প্রাপ্তবয়ষ্ক মস্তিষ্ক কি সত্যিই নতুন নিউরন তৈরি করতে পারে?

গত বিশ বছর যাবৎ ধারণা করা হচ্ছে একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষের মস্তিষ্ক অসংখ্য নতুন নিউরন বা কোষ তৈরি করতে পারে, আর এই ধারনাটিই মানুষকে আশা জাগাচ্ছে যে কৃত্রিম উপায়ে কোষ উৎপাদন সম্ভব। স্নায়ুবিজ্ঞানের উন্নতি , নতুন স্নায়ুকোষ তৈরির জন্য গবেষকদের গবেষণা – এ সব কিছুই হতাশা বা অ্যালজেইমার ব্যাধি ( Alzheimer’s Disease)  এর মত অসুখ বিসুখের চিকিৎসা বা প্রতিরোধ করতে পারে।

কিন্তু নেচার (Nature)  জার্নালে প্রকাশিত একটি বিতর্কিত গবেষণার কারণে উপরোক্ত আশাটি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়াটি পরিপুর্ণ মানুষ হিসেবে ক্রমবিকাশ লাভের পর অর্থাৎ মায়ের পেটে থাকাকালীন সময়েই কমতে শুরু করে এবং প্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়ার পর পুরোপুরিভাবে থেমে যায়।

হসপিটাল ফর সিক চিলড্রেন, টরেন্টো, কানাডা এর স্নায়ুতত্ত্ববিদ Paul Frankland বলেন, “প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষ এবং বানরের ব্রেইনে নতুন স্নায়ুকোষ খোঁজার গবেষণার ফলাফল অনেককেই হতাশ করবে”।

“নতুন নিউরন বা স্নায়ুকোষ তৈরির প্রক্রিয়াটি কার্যগতভাবে আসলে খুবই দূর্বল”, বলেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী Rene Hen.

তবে সকলের মতেই এ গবেষণাগুলোতে আসলে অনেক ভুলত্রুটি রয়েছে। টিস্যুগুলো পরিক্ষানীরিক্ষা করার পদ্ধতি, রোগীর মানসিক অবস্থার ঘটনা কাহিনী, তাদের ব্রেইনে কোনো ধরনের প্রদাহ ছিল কিনা, এসবের দ্বারা হয়তো ব্যাখ্যা করা সম্ভব কেন গবেষকরা এখনো পুরোপুরিভাবে সফল হতে পারেননি।

 

সূত্রপাতঃ

নিউরন বা স্নায়ুকোষ সৃষ্টির প্রথম ঘটনা দেখা যায় ১৯৯৮ সালে। ক্যান্সার রোগীদের উপর জীবিত অবস্থাতেই একটি রাসায়নিক উপাদান ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। নাম ছিল- ব্রোমোডিঅক্সিইউরিডিন (Bromodeoxyuridine)। রাসায়নিকটি প্রয়োগের পর তাদের মস্থিষ্কে নতুন বিভাজিত কোষ দেখা যায়। মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে যেমন নতুন কোষগুলো ছড়ানো অবস্থায় থাকে এটা কিছুটা সেরকম। স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের Jonas Frisen’s ল্যাবের একটি গবেষণা এই বিষয়টি কে আর শক্তিশালী করে। ৫৫ জন রোগ্রাক্রান্ত মানুষের প্রত্যেকের ব্রেইন টিস্যুর প্রতিটি নিউরনের ‘কার্বন ডেটিং’ করা হয়। এ পদ্ধতিতে নিউরনের বয়স নির্ধারণ করার পর সিদ্ধান্তে আসা হয় ঐ মানুষগুলোর মস্তিষ্কের ডেন্টেট জাইরাস (Dentate gyrus)এ প্রায় ৭০০টি পুরাতন নিউরন নতুন নিউরন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

Arturo Alvarez-Buylla (ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকো) ১৯৮০ সাল থেকে গবেষণা করছেন মস্তিষ্কের নতুন কোষ উৎপাদনের ক্ষমতার উপর। কিন্তু তিনিও সন্দেহপ্রবণ। তিনি দেখিয়েছিলেন (Rodent) বা নিচু শ্রেণীর তীক্ষ্ণ দাঁত বিশিষ্ট কিছু প্রাণীদের মস্তিষ্কে স্টেম সেল কীভাবে নতুন অংশ পুনরুৎপাদন করে। কিন্তু কার্বন ডেটিং এ প্রাপ্ত ফলাফল এটি প্রমাণ করে না যে, মানব মস্তিষ্কেও ঠিক একই বিষয়টিই ঘটে।

মানব মস্তিষ্কের বিষয়টির ক্ষেত্রে অনেক ধাপ রয়েছে। আবার অনেক ধাপে ধারণা করে নেওয়া হয়েছে এমন বিষয়ও রয়েছে। যার কারনে আসল ব্যাপারটিতে পৌঁছানোর আগে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক।

Buylla এবং তাঁর দল ৫ বছর ধরে ৫৯ জন মানুষের ব্রেইন টিস্যু সংগ্রহ করেন। যাদের কেউ বা মারা গিয়েছিলেন, কারও আবার বিভিন্ন বয়সে সার্জারি করে খিঁচুনীর জন্য দায়ী টিস্যু ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ মানুষগুলোর বয়স ছিল মোটামুটি জন্মের আগ থেকে শুরু করে ৭৭ বছর পর্যন্ত। নিউরনের পূর্ণতা প্রাপ্তির বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন থাকে, এগুলোকে স্পেসিফিক প্রোটিন নামেই ডাকা হয়ে থাকে। এই প্রোটিন গুলোকে চিহ্নিত করতে ফ্লুরোসেন্ট এন্টিবডি ব্যবহার করা হয়েছিল। আর ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ নিয়ে বসা হয়েছিল কোনও লম্বা সহজ সরল আকৃতির বাচ্চা নিউরনকে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা।

[ইঁদুরের রেটিনায়  নতুন কোষ বিভাজন]

গবেষণাকারী এই দলটি দেখতে পেলেন, নবজাতকের ব্রেইনে একটি বড় সংখ্যায় জন্মদাতা কোষ অর্থাৎ প্রোজেনিটর সেল (progenitor cell) এবং স্টেম সেলের উপস্থিতি আছে। জন্মের সময় এই সংখ্যাটি মোটামুটি প্রতি মিলিমিটার ব্রেইন টিস্যুতে ১৬১৮টি নতুন নিউরন এরকম। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই কোষগুলো নতুন কোষ তৈরিতে অংশ নেয় না। এক থেকে সাত বছরের মধ্যে নতুন নিউরন সৃষ্টি প্রায় ২৩ শতাংশ কমে যায়। পূর্ণবয়ষ্ক হতে হতে নতুন নিউরনের জোগান প্রায় পুরোপুরিভাবেই থেমে যায়।

Alvarez-Buylla এর মতে, “অন্যরা এ নিয়ে কী দাবী করছে তা আমাদের দেখার বিষয় নয়”

অপরদিকে আবার Frisen এর মতে, এন্টিবডি মার্কার পদ্ধতিটি পুরোপুরিভাবে নির্ভরযোগ্য নয়, কারন এতে ব্যবহৃত ফ্লুরোসেন্স ফলাফলকে ঘোলাটে করে দিতে পারে। তিনি দাবী করেন এ পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য গবেষকেরা প্রাপ্ত বয়ষ্ক ব্রেইনে নতুন কোষ উৎপাদন দেখেছেন। Frankland এর মতে ,”এ তর্ক চলতেই থাকবে, আরো অনেক কিছু এখনো বাকি”।

 

 

দুঃস্বপ্নের বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ

কেউ আপনাকে ধাওয়া করছে বা আপনার সবগুলো দাঁত পড়ে গেছে। কিংবা নগ্ন অবস্থায় রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এরকম হয়েছে কি কখনো? বাস্তবে নয়, স্বপ্নে। এগুলো আসলে দুঃস্বপ্ন। কিছু কিছু দুঃস্বপ্ন খুবই পরিচিত। পৃথিবীতে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ মিলিয়ন স্বপ্ন দেখা হয়। তার মধ্যে দুঃস্বপ্নের পরিমাণই বেশি।

গবেষকদের মতে, মানুষের আচরণের প্রতিফলন হচ্ছে এই স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্নগুলো। এগুলো থেকে খানিকটা হলেও বোঝা যায় মানুষের মনের ভেতর আসলে কী ঘটে চলছে। অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটে সেরকম পরিচিত কিছু দুঃস্বপ্ন আসলে কী অর্থ প্রকাশ করে, তা নিয়ে আজকের আলোচনা।

১.দাঁত পড়ে যাওয়া

দাঁত নিয়ে স্বপ্ন দেখা আপনার চেহারা নিয়ে উদ্বিগ্নতাকে প্রকাশ করে। এছাড়া অন্যেরা আপনাকে কীভাবে দেখছে এ নিয়ে চিন্তা করলেও আপনি এ ধরনের স্বপ্ন দেখতে পারেন। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়, লজ্জা কিংবা অনাকর্ষণীয় দেখানোর ভয় থেকেও এ ধরনের স্বপ্ন জন্মাতে পারে।দাঁতকে আমরা ব্যবহার করে থাকি কামড় দিতে, ছিঁড়তে কিংবা চাবাতে। তাই দাঁত হারাবার স্বপ্ন আপনার অক্ষমতার অনুভূতিকে প্রকাশ করে অর্থাৎ আপনি আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছেন।

২)কেউ আপনাকে ধাওয়া করছে

এ ধরনের স্বপ্নের অর্থ আপনার বাস্তব জীবনে ভয় বা সমস্যা সৃষ্টি করছে এমন কিছু থেকে আপনি পালাতে চাচ্ছেন। অর্থাৎ বিশেষ কোনো পরিস্থিতি আপনি এড়িয়ে যেতে চাচ্ছেন। যে আপনাকে ধাওয়া করছে সেও কিন্তু আপনার চিন্তারই প্রতিফলন। হতে পারে আপনার রাগ, অহমিকা, ভয় এসবই আপনাকে তাড়া করছে.

৩)টয়লেট খুঁজে পাচ্ছেন না

আপনি নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে আপনার চাহিদাগুলো প্রকাশ করতে পারছেন না, এধরনের স্বপ্নের অর্থ এটাই। হতে পারে, অন্যের চাওয়া পাওয়াগুলোকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আপনি আপনার নিজের দিকটাই ঠিকমত পূরণ করতে পারছেন না। কিংবা আপনি নিজেকে সময় দিতে পারছেন না, আপনার আরো একান্ত সময়, নিজের দিকে খেয়াল প্রয়োজন।

৪)সবার সামনে নগ্ন অবস্থায়

নিজেকে নিয়ে এরকম কিছু দেখলে বুঝতে হবে আপনি অনিশ্চয়তায় ভুগছেন অথবা আপনাকে ভুল কারণে দোষারোপ করা হয়েছে।
কিন্তু যদি নগ্ন অবস্থায় না দেখে অন্য কাউকে দেখেন খারাপ বোধ করেন তবে বুঝতে হবে সেই মানুষটির আসল রূপ নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তায় আছেন।

৫)পরীক্ষার হলে অপ্রস্তুতভাবে

পরীক্ষা সর্ম্পকিত স্বপ্নগুলো এত বাস্তব যে, আমরা জেগে উঠেই ভাবি আসলেই হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ফেল করেছি। কমপক্ষে প্রতি ৫ জনে একজন মানুষ এই স্বপ্নগুলো দেখে থাকেন। পরীক্ষা সর্ম্পকিত এধরনের স্বপ্ন আত্মবিশ্বাসের এবং জীবনের পরবর্তী ধাপে সুদৃঢ় পদক্ষেপের অভাব প্রকাশ করে।

৬)উড়া

উড়তে দেখার অর্থ কেউ অথবা কোনো কিছু আপনাকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা দিচ্ছে।
যদি উড়তে ভয় পাচ্ছেন, এমন কিছু দেখেন তার মানে জীবনে আপনার যে লক্ষ্য স্থির করেছিলেন সেটির সাথে তাল মিলাতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। আপনি একা এবং উড়ার জন্য কসরত করছেন, তার মানে আপনি আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করছেন।

image source: steemit.com

৭)পড়ে যাওয়া

আপনি কোথাও পড়ে গেলেন এবং ভয় পেলেন তার মানে কোনো পরিস্থিতি নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তায় আছেন।
যদি আপনার পড়ে যাওয়া উপভোগ করে থাকেন তবে আপনি পরিবর্তন সর্ম্পকে ততটা ভীত নন।

৮)নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন

গাড়ির স্বপ্ন আমাদের জীবন চালনা এবং তার দিক প্রতিফলিত করে। এসময় আপনি হয়তো অনুভব করছেন আপনি পথবিচ্যুত হয়ে পড়েছেন এবং আপনার পথে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।

৯)নতুন ঘর খুঁজে পাওয়া

যদি স্বপ্নে আপনি নতুন, অব্যবহৃত ঘর খুঁজে পান তবে তার মানে আপনি নিজের নতুন চেহারা,নতুন ক্ষমতা খুঁজে পেয়েছেন। যদি সেই ঘরের রঙ সাদা হয় তাহলে আপনি একটি নতুন জীবন শুরু করার জন্য প্রস্তুত।

১০)দেরী হয়ে যাওয়া

কোথাও দেরী করে ফেলেছেন এধরনের স্বপ্ন আপনার জীবনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আপনার ভয় ও দুশ্চিন্তাকে প্রকাশ করে। কিংবা আপনি কিছু করতে চাচ্ছেন, কিন্তু তার জন্য মনে হবে সময় পার হয়ে যাচ্ছে।

আপনি যখন আপনার দুঃস্বপ্নের অর্থ খুঁজতে যাচ্ছেন, তখন আপনাকে সচেতনভাবে মনোযোগসহকারে তা খুঁজে বের করতে হবে। কারণ আপনার অসতর্কতা হয়তো সঠিক অর্থটি থেকে আপনাকে বিচ্যুত করবে

ঘুমানোর সময়, স্বপ্ন দেখার ৫ টি পর্ব তৈরি হয়। এই পর্বগুলো ১৫ থেকে ৪০ মিনিট স্থায়ী হতে পারে। অর্থাৎ ঘুমানোর সময় মোটামুটি আমরা ২ ঘণ্টা সময় স্বপ্ন দেখেই কাটাই।

প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৭ বিলিয়ন স্বপ্ন দেখক মিলে ৩৫ বিলিয়ন স্বপ্ন তৈরি করে ফেলেন। সবকিছু আসলে আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। কেউ কেউ আবার বিশ্বাস করেন স্বপ্নগুলো দ্বারা প্রতিফলিত হয় আমরা কী, আমরা কী চাই এবং আমরা কী বিশ্বাস করি।

featured image: ivanyolo.com

ডার্ক চকলেট বাড়াবে জীবনীশক্তি

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে ডার্ক চকলেট খেলে তা দৈনন্দিন জীবনে খুবই উপকার বয়ে আনতে পারে। এটি শরীরের বিভিন্ন ধকল এবং প্রদাহ কমায়, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে, দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও মন মেজাজ ভাল রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের ডার্ক চকলেট থেকে কয়েক ধরনের শারীরিক উপকারিতা লাভ করা সম্ভব। 

সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলোজি-২০১৮ এর একটি কনফারেন্সে এ সংক্রান্ত দুটি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, ডার্ক চকলেটে প্রচুর পরিমাণ ক্যাকাও (Cacao) থাকে। প্রদাহ ও ধকল কমাতে এবং প্রতিরোধক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এই ক্যাকাও।

ফ্লাভোনয়েডস নামক একটি মূল্যবান খাদ্য উপাদানের প্রধান উৎস হলো ক্যাকাও। গবেষণায় জানা যায় বুদ্ধিবৃত্তি, রক্তসঞ্চালন, এমনকি দেহের বিভিন্ন নিঃসরনের ক্ষেত্রে ফ্লাভোনয়েডস ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

image source: dietitianrenupreet.com

সাইকোনিউরোইমিউনোলজি এবং ফুড সায়েন্সের গবেষক লি এস বার্ক উপরোক্ত গবেষণাগুলোতে প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। “কয়েক বছর ধরে আমরা নিউরনের উপর ডার্ক চকলেটের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে এসেছি” বলেন বার্ক। 

পরীক্ষাগুলো থেকে দেখা যায়, যত বেশি ক্যাকাও তত বেশি দেহের বুদ্ধি, স্মৃতি, মন মেজাজ ইত্যাদির উপর ভালো প্রভাব। ক্যাকাও-তে যে ফ্লাভোনয়েডস নামক পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায় তা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রদাহপ্রতিরোধকারী হিসেবে কাজ করে। এটি মস্তিষ্ক এবং হৃৎপিণ্ডের জন্যও বেশ উপকারী।

এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলোজি- ২০১৮ এর কনফারেন্সে উপস্থাপিত কিছু ফলাফল এখানে তুলে ধরা হলো। 

(১)

কোষের প্রতিরক্ষা, স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং বিভিন্ন সংবেদনশীলতায় ভুমিকা রাখে

(২)

ডার্ক চকলেট মস্তিষ্কের EEG ক্ষমতা বাড়ায়। মস্তিষ্কে কতটা ইলেকট্রিক্যাল একটিভিটি উৎপন্ন হচ্ছে তা জানা যায় EEG পদ্ধতিতে। নতুন কিছু শেখা, কোনো কিছু মনে করা, সামঞ্জস্যতা, ধ্যান, মস্তিষ্কের নমনীয়তা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকারী ভূমিকা পালন করে এটি।

 

গবেষক বার্ক বলেন, এটি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে দেহের প্রতিরক্ষা এবং মস্তিষ্কের কার্যকরিতার উপর এটির কী প্রভাব ফেলে তা জানার জন্য, একটি বড় জনগোষ্ঠীর উপর পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। অধিক মাত্রায় ডার্ক চকলেট গ্রহণ করলে মস্তিষ্ক এবং আচরণের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা ফেললে তার প্রভাব কেমন হবে এটি এখন গবেষণা করে দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: sciencedaily

মস্তিষ্কের নকশা

মানব মস্তিষ্ক একটি বিস্ময়। এটি সব ধরনের অনুভূতি ধারণ করতে পারে। সারাজীবন ধরে স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে এবং সামান্য প্ররোচনাতেই সাড়া দিতে পারে। কীভাবে মস্তিষ্ক এ কাজগুলো করে সে ব্যাপারে আমরা খুব কমই জানি। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা পর্যবেক্ষণ করতে আমরা কি পুরো মস্তিষ্কের একটি ডায়াগ্রাম বানাতে পারি যেখানে প্রত্যেকটি নিউরন এবং সিন্যাপ্স তারের মতো পরিষ্কারভাবে চিত্রায়িত হবে? এটা কি সম্ভব?

তার আগে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। মস্তিষ্কের কার্যক্রম নির্ভর করে নিউরনগুলোর সংযোগের উপর। বিভিন্ন স্তরের নিউরনের সংযোগ একটি একক সত্ত্বা হিসেবে কাজ করে। নিউরনের এই নেটওয়ার্ককে বিজ্ঞানীরা বলেন কানেকটম (Connectome)।

মানব মস্তিষ্কের কানেকটমকে বৃহৎ অথবা আণুবীক্ষনিক কোনো স্কেলেই মাপা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষণা এখন অনেক দূর এগিয়েছে। The Human Connectome Project-এ মোটামুটি ১,০০০ মানুষের মস্তিষ্কের Connectome ম্যাক্রো স্কেলে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রধানত মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটার বা মায়েলিন শীথ দ্বারা মোড়ানো স্নায়ুতন্তুর Connectome নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। এই কাজে ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং পদ্ধতি বা MRI ব্যবহার করা হয়।

২২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪৬০ জন মানুষের উপর গবেষণা করে দেখা যায়, যারা ভালো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে (যেমনঃ উন্নত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি) তাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর সংযোগও বেশ উন্নত হয়।

অপরদিকে নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যারা (যেমনঃ ধুমপান, মদ্যপান, উগ্র আচরণ ইত্যাদি) তাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সংযোগ আগের দলের তুলনায় তেমন উন্নত নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় এটি ভবিষ্যত আচরণ সম্পর্কে ধারণা করার একটি মাধ্যম হতে পারে। কিংবা কোনো মাদকদ্রব্যের মস্তিষ্কের উপর প্রভাব কেমন তাও জানা যেতে পারে Connectome এর সাহায্যে।

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিদ্যার বিশ্ববিখ্যাত গবেষক Jeff Lichtman। তিনি হিস্টোলজি (টিস্যু বিষয়ক বিজ্ঞান)-র উপর একসময় একটি কোর্স শুরু করেছিলেন। এ কোর্সের ব্যবহারিক দিক নিয়ে কাজ করার সময় বিভিন্ন রোগাক্রান্ত টিস্যু নিয়ে গবেষণা করেন।

তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন অটিজম, সাইজোক্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অস্বাভাবিকতার কোনো শারীরিক লক্ষণ নেই। কিন্তু যদি ক্ষুদ্র টিস্যু স্তরে পর্যবেক্ষণ করা যায় তবে প্রদাহ কিংবা বিবর্ণতার মতো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ এ অসুখগুলোর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কোষ পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিকতা নিরূপণ করা সম্ভব।

মানব মস্তিষ্ক অন্যান্য যেকোনো অঙ্গের তুলনায় নিঃসন্দেহে জটিল। এটিকে শুধু বিস্তৃত করে দেখলেই চলে না, এটিকে বুঝতেও হয়। মস্তিষ্ক একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে যেখানে একটি স্নায়ুকোষের সাথে হাজারো স্নায়ুকোষের সংযোগ স্থাপিত হয়।

চিত্রঃ ডেনড্রাইটের সংযোগের ক্লোজ আপ চিত্র।

Lichtman প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণার সময় মানব শিশু এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী শিশুর স্নায়ুতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, শিশু বড় হবার সাথে সাথে স্নায়ুতন্ত্র নতুনভাবে সজ্জিত হয়। তিনি এটিকে বিভিন্ন রঙ ব্যবহার করে চিহ্নিত করতে চাইলেন। কিন্তু দেখা গেলো, এতগুলো স্তর চিহ্নিত করতে গেলে যে পরিমাণ রঙের দরকার সে পরিমাণ রঙই নেই।

তবে মানুষের বেলায় করা না গেলেও এ পদ্ধতিতে একটি প্রাণীর সম্পূর্ণ Connectome চিহ্নিত করা গিয়েছিল। প্রাণীটি roundwarm, যেটির মাত্র ৩০২ টি নিউরন রয়েছে। গবেষকেরা তারপর ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের প্রচেষ্টা শুরু করলেন।

Lichtman এবং তার ২০ জন সহকর্মী মিলে ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের নতুন একটি পদ্ধতি তৈরি করলেন- নিউ ইমেজিং টেকনোলোজি। এটি আসলে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে ন্যানোস্কেল পর্যায়ে ব্রেইন ইমেজিংয়ের একটি পদ্ধতি। তারপর তারা ইঁদুরের মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে পরীক্ষা করেন এবং অ্যাক্সন ও ডেনড্রাইটের মধ্যে অপূর্ব এক নেটওয়ার্ক খুঁজে পান। Lichtman ধারণা করেছিলেন, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা নিরূপণে এ পদ্ধতি অনেক কাজে দিবে।

Connectome এর ডায়াগ্রাম বানানোর মুল প্রেরণা ছিল মস্তিষ্কে কত স্মৃতি জমা আছে তা জানার চেষ্টা। Lichtman এর মতে, জীবনের সব অভিজ্ঞতাই মস্তিষ্কে জমা রয়েছে কিন্তু এ স্মৃতিগুলো আসলে মস্তিষ্কে কী রূপে জমা আছে তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন, মস্তিষ্কের এ ডায়াগ্রাম বানানো সম্ভব হলে এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

বিশাল তথ্যসম্ভার

এতকিছু না হলেও, মস্তিষ্কের ডায়াগ্রাম তৈরি করা সম্ভব হলে এটি মস্তিষ্ক সম্পর্কে না জানা অনেক তথ্যের বিশাল সম্ভার দিতে পারে। মস্তিষ্কের প্রতি ঘনমিলিমিটার স্থানেই প্রায় দুই টেরাবাইটের সমান তথ্য থাকা সম্ভব!

খুব মজার একটি ব্যাপার হলো, সম্পূর্ণ পৃথিবীর জন্য গুগল ম্যাপে যে পরিমাণ তথ্য রয়েছে তা মোটামুটি ২০ পেটাবাইট অর্থাৎ ২০৫০০ টেরাবাইট। মানব মস্তিষ্ককে সামগ্রিকভাবে এক মিলিয়ন ঘনমিলিমিটারের একটি বস্তু কল্পনা করলে আর প্রতি ঘনমিলিমিটারে ২ টেরাবাইত করে তথ্য থাকলে একজন মানুষের মস্তিষ্কে থাকা তথ্যের পরিমাণ হতে পারে ২ মিলিয়ন টেরাবাইট বা ২ হাজার পেটাবাইট বা ২ এক্সাবাইট! এমনকি ৩০২ টি নিউরনযুক্ত roundwarm এর ক্ষেত্রেও এ তথ্যের পরিমাণ প্রায় ১২ টেরাবাইট। প্রকৃতিতে খুব শৃঙ্খলার সাথে প্রত্যেকটি প্রাণীর সকল কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণও মূলত মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্য সমাহার।

দৃষ্টিভঙ্গী যদি সীমিত হয় তবে বিশাল জিনিস কল্পনা করাও কঠিন হয়। মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা তেমনই বিশাল। আর ধীরে ধীরে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত থেকে বিশালতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে হঠাৎ করেই বিশাল সীমানা পার করাটা যেকোনো দিক দিয়েই ক্ষতিকর। মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্যসম্ভার যেকোনো মানুষের কল্পনা থেকেও অনেক বেশি জটিল। আমরা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারি তবে তার ফলাফল এখনো আমাদের অজানা। এর জন্য আরো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।

তথ্যসূত্র

http://gizmag.com/connectome-wiring-diagram-human-brain/39659/

featured image: bigthink.com

মস্তিষ্ক কি পূর্ণ হতে পারে?

মস্তিষ্ক সত্যিই খুব আশ্চর্যজনক। এ যেন এক অবিরাম গ্রন্থাগার যার প্রতিটি তাক আমাদের জীবদ্দশার অতি মূল্যবান স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে রাখে। কিন্তু এমন কি কোনো বিন্দু আছে যেখানে মস্তিষ্ক তার সংরক্ষণ ক্ষমতার চূড়ান্ত অবস্থায় পৌছায়? অন্য কথায়,মস্তিষ্ক কি ‘পূর্ণ’ হতে পারে?

উত্তরটি প্রশ্নাতীত ভাবেই হবে ‘না’। কারণ মস্তিষ্ক তার চেয়েও একটু বেশি বুদ্ধি সম্পন্ন, বেশি স্মার্ট। এ বছরের শুরুর দিকে ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ সাময়িকীর এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নতুন স্মৃতিকে ধারণ করতে মস্তিষ্ক তার পুরাতন স্মৃতির সাথে গাদাগাদি করে রাখার পরিবর্তে পুরোনো তত্থ্যগুলোকেই সড়িয়ে ফেলে। আচরণগত দিক নিয়ে আগের গবেষণাগুলোতে দেখা যায়, নতুন তথ্যের আগমন পুরাতনকে ভুলে যাবার অন্যতম কারণ হতে পারে।

পরীক্ষা নিরীক্ষা

মস্তিষ্কে যখন আমরা প্রায় একই রকম কিছু তথ্য ধরে রাখতে চেষ্টা করি তখন আসলে কী ঘটে? এই কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলেন কয়েকজন গবেষক-বিজ্ঞানী। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একই ধরনের তথ্য পূর্ব থেকে বিদ্যমান তথ্যের সাথে জট পাকিয়ে যেতে চায়।

মস্তিষ্ক যখন একটি ‘নির্দিষ্ট’ স্মৃতি সংরক্ষণ করতে যায় তখন কীভাবে সে কর্মকাণ্ড পরিবর্তিত হয় তা নিয়ে বিজ্ঞানী দল পরীক্ষা করলেন। যেমন একই সময়ে একটা জিনিস মনে রাখা এবং তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরেকটা জিনিস মনে রাখা। দ্বিতীয় জিনিসটি হতে পারে প্রথম জিনিসটির বিপরীতধর্মী কোনো কিছু। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ-কারীদেরকে দুটি ভিন্ন চিত্রের সাথে কোনো একটি শব্দের সম্পর্ক খুঁজে বের করতে বলা হয়। যেমন মেরিলিন মনরো এবং একটি টুপির সাথে sand শব্দটির কী সম্পর্ক বের করা।

গবেষকেরা দেখতে পেলেন টার্গেট করা স্মৃতিটি প্রায়ই যখন মনে করা হয় তখন সেই স্মৃতির জন্য মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বেড়ে যায়। কিন্তু যখন ঐ গোত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী স্মৃতির আগমন ঘটে তখন মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। স্মৃতি সংক্রান্ত এমন কর্মকাণ্ড মস্তিস্কের মধ্য অঞ্চল (হিপোক্যাম্পাস) এর চেয়ে অগ্র অঞ্চল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সেই বেশি ঘটে। হিপোক্যাম্পাস স্বভাবগতভাবেই স্মৃতি নষ্টের কারণ।

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অনেক জটিল জ্ঞান সংক্রান্ত বিষয় যেমন, পরিকল্পনা প্রণয়ন,সিদ্ধান্ত গ্রহণ,স্মৃতি সংক্রান্ত বিষয় নির্বাচন করার মতো কাজের সাথে জড়িত থাকে। নিবিড় গবেষণায় দেখা গেছে,আমাদের মস্তিষ্কের এই অংশটি বিশেষ ধরনের কিছু স্মৃতিকে আহরণ করার জন্য হিপোক্যাম্পাস এর সমন্বয়ে কাজ করে থাকে।

যদি হিপোক্যাম্পাসকে একটি সার্চ ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হবে সেই ফিল্টার সমতুল্য। যা নির্ধারণ করে কোন স্মৃতিটি বেশি প্রাসঙ্গিক ও সাদৃশ্যপূর্ণ। এই অঞ্চলটিই নির্ধারণ করে একের পর এক তথ্য সংগ্রহ করে ফেলা স্মৃতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ কোনো স্মৃতির ঝক্কি ছাড়াই সমতুল্য তথ্যে প্রবেশ করানোর মতো সামর্থ্যও মস্তিষ্কের থাকতে হয়।

যদি হিপোক্যাম্পাস হয় সার্চ ইঞ্জিন তাহলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হবে তথ্যের ফিল্টার; image source: aboutmodafinil.com

ভুলে যাওয়া যখন ভালো লক্ষণ

দৈনন্দিন জীবনে ভুলে যাওয়ারও কিছু সুবিধা আছে। উদাহরণস্বরূপ, মনে করুন, আপনি আপনার ব্যাঙ্কের কার্ডটি হারিয়ে ফেলেছেন। যখন নতুন কার্ডটি আসবে তখন সেটা একটা নতুন পিন নম্বর সহ আসবে। এক্ষেত্রে গবেষণা বলে যে প্রত্যেক বার কেউ যখন নতুন পিন নম্বরটি মনে রাখতে চেষ্টা করবে, তখন পুরাতন পিন নম্বরটি ধীরে ধীরে ভুলতে থাকবে। এই প্রক্রিয়া পুরনো স্মৃতিতে হটিয়ে দেবার মাধ্যমে নতুন তথ্যের উন্নতির পথ সুগম করে।

আমাদের মধ্যে অনেককেই পাওয়া যাবে যারা পুরাতন স্মৃতির সাথে নতুন সমতুল্য স্মৃতিকে মিলিয়ে ফেলার হতাশায় ভুগছেন। ধরুন,আপনি এক সপ্তাহ আগে কার পার্কিং জোনের কোথায় গাড়ি পার্ক করেছিলেন তা মনে করার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের স্মৃতি সুনির্দিষ্টভাবেই এর জন্য সংবেদনশীল, মনে রাখা দরকার ও মনে রাখা দরকার নয় এই দোটানায় উপরিপাতিত হয়। যখন আমরা সম্পূর্ণ নতুন কোনো তথ্য আহরণ করি তখন আমাদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভিতরে থাকা তথ্যের সাথে নতুন তথ্যকে সুবিন্যস্ত করে অঙ্গীভূত করে নেয়।

পূর্বের গবেষণায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা কীভাবে শিখি এবং নতুন তথ্য মনে রাখি তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। কিন্তু আগে উল্লেখিত বর্তমানের গবেষণা আলোকপাত করছে, আমরা কেন ভুলে যাই তার উপর। এবং এই ব্যাপারটার গুরত্ব অধিক হারে মূল্যায়িত হচ্ছে।

স্মৃতির অভিশাপ

খুব কম সংখ্যক মানুষই জীবনের সমস্ত তথ্য খুঁটি নাটি সহ মনে রাখতে পারে, তাদের হাইপারথাইমেস্টিক সিন্ড্রোম থাকে। এমনকি যদি দিন তারিখের স্মৃতিও হয় তাহলে তারা আপনাকে নির্দিষ্ট দিনে কখন কোথায় কী করেছিল তাও বলে দিতে পারবে। যদিও এটা শুনতে অনেকের কাছেই আশীর্বাদ মনে হতে পারে, কিন্তু এই বিশেষ বৈশিষ্টের স্বল্পসংখ্যক মানুষের কাছে তাদের অসাধারণ ক্ষমতা আগুনের মতো জ্বালা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এটি একটি রোগ।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কখনো কখনো কেউ বর্তমান অথবা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে পারে না তার কারণ অতীতের কোনো স্মৃতির কারণে ভিতরে থাকা অনুভূতি।

এখানের আলোচনা নির্দেশ করে যে মনে রাখা এবং ভুলে যাওয়া একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। এক দিক থেকে ভুলে যাওয়া হলো নতুন স্মৃতিকে ধারণ করার একটি রাস্তা। এই হিসেবে ভুলে যাওয়াকে বলা যায় মস্তিষ্কের পূর্ণ হয়ে যাওয়া ঠেকানোর একটি মেকানিজম, যা মানুষ বিবর্তনের পথে হাজার হাজার বছরে অর্জন করেছে।

featured image: vivacomfelicidade.com

মহাকাশে নারী মহাকাশচারীর ঋতুস্রাব জটিলতা

নাসার শুরুর দিকের কাহিনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নাসার প্রকৌশলীদের কাছে নারী মহাকাশচারীদের পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব ছিল বড় ধরনের এক চিন্তার বিষয়। স্যালী রাইড ছিলেন আমেরিকার প্রথম নারী মহাকাশচারী যিনি ১৯৮৩ সালে মহাশূন্যে ভ্রমণ করেন। সাধারণত মহাকাশ ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্য অসংখ্য বিষয় মাথায় রাখতে হয়। অসংখ্য বিষয়ের মাঝে ছিল না নারী সংক্রান্ত বিষয়। যেমন টেমপন (তুলার পট্টি) বা স্যানিটারী ন্যাপকিনের বিষয়টি কেবল তখনই মাথায় আসে যখন দেখা যায় মহাকাশচারী একজন নারী। ঠিক করা হলো স্যালি রাইডের এ মিশনের জন্য স্যানিটারী প্যাডের একটা বিশাল সরবরাহ পাঠানো হবে (এক সপ্তাহের জন্য ১০০ টেমপন)। কারণ প্রকৌশলীরা জানতেন না মহাশূন্য নারীর ঋতুস্রাব কেমন আচরণ করবে।

Image result for sally ride
স্যালি রাইড

নাসার মেডিকেল কর্মকর্তারা অনেক সন্দিহান ছিলেন মধ্যাকর্ষণ বল পিরিয়ডের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। কী ঘটবে যখন মহাকাশে অবস্থানরত নারীর ঋতুস্রাব হবে? কী কী সম্ভাব্য অসুবিধা ও জটিলতা তৈরি করতে পারে সেখানে? এত ভাবনা ও প্রস্তুতির পর দেখা গেল, পৃথিবীতে ঋতুস্রাব আর মহাকাশে ঋতুস্রাবের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। যুগ যুগ ধরে এখন নারী মহাকাশচারীরা শূন্যে অবস্থান ও কাজ করে আসছেন কোনো ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা ছাড়াই।

তবে একটি সমস্যা কিন্তু রয়েই গিয়েছে। আজ পর্যন্ত যত মহাকাশ ভ্রমণ এবং এ সম্পর্কিত তথ্য রয়েছে সবই অল্প দূরত্বে ভ্রমণের ক্ষেত্রে। গবেষকরা এখন নতুন চিন্তায় পড়েছেন যখন দীর্ঘ যাত্রা হবে তখন কী হবে? ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঋতুস্রাবের রক্ত নেয়ার মতো পরিকল্পনা করে বানানো নয়। কারণ এখানের টয়লেট সিস্টেম Water Reclamation System এর সাথে সংযোগ করা। যেখানে প্রস্রাবকে রিসাইকেল করে আবার খাবার উপযোগী পানিতে পরিবর্তন করা হয়।

Water Reclamation System in space

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাও এখানে খুব একটা উপযোগী নয়। কারণ এখানে নেই গোসলের সুব্যবস্থা, নেই পানির অফুরন্ত যোগান। সুতরাং পৃথিবীর মতো উপায়ে মহাকাশে চিন্তা করলে চলছে না। যার কারণে নারী মহাকাশচারীরা গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট বা বড়ি খাওয়ার দিকেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এর ফলে মহাকাশ ভ্রমণ এবং প্রশিক্ষণ উভয় সময়েই তাদের ঋতুস্রাব বন্ধ থাকে।সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ট্যাবলেটগুলোর মাঝে অন্যতম হলো প্রোজেস্টেরন ট্যাবলেট।

দ্বিতীয় ব্যবহারবহুল পদ্ধতিটি হচ্ছে IUCD (Intra Uterine Contraceptive Device)। যেটি একজন ডাক্তারের সাহায্যে জরায়ুতে স্থাপন করা হয় এবং ৩-৫ বছর সহজেই সমস্যাবিহীন ভাবে জরায়ুতে থাকতে পারে। তবে সেটি পিরিয়ড বন্ধ করবে কিনা তা নির্ভর করে কোন ধরনের IUCD ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপর। ২ ধরনের IUCD রয়েছে। ১) হরমনবিহীন; ও ২) হরমোনযুক্ত। হরমোনযুক্ত IUCD ব্যবহার করলে তা পিরিয়ড বন্ধ রাখতে সক্ষম।

 

এরপর আছে ইনজেকশন পদ্ধতিতে। বিশেষ করে ডেপো শট। ‘ডেপো প্রভেরা’ নামক একটি ইনজেকশন রয়েছে যা প্রজেস্টেরনের সমকক্ষ। এটি প্রতি ১২ সপ্তাহে একবার করে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে দিতে হয় এবং ২-৩ বছর পর্যন্ত সমস্যাবিহীনভাবে ব্যবহার করা যায়। ফ্লোরিডার গাইনী বিশষজ্ঞ ‘ক্রিস্টিন জ্যাকসন’-এর মতে বিশেষ ক্ষেত্রগুলোতে পিরিয়ড বন্ধ রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো জন্মনিরোধক পিল অথবা IUCD। তিনি বলেন, “মেয়েদের পিরিয়ড বন্ধ রাখার এ দুটিই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। অসংখ্য মেয়েরা তাদের পিরিয়ডের সময় অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং এর এমন কোনো জরুরী কারণ নেই যে প্রতি মাসেই একজন মেয়ের পিরিয়ড হতে হবে”

তবে কোন পদ্ধতিটি অন্য পদ্ধতির তুলনায় ভালো, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ প্রতিটি নারীই একজন আরেকজন থেকে আলাদা। যা একজনের উপর ভালোভাবে কাজ করে তা আরেকজনের উপর নাও করতে পারে। আবার ক্ষেত্র বিশেষে পদ্ধতির পরিবর্তন হয়। যেমনঃ ডেপো শট যারা ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা যায়। মহাকাশে অবস্থানরত ব্যাক্তিদের মধ্যে হাড় ক্ষয়ে যাওয়া এমনিতেই একটি চিন্তার বিষয়, তার উপর কেউ যদি ডেপো শট ব্যবহার করে তাহলে তা আরো বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। তাই মহাকাশচারীদের ক্ষেত্রে ডেপো শট ব্যবহার না করাই ভালো।

লন্ডনের কিংস কলেজের একটি গবেষণাপত্রে লেখক Varsha Jain বলেন, “সামরিক বাহিনীতে যেসব মহিলা কর্মরত থাকেন, তারাই তাদের মিশন বা প্রশিক্ষণের সময় পিরিয়ড বন্ধ রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আর মহাকাশচারীদের ব্যাপার, যেখানে জীবন খুব সুবিধার না সেখানে এটি বন্ধ করতে চাওয়া খুবই স্বাভাবিক”

আরেক দল গবেষক আরেকটি সমস্যা খুঁজে বের করলেন। তিন বছরের সরবরাহের জন্য এতগুলো জন্মনিরোধক ট্যাবলেট বহন করে শূন্যে নিয়ে যাওয়া কিন্তু সহজ বিষয় নয়। তিন বছরের জন্য কম করে হলেও এক হাজার ট্যাবলেট প্রয়োজন এবং সেগুলোর প্যাকেজিং করতে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসপত্র লাগবে। তাছাড়া জন্মনিরোধক পিলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়। সুতরাং মহাকাশচারী নারীদের জন্য IUCD বা Implant সবচেয়ে ভাল ও কার্যকর উপায়। এগুলোর কোনো অতিরিক্ত ঝামেলা নেই। মহাকাশ মিশনের আগে আগে এগুলো করে ফেললে পৃথিবীতে ফিরে না আসা পর্যন্ত আর কোনো চিন্তাও নেই।

মহাকাশে হাড় ক্ষয়ে যাওয়া বা হরমোনের প্রভাব আরো ভাল করে বোঝার জন্য আরো গবেষণা দরকার। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, এ সম্পর্কে যত তাড়াতাড়ি জানা যায় ততোই ভাল। তাহলে হয়ত মানুষ নতুন একটি পৃথিবীতে বসবাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরো একধাপ এগিয়ে যেতে পারবে।

তথ্যসূত্র: সায়েন্স এলার্ট

 

প্রাগৈতিহাসিক ওষুধপত্র

আজ থেকে প্রায় ৩০ হাজার বছর আগের কথা। শেষ বরফ যুগের কাছাকাছি। স্থানঃ পশ্চিম ইউরোপের আইবেরিয়ান পেনিনসুলার কোনো গুহার সামনের ফাঁকা একটি জায়গা। ঠিক সন্ধ্যে নামার মূহুর্তে একদল গাট্টাগোট্টা মানুষের দেখা মেলে, যাদের গায়ে ছিল অমসৃন লোমশ আবরণ। এরা ভীড় জমাতে শুরু করে ফার্ন, মস ইত্যাদি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি একটি মঞ্চের মতো জায়গার চারপাশে। মঞ্চের উপরে বসে ছিলেন দলের সবচেয়ে প্রবীন সদস্যটি। বয়স প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি। দেখে মনে হবেতার চোখ বন্ধ, যেন তিনি ঘুমাচ্ছেন। গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে আর নিঃশ্বাস ধীরগতির। হঠাৎতাকে ঘিরে থাকা দর্শকের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। একসময় তারা স্তব গাইতে শুরু করল। এর মধ্যে কেউ কেউ আবার হাত তুলে অস্ত যাওয়া সূর্যের দিকে ইঙ্গিত করতে লাগলো। আগুনের ঝিকিমিকি ছটার মাঝে কমবয়সী একজন তরুণী আর্তনাদের মতো শব্দ করে সামনে লাফিয়ে এগিয়ে আসলো এবং তিক্ত গন্ধযুক্ত একটি মিশ্রণ বৃদ্ধের মুখের সামনে ধরলো। খুব ধীরে প্রবীণ নড়ে উঠলেন, চোখ খুললেন এবং মৃদু হাসলেন।

প্রাগৈতিহাসিক ওষুধপত্র

দৃশ্যটি আসলে পুরোপুরিই কল্পিত। কিন্তু এমনই কিছু একটা হয়তো ঘটেছিল এল সিডারন নামের উত্তর পশ্চিম স্পেনের প্রসিদ্ধ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে। এখানে পাওয়া গেছে হাড় ও দাঁতের শত শত ফসিল বা জীবাশ্ম যা আসলে নিয়ান্ডারথাল(Homo neanderthalensis)প্রজাতির। এরাআমাদের সহোদর প্রজাতি। এই প্রজাতিটি ৩০ হাজার থেকে ২৫ হাজার বছর পূর্বেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ২০১২ সালে বিজ্ঞানীরা নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির ৫টি দাঁত বিশ্লেষণ করেন। এক্ষেত্রে তারা গ্যাস ক্রোমোটোগ্রাফি নামের

খুব উন্নত একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।প্রত্যেকটি দাঁতের ক্যালকুলাস নামক শক্ত প্লাক স্তরে আটকে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেছে ক্ষুদ্র অণুজীব এবং কিছু উদ্ভিদের জীবাশ্ম।

ধারণা করা হয়, দাঁতের মালিক উদ্ভিদগুলো কোনো কারণে খেয়েছিলেন ফলে সেগুলো প্লাক স্তরে আটকে গিয়েছিল। এর মধ্যে একজনের মুখে তিক্তস্বাদযুক্ত কিছু গুল্ম পাওয়া গেছে।যেমন ইয়েরো নামক উগ্রগন্ধের ফুল এবং ক্যারোমিল। এসব উদ্ভিদের আসলে কোনো পুষ্টিগুণ নেই। তবে কেন এসবখেয়েছিল? একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে উদ্ভিদগুলোর ওষুধিগুণ ছিল। ইয়েরো উদ্ভিদ যুগ যুগ ধরে শক্তিবর্ধক হিসেবে আর ক্যারোমিল উত্তেজনা ও প্রদাহ নিরোধক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

এল সিডারনে পাওয়া এই প্রমাণ আদিকালের রোগবালাইয়ের প্রতিষেধক, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে সাহায্য করে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানার্জন নির্ভর করে মূলত সংরক্ষিত মৃতদেহ, হস্তনির্মিত বস্তু(যেমন যন্ত্রপাতি, অলংকার) কিংবা প্রাকৃতিক জিনিসপত্র(যেমন উদ্ভিদের বীজ,প্রাণীর জীবাশ্ম) ইত্যাদির উপর। এছাড়া গুহাচিত্র আর প্রস্তরশিল্প থেকেও অনেক কিছু ধারণা করা যায়। প্রাগৈতিহাসিক চিত্রগুলোতে মানবদেহের গঠনগত চিত্র দেখা যায়। এসব চিত্রেহৃৎপিণ্ডও রয়েছে।

আধুনিক নৃবিদ্যা প্রাগৈতিহাসিক সময়ে ব্যবহৃত ওষুধের দিকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলর ইতিহাসে। এ অঞ্চলগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,রোগশোক সম্বন্ধে মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকতা মেশানো একটি মিশ্র অনুভূতি ছিল। তারা মনে করতো কোনো শয়তান বা অপদেবতার অভিশাপে কিংবা তারা যেসকল পাপ করেছে তার শাস্তি হিসেবে অসুখ বিসুখগুলো হয়ে থাকে। আর এসবের প্রতিকারের জন্য তারা রহস্যময় ও অতিপ্রাকৃত কিছু পদ্ধতির আশ্রয় নিতো।যেমন আত্মার উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন, ঈশ্বরের জন্য আত্মত্যাগ, অভিশাপ গুলো তুলে নেবার জন্য বিভিন্ন অজুহাত স্থাপন ইত্যাদি। পাশাপাশি তারা বিভিন্ন ধরনের মলম বা প্রলেপ জাতীয় জিনিসও ব্যবহার করতো যা তৈরি হতো উদ্ভিদ থেকে বা প্রাণীর বিভিন্ন অংশ যেমন রক্ত,হাড়ের গুঁড়া ইত্যাদি থেকে।

বিভিন্ন এলাকায় ব্যবহৃত ওষুধ বিভিন্ন রকম হতো, কেননা তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। ফলে নিজ এলাকায় যা পাওয়া যেত তাই কাজে লাগানো হতো। নৃবিজ্ঞানীগণধারণা করেন, প্রতি এলাকায় একজন করে ওঝা থাকতো যে এসব নিরাময় পদ্ধতি সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখতো। তাকে বিজ্ঞ ব্যক্তি, ধর্মযাজক, উপদেষ্টা এমনকি কখনো কখনো শাসকও মানা হতো। বিশ্বাস করা হতো যে, এই বিশেষ ব্যক্তিটির ঈশ্বর কিংবা আত্মার সাথে যোগাযোগ করার এক বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে এবং তিনি প্রাকৃতিক ওষুধ তৈরিতে কিংবা মালিশ করার মতো বিষয়গুলোতে সিদ্ধহস্ত।

প্রাগৈতিহাসিক চিকিৎসা নিয়ে গবেষণার পর তাদের কিছু নিরাময় পদ্ধতি সম্বন্ধে জানা যায়। যেমন হাড় ভেঙে গেলে সেটিকে ঠিক করার জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় এনে কাদা মাটি দিয়ে প্লাস্টার করে শুকাতে দেয়া হতো।বর্তমানেযেমনটা করা হয় সেটিরই তৎকালীন ভার্সন আরকি। সাথে বেঁধে দেয়া হতো

বন্ধফলক যেটি তৈরি হতো কাঠ, হাড় কিংবা শিং দিয়ে। ক্ষত স্থানে লাগানো হতো গাছের পাতায় তৈরি উপকারী প্রলেপ আর ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহার করা হতো প্রাণীর চামড়া।

পেটের পীড়া থেকে মুক্তি মিলতো অর্কিডের মূলের রস পানে। উইলো গাছের ছাল হচ্ছে অ্যাসিটাইল-স্যালিসাইলিক এসিড, সোজা কথায় অ্যাসপিরিনের উৎস। এটি চিবিয়ে খেলে ব্যথা উপশম হতো এবং ফুলে উঠা কমে যেত। শরীরের কোনো স্থান পুড়ে গেলে বিভিন্ন গাছের জাদুকরী রস লাগানো হতো। দূষিত খাদ্য থেকে রক্ষা পেতে কিংবা খাবারে প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহের জন্য খাওয়া হতো বিশেষ ধরনের কাদামাটি, যা geophagy বা মৃত্তিকাভক্ষক নামেপরিচিত।

দন্ত চিকিৎসাও পিছিয়ে ছিল না। মধ্য পশ্চিম পাকিস্তানের সিবির কাছে মেহেরগড় নামক প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে পাওয়া হাজারো জিনিসের মধ্যে এগারোটি ছিল মোলার দাঁত বা পেষণ দন্ত। এগুলো সম্ভবত নয়জন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির দাঁত ছিল। মজার ব্যপার হলো, চকচকে ধারালো সরু প্রান্ত যুক্ত কোনো একটি যন্ত্র দিয়ে দাঁতগুলো ছিদ্র করা হয়েছিল। গবেষকরা যন্ত্রটি পুনরায় তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। সম্ভবত যন্ত্রটি দিয়ে এক মিনিটের কম সময়ে দাঁতে ছিদ্র করা যেত। দাঁতের ও ছিদ্রের অবস্থা দেখে ধারণা করা হয় ছিদ্র করার সময় দাঁতের মালিক জীবিতই ছিলেন।

তুরপুন দিয়ে ছিদ্র করার এ পদ্ধতিটি মাথার খুলি ছিদ্র করে মস্তিস্কের আবরণ মেনিনজেস বের করার ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো হতো। পরে এ কাজটি করা হতো পাথরের ভাঙা ধারালো প্রান্ত দিয়ে হাড় বের করে আনার ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে হাড় টুকরো টুকরো করে অথবা মধ্যের স্থান থেকে উপড়িয়ে বের করে আনা হতো। আরো আধুনিক পদ্ধতি ছিল ঘূর্ণীয়মান করাতের ব্যবহার। ছিদ্র করার এ প্রক্রিয়ার মূল বিশ্বাস ছিল রোগীর শরীর থেক অশুভ শক্তিকে বের করে দেয়া। ছিদ্র করে বের করে আনা ভাঙা হাড়কেকবচ হিসেবে রাখা হতো যাতে সেই অশুভ জিনিসটি আবার ফিরে না আসে।

বর্তমানে অনুমান করা হয়, যেসব রোগীর ওপর এ পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে তারা সম্ভত অসহ্য মাইগ্রেনের ব্যথায় ভুগছিলেন অথবা তাদের অনিচ্ছাপূর্বক ধরে আনা হয়েছিল। এছাড়া আরো কারণ হতে পারে গভীর হতাশা, বাইপোলার ডিজঅর্ডার কিংবা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ। এরকম রক্তক্ষরণে মৃত্যুও হতে পারে। মস্তিষ্কের এসকল সমস্যার কারণে খুলি ছিদ্রকরণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। এটি সম্ভবত রক্তক্ষরণের কারণে জমে থাকা রক্ত বের করে চাপ কমাতে সাহায্য করতো।

১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং ইতালির মধ্যকার সীমান্তের কাছাকাছি আলপসনামক স্থানে প্রাকৃতিক উপায়ে মমি করে সংরক্ষণ করা একটি মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। এরনাম দেয়া হয় Otzi, the iceman। এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার গবেষণা করা মানুষের মৃতদেহ। Otzi-র বয়স ছিল ৪৫ বছর, মারা গিয়েছিল এখন হতে প্রায় ৫৩০০ বছর আগে। তার পরনে ছিল ঘাস দিয়ে বোনা আবরণ। তার গায়ে ছিল সত্যিকারের চামড়ার তৈরি গাত্রাবরণ এবং জুতা। সাথে রাখা ছিল ছুরি, কুঠার, তীর, ধনুক, গাছের ছাল এবং তৎকালীন চিকিৎসার জন্য যা যা লাগতো তার সব।

অটজির দেহের কিছু স্থান দখল করেছিল বুড়ো আঙ্গুলের সমান আকারের ২টি ফাঙাসের পিণ্ডবা মোল্ড। ফাঙ্গাস প্রজাতিটির নামPiptoporus betulinus। প্রত্যেকটি পিণ্ডে একটি করে ছিদ্র ছিল যাতে তারা সুরক্ষিতভাবে চামড়ার বস্ত্রের উপর অবস্থান করতে পারে। চিকিৎসাশাস্ত্রে এইফাঙ্গাসটির বেশ কিছু ব্যবহার আছে। এটি রেচক(কোষ্ঠ দূর করে এমন) হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে সেসাথে এটি ডায়রিয়া সৃষ্টির কারণও হতে পারে। এর কিছু অ্যান্টিবায়োটিক গুণও আছে, অন্ত্রের কৃমি ধ্বংসের জন্য এটি উপকারী। এরকমটা হয়েছিল কারণঅটজির দেহের বিস্তৃত গবেষণার পর তার বৃহদন্ত্রে কৃমির ডিমের সন্ধান পাওয়া যায়।

চিত্রঃ অটজির গায়ের ট্যাটু।

স্বাভাবিকভাবেই এই জায়গাগুলোতে তীব্র ব্যথা অনুভব করত সে। ট্যাটুগুলো আঁকা হয়েছিল ব্যথার এই স্থানগুলোতেই। তাহলে দাঁড়ায়, ট্যাটুগুলো ব্যথা হতে মুক্তির এক ধরনের সাংকেতিক চিকিৎসা। আরেকটি ব্যাপার ধারণা করা হয়, সমান্তরাল রেখাগুলি আকুপাংচার থেরাপির কারণে সৃষ্ট। চৈনিক চিকিৎসাবিদ্যায় এধরনের রেখাকে বলা হয় channels of meridians। অটজির সম্পূর্ণ রহস্য এখনো কিছুটা অজানা। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক চিকিৎসা যে বর্তমান অনেক পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবধর্মী ছিলOtzi তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।অটজির আরো চমকপ্রদ জিনিস হচ্ছে তার গায়ের ট্যাটু। সারা শরীর জুড়ে তার ৫০টিরও বেশি ট্যাটু রয়েছে। বাঁ হাতের কবজি, বাঁ পায়ের গুলি, ডান হাঁটু, উভয় গোড়ালি, ডান পায়ের পাতাএবং মেরুদণ্ডের নিচের দিকে উভয় পাশে ট্যাটুগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যেন একগুচ্ছ সমান্তরাল রেখা। চামড়ার উপরে কিছু দিয়ে কাটার পর তাতে চারকোল ঘষে দেয়া হয়েছে। এত জায়গাজুড়ে ট্যাটুগুলো আঁকানোর পরেও সেগুলো আসলে গায়ের আবরণ এবং জুতা দিয়ে ঢাকা থাকে। সুতরাং মনে হয় না যে সেগুলো শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যই আঁকা হয়েছে। এক্সরে এবং সিটি স্ক্যান করে দেখা গেছে অটজির মেরুদণ্ড, হাঁটু এবং গোড়ালির হাড়গুলোতে ক্ষয় হয়ে যাবার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

প্রাগৈতিহাসিক ওষুধপত্র

আজ থেকে প্রায় ৩০ হাজার বছর আগের কথা। শেষ বরফ যুগের কাছাকাছি। স্থানঃ পশ্চিম ইউরোপের আইবেরিয়ান পেনিনসুলার কোনো গুহার সামনের ফাঁকা একটি জায়গা। ঠিক সন্ধ্যে নামার মূহুর্তে একদল গাট্টাগোট্টা মানুষের দেখা মেলে, যাদের গায়ে ছিল অমসৃন লোমশ আবরণ। এরা ভীড় জমাতে শুরু করে ফার্ন, মস ইত্যাদি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি একটি মঞ্চের মতো জায়গার চারপাশে। মঞ্চের উপরে বসে ছিলেন দলের সবচেয়ে প্রবীন সদস্যটি। বয়স প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি। দেখে মনে হবেতার চোখ বন্ধ, যেন তিনি ঘুমাচ্ছেন। গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে আর নিঃশ্বাস ধীরগতির। হঠাৎতাকে ঘিরে থাকা দর্শকের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। একসময় তারা স্তব গাইতে শুরু করল। এর মধ্যে কেউ কেউ আবার হাত তুলে অস্ত যাওয়া সূর্যের দিকে ইঙ্গিত করতে লাগলো। আগুনের ঝিকিমিকি ছটার মাঝে কমবয়সী একজন তরুণী আর্তনাদের মতো শব্দ করে সামনে লাফিয়ে এগিয়ে আসলো এবং তিক্ত গন্ধযুক্ত একটি মিশ্রণ বৃদ্ধের মুখের সামনে ধরলো। খুব ধীরে প্রবীণ নড়ে উঠলেন, চোখ খুললেন এবং মৃদু হাসলেন।

প্রাগৈতিহাসিক ওষুধপত্র

দৃশ্যটি আসলে পুরোপুরিই কল্পিত। কিন্তু এমনই কিছু একটা হয়তো ঘটেছিল এল সিডারন নামের উত্তর পশ্চিম স্পেনের প্রসিদ্ধ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে। এখানে পাওয়া গেছে হাড় ও দাঁতের শত শত ফসিল বা জীবাশ্ম যা আসলে নিয়ান্ডারথাল(Homo neanderthalensis)প্রজাতির। এরাআমাদের সহোদর প্রজাতি। এই প্রজাতিটি ৩০ হাজার থেকে ২৫ হাজার বছর পূর্বেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ২০১২ সালে বিজ্ঞানীরা নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির ৫টি দাঁত বিশ্লেষণ করেন। এক্ষেত্রে তারা গ্যাস ক্রোমোটোগ্রাফি নামের

খুব উন্নত একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।প্রত্যেকটি দাঁতের ক্যালকুলাস নামক শক্ত প্লাক স্তরে আটকে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেছে ক্ষুদ্র অণুজীব এবং কিছু উদ্ভিদের জীবাশ্ম।

ধারণা করা হয়, দাঁতের মালিক উদ্ভিদগুলো কোনো কারণে খেয়েছিলেন ফলে সেগুলো প্লাক স্তরে আটকে গিয়েছিল। এর মধ্যে একজনের মুখে তিক্তস্বাদযুক্ত কিছু গুল্ম পাওয়া গেছে।যেমন ইয়েরো নামক উগ্রগন্ধের ফুল এবং ক্যারোমিল। এসব উদ্ভিদের আসলে কোনো পুষ্টিগুণ নেই। তবে কেন এসবখেয়েছিল? একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে উদ্ভিদগুলোর ওষুধিগুণ ছিল। ইয়েরো উদ্ভিদ যুগ যুগ ধরে শক্তিবর্ধক হিসেবে আর ক্যারোমিল উত্তেজনা ও প্রদাহ নিরোধক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

এল সিডারনে পাওয়া এই প্রমাণ আদিকালের রোগবালাইয়ের প্রতিষেধক, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে সাহায্য করে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানার্জন নির্ভর করে মূলত সংরক্ষিত মৃতদেহ, হস্তনির্মিত বস্তু(যেমন যন্ত্রপাতি, অলংকার) কিংবা প্রাকৃতিক জিনিসপত্র(যেমন উদ্ভিদের বীজ,প্রাণীর জীবাশ্ম) ইত্যাদির উপর। এছাড়া গুহাচিত্র আর প্রস্তরশিল্প থেকেও অনেক কিছু ধারণা করা যায়। প্রাগৈতিহাসিক চিত্রগুলোতে মানবদেহের গঠনগত চিত্র দেখা যায়। এসব চিত্রেহৃৎপিণ্ডও রয়েছে।

আধুনিক নৃবিদ্যা প্রাগৈতিহাসিক সময়ে ব্যবহৃত ওষুধের দিকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলর ইতিহাসে। এ অঞ্চলগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,রোগশোক সম্বন্ধে মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকতা মেশানো একটি মিশ্র অনুভূতি ছিল। তারা মনে করতো কোনো শয়তান বা অপদেবতার অভিশাপে কিংবা তারা যেসকল পাপ করেছে তার শাস্তি হিসেবে অসুখ বিসুখগুলো হয়ে থাকে। আর এসবের প্রতিকারের জন্য তারা রহস্যময় ও অতিপ্রাকৃত কিছু পদ্ধতির আশ্রয় নিতো।যেমন আত্মার উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন, ঈশ্বরের জন্য আত্মত্যাগ, অভিশাপ গুলো তুলে নেবার জন্য বিভিন্ন অজুহাত স্থাপন ইত্যাদি। পাশাপাশি তারা বিভিন্ন ধরনের মলম বা প্রলেপ জাতীয় জিনিসও ব্যবহার করতো যা তৈরি হতো উদ্ভিদ থেকে বা প্রাণীর বিভিন্ন অংশ যেমন রক্ত,হাড়ের গুঁড়া ইত্যাদি থেকে।

বিভিন্ন এলাকায় ব্যবহৃত ওষুধ বিভিন্ন রকম হতো, কেননা তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। ফলে নিজ এলাকায় যা পাওয়া যেত তাই কাজে লাগানো হতো। নৃবিজ্ঞানীগণধারণা করেন, প্রতি এলাকায় একজন করে ওঝা থাকতো যে এসব নিরাময় পদ্ধতি সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখতো। তাকে বিজ্ঞ ব্যক্তি, ধর্মযাজক, উপদেষ্টা এমনকি কখনো কখনো শাসকও মানা হতো। বিশ্বাস করা হতো যে, এই বিশেষ ব্যক্তিটির ঈশ্বর কিংবা আত্মার সাথে যোগাযোগ করার এক বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে এবং তিনি প্রাকৃতিক ওষুধ তৈরিতে কিংবা মালিশ করার মতো বিষয়গুলোতে সিদ্ধহস্ত।

প্রাগৈতিহাসিক চিকিৎসা নিয়ে গবেষণার পর তাদের কিছু নিরাময় পদ্ধতি সম্বন্ধে জানা যায়। যেমন হাড় ভেঙে গেলে সেটিকে ঠিক করার জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় এনে কাদা মাটি দিয়ে প্লাস্টার করে শুকাতে দেয়া হতো।বর্তমানেযেমনটা করা হয় সেটিরই তৎকালীন ভার্সন আরকি। সাথে বেঁধে দেয়া হতো

বন্ধফলক যেটি তৈরি হতো কাঠ, হাড় কিংবা শিং দিয়ে। ক্ষত স্থানে লাগানো হতো গাছের পাতায় তৈরি উপকারী প্রলেপ আর ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহার করা হতো প্রাণীর চামড়া।

পেটের পীড়া থেকে মুক্তি মিলতো অর্কিডের মূলের রস পানে। উইলো গাছের ছাল হচ্ছে অ্যাসিটাইল-স্যালিসাইলিক এসিড, সোজা কথায় অ্যাসপিরিনের উৎস। এটি চিবিয়ে খেলে ব্যথা উপশম হতো এবং ফুলে উঠা কমে যেত। শরীরের কোনো স্থান পুড়ে গেলে বিভিন্ন গাছের জাদুকরী রস লাগানো হতো। দূষিত খাদ্য থেকে রক্ষা পেতে কিংবা খাবারে প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহের জন্য খাওয়া হতো বিশেষ ধরনের কাদামাটি, যা geophagy বা মৃত্তিকাভক্ষক নামেপরিচিত।

দন্ত চিকিৎসাও পিছিয়ে ছিল না। মধ্য পশ্চিম পাকিস্তানের সিবির কাছে মেহেরগড় নামক প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে পাওয়া হাজারো জিনিসের মধ্যে এগারোটি ছিল মোলার দাঁত বা পেষণ দন্ত। এগুলো সম্ভবত নয়জন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির দাঁত ছিল। মজার ব্যপার হলো, চকচকে ধারালো সরু প্রান্ত যুক্ত কোনো একটি যন্ত্র দিয়ে দাঁতগুলো ছিদ্র করা হয়েছিল। গবেষকরা যন্ত্রটি পুনরায় তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। সম্ভবত যন্ত্রটি দিয়ে এক মিনিটের কম সময়ে দাঁতে ছিদ্র করা যেত। দাঁতের ও ছিদ্রের অবস্থা দেখে ধারণা করা হয় ছিদ্র করার সময় দাঁতের মালিক জীবিতই ছিলেন।

তুরপুন দিয়ে ছিদ্র করার এ পদ্ধতিটি মাথার খুলি ছিদ্র করে মস্তিস্কের আবরণ মেনিনজেস বের করার ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো হতো। পরে এ কাজটি করা হতো পাথরের ভাঙা ধারালো প্রান্ত দিয়ে হাড় বের করে আনার ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে হাড় টুকরো টুকরো করে অথবা মধ্যের স্থান থেকে উপড়িয়ে বের করে আনা হতো। আরো আধুনিক পদ্ধতি ছিল ঘূর্ণীয়মান করাতের ব্যবহার। ছিদ্র করার এ প্রক্রিয়ার মূল বিশ্বাস ছিল রোগীর শরীর থেক অশুভ শক্তিকে বের করে দেয়া। ছিদ্র করে বের করে আনা ভাঙা হাড়কেকবচ হিসেবে রাখা হতো যাতে সেই অশুভ জিনিসটি আবার ফিরে না আসে।

বর্তমানে অনুমান করা হয়, যেসব রোগীর ওপর এ পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে তারা সম্ভত অসহ্য মাইগ্রেনের ব্যথায় ভুগছিলেন অথবা তাদের অনিচ্ছাপূর্বক ধরে আনা হয়েছিল। এছাড়া আরো কারণ হতে পারে গভীর হতাশা, বাইপোলার ডিজঅর্ডার কিংবা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ। এরকম রক্তক্ষরণে মৃত্যুও হতে পারে। মস্তিষ্কের এসকল সমস্যার কারণে খুলি ছিদ্রকরণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। এটি সম্ভবত রক্তক্ষরণের কারণে জমে থাকা রক্ত বের করে চাপ কমাতে সাহায্য করতো।

১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং ইতালির মধ্যকার সীমান্তের কাছাকাছি আলপসনামক স্থানে প্রাকৃতিক উপায়ে মমি করে সংরক্ষণ করা একটি মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। এরনাম দেয়া হয় Otzi, the iceman। এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার গবেষণা করা মানুষের মৃতদেহ। Otzi-র বয়স ছিল ৪৫ বছর, মারা গিয়েছিল এখন হতে প্রায় ৫৩০০ বছর আগে। তার পরনে ছিল ঘাস দিয়ে বোনা আবরণ। তার গায়ে ছিল সত্যিকারের চামড়ার তৈরি গাত্রাবরণ এবং জুতা। সাথে রাখা ছিল ছুরি, কুঠার, তীর, ধনুক, গাছের ছাল এবং তৎকালীন চিকিৎসার জন্য যা যা লাগতো তার সব।

অটজির দেহের কিছু স্থান দখল করেছিল বুড়ো আঙ্গুলের সমান আকারের ২টি ফাঙাসের পিণ্ডবা মোল্ড। ফাঙ্গাস প্রজাতিটির নামPiptoporus betulinus। প্রত্যেকটি পিণ্ডে একটি করে ছিদ্র ছিল যাতে তারা সুরক্ষিতভাবে চামড়ার বস্ত্রের উপর অবস্থান করতে পারে। চিকিৎসাশাস্ত্রে এইফাঙ্গাসটির বেশ কিছু ব্যবহার আছে। এটি রেচক(কোষ্ঠ দূর করে এমন) হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে সেসাথে এটি ডায়রিয়া সৃষ্টির কারণও হতে পারে। এর কিছু অ্যান্টিবায়োটিক গুণও আছে, অন্ত্রের কৃমি ধ্বংসের জন্য এটি উপকারী। এরকমটা হয়েছিল কারণঅটজির দেহের বিস্তৃত গবেষণার পর তার বৃহদন্ত্রে কৃমির ডিমের সন্ধান পাওয়া যায়।

চিত্রঃ অটজির গায়ের ট্যাটু।

স্বাভাবিকভাবেই এই জায়গাগুলোতে তীব্র ব্যথা অনুভব করত সে। ট্যাটুগুলো আঁকা হয়েছিল ব্যথার এই স্থানগুলোতেই। তাহলে দাঁড়ায়, ট্যাটুগুলো ব্যথা হতে মুক্তির এক ধরনের সাংকেতিক চিকিৎসা। আরেকটি ব্যাপার ধারণা করা হয়, সমান্তরাল রেখাগুলি আকুপাংচার থেরাপির কারণে সৃষ্ট। চৈনিক চিকিৎসাবিদ্যায় এধরনের রেখাকে বলা হয় channels of meridians। অটজির সম্পূর্ণ রহস্য এখনো কিছুটা অজানা। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক চিকিৎসা যে বর্তমান অনেক পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবধর্মী ছিলOtzi তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।অটজির আরো চমকপ্রদ জিনিস হচ্ছে তার গায়ের ট্যাটু। সারা শরীর জুড়ে তার ৫০টিরও বেশি ট্যাটু রয়েছে। বাঁ হাতের কবজি, বাঁ পায়ের গুলি, ডান হাঁটু, উভয় গোড়ালি, ডান পায়ের পাতাএবং মেরুদণ্ডের নিচের দিকে উভয় পাশে ট্যাটুগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যেন একগুচ্ছ সমান্তরাল রেখা। চামড়ার উপরে কিছু দিয়ে কাটার পর তাতে চারকোল ঘষে দেয়া হয়েছে। এত জায়গাজুড়ে ট্যাটুগুলো আঁকানোর পরেও সেগুলো আসলে গায়ের আবরণ এবং জুতা দিয়ে ঢাকা থাকে। সুতরাং মনে হয় না যে সেগুলো শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যই আঁকা হয়েছে। এক্সরে এবং সিটি স্ক্যান করে দেখা গেছে অটজির মেরুদণ্ড, হাঁটু এবং গোড়ালির হাড়গুলোতে ক্ষয় হয়ে যাবার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।