ায় বস্তুর রঙের পরিবর্তন ঘটে এবং প্রায়ই সবুজ ছাপ পড়ে যায়। তাই অত্যাধিক দূষিত শহরে LPR Filter ব্যবহার করে শুধু উজ্জ্বল নীহারিকাই (Emission Nebulae) দেখা সম্ভব, কারণ অন্যান্য ম্লান গ্রহ-নক্ষত্র বস্তুত অদৃশ্য হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ কিংবা ছবি তোলার জন্য কোনো ফিল্টারই অন্ধকার আকাশের সমকক্ষ হতে পারে না। আমরা কোনো স্থানের রাতের আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপ করার জন্য Bortle Scale ব্যবহার করতে পারি। শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী John E. Bortle ২০০১ সালে এই স্কেলের প্রবর্তন করেন যা কোনো জায়গা থেকে কত ভালোভাবে গ্রহ-নক্ষত্র দেখা যায় এবং তা আলো দ্বারা কী পরিমাণ দূষিত তা পরিমাপ করে। এই স্কেলে ‘১’ দ্বারা অসাধারণ অন্ধকার স্থান (যেখানে অত্যন্ত ম্লান তারকারাজিও দেখা সম্ভব, অবশ্য অন্যান্য উজ্জ্বল জগতের জন্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে) এবং ‘৯’ দ্বারা অত্যুজ্জ্বল শহর (যেখানে আকাশ কখনই অন্ধকার হয় না, চাঁদ এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ-নক্ষত্রই শুধু দেখা সম্ভব হতে পারে) বুঝায়।

এতক্ষণ ধরে লেখা পড়ে মনে হতে পারে, কৃত্রিম আলোর জন্যই আকাশ কখনো অন্ধকার হয় না, এটিই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সকল গবেষণাতে সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্ত প্রকৃত অর্থে আমাদের বায়ুমণ্ডল কখনোই সম্পূর্ণভাবে অন্ধকার হয় না, কারণ উপরের দিকে (সাধারণত মেসোস্ফিয়ারে) সূর্যের অত্যন্ত কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে আয়ন উৎপন্ন হয় এবং তারা বিভিন্ন কণার সাথে যুক্ত হলে ফোটন নির্গত হয় যা বাষ্পদ্যুতির (airglow) সৃষ্টি করে। দিনে সূর্যের জন্য বাষ্পদ্যুতির প্রভাব বুঝা না গেলেও রাতে তা যথেষ্টই সমস্যার সৃষ্টি করে, এজন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে থাকা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র অনেক ম্লান তারাও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে যা ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব হয় না। এছাড়া সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলে প্রতিফলিত হলেও তা মহাবিশ্বে বিভিন্ন ধুলিকণার মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আকাশকে রাতে উজ্জ্বল করে তোলে। তাই আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপের সময় Bortle Dark Sky Scale এ ‘১’ দ্বারাও প্রকৃতপক্ষে ‘সম্পূর্ণ অন্ধকার’ বুঝায় না।

চিত্রঃ Bortle Dark Sky Scale (The Scale ranges from 1 to 9)

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনেও আলোক দূষণের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে সকল প্রাণী উদ্ভিদ এবং পোকামাকড়ের জীবনযাত্রা, দিন-রাতের নিয়মিত আবর্তনের উপর নির্ভর করে বিবর্তিত হয়েছে, কিন্ত কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে বাস্তুতন্ত্রের এই ভারসাম্য আজ নষ্ট হতে চলেছে। আলোর প্রতি বিভিন্ন পোকামাকড়ের অদম্য আকর্ষণের বিষয়টিই বিবেচনা করা যাক। জার্মানির Mainz বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের Gerhard Eisenbeis এর ২০০৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোর দিকে কীট-পতঙ্গের আকৃষ্ট হবার বিষয়টি তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, কিছু পোকা আলোর দিকে উড়ে গেলেও কিছুদূর গিয়ে থেমে যায় এবং সেখানেই সারারাত আটকে থাকে, যা fixated or capture effect নামে পরিচিত।

রাতের অন্ধকারের মাঝে কৃত্রিম আলোয় পোকাগুলি বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তারা সরাসরি গরম প্রদীপের উপরে উড়ে এসে পড়ে কিংবা সারারাত ধরে আলোর চারদিকে উড়তে থাকে। দুই ক্ষেত্রেই উত্তাপ আর অবসাদে পোকাগুলির মৃত্যু ঘটে। এছাড়া তারা আলোর প্রতি এমন অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করে যে সবকিছু ভুলে সারাক্ষণ আলোর চারপাশেই অবস্থান করে এবং পাখি, মাকড়সা বা

চিত্রঃ বায়ুমণ্ডলের উপরে অস্থিতিশীল অক্সিজেন পরমাণুর সবুজ বাষ্পদ্যুতি, International Space Station থেকে ছবিটি তোলা।

বাদুড়ের সহজ শিকারে পরিণত হয়। ফলে বাস্ততন্ত্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে। যেমন, সুইডেনের কিছু শহরে নতুন ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের অল্পদিনের মধ্যেই Europian Lesser Horseshow নামক বাদুঢ় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, কারণ আলোর প্রতি অধিক সহনশীল Pipistrell বাদুঢ় ল্যাম্পপোস্টের দিকে আকৃষ্ট পোকামাকড় শিকার করা শুরু করায় তাদের খাবারের অভাব ঘটে।

দ্বিতীয়ত, কীটপতঙ্গের চলার পথ আলোকিত হয়ে গেলে (যেমন রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করলে) তারা সেদিক দিয়ে আর যায় না, যা Crash Barrier Effect নামে পরিচিত। এভাবে আলোর প্রবর্তনের ফলে পোকামাকড়ের চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়।

সবশেষে Vacuum Cleaner Effect বিষয়টি বিবেচনা করা যায়, যা কৃত্রিম আলোর প্রভাবে নিজস্ব পরিবেশের পরিবর্তনের জন্য পোকামাকড়ের বিশাল সংখ্যায় মৃত্যুকে নির্দেশ করে। কৃত্রিম আলো বিপুল সংখ্যায় পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করে এবং খাদ্য অনুসন্ধান কিংবা বংশবৃদ্ধির পরিবর্তে তারা আলোর চারদিকে উড়তে থাকে, ফলে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে। এক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ লক্ষ Mayfly এক রাতে কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং বংশবৃদ্ধি না করেই মারা গিয়েছিল, যা সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। মেফ্লাই হচ্ছে এক ধরনের জলজ পতঙ্গ যা জীবনের অধিকাংশ সময় মূককীট হিসেবে পানির নিচে থাকে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে শুধুমাত্র প্রজননের জন্য পানির উপরে উঠে আসে। এ সময় তাদের আয়ু মাত্র ৫ মিনিট থেকে একদিন হয় এবং মুখ ও পাকস্থলি না থাকায় শুধু বংশবৃদ্ধিই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়। গবেষকের মতে, রাস্তায় কৃত্রিম আলো ব্যবহারের জন্য এক গ্রীষ্মকালে ৬০ থেকে ১৩০ বিলিয়ন পোকা শুধু জার্মানিতেই মারা যায়।

বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যেও আলোর প্রতি এই অদ্ভুত আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তারা সার্চলাইট টাওয়ারের চারপাশে অবসাদে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত উড়তে থাকে। আলোর প্রতি এই অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আকর্ষণ Positive phototaxis নামে পরিচিত; এবং এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক মতবাদ থাকলেও কোনোটাই ত্রুটিমুক্ত না হওয়ায় এই আচরণের কারণ আজও অজানা।

আলোক দূষণের ফলে বিভিন্ন প্রাণীর বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। কৃত্রিম আলো থাকলে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ, জোনাকি ও ফড়িঙ প্রজননে অনুৎসাহিত হয়। যেমন Heliothis zea পোকা সম্পূর্ণ অন্ধকার না হলে কখনোই প্রজননে অংশ নেয় না। আলোর জন্য ডিম পাড়াও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। যেমন ১৯৩৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আলোর ফাঁদে আটকে পড়া স্ত্রী মথের শতকরা আশি ভাগই ডিম পাড়ার জায়গা খুঁজছিল। কৃত্রিম আলোতে গাছের পরাগায়নও হুমকির মুখে পড়ে। বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসের ফুল রাতের অন্ধকারে স্বল্প সময়ের জন্য ফুটে এবং প্রধানত বাদুঢ় ও মথের মাধ্যমে তাদের পরাগায়ন ঘটে, তাই চারপাশে আলোর পরিমাণ বেশি হলে পলিনেটরের অভাবে তাদের বংশবৃদ্ধি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গাছের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্যও আলোক দূষণ দায়ী। Purdue University এর Forestry and Natural Resource বিভাগের William R. Chaney এর ২০০২ সালের জুন মাসের গবেষণা অনুযায়ী, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য, ঔজ্জ্বল্য এবং দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের প্রভাব রয়েছে। তাই রাতে কৃত্রিম আলোর প্রবর্তনের ফলে পাতার আকৃতি, রঞ্জক পদার্থের সৃষ্টি, শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কুঁড়ির সুপ্তাবস্থা প্রভৃতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

রাতে কৃত্রিম আলোর প্রভাবে গাছের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, তাই ল্যাম্পপোস্ট থেকে 700nm-1mm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (লাল থেকে অবলোহিত) আলো নির্গত হলে গাছের ফুল ফোটার প্যাটার্নে পরিবর্তন ঘটতে পারে। গবেষকের মতে, যদি কৃত্রিম আলো কোনো গাছের ফটো পিরিয়ডিজমে পরিবর্তন ঘটায় তবে সেই গাছের জন্য সারা বছরই গ্রীষ্মকাল থাকতে পারে (কারণ কৃত্রিম আলোর প্রভাবে সেটার জন্য রাতের দৈর্ঘ্য সবসময়ই কম থাকছে) এবং গাছের সম্পূর্ণ বৃদ্ধি কখনই সম্ভব হয় না। তিনি উদাহরণস্বরূপ একটা পাম গাছ সম্পর্কে লিখেছেন যাতে কখনই ফুল ধরে না। শীতপ্রধান দেশে তুষার জমে ডাল ভেঙে গিয়ে

গাছের ক্ষতি হতে পারে এবং এজন্যই শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়। কিন্ত শীতকাল চলে আসলেও কৃত্রিম আলোর প্রভাবে পত্রঝরা গাছের পাতা ঝরে পড়ে না, যা গাছের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

পরিযায়ী পাখিদের মৃত্যুর জন্যও আলোক দূষণ অনেকাংশে দায়ী। বহু হাজার বছর ধরে পরিযায়ী পাখিরা চাঁদ-তারার আলো ব্যবহার করে রাতে শীতপ্রধান দেশ থেকে উষ্ণ স্থানে উড়ে যাচ্ছে, কিন্ত বর্তমানে কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে তারা আর পথ ঠিক রাখতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের Fish and Wildlife Service এর হিসেব অনুযায়ী, উঁচু টাওয়ার এবং বিল্ডিং এর আলোয় আকৃষ্ট হয়ে সংঘর্ষের ফলে প্রতি বছর ৪০-৫০ লক্ষ পাখির মৃত্যু ঘটে। Fatal Light Awareness Program এর নির্বাহী পরিচালক Michael Measure এর মতে, শুধু উত্তর আমেরিকাতেই ৪৫০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আলোকিত স্থাপনার সাথে সংঘর্ষের ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় Henslow’s Sparrow, cerulean warble-ও রয়েছে। আবার সার্চলাইটের আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পাখিরা সারা রাত ধরে তার চারদিকে উড়তে থাকে যতক্ষণ না অবসাদে মৃত্যু ঘটে। যেমন ১৯৫৪ সালের ৭-৮ অক্টোবরে জর্জিয়ায় Warner Robin Air Force Base এর ceilometer (সার্চলাইট টাওয়ার) এর চারপাশে ৫৩ প্রজাতির অর্ধ লক্ষাধিক পাখি মারা গিয়েছিল। এছাড়া কৃত্রিম আলোর জন্য পাখিরা মনে করে বসন্ত চলে এসেছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যাত্রা শুরু করে যার ফলে তারা বাসা বাঁধা, প্রজনন এবং খাদ্য সন্ধানের আদর্শ সময় মিস করতে পারে।

আলোক দূষণ আজ বিভিন্ন সরীসৃপ, বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। সাড়ে ৬ কোটি বছরের পুরনো এই প্রাণী প্রায় দুইশ বছর বাঁচতে পারে, যার অধিকাংশ সময় পানিতে থাকলেও ডিম পাড়ার জন্য তারা শত শত মাইল সাঁতরে সমুদ্রসৈকতে উঠে আসে। একটি মা কচ্ছপ বালুর মধ্যে এক-দুই ঘণ্টা থেকে প্রায় শ’খানেক ডিম পাড়ে এবং ৭-১২ সপ্তাহের মধ্যে (সাধারণত রাতে) বাচ্চা জন্মায়। বাচ্চা কচ্ছপের জীবনের প্রথম মুহূর্তগুলো খুবই কঠিন, যখন তারা পাখি, কাঁকড়া ও অন্যান্য শিকারি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে দ্রুত সাগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। অবশ্য এই কচ্ছপগুলো এতই ছোট যে বালুর উপরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত মাথা তুলতে পারে। তাই সাগরে যাওয়ার জন্য প্রবৃত্তিগতভাবেই তারা তাদের অন্ধকার স্থান ছেড়ে নিচের দিকে সমতল আর উজ্জ্বল স্থানের দিকে ছুটে চলে। এই যাত্রা এতই বিপজ্জনক যে মাত্র দশ শতাংশ সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে এবং এক শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্ত বর্তমানের আলোক দূষণ তাদের এই সংগ্রামকে আরো কঠিন করে তুলছে।

প্রথমত, মা কচ্ছপ ডিম পাড়ার জন্য অন্ধকারতম সৈকতই বেছে নেয়, যা খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চা কচ্ছপের সাগর খুঁজে পাওয়ার জন্য আকাশ অন্ধকার হওয়া প্রয়োজন। Florida Atlantic University এর জীববিজ্ঞানী Dr. Michael Salmon এর ১৯৯৫ এবং ২০০৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে বাচ্চা কচ্ছপেরা সাগরের বদলে শহরের দিকে চলে আসে যা তাদের ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, পাখি বা অন্যান্য প্রাণীর সহজ শিকারে পরিণত হওয়া কিংবা গাড়ির আঘাতে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শুধুমাত্র ফ্লোরিডাতেই এই কারণে বছরে লক্ষ লক্ষ কচ্ছপ মারা যায়।

অন্যান্য প্রাণী, যেমন ব্যাঙ, সাপ আর স্যালাম্যানডার গভীর রাতে কিংবা ভোরের দিকে শিকার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর কারণে অন্ধকার নেমে আসতে দেরি হওয়ায় তারা কমপক্ষে এক ঘণ্টা পরে শিকারে বের হয়, ফলে তাদের খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

শুধু প্রাণী আর পোকামাকড় নয় বরং মানুষের উপরেও কৃত্রিম আলোর কুপ্রভাব রয়েছে। আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম (২৪ ঘণ্টায় শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত পরিবর্তনের যে চক্র সম্পন্ন হয়; যা শরীরের তাপমাত্রা, স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারা এবং বিভিন্ন হরমোনের সুষম নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে) বহাল রাখার জন্য আলো এবং অন্ধকারের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। উদাহরণস্বরুপ মেলাটোনিন হরমোনের কথাই বিবেচনা করা যাক। আমাদের মস্তিষ্কে অপটিক নার্ভের উপরে অবস্থিত

Suprachiasmatic Nucleus (SCN) গ্রুপের স্নায়ুকোষ পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে মেলাটনিন হরমোনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। Antioxidant গুণাগুণ থাকার পাশাপাশি এই হরমোন ঘুমাতে সাহায্য করে, রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে, কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে এবং থাইরয়েড, প্যানক্রিয়াস, ওভারিস, টেসটিস এবং অ্যাডরিনাল গ্ল্যান্ডের কাজে সহায়তা করে। সুতরাং আমাদের সুস্থতার জন্য এই হরমোন নিঃসৃত হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

এই হরমোন অন্ধকারে নিঃসৃত হয়, তাই রাতে কৃত্রিম আলোর ব্যবহারে এই নিঃসরণ বন্ধও হয়ে যেতে পারে (মাত্র ৩৯ মিনিট আলোতে থাকলেই রক্তে মেলাটনিনের পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগ কমে যায়) যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান Paolo Sassone-Corsi এর মতে, সার্কাডিয়ান রিদম আমাদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আলোক দূষণে এই রিদমে যে ব্যাঘাত ঘটে তা বিষণ্ণতা, অনিদ্রা, স্থুলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, অবসাদ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উচ্চ-রক্তচাপ এবং কর্মদক্ষতা কমে যাবার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Plitnick and co. (2010) এর গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রাত জেগে কাজ করলে মানুষের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, ফলে সামান্য কারণেই মেজাজ খারাপ হয় এবং স্বাভাবিক তৎপরতাও কমে যায়। এছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তে প্রকাশিত বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোয় মানুষের অনুভূতিও তীব্র হয়ে থাকে,তাই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঝামেলা নিষ্পত্তি কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক পরিমাণ সূর্যালোক গ্রহণ করলে ছাত্রদের ক্লাসে দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং আলঝেইমার ডিজিজের সমস্যা কমে যেতে পারে।

Breast cancer এবং prostate cancer এর পেছনেও রাতে কৃত্রিম আলো ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০০৩ সালের ৪ জুন প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী যেসকল নার্স ১৫ বছর বা তারচেয়ে বেশি সময় ধরে মাসে কমপক্ষে ৩ বার রাতে ডিউটি পালন করেছেন তাঁদের ক্যান্সারের ঝুঁকি শতকরা ৩৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য ২০০৭ সালে World Health Organization (WHO) এর International Agency for Research on Cancer নাইটশিফট (বা অন্য কোনো শিফটে কাজ) যা সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত ঘটায়, তাকে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কৃত্রিম আলোর অনেক ক্ষতিকর দিক থাকলেও আশার কথা হলো, আমরা দৈনিক যেসকল দূষণের মুখোমুখি হই তাদের তুলনায় এই আলোক দূষণ সমস্যার সমাধান অত্যন্ত সহজ। আলোর ডিজাইন, উপকরণ এবং বিন্যাসে সামান্য পরিবর্তনই এই দূষণ অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে। International Dark-sky Association এর গাইডলাইন অনুযায়ী আলোর উৎসকে ঢেকে রাখা যেন উপরের দিকে মুখ না করে থাকে। পারদ-বাষ্প, ধাতব হ্যালাইড বাষ্প কিংবা নীল আলোর এলইডি বাল্বের বদলে কমলা সোডিয়াম-বাষ্প ল্যাম্প ব্যবহার করা, টাইমার কিংবা সেন্সর যুক্ত বাতি ব্যবহার করা যাতে শুধুমাত্র ঘরে প্রবেশ করলেই আলো জ্বলে উঠে এবং আলোর ঔজ্জ্বল্য (লুমেন) কমিয়ে ফেলে সঠিকভাবে ব্যবহার করলেই এই সমস্যা অনেক কমে যাবে। ২০১৩ সালে ফ্রান্স আলোক দূষণ প্রতিরোধে অর্ডিন্যান্স জারি করেছে যার কারণে প্যারিসে এখন রাত ১ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত অফিস এবং দোকানের সামনে বাতি নিভিয়ে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, এসকল নিয়ম মেনে অ্যারিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফ, ওকক্রিক, সিডোনা শহর, স্কটল্যান্ডের কোল, কানাডার বন অ্যাকর্ড শহর সহ প্রচুর জায়গা International Dark-sky City উপাধি পেয়েছে, যা কীভাবে সহজেই এই সমস্যা সমাধান করা যায় তা দেখিয়ে দেয়।

উনিশ লক্ষ বছর আগে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে ১৮৭৮ সালে প্যারিসের রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলন, রাতের অন্ধকার দূর করতে আলো ব্যবহারের ইতিহাস বেশ অনেকদিনের পুরনো। কৃত্রিম আলো আজ আমাদের জীবনকে অনেক সহজ ও নিরাপদ করেছে, কিন্ত পাশাপাশি এই বৈদ্যুতিক বাতির যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য আর সর্বোপরি আমাদের স্বাস্থ্যের উপরে বিরূপ প্রভাবও বয়ে আনছে। আর তাই এখন সময় এসেছে পানি, বায়ু বা শব্দের মতো আলো দূষণকেও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার, কারণ অল্প একটু সচেতনতা আর সামান্য একটু সমবেত প্রচেষ্টাই পারবে এই দূষণ দূর করে পরিবেশে আলোর সত্যিকারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে।

প্রকৃতপক্ষে, জীবনে আলোর পাশাপাশি অন্ধকারের ভূমিকাও অনস্বীকার্য, কারণ রাতের ঐ আপাত অন্ধকার আকাশের আসল বর্ণিল সৌন্দর্য অনুভব করতে সদা জীবন্ত, উজ্জ্বল শহরের চেয়ে অন্ধকার, শীতল কোনো মরু প্রান্তরই বেশি উপযুক্ত। তাই আমরা যদি এসব নকল আলোর আবরণ সরিয়ে কোনো গভীর, একাকী রাতে উপরের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের জীবনের তুচ্ছ সমস্যাগুলোকে ভুলে এই মহাবিশ্বের বিশালত্বকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবো- আমাদের এই আত্মবিধ্বংসী মানবজাতির জন্য আজ যা খুবই দরকার।

তথ্যসূত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/1994_Northridge_earthquake
  2. https://www.youtube.com/watch?v=_nlFcEj41Xk
  3. http://iflscience.com/space/one-third-of-humanity-cant-see-the-milky-way-in-the-night-sky/
  4. https://www.washingtonpost.com/news/energy-environment/wp/2016/06/10/light-pollution-keeps-much-of-humanity-from-seeing-the-night-sky/
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Lighting
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Light_pollution
  7. http://darksky.org/light-pollution/wildlife
  8. http://iflscience.com/environment/light-pollution-leads-baby-sea-turtles-astray-study-shows/
  9. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-environ.html
  10. http://lightpollutionanddarkskies.blogspot.com/
  11. http://darksky.org/light-pollution/energy-waste/
  12. https://en.wikipedia.org/wiki/Bortle_scale
  13. Ecological Consequences of Artificial Night Lighting. Catherine Rich & Travis Longcore (eds). 2006. Island Press. Covelo, CA. Pages 281-304,305-344
  14. nationalgeographic.com/news/2003/04/0417_030417_tvlightpollution_2.html
  15. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-Plants.html
  16. Salmon (2003)."Artificial night lighting and sea turtles" (PDF). Biologist 50: 163–168
  17. https://en.wikipedia.org/wiki/Ecological_light_pollution
  18. http://darksky.org/light-pollution/human-health/
  19. http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2627884/
  20. http://science.howstuffworks.com/environmental/green-science/light-pollutionhtm

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

১৭ জানুয়ারি, ১৯৯৪। স্থানীয় সময় ভোর ৪ টা ৫৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে ৬.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসে। এই ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৭০০ ছাড়িয়ে যায় আর মারা যায় কমপক্ষে ৫৭ জন। একইসাথে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিনষ্ট হয়, তাই মাত্র ১০-২০ সেকেন্ডের এই ভূমিকম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ হিসেবে স্থান পেয়েছে।

এই দুঃখজনক দুর্যোগের পরে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে, যখন ইমারজেন্সি নাম্বারে অস্বাভাবিক সংখ্যায় ফোন দিয়ে শত শত ব্যক্তি জানতে চান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে রাতের আকাশে যে বিশাল রুপালী মেঘের মতো দেখা যাচ্ছে তা কোনোভাবে এই ভূমিকম্পের জন্য দায়ী কিনা। তারা প্রকৃতপক্ষে মিল্কিওয়ে (আকাশ গঙ্গা) গ্যালাক্সির কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, কারণ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তারা জীবনে কোনোদিন আমাদের ছায়াপথ দেখেনি।

ইতালীয় বিজ্ঞানী এবং CieloBuio-Coordination for the protection of the night sky এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. ফ্যাবিও ফালকি পরিচালিত Light Pollution Science and Technology Institute এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা ষাট ভাগ ইউরোপিয়ান, আশি ভাগ উত্তর আমেরিকান এবং বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ রাতের আকাশে আপন গ্যালাক্সি দেখতে পারেন না। ১০ই জুন, ২০১৬ সালে প্রকাশিত National Oceanic and Atmospheric Administration(NOAA) এর পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের সম্পূর্ণ এবং কুয়েত, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আর্জেন্টিনার প্রায় সবটুকু আকাশ এতই উজ্জ্বল যে সেখানে কখনোই রাতে অন্ধকার নেমে আসে না। জার্মানি, হংকং, বেলজিয়ামের নানা অংশ এবং বোস্টন, লন্ডন, ওয়াশিংটন, প্যারিসের কোনো মানুষকে পরিষ্কার রাত দেখার জন্য ক্ষেত্র বিশেষে প্রায় ৫০০ থেকে ৮৫০ মাইল ভ্রমণ করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট আলোর বাধার জন্য গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে না পারাকেই যদি দূষণ (Light Pollution) বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বিশ্বের ৮০ ভাগ এবং পাশ্চাত্যের সম্পূর্ণ আকাশই দূষিত।

আলোক দূষণ বলতে আমরা অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর ক্ষতিকর প্রভাবকে বুঝে থাকি; যা অপর্যাপ্ত, অনিয়ন্ত্রিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নানা সমস্যাকে নির্দেশ করে। এসকল সমস্যার মধ্যে skyglow, light trespass, glare, clutter এবং over-illumination উল্লেখযোগ্য।

অরক্ষিত কিংবা ঊর্ধ্বমুখী আলোক উৎস থেকে আলো বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য কণার মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সম্পূর্ণ আকাশই অত্যন্ত উজ্জ্বল (skyglow) দেখায়, যা অনেক দূর থেকেও পরিলক্ষিত হয়।এই দীপ্তির কারণে রাতের আকাশ প্রায় দিনের মতোই উজ্জ্বল হয় এবং চাঁদ-তারা কিছুই দেখা যায় না। International Dark-sky Association এর গবেষণা অনুযায়ী লস এঞ্জেলেসের skyglow বায়ুমণ্ডলের ২০০ মাইল উচ্চতা থেকেও দেখা যায়। আকাশ মেঘলা হলে এই সমস্যা ১০,০০০ গুণ বেশি প্রকট হতে পারে।

চিত্রঃ রাতের মেক্সিকো সিটি। skyglow এর কারণে আকাশ এতই উজ্জ্বল যে চাইলে বাসার বাইরে রাতের বেলাও বই পড়া যায়।

আপনার বাসায় কিংবা জমিতে আলোর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ Light Trespass নামে পরিচিত। যেমন প্রতিবেশির ব্যবহৃত আলো জানালা দিয়ে আপনার ঘরে ঢুকতে পারে, যার ফলে শান্তিভঙ্গ কিংবা ঘুমের অসুবিধা হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে International Dark-sky Association এর সহায়তায় Light Trespass থেকে জনসাধারণের অধিকার রক্ষার্থে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ফেডারাল এজেন্সি অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারে।

আমাদের চোখে যদি হঠাৎ করেই অত্যুজ্জ্বল আলো (Glare) এসে পড়ে, (যেমন রাতের বেলায় রাস্তায় ছোট প্রাইভেট গাড়ি চালানোর সময় ট্রাককে মুখোমুখি অতিক্রম করতে গেলে ট্রাকটির হেড লাইটের আলো কিছুক্ষণের জন্য সরাসরি চোখে এসে পড়ে) তবে তা আমাদের দৃষ্টি ব্যাহত করতে পারে, দেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এমনকি ক্ষণিকের জন্য অন্ধও করে দিতে পারে।

অতিরিক্ত আলোকিত এলাকা, যেমন Las Vegas Strip বা Manhattan এর রাস্তায় বিভিন্ন রঙের আলোর মাত্রাতিরিক্ত উজ্জ্বল এবং জমকালো সমাবেশকে Light Clutter (আলোক-বিশৃঙ্খলা) বলে। রাস্তার চারদিকে অত্যুজ্জ্বল বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড থাকলে কোনো ড্রাইভার বিভ্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। প্লেন চালানোর সময় পাইলট শহরের বাণিজ্যিক আলোক সমাবেশের সাথে সেফটি লাইট, যেমন রানওয়ের আলো গুলিয়ে ফেলতে পারে, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।

চিত্রঃ গাড়ি চালানোর সময় Glare দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত করতে পারে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আলোর অত্যাধিক ব্যবহার Over-illumination নামে পরিচিত। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই দৈনিক প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল (১ ব্যারেল = ১৫৯ লিটার) তেল এজন্য নষ্ট হয়। Energy Data নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর জন্য যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহৃত হয় তার শতকরা ৩০-৬০ ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং U.S. Department of Energy( DOE) হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৯ সালেই এজন্য ৮১.৬৮ টেরাওয়াট বিদ্যুৎ নষ্ট হয়েছে।

আসলে শুধু over-illumination-ই নয়, সকল প্রকার আলোক দূষণেই বিপুল পরিমাণ শক্তির অপচয় হয়। ২০০৫ সালের হিসেব অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বের উৎপাদিত বিদ্যুতের এক চতুর্থাংশ শুধু আলো জ্বালাতেই ব্যয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু রাস্তা আর পার্কিং-লট আলোকিত করতে বছরে ১২০ টেরাওয়াট/ঘণ্টা শক্তি ব্যয় হয়, যা দিয়ে নিউইয়র্ক শহরের দুই বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

শুধু তাই নয়, কৃত্রিম আলোর জন্য যে শক্তি ব্যয় হয় তার প্রায় ত্রিশ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর তিন কোটি ব্যারেল তেল এবং ৮২ লক্ষ ব্যারেল কয়লার অপচয় ঘটে, ক্ষতি হয় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের এবং প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা শোষণ করতে সাড়ে ৮৭ কোটি গাছের প্রয়োজন। ২০০৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় কৃত্রিম আলো গ্রীনহাউজ গ্যাসের সবচেয়ে বড় (৩০-৫০%) উৎস। প্রায় ২ কোটি মানুষের জন্য ১০৩৫ গিগাওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় যার জন্য ২১ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার খরচ হয় এবং সেইসাথে প্রায় সাড়ে ১১ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।

চিত্রঃ Las Vegas Strip এ নানা রঙের আলোর বিশৃঙ্খল সমাবেশ(Clutter)।

আলোক দূষণের কুপ্রভাব মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ দেখলেই অনুধাবন করা যায়। সুবিশাল টুইন টাওয়ারের আলোর বিম Light Trespass এর জন্য দায়ী, আশেপাশের বিল্ডিংগুলোয় অহেতুক অত্যাধিক আলো ব্যবহৃত (Over-illumination) হয়েছে এবং এইসব দূষণের ফলে শহরের আকাশ অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে গেছে এবং কোনো নক্ষত্রই দৃশ্যমান নয় (skyglow)।

চিত্রঃ একটি কসমেটিকস দোকান, যা প্রয়োজনের দ্বিগুণ আলো ব্যবহার করছে। ফলে হচ্ছে আলোক তথা শক্তির অপচয়।

আলোক দূষণের জন্য শুধু শক্তির অপচয়ই হয় না; তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যেমন মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে অনেক কঠিন করে তোলে। চারপাশে আলোর অত্যাধিক ব্যবহারে সম্পূর্ণ আকাশই উজ্জ্বল হয়ে যায়, ফলে কোনো অস্পষ্ট গ্রহ-নক্ষত্র দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এজন্যই নতুন দূরবীনগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করা হচ্ছে। আবার আমরা জানি, বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র কোনো নক্ষত্রের আলো কীভাবে বিভিন্ন রঙিন আলোক রেখায় ভেঙে যায় তা রেকর্ড করে।

প্রত্যেক মৌলেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী আছে, সুতরাং মহাবিশ্বের কোনো বস্তুর বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করে তার ভর, উপাদান, তাপমাত্রা, ঔজ্জ্বল্য ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায়। ফলে তা কি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, নিউট্রন-স্টার নাকি অন্যকিছু তা বুঝা সম্ভব হয়। জ্যোতির্বিদ্যায় এই যন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত কৃত্রিম আলো বর্ণালীতে উজ্জ্বল আলোক রেখার সৃষ্টি করে যা অন্যান্য লাইনকে ম্লান করে দেয়, যেমন

চিত্রঃ কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ।

পারদ-বাষ্প, সোডিয়াম-বাষ্প বা ধাতব-হ্যালাইড প্রদীপ তাদের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী সৃষ্টি করে যা আমরা যে বর্ণালী দেখতে চাইছি তাকে অস্পষ্ট করে ফেলে।

এজন্য জ্যোতির্বিদগণ ‘নেবুলা-ফিল্টার’ ব্যবহার করতে পারেন যা নেবুলায় সাধারণত যেসব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পাওয়া যায় শুধুমাত্র সেগুলোই দূরবীক্ষণ যন্ত্রে প্রবেশ করতে দেয়। তারা এছাড়া Light Pollution Filter (LPR) ব্যবহার করে থাকেন যা এসকল প্রদীপের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী প্রবেশ করতে দেয় না এবং ফলশ্রুতিতে আলোক দূষণের প্রভাব কমে যায়। তাই গ্যালাক্সি এবং নীহারিকার মতো ম্লান জগৎ দেখা সহজ হয়।

কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি এসকল ফিল্টার আলোক দূষণের কু-প্রভাব একেবারে নষ্ট করতে পারে না। যেহেতু এখানে পরীক্ষাধীন বস্তুর ঔজ্জ্বল্য কমিয়ে ফেলা হয় তাই ‘Higher magnification’ সম্ভব হয় না। তাছাড়া কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বাধা দেওয়ায় বস্তুর রঙের পরিবর্তন ঘটে এবং প্রায়ই সবুজ ছাপ পড়ে যায়। তাই অত্যাধিক দূষিত শহরে LPR Filter ব্যবহার করে শুধু উজ্জ্বল নীহারিকাই (Emission Nebulae) দেখা সম্ভব, কারণ অন্যান্য ম্লান গ্রহ-নক্ষত্র বস্তুত অদৃশ্য হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ কিংবা ছবি তোলার জন্য কোনো ফিল্টারই অন্ধকার আকাশের সমকক্ষ হতে পারে না। আমরা কোনো স্থানের রাতের আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপ করার জন্য Bortle Scale ব্যবহার করতে পারি। শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী John E. Bortle ২০০১ সালে এই স্কেলের প্রবর্তন করেন যা কোনো জায়গা থেকে কত ভালোভাবে গ্রহ-নক্ষত্র দেখা যায় এবং তা আলো দ্বারা কী পরিমাণ দূষিত তা পরিমাপ করে। এই স্কেলে ‘১’ দ্বারা অসাধারণ অন্ধকার স্থান (যেখানে অত্যন্ত ম্লান তারকারাজিও দেখা সম্ভব, অবশ্য অন্যান্য উজ্জ্বল জগতের জন্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে) এবং ‘৯’ দ্বারা অত্যুজ্জ্বল শহর (যেখানে আকাশ কখনই অন্ধকার হয় না, চাঁদ এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ-নক্ষত্রই শুধু দেখা সম্ভব হতে পারে) বুঝায়।

এতক্ষণ ধরে লেখা পড়ে মনে হতে পারে, কৃত্রিম আলোর জন্যই আকাশ কখনো অন্ধকার হয় না, এটিই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সকল গবেষণাতে সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্ত প্রকৃত অর্থে আমাদের বায়ুমণ্ডল কখনোই সম্পূর্ণভাবে অন্ধকার হয় না, কারণ উপরের দিকে (সাধারণত মেসোস্ফিয়ারে) সূর্যের অত্যন্ত কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে আয়ন উৎপন্ন হয় এবং তারা বিভিন্ন কণার সাথে যুক্ত হলে ফোটন নির্গত হয় যা বাষ্পদ্যুতির (airglow) সৃষ্টি করে। দিনে সূর্যের জন্য বাষ্পদ্যুতির প্রভাব বুঝা না গেলেও রাতে তা যথেষ্টই সমস্যার সৃষ্টি করে, এজন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে থাকা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র অনেক ম্লান তারাও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে যা ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব হয় না। এছাড়া সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলে প্রতিফলিত হলেও তা মহাবিশ্বে বিভিন্ন ধুলিকণার মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আকাশকে রাতে উজ্জ্বল করে তোলে। তাই আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপের সময় Bortle Dark Sky Scale এ ‘১’ দ্বারাও প্রকৃতপক্ষে ‘সম্পূর্ণ অন্ধকার’ বুঝায় না।

চিত্রঃ Bortle Dark Sky Scale (The Scale ranges from 1 to 9)

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনেও আলোক দূষণের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে সকল প্রাণী উদ্ভিদ এবং পোকামাকড়ের জীবনযাত্রা, দিন-রাতের নিয়মিত আবর্তনের উপর নির্ভর করে বিবর্তিত হয়েছে, কিন্ত কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে বাস্তুতন্ত্রের এই ভারসাম্য আজ নষ্ট হতে চলেছে। আলোর প্রতি বিভিন্ন পোকামাকড়ের অদম্য আকর্ষণের বিষয়টিই বিবেচনা করা যাক। জার্মানির Mainz বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের Gerhard Eisenbeis এর ২০০৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোর দিকে কীট-পতঙ্গের আকৃষ্ট হবার বিষয়টি তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, কিছু পোকা আলোর দিকে উড়ে গেলেও কিছুদূর গিয়ে থেমে যায় এবং সেখানেই সারারাত আটকে থাকে, যা fixated or capture effect নামে পরিচিত।

রাতের অন্ধকারের মাঝে কৃত্রিম আলোয় পোকাগুলি বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তারা সরাসরি গরম প্রদীপের উপরে উড়ে এসে পড়ে কিংবা সারারাত ধরে আলোর চারদিকে উড়তে থাকে। দুই ক্ষেত্রেই উত্তাপ আর অবসাদে পোকাগুলির মৃত্যু ঘটে। এছাড়া তারা আলোর প্রতি এমন অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করে যে সবকিছু ভুলে সারাক্ষণ আলোর চারপাশেই অবস্থান করে এবং পাখি, মাকড়সা বা

চিত্রঃ বায়ুমণ্ডলের উপরে অস্থিতিশীল অক্সিজেন পরমাণুর সবুজ বাষ্পদ্যুতি, International Space Station থেকে ছবিটি তোলা।

বাদুড়ের সহজ শিকারে পরিণত হয়। ফলে বাস্ততন্ত্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে। যেমন, সুইডেনের কিছু শহরে নতুন ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের অল্পদিনের মধ্যেই Europian Lesser Horseshow নামক বাদুঢ় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, কারণ আলোর প্রতি অধিক সহনশীল Pipistrell বাদুঢ় ল্যাম্পপোস্টের দিকে আকৃষ্ট পোকামাকড় শিকার করা শুরু করায় তাদের খাবারের অভাব ঘটে।

দ্বিতীয়ত, কীটপতঙ্গের চলার পথ আলোকিত হয়ে গেলে (যেমন রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করলে) তারা সেদিক দিয়ে আর যায় না, যা Crash Barrier Effect নামে পরিচিত। এভাবে আলোর প্রবর্তনের ফলে পোকামাকড়ের চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়।

সবশেষে Vacuum Cleaner Effect বিষয়টি বিবেচনা করা যায়, যা কৃত্রিম আলোর প্রভাবে নিজস্ব পরিবেশের পরিবর্তনের জন্য পোকামাকড়ের বিশাল সংখ্যায় মৃত্যুকে নির্দেশ করে। কৃত্রিম আলো বিপুল সংখ্যায় পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করে এবং খাদ্য অনুসন্ধান কিংবা বংশবৃদ্ধির পরিবর্তে তারা আলোর চারদিকে উড়তে থাকে, ফলে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে। এক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ লক্ষ Mayfly এক রাতে কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং বংশবৃদ্ধি না করেই মারা গিয়েছিল, যা সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। মেফ্লাই হচ্ছে এক ধরনের জলজ পতঙ্গ যা জীবনের অধিকাংশ সময় মূককীট হিসেবে পানির নিচে থাকে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে শুধুমাত্র প্রজননের জন্য পানির উপরে উঠে আসে। এ সময় তাদের আয়ু মাত্র ৫ মিনিট থেকে একদিন হয় এবং মুখ ও পাকস্থলি না থাকায় শুধু বংশবৃদ্ধিই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়। গবেষকের মতে, রাস্তায় কৃত্রিম আলো ব্যবহারের জন্য এক গ্রীষ্মকালে ৬০ থেকে ১৩০ বিলিয়ন পোকা শুধু জার্মানিতেই মারা যায়।

বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যেও আলোর প্রতি এই অদ্ভুত আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তারা সার্চলাইট টাওয়ারের চারপাশে অবসাদে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত উড়তে থাকে। আলোর প্রতি এই অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আকর্ষণ Positive phototaxis নামে পরিচিত; এবং এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক মতবাদ থাকলেও কোনোটাই ত্রুটিমুক্ত না হওয়ায় এই আচরণের কারণ আজও অজানা।

আলোক দূষণের ফলে বিভিন্ন প্রাণীর বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। কৃত্রিম আলো থাকলে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ, জোনাকি ও ফড়িঙ প্রজননে অনুৎসাহিত হয়। যেমন Heliothis zea পোকা সম্পূর্ণ অন্ধকার না হলে কখনোই প্রজননে অংশ নেয় না। আলোর জন্য ডিম পাড়াও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। যেমন ১৯৩৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আলোর ফাঁদে আটকে পড়া স্ত্রী মথের শতকরা আশি ভাগই ডিম পাড়ার জায়গা খুঁজছিল। কৃত্রিম আলোতে গাছের পরাগায়নও হুমকির মুখে পড়ে। বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসের ফুল রাতের অন্ধকারে স্বল্প সময়ের জন্য ফুটে এবং প্রধানত বাদুঢ় ও মথের মাধ্যমে তাদের পরাগায়ন ঘটে, তাই চারপাশে আলোর পরিমাণ বেশি হলে পলিনেটরের অভাবে তাদের বংশবৃদ্ধি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গাছের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্যও আলোক দূষণ দায়ী। Purdue University এর Forestry and Natural Resource বিভাগের William R. Chaney এর ২০০২ সালের জুন মাসের গবেষণা অনুযায়ী, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য, ঔজ্জ্বল্য এবং দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের প্রভাব রয়েছে। তাই রাতে কৃত্রিম আলোর প্রবর্তনের ফলে পাতার আকৃতি, রঞ্জক পদার্থের সৃষ্টি, শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কুঁড়ির সুপ্তাবস্থা প্রভৃতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

রাতে কৃত্রিম আলোর প্রভাবে গাছের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, তাই ল্যাম্পপোস্ট থেকে 700nm-1mm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (লাল থেকে অবলোহিত) আলো নির্গত হলে গাছের ফুল ফোটার প্যাটার্নে পরিবর্তন ঘটতে পারে। গবেষকের মতে, যদি কৃত্রিম আলো কোনো গাছের ফটো পিরিয়ডিজমে পরিবর্তন ঘটায় তবে সেই গাছের জন্য সারা বছরই গ্রীষ্মকাল থাকতে পারে (কারণ কৃত্রিম আলোর প্রভাবে সেটার জন্য রাতের দৈর্ঘ্য সবসময়ই কম থাকছে) এবং গাছের সম্পূর্ণ বৃদ্ধি কখনই সম্ভব হয় না। তিনি উদাহরণস্বরূপ একটা পাম গাছ সম্পর্কে লিখেছেন যাতে কখনই ফুল ধরে না। শীতপ্রধান দেশে তুষার জমে ডাল ভেঙে গিয়ে

গাছের ক্ষতি হতে পারে এবং এজন্যই শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়। কিন্ত শীতকাল চলে আসলেও কৃত্রিম আলোর প্রভাবে পত্রঝরা গাছের পাতা ঝরে পড়ে না, যা গাছের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

পরিযায়ী পাখিদের মৃত্যুর জন্যও আলোক দূষণ অনেকাংশে দায়ী। বহু হাজার বছর ধরে পরিযায়ী পাখিরা চাঁদ-তারার আলো ব্যবহার করে রাতে শীতপ্রধান দেশ থেকে উষ্ণ স্থানে উড়ে যাচ্ছে, কিন্ত বর্তমানে কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে তারা আর পথ ঠিক রাখতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের Fish and Wildlife Service এর হিসেব অনুযায়ী, উঁচু টাওয়ার এবং বিল্ডিং এর আলোয় আকৃষ্ট হয়ে সংঘর্ষের ফলে প্রতি বছর ৪০-৫০ লক্ষ পাখির মৃত্যু ঘটে। Fatal Light Awareness Program এর নির্বাহী পরিচালক Michael Measure এর মতে, শুধু উত্তর আমেরিকাতেই ৪৫০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আলোকিত স্থাপনার সাথে সংঘর্ষের ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় Henslow’s Sparrow, cerulean warble-ও রয়েছে। আবার সার্চলাইটের আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পাখিরা সারা রাত ধরে তার চারদিকে উড়তে থাকে যতক্ষণ না অবসাদে মৃত্যু ঘটে। যেমন ১৯৫৪ সালের ৭-৮ অক্টোবরে জর্জিয়ায় Warner Robin Air Force Base এর ceilometer (সার্চলাইট টাওয়ার) এর চারপাশে ৫৩ প্রজাতির অর্ধ লক্ষাধিক পাখি মারা গিয়েছিল। এছাড়া কৃত্রিম আলোর জন্য পাখিরা মনে করে বসন্ত চলে এসেছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যাত্রা শুরু করে যার ফলে তারা বাসা বাঁধা, প্রজনন এবং খাদ্য সন্ধানের আদর্শ সময় মিস করতে পারে।

আলোক দূষণ আজ বিভিন্ন সরীসৃপ, বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। সাড়ে ৬ কোটি বছরের পুরনো এই প্রাণী প্রায় দুইশ বছর বাঁচতে পারে, যার অধিকাংশ সময় পানিতে থাকলেও ডিম পাড়ার জন্য তারা শত শত মাইল সাঁতরে সমুদ্রসৈকতে উঠে আসে। একটি মা কচ্ছপ বালুর মধ্যে এক-দুই ঘণ্টা থেকে প্রায় শ’খানেক ডিম পাড়ে এবং ৭-১২ সপ্তাহের মধ্যে (সাধারণত রাতে) বাচ্চা জন্মায়। বাচ্চা কচ্ছপের জীবনের প্রথম মুহূর্তগুলো খুবই কঠিন, যখন তারা পাখি, কাঁকড়া ও অন্যান্য শিকারি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে দ্রুত সাগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। অবশ্য এই কচ্ছপগুলো এতই ছোট যে বালুর উপরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত মাথা তুলতে পারে। তাই সাগরে যাওয়ার জন্য প্রবৃত্তিগতভাবেই তারা তাদের অন্ধকার স্থান ছেড়ে নিচের দিকে সমতল আর উজ্জ্বল স্থানের দিকে ছুটে চলে। এই যাত্রা এতই বিপজ্জনক যে মাত্র দশ শতাংশ সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে এবং এক শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্ত বর্তমানের আলোক দূষণ তাদের এই সংগ্রামকে আরো কঠিন করে তুলছে।

প্রথমত, মা কচ্ছপ ডিম পাড়ার জন্য অন্ধকারতম সৈকতই বেছে নেয়, যা খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চা কচ্ছপের সাগর খুঁজে পাওয়ার জন্য আকাশ অন্ধকার হওয়া প্রয়োজন। Florida Atlantic University এর জীববিজ্ঞানী Dr. Michael Salmon এর ১৯৯৫ এবং ২০০৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে বাচ্চা কচ্ছপেরা সাগরের বদলে শহরের দিকে চলে আসে যা তাদের ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, পাখি বা অন্যান্য প্রাণীর সহজ শিকারে পরিণত হওয়া কিংবা গাড়ির আঘাতে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শুধুমাত্র ফ্লোরিডাতেই এই কারণে বছরে লক্ষ লক্ষ কচ্ছপ মারা যায়।

অন্যান্য প্রাণী, যেমন ব্যাঙ, সাপ আর স্যালাম্যানডার গভীর রাতে কিংবা ভোরের দিকে শিকার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর কারণে অন্ধকার নেমে আসতে দেরি হওয়ায় তারা কমপক্ষে এক ঘণ্টা পরে শিকারে বের হয়, ফলে তাদের খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

শুধু প্রাণী আর পোকামাকড় নয় বরং মানুষের উপরেও কৃত্রিম আলোর কুপ্রভাব রয়েছে। আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম (২৪ ঘণ্টায় শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত পরিবর্তনের যে চক্র সম্পন্ন হয়; যা শরীরের তাপমাত্রা, স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারা এবং বিভিন্ন হরমোনের সুষম নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে) বহাল রাখার জন্য আলো এবং অন্ধকারের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। উদাহরণস্বরুপ মেলাটোনিন হরমোনের কথাই বিবেচনা করা যাক। আমাদের মস্তিষ্কে অপটিক নার্ভের উপরে অবস্থিত

Suprachiasmatic Nucleus (SCN) গ্রুপের স্নায়ুকোষ পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে মেলাটনিন হরমোনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। Antioxidant গুণাগুণ থাকার পাশাপাশি এই হরমোন ঘুমাতে সাহায্য করে, রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে, কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে এবং থাইরয়েড, প্যানক্রিয়াস, ওভারিস, টেসটিস এবং অ্যাডরিনাল গ্ল্যান্ডের কাজে সহায়তা করে। সুতরাং আমাদের সুস্থতার জন্য এই হরমোন নিঃসৃত হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

এই হরমোন অন্ধকারে নিঃসৃত হয়, তাই রাতে কৃত্রিম আলোর ব্যবহারে এই নিঃসরণ বন্ধও হয়ে যেতে পারে (মাত্র ৩৯ মিনিট আলোতে থাকলেই রক্তে মেলাটনিনের পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগ কমে যায়) যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান Paolo Sassone-Corsi এর মতে, সার্কাডিয়ান রিদম আমাদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আলোক দূষণে এই রিদমে যে ব্যাঘাত ঘটে তা বিষণ্ণতা, অনিদ্রা, স্থুলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, অবসাদ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উচ্চ-রক্তচাপ এবং কর্মদক্ষতা কমে যাবার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Plitnick and co. (2010) এর গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রাত জেগে কাজ করলে মানুষের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, ফলে সামান্য কারণেই মেজাজ খারাপ হয় এবং স্বাভাবিক তৎপরতাও কমে যায়। এছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তে প্রকাশিত বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোয় মানুষের অনুভূতিও তীব্র হয়ে থাকে,তাই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঝামেলা নিষ্পত্তি কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক পরিমাণ সূর্যালোক গ্রহণ করলে ছাত্রদের ক্লাসে দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং আলঝেইমার ডিজিজের সমস্যা কমে যেতে পারে।

Breast cancer এবং prostate cancer এর পেছনেও রাতে কৃত্রিম আলো ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০০৩ সালের ৪ জুন প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী যেসকল নার্স ১৫ বছর বা তারচেয়ে বেশি সময় ধরে মাসে কমপক্ষে ৩ বার রাতে ডিউটি পালন করেছেন তাঁদের ক্যান্সারের ঝুঁকি শতকরা ৩৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য ২০০৭ সালে World Health Organization (WHO) এর International Agency for Research on Cancer নাইটশিফট (বা অন্য কোনো শিফটে কাজ) যা সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত ঘটায়, তাকে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কৃত্রিম আলোর অনেক ক্ষতিকর দিক থাকলেও আশার কথা হলো, আমরা দৈনিক যেসকল দূষণের মুখোমুখি হই তাদের তুলনায় এই আলোক দূষণ সমস্যার সমাধান অত্যন্ত সহজ। আলোর ডিজাইন, উপকরণ এবং বিন্যাসে সামান্য পরিবর্তনই এই দূষণ অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে। International Dark-sky Association এর গাইডলাইন অনুযায়ী আলোর উৎসকে ঢেকে রাখা যেন উপরের দিকে মুখ না করে থাকে। পারদ-বাষ্প, ধাতব হ্যালাইড বাষ্প কিংবা নীল আলোর এলইডি বাল্বের বদলে কমলা সোডিয়াম-বাষ্প ল্যাম্প ব্যবহার করা, টাইমার কিংবা সেন্সর যুক্ত বাতি ব্যবহার করা যাতে শুধুমাত্র ঘরে প্রবেশ করলেই আলো জ্বলে উঠে এবং আলোর ঔজ্জ্বল্য (লুমেন) কমিয়ে ফেলে সঠিকভাবে ব্যবহার করলেই এই সমস্যা অনেক কমে যাবে। ২০১৩ সালে ফ্রান্স আলোক দূষণ প্রতিরোধে অর্ডিন্যান্স জারি করেছে যার কারণে প্যারিসে এখন রাত ১ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত অফিস এবং দোকানের সামনে বাতি নিভিয়ে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, এসকল নিয়ম মেনে অ্যারিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফ, ওকক্রিক, সিডোনা শহর, স্কটল্যান্ডের কোল, কানাডার বন অ্যাকর্ড শহর সহ প্রচুর জায়গা International Dark-sky City উপাধি পেয়েছে, যা কীভাবে সহজেই এই সমস্যা সমাধান করা যায় তা দেখিয়ে দেয়।

উনিশ লক্ষ বছর আগে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে ১৮৭৮ সালে প্যারিসের রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলন, রাতের অন্ধকার দূর করতে আলো ব্যবহারের ইতিহাস বেশ অনেকদিনের পুরনো। কৃত্রিম আলো আজ আমাদের জীবনকে অনেক সহজ ও নিরাপদ করেছে, কিন্ত পাশাপাশি এই বৈদ্যুতিক বাতির যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য আর সর্বোপরি আমাদের স্বাস্থ্যের উপরে বিরূপ প্রভাবও বয়ে আনছে। আর তাই এখন সময় এসেছে পানি, বায়ু বা শব্দের মতো আলো দূষণকেও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার, কারণ অল্প একটু সচেতনতা আর সামান্য একটু সমবেত প্রচেষ্টাই পারবে এই দূষণ দূর করে পরিবেশে আলোর সত্যিকারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে।

প্রকৃতপক্ষে, জীবনে আলোর পাশাপাশি অন্ধকারের ভূমিকাও অনস্বীকার্য, কারণ রাতের ঐ আপাত অন্ধকার আকাশের আসল বর্ণিল সৌন্দর্য অনুভব করতে সদা জীবন্ত, উজ্জ্বল শহরের চেয়ে অন্ধকার, শীতল কোনো মরু প্রান্তরই বেশি উপযুক্ত। তাই আমরা যদি এসব নকল আলোর আবরণ সরিয়ে কোনো গভীর, একাকী রাতে উপরের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের জীবনের তুচ্ছ সমস্যাগুলোকে ভুলে এই মহাবিশ্বের বিশালত্বকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবো- আমাদের এই আত্মবিধ্বংসী মানবজাতির জন্য আজ যা খুবই দরকার।

তথ্যসূত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/1994_Northridge_earthquake
  2. https://www.youtube.com/watch?v=_nlFcEj41Xk
  3. http://iflscience.com/space/one-third-of-humanity-cant-see-the-milky-way-in-the-night-sky/
  4. https://www.washingtonpost.com/news/energy-environment/wp/2016/06/10/light-pollution-keeps-much-of-humanity-from-seeing-the-night-sky/
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Lighting
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Light_pollution
  7. http://darksky.org/light-pollution/wildlife
  8. http://iflscience.com/environment/light-pollution-leads-baby-sea-turtles-astray-study-shows/
  9. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-environ.html
  10. http://lightpollutionanddarkskies.blogspot.com/
  11. http://darksky.org/light-pollution/energy-waste/
  12. https://en.wikipedia.org/wiki/Bortle_scale
  13. Ecological Consequences of Artificial Night Lighting. Catherine Rich & Travis Longcore (eds). 2006. Island Press. Covelo, CA. Pages 281-304,305-344
  14. nationalgeographic.com/news/2003/04/0417_030417_tvlightpollution_2.html
  15. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-Plants.html
  16. Salmon (2003)."Artificial night lighting and sea turtles" (PDF). Biologist 50: 163–168
  17. https://en.wikipedia.org/wiki/Ecological_light_pollution
  18. http://darksky.org/light-pollution/human-health/
  19. http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2627884/
  20. http://science.howstuffworks.com/environmental/green-science/light-pollutionhtm