অ্যাটাকামা’র মমি রহস্য

মমি– নামটা শুনলেই মানসপটে ভেসে ওঠে প্রাচীন মিশর ও পিরামিডের ছবি। এককালের মহা প্রতাপশালী ফারাও রাজারা মৃত্যুর পরও অমর হয়ে রয়েছেন এই মমির মাধ্যমে। তবে মৃতদেহকে মমি বানিয়ে অবিনশ্বর বানানোর চেষ্টা যে শুধু মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা কিন্তু নয়। প্রাচীন চীন, লিবিয়া, সাইবেরিয়া, ডেনমার্ক ইত্যাদি দেশেও অতীতে মমিকরণের খোঁজ মিলেছে।

কিছু মমি ছিল মানবসৃষ্ট। আবার কিছু মৃতদেহ প্রাকৃতিকভাবেই মমিতে পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব মমির খোঁজ পাওয়া গেছে, সেগুলো সম্পর্কে একটা ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত। মমিগুলো এককালে জীবন্ত মানুষ ছিল। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিতে ক্ষুদ্র কিন্তু অদ্ভুত এমন এক মমির খোঁজ মেলে। সাধারণ মানবদেহের কাঠামোর সাথে যার অনেক বৈশিষ্ট্যই বিরোধিতা করে।

আন্দিজ পর্বতের পশ্চিমে অবস্থিত চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর শুষ্কতম স্থান। বছরে সর্বোচ্চ এক মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এখানে। এমন জায়গাও রয়েছে এই মরুভূমিতে, যেখানে কোনোদিনই বৃষ্টিপাত হয়নি। প্রায় এক লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত এই জনমানবহীন স্থানে প্রাণের সন্ধান মেলে কদাচিৎ।

তবে ৭০০০ থেকে ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এখানে ‘চিনচিরো’ উপজাতির বসবাস ছিল। বর্তমানে যেসকল গোষ্ঠী এখনো টিকে আছে, তাদের অধিকাংশেরই বাস সাগরের অববাহিকা সংলগ্ন এলাকায়। এর মূল কারণ সাগরের নিকটবর্তী স্থানে বসবাসের জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যায়।

চিত্র: অ্যাটাকামা মরুভূমি হতে প্রাপ্ত মমি

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বলছিলাম মমি নিয়ে। ২০০৩ সালে অস্কার মুনোজ নামের একজন শখের সংগ্রাহক এই অ্যাটাকামা মরুভূমিতে বেড়াতে আসেন। বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে ঘুরতে তিনি চলে যান এর লা নোরিয়া নামক স্থানে। অ্যাটাকামার এই জায়গাটিকে বলা হয় ঘোস্ট ভিলেজ। কারণ বহু আগে এখানে মানুষের বসবাস থাকলেও এখন সে জায়গা পুরোপুরি পরিত্যক্ত।

মুনোজের ভাষ্যমতে তিনি সেখানে চামড়ার থলেতে মোড়ানো এক টুকরো সাদা কাপড় পড়ে থাকতে দেখেন। সংগ্রাহকের স্বভাবজাত কৌতূহলবশত তিনি কাপড়টা অনাবৃত করলে একটি ক্ষুদ্র মানবসদৃশ প্রাণীর কঙ্কাল দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে কঙ্কাল মনে হলেও পরে এর চামড়ার আস্তরণ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে তিনি বুঝলেন এটি আসলে একটি মমি।

দৈর্ঘে ৬ ইঞ্চি লম্বা মমিটির মাথা ছিল সাধারণ মানুষের মাথার তুলনায় অনেকাংশে লম্বা এবং চোখা। অক্ষিকোটর দুটোও ছিল অস্বাভাবিক রকমের বড় এবং প্রায় ত্রিকোণাকার। ছিল লিকলিকে লম্বা দুটো হাত ও পা। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের বক্ষপিঞ্জরে হাড় থাকে ১২ জোড়া, কিন্তু এর বুকে হাড়ের সংখ্যা ছিল ১০ জোড়া।

আবিষ্কারের পর বহুদিন পর্যন্ত এটি তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকায় মমিটি সকলে কাছে প্রায় অজানাই ছিল। এটি সর্বপ্রথম জনসম্মুখে আসে ২০০৯ সালে, যখন স্পেনের বার্সেলোনায় গবেষকদের সামনে একে উন্মোচন করা হয়।

চিত্র: অ্যাটা

এরও প্রায় চার বছর পর, ২০১৩ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গ্যারি নোলান মমিটিকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এরপর একে একে বের হতে থাকে চমকপ্রদ সব তথ্য। প্রাপ্তিস্থান অ্যাটাকামার সাথে মিল রেখে তিনি মমিটির নামকরন করেন অ্যাটা।

নানা মুনির নানা মতের মতো অ্যাটাকে দেখার সাথে সাথেই বিভিন্ন জন ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ দেয়া শুরু করেন। কেউ বললেন এটি স্রেফ একটা গুজব, পুরোটাই ধোঁকাবাজি, মানুষের কারসাজি। কেউ কেউ বললেন এটি হয়তো আসলেই অজানা কোনো প্রজাতি বা এলিয়েনের নমুনা। আবার অনেকে বললেন, দেখতে যেমনই হোক, এটি আসলে একটি মানুষ।

অ্যাটাকে ধোঁকাবাজি হিসেবে দাবি করা মানুষগুলোর ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্নের উত্তর খুব তাড়াতাড়িই মিলে গেল। এর দেহ হতে প্রাপ্ত ডিনএনএ’র নমুনা বিশ্লেষণ করে নোলান প্রমাণ করলেন, অ্যাটা কোনো মানবসৃষ্ট ধোঁকা নয়, সে এককালে জীবিত থাকা পরিপূর্ণ একটি প্রাণের নমুনা।

প্রাণ পর্যন্ত তো হলো। বাকি রইলো একটি প্রশ্ন- অ্যাটা কি এককালে মানুষ ছিল? নাকি অন্যকিছু?

অ্যাটার বক্ষপিঞ্জরে যে ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায়, ধারণা করা হয় সেখানে তার হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস ছিল। অত্যন্ত শুষ্ক স্থানে থাকার কারণে বহুকাল পরও তার দেহ প্রায় অক্ষত রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় অ্যাটা’র মমিকে এক্স রে, ক্রোমাটোগ্রাফি ও জেনেটিক স্যাম্পলিং করে একে মানুষ বলেই ঘোষণা করলেন নোলান।

কিন্তু গবেষণার একটি ফল নোলানের এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। অ্যাটার ডিএনএ’র ৯১ শতাংশ মানুষের জিনোমের সাথে মিললেও বাকি ৯ শতাংশ মেলে না। নোলানের মতে, এই ব্যতিক্রম শুধুমাত্র ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের অংশটুকুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, পুরো জিনোমের ক্ষেত্রে নয়। তবে এরপরও প্রশ্ন রয়েই যায়। কারণ মানব ভ্রূণের অনেক বৈশিষ্টের সাথেই অ্যাটার বৈশিষ্ট খাপ খায় না।

অ্যাটার করোটিতে পরিপূর্ণ দাঁতের সন্ধান পাওয়া। তার হাত ও পায়ের অস্থির গঠন ৬/৭ বছরের একটি শিশুর অস্থির গঠনের সাথে অনেকাংশেই মিলে যায়। মাত্র ৬ ইঞ্চি লম্বা একজন মানুষের হাড় ৬/৭ বছরের শিশুর মতো দৃঢ় কেন হবে? অপরিণত একটি মানুষের পূর্ণ বিকশিত দাঁত কীভাবে হয়? শিশু জন্মের কয়েক বছর পরই না দাঁত উঠে, তা-ও আবার থাকে অবিকশিত।

এই প্রশ্নে আবারো অ্যাটার আদি পরিচয় নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিভক্ত হয়ে পড়লেন। এমন পরিস্থিতিতে অ্যাটার মালিক তাকে বিক্রি করে দিলে সে চলে যায় স্পেনের এক সংগ্রাহকের হাতে। ফলে থেমে যায় তাকে নিয়ে চলতে থাকা গবেষণা।

চিত্র: অ্যাটার আকার খুবই ছোট

২০১৮ সালে অ্যাটাকে নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়। এর নেতৃত্ব দেন গ্যারি নোলান এবং তার সহকর্মী অতুল বাট। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে অত্যন্ত সূক্ষ্ম জেনেটিক অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে তারা অ্যাটার ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানা তথ্য বের করতে সক্ষম হয়েছেন। সেসব তথ্য হয়তো হয়তো বলছে এটি কোনোভাবেই এলিয়েন নয়, কিন্তু তারপরেও সেসব তথ্য কোনো অংশে কম বিস্ময়কর নয়।

গবেষণায় তারা জানতে পারেন, ভ্রূণ অবস্থাতেই অ্যাটার মৃত্যু হয়। ক্রোমোসোম বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় যে অ্যাটা ছিল একজন নারী এবং সে আসলে তৎকালীন অ্যাটাকামা অঞ্চলেরই স্থানীয় কোনো বাসিন্দার সন্তান।

মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৬ সপ্তাহের মতো। সাধারণত মৃত্যুর পর যত দিন যায়, ডিএনএ সূত্রগুলো খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে ছোট হতে থাকে। সেই তুলনায় অ্যাটার ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্ট যথেষ্ট লম্বা। এ থেকে ধারণা করা হয় যে অ্যাটার এই মমির বয়স ৫০০ বছরের বেশি নয়।

গবেষকদের মতে, ভ্রূণ অবস্থায় অ্যাটার শরীরে প্রায় ৫৪ রকমের মিউটেশন ঘটে। এরই বহিঃপ্রকাশ অ্যাটার এই অস্বাভাবিক অবয়ব। প্রথম দেখায় অনেকেই বলবে এটা পৃথিবীর কোনো প্রাণ নয়, এটা নির্ঘাত এলিয়েন। মিউটেশনগুলোর মধ্যে বামনত্ব (Dwarfism) এবং প্রোজেরিয়া (Progeria) অন্যতম।

বেশ কিছু মিউটেশনের ধরন এখনো গবেষকদের কাছে অজানা। এগুলো সম্পর্কে জানার একমাত্র উপায় হলো ল্যাবরেটরিতে স্টেম সেলের মাধ্যমে সেখানে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে এই ৫৪টি মিউটেশন ঘটানো এবং পর্যায়ক্রমে সেগুলোর বিকাশ ও ফলাফল পর্যপেক্ষণ করা। আরেকটি উপায় হচ্ছে অ্যাটার ডিএনএ’র ময়নাতদন্ত করা, যার মাধ্যমে হয়তো আমরা তার অতীতকে ঘেঁটে তার বর্তমান রূপকে ব্যাখ্যা করতে পারব।

ছোট্ট একটা শরীরে এতগুলো মিউটেশনই অ্যাটার মৃত্যুর মূল কারণ। তার ১০ জোড়া বুকের পাঁজর, ভ্রূণ অবস্থায়ও প্রায় পরিপূর্ণ হাত ও পায়ের অস্থি, পূর্ণ বিকশিত দাঁত- সবই মিউটেশনের ফল হিসেবে ধারণা করা হয়। মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই তার মাথা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার কারণে দেহের তুলনায় মাথার আকার বড় হয়ে যায়। অক্ষিকোটরও হয়ে যায় ত্রিকোণাকার। কিন্তু একটি সদ্য সৃষ্ট ভ্রূণের মধ্যে একসাথে এতগুলো মিউটেশন কীভাবে হওয়া সম্ভব, এর উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনো দিতে পারেননি।

চিত্র: কিশতিম ডোয়ার্ফ মমি

তবে এই মমিটিকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার চেয়ে অতিপ্রাকৃত গল্পই বেশি প্রচলিত রয়েছে। কারণ যিনি এটিকে সর্বপ্রথম পান, তিনি একে পাওয়ার কিছুদিন পরই পাগল হয়ে যান। এবং মমিটিও নিখোঁজ হয়ে যায়। স্থানীয় লোকজনেরা বলাবলি শুরু করে যে মমিটিকে তার প্রজাতির অন্যান্য সদস্যরা ইউএফওতে করে এসে তুলে নিয়ে গেছে!যদিও অ্যাটার এই অদ্ভুত ডিএনএ মিউটেশন বিজ্ঞানীমহলে মানবভ্রূণ ও এর জিনগত বৈশিষ্ট নিয়ে নতুন প্রশ্নের উদ্ভব ঘটিয়েছে, কিন্তু এরকম মমির সন্ধানলাভ কিন্তু এই প্রথম নয়। অ্যাটারও পূর্বে, ১৯৯৬ সালে রাশিয়ার কিশতিম শহরে এরকম খর্বাকৃতির একটি মমি পাওয়া যায়, যার নামকরণ করা হয় ‘কিশতিম ডোয়ার্ফ’।

বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে কল্পনাকেও হার মানায়। চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমির প্রাচীন কন্যা অ্যাটা তারই এক জলন্ত প্রমাণ। গবেষকরা অ্যাটাকে নিয়ে পরীক্ষা করতে করতে অনেক সময় নিজেরাই চমকিত হয়েছেন। শিম্পাঞ্জীর সাথে মানুষের যেখানে ৯৬ শতাংশ জিনোম মিলে যায়, সেখানে মাত্র ৯১ শতাংশ মিল নিয়ে অ্যাটা কীভাবে মানুষ হতে পারে, সে প্রশ্ন অনেকের মনেই রহস্যের উদ্রেক ঘটায়।

ডিনএনএ পোস্ট মর্টেম ও রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা অ্যাটাকে পুরোপুরিভাবে জানতে পারবো। তার আগে ততদিন পর্যন্ত সে অ্যাটাকামা’র বিস্ময় হয়েই থাকবে আমাদের সকলের কাছে।

তথ্যসূত্র

  1. https:// nytimes.com/2018/03/22/science/ata-mummy-alien-chile.html
  2. https:// usatoday.com/story/news/world/2018/03/23/mystery-solved-alien-mummy- human-after-all/453323002/
  3. https://gizmodo.com/alien-mummy-found-in-atacama-desert-is-actually-a-tiny-1823988455

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমঃ প্রাচীন সভ্যতার অত্যাধুনিক উদ্ভাবন

জ্যোতি:পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান আমাদের সকলেরই আকর্ষণের বিষয়। আলপিনতুল্য মানব সম্প্রদায় তার উৎপত্তিলগ্ন থেকেই ঐরাবতসম মহাকাশ ও তার সৃষ্টিরহস্য ভেদে বিভোর হয়ে আছে। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও শক্তিশালী কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিনিয়তই মহাকাশবিজ্ঞানের অজানা সব তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে। বহু আলোকবর্ষ দূরে থাকা গ্রহ নক্ষত্রের নির্ভুল তথ্য আমরা এখন পৃথিবীতে বসেই জানতে পারি।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা যে কম্পিউটার ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি লক্ষ্য করছি, এর রূপরেখা আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগেই প্রাচীন গ্রীসের প্রকৌশলীরা তৈরী করেছিলেন। অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নামের এ প্রযুক্তিকে বলা হয় মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার।

১৯০০ সালের কথা। গ্রীসের একদল স্পঞ্জ ডাইভার দেশটির অ্যান্টিকিথেরা দ্বীপের কাছে একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করে। খুঁজে পান বহু বছরের প্রাচীন সব অলংকার, মূর্তি, মুদ্রা ইত্যাদি। ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত সকল বস্তুই তারা গবেষণার জন্য পাঠিয়ে দেন গ্রীসের ন্যাশনাল আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়ামে।

প্রাপ্ত বস্তুগুলোর মধ্যে কিছু ব্রোঞ্জ ও পাথরের পিণ্ডের মতো অনিয়মিত আকারের জিনিস ছিল। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ প্রথমে সেগুলোর দিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে তারা উদ্ধারকৃত অন্যান্য জিনিসগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করেন। এর কারণে উদ্ধারের প্রায় দুই বছর পর্যন্ত সেগুলো নিয়ে কেউ গবেষণা করেনি। সত্যিকার অর্থে, সবুজ শ্যাওলা পড়া জিনিসগুলোর প্রতি আদপে তারা খুব একটা আগ্রহবোধ করেনি। কিন্তু কে জানতো? এই মাটির ঢিবি সদৃশ বস্তুগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার আশ্চর্য এক উদ্ভাবন!

চিত্র: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের অংশ বিশেষ

দুই বছর পর ১৯০২ সালে গ্রিক আর্কিওলজিস্ট ভ্যালেরিওস স্টাইস জিনিসগুলি নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা শুরু করেন। তিনি আবিষ্কার করেন, উদ্ধারকৃত পাথর ও ব্রোঞ্জের পিণ্ডগুলোর একটির মধ্যে ঘুর্নায়মান চাকা রয়েছে।

প্রথমে তিনি একে ঘড়ি ভাবলেও পরে আরো গভীর পর্যপেক্ষণের মাধ্যমে এর মধ্যে জটিল এক যন্ত্রকৌশল আবিষ্কার করেন। স্টাইসের আবিষ্কারের পর বহুদিন পর্যন্ত এ নিয়ে গবেষণা বন্ধ ছিল। মূলত এই গবেষণা হতে ফলপ্রসু কিছু পাওয়া যাবে না- এ কথা ভেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর অর্থায়ন করতে অপারগতা প্রকাশ করে।

পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ডেরেক প্রাইস এটি নিয়ে পুনরায় নাড়াচাড়া শুরু করেন। তিনি এটিকে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এক্স রে ও গামা রে ইমেজিংয়ের মাধ্যমে তিনি এর সম্ভাব্য ৮২টি টুকরোর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তিনি এ আবিষ্কারের উপর ৭০ পৃষ্ঠার একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বপ্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার। প্রফেসর প্রাইসের ভাষ্যমতে, এটি খ্রিষ্টপূর্ব ৮৭ সালের দিকে তৈরী করা হয়েছিল। এর মূল উপাদান ছিল ব্রোঞ্জ এবং অল্প পরিমাণ টিন। এছাড়া পাথর ও কাঠের বিভিন্ন কাঠামোও এতে ব্যবহার করা হয়। গঠনশৈলী দেখে ধারণা করা হয় হেলেনিস্টিক সময়কালে (খ্রী: পূ: ৩২৩ – খ্রী: পূ: ৩১) এই যন্ত্রের ব্যবহার প্রচলিত ছিল।

যন্ত্রটি দেখতে অনেকটা ছোটখাট ঘড়ির মতো। এতে অনেকগুলো ডায়াল এবং কাঁটা বিদ্যমান। ডায়ালগুলো চন্দ্র, সূর্য এবং পাঁচটি গ্রহকে নির্দেশ করে। এগুলো ছাড়াও এর মাঝে কয়েকটি সংখ্যা খচিত ব্লক রয়েছে। এগুলোর সাহায্যে জ্যোতির্বিদ্যার জটিল হিসাব করা যেত সহজেই।

চিত্র: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের কম্পিউটারাইজড থ্রিডি মডেল

প্রাইসের শনাক্ত করা ৮২টি টুকরোর মধ্যে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে ৭টি টুকরো। ১৬টি পাওয়া গেছে ভগ্ন অবস্থায়। বাকিগুলো হয় এখনো সাগরতলেই লুকায়িত রয়েছে, না হয় কালের বিবর্তনে ধ্বংস হয়ে গেছে।

অক্ষত ৭টি টুকরোকে মেজর ফ্র্যাগমেন্ট এবং বাকি টুকরোগুলোকে মাইনর ফ্র্যাগমেন্ট বলা হয়। মেজর ফ্র্যাগমেন্টগুলোকে A, B, C, D, E, F এবং G- এ সাত ভাগে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ A-এর দৈর্ঘ্য ১৮০ মিলিমিটার, প্রস্থ ১৫০ মিলিমিটার। প্রতিটি অংশেই বিভিন্ন গিয়ার, ডায়াল ও ঘড়ির চাকতি সদৃশ বস্তুর সন্ধান মিলেছে। এছাড়া ফ্র্যাগমেন্টগুলোর গায়ে বিভিন্ন সাংকেতিক লিপি খোদাই করা আছে। মাইনর ফ্র্যাগমেন্টগুলোর কাজ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত না হলেও এদের পৃষ্ঠেও বিভিন্ন চিহ্ন দেখা যায়।

প্রাচীন গ্রিসের লোকেরা গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করতেন। চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে তাদের অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় অনেক দূর এগিয়েছিলেন। গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তনের সূক্ষ্ম হিসাব রাখতে তারা অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম ব্যবহার করতেন বলে ধারণা করা হয়। যন্ত্রটির সামনের দিকে দুটো ডায়াল দেখা যায় যেগুলো রাশিচক্র ও সৌর বছরকে চিহ্নিত করে। সেখান থেকে আরো দুটো রেখার মতো দাগ বের হয়েছে যেগুলো চন্দ্র ও সুর্যের সম্যক অবস্থাকে নির্দেশ করে।

চিত্র: সাগরের তলদেশ হতে প্রাপ্ত যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ

যন্ত্রটির পেছনে দুটি ঘূর্ণায়মান রেখা যথাক্রমে সারস ও ক্যালিপিক চক্র নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হতো। এ চক্র দুটি প্রতি ১৮ ও ৭৬ বছরে চন্দ্রগ্রহণের সময়কাল বের করতে পারতো। মূল যন্ত্রের সাথে একটি L আকৃতির হাতল যুক্ত ছিল যার সাহায্যে একটি তারিখ নির্দিষ্ট করা হলে যন্ত্রটি সঙ্গে সঙ্গে সেই তারিখের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করতে পারত। যন্ত্রের গঠনশৈলী থেকে বোঝা যায় তৎকালীন গ্রিক পণ্ডিতরা সূর্যকে সৌরজগতের কেন্দ্র হিসেবে ধরে নিয়েই এ যন্ত্রের নকশা করেছিলেন।

এত ছোট একটি যন্ত্র এত জটিল সব হিসেব কীভাবে সম্পাদন করতো, সে রহস্য আজও গবেষকরা পুরোপুরি ভেদ করতে পারেননি। তাদের মতে, সূক্ষ্ম এবং সঠিক মাপের গিয়ারের ব্যবহারই যন্ত্রটির আকার কমিয়ে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিত। অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের গিয়ারের বিন্যাস নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী ভিন্ন ভিন্ন মডেল প্রদান করেছেন। এদের মধ্যে রাইট প্রপোজাল, ইভান’স প্রপোজাল ও ফ্রিথ প্রপোজাল অন্যতম।

শুধু যে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নির্ধারণ করতেই এ যন্ত্র ব্যবহৃত হতো, তা কিন্তু না। ২০০৮ সালে করা এক গবেষণায় জানা যায়, এ যন্ত্র তৎকালীন বিভিন্ন উৎসব, যেমন প্রাচীন অলিম্পিক গেমস এর দিনক্ষণের হিসেবও রাখতো। যন্ত্রটির গায়ে থাকা লিপিগুলো বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এর সাথে একটি পূর্ণ সৌর মডেল যুক্ত ছিল যেখানে বিভিন্ন গোলকের মাধ্যমে গ্রহগুলোকে চিহ্নিত করা হতো। লিপিগুলোতে থাকা মাসের নাম ও ক্যালেন্ডার দেখে ধারণা করা হয় গ্রীসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের করিন্থিয়া অঞ্চলে এ যন্ত্রের প্রচলন ছিল।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে এখনো। বিজ্ঞানীরা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এর পেছনে থাকা জটিল কৌশলগুলোর পুরোপুরি ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে। দুই হাজার বছর আগে যেখানে প্রযুক্তির অপ্রতুলতা ছিল প্রকট, জ্ঞানের পরিধি ছিল সীমিত, সেখানে সামান্য ব্রোঞ্জ, কাঠ ও পাথর দিয়ে তখনকার প্রকৌশলীরা এত নির্ভুল একটি যন্ত্র কীভাবে তৈরী করলেন, এ প্রশ্ন এখনো মানুষকে তাক লাগিয়ে দেয়।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম তাই শুধুই একটি যন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ নয়, এটি তৎকালীন গ্রীক বিজ্ঞানীদের চিন্তাধারা বিশ্লেষণের নতুন এক দ্বারও উন্মোচন করেছে।

তথ্যসূত্র

  1. http://age-of-the-sage.org/archaeology/antikythera_mechanism.html
  2. https://smithsonianmag.com/history/decoding-antikythera-mechanism-first-computer-180953979
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Antikythera_mechanism

কেওস থিওরিঃ বিশৃঙ্খলাই যেখানে শৃঙ্খলার পরিচায়ক

শুরুতেই একটি বাস্তব দৃশ্যপট কল্পনা করুন। মাসুদ সাহেব প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। হাতমুখ ধুয়ে একটু শরীরচর্চা করেন, নাস্তা খান, এরপর অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হন। নিত্যদিনের মতো আজও তিনি সব কাজ সেরে নাস্তা করতে বসেছেন কিন্তু বসেই তার মেজাজ গেল বিগড়ে। উনার স্ত্রী অন্যমনস্ক থাকায় নাস্তার রুটি পুড়ে গেছে।

পোঁড়া কালো রুটি দেখে উনার মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল। এই রাগ তিনি কিছুক্ষণ ঝাড়লেন স্ত্রীর উপর। স্ত্রীও কম যান না, সামান্য ব্যাপার নিয়ে মাসুদ সাহেবের বাড়াবাড়ি দেখে উনিও রাগ করে তখনই ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেলেন তার ভাইয়ের বাসায়। অনেকদিন ধরেই স্ত্রীর সাথে বনিবনা হচ্ছিলো না, তাই মাসুদ সাহেবও চললেন তার এক আইনজীবী বন্ধুর বাসায়। এবারে ডিভোর্সটা দিয়েই ছাড়বেন তিনি।

উল্লেখিত দৃশ্যপটের শুরুটা ছিল পুড়ে যাওয়া রুটি নিয়ে। এবং সেটি শেষ হলো একজন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পরিকল্পনার মাধ্যমে। গণিতের ভাষায় এই ঘটনাকে বলে কেওস (Chaos) বা বিশৃঙ্খলা। আর এ ধরনের বিশৃঙ্খলাকে ব্যাখ্যা করে যে তত্ত্ব, তার নাম কেওস থিওরি।

মার্কিন গণিতবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ এই থিওরির প্রতিষ্ঠাতা। কেওস থিওরি অনুসারে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু ও ঘটনা পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। কোনো একটি বিষয়ের সামান্য পরিবর্তনের ফলে অন্য একটি বিষয়ে ব্যাপক পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।

এই থিওরি বলে, কোনো স্থানে প্রজাপতির পাখা ঝাপটানোর মতো অতি সামান্য একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেই স্থান থেকে বহু দূরে টর্নেডোর মতো ভয়ানক দুর্যোগ পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়া, দুর্ঘটনা, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিশৃঙ্খল ঘটনা। এ ধরনের ঘটনাকে সাধারণত গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রে ফেলা যায় না। যে সকল ঘটনা সম্পর্কে আপনি অংক কষে সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎবাণী করতে পারবেন না, কেওস থিওরির মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়মিত ঘটনাকে ব্যখ্যা করা যায়।

একটি বিশৃঙ্খল সিস্টেমের দুই ধরনের রূপ থাকে। আপাতদৃষ্টিতে তারা অনিয়মিত আচরণ প্রদর্শন করলেও মূল ঘটনাগুলোকে আপনি চাইলেই ঘড়ির কাঁটার মতো চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান একটি সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। আবার এর ঠিক উল্টোটাও ঘটতে পারে, একগুচ্ছ শৃঙ্খলাবদ্ধ ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ছোট ছোট অসংখ্য বিশৃঙ্খলা। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন কেন হয়? বিশৃঙ্খল এই ঘটনাগুলো কেওস থিওরি মেনে চলেই বা কেন?

একটু গভীরে যাওয়া যাক। একটি সিস্টেম বা ঘটনা বিশৃঙ্খল কিনা, এবং বিশৃঙ্খল হলেও তা কতটুকু বিশৃঙ্খল- সেটা জানার জন্য চলুন কেওস থিওরির কয়েকটি শর্ত সম্পর্কে জেনে নেই।

বাটারফ্লাই ইফেক্ট

১৯৬১ সাল, বিজ্ঞানী লরেঞ্জ সদ্য আবিষ্কৃত একটি মেশিন নিয়ে তার ল্যাবে কাজ করছিলেন। একটি নির্দিষ্ট স্থানের চলমান আবহাওয়া অর্থাৎ তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা ইত্যাদি ফ্যাক্টরগুলোকে ১২ টি ভিন্ন ডিফারেনশিয়াল সমীকরণের মাধ্যমে একত্র করলেন। সেই সমীকরণকে একটি গাণিতিক সংখ্যা আকারে সদ্য আবিষ্কৃত যন্ত্রে ইনপুট দিয়ে দিলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী কিছুদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারতো।

ভালোই চলছিল কাজ। একদিন কী মনে করে তিনি প্রথমে সমীকরণ দিয়ে শুরু করার বদলে আগে থেকেই মেশিন হতে প্রাপ্ত কিছু ডাটা নিয়ে পরীক্ষা চালু করেন। শুরু থেকে ইনপুট দিলে যেই ফলাফল আসে, এবারও ঠিক তেমন ফলাফল আসার কথা। কিন্তু দেখা গেল ফলাফল ভিন্ন দেখাচ্ছে। লরেঞ্জ দেখলেন গ্রাফটি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ যাওয়ার পর এলোমেলো বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে।

চিত্রঃ লরেঞ্জের মেশিন হতে প্রাপ্ত গ্রাফ।

প্রথমে এটিকে যান্ত্রিক গোলযোগ ভাবলেও পরে বুঝতে পারলেন সমস্যাটা আসলে অন্য জায়গায়। মেশিনটি কাজ করছিল ৬ ডিজিটের সংখ্যা নিয়ে কিন্তু ফলাফল দেখাচ্ছিল ৩ ডিজিটের সংখ্যার আকারে। ইনপুট হিসেবে মেশিনটি নিয়েছিল ০.৫০৬১২৭- দশমিকের পর ছয় ঘর। কিন্তু আউটপুট রেজাল্টের সময় সংখ্যাটিকে ০.৫০৬ হিসেবে ধরে ফলাফল গ্রাফটি প্রিন্ট করেছিল। দশমিকের পর তিন ঘর। সামান্য ০.০০০১২৭ এর পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়া পূর্বাভাসের গ্রাফে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

লরেঞ্জ এটিকে আখ্যায়িত করেন ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ নামে। তিনি বলেন, আমাজন জঙ্গলে কোনো এক প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর ফলে ভবিষ্যতের কোনো একসময় পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে বিশাল টাইফুনেরও সৃষ্টি হতে পারে। সামান্যতম পরিবর্তনে অসামান্য ফলাফল- এই হচ্ছে বাটারফ্লাই ইফেক্টের মূল কথা।

চিত্রঃ লরেঞ্জের আঁকা বাটারফ্লাই ইফেক্টের ডায়াগ্রাম।

আকর্ষক, আকর্ষণ ও অনিয়মিত আচরণ

একটি প্যাসেঞ্জার বিমান যখন আকাশে উড়ে, ভেতরে থাকা যাত্রী ও কেবিন ক্রুরা সর্বদাই আশা করেন যাতে প্লেনে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। আকাশে যদি ছোটখাটো কোনো দুর্যোগ সৃষ্টিও হয়, প্লেনটি যেন নিজের অবস্থান সর্বদা ধরে রাখতে পারে।

ঠিক তেমনিভাবে, একটি ফাইটার বিমানের পাইলট সর্বদা চান তার প্লেনটি যেন আকাশ ও বায়ুমণ্ডলের তুচ্ছ পরিবর্তনও বুঝতে পারে। পাইলট তার বিমানের অভ্যন্তরীণ গঠন, ইঞ্জিন, উড্ডয়ন কৌশল সম্পর্কে যত ভালো ধারণা রাখবেন, তত ভালোভাবে বিমানটিকে তিনি নিজের আয়ত্তে রাখতে পারবেন।

কেওস থিওরিও অনেকটা বিমানের মতোই কাজ করে। আপনি যদি কোনো ঘটনার কেন্দ্রে থাকা বিশৃঙ্খলাকে বের করতে পারেন তাহলে সেই ঘটনার ভবিষ্যৎ তত নিখুঁতভাবে বলতে পারবেন। পাশাপাশি ঘটনাটির উপর নিজের নিয়ন্ত্রণও আনতে পারবেন।

একটি সিস্টেমের মধ্যে লুকায়িত বিশৃঙ্খলাকে খুঁজে পেতে হলে তার কিছু Behavior বা আচরণসমষ্টিকে জানতে হবে। এগুলোকে গণিতবিদরা নাম দিয়েছেন Attractor বা আকর্ষক। কেওস থিওরিতে আকর্ষকের ভূমিকা অনুধাবন করার জন্য নিম্নোক্ত উদাহরণটি দেয়া যেতে পারে-

আপনার হাতে একটি পিং-পং বল আছে। সাগরের সামনে গিয়ে বলটিকে ছেড়ে দিলেন। পানির উপর থেকে যদি বলটি ছেড়ে দেন তাহলে সেটি পানিতে পড়ে ভাসতে থাকবে। আর যদি পানির তলদেশে গিয়ে বলটিকে ছাড়েন, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাবে এবং উপরের স্তরে এসে ভাসবে। অর্থাৎ যেখান থেকেই বলটি ছাড়া হোক না কেন, সেটি পানিতেই ভেসে থাকবে।

এখানে বলটি হচ্ছে একটি ঘটনা, পানির তল হচ্ছে ঘটনাটির আকর্ষক এবং সাগর হচ্ছে বস্তুজগতের বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা।

যদিও আমরা একটি বিশৃঙ্খল ঘটনার ফলাফল সম্পর্কে পুরোপুরি কখনোই নিশ্চিত হতে পারব না, তবে ঘটনাটির আকর্ষক সম্পর্কে জানা থাকলে আমরা তার ফলাফল ধারণা করতে সক্ষম হবো। একটি শৃঙ্খল ও স্থিতিশীল ঘটনার সাথে আকর্ষকের এই সম্পর্ক সাধারণ একটি জ্যামিতিক লুপ মেনে চলে।

কিন্তু কেওস থিওরির ক্ষেত্রে সেটি ভিন্ন। কেওস থিওরির সাথে আকর্ষক কাজ করে ফ্র্যাকটাল আকারে। (ফ্র্যাকটাল হচ্ছে অনিয়মিত জ্যামিতিক আকার।) অর্থাৎ একই সিস্টেমের মধ্যে থাকা একাধিক ঘটনার আকর্ষক এক হলেও তাদের ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।

চিত্রঃ একটি ফ্র্যাকটাল আকৃতি।

এরকম বিশৃঙ্খলার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে মানুষের হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ডে কোষের সংখ্যা প্রায় ৩ মিলিয়ন। প্রত্যেকটি কোষ তাদের নিজস্ব ছন্দে রক্ত পাম্প করে। কিছু কিছু কোষ একটু আগে সংকুচিত হয়, আবার কিছু কিছু হয় একটু পরে। যদিও এই পরিবর্তন খুবই সামান্য। এখানে সকল কোষ একই সিস্টেমের অংশ, তাদের আকর্ষকও অভিন্ন, কিন্তু তবুও প্রত্যেকটি কোষ তার নিজস্ব বিধি মেনে চলে। এবং কোষগুলোর কম্পনে সামান্য এই পরিবর্তনের কারণে হৃদপিণ্ডের স্থায়িত্ব ও কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

আলপিন থেকে ঐরাবত- বিশৃঙ্খলা রয়েছে সবখানেই

কেওস থিওরি শুধু যে গাণিতিক ব্যাখ্যা দেয় তা কিন্তু নয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি হতে শুরু করে বস্তুজগতের সবখানেই রয়েছে বিশৃঙ্খলা। আর সেই বিশৃঙ্খলাকে বোধগম্য করতে রয়েছে কেওস থিওরি। দুটি ঘটনা বিবেচনা করুন। এক- একটি আধখোলা পানির কল, যেখান থেকে একটি বালতির মধ্যে টিপটিপ করে পানি পড়ছে। দুই- লার্জ হাড্রন কলাইডারের মধ্যে থাকা হিলিয়াম গ্যাস, যা কলাইডারের শীতক (coolant) হিসেবে কাজ করে।

আপাতদৃষ্টিতে দুটি ঘটনাই নিয়মিত এবং বিশৃঙ্খলাহীন ঘটনা। কিন্তু পানির কলটি যদি ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেন, পানি পড়ার পরিমাণও বাড়তে থাকবে এবং বালতির মধ্যে পানি পড়ার শব্দও পরিবর্তিত হতে থাকবে। ঠিক তেমনই, লার্জ হাড্রন কলাইডারে থাকা হিলিয়ামের তাপমাত্রা যদি বৃদ্ধি করা হয়, সেখানেও আণবিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করবে। পরিশেষে দুটি শৃঙ্খল ঘটনা থেকে সৃষ্টি হবে অবিরাম পানির স্রোত ও উত্তপ্ত হিলিয়ামের দুটি বিশৃঙ্খলা।

মজার ব্যাপার হলো, একটি শৃঙ্খল অবস্থা থেকে বিশৃঙ্খল ঘটনাতে রূপান্তর সর্বদা একটি ধ্রুবক অনুসারে সংঘটিত হয়ে থাকে। এই ধ্রুবককে বলা হয় ‘ফাইজেনবাম ধ্রুবক’। ফাইজেনবাম ধ্রুবক মূলত দুটি সংখ্যা। এর দ্বারা একটি লিনিয়ার সিস্টেম কী করে নন-লিনিয়ার তথা বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয় তা ব্যাখ্যা করা যায়।

চিত্র: ক্যাওস থিওরির প্রতিষ্ঠাতা এডওয়ার্ড লরেঞ্জ; image source:
thegwpf.com

কেওস থিওরি আমাদের অতি পরিচিত প্রকৃতিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। যেসকল ঘটনাকে আমরা দৈব ঘটনা, দুর্যোগ ইত্যাদি বলে চিনেছি সেগুলো আসলে পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো বিশৃঙ্খলারই ফলাফল।

পরিবেশের সামান্য একটি পরিবর্তন কী সুবিশাল পরিণাম ডেকে আনতে পারে, আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হওয়া কোনো ঘটনার পেছনেও যে থাকতে পারে অতি জটিল গাণিতিক হিসেব- তা অনুধাবন করা যায় কেওস থিওরির মাধ্যমে। কেওস থিওরি আমাদের সামনে বারবার একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে- আমরা আমাদের এই অতি পরিচিত পৃথিবীকে আসলে কতটুকু চিনতে পেরেছি?

তথ্যসুত্র

(i) http://theconversation.com/explainer-what-is-chaos-theory-10620

(ii) https://en.wikipedia.org/wiki/Chaos_theory

(iii) Book: Jurassic Park by Michael Crichton