দগ্ধ পৃথিবীঃ ২২০০ খ্রিষ্টাব্দ

 

জলবায়ুর পরিবর্তন পরাস্ত করেছে মানুষের দাপট। মাত্র পঞ্চাশ কোটি পৃথিবীবাসী অবশিষ্ট উত্তরের জীবন-তরীতে। কীভাবে বেঁচে আছে তারা?

অভেদ্য, নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার সুউচ্চ বহুতল ভবনের ৩০০ তলায় ক্ষুদ্র ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে তাকাই। মাটির আধামাইল উপরে আমার ফ্ল্যাট। এখান থেকে মনোমুগ্ধকর বীথিদৃশ্য চোখে পড়ে। বেশ কিছু বাংলো, ছিমছাম উঠান, পান্না-সবুজ রাঙা খেলার মাঠ, সূর্যের আলো ঝিলিক দেয়া সুইমিং পুল, আর দীর্ঘ বেলাভূমির ওপারে তৈরি কিছু প্রাসাদসম অট্টালিকা। দৃশ্যগুলো লস এঞ্জেলস শহরের স্মৃতি মনে করিয়ে আকুল করে দেয়। শহরটি এখন অস্তিত্বহীন, যেখানে শান্তিপূর্ণ সময়ে বড় হয়েছেলিন আমার দাদার-দাদা, যখন নবজাতকের জন্মদান কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো না, আর সাতশ’ কোটি মানুষ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতো পৃথিবী বুকে।

এখন পৃথিবীতে আমরা মাত্র পঞ্চাশ কোটি মানুষ বেঁচে আছি, জলবায়ুর পরিবর্তন এ গ্রহের ধারণ ক্ষমতা (carrying capacity) কমিয়ে এনেছে। একটি পরিবেশে জনসংখ্যা সর্বোচ্চ কতটুকু বাড়তে পারবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া। এর বাইরে যাওয়া যাবে না। বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস লাভলক যাকে বলেছিলেন জীবন-তরী, এখন তার মাঝেই উত্তরমেরুর দূরপ্রান্তে বসবাস করছে বেশিরভাগ মানুষ। একসময় এখানে ছিল কানাডা, চীন, রাশিয়াসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো। জলবায়ুর পরিবর্তন একটু হলেও সহনশীল এদিকটায়। একসময় এখানেই কোটি কোটি মরিয়া উদ্বাস্তুকে স্থান দিতে নিমেষেই তৈরি করা হয়েছিলো অনুপযোগী শহর।

জানলার বাইরে যে দৃশ্য আমি ‘দেখছি’ তা আসলে বিভ্রম। আমার আবেগী মস্তিষ্কে তার একটি কোমল ও অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কঠোর বাস্তবতায় অবিচলিত থাকা যায় না। যতদূরে দৃষ্টি যায় চোখে পড়ে কাঁচ দিয়ে ঘেরা সভ্যতার উচ্ছ্বিষ্ট। বুলেট ট্রেনকে পারাপার করার জন্যে ফিতার মতো রাজপথ ঘিরে আছে এই প্রকাণ্ডপুরীকে। আকাশভেদী কয়েক শত তলা উঁচু ভবন, যেখানে ঠাঁসাঠাসি করে বসবাস করছে কোটি কোটি মানুষ। গ্রীনহাউসের ভেতর বিস্তৃত জমিতে রাসায়নিক-পুষ্টিতে বাড়ছে ফল-মূল-শাক-সবজি। চরে বেড়ানো গবাদিপশু কিংবা বসন্তের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে হেঁটে বেড়ানোর জন্য কৃত্রিম গ্রামীণ পরিবেশ।

ভীষণ-বিপর্যয়ের ভূকম্পীয় আঘাতের আগে মানুষের চলাচল ছিল বন্ধনহীন। মুক্তবায়ুতে তারা নিঃশ্বাস নিতে পারতো। ঘুরে বেড়াতে পারতো জঙ্গলে। বাচ্চাদের বল খেলা দেখতে পারতো মাঠে। বিস্তৃত ভূমিগুলো এখন নিষিদ্ধ এলাকা। সে অঞ্চলে বিভিন্ন রোগ ও দূর্যোগের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান। প্রবল বৃষ্টির উপদ্রব সাথে নিয়ে ঝড়ো হাওয়া ঘণ্টায় শত কিলোমিটার বেগে আর্তনাদ করে বেড়ায়। বৃষ্টি না থাকলে রুক্ষ ধুলি-ঝড় হামলে পড়ে। যেখানে একসময় ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মরুভূমি থেকে গম্ভীর গুড়গুড় শব্দে ভূমি-সুনামি ঢেকে দেয় বিশাল অঞ্চল। বন্য-আবহাওয়া যখন খানিকটা বিরাম নেয়, তখন দাহক সূর্য অবিরত পুড়িয়ে দেয় বায়ুমন্ডলকে। দিনের মাঝভাগে তাপমাত্রা উঠে যায় ১৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইটেরও ওপরে। বিশেষ-দেহবর্ম ও অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া তখন অসম্ভব হয় যায়।

আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বদলে গেছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় ধর্মীয় ও সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কর্তৃত্ব করতো। এখন তা ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ, কারণ পৃথিবীতে ঐ অঞ্চলগুলো এখন আর নেই।

উপরের কথা হয়তো কোনো রোগীর জ্বরের ঘোরে দুঃস্বপ্নদুষ্ট প্রলাপ মনে হতে পারে। তবে এখন থেকে তিন হাজার বছর আগেও জলবায়ুর পরিবর্তন অগ্রসর সভ্যতা পতনের সূচনা হিসেবে কাজ করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে দেড়শ বছর ধরে ঘটে চলা ভূমিকম্প, খরা ও দূর্ভিক্ষের মতো দূর্যোগ-পরম্পরা নির্ধারণ করে দিয়েছিল পূর্ব-ভূমধ্য অঞ্চলে শেষ ব্রোঞ্জ যুগে টিকে থাকা রাজ্যগুলোর ভাঙ্গনের গতিপথ। এখন যেখানে রয়েছে গ্রীস, ইসরায়েল, লেবানন, তুরস্ক ও সিরিয়া। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা নিদর্শন অনুযায়ী পৃথিবীর ঐ অঞ্চল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রয়োগিক উন্নতির স্পন্দনের মধ্য দিয়ে গেছে তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে। প্রাচীন মাইসেনিয়া, মিনোয়া থেকে হিট্টাইট, অসিরিয়া, সমাজ ছিল সাইপ্রিয়ট ও মিশরীয়দের পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। তারা চিকিৎসক, সংগীতজ্ঞ ও কারিগরদের সেবা বিনিময় করতো। বিকশিত-বাণিজ্যপথে ব্রোঞ্জ তৈরিতে দরকারী টিনের মতো পণ্যদ্রব্য, বিভিন্ন মালামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদও বিনিময় করতো।

তবে ২০১২ সালের একটি গবেষণায় খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে ভূমধ্য সাগরের পৃষ্ঠীয় তাপমাত্রা খুব দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাবার খবর উঠে আসে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলছে এ ঘটনা তীব্র খরাকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে দেখা দেয় খাদ্য সঙ্কট, গণহারে দেশত্যাগ, কৃষক-বিদ্রোহ। পরিণামে এক সময়ের জৌলুশপূর্ণ ব্রোঞ্জযুগীয় সমাজের কেন্দ্রীয় শহরগুলো বহিরাগত সৈন্যবাহিনীর আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যে বাহিনীর সেনারা সম্ভবত নিজেরাই খরা-পিড়ীত স্বদেশ ছেড়ে পলায়ন করে। বিনাশ হয় সংস্কৃতির, ভাষার ও প্রযুক্তির। ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় প্রথম অন্ধকার যুগ। হয় ব্রোঞ্জ যুগের পতন। এক সময়ের পরিশীলিত ও সূক্ষ্ম সমাজের অস্তিত্ব নাশ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার পুননির্মাণ ও পুনরুদ্ধারে করতে চলে যায় কয়েক শতাব্দী।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ও 1177 BC: The Year Civilization Collapsed বইয়ের লেখক এরিক এইচ ক্লিন বলেন –

“তখনকার সময় সেটি ছিল একটি বিশ্বায়িত সমাজ, প্রত্যেকেই অন্যের সাথে সংযুক্ত ছিল, নির্ভর করতো

একে অপরের ওপর। ফলে আপনারা একটা ডমিনো প্রভাব লক্ষ্য করবেন, একটি সংস্কৃতি দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়লে তা ধারাবাহিকভাবে বাকিদের ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। মিশর টিকে যায় কারণ তারা প্রস্তুতি নিতে তুলনামুলক সক্ষম ছিল। কিন্তু সে বিজয় ছিল বহু বিপর্যয়ের, কারণ তাদের সকল বাণিজ্য-অংশীদার হারিয়ে গেছে। এক শতাব্দীর ভেতর তাদের সকল জানা বিশ্বের পতন হয়েছে।”

এর আগে সতের’শ শতাব্দীর দিকে পৃথিবীর বুকে যখন ৫০ কোটি মানুষ বসবাস করতো সে সময়ে ফিরে তাকালে শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যায়। কাকতালীয়ভাবে তখনো ছিল জলবায়ু-প্ররোচিত ভীষণ অভ্যূত্থান-কাল। একইসাথে সময়টাকে ধরা হয় আধুনিক ইউরোপের ভোর। ভাবুন নিউটন, রেমব্রানৎস, গ্যালিলিও কিংবা ষোড়ষ লুইসের কথা। তখন যা ঘটেছিল আর আজকে আমরা যেরকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তাদের মধ্যে মিল লক্ষ্যণীয়। ইতিহাসবিদরা সে সময়টাকে বলেন সর্বজনীন সংকটের যুগ, কারণ সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমাগত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রিশ বছরের যুদ্ধ, চীনে মিং রাজবংশ ও ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট রাজতন্ত্রের পতন।

তার উপরে সময়টা ছিল সেই শতাব্দী, যখন শিশু-তুষার যুগ সবচেয়ে তীব্র হয়ে এই গ্রহের শীতলীকরণে নের্তৃত্ব দিচ্ছিল। এর প্রভাব উত্তর-গোলার্ধে বসবাসকারী মানুষজন টের পাচ্ছিল ভালোভাবেই। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেফরি পার্কারের মতে সতের’শ শতাব্দীর বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পেছনে আবহাওয়ার ভীষণ পরিবর্তনকে প্রভাবক হিসেবে পাওয়া যাবে। শীতল আবহাওয়া, ঝড় তৈরি করা এল-নিনোর বাড়তি পর্যায়- যার পরিণাম বন্যা, কৃষি বিপর্যয়, খরা ও দূর্ভিক্ষ। যার পরিণাম সামাজিক অস্থিরতা, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ। টানা সংকট স্পেন, রাশিয়া ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো কর্তৃত্বশালী রাজ্যগুলোকে দূর্বল করে দেয়। মৃত্যু হয় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার।

ক্লাইনের ভাষায়, “অতীতের সমাজের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তারা টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিমাতার দৈবানুগ্রহের উপর নির্ভরশীল ছিলে। (তার বিপরীতে) আমরা নিজেদের পতনের জন্য দায়ী হবো কিনা সেটা দেখা এখনো দেখার বাকি আছে। আমাদের পূর্বে যেসব সভ্যতা এসেছিল শেষ পর্যন্ত ধ্বসে গেছে। আমরা কেন ভাবছি যে আমরা নিরাপদ?”

আমরা পরিবেশ-প্রতিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি করবো, তার ফলে পরিবর্তিত জলবায়ুতে প্রথমে স্বপ্নের মতো করে বলা বিজ্ঞানী লাভলকের কল্পিত জীবনতরীতে নিজেদেরকে যেকোনোভাবে বাঁচাতে পারবো এমন চিন্তা করাটা এক ধরনের ঔদ্ধ্যত্য। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন গাণিতিক মডেল অনুযায়ী চলতি শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাবে অন্তত চার ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিংবা তার চেয়েও বেশি। এ অবস্থাকে গবেষক কেভিন এন্ডারসন বর্ণনা করেছেন “যে কোনো সংগঠিত, ন্যায়নিষ্ঠ ও সভ্য বিশ্ব-সমাজের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।”

প্রিন্সটনের এন.পি.ও. ক্লাইমেট সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি কুলেন বলেন, “মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে কোনো তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা আমরা পরিলক্ষিত করব- যে তাপমাত্রার জন্য আমরা কোনোভাবেই অভিযোজিত নই।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের জন্য কল্পনা করা কঠিন যে পৃথিবীর একটা বিশাল অঞ্চল মানব-বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।”

তাপমাত্রা চার ডিগ্রী বাড়লে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র কিছু অঞ্চল থেকে গণদেশান্তর দেখতে পাবো। আমাজন, ভারতের কিছু অঞ্চল ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চল এর আওতায় পড়বে। সাগরতল উচ্চতায় চার ফুট কিংবা তার চেয়েও বেশি বাড়বে। টোকিও থেকে মুম্বাইয়ের মতো উপকূলীয় শহর হিংস্র ঝড়ের বন্যায় ভেসে যাবে। বাংলাদেশ ও ফ্লোরিডার মতো নিচু অঞ্চলগুলো পানিতে অর্ধনিমজ্জিত হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ হবে বাস্তুচ্যুত।

অন্যদিকে মধ্য চীন থেকে শুরু করে ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চল, আফ্রিকা, আস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও

ল্যাটিন আমেরিকার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলো এ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশুষ্ক হয়ে পড়বে। সেসব এলাকায় ভূপৃষ্ঠের উপরিতলে যেটুকু পানি ছিল তা শুষে নিবে। ধ্বংস হবে ফসল, যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অজস্র গবেষণা ও তাদের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীবাসীর অর্ধেক, অন্তত চার’শ কোটি মানুষ পানির দুঃসহ সংকটে আর অনাহারে ভুগবে।

ঝলসে দেয়া তাপীয় প্রবাহ আর ভয়াবহ অগ্নিকান্ড খাদ্য-দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও গণদেশান্তর উসকে দেবে। দ্রুত বেড়ে গিযে কীট-পতঙ্গেরা টাইফাস, কলেরা, পীতজ্বর, ডেঙ্গু ও ম্যালিরিয়াসহ দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত থাকতে সক্ষম জীবাণু, এমনকি একেবারে নতুন জীবাণু দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। বিস্তার ঘটবে অজস্র মহামারীর, যা পৃথিবীকে আবার ব্ল্যাক ডেথের কথা মনে করিয়ে দিবে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে প্লেগ-মহামারী ইউরোপের প্রায় ২০ কোটি মানুষ মেরে ফেলেছিল। এক সময়ের জমজমাট মহানগরগুলো পরিণত হবে নিস্তেজ ভূতুড়ে শহরে। ভেবে দেখুন ম্যানহাটন, টোকিও, সাও পাওলো পানির নিচে চলে গেছে। এলোমেলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো কলোনিতে বেঁচে থাকছে কয়জন টিকে যাওয়া কষ্টসহিষ্ণু মানুষ যারা অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ জায়গায় খুব সাবধানে বেঁচে থাকছে গল্পের ভ্যাম্পায়ারের মতো। কেবল রাত হলেই বাইরে আসছে যখন তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। গড় তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী বেড়ে গিয়েই স্থিতিশীল হবে না, আরো বাড়বে। ইতিমধ্যে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে নিঃসরিত হয়েছে সেগুলোর তাপের অধিক ধারণক্ষমতার কারণে জলবায়ু একশো বছরেও নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে না। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জেমস হ্যানসেন বলেন, “বায়ুমণ্ডলে ইতিমধ্যে নিঃসরিত গ্যাসের জন্যে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হবে তার খুব সামন্যই আমরা অনুভব করছি। আরো গ্যাস বায়ুস্তরে ছড়াবে, কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর বিশাল জাড্যতা রয়েছে বলে তা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয় না।” মানব সভ্যতার বেশিরভাগকে বিদায়-চুম্বন জানানোর আগ পর্যন্ত এই গ্রহ তাই ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকবে। চলমান জলবায়ু পরিবর্তনে চক্রাকারে যোগাতে থাকবে আরো বেশি ইন্ধন।

দ্বিবিংশতম শতাব্দীতে যখন আমরা প্রবেশ করব, পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত ক্রান্তীয় রেইন ফরেস্ট মরু-আবৃত হয়ে পড়বে। ছোট ছোট বনসমূহ দাবানলের রোষে রুষ্ট হবে। বৈজ্ঞানিক জার্নাল সায়েন্সে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জীববিজ্ঞানী রডলফ ডিরাজো ও সহকর্মীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আমরা এই পৃথিবীর ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির প্রান্তে আছি, যা পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতীর মাঝে ৯০ শতাংশকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে। পৃথিবীর বিষুবীয় এলাকায় যে সব পশু-পাখিরা ঘুরে বেড়ায় তারা হারিয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়া পুনরায় মনুষ্যবিহীন গনগনে মরুভূমিতে পরিণত হবে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলি- হাওয়াই থেকে ফিজি, চলে যাবে সাগরতলে।

এত কিছুর পরেও ইতিহাস আমাদের প্রজাতীর বেঁচে থাকার জন্য একটা পথ দেখায়। পার্কার তার তথ্যবহুল গবেষণার বিশ্লেষণে এক চমকপ্রদ উপসংহার টেনেছেন। সপ্তদশ-শতাব্দীর বঞ্চনা কল্যাণ-রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দেয়, যা উনবিংশ শতাব্দীতে সকল আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর রাষ্ট্রসমূহের মূল-বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উল্লেখ করেন, “সপ্তদশ-শতাব্দীর মতোই একবিংশ-শতাব্দীতেও ব্যাপক মাত্রায় বিপর্যয় সামলাতে হলে যে সম্পদ লাগবে তা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই ব্যবস্থা করতে পারবে।”

আগামীর মহাবিপর্যয়ের চিত্র কল্পনা করে অনেকে যে শঙ্কিত, সে তুলনায় আমরা মানুষ প্রযুক্তিতে অনেক-উন্নত। আশা করা যায়, সামাজিকভাবে পরিশীলিতও বটে। তাই জলবায়ু বিপর্যয় বর্বরদের মতো মোকাবেলা না করে মনুষ্যপ্রজাতির বেঁচে যাওয়া সদস্যরা কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত খাবার খেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের উঁচু ভবনের মাঝে ভিড় করবে, ভূমি থেকে বহু উপরে যেখানে তারা পুনর্বার তৈরি করবে পৃথিবীর নতুন সংস্কৃতি।

তথ্যসূত্র

মূল লেখাঃ Scorched Earth, 2200 AD by Linda Marsa. Published in Aeon (online magazine). 10 February 2015.

লেখক পরিচিতিঃ লিন্ডা মার্সা ডিসকভার ম্যাগাজিনের অবদানকারী-সম্পাদক, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলসের লেখক প্রোগ্রামের শিক্ষক ও ২০১৩ সালে প্রকাশিত Fevered: Why a Hotter Planet Will Hurt Our Health বইটির লেখক।

নিমগ্নতার সুখ

আমরা জীবনে সুখের হরিণের পেছনে ছুটে বেড়াই। গড়পড়তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-লেখক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ধর্মবেত্তা-দার্শনিক সকলেই সুখ পাখিটা ধরতে চায়। তবে যারা সুখ জিনিসটা কী তা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের অনুসন্ধানটা ভিন্ন। তারা সুখকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। এ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান হয়তো বলবে এন্ডরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হলে মানুষ সুখানুভূতি পায়, তবে তারপরও কাজের সাথে সুখানুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এক জন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

কখনো কি এমন কোনো কাজে ডুবে গিয়েছিলেন যে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন? বেলা গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা হয়েছে টের পাননি? কিংবা রাতে খাবার পর কাজে বসে হঠাৎ টের পেয়েছেন যে ভোর হয়ে গেছে? কাজে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, সময় পার হবার অনুভূতি লোপ পেয়েছিল, ক্ষুধা অনুভব করেননি? এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই একবার না একবার হয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতের কাজটি চ্যালেঞ্জিং আর আগ্রহোদ্দীপক কিছু হয়ে থাকে।

টানটান উত্তেজনাপূর্ণ কোনো খেলা দেখার সময়েও এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে, অনেক সময় মজার অথচ জটিল কোনো গেম খেলার মধ্যে ডুবে গেলেও এ অবস্থা তৈরি হয়। অনেক প্রোগ্রামার রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ রাতে সাধারণত অন্য কেউ কথা বলে না, ডাক দেয় না, বিরক্ত করে না। তখন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো সমস্যা সমাধানে কাটিয়ে দিতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফ্লো’ (Flow)। বাংলায় একে আমরা নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা নিমগ্নতা বলতে পারি।

এখানে নিমগ্ন দশার সাথে সুখের সম্পর্কটা কী? এ প্রসঙ্গে ফ্লো তত্ত্বের জনক চেক মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাইয়ের গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করি।[১] ১৯৫৬ সালে এক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান উল্লেখ করেন যে, তারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত সুখী (গ্রাফ দ্রষ্টব্য)। তখন থেকে কয়েক বছর পরপর নিয়মিত এ জরিপটি করা হয়েছে। দেখা গেছে ১৯৫৬ সালের পরে আমেরিকানদের গড়পড়তা আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়লেও ‘সুখী’ আমেরিকানদের অনুপাত বাড়েনি। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নীচে আয় থাকলে তা অবশ্যই দুঃখের কারণ হবে। কিন্তু আয় অনেক বাড়লে সুখানুভূতি বাড়বে এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অধিক উপার্জন মানুষকে অধিক সুখী করে তুলতে পারে না।

চিত্রঃ আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সুখের সম্পর্ক।

২০০৫ সালে আমেরিকানদের গড় ক্রয় ক্ষমতা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সুখী মানুষের অনুপাতের কোনো পরিবর্তন হয়নি।[২] ছোট কালো বিন্দু দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে। বড় চতুষ্কোণ বিন্দু দিয়ে সুখী মানুষের অনুপাত বোঝানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষিতে মিহাই সুখ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা কি আসলেই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি? এটিই ছিল তার অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। তিনি প্রথমে সৃজনশীল ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিল শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানুষজন। তাদের সাক্ষাৎকারে যখন তারা নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে অন্যরকম ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেন তখন বার বার একটি অনুভূতির কথা উঠে আসে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি উচ্ছসিত আনন্দের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। সৃজনশীল কাজটি সহজে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় এ আনন্দময় দশাটি তৈরি হবার কথা উঠে আসে তাদের সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি মিহাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজের মধ্যে থাকা

অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি কেমন সেই তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন। তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পেজার নামক একটি যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পেজার মূলত মোবাইল ফোনের পূর্বপুরুষ। অংশগ্রহণকারীদের নিত্যদিনের কাজের মাঝে বিভিন্ন সময়ে এ পেজারটি বেজে উঠতো। অংশগ্রহণকারী ঐ মুহূর্তে কী কাজ করছেন, কাজ করতে কেমন লাগছে, কাজটি কোথায় করা হচ্ছে, কাজ করার সময় কী নিয়ে চিন্তা করছেন এসব তথ্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন।

এ ছাড়াও আরো দুটি পরিমাপ করা হয়। প্রথমত, অংশগ্রহণকারী যে কাজটি করছেন তা কতটুকু কঠিন। দ্বিতীয়ত, কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী কতটুকু দক্ষ। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন সময়ে করা বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মিহাই

একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছে দিনভর কাজ কতটুকু সহজ বা কঠিন মনে হয় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য তার কতটুকু দক্ষতা আছে, এ দুটি পরিমাপের মাঝামাঝি একটি বিন্দু ঠিক করা যায়। এ কেন্দ্রবিন্দু থেকে বোঝা সম্ভব কখন একজন অংশগ্রহণকারী ‘মগ্নতা‘ দশায় প্রবেশ করবেন।

চিত্রঃ কাজ কতটা চ্যালেঞ্জিং ও মানুষের দক্ষতা কতটুকু এবং এর সাথে সম্পর্কিত অনুভূতির চার্ট।

যখন আমাদের হাতের কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সে কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে তখন আমরা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করি। আর যখন কাজটা খুব সহজ হয় আর কাজের জন্য দরকারী দক্ষতা পর্যাপ্ত থাকে, তখন আমরা বেশ আরামে থাকি। তবে যখন কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয় আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকারী দক্ষতাও উপস্থিত থাকে, তখন আমরা মগ্নদশায় প্রবেশ করি। এই নিমগ্ন অবস্থায় কাজের চ্যালেঞ্জকে টক্কর দেবার সাথে সাথে একধরনের ভাবাবেশ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

তখন ক্ষুধা, সময় ইত্যাদির অনুভূতি থাকে না, আমরা ডুবে যাই কাজের ধারায়, লাভ করি চ্যালেঞ্জ খণ্ডনের তৃপ্তিময় আনন্দ। যখন হাতের কাজটি খুবই সোজা, আর সেটি করতেও তেমন কোনো দক্ষতা লাগে না, তখন মানুষ অনীহা/ঔদাসীন্য/বিরক্তি অনুভব করে। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার সময় মানুষ এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। (ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে ফিড ঘাঁটার সময়ে এরকম বোধ করি।)

‘নিমগ্ন’ দশার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা যে কাজটি করছি তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ থাকে ঐ কাজে। এছাড়া এ অবস্থার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[৩] যেমনঃ

১. নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে তৃপ্তিময় ভাবাবেশের অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।

২. মনের ভেতরে স্বচ্ছতার অনুভূতি থাকে। আপনি জানেন কী করা দরকার। আর আপনি কাজটা ঠিক মতো করছেন কি না, তা নিজে থেকেই বুঝতে পারেন।

৩. আপনি জানেন কাজটি শেষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কর্মসম্পাদনের দরকারী দক্ষতা আপনার আছে।

৪. নিজের সম্পর্কে কোনো খেয়াল থাকে না। আপনার সকল উদ্বেগ ও ভাবনা দূরে সরে যায়।

৫. আপনি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আর কেবল বর্তমানে হাতের কাজটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।

৬. কাজের মধ্যে একটা প্রণোদনা লুকানো থাকে। নিমগ্ন অবস্থাটি যে কাজের মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন, কাজ করাটাই তখন পুরষ্কার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানুষের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা সীমিত। মিহাই উল্লেখ করেন, মানব মস্তিষ্ক সেকেন্ডে ১১০ বিট তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই পরিমাণটি বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু নিত্যদিনের ছোট ছোট কাজে অনেক তথ্য প্রয়োজন হয়। যেমন কথার অর্থ উদ্ধার করতে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ বিট তথ্য লেগে যায়। এ কারণে কারো সাথে কথা বলার সময় অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা যায় না। ক্ষুধাবোধ, সময়জ্ঞান এগুলোও তথ্য যা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুপথের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে

এ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই না। নিমগ্ন অবস্থায় আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পুরোটাই ব্যবহৃত হয় হাতের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। তাই নাওয়া-খাওয়া ও সময়ের কথা আমাদের খেয়াল থাকে না। এরকম অবস্থায় দেহের অনুভূতি বোঝার জন্য কোনো মনোযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

নিমগ্নতা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এ দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে কাজের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] Flow, the secret to happiness. TED-talk by Mihaly Csikszentmihalyi.http://ted.com

[২] Happiness data from National Opinion Research Center General Social Survey; income data from Historical Statistics of the United States and Economic Indicators.

[৩] What Is Flow? Understanding the Psychology of Flow.https://www.verywell.com

সমুদ্রের ঘ্রাণ

মেঘমালা আপনাকে সমুদ্রের কথা মনে করিয়ে দেবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু সমুদ্র না থাকলে মাথার উপরে খুব কম সংখ্যক মেঘই ভেসে বেড়াতো। কারণ সুবিশাল সমুদ্র জুড়ে অজস্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব রয়েছে যারা ডাই-মিথাইল সালফাইড (ডিএমএস) নামক গ্যাস তৈরি করে। সুনির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ডিএমএস মেঘ গঠন শুরু করতে পারে। এই ক্ষুদ্র জীবদের মধ্যে আছে শৈবাল ও অণুজীব। এরা অবশ্য মেঘ তৈরির জন্য ডিএমএস তেরি করে না। ডিএমএস আসলে ডাই-মিথাইল-সালফোনিও-প্রপিওনেট (ডিএমএসপি) নামক বিপাকীয় অণুর উপজাত। সম্ভবত ভেসে বেড়ানো কিংবা প্রতিরক্ষা কিংবা উভয় কাজেই ফাইটোপ্লাঙ্কটনের ডিএমএসপি দরকার।

সমুদ্রের একটি নিজস্ব ঘ্রাণ আছে। এই ঘ্রাণ কখনো কখনো অপ্রীতিকর কটু গন্ধ বলে মনে হতে পারে। এ ঘ্রাণের জন্য বায়ুবাহিত ডিএমএস দায়ী। সম্প্রতি সাগরের ফাইটোপ্লাঙ্কটন এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির (Emiliania huxleyi) মাঝে এ ঘ্রাণের পেছনে যে উৎসেচক বা এনজাইম দায়ী তা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ডিএমএসপি লাইয়েজ ১। এটি শৈবালের উৎসেচক যা ডিএমএসপি-কে ভেঙে ফেলে। ফলাফল হিসেবে সুগন্ধী ডিএমএস তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে।

সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো অধিকাংশ ফাইটোপ্লাঙ্কটন হলো এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। এরা সমুদ্রের বিশাল অঞ্চল জুড়ে সবুজ আস্তরণ তৈরি করে। ব্লুম নামে পরিচিত এ আস্তরণ মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। ক্রান্তীয় ও সাবআর্কটিক উভয় সাগরজলে এদের উপস্থিতি সাবলীল। এসব বাস্তুসংস্থানে খাদ্যজালের গুরুত্বপূর্ণ অংশও এ ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলো। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি এককোষী ইউক্যারিয়টিক (নিউক্লিয়াস বিদ্যমান এমন প্রকৃতকোষী) ফাইটোপ্লাঙ্কটন যাদের চারপাশে কোক্কোলিথ নামক এক ধরনের আবরণ রয়েছে। কোক্কোলিথের নামকরণ করেছিলেন ব্রিটিশ তুলনামূলক দেহসংস্থানবিদ থমাস হাক্সলি (১৮২৫ – ১৮৯৫)।

2চিত্রঃ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। বাইরে কোক্কোলিথের আবরণ দেখা যাচ্ছে।

কোক্কোলিথ ক্যালসাইট নামক খনিজ দিয়ে তৈরি। এদের নির্মাণকৌশল খুব সূক্ষ্ম ও অসাধারণ। বেশিরভাগ সময়েই এরা রঙহীন ও অস্বচ্ছ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির কোক্কোলিথ ক্যালসাইটের চাকতি দিয়ে তৈরি। এ বিষয়টি সর্বপ্রথম বর্ণনা করেন হাক্সলি ও সিজার এমিলিয়ানি নামক আরো একজন ইতালীয় অণুজীববিজ্ঞানী। তাদের দু’জনের নামানুসারেই এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি-র নামকরণ করা হয়েছে। নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় ক্যালসাইটের খোলটি প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা রাখে। কোক্কোলিথ হয়তো অনান্য বড় প্রাণীর ভোজে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করার একটা পদ্ধতি। অথবা এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, এমনকি হয়তো ক্ষতিকর অতিবেগুণী রশ্মির বিরুদ্ধে ভৌত বাধা হিসেবেও কাজ করে। এরা হয়তো ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলোকে ভাসিয়ে রাখার জন্য জরুরী। অথবা গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী প্রজাতিগুলোর সালোকসংশ্লেষণের আলো যোগাড়ের একটি পদ্ধতিও হতে পারে। এই ক্যালসাইট খোলগুলো প্রতিনিয়ত দেহ থেকে স্খলিত হয়ে সাগরতলে ডুবে যায়। গভীর সাগরে জমা হওয়া তলানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এ ক্যালসাইটগুলো। ডোভার নগরীর শ্বেত পর্বতগাত্র দীর্ঘ ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে জমা হওয়া এরকম তলানীর উদাহরণ।

3চিত্রঃ ডোভার নগরের শ্বেত পর্বতগাত্র। সাগরতলে দীর্ঘদিন ক্যালসাইট খোলের তলানী পড়ে এ স্তর তৈরি হয়েছে।

স্বতন্ত্র্য ক্যালসাইট খোল ছাড়াও এমিলেনিয়া হাক্সলি ডিএমএসপি তৈরি করে। অন্যান্য ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালও এই রাসায়নিক যৌগটি তৈরি করে। এই জৈব-যৌগটি প্রতি বছর এক বিলিয়ন মেট্রিক টন পরিমাণে সমুদ্রে যুক্ত হয় ও সাথে সাথে বদলে যায়। ডিএমএসপি অধিক পরিমাণে পাওয়া যায় বলে জৈব অণুর উপস্থিতি সমুদ্রে প্রাণের অন্যতম চিহ্ন হিসেবে ধরা হয়। যেহেতু এই অণুটির উৎপাদন অনেক বেশি, সুতরাং ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালের জীবনচক্রে ডিএমএসপি অবশ্যই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ সুনির্দিষ্টভাবে জানেন না এর কাজ কী। হয়তো এটি জীবকে অভিস্রবণীয় চাপ থেকে রক্ষা করে। ভেসে বেড়ানোর জন্য এর হয়তো ভূমিকা রয়েছে। এমনকি হয়তো শিকারী-শিকার সম্পর্কে এর কোনো বিশেষ কাজ রয়েছে।

ডিএমএসপি থেকে যে ডিএমএস তৈরি হয় তা সর্বপ্রথম ১৯৪৮ সালে লোহিত শৈবাল পলিসাইফোনিয়ায় শনাক্ত করা হয়। সমুদ্র শৈবালের গন্ধের জন্য যে ডিএমএস দায়ী তা তখনই জানা ছিল। ১৯৫৬ সালে প্রথম ডিএমএসপি ভাঙার উৎসেচক শনাক্ত করা হয়। এটি ছিল এরকম অনেকগুলো এনজাইমের মধ্যে একটি যাদের মধ্যে আধুনিকতম হলো ডিএমএসপি লাইএজ ১।

ডিএমএস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে গিয়ে পৃথিবীর সালফার চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর তীব্র সৌরভ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীকে সাম্ভাব্য খাদ্য-উৎসের প্রতি রাসায়নিক আকর্ষক হিসেবে কাজ করে। এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক পাখি, বিভিন্ন অমেরুদন্ডী এবং কিছু স্তন্যপায়ী। ডিএমএস মেঘ তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে। এর ফলশ্রুতিতে এই যৌগটি বিশ্ব জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে? যখন গ্যাসটি বায়ুমণ্ডলে নিক্ষিপ্ত হয় তখন তা তাৎক্ষণিকভাবে জারিত হয়ে যায়। ডিএমএস জারিত হয়ে তৈরি করে ডিএমএসও। ডিএমএসও পানির অণুর ঘণীভবনের নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করে। এতে তৈরি হয় মেঘ। আর যেখানেই মেঘ রয়েছে সে অঞ্চলের জলবায়ুতে এর প্রভাব থাকবেই। শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জলবায়ুতেও এর প্রভাব থাকবে। মেঘ সৌর বিকিরণের প্রতিফলন বাড়িয়ে এটিকে মহাশূন্যে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রভাবিত হয়।

ডিএমএস এর এক রকমের কটু গন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন গন্ধটা বাঁধাকপির মতো। অন্যরা কাব্যিকভাবে একে সমুদ্রের ঘ্রাণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিট-মূল, এসপারাগাস ও সামুদ্রিক খাবার রান্না করার সময়ও এ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘ্রাণ পাওয়া যায়। বিশ বছর আগে থিয়েরি থ্যালৌ নামের একজন ফরাসী রসায়নবিদ কটু গন্ধের জন্য ডিএমএস-কে দায়ী করেন। তিনি এ তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এক ধরনের ভূগর্ভস্থ ছত্রাক ও শূকর ব্যবহার করেন। আজকাল অবশ্য ডিএমএস খুব কম মাত্রায় খাবারে দেয়া হয় মশলাদার স্বাদ নিয়ে আসার জন্য।

একটি রাসায়নিকের মেঘ তৈরির ক্ষমতা রয়েছে– এ কথাটির মধ্যে এক রকমের গীতিধর্মী আবেদন আছে। মেঘ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যা ইদানিংকালে বেশ সংবেদনশীল বিষয়। ডিএমএসপি লাইয়েজ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা গেলে বোঝা যাবে এটি বায়ুমণ্ডলে ডিএমএস তৈরিতে কীভাবে ভূমিকা রাখে। এটি আবার ব্যাকটেরিয়া ও ইউক্যারিয়টদের বৈশ্বিক বিস্তৃতির উপর নির্ভরশীল। ডিএমএস কীভাবে পরিবেশের বিভিন্ন পরিমাপ দিয়ে আক্রান্ত হয় কিংবা ডিএমএস কীভাবে পরিবেশকে প্রভাবিত করে তা আমাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে ডিএমএসপি লাইয়েজের মতো একই কাজ করা অনেক উৎসেচক সম্পর্কে আমরা কোনো কিছু জানিই না।

ফাইটোপ্লাঙ্কটনের শারীরবৃত্তীক, জৈব সংকেত লেনদেন করা, ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধের এর প্রতিরোধ ক্ষমতা, শিকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য জীবের সাথে মিথোজীবিতার ক্ষেত্রে ডিএমএস-এর ভূমিকা বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক সালফার চক্রে এ ক্ষুদ্র জীবটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরেও বড়সড় ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে এ জীবটি সমগ্র পৃথিবীতেই ভূমিকা রাখে, আমরাও যার একটি অংশ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি আসলে সেই প্রাণী যা লাভলকের বিখ্যাত গায়া হাইপোথিসিসকে অনুপ্রাণিত করে, যে অনুকল্পের মূল কথা হলো পৃথিবীর জৈব-রসায়ন ও ভূ-রসায়ন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত।

প্রোটিন স্পটলাইট ১৭৪ ইস্যু হতে The smell of the sea-র ভাষান্তর মূল লেখক Vivienne Baillie Gerritsen

লেখকঃ আরাফাত রহমান

প্রভাষক, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

নিমগ্নতা, কাজ ও খেলা

বিজ্ঞানী সত্যেনন্দ্রনাথ বসুর কথা বলা যাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় তার মেয়ে একবার সিনেমা দেখার বায়না ধরেন। সে সময় তিনি জটিল একটি গাণিতিক সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এদিকে মেয়ে নাছোড়বান্দা। শেষে মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে ঘোড়ার গাড়িতে করে মেয়েকে নিয়ে গেলেন মুকুল সিনেমা হলে। সেখানে পৌঁছে দেখেন তিনি বাসায় টাকা ফেলে এসেছেন। মেয়েকে সেখানে রেখে গাড়োয়ানকে নিয়ে বাসায় ফিরলেন টাকা নিতে।

বাসায় পৌঁছে টাকা নেয়ার সময় টেবিলে দেখেন অসমাপ্ত গাণিতিক সমস্যাটা পড়ে আছে। তখন তিনি মেয়ের কথা ভুলে সেখানেই বসে পড়েন সমস্যা সমাধানে। এদিকে গাড়োয়ান যখন দেখলেন অনেকক্ষণ সময় পার হয়েছে তখন আর অপেক্ষা না করে বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। ঢুকে দেখেন, সত্যেন বসু টেবিল-চেয়ারে নিমগ্নভাবে অঙ্ক কষে চলছেন। গাড়োয়ান সত্যেন বসুকে মেয়ের কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি সম্বিত ফিরে পান।[১]

সত্যেন বসু

এরকম অনেক গল্প আমরা শুনেছি। যেমন আইনস্টাইন হোটেলের ঠিকানা হারিয়ে ফেলেন। আর্কিমিডিস গোসল করতে নেমে স্বর্ণ-খাদের সমস্যা সমাধান খুঁজে পেয়ে দিগম্বর অবস্থায় রাস্তায় বের হয়ে পড়েন “ইউরেকা! ইউরেকা!” চিৎকার করতে করতে।

এ ধরনের মুখরোচক গল্পগুলো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এর কারণ হলো আমরা বিজ্ঞানীদের আত্মভোলা মানুষ হিসেবে ভাবতে পছন্দ করি। তবে বিজ্ঞানীদের এভাবে চিহ্নিত করায় একটা সমস্যা রয়েছে। তারা আসলে আত্মভোলা নন। অনেক সময় বিজ্ঞানীরা গভীর সমস্যা সমাধানে এতোটাই নিমজ্জিত হয়ে যান যে অন্য কোনো কিছুর কথা তাদের মনেই থাকে না। এটাকেই মনস্তত্বে নিমগ্ন-দশা বা flow বলা হয়।

মনোযোগ দেয়ার প্রক্রিয়া

নিমগ্ন দশার কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের চেনা। প্রথমত নিমগ্নতা হলো কোনো কাজে গভীর মনোযোগ দেবার ফলে উৎপন্ন একটি পরিস্থিতি। দ্বিতীয়ত, ঐ কাজটি চ্যালেঞ্জিং। তৃতীয়ত, কাজটির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রয়োজন।

আমরা যখন কোনো বিষয়ে মনোযোগ দেই তখন মস্তিষ্কে কী ঘটে সে প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জানা যাক। যখন আমরা ঠিক করি কোনো বিষয়ে মনোযোগ দেব, তখন মস্তিষ্কের মনোযোগ-ব্যবস্থাটি দুটি ধাপে কাজ করে।[২] ধাপ দুটি হলো ইন্দ্রিয়প্রাপ্ত তথ্য বাছাই করে সেখানকার অর্থ উদ্ধার করা। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে-

১) কোনো দৃশ্যপটে যত তথ্য আছে তা চোখের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। তথ্যগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে খুঁজতে হয় কী বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। প্রক্রিয়াটিকে কোনো ঝাপসা ছবির সাথে তুলনা করা যায় যা ধীরে ধীরে পরিস্কার হওয়া শুরু করছে।

চিত্রঃ একটি রাস্তার দৃশ্যপট। ছবিঃ লাইফহ্যাকার।

২) দ্বিতীয় ধাপটি হলো প্রাপ্ত তথ্যগুলোর একটিমাত্র অংশে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা। প্রক্রিয়াটি তুলনা করুন প্রথম ধাপে দেয়া ছবির উদাহরণের সাথে। ঝাপসা ছবিটি পরিস্কার হবার সময় মস্তিষ্ক এর একটি অংশে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে অংশটি বিবর্ধিত করতে থাকে। ছবিটির বাকি অংশের তুলনায় ঐ অংশটি অধিক স্বচ্ছ ও বিস্তৃত থাকে।

মনোযোগ প্রক্রিয়াটি ঐচ্ছিক হোক, কিংবা স্বয়ংস্ক্রিয় হোক, উভয় ক্ষেত্রে দুই ধাপে সম্পন্ন হয়। আপনি যখন কোনো বিষয়ের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন তখন চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে আপনার চেতনা বদলে যায়। এসময় চারপাশের ঘটনাগুলো অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা বেড়ে যায়।

কিন্তু মনোযোগ ভেঙে যাবার ব্যপারটি কীরকম? মনোযোগ ভেঙে যাবার প্রক্রিয়াও মনোযোগ দেয়ার সাথে যুক্ত। মনোযোগ ভাঙার মূলে রয়েছে একটি প্রাচীন বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া। অতর্কিত বিপদে মানুষকে সচেতন করে আত্মরক্ষা করার জন্য এর উৎপত্তি। কোনো কাজে সক্রিয়ভাবে মনোযোগ দিতে সময় ও শ্রম দিতে হয়। অন্যদিকে মনোযোগ ভাঙার প্রক্রিয়াটি মানুষের স্বভাবজাত।

হঠাৎ উজ্জ্বল রঙ বা আলো এবং জোড়ালো শব্দ মনোযোগ ভাঙার জন্য মূল ভূমিকা রাখে। সুদূর অতীতে বুনো জন্তুর গোঙানী বা গাছের ফাঁকে হলুদ রঙের ঝিলিক শিকারী-সংগ্রাহক মানুষকে সতর্ক করে তুলতো। এখনো অ্যাম্বুলেন্স তীক্ষ্ম শব্দ ও লাল-নীল আলোর মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করে দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একবার কোনো কারণে মনোযোগ ভেঙে গেলে তা আবার কেন্দ্রীভূত হতে ২৫ মিনিটের মতো সময় লাগতে পারে।[৩] অর্থাৎ মনোযোগ দেয়াটা একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। সুতরাং কোনো কাজে মনোযোগ দিতে চাইলে বুদ্ধিমানের কাজ হবে মনোযোগ ভাঙতে পারে এমন জিনিস দূরে রাখা।

যেমন মুঠোফোন বন্ধ বা নীরব করে রাখা। ইন্টারনেট প্রয়োজন না হলে বন্ধ করে রাখা। এমন কোনো জায়গায় কাজ করা যেখানে অন্য কেউ বিরক্ত করার সম্ভাবনা কম। এছাড়া যে টেবিলে কাজ করা হবে সেখানে কাজের জিনিস (বই-পত্র ইত্যাদি) ছাড়া অন্যান্য জিনিসপত্র দূরে সরিয়ে রাখা।

নিমগ্ন দশা এক ধরনের অতি-মনোযোগের ফলে সৃষ্ট অবস্থা। এ সময় আমরা নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলে যাই, সময়জ্ঞান থাকে না। একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে পড়ে হাতের কাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা। কাজ করতে তখন অন্যরকম আনন্দ ও উদ্দীপনা পাওয়া যায়।

তবে শুধু মনোযোগী হলেই হবে না। এ দশায় প্রবেশ করতে হলে কঠিন কাজের চ্যলেঞ্জের পাশাপাশি সে কাজ সম্পাদনের জন্য দরকারী দক্ষতাও থাকতে হবে। নিমগ্ন দশার সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো এ সময় কাজকে আর অপ্রিয় মনে হয় না। এ দশাতে কাজ হয়ে যায় উত্তেজনাকর খেলা।

কাজ যখন খেলা

আমরা জীবনে অধিকাংশ কাজ করে থাকি দ্বিতীয় কোনো কাজের উদ্দেশ্যে। আমরা পেশাগত জীবনে যেসব কাজ করি তার প্রধান উদ্দেশ্য থাকে অর্থ উপার্জন। উপার্জিত অর্থ ব্যয় করি নিজের এবং পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে। নতুন নতুন প্রয়োজন মেটাতে পুনরায় অর্থ উপার্জনের দরকার হয়। তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতেই হয়। চক্রটি পুনরায় একইভাবে ঘুরতে থাকে।

শিক্ষার্থীরা অবশ্য সরাসরি জীবিকা নির্বাহের সাথে জড়িত নয়। তবে তাদের লেখাপড়ার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যও হলো শিক্ষা শেষে জীবিকা খুঁজে নেয়া। অর্থাৎ আমরা অধিকাংশ সময়েই শুধুমাত্র হাতের কাজটি ‘করা’র খাতিরেই কাজ করি না। কাজ করার পেছনে অন্য দ্বিতীয় একটি উদ্দেশ্য থাকে। এ দ্বিতীয় উদ্দেশ্য আবার তৃতীয় কোনো প্রয়োজন মেটায়। এভাবে একটি কাজের উদ্দেশ্যের সাথে অন্যটির প্রয়োজন যুক্ত থাকে।[৪]

এর ব্যতিক্রম হলো খেলা। ছোটবেলায় যখন আমরা খেলতাম, তখন খেলার পেছনে দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্য থাকতো না। খেলায় প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি পদক্ষেপ ও গতিবিধি শুধুমাত্র ঐ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার আনন্দ নেয়ার জন্য সম্পাদিত হতো। ছোটরা খেলার মধ্যে একেবারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে ‘খেলা’। খেলার প্রতিটি মুহুর্তে নিঙরে নিঙরে তারা উত্তেজনার আনন্দ লাভ করে।

সেই ছোট্ট আমরা বড় হবার জীবনব্যাপী খেলাটি খেলতে গিয়ে খেলার আনন্দের কথা ভুলে যাই। আমাদের কাজের উদ্দেশ্য হয়ে পড়ে দ্বিতীয় একটি প্রয়োজন সাধন। এই চক্রটি এভাবে চলতেই থাকে।

চিত্রঃ শিশুদের খেলায় দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্য থাকে না।

তবে যখন কোনো দুরূহ কাজ করার দক্ষতা আমাদের থাকে, কাজটাও হয় চ্যালেঞ্জিং ও তাৎপর্যপূর্ণ। তখন আমরা নিজেদের মধ্যে flow অনুভব করি। তখন ঐ কাজে আমরা নিমজ্জিত হয়ে যাই। লাভ করি নিমগ্নতার সুখ। তখন কাজ হয়ে পড়ে খেলা। তখন কাজটা যত কঠিনই হোক না কেন আমরা কোনো ক্লান্তি অনুভব করি না।

নিমগ্নতা একটা চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এই দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে নতুন নতুন কাজ করার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা কারো রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

নিমগ্নতা আমাদের দ্বিতীয় শৈশবে ফিরিয়ে নিতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] ছোটদের বিজ্ঞান-মনীষাঃ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সাদ আব্দুল ওয়ালী, http://e-learningbd.com/

[২] Train Your Brain for Monk-Like Focus, Thorin Klosowski, http://lifehacker.com/

[৩] Meet the Life Hackers, Clive Thompson, http://www.nytimes.com/

[৪] Tennis with Plato, Mark Rowlands, https://aeon.co

featured image: blog.bufferapp.com

ডি ক্যাপ্রিওর অস্কার বক্তৃতা ও জিকা ভাইরাসের উত্থান

গত কয়েক বছর যাবত মার্কিন অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর অস্কার না পাওয়া নিয়ে অনলাইনে একটি কৌতুক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হলিউডের এ অভিনেতা টাইটানিক (১৯৯৭) থেকে শুরু করে অনেকগুলো চলচিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন। গত পাঁচ-দশ বছর ধরে সবাই আশা করছিলেন তিনি অভিনয়ের জন্য অস্কার পাবেন। কয়েকবার একাডেমি এওয়ার্ডে অস্কারের জন্য মনোনীতও হয়েছিলেন, কিন্তু প্রতিবছরই সবার আশাভঙ্গ হচ্ছিলো। কৌতুকটা হলো, এখন থেকে ত্রিশ বছর পর লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর অস্কার-না-পাওয়া কর্মবহুল জীবন নিয়ে তৈরি একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ভবিষ্যতের কোনো প্রতিভাবান অভিনেতা অস্কার পেয়ে যেতে পারেন।

সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো ২০১৬ সালের একাডেমী এওয়ার্ডে, যেখানে ডিক্যাপ্রিও দ্যা রেভেন্যান্ট (২০১৫) চলচিত্রটির জন্য অস্কার পুরস্কার পান। সকলেই আগ্রহী ছিলেন এ অভিনেতা অস্কার ভাষণে কী বলেন। তবে ডিক্যাপ্রিও অস্কারের মঞ্চটিকে ব্যবহার করেন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সবাইকে সচেতন করার জন্য।

ডিক্যাপ্রিও বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তন বাস্তব; এটা এখনই ঘটছে। আমাদের সমস্ত প্রজাতি গুরুতর এই ঝুঁকির সম্মুখীন; আমাদের একসাথে কাজ করা দরকার এবং দীর্ঘসূত্রীতা থামানো দরকার।

অনেকেই অবাক হয়েছে ডিক্যাপ্রিওর মতো বিশ্বমানের অভিনেতা পরিবেশের ভূমিকাটা বড় করে দেখাতে। তবে জলবায়ুর পরিবর্তনের গুরুত্ব আসলেই অনেক। ডিক্যাপ্রিওর অস্কার পুরস্কারের মতো ২০১৬ সালে গুরুত্ববহ একটি ঘটনা হলো জিকা ভাইরাস কর্তৃক নতুন একটি রোগের বিশ্ববিস্তার। জিকা ভাইরাসকে হঠাৎ আবির্ভূত মশাবাহিত রোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই ভাইরাসের বিশ্ববিস্তার আসলে পরিবর্তিত জলবায়ুরই একটি পরিণাম।

লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও

তবে এটাই শেষ নয়। প্রতিবছর বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। এর সমান তালে এখন মশাদের ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে দূরেও পাওয়া যাচ্ছে। মিশরীয় এডিস মশা (Aedes aegypti) সাধারণত এমন জায়গায় থাকতে পারে না যেখানে শীতে তাপমাত্রা দশ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে চলে যায়। মশারা এতো শীত সহ্য করতে পারে না। কিন্তু এখন অনেক উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা উষ্ণশীতকালের সম্মুখীন হচ্ছে। প্রকারান্তরে মিশরীয় এডিস মশা তাদের গন্ডী বাড়াচ্ছে সহজেই।

জিকার মতো মশাবাহিত অনেক রোগই এডিস মশার দুইটি প্রজাতির মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন Aedes aegyptiAedes albopictus। এ দুটি প্রজাতির উৎপত্তি আফ্রিকা ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায়। এদেরকে এখন ভূগোলকের ক্রান্তীয় ও গ্রীষ্ম-মন্ডলীয় এলাকা পাওয়া যায়। এরা নিশ্চয়ই নিজেদের পাখায় উড়তে উড়তে মহাসাগর পেরিয়ে অন্য মহাদেশে স্থানান্তরিত হয়নি। বরং অতীতের দাস ব্যবসা ও বর্তমানের আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এদের বিশ্বভ্রমণে সাহায্য করেছে।

চিত্রঃ পৃথিবীর ক্রান্তীয় অঞ্চলে মিশরীয় এডিস মশার বিস্তার।

জিকা ভাইরাসের নামকরণ করা হয়েছে উগান্ডার জিকা বনের নামানুসারে। অর্ধশত বছরেরও আগে থেকে গবেষকরা জিকা বনে আসেন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে- মশাবাহিত ভাইরাস নিয়ে গবেষণার জন্য। জিকা বনে এ গবেষণার শুরু মূলত পীতজ্বর (ইয়েলো ফিভার) ভাইরাসের অনুসন্ধানের জন্য। এটি এমন একটি বন যেখানে প্রায় প্রতি বছরই গড়ে একটি করে নতুন ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়। ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি সময়ে গবেষকরা বুঝতে পারেন যে একেক ধরনের মশকী একেক উচ্চতায় সক্রিয় থাকে। তাই তাঁরা পীতজ্বর গবেষণার জন্য জঙ্গলের মাঝে এক সুউচ্চ লৌহ-টাওয়ার তৈরি করেন।

১৯৪৭ সালের এপ্রিলে আলেক্সান্ডার হ্যাডো ও জর্জ ডিক সেই টাওয়ারে সংরক্ষিত একটি রেসাস বানরে মৃদু জ্বরের লক্ষণ দেখতে পান। সেই বানর থেকে পরবর্তীতে একটি নতুন ভাইরাস সনাক্ত করা হয়, যার নাম দেয়া হয় ‘জিকা ভাইরাস’।

প্রথম সনাক্তকণের সময় ভাইরাসটি কেবল বানরদের সংক্রমিত করতে পারতো; অন্তত তথ্যপ্রমাণ তা-ই বলে। এমনকি পরবর্তী কয়েক দশকে যখন কয়েক ডজন রোগীর মধ্যে জিকা ভাইরাস পাওয়া যায়, তখনো রোগের লক্ষণ খুব মৃদু ছিল। উগান্ডাতে কখনোই জিকা ভাইরাস হুমকি সরূপ হয়ে দেখা দেয়নি। তাহলে পরবর্তী সময়ে এমন কী হলো যে জিকা ভাইরাস এতো ভয়াবহ রোগের কারণ হিসেবে ছড়িয়ে পড়লো? এ প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর পেতে গবেষকদের আরো সময় লাগবে।

যখনই পৃথিবী কোনো গুরুতর জলবায়ু পরিবর্তনের (মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক) মধ্য দিয়ে গিয়েছে তখন একটি বৈশ্বিক-প্রপঞ্চ ঘটেছে। ঐ সময়ে বিভিন্ন প্রাণী তার নিজস্ব জীবাণু সাথে করে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। ফলে সেসব জীবাণু এমনসব প্রজাতীর সংস্পর্শে এসেছে যাদের ঐ জীবাণুর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে সবাই হঠাৎ অঘটন বলে ভাবছেন। প্রকৃতপক্ষে এটি অনুরূপ কয়েকটি ধারাবাহিক ঘটনার মধ্যে সর্বশেষ।

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ওয়েস্ট নীল ভাইরাসও কিন্তু জিকা ভাইরাসের সমসাময়িক। ১৯৩৭ সালে উগান্ডার একটি হাসপাতালে রহস্যময় জ্বরে আক্রান্ত এক রোগী থেকে ওয়েস্ট নীল ভাইরাস সনাক্ত করেন বিজ্ঞানীরা। পরবর্তী কয়েক দশকে এই ভাইরাসটি পশ্চিম এশিয়া, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতে রোগ ছড়ায়। ১৯৯৯ সালে এই ভাইরাসটির দেখা পাওয়া যায় আমেরিকার নিউ ইয়র্কে। ওয়েস্ট নীল ভাইরাসটি তিনটি ভিন্ন পোষকের মধ্যে আবর্তিত হতে পারে- মশা, পাখি ও মানুষ।

ওয়েস্ট নীল ভাইরাস

এক গবেষণায় দেখা যায় আবহাওয়ার পরিবর্তনের সাথে ওয়েস্ট নীল ভাইরাসের দ্বারা জ্বরের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। ভারী বৃষ্টিপাত, উচ্চ আর্দ্রতা ও উষ্ণ তাপমাত্রা মশার বংশবিস্তারে গতি যোগায় ও তাদের প্রজনন কালকে দীর্ঘায়িত করে। সাথে সাথে মশার ভেতরে ভাইরাসের বৃদ্ধি বাড়িয়ে দেয় এমন আবহাওয়া। দুঃখজনক বিষয় হলো, অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এরকম স্যাঁতস্যাঁতে উষ্ণ, গুমোট বর্ষণের আবহাওয়া আরো ঘনঘন দেখা দেবে। কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য তাপখেকো গ্যাস বায়ুমন্ডলে বাড়তে থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরো দ্রুততর হতে থাকবে। ফলে মশাদের জন্য আবহাওয়া আরো আরামদায়ক হতে থাকবে, সাথে সাথে বাড়বে মশাবাহিত রোগের প্রকোপ।

বর্ধনশীল তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তিত ধরণ, মশার মাধ্যমে জিকা ভাইরাস বিস্তারে ঠিক কী ভূমিকা পালন করছে এটা পরিস্কার নয়। কোনো সংক্রমক রোগের বিস্তারে জলবায়ুর পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মানুষের ভ্রমণ সম্ভবত বড় ভূমিকা রাখছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, জলবায়ুর পরিবর্তন ভেক্টর ও পানিবাহিত রোগ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বদলে দেবে। ভেক্টর বলতে জীববিজ্ঞানে কোনো বাহক প্রাণী বোঝায় যা নিজে রোগ সৃষ্টি না করলেও রোগের জীবাণু এক পোষক থেকে অন্য পোষকে সংক্রমিত করে।

WHO বলছে পৃথিবীর গড় তাপমত্রা যদি ২-৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়ে তাহলে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে ৩-৫ শতাংশ। এই বর্ধিত ৩-৫% কয়েকশ মিলিয়ন মানুষের সমতুল্য। যেসব এলাকায় ম্যালেরিয়া সবসময় পাওয়া যায় সেখানে ম্যালেরিয়া-মৌসুমের স্থায়িত্ব আরো দীর্ঘতর হয়ে যাবে।

জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর সকল বাস্তুসংস্থানে প্রভাব ফেলার সাথে সাথে বিভিন্ন রোগব্যাধি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। বর্ধিত বৃষ্টিপাত মশার বংশবিস্তারের উপযোগী বদ্ধ-জলাশয়ের সংখ্যা বাড়াবে। ফলে ম্যালেরিয়া সহ রিফ্ট ভ্যালি জ্বর, ডেঙ্গু, জিকা সহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়বে বৈ কমবে না।

অন্যদিকে বন উজাড় ও কৃষিকাজের তীব্রতা বৃদ্ধিও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়াবে। মহাসাগরের তাপমাত্রা বিশ্ব তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়তে থাকবে। ফলে বিষাক্ত শৈবালের পরিমাণ বৃদ্ধি মানুষে রোগ সংক্রামণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

লেখাটা শেষ করতে চাই লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর একটি উক্তি দিয়ে। আমি কৃতজ্ঞতাভারে উদ্বেলিত, কিন্তু আমি এটাও অনুভব করছে ঘড়ির কাটা টিক টিক করে চলছে (পরিবেশ বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে)সত্য হলো- আপনি যদি পরিবেশ বিপর্যয়ে বিশ্বাস না করেন, তাহলে আপনি আধুনিক বিজ্ঞান কিংবা পরীক্ষা লব্ধ সত্যকেও বিশ্বাস করেন না। এখন খুব প্রয়োজন এ বিপর্যয় রোধে জনমত গড়ে তোলা।

তথ্যসূত্রঃ
১. Leonardo DiCaprio Uses Oscar Speech to Urge Action on Climate Change, লিসা ফ্রিডম্যান, ক্লাইমেট ওয়্যার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

২. Uganda’s Zika Forest, birthplace of the Zika virus, ব্রান্ট সোয়ালস ও ডেভিড ম্যাককেনজি, সিএনএন, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

৩. Climate change may have helped spread Zika virus, according to WHO scientists, অলিভার মিলম্যান, দ্যা গার্ডিয়ান, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

৪. Climate change and urbanization are spurring outbreaks of mosquito-borne diseases like Zika, লরেন গ্রুশ, দ্যা ভার্জ, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

৫. A planet of viruses, কার্ল জিমার, ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো প্রেস, ২০১১

featured photo: mx.usembassy.gov

“হাল ছেড়ো না বন্ধু”- আইনস্টাইন যেভাবে ‘আইনস্টাইন’ হয়ে উঠলেন

ফেব্রুয়ারি ১১ তারিখ, যেদিন মহাকর্ষ তরঙ্গের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, অনেকের মতো আমিও এ বিষয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠি। মহাকর্ষ তরঙ্গ বলে একটা জিনিস যে আছে তা প্রায় একশ বছর আগে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে বলে গেছেন। আবদুল গাফফার রনির “থিওরি অব রিলেটিভিটি” (অন্বেষা, ২০১৬) বইটি পড়ে ফেলি। লেখক সাবলীল ভাষায় এ তত্ত্বটির মূল ধারণাগুলোর সহজবোধ্য বর্ণনা দিয়েছেন। বইটি পদার্থবিজ্ঞানের বই হলেও বেশ উপভোগ্য, গাণিতিক সূত্রের ছড়াছড়ি নেই। এই জটিল বিষয়ে প্রাথমিক সাক্ষরতা লাভের জন্য বইটি বেশ চমৎকার।

আইনস্টাইন, যাকে বলা হয় বিজ্ঞানের পোস্টারবয়, বিজ্ঞানের রঙিন জগতের একজন তারকা, তিনি আরেকবার জিতলেন। তার তত্ত্বটিতে কী বলা হয়েছে, কিংবা মহাকর্ষ তরঙ্গ জিনিসটা আসলে কী- এসব বিষয় নিয়ে আমি কিছুই লিখবো না। কারণ বাংলা ভাষায় অনেকেই এ বিষয়গুলো নিয়ে খুব ভালো লিখছেন। আমার আগ্রহ হলো অন্য জায়গায়: আইনস্টাইন কীভাবে ‘আইনস্টাইন’ হয়ে উঠলেন, তার উপর।

আমরা যে শুনি, তিনি তৎকালীন নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানের ভিত নড়িয়ে দিয়ে নতুন ধরনের পদার্থবিজ্ঞান চালু করেছেন- এরকম বিদ্রোহী কি একেবারে শুরু থেকেই ছিলেন? তিনি কাজ করতেন কীভাবে? তার কাছ থেকে তরুণরা কী শিখতে পারেন?

শৈশবের আইনস্টাইন; image source: biography.com

যে কোনো বড়সড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কিংবা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পেছনে একটি প্রস্তুতির বিষয় থাকে। আমরা সেই বিরাট আবিষ্কার বা পরিবর্তন দেখে এতোটাই বিস্মিত হয়ে যাই, ঘটনার নায়কের প্রচলিত জীর্ণ-নিয়ম ভেঙে ফেলা বিদ্রোহের সাফল্যে এতোটাই উদ্বেলিত হয়ে পড়ি যে, পেছনের দীর্ঘ প্রস্তুতির পরিশ্রমটা চোখেই পড়ে না। আর সে প্রস্তুতি যে প্রচলিত রীতিমাফিকই হয়ে থাকে, সে কথাটাও ভুলে যাই।

অনেক দিন আগে কাল নিউপোর্টের ব্লগে এ প্রসঙ্গে একটি লেখা পড়ি যেখানে তিনি আইনস্টাইনের প্রস্তুতির উপর আলো ফেলেছিলেন। সেখান থেকে একটা গল্প এখানে বলবো।

আইনস্টাইনের এই কাহিনীটা প্রায় সবাই শুনেছেন। গল্পটা এরকম-আইনস্টাইন শিক্ষাগত জীবনে বিদ্রোহী ছাত্র ছিলেনগতানুগতিক পড়াশুনা তার ভালো লাগতো নাফলে পরীক্ষায় খারাপ নাম্বার পেতেনবিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শেষ হয়ে গেলোকিন্তু তখনকার শিক্ষায়তন তার প্রতিভা উপেক্ষা করে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিতে অস্বীকার করেফলে বেকার আইনস্টাইন অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা সর্বস্বান্ত হয়ে প্যাটেন্ট অফিসে ক্লার্ক হিসেবে নিচু পদের চাকরীতে যোগ দেন তবে চাকরী তার জন্য হিতেবিপরীত হয়ে দাঁড়ায়গতানুগতিক জ্ঞানচর্চার গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সাহসী ও মৌলিক চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পানপরবর্তীতে চিন্তাভাবনা তাবৎ পৃথিবীর পদার্থবিজ্ঞানকে বদলে দেয়

তবে বাস্তবতা এর চেয়ে জটিল ছিল আইনস্টাইন বিদ্রোহী ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তিনি স্কুলে ও এন্ট্রান্স পরীক্ষায় গণিত ও পদার্থবিদ্যায় সব সময়েই উচ্চ নাম্বার পেতেন। কলেজের পর আইনস্টাইনকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছিল। তবে অধ্যাপনার আবেদন করায় তাকে সেখানে নেয়া হয়নি- ঘটনা এমন নয়। তিনি গ্রাজুয়েশনের পর ইউনিভার্সিটি এসিস্টেন্টশিপ পদে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু পাননি।

ইউনিভার্সিটি এসিস্টেন্টশিপ মূলতঃ গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীর ডক্টরাল গবেষণা চালানোর সময় জীবিকা নির্বাহের আর্থিক উৎস হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাজুয়েট শিক্ষার ক্ষেত্রে যাকে বলা হয় গবেষণা সহযোগী বা রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট।

এমন না আইনস্টাইনের প্রতিভা অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। বরং আইনস্টাইন ‘অসামান্য প্রতিভার ছাপ’ রাখার মতো কোনো কাজই তখনো করেননি, তার কর্মজীবনের মাত্র শুরু তখন। গ্রাজুয়েশনের পর কৈশিক প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি যে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন সেটাও ছিল মাঝামাঝি মানের। বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগী হিসেবে কাজ না পাওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল একজন অধ্যাপকের নেতিবাচক সুপারিশ; যিনি আবার আইনস্টাইনকে পছন্দ করতেন না।

এই গল্পে যে কথা অনুপস্থিত তা হলো প্যাটেন্ট অফিসের ক্লার্ক থাকা অবস্থাতেও আইনস্টাইন তার ডক্টরাল ডিগ্রির জন্য গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার একজন উপদেষ্টাও ছিলেন। ডক্টরাল-উপদেষ্টার সাথে আইনস্টাইন নিয়মিত একটি পাঠচক্রে দেখা করতেন, লেখালেখিও করতেন একে অপরকে (ছবি দ্রষ্টব্য)।

যে বছর আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বটি প্রকাশ করেন (১৯০৫), এই বছরেও তিনি অভিসন্দর্ভ জমা দেন এবং PhD ডিগ্রী পেয়ে যান। এর পরেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জন্য সুযোগ পেয়ে যান ও তার একাডেমিক কর্মজীবন শুরু হয়।

অন্যভাবে বলা যায়, আইনস্টাইনকে পিএইচডি গবেষণা চালানোর পাশাপাশি একটা চাকরী করতে হতো জীবিকা নির্বাহের জন্য। পিএইচডি গবেষণার পাশাপাশি চাকরী করা খুবই ঝামেলার একটা ব্যাপার এবং গবেষকের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। তবুও আইনস্টাইনের স্নাতক পড়াশুনা থেকে শুরু করে অধ্যাপনার কাজে নিয়োগ হওয়ার সময়টা মোটামুটি রীতিমাফিক পথ ও প্রতিষ্ঠিত সময়সীমা ধরেই চলেছে।

এই গল্প বলার পেছনে কারণ হলো এখান থেকে আমাদের একটা (বদ)অভ্যাস ধরা পড়ে, আমরা উদ্ভাবক-আবিষ্কারকদের আগন্তুক হিসেবে দেখতে ভালোবাসি। আগন্তুক, কারণ তারা প্রথাকেন্দ্রীক প্রতিষ্ঠানের বাঁধন ছিড়ে মুক্ত মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হন, পৃথিবীকে বদলে দেন। আগন্তুক, কারণ তারা প্রচলিত নিয়ম ভাঙেন, অনেকটা হঠাৎ করেই নতুন কিছু তৈরি করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো বৈপ্লবিক আবিষ্কার বা ভিন্ন ধর্মী কাজ করতে হলে এর আগে রীতিমাফিক প্রশিক্ষণ বা তালিমের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে আসতে হয়।

আইনস্টাইন মেধাবী ও মৌলিক চিন্তার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ গ্রাজুয়েট শিক্ষা সম্পূর্ণ করার আগ পর্যন্ত তিনি যথেষ্ট পদার্থবিজ্ঞান জানতেন না; পদার্থবিজ্ঞানকে সামনে এগিয়ে নেয়া ছিল আরো পরের ব্যাপার। অন্যান্য আবিষ্কারকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্টিভ জবস প্রথমে অ্যাপল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে বের হয়ে আসেন, দশ বছর অন্যান্য ব্যবসা করে আবার অ্যাপলে ফিরেন।

দ্বিতীয়বার অ্যাপলে ফিরে আসা ছিল তার ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়ার ঘটনা- এর পর থেকে তিনি সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠতে থাকেন। কারণ মাঝখানের দশ বছর তিনি কঠিন সময় পার করেছেন ব্যবসা বিষয়ে ওস্তাদ হতে, দরকারি বিভিন্ন দক্ষতা শানিয়ে নিতে। এ দীর্ঘ সময় রূঢ় বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে তৈরি করার পরেই কেবল অ্যাপল-২ তে তার মেধা প্রযুক্তির বাজার বদলে দেয়ার একটি ক্ষেত্র পায়।

আইনস্টাইন প্রথমেই বিপ্লবী বিজ্ঞানী হিসেবে আবির্ভূত হননি। তাকে নিজেকে তৈরি করে নিতে হয়েছে, স্নাতকের পর পিএইচডি করতে হয়েছে প্রচলিত রীতি অনুসারেই। যে কোনো যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্পর্কে এটা তিক্ত সত্য। আমরা যদি অন্যান্যদের পৃথিবী বদলানোর জন্য উৎসাহিত করতে চাই, প্রথমে তাদেরকে ভেতর থেকে ভিত শক্ত করার জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করতে হবে।

এক্ষেত্রে সবচাইতে কৌশলের জায়গা হলো প্রাতিষ্ঠানিক প্রথা, রীতি বা ঐতিহ্যমতো প্রশিক্ষণ বা তালিম নিয়ে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি নিজের মধ্যে ভিন্নভাবে ভাবার স্ফুলিঙ্গ বাঁচিয়ে রাখা। নতুন কিছু করা, নতুনভাবে চারপাশকে দেখার ইচ্ছেটা একটি দীর্ঘ সময় ধরে জিইয়ে রাখা, যতক্ষণ না সেই ভিন ধারার কাজটি করার জন্য ‘যথেষ্ট-ভালো’ একটি পর্যায়ে যাওয়া না যায়। কবীর সুমনের গানের কলি মনে পড়ে-

বন্ধু তোমার ভালোবাসার স্বপ্নটাকে রেখো,/ বেঁচে নেবার স্বপ্নটাকে জাপটে ধরে থেকো,

দিন বদলের স্বপ্নটাকে হারিয়ে ফেলো না,/ পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনো গেলো না,

…হাল ছেড়ো না…

featured image: nytimes.com 

দগ্ধ পৃথিবীঃ ২২০০ খ্রিষ্টাব্দ

 

জলবায়ুর পরিবর্তন পরাস্ত করেছে মানুষের দাপট। মাত্র পঞ্চাশ কোটি পৃথিবীবাসী অবশিষ্ট উত্তরের জীবন-তরীতে। কীভাবে বেঁচে আছে তারা?

অভেদ্য, নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার সুউচ্চ বহুতল ভবনের ৩০০ তলায় ক্ষুদ্র ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে তাকাই। মাটির আধামাইল উপরে আমার ফ্ল্যাট। এখান থেকে মনোমুগ্ধকর বীথিদৃশ্য চোখে পড়ে। বেশ কিছু বাংলো, ছিমছাম উঠান, পান্না-সবুজ রাঙা খেলার মাঠ, সূর্যের আলো ঝিলিক দেয়া সুইমিং পুল, আর দীর্ঘ বেলাভূমির ওপারে তৈরি কিছু প্রাসাদসম অট্টালিকা। দৃশ্যগুলো লস এঞ্জেলস শহরের স্মৃতি মনে করিয়ে আকুল করে দেয়। শহরটি এখন অস্তিত্বহীন, যেখানে শান্তিপূর্ণ সময়ে বড় হয়েছেলিন আমার দাদার-দাদা, যখন নবজাতকের জন্মদান কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো না, আর সাতশ’ কোটি মানুষ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতো পৃথিবী বুকে।

এখন পৃথিবীতে আমরা মাত্র পঞ্চাশ কোটি মানুষ বেঁচে আছি, জলবায়ুর পরিবর্তন এ গ্রহের ধারণ ক্ষমতা (carrying capacity) কমিয়ে এনেছে। একটি পরিবেশে জনসংখ্যা সর্বোচ্চ কতটুকু বাড়তে পারবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া। এর বাইরে যাওয়া যাবে না। বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস লাভলক যাকে বলেছিলেন জীবন-তরী, এখন তার মাঝেই উত্তরমেরুর দূরপ্রান্তে বসবাস করছে বেশিরভাগ মানুষ। একসময় এখানে ছিল কানাডা, চীন, রাশিয়াসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো। জলবায়ুর পরিবর্তন একটু হলেও সহনশীল এদিকটায়। একসময় এখানেই কোটি কোটি মরিয়া উদ্বাস্তুকে স্থান দিতে নিমেষেই তৈরি করা হয়েছিলো অনুপযোগী শহর।

জানলার বাইরে যে দৃশ্য আমি ‘দেখছি’ তা আসলে বিভ্রম। আমার আবেগী মস্তিষ্কে তার একটি কোমল ও অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কঠোর বাস্তবতায় অবিচলিত থাকা যায় না। যতদূরে দৃষ্টি যায় চোখে পড়ে কাঁচ দিয়ে ঘেরা সভ্যতার উচ্ছ্বিষ্ট। বুলেট ট্রেনকে পারাপার করার জন্যে ফিতার মতো রাজপথ ঘিরে আছে এই প্রকাণ্ডপুরীকে। আকাশভেদী কয়েক শত তলা উঁচু ভবন, যেখানে ঠাঁসাঠাসি করে বসবাস করছে কোটি কোটি মানুষ। গ্রীনহাউসের ভেতর বিস্তৃত জমিতে রাসায়নিক-পুষ্টিতে বাড়ছে ফল-মূল-শাক-সবজি। চরে বেড়ানো গবাদিপশু কিংবা বসন্তের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে হেঁটে বেড়ানোর জন্য কৃত্রিম গ্রামীণ পরিবেশ।

ভীষণ-বিপর্যয়ের ভূকম্পীয় আঘাতের আগে মানুষের চলাচল ছিল বন্ধনহীন। মুক্তবায়ুতে তারা নিঃশ্বাস নিতে পারতো। ঘুরে বেড়াতে পারতো জঙ্গলে। বাচ্চাদের বল খেলা দেখতে পারতো মাঠে। বিস্তৃত ভূমিগুলো এখন নিষিদ্ধ এলাকা। সে অঞ্চলে বিভিন্ন রোগ ও দূর্যোগের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান। প্রবল বৃষ্টির উপদ্রব সাথে নিয়ে ঝড়ো হাওয়া ঘণ্টায় শত কিলোমিটার বেগে আর্তনাদ করে বেড়ায়। বৃষ্টি না থাকলে রুক্ষ ধুলি-ঝড় হামলে পড়ে। যেখানে একসময় ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মরুভূমি থেকে গম্ভীর গুড়গুড় শব্দে ভূমি-সুনামি ঢেকে দেয় বিশাল অঞ্চল। বন্য-আবহাওয়া যখন খানিকটা বিরাম নেয়, তখন দাহক সূর্য অবিরত পুড়িয়ে দেয় বায়ুমন্ডলকে। দিনের মাঝভাগে তাপমাত্রা উঠে যায় ১৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইটেরও ওপরে। বিশেষ-দেহবর্ম ও অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া তখন অসম্ভব হয় যায়।

আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বদলে গেছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় ধর্মীয় ও সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কর্তৃত্ব করতো। এখন তা ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ, কারণ পৃথিবীতে ঐ অঞ্চলগুলো এখন আর নেই।

উপরের কথা হয়তো কোনো রোগীর জ্বরের ঘোরে দুঃস্বপ্নদুষ্ট প্রলাপ মনে হতে পারে। তবে এখন থেকে তিন হাজার বছর আগেও জলবায়ুর পরিবর্তন অগ্রসর সভ্যতা পতনের সূচনা হিসেবে কাজ করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে দেড়শ বছর ধরে ঘটে চলা ভূমিকম্প, খরা ও দূর্ভিক্ষের মতো দূর্যোগ-পরম্পরা নির্ধারণ করে দিয়েছিল পূর্ব-ভূমধ্য অঞ্চলে শেষ ব্রোঞ্জ যুগে টিকে থাকা রাজ্যগুলোর ভাঙ্গনের গতিপথ। এখন যেখানে রয়েছে গ্রীস, ইসরায়েল, লেবানন, তুরস্ক ও সিরিয়া। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা নিদর্শন অনুযায়ী পৃথিবীর ঐ অঞ্চল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রয়োগিক উন্নতির স্পন্দনের মধ্য দিয়ে গেছে তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে। প্রাচীন মাইসেনিয়া, মিনোয়া থেকে হিট্টাইট, অসিরিয়া, সমাজ ছিল সাইপ্রিয়ট ও মিশরীয়দের পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। তারা চিকিৎসক, সংগীতজ্ঞ ও কারিগরদের সেবা বিনিময় করতো। বিকশিত-বাণিজ্যপথে ব্রোঞ্জ তৈরিতে দরকারী টিনের মতো পণ্যদ্রব্য, বিভিন্ন মালামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদও বিনিময় করতো।

তবে ২০১২ সালের একটি গবেষণায় খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে ভূমধ্য সাগরের পৃষ্ঠীয় তাপমাত্রা খুব দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাবার খবর উঠে আসে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলছে এ ঘটনা তীব্র খরাকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে দেখা দেয় খাদ্য সঙ্কট, গণহারে দেশত্যাগ, কৃষক-বিদ্রোহ। পরিণামে এক সময়ের জৌলুশপূর্ণ ব্রোঞ্জযুগীয় সমাজের কেন্দ্রীয় শহরগুলো বহিরাগত সৈন্যবাহিনীর আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যে বাহিনীর সেনারা সম্ভবত নিজেরাই খরা-পিড়ীত স্বদেশ ছেড়ে পলায়ন করে। বিনাশ হয় সংস্কৃতির, ভাষার ও প্রযুক্তির। ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় প্রথম অন্ধকার যুগ। হয় ব্রোঞ্জ যুগের পতন। এক সময়ের পরিশীলিত ও সূক্ষ্ম সমাজের অস্তিত্ব নাশ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার পুননির্মাণ ও পুনরুদ্ধারে করতে চলে যায় কয়েক শতাব্দী।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ও 1177 BC: The Year Civilization Collapsed বইয়ের লেখক এরিক এইচ ক্লিন বলেন –

“তখনকার সময় সেটি ছিল একটি বিশ্বায়িত সমাজ, প্রত্যেকেই অন্যের সাথে সংযুক্ত ছিল, নির্ভর করতো

একে অপরের ওপর। ফলে আপনারা একটা ডমিনো প্রভাব লক্ষ্য করবেন, একটি সংস্কৃতি দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়লে তা ধারাবাহিকভাবে বাকিদের ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। মিশর টিকে যায় কারণ তারা প্রস্তুতি নিতে তুলনামুলক সক্ষম ছিল। কিন্তু সে বিজয় ছিল বহু বিপর্যয়ের, কারণ তাদের সকল বাণিজ্য-অংশীদার হারিয়ে গেছে। এক শতাব্দীর ভেতর তাদের সকল জানা বিশ্বের পতন হয়েছে।”

এর আগে সতের’শ শতাব্দীর দিকে পৃথিবীর বুকে যখন ৫০ কোটি মানুষ বসবাস করতো সে সময়ে ফিরে তাকালে শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যায়। কাকতালীয়ভাবে তখনো ছিল জলবায়ু-প্ররোচিত ভীষণ অভ্যূত্থান-কাল। একইসাথে সময়টাকে ধরা হয় আধুনিক ইউরোপের ভোর। ভাবুন নিউটন, রেমব্রানৎস, গ্যালিলিও কিংবা ষোড়ষ লুইসের কথা। তখন যা ঘটেছিল আর আজকে আমরা যেরকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তাদের মধ্যে মিল লক্ষ্যণীয়। ইতিহাসবিদরা সে সময়টাকে বলেন সর্বজনীন সংকটের যুগ, কারণ সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমাগত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রিশ বছরের যুদ্ধ, চীনে মিং রাজবংশ ও ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট রাজতন্ত্রের পতন।

তার উপরে সময়টা ছিল সেই শতাব্দী, যখন শিশু-তুষার যুগ সবচেয়ে তীব্র হয়ে এই গ্রহের শীতলীকরণে নের্তৃত্ব দিচ্ছিল। এর প্রভাব উত্তর-গোলার্ধে বসবাসকারী মানুষজন টের পাচ্ছিল ভালোভাবেই। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেফরি পার্কারের মতে সতের’শ শতাব্দীর বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পেছনে আবহাওয়ার ভীষণ পরিবর্তনকে প্রভাবক হিসেবে পাওয়া যাবে। শীতল আবহাওয়া, ঝড় তৈরি করা এল-নিনোর বাড়তি পর্যায়- যার পরিণাম বন্যা, কৃষি বিপর্যয়, খরা ও দূর্ভিক্ষ। যার পরিণাম সামাজিক অস্থিরতা, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ। টানা সংকট স্পেন, রাশিয়া ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো কর্তৃত্বশালী রাজ্যগুলোকে দূর্বল করে দেয়। মৃত্যু হয় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার।

ক্লাইনের ভাষায়, “অতীতের সমাজের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তারা টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিমাতার দৈবানুগ্রহের উপর নির্ভরশীল ছিলে। (তার বিপরীতে) আমরা নিজেদের পতনের জন্য দায়ী হবো কিনা সেটা দেখা এখনো দেখার বাকি আছে। আমাদের পূর্বে যেসব সভ্যতা এসেছিল শেষ পর্যন্ত ধ্বসে গেছে। আমরা কেন ভাবছি যে আমরা নিরাপদ?”

আমরা পরিবেশ-প্রতিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি করবো, তার ফলে পরিবর্তিত জলবায়ুতে প্রথমে স্বপ্নের মতো করে বলা বিজ্ঞানী লাভলকের কল্পিত জীবনতরীতে নিজেদেরকে যেকোনোভাবে বাঁচাতে পারবো এমন চিন্তা করাটা এক ধরনের ঔদ্ধ্যত্য। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন গাণিতিক মডেল অনুযায়ী চলতি শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাবে অন্তত চার ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিংবা তার চেয়েও বেশি। এ অবস্থাকে গবেষক কেভিন এন্ডারসন বর্ণনা করেছেন “যে কোনো সংগঠিত, ন্যায়নিষ্ঠ ও সভ্য বিশ্ব-সমাজের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।”

প্রিন্সটনের এন.পি.ও. ক্লাইমেট সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি কুলেন বলেন, “মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে কোনো তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা আমরা পরিলক্ষিত করব- যে তাপমাত্রার জন্য আমরা কোনোভাবেই অভিযোজিত নই।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের জন্য কল্পনা করা কঠিন যে পৃথিবীর একটা বিশাল অঞ্চল মানব-বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।”

তাপমাত্রা চার ডিগ্রী বাড়লে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র কিছু অঞ্চল থেকে গণদেশান্তর দেখতে পাবো। আমাজন, ভারতের কিছু অঞ্চল ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চল এর আওতায় পড়বে। সাগরতল উচ্চতায় চার ফুট কিংবা তার চেয়েও বেশি বাড়বে। টোকিও থেকে মুম্বাইয়ের মতো উপকূলীয় শহর হিংস্র ঝড়ের বন্যায় ভেসে যাবে। বাংলাদেশ ও ফ্লোরিডার মতো নিচু অঞ্চলগুলো পানিতে অর্ধনিমজ্জিত হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ হবে বাস্তুচ্যুত।

অন্যদিকে মধ্য চীন থেকে শুরু করে ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চল, আফ্রিকা, আস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও

ল্যাটিন আমেরিকার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলো এ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশুষ্ক হয়ে পড়বে। সেসব এলাকায় ভূপৃষ্ঠের উপরিতলে যেটুকু পানি ছিল তা শুষে নিবে। ধ্বংস হবে ফসল, যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অজস্র গবেষণা ও তাদের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীবাসীর অর্ধেক, অন্তত চার’শ কোটি মানুষ পানির দুঃসহ সংকটে আর অনাহারে ভুগবে।

ঝলসে দেয়া তাপীয় প্রবাহ আর ভয়াবহ অগ্নিকান্ড খাদ্য-দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও গণদেশান্তর উসকে দেবে। দ্রুত বেড়ে গিযে কীট-পতঙ্গেরা টাইফাস, কলেরা, পীতজ্বর, ডেঙ্গু ও ম্যালিরিয়াসহ দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত থাকতে সক্ষম জীবাণু, এমনকি একেবারে নতুন জীবাণু দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। বিস্তার ঘটবে অজস্র মহামারীর, যা পৃথিবীকে আবার ব্ল্যাক ডেথের কথা মনে করিয়ে দিবে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে প্লেগ-মহামারী ইউরোপের প্রায় ২০ কোটি মানুষ মেরে ফেলেছিল। এক সময়ের জমজমাট মহানগরগুলো পরিণত হবে নিস্তেজ ভূতুড়ে শহরে। ভেবে দেখুন ম্যানহাটন, টোকিও, সাও পাওলো পানির নিচে চলে গেছে। এলোমেলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো কলোনিতে বেঁচে থাকছে কয়জন টিকে যাওয়া কষ্টসহিষ্ণু মানুষ যারা অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ জায়গায় খুব সাবধানে বেঁচে থাকছে গল্পের ভ্যাম্পায়ারের মতো। কেবল রাত হলেই বাইরে আসছে যখন তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। গড় তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী বেড়ে গিয়েই স্থিতিশীল হবে না, আরো বাড়বে। ইতিমধ্যে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে নিঃসরিত হয়েছে সেগুলোর তাপের অধিক ধারণক্ষমতার কারণে জলবায়ু একশো বছরেও নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে না। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জেমস হ্যানসেন বলেন, “বায়ুমণ্ডলে ইতিমধ্যে নিঃসরিত গ্যাসের জন্যে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হবে তার খুব সামন্যই আমরা অনুভব করছি। আরো গ্যাস বায়ুস্তরে ছড়াবে, কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর বিশাল জাড্যতা রয়েছে বলে তা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয় না।” মানব সভ্যতার বেশিরভাগকে বিদায়-চুম্বন জানানোর আগ পর্যন্ত এই গ্রহ তাই ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকবে। চলমান জলবায়ু পরিবর্তনে চক্রাকারে যোগাতে থাকবে আরো বেশি ইন্ধন।

দ্বিবিংশতম শতাব্দীতে যখন আমরা প্রবেশ করব, পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত ক্রান্তীয় রেইন ফরেস্ট মরু-আবৃত হয়ে পড়বে। ছোট ছোট বনসমূহ দাবানলের রোষে রুষ্ট হবে। বৈজ্ঞানিক জার্নাল সায়েন্সে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জীববিজ্ঞানী রডলফ ডিরাজো ও সহকর্মীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আমরা এই পৃথিবীর ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির প্রান্তে আছি, যা পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতীর মাঝে ৯০ শতাংশকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে। পৃথিবীর বিষুবীয় এলাকায় যে সব পশু-পাখিরা ঘুরে বেড়ায় তারা হারিয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়া পুনরায় মনুষ্যবিহীন গনগনে মরুভূমিতে পরিণত হবে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলি- হাওয়াই থেকে ফিজি, চলে যাবে সাগরতলে।

এত কিছুর পরেও ইতিহাস আমাদের প্রজাতীর বেঁচে থাকার জন্য একটা পথ দেখায়। পার্কার তার তথ্যবহুল গবেষণার বিশ্লেষণে এক চমকপ্রদ উপসংহার টেনেছেন। সপ্তদশ-শতাব্দীর বঞ্চনা কল্যাণ-রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দেয়, যা উনবিংশ শতাব্দীতে সকল আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর রাষ্ট্রসমূহের মূল-বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উল্লেখ করেন, “সপ্তদশ-শতাব্দীর মতোই একবিংশ-শতাব্দীতেও ব্যাপক মাত্রায় বিপর্যয় সামলাতে হলে যে সম্পদ লাগবে তা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই ব্যবস্থা করতে পারবে।”

আগামীর মহাবিপর্যয়ের চিত্র কল্পনা করে অনেকে যে শঙ্কিত, সে তুলনায় আমরা মানুষ প্রযুক্তিতে অনেক-উন্নত। আশা করা যায়, সামাজিকভাবে পরিশীলিতও বটে। তাই জলবায়ু বিপর্যয় বর্বরদের মতো মোকাবেলা না করে মনুষ্যপ্রজাতির বেঁচে যাওয়া সদস্যরা কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত খাবার খেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের উঁচু ভবনের মাঝে ভিড় করবে, ভূমি থেকে বহু উপরে যেখানে তারা পুনর্বার তৈরি করবে পৃথিবীর নতুন সংস্কৃতি।

তথ্যসূত্র

মূল লেখাঃ Scorched Earth, 2200 AD by Linda Marsa. Published in Aeon (online magazine). 10 February 2015.

লেখক পরিচিতিঃ লিন্ডা মার্সা ডিসকভার ম্যাগাজিনের অবদানকারী-সম্পাদক, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলসের লেখক প্রোগ্রামের শিক্ষক ও ২০১৩ সালে প্রকাশিত Fevered: Why a Hotter Planet Will Hurt Our Health বইটির লেখক।

নিমগ্নতার সুখ

আমরা জীবনে সুখের হরিণের পেছনে ছুটে বেড়াই। গড়পড়তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-লেখক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ধর্মবেত্তা-দার্শনিক সকলেই সুখ পাখিটা ধরতে চায়। তবে যারা সুখ জিনিসটা কী তা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের অনুসন্ধানটা ভিন্ন। তারা সুখকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। এ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান হয়তো বলবে এন্ডরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হলে মানুষ সুখানুভূতি পায়, তবে তারপরও কাজের সাথে সুখানুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এক জন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

কখনো কি এমন কোনো কাজে ডুবে গিয়েছিলেন যে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন? বেলা গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা হয়েছে টের পাননি? কিংবা রাতে খাবার পর কাজে বসে হঠাৎ টের পেয়েছেন যে ভোর হয়ে গেছে? কাজে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, সময় পার হবার অনুভূতি লোপ পেয়েছিল, ক্ষুধা অনুভব করেননি? এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই একবার না একবার হয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতের কাজটি চ্যালেঞ্জিং আর আগ্রহোদ্দীপক কিছু হয়ে থাকে।

টানটান উত্তেজনাপূর্ণ কোনো খেলা দেখার সময়েও এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে, অনেক সময় মজার অথচ জটিল কোনো গেম খেলার মধ্যে ডুবে গেলেও এ অবস্থা তৈরি হয়। অনেক প্রোগ্রামার রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ রাতে সাধারণত অন্য কেউ কথা বলে না, ডাক দেয় না, বিরক্ত করে না। তখন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো সমস্যা সমাধানে কাটিয়ে দিতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফ্লো’ (Flow)। বাংলায় একে আমরা নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা নিমগ্নতা বলতে পারি।

এখানে নিমগ্ন দশার সাথে সুখের সম্পর্কটা কী? এ প্রসঙ্গে ফ্লো তত্ত্বের জনক চেক মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাইয়ের গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করি।[১] ১৯৫৬ সালে এক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান উল্লেখ করেন যে, তারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত সুখী (গ্রাফ দ্রষ্টব্য)। তখন থেকে কয়েক বছর পরপর নিয়মিত এ জরিপটি করা হয়েছে। দেখা গেছে ১৯৫৬ সালের পরে আমেরিকানদের গড়পড়তা আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়লেও ‘সুখী’ আমেরিকানদের অনুপাত বাড়েনি। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নীচে আয় থাকলে তা অবশ্যই দুঃখের কারণ হবে। কিন্তু আয় অনেক বাড়লে সুখানুভূতি বাড়বে এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অধিক উপার্জন মানুষকে অধিক সুখী করে তুলতে পারে না।

চিত্রঃ আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সুখের সম্পর্ক।

২০০৫ সালে আমেরিকানদের গড় ক্রয় ক্ষমতা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সুখী মানুষের অনুপাতের কোনো পরিবর্তন হয়নি।[২] ছোট কালো বিন্দু দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে। বড় চতুষ্কোণ বিন্দু দিয়ে সুখী মানুষের অনুপাত বোঝানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষিতে মিহাই সুখ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা কি আসলেই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি? এটিই ছিল তার অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। তিনি প্রথমে সৃজনশীল ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিল শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানুষজন। তাদের সাক্ষাৎকারে যখন তারা নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে অন্যরকম ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেন তখন বার বার একটি অনুভূতির কথা উঠে আসে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি উচ্ছসিত আনন্দের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। সৃজনশীল কাজটি সহজে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় এ আনন্দময় দশাটি তৈরি হবার কথা উঠে আসে তাদের সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি মিহাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজের মধ্যে থাকা

অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি কেমন সেই তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন। তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পেজার নামক একটি যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পেজার মূলত মোবাইল ফোনের পূর্বপুরুষ। অংশগ্রহণকারীদের নিত্যদিনের কাজের মাঝে বিভিন্ন সময়ে এ পেজারটি বেজে উঠতো। অংশগ্রহণকারী ঐ মুহূর্তে কী কাজ করছেন, কাজ করতে কেমন লাগছে, কাজটি কোথায় করা হচ্ছে, কাজ করার সময় কী নিয়ে চিন্তা করছেন এসব তথ্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন।

এ ছাড়াও আরো দুটি পরিমাপ করা হয়। প্রথমত, অংশগ্রহণকারী যে কাজটি করছেন তা কতটুকু কঠিন। দ্বিতীয়ত, কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী কতটুকু দক্ষ। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন সময়ে করা বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মিহাই

একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছে দিনভর কাজ কতটুকু সহজ বা কঠিন মনে হয় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য তার কতটুকু দক্ষতা আছে, এ দুটি পরিমাপের মাঝামাঝি একটি বিন্দু ঠিক করা যায়। এ কেন্দ্রবিন্দু থেকে বোঝা সম্ভব কখন একজন অংশগ্রহণকারী ‘মগ্নতা‘ দশায় প্রবেশ করবেন।

চিত্রঃ কাজ কতটা চ্যালেঞ্জিং ও মানুষের দক্ষতা কতটুকু এবং এর সাথে সম্পর্কিত অনুভূতির চার্ট।

যখন আমাদের হাতের কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সে কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে তখন আমরা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করি। আর যখন কাজটা খুব সহজ হয় আর কাজের জন্য দরকারী দক্ষতা পর্যাপ্ত থাকে, তখন আমরা বেশ আরামে থাকি। তবে যখন কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয় আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকারী দক্ষতাও উপস্থিত থাকে, তখন আমরা মগ্নদশায় প্রবেশ করি। এই নিমগ্ন অবস্থায় কাজের চ্যালেঞ্জকে টক্কর দেবার সাথে সাথে একধরনের ভাবাবেশ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

তখন ক্ষুধা, সময় ইত্যাদির অনুভূতি থাকে না, আমরা ডুবে যাই কাজের ধারায়, লাভ করি চ্যালেঞ্জ খণ্ডনের তৃপ্তিময় আনন্দ। যখন হাতের কাজটি খুবই সোজা, আর সেটি করতেও তেমন কোনো দক্ষতা লাগে না, তখন মানুষ অনীহা/ঔদাসীন্য/বিরক্তি অনুভব করে। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার সময় মানুষ এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। (ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে ফিড ঘাঁটার সময়ে এরকম বোধ করি।)

‘নিমগ্ন’ দশার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা যে কাজটি করছি তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ থাকে ঐ কাজে। এছাড়া এ অবস্থার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[৩] যেমনঃ

১. নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে তৃপ্তিময় ভাবাবেশের অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।

২. মনের ভেতরে স্বচ্ছতার অনুভূতি থাকে। আপনি জানেন কী করা দরকার। আর আপনি কাজটা ঠিক মতো করছেন কি না, তা নিজে থেকেই বুঝতে পারেন।

৩. আপনি জানেন কাজটি শেষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কর্মসম্পাদনের দরকারী দক্ষতা আপনার আছে।

৪. নিজের সম্পর্কে কোনো খেয়াল থাকে না। আপনার সকল উদ্বেগ ও ভাবনা দূরে সরে যায়।

৫. আপনি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আর কেবল বর্তমানে হাতের কাজটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।

৬. কাজের মধ্যে একটা প্রণোদনা লুকানো থাকে। নিমগ্ন অবস্থাটি যে কাজের মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন, কাজ করাটাই তখন পুরষ্কার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানুষের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা সীমিত। মিহাই উল্লেখ করেন, মানব মস্তিষ্ক সেকেন্ডে ১১০ বিট তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই পরিমাণটি বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু নিত্যদিনের ছোট ছোট কাজে অনেক তথ্য প্রয়োজন হয়। যেমন কথার অর্থ উদ্ধার করতে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ বিট তথ্য লেগে যায়। এ কারণে কারো সাথে কথা বলার সময় অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা যায় না। ক্ষুধাবোধ, সময়জ্ঞান এগুলোও তথ্য যা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুপথের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে

এ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই না। নিমগ্ন অবস্থায় আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পুরোটাই ব্যবহৃত হয় হাতের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। তাই নাওয়া-খাওয়া ও সময়ের কথা আমাদের খেয়াল থাকে না। এরকম অবস্থায় দেহের অনুভূতি বোঝার জন্য কোনো মনোযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

নিমগ্নতা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এ দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে কাজের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] Flow, the secret to happiness. TED-talk by Mihaly Csikszentmihalyi.http://ted.com

[২] Happiness data from National Opinion Research Center General Social Survey; income data from Historical Statistics of the United States and Economic Indicators.

[৩] What Is Flow? Understanding the Psychology of Flow.https://www.verywell.com

সমুদ্রের ঘ্রাণ

মেঘমালা আপনাকে সমুদ্রের কথা মনে করিয়ে দেবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু সমুদ্র না থাকলে মাথার উপরে খুব কম সংখ্যক মেঘই ভেসে বেড়াতো। কারণ সুবিশাল সমুদ্র জুড়ে অজস্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব রয়েছে যারা ডাই-মিথাইল সালফাইড (ডিএমএস) নামক গ্যাস তৈরি করে। সুনির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ডিএমএস মেঘ গঠন শুরু করতে পারে। এই ক্ষুদ্র জীবদের মধ্যে আছে শৈবাল ও অণুজীব। এরা অবশ্য মেঘ তৈরির জন্য ডিএমএস তেরি করে না। ডিএমএস আসলে ডাই-মিথাইল-সালফোনিও-প্রপিওনেট (ডিএমএসপি) নামক বিপাকীয় অণুর উপজাত। সম্ভবত ভেসে বেড়ানো কিংবা প্রতিরক্ষা কিংবা উভয় কাজেই ফাইটোপ্লাঙ্কটনের ডিএমএসপি দরকার।

সমুদ্রের একটি নিজস্ব ঘ্রাণ আছে। এই ঘ্রাণ কখনো কখনো অপ্রীতিকর কটু গন্ধ বলে মনে হতে পারে। এ ঘ্রাণের জন্য বায়ুবাহিত ডিএমএস দায়ী। সম্প্রতি সাগরের ফাইটোপ্লাঙ্কটন এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির (Emiliania huxleyi) মাঝে এ ঘ্রাণের পেছনে যে উৎসেচক বা এনজাইম দায়ী তা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ডিএমএসপি লাইয়েজ ১। এটি শৈবালের উৎসেচক যা ডিএমএসপি-কে ভেঙে ফেলে। ফলাফল হিসেবে সুগন্ধী ডিএমএস তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে।

সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো অধিকাংশ ফাইটোপ্লাঙ্কটন হলো এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। এরা সমুদ্রের বিশাল অঞ্চল জুড়ে সবুজ আস্তরণ তৈরি করে। ব্লুম নামে পরিচিত এ আস্তরণ মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। ক্রান্তীয় ও সাবআর্কটিক উভয় সাগরজলে এদের উপস্থিতি সাবলীল। এসব বাস্তুসংস্থানে খাদ্যজালের গুরুত্বপূর্ণ অংশও এ ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলো। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি এককোষী ইউক্যারিয়টিক (নিউক্লিয়াস বিদ্যমান এমন প্রকৃতকোষী) ফাইটোপ্লাঙ্কটন যাদের চারপাশে কোক্কোলিথ নামক এক ধরনের আবরণ রয়েছে। কোক্কোলিথের নামকরণ করেছিলেন ব্রিটিশ তুলনামূলক দেহসংস্থানবিদ থমাস হাক্সলি (১৮২৫ – ১৮৯৫)।

2চিত্রঃ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। বাইরে কোক্কোলিথের আবরণ দেখা যাচ্ছে।

কোক্কোলিথ ক্যালসাইট নামক খনিজ দিয়ে তৈরি। এদের নির্মাণকৌশল খুব সূক্ষ্ম ও অসাধারণ। বেশিরভাগ সময়েই এরা রঙহীন ও অস্বচ্ছ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির কোক্কোলিথ ক্যালসাইটের চাকতি দিয়ে তৈরি। এ বিষয়টি সর্বপ্রথম বর্ণনা করেন হাক্সলি ও সিজার এমিলিয়ানি নামক আরো একজন ইতালীয় অণুজীববিজ্ঞানী। তাদের দু’জনের নামানুসারেই এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি-র নামকরণ করা হয়েছে। নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় ক্যালসাইটের খোলটি প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা রাখে। কোক্কোলিথ হয়তো অনান্য বড় প্রাণীর ভোজে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করার একটা পদ্ধতি। অথবা এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, এমনকি হয়তো ক্ষতিকর অতিবেগুণী রশ্মির বিরুদ্ধে ভৌত বাধা হিসেবেও কাজ করে। এরা হয়তো ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলোকে ভাসিয়ে রাখার জন্য জরুরী। অথবা গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী প্রজাতিগুলোর সালোকসংশ্লেষণের আলো যোগাড়ের একটি পদ্ধতিও হতে পারে। এই ক্যালসাইট খোলগুলো প্রতিনিয়ত দেহ থেকে স্খলিত হয়ে সাগরতলে ডুবে যায়। গভীর সাগরে জমা হওয়া তলানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এ ক্যালসাইটগুলো। ডোভার নগরীর শ্বেত পর্বতগাত্র দীর্ঘ ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে জমা হওয়া এরকম তলানীর উদাহরণ।

3চিত্রঃ ডোভার নগরের শ্বেত পর্বতগাত্র। সাগরতলে দীর্ঘদিন ক্যালসাইট খোলের তলানী পড়ে এ স্তর তৈরি হয়েছে।

স্বতন্ত্র্য ক্যালসাইট খোল ছাড়াও এমিলেনিয়া হাক্সলি ডিএমএসপি তৈরি করে। অন্যান্য ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালও এই রাসায়নিক যৌগটি তৈরি করে। এই জৈব-যৌগটি প্রতি বছর এক বিলিয়ন মেট্রিক টন পরিমাণে সমুদ্রে যুক্ত হয় ও সাথে সাথে বদলে যায়। ডিএমএসপি অধিক পরিমাণে পাওয়া যায় বলে জৈব অণুর উপস্থিতি সমুদ্রে প্রাণের অন্যতম চিহ্ন হিসেবে ধরা হয়। যেহেতু এই অণুটির উৎপাদন অনেক বেশি, সুতরাং ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালের জীবনচক্রে ডিএমএসপি অবশ্যই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ সুনির্দিষ্টভাবে জানেন না এর কাজ কী। হয়তো এটি জীবকে অভিস্রবণীয় চাপ থেকে রক্ষা করে। ভেসে বেড়ানোর জন্য এর হয়তো ভূমিকা রয়েছে। এমনকি হয়তো শিকারী-শিকার সম্পর্কে এর কোনো বিশেষ কাজ রয়েছে।

ডিএমএসপি থেকে যে ডিএমএস তৈরি হয় তা সর্বপ্রথম ১৯৪৮ সালে লোহিত শৈবাল পলিসাইফোনিয়ায় শনাক্ত করা হয়। সমুদ্র শৈবালের গন্ধের জন্য যে ডিএমএস দায়ী তা তখনই জানা ছিল। ১৯৫৬ সালে প্রথম ডিএমএসপি ভাঙার উৎসেচক শনাক্ত করা হয়। এটি ছিল এরকম অনেকগুলো এনজাইমের মধ্যে একটি যাদের মধ্যে আধুনিকতম হলো ডিএমএসপি লাইএজ ১।

ডিএমএস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে গিয়ে পৃথিবীর সালফার চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর তীব্র সৌরভ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীকে সাম্ভাব্য খাদ্য-উৎসের প্রতি রাসায়নিক আকর্ষক হিসেবে কাজ করে। এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক পাখি, বিভিন্ন অমেরুদন্ডী এবং কিছু স্তন্যপায়ী। ডিএমএস মেঘ তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে। এর ফলশ্রুতিতে এই যৌগটি বিশ্ব জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে? যখন গ্যাসটি বায়ুমণ্ডলে নিক্ষিপ্ত হয় তখন তা তাৎক্ষণিকভাবে জারিত হয়ে যায়। ডিএমএস জারিত হয়ে তৈরি করে ডিএমএসও। ডিএমএসও পানির অণুর ঘণীভবনের নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করে। এতে তৈরি হয় মেঘ। আর যেখানেই মেঘ রয়েছে সে অঞ্চলের জলবায়ুতে এর প্রভাব থাকবেই। শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জলবায়ুতেও এর প্রভাব থাকবে। মেঘ সৌর বিকিরণের প্রতিফলন বাড়িয়ে এটিকে মহাশূন্যে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রভাবিত হয়।

ডিএমএস এর এক রকমের কটু গন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন গন্ধটা বাঁধাকপির মতো। অন্যরা কাব্যিকভাবে একে সমুদ্রের ঘ্রাণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিট-মূল, এসপারাগাস ও সামুদ্রিক খাবার রান্না করার সময়ও এ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘ্রাণ পাওয়া যায়। বিশ বছর আগে থিয়েরি থ্যালৌ নামের একজন ফরাসী রসায়নবিদ কটু গন্ধের জন্য ডিএমএস-কে দায়ী করেন। তিনি এ তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এক ধরনের ভূগর্ভস্থ ছত্রাক ও শূকর ব্যবহার করেন। আজকাল অবশ্য ডিএমএস খুব কম মাত্রায় খাবারে দেয়া হয় মশলাদার স্বাদ নিয়ে আসার জন্য।

একটি রাসায়নিকের মেঘ তৈরির ক্ষমতা রয়েছে– এ কথাটির মধ্যে এক রকমের গীতিধর্মী আবেদন আছে। মেঘ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যা ইদানিংকালে বেশ সংবেদনশীল বিষয়। ডিএমএসপি লাইয়েজ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা গেলে বোঝা যাবে এটি বায়ুমণ্ডলে ডিএমএস তৈরিতে কীভাবে ভূমিকা রাখে। এটি আবার ব্যাকটেরিয়া ও ইউক্যারিয়টদের বৈশ্বিক বিস্তৃতির উপর নির্ভরশীল। ডিএমএস কীভাবে পরিবেশের বিভিন্ন পরিমাপ দিয়ে আক্রান্ত হয় কিংবা ডিএমএস কীভাবে পরিবেশকে প্রভাবিত করে তা আমাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে ডিএমএসপি লাইয়েজের মতো একই কাজ করা অনেক উৎসেচক সম্পর্কে আমরা কোনো কিছু জানিই না।

ফাইটোপ্লাঙ্কটনের শারীরবৃত্তীক, জৈব সংকেত লেনদেন করা, ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধের এর প্রতিরোধ ক্ষমতা, শিকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য জীবের সাথে মিথোজীবিতার ক্ষেত্রে ডিএমএস-এর ভূমিকা বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক সালফার চক্রে এ ক্ষুদ্র জীবটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরেও বড়সড় ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে এ জীবটি সমগ্র পৃথিবীতেই ভূমিকা রাখে, আমরাও যার একটি অংশ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি আসলে সেই প্রাণী যা লাভলকের বিখ্যাত গায়া হাইপোথিসিসকে অনুপ্রাণিত করে, যে অনুকল্পের মূল কথা হলো পৃথিবীর জৈব-রসায়ন ও ভূ-রসায়ন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত।

প্রোটিন স্পটলাইট ১৭৪ ইস্যু হতে The smell of the sea-র ভাষান্তর মূল লেখক Vivienne Baillie Gerritsen

লেখকঃ আরাফাত রহমান

প্রভাষক, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সমুদ্রের ঘ্রাণ

মেঘমালা আপনাকে সমুদ্রের কথা মনে করিয়ে দেবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু সমুদ্র না থাকলে মাথার উপরে খুব কম সংখ্যক মেঘই ভেসে বেড়াতো। কারণ সুবিশাল সমুদ্র জুড়ে অজস্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব রয়েছে যারা ডাই-মিথাইল সালফাইড (ডিএমএস) নামক গ্যাস তৈরি করে। সুনির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ডিএমএস মেঘ গঠন শুরু করতে পারে। এই ক্ষুদ্র জীবদের মধ্যে আছে শৈবাল ও অণুজীব। এরা অবশ্য মেঘ তৈরির জন্য ডিএমএস তেরি করে না। ডিএমএস আসলে ডাই-মিথাইল-সালফোনিও-প্রপিওনেট (ডিএমএসপি) নামক বিপাকীয় অণুর উপজাত। সম্ভবত ভেসে বেড়ানো কিংবা প্রতিরক্ষা কিংবা উভয় কাজেই ফাইটোপ্লাঙ্কটনের ডিএমএসপি দরকার।

সমুদ্রের একটি নিজস্ব ঘ্রাণ আছে। এই ঘ্রাণ কখনো কখনো অপ্রীতিকর কটু গন্ধ বলে মনে হতে পারে। এ ঘ্রাণের জন্য বায়ুবাহিত ডিএমএস দায়ী। সম্প্রতি সাগরের ফাইটোপ্লাঙ্কটন এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির (Emiliania huxleyi) মাঝে এ ঘ্রাণের পেছনে যে উৎসেচক বা এনজাইম দায়ী তা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ডিএমএসপি লাইয়েজ ১। এটি শৈবালের উৎসেচক যা ডিএমএসপি-কে ভেঙে ফেলে। ফলাফল হিসেবে সুগন্ধী ডিএমএস তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে।

সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো অধিকাংশ ফাইটোপ্লাঙ্কটন হলো এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। এরা সমুদ্রের বিশাল অঞ্চল জুড়ে সবুজ আস্তরণ তৈরি করে। ব্লুম নামে পরিচিত এ আস্তরণ মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। ক্রান্তীয় ও সাবআর্কটিক উভয় সাগরজলে এদের উপস্থিতি সাবলীল। এসব বাস্তুসংস্থানে খাদ্যজালের গুরুত্বপূর্ণ অংশও এ ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলো। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি এককোষী ইউক্যারিয়টিক (নিউক্লিয়াস বিদ্যমান এমন প্রকৃতকোষী) ফাইটোপ্লাঙ্কটন যাদের চারপাশে কোক্কোলিথ নামক এক ধরনের আবরণ রয়েছে। কোক্কোলিথের নামকরণ করেছিলেন ব্রিটিশ তুলনামূলক দেহসংস্থানবিদ থমাস হাক্সলি (১৮২৫ – ১৮৯৫)।

2চিত্রঃ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। বাইরে কোক্কোলিথের আবরণ দেখা যাচ্ছে।

কোক্কোলিথ ক্যালসাইট নামক খনিজ দিয়ে তৈরি। এদের নির্মাণকৌশল খুব সূক্ষ্ম ও অসাধারণ। বেশিরভাগ সময়েই এরা রঙহীন ও অস্বচ্ছ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির কোক্কোলিথ ক্যালসাইটের চাকতি দিয়ে তৈরি। এ বিষয়টি সর্বপ্রথম বর্ণনা করেন হাক্সলি ও সিজার এমিলিয়ানি নামক আরো একজন ইতালীয় অণুজীববিজ্ঞানী। তাদের দু’জনের নামানুসারেই এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি-র নামকরণ করা হয়েছে। নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় ক্যালসাইটের খোলটি প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা রাখে। কোক্কোলিথ হয়তো অনান্য বড় প্রাণীর ভোজে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করার একটা পদ্ধতি। অথবা এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, এমনকি হয়তো ক্ষতিকর অতিবেগুণী রশ্মির বিরুদ্ধে ভৌত বাধা হিসেবেও কাজ করে। এরা হয়তো ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলোকে ভাসিয়ে রাখার জন্য জরুরী। অথবা গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী প্রজাতিগুলোর সালোকসংশ্লেষণের আলো যোগাড়ের একটি পদ্ধতিও হতে পারে। এই ক্যালসাইট খোলগুলো প্রতিনিয়ত দেহ থেকে স্খলিত হয়ে সাগরতলে ডুবে যায়। গভীর সাগরে জমা হওয়া তলানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এ ক্যালসাইটগুলো। ডোভার নগরীর শ্বেত পর্বতগাত্র দীর্ঘ ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে জমা হওয়া এরকম তলানীর উদাহরণ।

3চিত্রঃ ডোভার নগরের শ্বেত পর্বতগাত্র। সাগরতলে দীর্ঘদিন ক্যালসাইট খোলের তলানী পড়ে এ স্তর তৈরি হয়েছে।

স্বতন্ত্র্য ক্যালসাইট খোল ছাড়াও এমিলেনিয়া হাক্সলি ডিএমএসপি তৈরি করে। অন্যান্য ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালও এই রাসায়নিক যৌগটি তৈরি করে। এই জৈব-যৌগটি প্রতি বছর এক বিলিয়ন মেট্রিক টন পরিমাণে সমুদ্রে যুক্ত হয় ও সাথে সাথে বদলে যায়। ডিএমএসপি অধিক পরিমাণে পাওয়া যায় বলে জৈব অণুর উপস্থিতি সমুদ্রে প্রাণের অন্যতম চিহ্ন হিসেবে ধরা হয়। যেহেতু এই অণুটির উৎপাদন অনেক বেশি, সুতরাং ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালের জীবনচক্রে ডিএমএসপি অবশ্যই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ সুনির্দিষ্টভাবে জানেন না এর কাজ কী। হয়তো এটি জীবকে অভিস্রবণীয় চাপ থেকে রক্ষা করে। ভেসে বেড়ানোর জন্য এর হয়তো ভূমিকা রয়েছে। এমনকি হয়তো শিকারী-শিকার সম্পর্কে এর কোনো বিশেষ কাজ রয়েছে।

ডিএমএসপি থেকে যে ডিএমএস তৈরি হয় তা সর্বপ্রথম ১৯৪৮ সালে লোহিত শৈবাল পলিসাইফোনিয়ায় শনাক্ত করা হয়। সমুদ্র শৈবালের গন্ধের জন্য যে ডিএমএস দায়ী তা তখনই জানা ছিল। ১৯৫৬ সালে প্রথম ডিএমএসপি ভাঙার উৎসেচক শনাক্ত করা হয়। এটি ছিল এরকম অনেকগুলো এনজাইমের মধ্যে একটি যাদের মধ্যে আধুনিকতম হলো ডিএমএসপি লাইএজ ১।

ডিএমএস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে গিয়ে পৃথিবীর সালফার চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর তীব্র সৌরভ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীকে সাম্ভাব্য খাদ্য-উৎসের প্রতি রাসায়নিক আকর্ষক হিসেবে কাজ করে। এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক পাখি, বিভিন্ন অমেরুদন্ডী এবং কিছু স্তন্যপায়ী। ডিএমএস মেঘ তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে। এর ফলশ্রুতিতে এই যৌগটি বিশ্ব জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে? যখন গ্যাসটি বায়ুমণ্ডলে নিক্ষিপ্ত হয় তখন তা তাৎক্ষণিকভাবে জারিত হয়ে যায়। ডিএমএস জারিত হয়ে তৈরি করে ডিএমএসও। ডিএমএসও পানির অণুর ঘণীভবনের নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করে। এতে তৈরি হয় মেঘ। আর যেখানেই মেঘ রয়েছে সে অঞ্চলের জলবায়ুতে এর প্রভাব থাকবেই। শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জলবায়ুতেও এর প্রভাব থাকবে। মেঘ সৌর বিকিরণের প্রতিফলন বাড়িয়ে এটিকে মহাশূন্যে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রভাবিত হয়।

ডিএমএস এর এক রকমের কটু গন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন গন্ধটা বাঁধাকপির মতো। অন্যরা কাব্যিকভাবে একে সমুদ্রের ঘ্রাণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিট-মূল, এসপারাগাস ও সামুদ্রিক খাবার রান্না করার সময়ও এ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘ্রাণ পাওয়া যায়। বিশ বছর আগে থিয়েরি থ্যালৌ নামের একজন ফরাসী রসায়নবিদ কটু গন্ধের জন্য ডিএমএস-কে দায়ী করেন। তিনি এ তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এক ধরনের ভূগর্ভস্থ ছত্রাক ও শূকর ব্যবহার করেন। আজকাল অবশ্য ডিএমএস খুব কম মাত্রায় খাবারে দেয়া হয় মশলাদার স্বাদ নিয়ে আসার জন্য।

একটি রাসায়নিকের মেঘ তৈরির ক্ষমতা রয়েছে– এ কথাটির মধ্যে এক রকমের গীতিধর্মী আবেদন আছে। মেঘ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যা ইদানিংকালে বেশ সংবেদনশীল বিষয়। ডিএমএসপি লাইয়েজ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা গেলে বোঝা যাবে এটি বায়ুমণ্ডলে ডিএমএস তৈরিতে কীভাবে ভূমিকা রাখে। এটি আবার ব্যাকটেরিয়া ও ইউক্যারিয়টদের বৈশ্বিক বিস্তৃতির উপর নির্ভরশীল। ডিএমএস কীভাবে পরিবেশের বিভিন্ন পরিমাপ দিয়ে আক্রান্ত হয় কিংবা ডিএমএস কীভাবে পরিবেশকে প্রভাবিত করে তা আমাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে ডিএমএসপি লাইয়েজের মতো একই কাজ করা অনেক উৎসেচক সম্পর্কে আমরা কোনো কিছু জানিই না।

ফাইটোপ্লাঙ্কটনের শারীরবৃত্তীক, জৈব সংকেত লেনদেন করা, ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধের এর প্রতিরোধ ক্ষমতা, শিকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য জীবের সাথে মিথোজীবিতার ক্ষেত্রে ডিএমএস-এর ভূমিকা বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক সালফার চক্রে এ ক্ষুদ্র জীবটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরেও বড়সড় ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে এ জীবটি সমগ্র পৃথিবীতেই ভূমিকা রাখে, আমরাও যার একটি অংশ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি আসলে সেই প্রাণী যা লাভলকের বিখ্যাত গায়া হাইপোথিসিসকে অনুপ্রাণিত করে, যে অনুকল্পের মূল কথা হলো পৃথিবীর জৈব-রসায়ন ও ভূ-রসায়ন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত।

প্রোটিন স্পটলাইট ১৭৪ ইস্যু হতে The smell of the sea-র ভাষান্তর মূল লেখক Vivienne Baillie Gerritsen

লেখকঃ আরাফাত রহমান

প্রভাষক, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়