যেভাবে কাজ করে অপটিক্যাল ফাইবার

পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ব্যাপারে আমরা সবাই কমবেশি জানি। আলোকরশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা মাধ্যমে কৌণিকভাবে প্রবেশের সময় একটি নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে অভিলম্বের ওপর আপতিত হলে, আপতিত আলোর পুরোটাই প্রতিফলিত হয়। প্রতিফলিত হয়ে প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে।

এখান থেকে একটু অগ্রসর হয়ে আমরা একটি পরীক্ষা করে দেখতে পারি। একটি পাত্রকে তরল পদার্থ দ্বারা পূর্ণ করা হলো। ছবিতে দ্রষ্টব্য। এরপর একদিক থেকে একটি লেজার রশ্মি তরলের ভেতর সরলরেখা বরাবর প্রক্ষেপণ করা হলো।

অপরদিকে লেজারের সাপেক্ষে একই উচ্চতায় একটি ছিদ্র করা হলো। ছিদ্র দিয়ে তরল নীচের দিকে প্রাসের গতিপথের মতো পতিত হয়। দেখা যাবে তরলের ভেতর দিয়ে আলো এমনভাবে অগ্রমুখী হচ্ছে যেন এর গতিপথ বক্র। অথচ আলো বা লেজারের গতিপথ কখনোই বক্র নয়। আসলে পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ফলে তরল আর বাতাসের সীমানায় প্রতিফলিত হয়ে হয়ে সামনে এগুচ্ছে।

ঘন তরল মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা বায়ু মাধ্যমে প্রবেশ করতে গেলে, নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত আলো তরলের মধ্যেই আটকা পড়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কৌণিক শর্ত পূরণ হতে থাকবে, পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আলো যে কোনো পথে এগোতে পারবে, এক্ষেত্রে প্রাসের গতিপথ বরাবর এগুচ্ছে।

উপরের চিত্রে তরল হিসেবে প্রোপিলিন- গ্লাইকল ব্যবহার করা হয়েছে। মাধ্যম কতটা ঘন তা refractive index বা প্রতিসরণাঙ্ক নামক একটি ধ্রুবক থেকে বোঝা যায়। এর মান যত বড় হবে, বুঝতে হবে মাধ্যম ততটাই ঘন। এক্ষেত্রে তীর চিহ্ন বরাবর অভিলম্বের সাথে ৪৪.৩৫ ডিগ্রি এর বেশি কোণে আপতিত হলে তরলের ভেতর পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হবে।

উপরে তরল ও লেজার আলোক ব্যবহার করে যে ব্যাপারটি আলোচনা করা হলো তা-ই আসলে অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তরলের বদলে বিশেষ ধরনের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। একে সাধারণভাবে বলা যায় কাচ।

একটু সঠিক করে বলতে গেলে বলা যায় এক্ষেত্রে দুই স্তরের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। ভেতরের স্তরকে বলা হয় core যা প্রধানত সিলিকন ডাই-অক্সাইড দ্বারা গঠিত। বাইরের স্তরকে বলা হয় cladding। এটি সিলিকন ডাই-অক্সাইড দিয়ে গঠিত। এতে সামান্য বোরন এবং জার্মেনিয়ামের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। এটি করা হয় প্রতিসরণাঙ্ক core অপেক্ষা কিছুটা কমানোর জন্য। পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত সৃষ্টি করবার জন্য মাত্র ১% প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যই যথেষ্ট।

এক্ষেত্রে অবশ্যই একটি প্রশ্ন আসতে পারে, যদি আপতিত আলো সঙ্কট কোণের চেয়ে কম কোণে আপতিত হয়? হ্যাঁ এরকম ঘটনা ঘটতে পারে দুই উপায়ে। ১) ফাইবারের ভেতরে কিছুটা বিকৃতি থাকলে এবং ২) একটি সীমাস্থ পরিমাণের চেয়ে বেশি পরিমাণে ফাইবারটিকে বাঁকালে।

চিত্র: ফাইবারের ভেতর বিকৃতি

চিত্র: বেশি পরিমাণে বাঁকানো

এক্ষেত্রে আলোকের নির্দিষ্ট অংশ অপচয় হবে এবং তা সামনে এগুতে পারবে না। তাই এই দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

তথ্যকে ডিজাটাল রূপে রূপান্তরিত করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পাঠানো যায়। যেমন বৈদ্যুতিক মাধ্যমে। এরপর একসময় আসলো অপটিক্যাল ফাইবারের ধারণা। তথ্য যদি বৈদ্যুতিকভাবে না পাঠিয়ে আলো দ্বারা কোনোভাবে পাঠানো যায়, তাহলে তার প্রেরণের গতি নিশ্চয়ই বেশি হবে। কারণ আলোর গতি সবচেয়ে বেশি।

১ এবং ০ এর বদলে আলোর উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি দ্বারাও দুটি অবস্থা প্রকাশ করা যায়। এক্ষেত্রে যেটি করতে হবে, প্রেরক প্রান্তে প্রথমে সিগন্যালকে ০ এবং ১ এর সিরিজে পরিণত করতে হবে। তারপর ১ এর জন্য আলো পাঠানো এবং ০ এর জন্য আলোর অনুপস্থিতি নির্ধারিত থাকবে। প্রাপক প্রান্তে এভাবে বার্তা গ্রহণ করার পর তাকে আবার ১ এবং ০ এর সিরিজে রূপান্তরিত করা হয়। তারপর সেখান থেকে থেকে আবার মূল সিগনালে রূপান্তরিত করা হয়।

অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করার ফলে খুব দ্রুত বেগে (আলোর বেগের ৭০% বেগে) তথ্য আদান প্রদান করতে পারছি। দ্রুততার কারণেই বর্তমানে প্রায় সকল ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিক ক্যাবল ব্যবহার করা হয়।

ক্যাবল বলতে আমরা যে দুই স্তর বিশিষ্ট মাধ্যমকে বোঝাচ্ছি, তা আসলে খুবই সরু। বাইরে সুরক্ষা বেষ্টনী ব্যবহার করার কারণে এটি মোটা দেখায়।

চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবলের গঠন
চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবল দেখতে যেমন

একেকটি সরু ফাইবারের বাইরে বেশ কয়েকটি স্তর থাকে। চূড়ান্তভাবে পুরো ক্যাবলটির ব্যাস হয় ১ ইঞ্চির মতো। সর্বপ্রথম যেই ক্যাবল-টি ব্যবহার করা হয়েছিল তা ছিল TAT-8 ক্যাবল। এতে একসাথে ছয়টি ক্যাবল একটি শক্ত ভিত্তিকে কেন্দ্র করে চক্রাকারে সাজানো হয়েছিল। বাইরে আরও বেশ কয়েকটি স্তর ছিল যার ফলে সমুদ্রের ভেতর দিয়ে ৩৫০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রথম ফাইবার দ্বারা টেলিযোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। এটি একইসাথে ৪০ হাজার কানেকশন/কল স্থাপন করতে পারতো।

আজ এ পর্যন্তই, পরবর্তীতে হাজির হবো ফাইবার অপটিকের নতুন কোনো ম্যাকানিজম নিয়ে।

চুম্বকের ভেতরের কথা

গল্পটা শুরু করা যাক। ছোটবেলায় সবচেয়ে পছন্দের খেলনা ছিল চুম্বক। কোথা থেকে কি ভেঙ্গে একবার কীভাবে যেন একটা চুম্বক পেলাম। আমার নির্মমতায় তা কয়েকখণ্ড হয়ে গেল। খণ্ডগুলো দেখলাম দুষ্ট ছেলেপিলের মত একটা আরেকটাকে লাথি মারে, কখনও আবার কী ভাব তাদের! দূর থেকে দেখলেই ছুটে যায়, ধরে রাখা যায়না হাতে।

বুঝলামনা মাথামুণ্ডু কিছুই, তাড়িয়ে দেয় কীভাবে, কাছেই বা টানে কীভাবে! যেদিককে যে দিক লাথি মারে তারা আবার কখনোই নিজেদের টানেনা কাছে! পড়লাম মহা মুশকিলে।বইপত্র ঘেঁটে দেখি রাবার ব্যান্ডের মত চৌম্বকবলরেখা না কী সব যেন আঁকা, সব বস্তুর নাকি ও রেখা উৎপন্ন করার সাধ্য নেই! যাইহোক, ব্যাপারটার তল খতিয়ে দেখার স্পৃহা থেকে যতটুকু সম্ভব গভীরে গেলাম।

যে যুগে পদার্থের ভেতরের পারমাণবিক বা আণবিক বৈশিষ্ট্য জানার কোনো সুযোগ ছিলনা, বিজ্ঞানীরা তখনও মানতেন যে চুম্বক এবং চৌম্বকপদার্থ যে খেল দেখাচ্ছে তার সাথে তড়িতের কোনো না কোনো সম্পর্ক রয়েছে। চৌম্বকবলরেখা সম্পর্কে সবচেয়ে পরিচিত ছবিটির ব্যাখ্যা দেয়া যাক।

একটি দণ্ড চুম্বক। এর উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু নামক দুটি মেরু রয়েছে। সর্বজনস্বীকৃত বিধান অনুযায়ী বলবো উত্তর মেরু থেকে চৌম্বকবলরেখা নামক কিছু রেখা বেরিয়ে দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ করছে। তড়িতের ক্ষেত্রে যেমন সর্বদা ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্ত থেকে ঋণাত্মক প্রান্তের দিকে প্রবাহের দিক ধরা হয় তেমনই একটি ব্যাপার।

এক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রথমত এই রেখাগুলো হচ্ছে বলরেখা বা শক্তিরেখা অর্থাৎ কোনো এক প্রকার শক্তির সূচনা হচ্ছে একটি প্রান্তে এবং সমাপ্তি অপর প্রান্তে। দ্বিতীয়ত, শক্তিরেখাগুলো এলোমেলোভাবে না ছড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করছে। কিন্তু গতিপথের চেহারা ঠিক এরূপই কেন? উত্তর দেবার আগে একটু পরমাণু জগতে ঢুঁ মারি।

বেশ, একটি ইলেকট্রন এবং একটি প্রোটন এরুপ দূরত্বে থাকলে একে অপরকে আকর্ষণ করবে, এবার চুম্বকের পোলের দিকে খেয়াল করিঃ-

একটি উত্তর মেরু এবং একটি দক্ষিণ মেরু এর মধ্যে ঠিক একই রূপ আকর্ষণ বিদ্যমান। এখনঃ-

চার্জ দুটির আশেপাশে কোথাও একটি ধনাত্মক আধান রেখে আমরা তার ওপর চার্জ দুটির প্রভাব যদি খেয়াল করি তবে দেখব ধনাত্মক আধানটি প্রোটনের বিকর্ষণ বলের দিক এবং ইলেকট্রনের আকর্ষণ বল,দুই বলের লব্ধি বলের দিকে ভ্রমন করছে।

এখন একটি শক্তিশালী দণ্ড চুম্বকের পাশে আমরা যদি বিভিন্ন অবস্থানে একটি চুম্বক শলাকাকে স্থাপন করি তবে স্বাভাবিকভাবেই শলাকা এবং চুম্বকের সম পোলগুলোর মধ্যে আকর্ষণ এবং বিপরীত পোলগুলোর মধ্যে বিকর্ষণের ফলে লব্ধি বলের দিকে শলাকা অবস্থান নেবে। এখন শলাকার যে কোনো একটি পোলের অবস্থানের গতিপথ যদি আমরা যোগ করে দিই তবে সেই আকাঙ্ক্ষিত বলরেখার পথটিই পাবো।

ব্যাপারটি আরও পরিষ্কার হবে যদি আমরা বলরেখা বা magnetic line of flux বা magnetic line of force এর তাত্ত্বিক সংজ্ঞাটি খেয়াল করিঃ-

“যখন একটি বিচ্ছিন্ন একক চুম্বক মেরু(হয় উত্তর অথবা দক্ষিণ) একটি চুম্বক ক্ষেত্রে রাখা হয়, এটি আকর্ষণ এবং বিকর্ষণ উভয় বল অনুভব করে, বিপরীত এবং সমমেরুর প্রভাবে, দুটি বলের লব্ধি বলের কারণে মেরুটি একটি পথে ভ্রমন করবে, সেই পথের নামই চৌম্বকবলরেখা। এরকম অসংখ্য পথকে সম্মিলিতভাবে magnetic flux বলা যায়।”

এই সংজ্ঞার মধ্যে একটু ঘাপলা আছে যা পরে ব্যাখ্যা করছি।

আমরা যদি উপরের ছবির প্রতিটা অবস্থানে একক মেরুটি বসিয়ে তার গতিপথ গাণিতিকভাবে নির্ণয় করতাম তবে ছোট ছোট যেই অভিক্ষেপগুলো পেতাম তার যোগফল হল একটি রেখা। তাই বলা যায় মেরুটি রেখা বরাবর যাত্রা করেনা বরং তার যাত্রাপথের ওপর লক্ষ করেই রেখাটি আঁকা হয়েছে।

এই বলরেখাগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছেঃ-

(১)বলরেখার দিক ধরা হয় উত্তর মেরু থেকে দক্ষিনের দিকে।

(২)বলরেখাগুলো একে অপরকে ছেদ করেনা।

(৩)বলরেখাগুলো বদ্ধ লুপ বা প্যাঁচ তৈরি করে। ইলেকট্রন-প্রোটনের সাথে তুলনা বা analogy দেয়ার সময় আমরা একটি একক মেরুর সাথে একক চার্জের মিল পেলেও চার্জ এবং পোলের মধ্যে যেই সুস্পষ্ট পার্থক্যটি রয়েছে তা হল একক অস্তিত্ব। একক চার্জ খুবই সাধারণ একটি বিষয় হলেও বাস্তবজগতে একক মেরু বলে কিছু নেই, এটি একটি গাণিতিক ধারণামাত্র। ফলস্বরূপ একটি একক চার্জের চারিদিকে তার যে শক্তিরেখা তা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।যেমনঃ-

কিন্তু একক মেরু বলতে যেহেতু কিছুর অস্তিত্বই নেই তাই চুম্বকের শক্তিরেখা আবদ্ধ। প্রশ্ন হতে পারে চুম্বককে দুভাগ করলেই তো হয়? তখন যা হয়ঃ-

অর্থাৎ ভগ্ন অংশ নিজেই আরেকটি স্বকীয় চুম্বকে পরিণত হয়। তখন এক মেরু থেকে যেই শক্তিরেখা বের হয় তা চারিদিকে না ছড়িয়ে বিপরীত মেরুর দিকে আকৃষ্ট হয়। একারণে চৌম্বকবলরেখা বদ্ধ হয়।

(৪) বলরেখাগুলো স্থিতিস্থাপক ইলাস্টিকের মত আচরণ করে।মোট কথা,বলরেখার স্থিতিস্থাপক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিপরীত মেরুর মধ্যে আকর্ষণ আর সমমেরুর বিকর্ষণের ব্যাখ্যা দেয়া যায় এইভাবেঃ-

ধরা যাক উত্তর মেরু থেকে কিছু রেখা দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ করল। স্থিতিস্থাপক বস্তুর ধর্ম হল টানলে সরণের বিপরীত দিকে একটি বলের সৃষ্টি হয়, তাই পোল দুটি দূরত্ব কমিয়ে স্থিত অবস্থা লাভের চেষ্টা করে।

যেহেতু সমপোল হতে বলরেখা সমপোলে প্রবেশ করবেনা এবং একটি রেখা আরেকটিকে ছেদ করবেনা বা আরেকটির অভ্যন্তরে ঢুকে যাবেনা তাই দুটি বিপরীত পোল কাছাকাছি আনলে অনেকটা সঙ্কুচিত রাবার ব্যান্ডের মত অবস্থা সৃষ্টি হয় যা প্রসারিত হয়ে স্থিত অবস্থায় আসতে চায়, ফলে বিকর্ষণ বলের সৃষ্টি হয়।

চলমান চার্জের চৌম্বকীয় ধর্মঃ-

চৌম্বকবলরেখা ব্যাখ্যা করার সময় একটি দণ্ড চুম্বকের চারপাশে বিভিন্ন অবস্থানে রেখে চুম্বক শলাকা রেখে প্রভাব দেখা হয়েছিল। দণ্ড চুম্বকের বদলে যদি ওখানে কিছু চার্জ রাখা হত তবে শলাকায় কোনো বিক্ষেপ হতনা। তবে সেই চার্জগুলোই চলমান অবস্থায় থাকলে তার চারপাশে একটি চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হত যার কারণে শলাকা বিক্ষেপ দেবে। আমরা চৌম্বকক্ষেত্রকে সংক্ষেপে B বলব। এই ব্যাপারটি প্রথম ব্যাখ্যাসহ প্রমান করেন Oersted নামক একজন অসাধারণ বিজ্ঞানী।

চিত্রঃ একটি বর্তনীতে প্রবাহের দরুন সৃষ্ট B শলাকার বিক্ষেপ ঘটাচ্ছে।

এখানে দুটো জিনিস রয়েছে, একটি বদ্ধ বর্তনী এবং একটি চুম্বক। এইযে তড়িৎ প্রবাহের ফলে একধরনের চৌম্বকত্ব সৃষ্টি হল,একেই বলে তড়িৎচুম্বক বা electromagnet। যদি পরিবর্তনশীল বা alternating current(A.C) ব্যবহার করা হয় তবে B এর মান এবং দিক দুটিই পরিবর্তিত হবে।

তার ১২ বছর পর বিজ্ঞানের আরেক দিকপাল মাইকেল ফ্যারাডে বলেনঃ-

“যখন কোনো বদ্ধ তার কুণ্ডলীতে আবদ্ধ চৌম্বক আবেশরেখার সংখ্যা বা ফ্লাক্সের পরিবর্তন ঘটে তখন উক্ত বর্তনীতে একটি তড়িচ্চালক শক্তি আবিষ্ট হয়।”

এটি তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের প্রথম সূত্র হিসেবে বিখ্যাত।

উপরের সূত্র দুটির সম্পর্কের ব্যাপারে বলা যায়, অনেকটা এরকম, দিনের শেষে রাত আসবে আর রাতের শেষে দিন। তড়িৎ প্রবাহ থেকে চুম্বক পাব আর চুম্বক থেকে তড়িৎ। ফ্যারাডের প্রথম সূত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বর্তনী ও চুম্বকের মধ্যে আপেক্ষিক গতি থাকতে হবে তবেই তড়িৎ উৎপন্ন হবে, গতির ফলে প্রতি মুহূর্তে কুণ্ডলী দিয়ে অতিক্রান্ত ফ্লাক্স সংখ্যার ভিন্নতা ঘটবে, গতি যদি না থাকে তবে অন্য কোনো উপায়ে প্রতি মুহূর্তে ফ্লাক্স সংখ্যার ভিন্নতা ঘটাতে হবে(সেটি কি হতে পারে?!)। উৎপন্ন তড়িচ্চালক শক্তি ফ্লাক্সের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক হবে। এই ব্যাপারটিকে বলা হচ্ছে তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের দ্বিতীয় সূত্র।

বেশ পরিচিত এই সূত্র দুটি উল্লেখ করলাম যেই কারণে সেখানে এখন আসছি।

বেশ বহুল পরিচিত একটি সূত্র এটি, তড়িৎ প্রবাহের দিকে ডানহাতের বুড়ো আঙ্গুল দিলে বাকি আঙ্গুলগুলো উৎপন্ন B এর দিক নির্দেশ করে।

যদি একটা কাগজের তল বরাবর ওপরের দিকে তড়িৎ প্রবাহিত হয় তবে উৎপন্ন B এর দিক এমন হবে যেন পরিবাহীর ডান পাশের কাগজ ফুঁড়ে উপরে উঠছে এবং বাম পাশের কাগজে ঢুকে যাচ্ছে।

এখন কথা হচ্ছে ডান হাতের প্যাঁচ অনুসরন করে B উৎপন্ন হয়নি কাকতালীয়ভাবে দেখা গিয়েছে যে একটি পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে যেভাবে B উৎপন্ন হয় তা আঙ্গুলের ওরকম অবস্থানের সাথে মিলে যাচ্ছে।

বেশ, আমরা এখন বিপরীত দৃশ্যটি দেখার চেষ্টা করি।একটি বদ্ধ বর্তনীতে B প্রয়োগ করা হবে এবং প্রবাহের দিক কোনো দিকে হওয়া উচিত তা দেখবঃ-

উপরের চিত্রে কুণ্ডলীর ভেতরে B প্রয়োগ করা হচ্ছে(কাগজের তলের ভেতর থেকে আমাদের দিকে), কুণ্ডলীটি পুরোপুরি দ্বিমাত্রিক কাগজ তলে অবস্থিত, যে কোনো একদিকে তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি হবে, তার দরুন পরিবাহীর নিজস্ব একটি ক্ষেত্রও সৃষ্টি হবে।

যদি প্রথম কেসটি সত্য হয় তবে প্রবাহের দরুন প্রয়োগকৃত B এর মতই উৎপন্ন B এর দিক হবে প্রথমত কাগজ ফুঁড়ে আমাদের দিকে, ঠিক তখন দুটি ক্ষেত্র একই দিকে ক্রিয়াশীল, সম্মিলিত ক্ষেত্র প্রবাহ আরও বাড়াবে, প্রবাহ আবার নিজস্ব B বাড়াবে এভাবে কুণ্ডলীর মধ্যে একটি সর্বদা চলমান অস্থিতিশীল সিস্টেমের উদ্ভব ঘটবে যা শক্তির নিত্যতার সূত্রকে ভাঙবে।

তাই এমন একদিকে প্রবাহ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন যার নিজস্ব ক্ষেত্র প্রয়োগকৃত ক্ষেত্রকে কমানোর চেষ্টা করবে, দ্বিতীয় চিত্রটি সঠিক কিনা তা পাঠক বিচার করুন।

লেনজ নামক অসাধারণ এক বিজ্ঞানী এই ব্যাপারটি প্রথম ব্যাখ্যা করেন। লেঞ্জের সূত্রটি হলঃ

“আবিষ্ট তড়িচ্চালক শক্তি বা তড়িৎ প্রবাহের দিক এমন হয় যে এটি উৎপন্ন হবার মুল কারণের বিরোধিতা করে।”

ভেক্টরের ক্রস গুননের ব্যাপারটি আমরা জানি, দুটি ভেক্টর রাশির ক্রসগুননের ফলে উভয়ের লম্ব বরাবর আরেকটি ভেক্টর উদয় হয়। প্রথম ভেক্টর থেকে দ্বিতীয় ভেক্টরের দিকে একটি স্ক্রু ঘুরালে সেটি যেদিকে যায়, উৎপন্ন ভেক্টরের দিক সেদিকে।

এখানে ডান হস্ত সূত্র নামক একটি ব্যাপার আছে, যদি ডান হাতের তর্জনী প্রথম ভেক্টর, মধ্যমা দ্বিতীয়টি হয় তবে বৃদ্ধাঙ্গুলি লব্ধি ভেক্টরের দিক বলবে, যে কোনো ভাবে আমরা দিকটি বের করতে পারি।

এতক্ষণ আমরা হয় তড়িতের প্রয়োগে চুম্বক বা চুম্বকের কারণে তড়িৎ এরূপ ব্যাপার দেখছিলাম।তড়িৎ হল চার্জের প্রবাহ যা একটি ভেক্টর রাশি আবার চুম্বকক্ষেত্রের নির্দিষ্ট দিক থাকায় সেটিও ভেক্টর রাশি,ফলস্বরূপ দুটি একসাথে কাজ করলে আরেকটি ভেক্টর রাশির উদয় ঘটবে উভয়ের লম্ব বরাবর। যা একটি বল, প্রকাশ করা হয়ঃ-

F=qVxB=qVBsin(angle)

এখানে q একটি ধনাত্মক চার্জ, যার বেগ v,B হল প্রয়োগকৃত ক্ষেত্র। ব্যাপারটি হল একটি চুম্বকক্ষেত্রে একটি আধান ক্রিয়াশীল থাকলে তা একটি বল অনুভব করবে, বলের দিক পাব ডান হস্ত সূত্র থেকে। অবশ্য চার্জটি যদি ঋণাত্মক হয় তবে ডান হস্তের বদলে বাম হস্ত সূত্র ব্যবহার হবে।তখন বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বলের দিক বোঝাবে। চিত্রে কাগজের বাইরে বেরিয়ে আসা ক্ষেত্র ও ভেতরে প্রবেশ করা ক্ষেত্রের জন্য উদ্ভূত বল F এর দিক দেখানো হয়েছে।

ফ্লেমিঙ্গের বাম হস্ত নিয়ম এবং কিছু কথাঃ-

বেশি কথা না বলে প্রথমেই চিত্রটি দিয়ে দিলাম, যদি বাম হাতের তর্জনী প্রয়োগকৃত চুম্বকক্ষেত্রের দিক, মধ্যমা কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের দিক নির্দেশ করে তবে ঐ পরিবাহী তারটি উপরের দিকে একটি বল অনুভব করবে, এক্ষেত্রে ভেক্টরের হিসেব করে দিক বের করতে হচ্ছেনা। কেবল চৌম্বকক্ষেত্র এবং প্রবাহের দিক বরাবর হাত বসালেই উদ্ভূত বলের দিক পাওয়া যাবে।

এক্ষেত্রে কিছু ছোট্ট বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় তা হলো, বিদ্যুতের প্রবাহ তো আসলে চার্জেরই প্রবাহ তাহলে ভেক্টরের বেসিক ডান হস্ত সূত্র ব্যবহার করলেই হতো আবার নতুন সূত্রের দরকার কি? দ্বিতীয়ত, ডান হস্ত সূত্রে তর্জনী বরাবর চার্জের প্রবাহ এবং মধ্যমা বরাবর B এর দিক ছিল কিন্তু এখানে উল্টো কেন?

প্রথম উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ,বিদ্যুৎ প্রবাহ আসলে চার্জেরই প্রবাহ, কোনো একটি তড়িৎ কোষে যেদিকে ইলেকট্রনের প্রবাহ ধরা হয় তার উল্টো দিকে ধরা হয় বিদ্যুৎ প্রবাহের দিক।অনেকটা এরকম যেন ইলেকট্রনের বিপরীত চার্জের আরেকটি কণার প্রবাহ(কেবল দিক বোঝার সুবিধার্থে বলা হচ্ছে), এক্ষেত্রে তাই পূর্বের অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধনাত্মক চার্জের জন্য বলের দিকের নিয়মটিই ব্যবহার করা যেত, কিন্তু এটি আসলে ঐ সূত্রেরই আরও সহজ রূপ। এখানে আঙ্গুল আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয় নির্দিষ্ট দিকটি বোঝাটাই আসল ব্যাপার।

ফ্লেমিঙ্গের সূত্রের সাথে তুলনা করি, ডান হাতের মধ্যমা যা আগে B বোঝানোর জন্য ব্যবহার হচ্ছিল তা উপরের চিত্রের B এর দিক বরাবর এবং তর্জনী প্রবাহের দিক বরাবর রাখলে দেখবো বল আসলে উপর দিকেই নির্দেশিত হচ্ছে তবে হাত একটু বেশি মোচড়ানো লাগছে এই আরকি!

ডান হস্ত সূত্রে একটি ব্যাপার আসলে একদম নির্দিষ্ট যে ক্রস গুননের যেই সূত্র, এক্ষেত্রে F=qV x B সেই সূত্রের প্রথম রাশি, তর্জনী বরাবর এবং দ্বিতীয় রাশি মধ্যমা বরাবর হলেই বৃদ্ধাঙ্গুলি বলের দিক বোঝাবে।কিন্তু ঐ যে উপরের চিত্রানুযায়ী আঙ্গুল স্থাপন করাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাম হস্ত সূত্র তুলনামুলকভাবে প্রয়োগ করা সহজ।bঅর্থাৎ সূত্র যাই হোক, ফলাফল আসলে একই!

আর এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই বৈদ্যুতিক মোটর তৈরি করা হয়।সহজভাবে বলতে গেলে বিদ্যুৎ প্রবাহ সরবরাহ করা হয়, চুম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয় তখন একটি ঘূর্ণনের সৃষ্টি হয়, এভাবে বৈদ্যুতিক শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রুপান্তরিত হয়। বিস্তারিত পরবর্তীতে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস থাকবে।

উদ্ভূত বলের বিষয়টি বাস্তবিকভাবেও অনুধাবন করা যায়, পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহ চলার সময় তার নিজের প্রবাহের কারণেই চারদিকে একটি চুম্বকক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়।তারপরে আবার যখন বাইরে থেকে চুম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয় তখন পরিবাহীর একদিকে একই দিকে নির্দেশক ক্ষেত্ররেখা এবং আরেকদিকে বিপরীতমুখী ক্ষেত্ররেখা একে অপরের মুখোমুখি হয়।ফলস্বরূপ ভেক্টর বিয়োগের সূত্রানুযায়ী ঐ দিকে ক্ষেত্ররেখা দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষেত্ররেখার যেহেতু আবার স্থিতিস্থাপক ধর্ম রয়েছে তাই তখন বেশি ঘনত্বের দিক থেকে কম ঘনত্বের দিকে একটি বল অনুভূত হয়, রাবার ব্যান্ডের মতই। এটিই আসলে টর্ক বা বল সৃষ্টির কারণ।

ডোমেইন তত্ত্ব,চৌম্বকপদার্থ এবং অন্যান্যঃ-

চৌম্বক-পদার্থ এবং চুম্বকের মধ্যে একটা পরিষ্কার পার্থক্য রয়েছে তা হল একটি চুম্বক তার সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করছে। অপরদিকে চৌম্বকপদার্থের চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য লাভের ক্ষমতা রয়েছে তবে তার পূর্বে একে চৌম্বকীকরন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হবে।

আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে একটি চুম্বক আরেকটি চুম্বকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে, একটি চৌম্বকপদার্থের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারবে কিন্তু একটি চৌম্বকপদার্থ চুম্বকে পরিণত হবার পূর্বে আরেকটি চৌম্বকপদার্থের ওপর কোনোও প্রভাব ফেলতে পারবেনা।

এই আলোচনার সূত্র ধরে যেই প্রশ্নটি আসে সেটি হল ঠিক কোনো কোনো মৌলগুলো চুম্বকে পরিণত হবার ক্ষমতা রাখে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সকল পদার্থকে তিনটি ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়েছেঃ-

(১)ডায়াচৌম্বক পদার্থ (diamagnetic substance)

(২)প্যারাচৌম্বক পদার্থ (paramagnetic substance)

(৩)ফেরোচৌম্বক পদার্থ(ferromagnetic substance)

পদার্থ অণু-পরমাণু দ্বারা গঠিত। পরমাণুর কেন্দ্রে প্রোটন ও নিউট্রন থাকে এবং ইলেকট্রনগুলো কেন্দ্রের চতুর্দিকে বিভিন্ন কক্ষপথে পরিভ্রমন করে। আবার নিজ নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ইলেকট্রনগুলোর ঘূর্ণন বা spin motion রয়েছে। ফলস্বরূপ আমরা দু’ধরনের গতি ভ্রামক পাচ্ছিঃ-

১/ কক্ষীয় গতি ভ্রামক(orbital motion moment)

২/ স্পিন গতি ভ্রামক(spin motion moment)

এক্ষেত্রে নিউক্লিয়াসের সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি ভ্রামক রয়েছে যার নাম nuclear magnetic moment। এসকল মোমেন্টের সমষ্টিগত ক্রিয়ার ফলে পদার্থের ভিন্ন ভিন্ন চৌম্বকবৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি প্রকাশ পায়।

প্রথম প্রকার পদার্থকে চুম্বকে পরিণত করা সম্ভব নয়, হতাশার গল্প দিয়েই শুরু করছি।

ডায়াচৌম্বক পদার্থঃ-

ঘূর্ণায়মান প্রতিটি ইলেকট্রনের কক্ষীয় গতি ভ্রামক রয়েছে। কিন্তু একেকটি ইলেকট্রনের ঘোরার দিকভঙ্গি বা orientation এর ভিন্নতার কারণে একটি আরেকটির চৌম্বকীয় প্রভাবকে বিলীন করে দেয়।ফলে নীট চৌম্বক প্রভাব হয় শূন্য।

এখন বাইরে থেকে কোনো ক্ষেত্র B প্রয়োগ করা হলে পরমাণুর কক্ষীয় গতির পরিবর্তন ঘটে কারণ কৌণিক গতি বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়। বাড়বে না কমবে তা নির্ভর করবে প্রয়োগকৃত ক্ষেত্রের দিক কোনো দিকে এবং ঘূর্ণনের দিক সেদিকেই বা তার বিপরীতে কিনা তার ওপর।

কৌণিক বেগ পরিবর্তিত হলে কক্ষীয় গতি ভ্রামক এর পরিবর্তন হবে।বেগ বাড়লে ভ্রামক বাড়ে, কমলে কমে। ফলস্বরূপ যা ঘটে তা হল একটি মোট ভ্রামকের সৃষ্টি হয় যা সাধারন অবস্থায় শূন্য ছিল। কিন্তু এই দিক আবার প্রয়োগকৃত চৌম্বকক্ষেত্র এর বিপরীত দিকে। তাই যখন চৌম্বকক্ষেত্রে রাখা হয়, এসমস্ত পদার্থ তখন ক্ষেত্র থেকে দূরে সরে যায়। চৌম্বকক্ষেত্র এসব পদার্থের ওপর প্রভাব ফেলছে ঠিকই কিন্তু চুম্বকীকরন প্রক্রিয়ার দ্বারা চুম্বকে পরিণত করতে পারছেনা।তাই একটুকরো সোনা কখনই চুম্বকে পরিণত হবেনা।

এখন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া যাক। প্রথমত, ডায়াচৌম্বকত্ব একটি বৈশিষ্ট্য এবং এর উদ্ভব ঘটে কক্ষীয় গতি ভ্রামক থেকে। যেহেতু সকল পদার্থের কক্ষীয় গতি ভ্রামক রয়েছে সেহেতু সকল পদার্থের ডায়াচৌম্বক বৈশিষ্ট্য রয়েছে কিন্তু এর প্রভাব অত্যন্ত দুর্বল। যে সকল পদার্থে মোট চৌম্বক ভ্রামক শূন্য হয়না এবং নির্দিষ্ট শর্তে প্রয়োগকৃত চৌম্বকক্ষেত্র এর দিক বরাবর ভ্রামকের অভিমুখ হয় তাদের মাঝে প্যারাচৌম্বকত্ব অথবা ফেরোচৌম্বকত্ব প্রকাশ পায় ফলে ডায়াচৌম্বকত্ব থাকা সত্ত্বেও তা ঢাকা পরে যায়।

এইটুকু আলোচনা থেকে যেই সারাংশ টানা যায় তা হল প্যারাচৌম্বক বা ফেরোচৌম্বক বৈশিষ্ট্য যদি উল্লেখযোগ্যভাবে উদ্ভব না হয় তবে যে কোনো পদার্থই ডায়াচৌম্বক এবং ঠিক এই কারণেই পৃথিবীতে ডায়াচৌম্বক পদার্থ সবচেয়ে বেশি। যথা- বিসমাথ, এন্টিমনি, তামা, সোনা, কোয়ার্টজ, মার্কারি, পানি, বাতাস, হাইড্রোজেন, বেশিরভাগ জৈব পদার্থ তার মানে যে কোনো জীবন্ত দেহও ডায়াচৌম্বকপদার্থ আর এই ব্যাপারটি কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি ঘটনা ঘটানো হয়েছেঃ-

ডায়াচৌম্বক বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে প্রয়োগকৃত চৌম্বকক্ষেত্রকে ব্যাঙটির দেহ বিকর্ষণ করছে তাই এটি ভাসমান অবস্থায় রয়েছে, ছোটখাটো আরও কয়েকটি প্রাণীর ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাটি করা হয়েছে এবং সেইদিন হয়ত আর বেশি দূরে নয় যখন মানুষ নিজেরা এই ব্যাপারটি উপভোগ করতে পারবে।

প্যারাচৌম্বক পদার্থঃ-

ডায়াচৌম্বক নিয়ে আলোচনার সময় আমরা চিন্তাভাবনা কক্ষীয় গতি ভ্রামক –এ সীমাবদ্ধ রাখতে পেরেছিলাম।প্যারাচৌম্বক পদার্থে যেটি ঘটে তা হল কক্ষীয় গতি ভ্রামক এবং স্পিন গতি ভ্রামক এর ক্রিয়ায় নতুন একটি স্থায়ী ভ্রামকের সৃষ্টি হয়।

চিত্রে ভ্রামককে কতগুলো চৌম্বক দ্বি-পোল এর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছেঃ-

এ ব্যাপারটি আগে ঘটেনি। যাই হোক, উদ্ভূত এই ভ্রামক এর একটি নির্দিষ্ট অভিমুখ থাকা উচিত হলেও সাধারন তাপমাত্রাতেই তাপজনিত কম্পন বেশি হওয়ায় দ্বিপোলগুলো বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকে। ফলে বহিস্থ চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ না করা হলে পদার্থের কোনো একদিকে নীট চৌম্বকত্ব থাকেনা।

ফলস্বরূপ যতক্ষণ বহিঃস্থ কোনো চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয় ততক্ষণ এদের নির্দিষ্ট চৌম্বক ভ্রামক থাকে এবং এরা চুম্বক হিসেবে কাজ করে।ক্ষেত্রটি সরিয়ে নিলেই এরা চুম্বকত্ব হারিয়ে ফেলে।

ফেরোচৌম্বক পদার্থঃ-

প্যারাচৌম্বক পদার্থের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছিলাম স্থায়ী ভ্রামকের অভিমুখ সাধারন অবস্থায়(তাপমাত্রায়) নির্দিষ্ট দিকে থাকছেনা। ফেরোচৌম্বক পদার্থের ক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হল স্থায়ী ভ্রামকের একটি নির্দিষ্ট অভিমুখ রয়েছে। একদম প্রথম থেকে ব্যাখ্যা করছি, একটি ইলেকট্রনের কক্ষীয় গতি ভ্রামক এবং স্পিন গতি ভ্রামক এর সমষ্টিগত ক্রিয়ায় প্রথমত ধরি একটি স্থায়ী ভ্রামকের সৃষ্টি হল।

প্যারাচৌম্বক পদার্থের ক্ষেত্রে একেকটি ইলেকট্রনের ভ্রামকের অভিমুখ ছিল একেকদিকে। কিন্তু ফেরোচৌম্বকের ক্ষেত্রে পরমাণুসমূহের ভ্রামক অনেকটা জায়গা জুড়ে সংঘবদ্ধ বা locked অবস্থায় থাকে।এই যে অনেকটা জায়গা বা অঞ্চলের কথা বললাম, এর নাম হচ্ছে ডোমেইন।

অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট জায়গার নাম আমরা দিলাম ডোমেইন। একেকটি ডোমেইনে প্রায় 10^16 – 10^19 সংখ্যক পরমাণু থাকে যাদের চৌম্বক মোমেন্ট(স্থায়ী ভ্রামক বোঝানো হচ্ছে)পরস্পর সমান্তরাল থাকে। ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের সাহায্যে ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব না হলেও কোয়ান্টাম ফিজিক্স এখানে কার্যকর এবং এই ক্ষেত্রে “বিনিময় যুগলায়ন” বা exchange integral নামক একটি কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া ঘটে যা ডোমেইনের মধ্যে ক্রিয়াশীল।

কিন্তু একটি ফেরোচৌম্বক পদার্থের কেলাসে বা ত্রিমাত্রিক ক্ষুদ্র গঠনে অসংখ্য ডোমেইন থাকে যাদের একেকজনের মোমেন্টের অভিমুখ একেকদিকে। ফলস্বরূপ নীট ভ্রামক আবারও শূন্য!

কিন্তু এই ক্ষেত্রে যখন চৌম্বক খণ্ডটিকে কোনো চৌম্বক ক্ষেত্রে স্থাপন করা হয় তখন ডোমেইনগুলো নির্দিষ্ট দিক বরাবর বিন্যস্ত হয়। মূলত তখনই খণ্ডটি বহিঃচৌম্বকত্ব প্রকাশ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল ডোমেইনগুলো বিন্যস্ত হবার পর বহিঃস্থ চৌম্বকক্ষেত্র সরিয়ে নিলেও এই বিন্যাস নষ্ট হয়না যদিনা একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ওপর গরম করা হয় অথবা মেকানিক্যাল স্ট্রেস(যেমনঃ হাতুড়ির আঘাত) দেয়া হয়। এভাবে একটি চৌম্বকপদার্থ চুম্বকে পরিণত হয়।

উচ্চতর ভাবে চিন্তা করতে গেলে ব্যাপারটা অনেকটা এইরকম, ক্ষুদ্র পরিমণ্ডলে একটি ইলেকট্রনের প্রভাব আরেকটির ওপর পারমাণবিক গণ্ডিতে ক্রিয়াশীল যা আমরা দেখিনা বা অনুভব করিনা। কিন্তু এরকম অসীমসংখ্যক ইলেকট্রন যখন একত্র হয়ে নির্দিষ্ট একটি দিকে প্রভাব বিস্তার করতে চায় তখন তা আর পারমাণবিক গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে বাস্তবিক চোখে ধরা পরে এবং কোনো এক অদৃশ্য শক্তির মত উদয় ঘটে চুম্বকশক্তির!

তথ্যসূত্র :-

/ https://www.electrical4u.com/fleming-left-hand-rule-and-fleming-right-hand-rule/

/ http://hyperphysics.phy-astr.gsu.edu/hbase/magnetic/magfor.html

/ http://www.physics.ucla.edu/marty/diamag/

/ https://en.wikipedia.org/wiki/Diamagnetism

featured image: nasa.gov

ইন্টারনেটের গতির মূল রহস্য কোথায়?

ধীরগতির ইন্টারনেট সংযোগের মতো হতাশাজনক আর কীইবা হতে পারে! একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে ইন্টারনেট গতির ব্যাপারে আমাদের সহনশীলতা প্রায় শূন্যের কোটায়। অথচ বেশি না, মাত্র ১৫ বছর আগেও ইন্টারনেটের কোনো সুবিধা নিতে গেলে হাতে ঘণ্টা কয়েক সময় নিয়ে বসতে হতো, ফেসবুকের পাতায় অলস সময়ক্ষেপণের চিন্তা তো বাদই দিলাম!

ডায়াল-আপ সংযোগের দিনগুলোয়, কম্পিউটার থেকে সংযোগ রিকোয়েস্ট পাঠাবার পর ঘণ্টাখানেক সময় কেবল সংযোগ স্থাপন হতেই চলে যেত। সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হিসেবটা এখন ২ – ১০ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ডে নেমে এসেছে সাধারণ ব্যাবহারকারীদের ক্ষেত্রে। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো আসলে কীভাবে ঘটেছে? বেশ কিছু বিষয় আছে। সবচেয়ে বড় প্রভাবক অবশ্যই সংযোগ পদ্ধতির মাঝে ব্যাবহার করা তারের উপাদান অথবা প্রকৃতি।

এ লেখায় এ দিকটিই আলোচনা করা হবে। উল্লেখ্য এই লেখায় মূলত বহুল প্রচলিত ব্রডব্যান্ড সংযোগ এবং ডায়াল আপ সংযোগের মাঝে তুলনা করা হবে, যারা কিনা তারের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে। তারবিহীন মাধ্যম যেমন ওয়াইফাই, হটস্পট ইত্যাদি এই লেখার পরিধির বাইরে।

চিত্রঃ আদি ডায়াল আপ সংযোগের ইন্টারফেস।

ডায়াল আপ সংযোগের ক্ষেত্রে সাধারণত ৫৬ কিলোবাইট প্রতি সেকেন্ড ছিল গড় সংযোগ গতি।  ব্রডব্যান্ডের ক্ষেত্রে বেড়ে দাঁড়ায় ৫১২-তে। উদাহরণস্বরূপ, একটি অডিও ফাইল নামাতে প্রথম ক্ষেত্রে ১০ মিনিট লাগলে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ড লাগবে মাত্র।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে কপার তারের পরিবর্তে অপটিক্যাল ফাইবার ব্যাবহার করবার মাধ্যমে। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্রমশ উন্নতির ফলে দিনকে দিন গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৪ সালে Technical University Of Denmark–এর একদল গবেষক অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্য দিয়ে সেকেন্ডে ৪৩ টেরাবাইট ডাটা পাঠাতে সক্ষম হন। আমাদেরকে এক্ষেত্রে অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি সম্পর্কে জানতে হবে। সেই সাথে কপার তারের সমস্যাগুলোও বর্ণনা করা হবে।

কপার তারের মাধ্যমে সংযোগ

আমরা জানি আধুনিক যোগাযোগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল, যেকোনো কিছুকে ০ এবং ১ এর মাধ্যমে প্রকাশ করে বার্তা পাঠানো হয়। কপার তার সংযোগ কাজ করতো বৈদ্যুতিক পালস পাঠাবার মাধ্যমে। তারের মধ্য দিয়ে যে পালস যেতো তা গ্রাহক প্রান্তে ধারণ করা হত তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন দ্বারা। একটি নির্দিষ্ট মানের চেয়ে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ক্ষেত্র ধারণ করার অর্থ “১” পাওয়া এবং একইভাবে নির্দিষ্ট মানের চেয়ে কম ক্ষেত্র ধারণ করার অর্থ “০” পাওয়া।

অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে সংযোগ

অপটিক্যাল ফাইবারের ধারণাটা বেশ সহজ। পাশাপাশি দুটো দেয়ালের মতো দুটো আয়না কল্পনা করা যাক। এখন একটি লেজার রশ্মি কৌণিকভাবে আয়নায় ফেললে তা বারবার প্রতিফলিত হয়ে সামনে এগোতে থাকবে। অপটিক্যাল ফাইবারে এই কাজটিই করা হয়, চুলের মতো সূক্ষ্ম একটি ফাইবার যা মূলত কাচ দ্বারা তৈরি তার মধ্যে আলো প্রবেশ করানো হয়, সেই আলো ফাইবারের ভেতর বারংবার পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মাধ্যমে সামনে এগোতে থাকে।

পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ব্যাপারে আমরা সবাই জানি, আলোক রশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা মাধ্যমে প্রবেশের সময় নির্দিষ্ট মানের চেয়ে বেশি কোণে আপতিত হলে আপতিত আলোকরশ্মি আবার প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে।

অপটিক্যাল ফাইবার কাচ দ্বারা তৈরি। সাধারনভাবে কাচ বলা যায়, কিন্তু আরেকটু ভালোভাবে বলতে গেলে এক্ষেত্রে দুই স্তরের একটি মাধ্যম ব্যাবহার করা হয়, ভেতরের স্তরকে বলা হয় core যা প্রধানত সিলিকন ডাই- অক্সাইড দ্বারা গঠিত, এর বাইরে আরও একটি স্তর আছে। একে বলা হয় cladding। এর উপাদান- সিলিকন ডাই-অক্সাইড, সাথে সামান্য বোরন এবং জার্মেনিয়ামের মিশ্রণ। প্রতিসরণাঙ্ক core অপেক্ষা কিছুটা কমানোর প্রয়োজন হয় এতে। মাত্র ১% প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যই যথেষ্ট, পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত সৃষ্টি করবার জন্য।

চিত্রঃ অপটিক্যাল ফাইবারের গঠন।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অপটিক্যাল ফাইবার আকৃতিতে যেমন চুলের মতো সূক্ষ্ম, স্থিতিস্থাপকতার দিক দিয়েও তাই। যেভাবেই বাঁকানো হোক, ভেতর দিয়ে পরিবাহিত আলোকরশ্মির ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

 

সহজ কথায় কপার তারের ক্ষেত্রে তথ্য প্রেরণ করা হচ্ছে ইলেকট্রনের প্রবাহ দ্বারা এবং অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তথ্য প্রেরণ করা হচ্ছে ফোটনের প্রবাহ দ্বারা। মূলনীতি ব্যাখ্যা করা শেষ, এবার আমরা কপার তার এবং অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনায় প্রবেশ করতে পারি।

১. ব্যান্ডউইথ

সহজে বলতে গেলে কোনো channel বা মাধ্যম তার মধ্য দিয়ে যেসকল ফ্রিকোয়েন্সির তথ্য পাঠাতে দেয়, তা-ই হলো সেই মাধ্যমের bandwidth। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে এটি প্রতি সেকন্ডে ১০ গিগাবাইট সাধারণত। এটি কপার তারের চেয়ে অনেক বেশি। আর যত বেশি bandwidth তত বেশি তথ্য পাঠানো সম্ভব।

কপার তারের ক্ষেত্রে বাহক হলো ইলেকট্রন আর অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে আলো বা ফোটন। কপার তারের মধ্য দিয়ে যে সিগন্যাল পরিবাহিত হবে তার গতি আলোর গতিবেগের ৫০% থেকে ৯৯% পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু পার্থক্য-টা হয়ে যায় এই bandwidth এর ক্ষেত্রেই। Multiplexing নামক একটি প্রক্রিয়া দ্বারা ফাইবারের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির সিগন্যাল পাঠানো যায়, অর্থাৎ এর bandwidth এর পরিধি অনেক বড়। কপার তারের মধ্য দিয়ে এত বড় bandwidth পাঠাতে গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমান attenuation বা অপচয় হয়। আলোর ক্ষেত্রে এটি হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, ০ ফ্রিকোয়েন্সি থেকে শুরু করে প্রায় ১ গিগাহার্জ পর্যন্ত পরিধির bandwidth কপার তারের মধ্য দিয়ে বেশ অবিকৃতভাবে পাঠানো যায়। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে এই পরিধি ১৭৫ টেরাহার্জ থেকে ২৫০ টেরাহার্জ পর্যন্ত, যা কপারের তুলনায় প্রায় ১ লক্ষ গুণ।

২. রিপিটারের প্রয়োজনীয়তা

বড় দূরত্ব অতিক্রম করতে গেলে সিগন্যাল অপচয় বা attenuate হবার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত দূরত্ব পরপর রিপিটার নামক একটি ডিভাইস বসানো হয়। এটি সিগন্যালের নির্দিষ্ট পরিমাণ একটি শক্তি যা বজায় না রাখলেই নয়, পুরো পথ জুড়ে তা বজায় রাখতে সাহায্য করে। সাধারণত সিগন্যাল দুর্বল হয়ে গেলে রিপিটার তা গ্রহণ করে শক্তি কিছুটা বর্ধিত করে একই সিগন্যাল আবার তার গন্তব্যের দিকে ছুঁড়ে দেয়। নিচের চিত্রটি লক্ষণীয়।

চিত্রঃ অপটিক্যাল ফাইবারের সাথে আরও কিছু মাধ্যমের তুলনা।

দেখা যাচ্ছে যে twisted pair copper cable এর ক্ষেত্রে রিপিটার স্পেসিং ২ কিলোমিটার। অর্থাৎ ২ কিলোমিটার পরপর রিপিটার ডিভাইস বসাতে হয়। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তা ৪০ কিলোমিটার অর্থাৎ ৪০ কিলোমিটার পরপর রিপিটার বসালেই কাজ হয়ে যাচ্ছে। মনে রাখা দরকার, এই রিপিটার ডিভাইসগুলোর দাম নেহায়েত কম নয়।

৩. আকৃতি, ওজন এবং দৃঢ়তা

চিত্রঃ অপটিক্যাল ফাইবার এবং কপার ক্যাবল

অপটিক্যাল ফাইবারের আরেকটি বড় সুবিধা হলো কপার তারের তুলনায় যথেষ্ট হালকা অথচ ৮ গুণ বল প্রয়োগ করে টানা হলেও ফাইবার ছিঁড়বে না। কোন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির আশেপাশে রাখা যাবে না- এরকম বাধ্যবাধকতা নেই আবার তাপমাত্রার প্রভাবও খুব বেশি নেই, সব দিক দিয়েই ইতিবাচক। কেবল দামের ব্যাপারটা ছাড়া, কপার সস্তা, অপটিক্যাল ফাইবার তুলনামুলকভাবে দামি। কিন্তু যত দামিই হোক কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে অপটিক্যাল ফাইবার ছাড়া অন্য কিছুর ব্যাবহার অতটা জনপ্রিয় নয়, যেমন শরীরের ভেতরে কোনো পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে।

চিত্রঃ মেডিক্যাল ক্ষেত্রে ফাইবারের ব্যবহার।

তবে যেসকল ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কপার তারের সংযোগ দেয়া হয়ে গিয়েছে সেখানে নতুন করে অপটিক্যাল ফাইবারের সংযোগ দেয়াটা বেশ খরচের। কিন্তু একথাও অনস্বীকার্য যে আমরা যখন আরো দ্রুতগতির ইন্টারনেটের সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে সামনের দিকে তাকাই, তখন অপটিক্যাল ফাইবার ছাড়া আর কোন শ্রেয় এবং সহজতর মাধ্যম বেছে নেয়ার সুযোগ নেই।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.scienceabc.com/innovation/fibre-optic-copper-faster-better-signal-transmission-bandwidth-speed-cost-fast.html
  2. http://www.abc.net.au/science/articles/2010/10/21/3044463.htm
  3. https://www.quora.com/What-determines-the-bandwidth-of-optical-fiber-versus-copper-wire