বায়োনিক কান

প্রতিদিনই নানা রকম শব্দের সম্মুখীন হই। কিন্তু সব শব্দই কি শুনতে ভালো লাগে? গান কিংবা কোনো মধুর কন্ঠস্বর শুনতে হয়তো কোনো সমস্যা নেই কারো কিন্তু সেটা যদি হয় বাস, ট্রাক বা ট্রেনের হুইসেল কিংবা কোনো সমাবেশে লোকজনের অবাঞ্চিত চিৎকার-চেঁচামেচি, তাহলে সেটা বিরক্তির জন্ম দেয়। এরকম অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা প্রতিনিয়তই। আর আমরা যারা বাংলাদেশের বিশেষ করে ঢাকার নাগরিক তাদের কথা নাই বললাম।

কেমন হতো যদি আমরা এই শ্রুতিকটু শব্দকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম? আপনার বাসায় উচ্চ শব্দে টেলিভিশন চলছে বা গান বাজছে, তখন আপনি কী করবেন? হয়তো টিভিসেটের সাউন্ড কমিয়ে দিবেন। তেমনি, আমরা যখন হট্টগোলে পরে যাই যা শুনতে আমাদের বিরক্তি লাগে, তখন যদি সেই শব্দগুলোর ভলিউম কমিয়ে শুনতে পারতাম কিংবা যে শ্রুতিমধুর শব্দের ভলিউম কম সেটাকে যদি বাড়িয়ে শুনতে পারতাম তাহলে ব্যাপারটা দারুণ হতো না?

ঠিক তেমনই একটা যুগান্তকারী যন্ত্র আবিষ্কার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান ডপলার ল্যাব। এর নাম বায়োনিক কান (Bionic ears)। এই যন্ত্রটির সাহায্যে আমরা চাইলেই যেকোনো শব্দের ভলিউম কমাতে বা বাড়াতে পারব।

যারা কানে শুনতে পায় না অথবা কম শুনে তাদের জন্য এটি আরো খুশির বার্তা নিয়ে এসেছে। যন্ত্রটি নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের প্রধান জেফ গ্রেইনারের মতে এই যন্ত্রটি দ্বারা বধিররা আগের তুলনায় ১০-৫০ গুণ পরিষ্কারভাবে শুনতে পারবে।

সংক্ষেপে এই যুগান্তকারী যন্ত্রটির গঠনকৌশল এবং এর কার্যপ্রণালী জেনে নেয়া যাক। এই যন্ত্রটিকে দুটি প্রধান অংশে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমটি internal part এবং দ্বিতীয়টি external part। এই প্রধান অংশগুলোর আবার বিভিন্ন উপাংশ রয়েছে।

Internal part ভিতরের অংশ এই অংশটুকু একটা ছোট অপারেশনের মাধ্যমে কানের অভ্যন্তরে ককলিয়ার সাথে বসানো হয় এবং ককলিয়ার স্নায়ুর সাথে সংযুক্ত করা হয়। এই অংশে glutamate নামক একটা যন্ত্র থাকে যার মাধ্যমে ককলিয়ার স্নায়ুকে উদ্দীপিত করা হয় যার ফলে উক্ত স্নায়ু external part থেকে প্রাপ্ত শব্দকে মস্তিস্কে প্রেরণ করে এবং মস্তিষ্ক শ্রবণের অনুভূতি তৈরি করে। ফলে আমরা সেই শব্দগুলো শুনতে পাই, যেগুলো external part থেকে আগেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসে।

External part বাইরের অংশ এটা খুব ছোট একটা যন্ত্র যা আমাদের কানের পিছনের অংশে লাগানো থাকে। এই যন্ত্রটির কয়েকটা উপ-অংশ নিয়ে গঠিত। ১. মাইক্রোফোন, যা পরিবেশ থেকে শব্দকে গ্রহণ করে। ২. শব্দ নিয়ন্ত্রক, যা মাইক্রোফোন থেকে প্রাপ্ত শব্দকে প্রয়োজন অনুসারে কমিয়ে বা বাড়িয়ে শ্রবণ উপযোগী করে তুলে। ৩. একটা প্রেরক যন্ত্র (transmitter) যা তড়িৎ-চুম্বকীয় আবেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত শব্দকে কানের অভ্যন্তরে রাখা internal device-এ প্রেরণ করে।

কিন্তু এই আলোচিত যন্ত্রটি ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কতটুকু সফল বা ফলপ্রসূ হতে পেরেছে? সর্বপ্রথম Alex Fitzpatrick নামক একজন ব্যক্তির দেহে এই বায়োনিক কান সফলভাবে লাগানো হয়। ১ ডিসেম্বর, ২০১৩ অবধি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরই ৩ লক্ষ ২৪ হাজার জন লোক এই যন্ত্রটি ব্যবহার করছে। যাদের মধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার শিশু। এছারাও যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, ইসরাইল, নিউজিল্যান্ড, চীন সহ আরো অনেক দেশেই এ যন্ত্রটি ব্যাপকভাবে প্রসারলাভ করেছে।

যদিও এ যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছিল শুধুমাত্র মিউজিসিয়ানদের জন্য কিন্ত পরবর্তীতে সাধারণ জনগণও এটা ব্যবহার করতে শুরু করে। এমনটাই বলেছেন ডপলার ল্যাবের CEO জনাব Noah Kraft।

তথ্যসূত্রঃ

১. en.wikipedia.org/wiki/Cochlear_implant

২. http://techfreep.com/bionic-ear-gives-cyborg-like-hearing.htm

featured image: thenextweb.com