অজানা অদৃশ্য মহাবিশ্ব

আমাদের সূর্য আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘূর্ণায়মান বাহুর একপাশে অবস্থান করছে। রাতের আকাশের দিকে খালি চোখে তাকালে আমরা যে এক হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই তার বেশিরভাগই আকাশগঙ্গায় অবস্থিত। খালি চোখে না তাকিয়ে একটি সাধারণ মানের দূরবীন ব্যবহার করলে চোখের সামনে নক্ষত্রের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। যাকে এখন সাধারণ মানের দূরবীন বলা হচ্ছে একটা সময় কিন্তু বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপও এর সাথে পাল্লা দিতে পারতো না। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ধারণা ছিল আকাশগঙ্গা ছায়াপথই আমাদের সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। ১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশগঙ্গার চেয়ে বেশি কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের টেলিস্কোপের ক্ষমতাও বাড়তে লাগল। নতুন নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ আকাশের দিকে তাক করে বিজ্ঞানীরা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন।

১৯২০ সালের দিকে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল আবিষ্কার করলেন এই মহাবিশ্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেয়েও অনেক বেশি বড়। আগে যেসব ঝাপসা আলোর বিন্দুকে অনেক দূরবর্তী নক্ষত্র ভাবা হতো, তাদের অনেকগুলোই আসলে আকাশগঙ্গার মতোই আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি! জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতিদিন নতুন নতুন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। সেই সময় Fritz Zwicky ছিলেন ক্যালটেকের প্রফেসর। তিনি Coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আশেপাশের অন্যান্য গ্যালাক্সিগুলোর সাপেক্ষে কোনো একটি গ্যালাক্সির গতিবেগ পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে কতটুকু ভর আছে সেটি বের করা সম্ভব।

প্রফেসর Fritz Zwicky, coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলোর গতিবেগ মেপে নিয়ে তার মধ্যে ঠিক কতটুকু ভর থাকতে পারে তা হিসেব করে বের করে নিলেন। কিন্তু এই ভরকে দৃশ্যমান ভরের সাথে তুলনা করতে গিয়ে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারলেন না। দৃশ্যমান ভর বলতে বোঝানো হয় গ্যালাক্সির যেসব নক্ষত্র আলো বিকিরণ করে কিংবা যেসব ধূলিকণা, গ্যাসের মেঘ নক্ষত্রের আলোকে আটকে দেয়। মোটকথা গ্যলাক্সির দিকে তাকিয়ে আমরা যেটুকু দেখতে পাই তার মোট ভর। Fritz Zwicky-এর হিসেব অনুযায়ী ক্লাস্টারের মধ্যে গ্যালাক্সিগুলোর যে গতিবেগ ততটুকু গতিবেগ অর্জন করতে হলে গ্যালাক্সিগুলোতে তাদের দৃশ্যমান ভরের প্রায় ১৬০ গুণ বেশি ভর থাকা উচিৎ ছিল।

তার মানে অদৃশ্য কোনো ভর গ্যালাক্সিগুলোর এই গতিবেগের জন্য দায়ী। সেই অদৃশ্য ভরকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল না। তিনি অনেকভাবে হিসেব করে দেখলেন, একটি বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য ভর না থাকলে Coma cluster-এর ভারসাম্য বজায় থাকত না। তিনি এই অদৃশ্য ভরের নাম দিলেন ‘হারানো ভর’ বা Missing matter।

ধরা-ছোঁয়া যায় এমন প্রায় সবকিছুর ভরই দাঁড়িপাল্লার নীতি ব্যবহার করে মেপে বের করে ফেলা যায়। কিন্তু পৃথিবী থেকে অকল্পনীয় দূরত্বে অবস্থিত এসব নক্ষত্র কিংবা গ্যালাক্সির ভর বিজ্ঞানীরা ঠিক কীভাবে মাপেন? পৃথিবীর ভর প্রায়  কেজি, সূর্যের ভর প্রায়  কেজি, বৃহস্পতির ভর প্রায়  কেজি, মিল্কিওয়ের ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ।

কিন্তু এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কাছে গিয়ে গ্যালাক্সিটাকে একটা দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে ভর মেপে নেয়ার কোনো উপায় নেই। তাই বিজ্ঞানীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরের অনেক দূরবর্তী পদার্থের ভর মাপেন একটু বাঁকা পথে। পথটা বাঁকা হলেও পদ্ধতিটি খুব সহজ। আমরা জানি একটি বস্তুর ভর যত বেশি হবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ হবে তত বেশি। আর বস্তুটি থেকে দূরত্ব যত বাড়তে থাকবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণও ততই কমে যাবে (বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ এবং ঠিক এ কারণেই সূর্যের চারিদিকে নিজের কক্ষপথে ভারসাম্য বজায় রাখতে বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি। নেপচুনের গতিবেগ সেই তুলনায় অনেক অনেক কম)। তাই আশেপাশের গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘ ইত্যাদির গতিবেগ এবং দূরত্ব থেকে খুব সহজেই ভরটুক বের করে ফেলা যায়।

2চিত্রঃ বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ। তাই বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি।

একটি ভরকে ঘিরে ঘুরপাক খাওয়া পদার্থের আরেকটি উদাহরণ হলো সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। যেসব গ্যলাক্সির একটি অত্যন্ত ভারী কেন্দ্র থাকে এবং গ্যালাক্সির সকল নক্ষত্র সেই ভারী কেন্দ্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তদেরকে বলা হয় সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। তাই ঠিক একইরকম হওয়ার কথা সর্পিলাকার গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলোর ঘূর্ণন বেগ কেন্দ্রের দিকে নক্ষত্রগুলোর চেয়ে অনেক কম হবে। বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন কিন্তু সেরকমটি দেখলেন না।

3চিত্রঃ সর্পিলাকার গ্যালাক্সি।

মিল্কিওয়ের মতো সর্পিল গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন পর্যবেক্ষণ করতে করতে তিনি দেখলেন গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলে যেমন নক্ষত্র, গ্যাস আর ধুলিকণার মেঘের গতিবেগ কমে যাওয়ার কথা ছিল, তেমনটি হচ্ছে না। বরং গতিবেগ প্রায় সমান সমান।

ভেরা রুবিনের হিসেব অনুযায়ী গ্যালাক্সিগুলোতে দৃশ্যমান যতটুক ভর আছে এবং সেই ভরের জন্য গ্যালাক্সির মধ্যে নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘের যতটুক গতিবেগ নিয়ে ঘোরার কথা ছিল তার তুলনায় এ গতিবেগ প্রায় দশগুণ বেশি। তারমানে নিশ্চয়ই গ্যলাক্সির মধ্যে এমন কোনো পদার্থ আছে যা গ্যালাক্সির এই গতির জন্য দায়ী এবং কোনো এক কারণে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না। রুবিন হিসেব করে বের করলেন, এমনটা হবে যদি গ্যালাক্সির মধ্যে অদৃশ্য ভরের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের দশগুণ হয়।

অদৃশ্য পদার্থকে এখন বলা হয় ‘Dark matter’। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা শত শত গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছেন। সব ক্ষেত্রেই সেই একই ব্যাপার। কিন্তু বহুবার বহুভাবে চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পেলেন না। যে বস্তুকে চোখেই দেখা যায় না তাকে খুঁজে পাবেন কীভাবে?

ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় আর আশ্চর্যজনক বস্তুগুলোর মধ্যে একটি। ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত কোনো পদার্থের সাথে কোনোরকম মিথস্ক্রিয়া করে না। তবে আর কিছুই না হোক ডার্ক ম্যাটারের ভর আছে (এই ভর যেকোনো হিসেবে বিশাল, বিজ্ঞানীরা এখন জানেন আমাদের মহাবিশ্বের ২৩ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার)। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব থেকে আমরা দেখেছি, যেকোনো ভর তার আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলে। তাই মহাকাশে কোথাও ডার্ক ম্যাটার থাকলে তা নিজের ভরের জন্য আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলবে।

কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র আর আমাদের দৃষ্টির মাঝে যদি ডার্ক ম্যাটার চলে আসে তবে সেই গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র থেকে আসা আলো বেঁকে যাবে। আমরা বুঝে ফেলব মাঝে প্রচণ্ড ভারী কিছু একটা আছে। শুধু সেই ভরকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না! ভারী বস্তুর আলোকে বাঁকিয়ে দেয়ার ধর্মকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন Gravitational Lensing।

গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং শুনতে যতটা খটমটে, বাস্তবে ঠিক ততটাই কাজের জিনিস। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বুঝতে পারেন তাই নয়, কোনো জায়গায় ঠিক কতটুকু ডার্ক ম্যাটার আছে, কীভাবে বিন্যস্ত আছে সব বের করতে পারেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখেছেন একেকটি গ্যালাক্সির মোট ভরের বেশিরভাগই আসলে ডার্ক ম্যাটারের ভর। গ্যালাক্সিগুলোতে নক্ষত্র, ধূলিকণা এবং গ্যাসের মেঘ ছাড়া যেসব ফাঁকা স্থান আছে সেগুলো আসলে ঠিক ফাঁকা নয়, সেখানে আছে ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানীরা রীতিমতো ডার্ক ম্যাটারের ম্যাপও তৈরি করে ফেলেছেন।

4চিত্রঃ ডার্ক ম্যাটারের ভরের জন্য গালাক্সি থেকে আসা আলো বেঁকে যাচ্ছে।

ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পাওয়ার পর পরই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন, এটি তৈরি হয়েছে কী দিয়ে? আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু নাকি অজানা কোনো কণা দিয়ে?

সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে, ডার্ক ম্যাটার আসলে আমাদের চেনা জানা অণু-পরমাণু দিয়েই তৈরি। শুধু তারা আলো বিকিরণ করে না বলে আমরা দেখতে পাই না। অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি কিন্তু আলো বিকিরণ করে না এমন অনেক পদার্থের কথাই আমরা জানি। সবার প্রথমে আসে ব্ল্যাকহোল। ব্ল্যাকহোল আলো বিকিরণ করে না, প্রচণ্ড মহাকর্ষ বলে সবকিছু নিজের দিকে টানতে থাকে। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং ব্যবহার করে তাদের খুঁজে বের করতে হয়।

তারপরেই আসে M.A.C.H.O. বা Massive Compact Halo Object। এরা আসলে ছোট ছোট ভারী নক্ষত্র যারা খুব অল্প আলো বিকিরণ করে। এদেরকেও গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়। তাছাড়া আছে Brown dwarf. এরা যথেষ্ট ভারী কিন্তু খুব বেশি আলো বিকিরণ করে না। কিন্তু গ্যালাক্সি আর ক্লাস্টারগুলোতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ এতো বেশি যে এসব কিছুও যথেষ্ট না। এক একটি গ্যালাক্সিতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের প্রায় দশ গুণ। শুরুর দিকে নিউট্রিনো বা এক্সিওন এর কথাও চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু এরা খুবই হালকা ভরের কণিকা। এরপর আর একটি সম্ভাবনাই বাকি থাকে। হয়তো ডার্ক ম্যাটার নতুন ধরনের কোনো কণিকা দ্বারা তৈরি যাদের আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।

আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি না হলেও ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্য কীরকম হতে পারে তা বিজ্ঞানীরা বের করেছেন। এরা আলোর মতো দ্রুত গতির নয়। এরা আমাদের পরিচিত সাধারণ সকল পদার্থকে মহাকর্ষ বলে আকর্ষণ করে এবং মহাকর্ষ ছাড়া অন্য কোনোভাবে পদার্থের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না। আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ডার্ক ম্যাটারের কণিকা এপাশ থেকে ওপাশে চলে যাচ্ছে, আমরা টের পাচ্ছি না। কারণ তারা কোনোভাবেই অণু-পরমাণুকে প্রভাবিত করে না। বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাব্য কণিকার নাম দিয়েছেন WIMP (Weakly Interacting Massive Particle)। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে তারা খুবই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। তাই এখন পর্যন্ত WIMP আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

তাই বলে বিজ্ঞানীরা বসে থাকেননি। আমেরিকার Soudan-এ মাটির নিচে একটি পরিত্যাক্ত লোহার খনিতে প্রায় অর্ধমাইল নীচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। এই ল্যাবে শূন্য কেলভিনেরও কম তাপমাত্রায় ১৬টি জার্মেনিয়াম সেন্সর বসানো আছে। সেন্সরগুলোতে জার্মেনিয়ামের ঘনত্ব খুব বেশি, পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি, প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। সেন্সরটিকে যখন শূন্য কেলভিনের নিচে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এটি অনেকটা থার্মোমিটারের মতো কাজ করে। কোনো কণা বা রশ্মি এই সেন্সরের মধ্য দিয়ে চলে গেলেই বিজ্ঞানীরা কণা বা রশ্মির বৈশিষ্ট্য হিসেব করে বের করে ফেলতে পারেন।

এই সেন্সর থেকে খুব সূক্ষ্ম মান পাওয়া যায়। কিন্তু পৃথিবীপৃষ্ঠে এটি নিয়ে কাজ করার খুব বড় রকমের একটি সমস্যা আছে। অনেকে নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত নিউট্রিনো এসে পৃথিবীকে আঘাত করছে। সেই সাথে আছে মিউওন, বিভিন্ন মহাজাগতিক রশ্মি, পৃথিবীপৃষ্ঠে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন রশ্মি। সেন্সরগুলো এতটাই সংবেদনশীল যে যেকোনো ধরনের কণার আঘাতেই বিক্ষেপ দেখাবে। এতসব সমস্যাকে পাশ কাটাতে বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। মাটির বিভিন্ন স্তর ভেদ করে সব ধরনের কণা এবং রশ্মি সেন্সর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা জার্মেনিয়াম সেন্সরে কোনো একদিন একটি WIMP কণিকা আঘাত করবে। যদিও WIMP কণিকা অণু-পরমাণুর সাথে এতই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করার কথা যে, জার্মেনিয়াম সেন্সর দিয়ে WIMP কণিকা ধরা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা এখনো WIMP কণিকা ধরতে পারেননি, এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

5চিত্রঃ ভূমির গভীরে এই স্থানে অবস্থিত গবেষণাগার। পূর্বে এটি স্বর্ণ উত্তোলন খনি ছিল।

শুনতে অবাক লাগবে, মহাবিশ্বের প্রায় ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার হলেও টেলিস্কোপ দিয়ে দৃশ্যমান আলো ব্যবহার করে আমরা যতটুকু বস্তু দেখতে পাই সেটি মহাবিশ্বের ৪ শতাংশ মাত্র। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো সুষমভাবে না থেকে ছাড়াছাড়াভাবে ছড়িয়ে থাকার কারণও ডার্ক ম্যাটার। কঙ্কাল যেমন দেহের আকারের পেছনে কাজ করে ডার্ক ম্যাটারের ক্ষেত্রেও সেই একই ব্যাপার। এখানে ২৩ + ৪ = ২৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে মাত্র। সেটি নিশ্চয়ই অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল সেটা অজানা এক ধরনের Energy। বিজ্ঞানীরা বলেন ‘Dark Energy’।

একসময় ভাবা হতো আমাদের মহাবিশ্ব স্থির। সর্বপ্রথম ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখলেন মহাবিশ্ব মোটেও স্থির নয়। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আলোর শিফট দেখে বলে দেয়া যায় তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে নাকি দূরে সরে যাচ্ছে। রেড শিফট অর্থাৎ আলো লালের দিকে সরে গেলে বুঝতে হবে দূরে সরে যাচ্ছে, আর ব্লু শিফট হলে বা নীলের দিকে হলে বুঝতে হবে এগিয়ে আসছে। এডউইন হাবল আকাশের সবদিকের গ্যালাক্সি থেকেই রেড শিফট পেলেন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে পৃথিবী বুঝি মহাবিশ্বের কেন্দ্র আর বাকি সব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখা গেলো পৃথিবী থেকে একটি গ্যালাক্সি যত দূরে তার দূরে ছুটে যাওয়ার হারও ততই বেশি। যার একটিই অর্থ হতে পারে- পৃথিবী মোটেই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবীসহ মহাবিশ্বের সবকিছু একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সোজা বাংলায়, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা আবিষ্কৃত হবার পর সবার আগে যেটা মাথায় আসে, একটা সময় মহাবিশ্বের সবকিছু নিশ্চয়ই এক জায়গায় একত্রিত ছিল। তারপর একদিন হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো কারণে সব আলাদা হয়ে বাইরের দিকে ছুটে যেতে শুরু করলো। বিজ্ঞানীরা এ বিস্ফোরণকে বলেন বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাং-এর আগে মহাবিশ্বের সবকিছু একবিন্দুতে একত্রিত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল বিগ ব্যাং-এর প্রবল ধাক্কার ফলাফল হিসেবে মহাবিশ্ব এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিস্ফোরণের পরপরই মহাকর্ষ বল সম্প্রসারণের বেগটাকে কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই একসময় সম্প্রসারণের বেগ কমতে কমতে মহাবিশ্ব স্থির হয়ে যাবে। তারপর মহাকর্ষের প্রভাবে আবার সংকোচন শুরু হবে। এর মাঝে বলে নেই, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুধুমাত্র স্থানের মধ্যে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার মতো ঘটনা না। সেরকম কিছু হলে পৃথিবী ধীরে ধীরে সূর্য থেকে দূরে সরে যেতো। স্থান শাশ্বত কিছু নয়। বিগ ব্যাং এর ফলে পদার্থের সাথে সাথে স্থানও সৃষ্টি হয়েছিল এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বলতে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির মধ্যবর্তী স্থানের সম্প্রসারণ বোঝানো হয়েছে।

কেউ যদি প্রশ্ন করে আমাদের মহাবিশ্বের পরিণতি কী? একটি সম্ভাব্য উত্তর হবার কথা ছিল- এখন মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাকর্ষের কারণে ধীরে ধীরে এ সম্প্রসারণের বেগ কমে আসার কথা এবং শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে আবার একটি বিন্দুতে চলে আসার কথা। বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। তাই বছর কয়েক আগে কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী ভাবলেন সম্প্রসারণ কমে আসার হারটা বের করা যাক। সেটা বের করতে হলে প্রথমেই জানা দরকার বিগ ব্যাং-এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতিবেগ কেমন ছিল।

বর্তমান সময়ে বসে কীভাবে অতীতের সম্প্রসারণ বেগ বের করা যায়? তার জন্য খুব সহজ উপায় আছে। ধরা যাক, এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে দশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্যালাক্সি থেকে আলো আসছে। তার মানে হচ্ছে, গ্যলাক্সিটা থেকে দশ হাজার বছর আগে যে আলোটুকু পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছিল সেই আলোটুকু পৃথিবী আর গ্যালাক্সিটার মধ্যবর্তী দূরত্ব অতিক্রম করে এই মাত্র আমাদের কাছে এসে পৌঁছলো। আমরা যদি এই আলোর রেড শিফট মাপি তাহলে পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়ার যে বেগ পাবো সেটা হচ্ছে দশ হাজার বছর আগের সম্প্রসারণের গতিবেগ। বর্তমানে সেই গতিবেগ হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু এখনই সেটি জানার কোনো উপায় নেই। সেটি জানতে হলে আরো দশ হাজার বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

ঠিক একই পদ্ধতিতে আরও কাছের বা দূরের গ্যালাক্সি বা আলোকিত কোনো বস্তুর রেড শিফট মেপে বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণের বেগ বের করা সম্ভব (খুব সূক্ষ্মভাবে রেড শিফট মাপার জন্য দরকার খুব উজ্জ্বল লক্ষ্যবস্তু। বিজ্ঞানীরা তাই মহাকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল টাইপ-১ সুপারনোভা ব্যবহার করেন)। বিজ্ঞানীদের দুটি দল আলাদা আলাদাভাবে প্রায় ৬০ টি সুপারনোভার রেড শিফট মেপে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার মোটেই কমে যাচ্ছে না, বরং তা ত্বরিত হারে বাড়ছে।

বারবার ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণ করেও বিজ্ঞানীরা একই ফল পেলেন। যার অর্থ হচ্ছে মহাবিশ্বে এক ধরনের এনার্জি বিদ্যমান যা বিকর্ষণধর্মী বল সৃষ্টি করে স্থানের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। একেই বিজ্ঞানীরা বলেন Dark Energy। এই ডার্ক এনার্জিই মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জি বিগ ব্যাং-এর সাথে সাথেই সৃষ্টি হয়েছিল। সম্প্রসারণের হার বের করতে গিয়ে দেখা গেল, বিগ ব্যাং-এর পরে প্রথম ৯ বিলিয়ন বছর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছিল। ঠিক তার পরপরই হঠাৎ করে সম্প্রসারণের হার বাড়তে শুরু করেছিল এবং গত পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে এ হার বেড়েই চলেছে।

যার অর্থ হচ্ছে- প্রথমদিকে মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার আর সাধারণ পদার্থের মহাকর্ষের আধিপত্য ছিল। তাই সম্প্রসারণের হার কমে যাচ্ছিল। যতই সময় গেল আর মহাবিশ্ব বড় হতে লাগল, ধীরে ধীরে ডার্ক এনার্জির আধিপত্য শুরু হলো। সম্প্রসারণের বেগ আবার বেড়ে যেতে শুরু করল। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা উচ্চ তাপমাত্রা আর অধিক ঘনত্বে (মহাবিশ্বের শুরুর অবস্থা) ডার্ক এনার্জির ক্রিয়া ধর্তব্যের মাঝে আসবে না। তাপমাত্রা যতই কমে আসবে, ঘনত্ব যতই কমে আসবে, ডার্ক এনার্জি ততই মহাকর্ষ বলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে। পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এ কারণেই আবার সম্প্রসারণের বেগ বাড়তে শুরু করেছিল।

ডার্ক এনার্জিকে বলা যায় স্থানের এক রহস্যময় ধর্ম যা সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীরা এখনো জানে না ডার্ক এনার্জি এভাবেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে নাকি কোনো একসময় দিক পরিবর্তন করে ফেলবে। তাই শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হবে, নাকি এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে তা এ মুহূর্তেই বলা সম্ভব নয়। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মনে করেন মহাবিশ্ব এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে।

সেই উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীব্যাপী পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি Unified তত্ত্ব বের করার চেষ্টা করে আসছেন। একগুচ্ছ সমীকরণ, যার মাধ্যমে পুরো মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাবে। আইনস্টাইন তার জীবনের শেষ ত্রিশ বছর চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। তার পরে এখনো বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। যতই তারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, মহাবিশ্ব যেন ততই নতুন নতুন রহস্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। বাস্তব মহাবিশ্ব যে যেকোন রহস্য উপন্যাসের চেয়ে কোনো অংশেই কম না সেটা আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে বসে থাকি।

তথ্যসূত্র

১) http://pics-about-space.com/planet-mars-black-and-white?p=2#img7875126582525238326

২) en.wikipedia.org/wiki/Andromeda_Galaxy

৩) en.wikipedia.org/wiki/Solar_mass

৪) www.sudan.umn.edu/cdms/

৫) cdms.berkeley.edu/experiment.html

সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের আদ্যোপান্ত

আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (থিওরি অব রিলেটিভিটি) সম্ভবত বিংশ শতকে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় আবিষ্কার। যারা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের তেমন কিছুই জানেন না তারাও হালকা গোঁফ, উঁচু কপাল, এলোমেলো চুলের একজন বিজ্ঞানীকে খুব ভালমতো চেনেন, যিনি ১৯০৫ সালে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের জগতেও আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গুরুত্ব একটু অন্যরকম। এই একটিমাত্র তত্ত্ব প্রায় ১০০ বছর আগে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তা এখনো শেষ হয়নি।

আইনস্টাইন আপেক্ষিকতাকে বর্ণনা করেছেন দুই ভাগে। একবার ১৯০৫ সালে ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’, পরের বার ১৯১৫ সালে ‘আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব’। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিশেষ তত্ত্ব নিশ্চয়ই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কাজ করবে, আর সাধারণ তত্ত্ব সাধারণভাবে সকল ঘটনার জন্য কাজ করবে। বিশেষ তত্ত্বের বিশেষ ক্ষেত্র বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে তা বুঝতে হলে প্রসঙ্গ কাঠামো বা রেফারেন্স ফ্রেম নিয়ে একটু ধারণা দরকার হয়। নাম শুনে যতটা কঠিন আর খটমটে মনে হয় সত্যিকার অর্থে প্রসঙ্গ কাঠামোর ধারণা ঠিক ততটাই সহজ আর সরল।

ধরা যাক, ভোরবেলা দুজন মানুষ পার্কে দৌড়াচ্ছে, একজনের চেয়ে অন্যজন একটু দ্রুত। এখন পার্কের বেঞ্চিতে বসে থাকা যে কেউ কোনোরকম যন্ত্রপাতি ছাড়া শুধুমাত্র দেখেই বলে দিতে পারবে তাদের মধ্যে কে দ্রুত দৌড়াচ্ছে। যখন আমরা শুধু চোখে দেখে কোনো গতি বোঝার চেষ্টা করি তখন নিজের অজান্তেই একটা কাজ করতে থাকি, আশেপাশের কোনো স্থির বস্তুর সাথে সাথে সেই গতিশীল বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে কিনা তা খেয়াল করি। যদি আমাদের বস্তুটি স্থির বস্তুটিকে রেখে (আমরা যে বস্তুটিকে মনে মনে স্থির বলে ধরে নেই) সরে যেতে থাকে তবে আমরা বুঝি আমাদের বস্তুটি গতিশীল, যে বস্তুটি যত দ্রুত সরে যাচ্ছে তার গতি তত বেশি। এখানে এই স্থির বস্তুটি, যার সাথে তুলনা করে আমরা গতিশীলতা বুঝতে পারলাম তাকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলবেন প্রসঙ্গ কাঠামো।

যেকোনো কিছুই প্রসঙ্গ কাঠামো হতে পারে, যদি কেউ একজন ল্যাবে বসে একটা পরীক্ষা করে তাহলে সে পুরো ল্যাবটাকে প্রসঙ্গ কাঠামো ধরতে পারে, আবার চলন্ত গাড়িতে বসে একই পরীক্ষাটা করতে চাইলে পরীক্ষকের সাপেক্ষে ‘স্থির’ গাড়ির কামরাকেই প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বে আইনস্টাইন দুটি সূত্র দিয়েছিলেন, ১. সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো একইরকম। ২. সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে আলোর গতি সমান। জড় প্রসঙ্গ কাঠামো হলো বিশেষ ধরনের কিছু প্রসঙ্গ কাঠামো যারা একে অন্যের সাপেক্ষে ধ্রুব বেগে গতিশীল।

প্রথম সূত্রটিতে বলা হয়েছে প্রসঙ্গ কাঠামো যদি জড় হয় তবে পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র একরকম হবে। অর্থাৎ সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে সবসময় ভরের সাথে ত্বরণ গুন করে বল বের করে ফেলা যাবে। খুবই সোজা সরল কথা। সে তুলনায় দ্বিতীয় সূত্রটা মেনে নিতে কষ্ট হয়।

অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখি দুজন মানুষ যদি একই দিকে দৌড়াতে থাকে তবে তাদের একজনের সাপেক্ষে আরেকজনের যে গতি, সে তুলনার স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কারো সাপেক্ষে তাদের গতি বেশি হবে। আবার তাদের বিপরীত দিক থেকে দৌড়ে আসা কারো সাপেক্ষে তাদের গতিবেগ আরো বেশি হবে। এটাই আমাদের পরিচিত আপেক্ষিক গতি। একটা গতি থেকে অন্য গতি বিয়োগ করে এই আপেক্ষিক গতিটা বের করে ফেলা যায়। কিন্তু দ্বিতীয় সূত্রটা বলছে আলোর বেলায় আমাদের পরিচিত আপেক্ষিক গতির ধারণাটা কাজ করবে না।

তার মানে কেউ যদি স্থির দাঁড়িয়ে থেকে আলোর গতি মাপে তাহলে দেখবে আলো সেকেন্ডে একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে ছুটে যাচ্ছে। আবার কেউ যদি সেকেন্ডে ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে ছুটে যেতে যেতে আলোর গতি মাপে তাহলেও কিন্তু আলোর গতিবেগ আমাদের জানাশোনা পুরনো পদ্ধতি অনুযায়ী  সেকেন্ডে একলক্ষ মাইল পাবে না, একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইলই পাবে। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হলেও বিজ্ঞানীরা অসংখ্যবার পরীক্ষা করার পরেও সূত্রটাতে কোনো ভুল পাওয়া যায়নি।

এই সূত্র দুটি মেনে নিয়ে যদি এগিয়ে যাওয়া হয় তাহলে দেখা যায় সময়, দূরত্ব আর ভরকে আমরা যেমন অপরিবর্তনীয় ভাবি, তেমনটা নয়। দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝতে পারি না, তার কারণ আমরা কখনোই আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছোটাছুটি করি না। কিন্তু কেউ একজন যদি স্থির অবস্থায় থেকে আর অন্য একজন যদি আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছুটতে ছুটতে দুটি একই ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ের পার্থক্য মাপতে চেষ্টা করেন তাহলে দেখা যাবে ঘটনা দুটির সাপেক্ষে যিনি আলোর কাছাকাছি বেগে ছুটে যাচ্ছিলেন তার মাপা সময়ের পার্থক্য যিনি স্থির ছিলেন তার মাপা সময়ের পার্থক্যের চেয়ে বেশি হবে!

আবার ধরে নেয়া যাক একজন মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার সামনে দিয়ে একটা গাড়ি ছুটে চলে যাচ্ছে, গাড়িটার গতিবেগ যদি আলোর কাছাকাছি হয় তাহলে মাটিতে দাঁড়ানো ব্যক্তি দেখবেন গতিশীল গাড়িটা যেন সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। এইটুকুই কিন্তু শেষ না, গাড়িটাতে যদি যাত্রী থাকেন তাহলে তার সাপেক্ষে কিন্তু গাড়িটা স্থির এবং মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আলোর কাছাকাছি বেগে সরে যাচ্ছে, কাজেই যাত্রী দেখবেন মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা সঙ্কুচিত হয়ে গেছেন!

আইনস্টাইন আরেকটা কাজ করলেন। আমাদের জগতটা ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ সবকিছুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা এই তিনটা মাত্রা আছে। যেকোনো স্থানে কোনো বস্তুকে যদি কেউ খুঁজে বের করতে চায় তাহলে কোনো একটা প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে বস্তুটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা বরাবর দূরত্বগুলো জেনে নিতে হবে।

চিত্রঃ প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা জানা থাকলে বস্তুকে চট করে খুঁজে বের করে ফেলা যায়।

আইনস্টাইন যুক্তি দেখালেন কেউ শুধু দূরত্বগুলো জেনে নিলেই সবসময় বস্তুটি খুঁজে বের করতে পারবে না। কারণ বস্তুটি যদি গতিশীল হয় তাহলে কোনো সময়ে প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে বস্তুটির দূরত্ব কত হচ্ছে তা জানতে হবে। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতার মতো সময়ও একটা মাত্রা, শুধু পার্থক্য হলো সময়কে আমরা একটু ভিন্নভাবে অনুভব করি। আইনস্টাইন একে বললেন স্পেস-টাইম বাংলায় বললে স্থান-কাল। আগের তিনটা মাত্রার সাথে সময়কে জুড়ে দিলে দেখতে কেমন হয়?

ব্যাপারটা খুব সহজে বোঝার জন্য ধরে নেই স্থানের মাত্রা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এই তিনটা না, স্থানের মাত্রা শুধু একটা যাকে আমরা একটা সুতার সাথে তুলনা করতে পারি। আর সময় তো নিজেই একটা মাত্রা, একেও একটা সুতার সাথে তুলনা করি। এবার যদি এই দুটি সূতা দিয়ে একটা কাপড় বুনে ফেলা হয় তাহলে দেখতে নিচের ছবিটার মতো হওয়ার কথা।

চিত্রঃ হালকা রঙের সুতাগুলো সময়ের জন্য আর গাড় রঙের সুতোগুলো স্থানের জন্য। (সহজে বোঝার জন্য তিনটা মাত্রাকে একটা ধরে নেয়াতে কিন্তু তেমন কোনো সমস্যা নেই, বিজ্ঞানীরাও হরহামেশাই এভাবে বর্ণনা করেন।)

এই ছিল মোটামুটি ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’। এতক্ষণে নিশ্চয় অনেকেই ধরে ফেলেছেন বিশেষ তত্ত্ব কেন বিশেষ। কারণ এই তত্ত্বের সূত্রগুলো কাজ করবে শুধুমাত্র যতক্ষণ প্রসঙ্গ কাঠামোগুলোর মধ্যে গতির পরিবর্তন (ত্বরণ) হবে না ততক্ষণ।

কিন্তু প্রকৃতিতে সবসময়ই সবকিছুতেই ত্বরণ হচ্ছে। তার মানে হচ্ছে তত্ত্বটা অসম্পূর্ণ এবং প্রকৃতিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে চাইলে আরো বড় পরিসরে চিন্তা করে করে তত্ত্বকে নতুন করে দাঁড় করাতে হবে, সোজা কথায় প্রসঙ্গ কাঠামোর শুধু ধ্রুব বেগের জন্য কাজ করলে হবে না, ত্বরণের জন্যও ‘আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ বের করতে হবে। তাই ১৯০৫ সালে বিশেষ তত্ত্ব দেয়ার পর পরই আইনস্টাইন নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন কীভাবে ত্বরণের জন্য আসল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বের করা যায়।

প্রকৃতিতে ত্বরণের কথা ভাবতে গেলে প্রথমেই মাথায় আসবে মহাকর্ষজ ত্বরণের কথা। পৃথিবীতে উপর থেকে ফেলে দিলে যেকোনো বস্তুর ত্বরণ হয় বা বেগ বাড়তে থাকে। প্রতি সেকেন্ডে এই বেগ বাড়াটাই হল মহাকর্ষজ ত্বরণ। এই ব্যাপারটা নিয়ে নিউটন ভাবনা-চিন্তা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যেহেতু বল প্রয়োগ করলে ত্বরণ হয় তার মানে মহাকর্ষজ ত্বরণও নিশ্চয়ই কোনো বলের কারণে হচ্ছে। তিনি এর নাম দিলেন মহাকর্ষ বল। অবশ্য এই বলের উৎস সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

মহাকর্ষ বল কেমন হতে পারে, তার জন্য গাণিতিক সমীকরণ কেমন হতে পারে সব নিউটন ভেবে ভেবে বের করে রেখেছিলেন এবং এসব সমীকরণ দিয়ে প্রকৃতিকে বেশ ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল। আইনস্টাইন তার আশেপাশে গেলেন না। একদিন অফিসের জানালা দিয়ে পাশের বিল্ডিঙের ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মাথায় এল কেউ যদি হঠাৎ পা পিছলে ছাদ থেকে পড়ে যায় এবং অভিকর্ষের প্রভাবে ত্বরণ নিয়ে নিচে পড়তে থাকে তাহলে মাটিতে পড়ার আগে সে কেমন অনুভব করবে? আইনস্টাইন ভাবনাটা আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গেলেন, ভাবলেন কেউ যদি একটা বাক্সের ভেতর থাকেন এবং তাকে যদি বাক্সটা সহ ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয় তখন কী হবে? লিফটের কর্ড ছিঁড়ে গেলে ঠিক এই অবস্থাটাই হয়।

বাক্সটি ফেলে দেয়ার আগ পর্যন্ত লোকটি বাক্সের ভিতরে দাঁড়িয়ে বাক্সের তলায় ওজনের সমান বল প্রয়োগ করছিলেন, তাই বাক্সটিও তার ওজনের সমান এবং বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বল ব্যক্তিটির উপর প্রয়োগ করছিল বলে তিনি তার ওজনটা অনুভব করছিলেন। যখনই বাক্সটাকে ফেলে দেয়া হবে সাথে সাথে বাক্সের ভেতরের মানুষটা মহাকর্ষজ ত্বরণের জন্য নিচে পড়তে থাকবেন এবং প্রতি সেকেন্ডে তার বেগ ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়তে থাকবে। কিন্তু বাক্সটাও মহাকর্ষজ ত্বরণের প্রভাবে পড়ে যাচ্ছে তাই পড়তে পড়তে সেটার বেগও প্রতিসেকেন্ডে ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়তে থাকবে, অর্থাৎ বাক্সটি মানুষটার পায়ের নিচ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড বেগে সরে যেতে থাকবে। তার মানে কিন্তু মানুষটা আর বাক্সটার তলায় বল প্রয়োগ করতে পারছেন না ফলে কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই, তাই তিনি নিজের ওজনটাও অনুভব করতে পারছেন না।

ব্যাপারটা কেমন হলো? বাক্স এবং মানুষ দুজনেরই ত্বরণ হচ্ছে কিন্তু তারা কেউই কোনো বল অনুভব করছে না। মহাকর্ষ বলহীন কোনো স্থানে স্থির অবস্থায় থাকলে যে অনুভূতি হবে, পৃথিবীতে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান ত্বরণে পড়তে থাকলে ঠিক সেই অনুভূতি হবে। ঠিক এই ভাবনাটাকেই একটু উল্টো করে ভাবলে বলা যায় বাক্সটা যদি শূন্যস্থানে কোনোরকম আকর্ষণের আওতায় না থেকে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান ত্বরণ নিয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে তাহলে ভিতরের কোনো মানুষ যেমন অনুভব করবে, পৃথিবীর পৃষ্ঠে স্থির অবস্থায় থাকলেও ঠিক তেমনই অনুভব করবে।

আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন মহাকর্ষ বল আর ত্বরণ আসলে একই জিনিষ এবং একে বললেন, “the happiest thought in my life”। এই মহাকর্ষ আর ত্বরণ সমান হওয়াকে নাম দিলেন “equivalence principle”।

এবার উপরের ছবিটা একটু দেখা যাক। আইনস্টাইন ঠিক এই থট এক্সপেরিমেন্টটাই করেছিলেন ভেবে ভেবে। দেখা যাচ্ছে লিফটের বাইরের লোকটা সামনের দিকে একটা আলোকরশ্মি নিক্ষেপ করেছেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির সাপেক্ষে যখন লিফটটা স্থির (চিত্রের প্রথম অংশে) তখন লিফটের ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোক রশ্মিটা একপাশ থেকে এসে সোজা অন্য পাশের দেয়ালে আঘাত করছে। বাইরের ব্যক্তির সাপেক্ষে লিফটটা যখন ধ্রুব বেগে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে তখন ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোকরশ্মিটা চিত্রের মতো বেঁকে যাচ্ছে এবং পাশের দেয়ালে আঘাত করার আগে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে, সময়ও বেশি লাগছে (ধ্রুব বেগের জন্য যে এমনটা হয় তা আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব থেকে আমরা আগেই জেনে গেছি)।

বাইরের ব্যক্তির সাপেক্ষে লিফটটার যখন উপরের দিকে ত্বরণ হচ্ছে তখন ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোকরশ্মিটা বেঁকে যাচ্ছে এবং পাশের দেয়ালে আঘাত করার আগে, আগের চেয়েও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করছে, সময়ও বেশি লাগছে। এর কারণ কী হতে পারে? আইনস্টাইন ভাবলেন, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি যেহেতু আলোক রশ্মিটাকে কখনোই বেঁকে যেতে দেখবেন না কিন্তু লিফটের সাথে ত্বরণে ছুটে চলা মানুষটা যেহেতু দেখবেন, আলোকরশ্মিটা বেশি সময় ধরে বেঁকে গিয়ে গিয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলছে তার মানে নিশ্চয়ই স্থির ব্যক্তির স্থান-কালের তুলনায় ত্বরণে থাকা ব্যক্তির স্থান-কালটাই বেঁকে যাচ্ছে। ত্বরণের জন্য স্থান-কাল বেঁকে যাচ্ছে। আবার “equivalence principle” অনুযায়ী যেহেতু ‘মহাকর্ষ’ আর ‘ত্বরণ’ একই জিনিস সেহেতু অভিকর্ষের জন্যও স্থান-কাল এভাবে বেঁকে যাবে।

অর্থাৎ আমরা যদি বলি, মহাকর্ষ বল বলে কিছু নেই কিংবা ‘ভারী বস্তুর মহাকর্ষ বল বেশি, হালকা বস্তুর মহাকর্ষ বল কম- এমনটা সত্য হবে না। ভারী বস্তু আসলে তার চারপাশের স্থান-কালকে বেশি করে বাঁকায় আর হালকা বস্তু কম বাঁকায়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। শুনে মনে হতে পারে গালগল্প কিন্তু আইনস্টাইন সত্যি সত্যি এই বাঁকানো স্থান-কালের ধারণা দিয়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে ফেললেন। যেমন সূর্য যদি পৃথিবীকে আকর্ষণ না করে শুধু স্থান-কালকে বাঁকিয়ে বসে থাকে তাহলে পৃথিবী কেন সূর্যের চারিদিক ঘুরবে না?

চিত্রঃ সূর্যের চারিদিকে বাঁকানো স্থান-কালে আটকা পড়ে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে।

 

ঠিক যে কারণে পানি গড়িয়ে নিচু জায়গায় পড়ে যেতে চায় সেই একই কারণে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে বাঁকা স্থান-কালের মধ্যে পড়ে ঘুরতে থাকে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলে, পরবর্তী ছবির মতো করে একটা টানটান করে রাখা চাদরের মাঝখানে ভারী কিছু রেখে আরেকটু হালকা একটা গোলককে কিছু গতি দিয়ে ছেড়ে দিয়ে দেখতে পারেন। এখানে চাদরটা স্থান-কালের মতো ভারী বস্তুটার ভরের জন্য বেঁকে যাবে। পৃথিবী কেমন করে সূর্যকে ঘিরে ঘুরতে থাকে, হালকা গোলকটার গতি দেখলেই সেটা বুঝে ফেলা সম্ভব।

এখানে অবশ্য চাদরের সাথে গোলকের ঘর্ষণে শক্তি কমতে কমতে একটা সময় গোলকটা মাঝখানের ভারী বস্তুতে গিয়ে আঘাত করবে, কিন্তু পৃথিবী যেহেতু শূন্যস্থানে ঘুরছে তাই তার সাথে কোনোকিছুর ঘর্ষণে গতিশক্তি কমে যায় না, পৃথিবীও সূর্যে গিয়ে আঘাত করে না।

আইনস্টাইন ত্বরণের জন্য আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বের করতে গিয়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে ফেললেন। নিউটনের পুরনো তত্ত্বকে পাশ কাটিয়ে আইনস্টাইন তার এই নতুন তত্ত্বটি দিয়ে ভরযুক্ত বস্তুর পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় আলোক রশ্মির বেঁকে যাওয়া (Gravitational Lensing), ভরযুক্ত বস্তুর কাছে সময়ের ধীর হয়ে যাওয়া (time dilation), ঘূর্ণায়মান ভরের দিকে স্থান-কালের টান ইত্যাদি ঘটনা ব্যাখ্যা করে ফেললেন, যেগুলো নিউটনের মহাকর্ষ বলের ধারণা দিয়ে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।

আইনস্টাইন কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে শুধুমাত্র ভেবে ভেবেই বের করে ফেলেছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা অনেকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই তত্ত্বের সবগুলো ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণ করেছিলেন। শুধু একটা ছাড়া। সেটি “মহাকর্ষীয় তরঙ্গ”।

আইনস্টাইন তার নতুন তত্ত্বটা দিয়ে অনেক কিছুই ঠিকঠিক ব্যাখ্যা করে ফেললেন কিন্তু ভারী বস্তু যে ভরের জন্য সত্যি সত্যিই চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে তা সরাসরি প্রমাণ করা যায় কীভাবে? আইনস্টাইন আবার ভেবে ভেবে বের করলেন, দুটি ভারী বস্তু যদি একে অন্যকে ঘিরে ঘুরতে ঘুরতে কাছাকাছি আসতে থাকে তবে তারা যে তাদের ভরের জন্য স্থান-কালকে বাঁকিয়ে রেখেছিল সেই বাঁকানো ভাবটার খুব দ্রুত একটা পরিবর্তন ঘটবে।

এই দ্রুত পরিবর্তনটার জন্য একটা খুব শক্তিশালী তরঙ্গ উৎপন্ন হয়ে হয়ে ছড়িয়ে পড়ার কথা, এই তরঙ্গটাকে তিনি নাম দিলেন ‘মহাকর্ষীয় তরঙ্গ’। কোনোভাবে যদি এইরকম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায় তাহলেই প্রমাণ হয়ে গেল যে ভারী বস্তু আসলেই স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে এত এত লেখালেখি হচ্ছে যে সেগুলো পড়ে পড়ে আমরা সবাই এ সম্পর্কে কমবেশি জানি।

সবাই অনুপ্রস্থ তরঙ্গ চিনি। যে তরঙ্গ নিচের ছবির মতো মাধ্যমের কণাগুলোকে উপরে নিচে কাঁপাতে কাঁপাতে কণার গতির দিকের সাথে সমকোণে এগিয়ে যায় সেটাই অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। যেমন পানির ঢেউ।

চিত্রঃ অনুপ্রস্থ তরঙ্গ।

আবার যে তরঙ্গ মাধ্যমের কণাগুলোকে সামনে পিছনে কাঁপাতে কাঁপাতে কণার গতির দিকে সমান্তরাল দিকে এগিয়ে যাবে তাকে আমরা বলি অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ। যেমন শব্দের তরঙ্গ।

চিত্রঃ অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ।

তবে মহাকর্ষ তরঙ্গ কিন্তু আমাদের পরিচিত অনুপ্রস্থ বা অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ না, একটু বিশেষ ধরনের তরঙ্গ। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কোয়াড্রুপল তরঙ্গ’। এই তরঙ্গ স্থানকে মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহার করে এবং অনুপ্রস্থ আর অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের মতোই মাধ্যমের সংকোচন প্রসারণ করে আলোর বেগে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কোয়াড্রুপল তরঙ্গ স্থানের মধ্য দিয়ে ছুটে চলার সময় স্থানকে যদি আনুভূমিক দিকে সংকুচিত করে তবে উলম্ব দিকে সম্প্রসারিত করে। একইভাবে, যদি আনুভূমিক দিকে সম্প্রসারিত করে তবে উলম্ব দিকে সংকুচিত করে, নিচের ছবির মতো। বোঝার সুবিধার জন্য এখানেও ধরে নিলাম স্থানের মাত্রা দুটি, দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ।

চিত্রঃ প্রথম চিত্রে স্থান-কাল আনুভূমিক দিকে প্রসারিত, উলম্ব দিকে সংকুচিত হয়েছে। দ্বিতীয় চিত্রে ঠিক উল্টো ঘটনাটা ঘটেছে।

কিন্তু এই কোয়াড্রুপল মহাকর্ষজ তরঙ্গ এত বেশি দুর্বল যে, যত সহজে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্তকরণের কথা বলা হলো, সত্যি সত্যি সনাক্ত করতে গেলে ঠিক ততটাই সূক্ষ্ম আর সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি দরকার। আইনস্টাইনের সময় এত সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির কথা চিন্তাও করা যেত না।

বেশ কিছু বছর পরে পদার্থবিজ্ঞানী Ray Weiss মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার জন্য একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি বের করলেন। তার পদ্ধতিটা সহজ, এতে থাকবে দুটি সমান দৈর্ঘ্যের টানেল, যেগুলো পরস্পর সমকোণে অবস্থান করবে। প্রত্যেকটি টানেলের শেষ মাথায় লাগানো থাকবে প্রতিফলক আয়না, দুটি টানেলের দৈর্ঘ্য খুব সূক্ষ্মভাবে সমান হতে হবে। টানেলগুলো দিয়ে আলোর ব্যতিচার মাপা হবে কাজেই সূক্ষ্মভাবে সমান করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

একটি লেজার বিমকে বিশেষ কৌশলে দুইভাগে ভাগ করে টানেলগুলো দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলে (নিচের ছবির মতো) লেজার রশ্মিগুলো টানেলের শেষ মাথার প্রতিফলক আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে। বিজ্ঞানীরা অনেক বছর ধরে অনেক খেটেখুটে টানেল দুটিকে খুব সূক্ষ্মভাবে সমান করে তৈরি করেছেন তাই ফিরে আসা রশ্মি দুটো ব্যতিচার করে পরস্পরকে নাই করে দিবে।

চিত্রঃ LIGO Interferometer.

এখন যদি পৃথিবীর মধ্য দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গ ছুটে যায় তাহলে স্থানের একবার সংকোচন আরেকবার প্রসারণ হবে। যেহেতু এই যন্ত্রটিও স্থানের মধ্যেই আছে সেহেতু টানেল দুটিতেও নিচের চিত্রের মতো সংকোচন-প্রসারণ হবে।

চিত্রঃ উলম্ব টানেলটা সংকুচিত আর আনুভূমিক টানেলটা প্রসারিত হচ্ছে।
চিত্রঃ উলম্ব টানেলটা প্রসারিত আর আনুভূমিক টানেলটা সংকুচিত হচ্ছে।

এই সংকোচন প্রসারণের জন্যই আগের মতো প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসা রশ্মি দুটো ব্যতিচারের মাধ্যমে আর পরস্পরকে নাই করে দিতে পারবে না। রশ্মি দুটো মিলে আরেকটু বেশি শক্তিশালী রশ্মি তৈরি করে শনাক্তকারকে আঘাত করবে (নিচের ছবি)। শনাক্তকারক থেকে এই রশ্মির তীব্রতা মাপা আর মহাকর্ষ তরঙ্গ মাপা আসলে একই কথা।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ বেঙ্গলেনসিস (ইমতিয়াজ আহমেদ)।

বাস্তবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে গিয়ে কিন্তু বিজ্ঞানীদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কারণ মহাকাশের অনেক অনেক দূরে পরস্পরকে ঘিরে ঘুরতে থাকা দুটি নিউট্রন তারা বা ব্ল্যাকহোল থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ পৃথিবীতে স্থানকে এত কম বিচ্যুত করবে যে তা শনাক্ত করতে হলে প্রায় অসাধ্য সাধন করতে হবে। তাই তারা প্রত্যেকটি টানেলকে ৪ কিলোমিটার লম্বা করে তৈরি করলেন (টানেলের দৈর্ঘ্য যত বেশি হবে বিচ্যুতি ধরতে পারার সম্ভাবনাও তত বাড়ে)।

এতটুক পড়ে এসে অনেকে নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, এতটা সংবেদনশীল করে তৈরি করার একটা অসুবিধাও আছে, যন্ত্রটার কাছাকাছি খুব অল্প কোনো নয়েজও যন্ত্রটাতে প্রভাব ফেলবে। যন্ত্রটার সংবেদনশীলতা এতই বেশি যে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে একটা তালি দিলেই একটা বিক্ষেপ দেখা যাবে। এই সমস্যাটা যাতে না হয় এবং পৃথিবীর কোনো নয়েজকে যাতে মহাকর্ষ তরঙ্গ ভেবে ভুল না হয় তাই বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় দুটি একইরকম যন্ত্র তৈরি করে রেখে দিয়েছিলেন কারণ দুই জায়গায় দুটি ভিন্ন যন্ত্রে একই সাথে বাইরে থেকে একই পরিমাণ নয়েজ ঢুকে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এই ধরনের ব্যবস্থা আর এত এত সতর্ক পদ্ধতি নিয়ে ২০০১ সালে LIGO প্রকল্প শুরু হয়েছিল। ২০১০ পর্যন্ত এর মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার মতো সংবেদনশীলতা ছিল না। শেষপর্যন্ত ২০৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে এর সংবেদনশীলতা ১০ গুন বাড়িয়ে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আবার চালু করা হয়। নতুন আপগ্রেডেড যন্ত্রপাতি নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসেই বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করে ফেললেন।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করে শুধুমাত্র আইনস্টাইনের বক্র স্থান-কালের ধারণা প্রমাণ করা হলো কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের সামনে একটা বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে গেল। ব্ল্যাকহোল থেকে কোনো তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ বের হতে পারে না। আমরা যেহেতু এতদিন শুধু তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গকেই যোগাযোগের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হিসেবে জানতাম তাই ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণাও হালে খুব একটা পানি পায়নি।

আবার বিগ ব্যাং এর পরে একটা নির্দিষ্ট সময় পর থেকে মহাবিশ্ব কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা আমরা জানি। কিন্তু বিগ ব্যাং এর ঠিক পর পরই মহাবিশ্বের ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে সেখান থেকে কোনো রকম তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ বের হতে পারেনি। তাই বিগ ব্যাং এর ঠিক পর পরই মহাবিশ্ব কেমন ছিল তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের আচরণ থেকে তার কোনোরকম তথ্য পাওয়া যায় না।

কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা নেই, মহাবিশ্বের একেবারে শুরুতে উচ্চ ঘনত্ব যেমন এই তরঙ্গকে আটকে রাখতে পারেনি তেমনি ব্ল্যাক হোলের উচ্চ ঘনত্বেও এই তরঙ্গ আটকা পড়ে থাকবে না। তাই এই সংক্রান্ত গবেষকদের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। আমাদের জীবদ্দশাতেই হয়ত আমরা জানতে পারবো মহাবিশ্ব একেবারে জন্মের সময়টা কীভাবে পার করেছে অথবা ব্ল্যাক হোলের ভিতরে কেমন সব আশ্চর্য ঘটনা ঘটে চলছে।

তথ্যসূত্রঃ

১. https://blog.mukto-mona.com/2016/02/12/48439/

২. https://blog.mukto-mona.com/2016/02/12/48447/

৩. https://www.youtube.com/watch?v=J9Zs-CjybTc

৪. http://csep10.phys.utk.edu/astr161/lect/history/einstein.html

৫. http://www.ceder.net/def/quadruple.php4?language=usa

৬. http://www.pitt.edu/~jdnorton/Goodies/Chasing_the_light/

৭. http://www.einstein-online.info/spotlights/equivalence_principle

৮. https://www.youtube.com/watch?v=RzZgFKoIfQI

featured image: rsi.ch

তারার জন্ম-মৃত্যু

খালি চোখে রাতের আকাশে তাকালে আমরা প্রায় ১০ হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই। সংখ্যার হিসাবে এটা খুবই কম। শুধুমাত্র আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথেই নক্ষত্র আছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন (এক হাজার মিলিয়নে এক বিলিয়ন, দশ লক্ষে এক মিলিয়ন)। দৃশ্যমান মহাবিশ্বে নক্ষত্র আছে প্রায় একশত হাজার মিলিয়নের মতো! একটা সময় মানুষের ধারণা ছিল নক্ষত্রগুলো এখন যেমন আছে সবসময় তেমনই ছিল। নক্ষত্রদেরও যে জন্ম মৃত্যুর মতো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় সে ধারণা মোটামুটি নতুনই বলা যায়। এই বিপুল পরিমাণ নক্ষত্রদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রক্রিয়াগুলো নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ। সেই গল্পই বলবো আজকে।

মহাকাশের কোথাও যদি হাইড্রোজেন গ্যাসের বিশাল সমাবেশ তৈরি হয় তখন গ্যাসের অণুগুলো নিজেরা নিজেদের আকর্ষণে (মহাকর্ষ বলের কারণে) সংকুচিত হতে শুরু করে। গ্যাস যতই সংকুচিত হতে থাকে ততই এর তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। কোনো গ্যাসকে সংকুচিত করলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া খুব পরিচিত ঘটনা। তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছে গেলে কিছুলে অবাক করা ব্যাপার ঘটে।

গ্যাসের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া মানে হলো গ্যাসের অণুগুলোর গতিবেগ বেড়ে যাওয়া। অণুগুলোর গতিবেগ বেড়ে যেতে থাকেলে এরা প্রচণ্ড বেগে নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। হাইড্রোজেনের ভাণ্ডার যখন খুব বেশি সংকুচিত হয়ে যায়, তাপমাত্রা যখন খুব বেশি বেড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছে যায় তখন গ্যাস অণুগুলোর গতিবেগ এত বেশি বেড়ে যায় যে একটা হাইড্রোজেন পরমাণু আরেকটা হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে মিলে হিলিয়াম নামে নতুন একটা পরমাণু গঠন করে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলে নিউক্লিয়ার ফিশন। নতুন এই হিলিয়াম পরমাণুটার ভর আগের হাইড্রোজেন পরমাণু দুটির ভরের যোগফলের চেয়ে কিছুটা কম হয়। এই বাড়তি ভরটুক আইনস্টাইনের  সূত্র অনুযায়ী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে বেরিয়ে আসে। এ শক্তির কিছু অংশ আমরা তাড়িৎচুম্বক তরঙ্গ হিসেবে দেখতে পাই।

এতক্ষণ হাইড্রোজেনের বিশাল ভাণ্ডারটি মহাকর্ষের কারণে লাগামহীনভাবে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যে মুহূর্ত থেকে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয় সেই মুহূর্ত থেকে নির্গত শক্তিটুকু সংকোচনের উল্টোদিকে বা বাইরের দিকে একটা চাপ তৈরি করে। যে আয়তনে এলে হাইড্রোজেনের ভাণ্ডারের মহাকর্ষীয় চাপ আর বাইরের দিকে প্রসারণের চাপ সমান হয় সেই আয়তনে এসে স্থির হয় এবং হঠাৎ করে জ্বলে ওঠে। এতে করে জন্ম হয় একটা নক্ষত্রের। নক্ষত্রটি তার বাকি জীবন হাইড্রোজেনের এই ভাণ্ডারকে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করে পার করে দেয়। কিন্তু যখন এই বিশাল হাইড্রোজেনের ভাণ্ডারটুকু শেষ হয়ে যায় তখন?

একটা নক্ষত্র আকারে যত বড় হয় তার জ্বালানীর পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই বড় নক্ষত্রের জীবনকালও বড়ই হবার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে নক্ষত্র যত বড় হয় তার তাপমাত্রা এবং নির্গত শক্তির পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই বড় বড় নক্ষত্রগুলো বেশি পরিমাণ জ্বালানীও খুব দ্রুতই শেষ করে ফেলে। সেই তুলনায় মাঝারী এবং ছোট নক্ষত্রগুলোর জীবনকাল মোটামুটি দীর্ঘ। আমাদের সূর্যও এরকম একটা নক্ষত্র এবং এর জীবনকাল মোটামুটিভাবে ১০ বিলিয়ন বছর। কিন্তু নক্ষত্র যত বড় বা ছোটই হোক একসময় তার কেন্দ্রের হাইড্রোজেন এবং অন্যান্য জ্বালানী শেষ হয়ে আসে। যতক্ষণ জ্বালানী থেকে শক্তি উৎপন্ন হচ্ছিল ততক্ষণ এ শক্তি মহাকর্ষীয় সংকোচনকে ঠেকিয়ে রেখেছিল। যে মুহূর্তে নক্ষত্রের জ্বালানী শেষ হয়ে শক্তি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে সেই মুহূর্ত থেকে মহাকর্ষকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য আর কিছু থাকবে না এবং নক্ষত্রটা আবার মহাকর্ষের কারণে সংকুচিত হতে শুরু করবে।

জ্বালানী শেষ হয়ে যাবার পর মহাকর্ষের ফলে মৃত নক্ষত্রটির ভাগ্যে কী ঘটে তা নিয়ে প্রথম চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর, ১৯২৮ সালে। তিনি তখন ছাত্র, ক্যামব্রিজে পড়তে যাচ্ছেন জাহাজে চড়ে। জাহাজে বসেই তিনি ভেবে ভেবে বের করলেন, একটা নক্ষত্র ঠিক কতটুকু পর্যন্ত বড় হলে জ্বালানী শেষ হবার পর সেটা সংকুচিত হতে হতে এক জায়গায় এসে থেমে যাবে।

চন্দ্রশেখর হিসাব করে দেখলেন, কোনো নক্ষত্রের ভর যদি আমাদের সূর্যের ভরের দেড় গুণ বা তার কম হয় তাহলে তার মহাকর্ষের জন্য সংকোচন এত শক্তিশালী হবে যে সেই নক্ষত্রগুলো জ্বালানী শেষ করে ফেলার পর নিজেদের সংকোচন আর বন্ধ করতে পারবে না। এ ধরনের নক্ষত্রের ক্ষেত্রে এমন একটা অবস্থা হবে যে সংকুচিত হতে হতে এর পরমাণুগুলো একেবারে গায়ে গায়ে লেগে যাবে। পরমাণুগুলো গায়ে গায়ে লেগে গেলে তাদের ইলেকট্রনগুলোর মধ্যে এক ধরনের তীব্র বিকর্ষণ কাজ করে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনার একটা কটকটে নাম আছে, এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল। এই তীব্র বিকর্ষণের ফলে শেষ পর্যন্ত মৃত নক্ষত্রটার সংকোচন থেমে গিয়ে মোটামুটি স্থিতিশীল একটা অবস্থায় চলে আসে। এ ধরনের মৃত নক্ষত্রকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন- white dwarf (শ্বেত বামন)।

শ্বেত বামনে পরিণত হয়ে যাবার পর নক্ষত্রটার বাকি জীবন খুব সাদামাটা। এরপর কিছুদিন নক্ষত্রটা তার উচ্চ তাপমাত্রার জন্য অল্প পরিমাণে শক্তি বিকিরণ করবে, তারপর ধীরে ধীরে শীতল হতে হতে শক্তি বিকিরণ বন্ধ করে দিয়ে একসময় নিবে যাবে। শ্বেত বামন হিসেবে একটি নক্ষত্রের মৃত্যু মোটামুটি শান্তিপূর্ণ মৃত্যু।

চিত্রঃ Messiar 4 গ্যালাক্সিতে অবস্থিত কিছু শ্বতবামন তারকা।

কিন্তু নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের দেড়গুণ বা তার চেয়ে অল্পকিছু বেশি হয় তাহলে জ্বালানী শেষ করে ফেলার পর আগের নক্ষত্রটার মতো শুধুমাত্র ইলেকট্রনগুলোর তীব্র বিকর্ষণ এর সংকোচনকে বন্ধ করতে পারবে না। সেই প্রচণ্ড মহাকর্ষের চাপে সংকুচিত হতে হতে পরমাণুগুলোর ইলেকট্রনগুলো কেন্দ্রে থাকা প্রোটনের সাথে মিশে নিউট্রন হয়ে যেতে থাকবে। যেহেতু সব পরমাণুতে প্রোটন আর ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান সমান তাই ইলেকট্রনগুলো প্রোটনের সাথে মিশে যেতে যেতে একসময় নক্ষত্রটাতে থাকবে শুধুই নিউট্রন। এসময় নিউট্রিনো নামে একটা কণিকাও তৈরি হয়। এই নিউট্রিনোর গতিবেগ খুব বেশি তাই তারা দ্রুত নক্ষত্র ছেড়ে বেড়িয়ে আসে।

এই অবস্থায় আবার এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল কাজ করা শুরু করবে (আগেরবার এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল কাজ করেছিল ইলেকট্রনের মধ্যে। এবার এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল কাজ করবে নিউট্রনের মাঝে) এবং নিউট্রনের মাঝে প্রচণ্ড বিকর্ষণের ফলে মৃত নক্ষত্রটার সংকোচন বন্ধ হয়ে স্থিতিশীলতা চলে আসবে। এ ধরনের নক্ষত্রকে বিজ্ঞানীরা বলেন Neutron star। ঠিক যত সহজে Neutron star এর কথা বলে ফেলা হলো Neutron star ঠিক ততটাই বিস্ময়কর বস্তু। সূর্যের প্রায় দ্বিগুণ ভর নিয়েও এক একটা Neutron star এর ব্যাসার্ধ হয় মাত্র ১১-১৫ কিলোমিটার (প্রায় ৭-৮ মাইলের মতো)।

এত বিশাল পরিমাণ ভরকে এতো ছোট জায়গায় আঁটিয়ে ফেলতে গিয়ে এর ঘনত্ব হয় ভয়াবহ। যদি কোনো একটা Neutron star থেকে কোনোভাবে এক চা-চামচ পরিমাণ পদার্থ পৃথিবীতে নিয়ে আসা যেত তাহলে তার ভর হতো কয়েক বিলিয়ন টন। তবে তার চেয়েও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এর স্পিন বা ঘূর্ণন। প্রচণ্ড ভর নিয়ে এক একটা Neutron star সেকেন্ডে প্রায় ৭০০ বারের মতো করে ঘুরতে থাকে (মিনিটে ৪৩,০০০ বার)।

নিউট্রন তারকার মধ্যে শতকরা ১০০ ভাগ নিউট্রন থাকার কথা হলেও আসলে এর মধ্যে কিছু প্রোটন আর কিছু ইলেকট্রন থেকে যায়। এই চার্জযুক্ত কণিকাগুলোকে নিয়ে এত অকল্পনীয় বেগে ঘোরার কারণে এর চারিদিকে এত শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি হয় যে মহাবিশ্বে Neutron star এর মতো শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র আর কিছুতে নেই।

তাপমাত্রার জন্য Neutron star থেকে সারাক্ষণই দৃশ্যমান আলো, গামা রশ্মি সহ অন্যান্য শক্তিশালী বিকিরণ বের হতে থাকে। এই বিকিরণের কায়দাও সাধারণ নক্ষত্রদের মতো না, এর দুই মেরু থেকে অনেকটা জেটের মতো করে এসকল শক্তিশালী রশ্মি নির্গত হতে থাকে। সেইসাথে বেশিরভাগ নিউট্রন তারকাই তার অক্ষের সাথে কিছুটা কোনাকুনিভাবে প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকে। অনেকটা পৃথিবীর মতো। পৃথিবীও তার অক্ষের সাথে প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি কোণ করে ঘোরে যার জন্য আমরা ঋতুবৈচিত্র্য দেখতে পাই।

পৃথিবী থেকে অনেক অনেক অনেক দূরের কোনো নিউট্রন তারকা থেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী বিকিরণ হয়তো পৃথিবীকে আঘাত করে কিন্তু নিজের অক্ষের সাথে কিছুটা হেলে ঘুরার কারণে এই বিকিরণকে সারাক্ষণ পাওয়া যায় না। একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর এই বিকিরণ পৃথিবীকে আঘাত করতে থাকে। নির্দিষ্ট সময় পর পর এসকল নিউট্রন তারকা থেকে pulse পাওয়া যায় বলে এদেরকে বলে pulsar। এই সময়ের পার্থক্যটুক সবসময় একই থাকে এবং এটা এতটাই নির্ভুল যে প্রথম যখন বিজ্ঞানীরা একটা নিউট্রিন তারকা থেকে আসা বিকিরণ সিগনাল ধরতে পেরেছিলেন তারা বিশ্বাসই করতে পারেননি যে এটা কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা হতে পারে। তারা ভেবেছিলেন হয়তোবা কোনো মহাজাগতিক প্রাণী পৃথিবীর মানুষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছে!

কিন্তু নক্ষত্রের ভর যে সবসময় সূর্যের ভরের দ্বিগুণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে তেমন কোনো কথা নেই। সত্যি কথা বলতে আমাদের সূর্য খুব ছোট একটা বামন প্রজাতির নক্ষত্র এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে ভারী নক্ষত্রটা সূর্যের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ ভারী! এত ভারী নক্ষত্রের মৃত্যু, অল্প ভরের নক্ষত্রের মতো সরল সোজা হয় না। সেই মৃত্যু প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিস্ময়কর।

সূর্যের দ্বিগুণের বেশি ভরসম্পন্ন নক্ষত্রগুলো যখন তাদের সব হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে পরিণত করে করে শেষ করে ফেলে তখন তাদেরও মহাকর্ষীয় সংকোচনকে আর ধরে রাখার মতো শক্তি থাকে না। ভর বেশি হওয়াতে তাদের সেই মহাকর্ষীয় আকর্ষণটাও হয় অনেক বেশি। সেই প্রচণ্ড আকর্ষণে সংকুচিত হতে হতে নক্ষত্রটার তাপমাত্রা এত বেড়ে যায় যে এর ভেতরে আরেকবার নিউক্লিয়ার ফিউশান বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এবারে হিলিয়াম থেকে কার্বন, কার্বন থেকে লোহা পর্যন্ত ভারী মৌলগুলো তৈরি হয় এবং বাড়তি ভরটুক শক্তি হিসেবে বেরিয়ে আসে।

নক্ষত্র যদি সূর্যের ৬ গুণের চেয়ে বেশি ভারী হয় তবে তার কেন্দ্রের প্রচণ্ড ভর বাইরের স্তরের সাথে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে না। যার কারণে প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে এর বাইরের স্তরটা

মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের এই স্তরের সাথে সাথে নক্ষত্রে তৈরি হওয়া ভারী মৌলগুলোও মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের রক্তে যে আয়রন, হাড়ের ক্যালসিয়াম এসব ভারী মৌলগুলো একসময় কোনো না কোনো নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হয়েছিল। তাই বলা যায় আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো নক্ষত্রের অংশ! এই বিস্ফোরণটাকে বিজ্ঞানীরা বলেন সুপারনোভা।

চিত্রঃ সুপারনোভার পর এক্স-রে, অবলাল আর দৃশ্যমান আলোতে কেপলারের অবশেষ।

সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের ভারী কেন্দ্রটি এর ভরের জন্য ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। যতই সংকুচিত হয় ততই এর ভর অল্প জায়গার মধ্যে এঁটে যেতে থাকে। যার কারণে এর মহাকর্ষ বল আরও শক্তিশালী হতে থাকে। আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি থেকে আমরা জানি কোনো বস্তুর ভর খুব বেশি হলে তা স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে, যার কারণে তার পাশ দিয়ে আলো আসার সময় বেঁকে যায়। এ কারণে দেখা যায় সূর্যগ্রহণের সময় দূরের নক্ষত্র থেকে আসা আলো সূর্যের মহাকর্ষের কারণে বেঁকে যায়।

নক্ষত্রের কেন্দ্রটা যতই সংকুচিত হতে থাকে ততই এর মহাকর্ষ শক্তিশালী হতে থাকে, এই শক্তিশালী মহাকর্ষের জন্য কেন্দ্রটা আরও বেশি সংকুচিত হতে থাকে। এবারে আর ইলেকট্রন বা নিউট্রনের এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল এই ভয়াবহ সংকোচনকে আটকাতে পারে না। এভাবে সংকুচিত হতে হতে একসময় কেন্দ্রটার মহাকর্ষ এতই বেড়ে যায় এবং তা স্থান-কালকে এতো বেশি বাঁকিয়ে ফেলে যে এর থেকে আর আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। বাইরে থেকে দেখলে দেখা যাবে নক্ষত্রের কেন্দ্রটি থেকে নির্গত আলোর পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসছে। কেন্দ্রটা যখন সংকুচিত হয়ে একটা নির্দিষ্ট আকারের চেয়ে ছোট হয়ে যাবে তখন আর কোনো আলোই বের হতে পারবে না। এরকম একটা অবস্থায় যখন পৌঁছে তখন তাকে বলে ব্ল্যাকহোল (কৃষ্ণবিবর)।

কৃষ্ণবিবর সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয়। তবে আশ্চর্যজনক হলেও একে বুঝতে হলে শুধুমাত্র ভর, চার্জ এবং কৌণিক ভরবেগ এই তিনটা রাশি জানাই যথেষ্ট! সব ব্ল্যাকহোলের চার্জ এবং কৌণিক ভরবেগ থাকতে হবে তা নয় কিন্তু সকল ব্ল্যাকহোলেরই ভর আছে। বেশি ভরের কারণেই আসলে ব্ল্যাকহোলটা সৃষ্টি হয়েছিল। তাই একটা ব্ল্যাকহোলকে বুঝতে হলে আসলে শুধু তার ভরটা জানলেই চলে!

চিত্রঃ একটা গ্যালাক্সি আর আমাদের দৃষ্টিসীমার মাঝে যদি একটা ব্ল্যাকহোল চলে আসে তবে আলো বাঁকিয়ে অনেকটা এমন দেখাবে।

ব্ল্যাকহোলের চারিদিকে যে ব্যাসার্ধের ভেতর থেকে এমনকি আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না তাকে বলে ঘটনা দিগন্ত। একটা ব্ল্যাকহোল যদি সূর্যের তুলনায় দশগুণ ভারী হয় তবে তার ঘটনা দিগন্তের পরিধি হবে মাত্র ১৮৫ কিলোমিটার। সেটা কত কম তা বোঝার জন্য বলা যায় যদি এর সম্পূর্ণ ভরটুকু ঘটনা দিগন্তের

ভেতরে সুষমভাবে ছড়ানো থাকতো তবে এর প্রতি সিসি (কিউবিক সেন্টিমিটার) আয়তনের ভর হতো ২০০ মিলিয়ন টন!

তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপারটা হলো ব্ল্যাকহোলের এই বিশাল পরিমাণ ভরটা কিন্তু ঘটনা দিগন্তের ভেতরে সুষমভাবে ছড়ানো থাকে না। যদি ব্ল্যাকহোলটা ঘূর্ণায়মান না হয় তবে ভরটা একটা অত্যন্ত ছোট বিন্দুর মধ্যে সংকুচিত হয়ে থাকে যার আকার  সেন্টিমিটারের মতো। সংখ্যাটা কতটা ছোট তা বোঝার জন্য বলা যায় পরমাণুর আকার  সেন্টিমিটার প্রায়, যা  থেকে একশো বিলিয়ন বিলিয়ন গুণ বড়। দশটা সূর্যের সমান ভর কী করে এত ছোট জায়গায় সংকুচিত হয়ে থাকে তার চেয়ে বড় বিস্ময় কি আর দুটো আছে? এই অত্যন্ত ছোট বিন্দুটার নাম সিঙ্গুলারিটি। অবশ্য ব্ল্যাকহোল ঘূর্ণায়মানও হতে পারে। সেক্ষেত্রে সিঙ্গুলারিটি বিন্দুর মতো না হয়ে রিংয়ের মতো হবে কিন্তু আকারের ক্ষেত্রে সেই একই ব্যাপার!

চিত্রঃ ঘূর্ণায়মান নয় এমন ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি।
চিত্রঃ ঘূর্ণায়মান ব্ল্যাকহোলের রিঙের মতো সিঙ্গুলারিটি।

যেহেতু ব্ল্যাকহোল থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না সেহেতু ব্ল্যাকহোলকে সরাসরি দেখার কোনো উপায় নেই। কিন্তু কোথাও যদি একটা ব্ল্যাকহোল থাকে তবে তার প্রচণ্ড আকর্ষণে চারদিকের ধূলিকণা, গ্যাসের অণু-পরমাণু সব তার দিকে আকৃষ্ট হতে থাকবে। এসব ধূলিকণা, অণু-পরমাণু যতই ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি যেতে থাকে ততই তাদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। যার কারণে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। তাপমাত্রা বাড়লে তার থেকে শক্তিটা আলো হিসেবে বের হয়ে আসে। বাল্বের ফিলামেন্ট, গরম লোহা ইত্যাদি তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।

এই তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে যখন কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে যাবে তখন এখান থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী আলোক রশ্মি (এক্স-রে) বের হতে থাকবে যা খালি চোখে দেখা যায় না। ব্ল্যাকহোলের কাছ থেকে বেরিয়ে আসা এক্স-রে দেখে বিজ্ঞানীরা প্রথম পৃথিবী থেকে প্রায় ছয় হাজার আলোকবর্ষ দূরে সিগনাস এক্স ওয়ান (Cygnus X-I) নামে একটি ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করেছিলেন।

চিত্রঃ Cygnus X-I ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়ে আসা এক্স-রে।

এছাড়াও কিছু কিছু ব্ল্যাকহোল প্রচণ্ড শক্তিশালী এক্স রশ্মি জেটের মতো করে মহাকাশে নিক্ষেপ করে। M 87 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে এমন একটা ব্ল্যাকহোল রয়েছে যেটা মহাকাশে প্লাজমা জেট নিক্ষেপ করে। এই জেটটা দৈর্ঘে প্রায় ৫০০ আলোকবর্ষ বিস্তৃত!

দুটি নক্ষত্র যদি একে অপরকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তবে পুরো সিস্টেমটাকে বলা হয় বাইনারি সিস্টেম। কোনো একটা বাইনারি সিস্টেমের একটা নক্ষত্র যদি মৃত্যুর পর ব্ল্যাকহোল হয়ে যায় তবে বাকি নক্ষত্রটার সেই ব্ল্যাকহোলটার প্রবল আকর্ষণ থেকে রক্ষা নেই। ব্ল্যাকহোলটা তখন সেই দুর্ভাগা নক্ষত্রটা থেকে সকল পদার্থ টেনে নিতে থাকে। এই অবস্থায় একটা ব্ল্যাকহোলকে শনাক্ত করা বেশ সহজ।

বিজ্ঞানীদের ধারণা বড় বড় গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্রে অকল্পনীয় ভরসম্পন্ন ব্ল্যাকহোল রয়েছে। সূর্যের ভরের বিলিয়ন গুণ ভরসম্পন্ন এসব ব্ল্যাকহোল সম্পূর্ণ গ্যালাক্সিকে ধরে রাখে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যে ব্ল্যাকহোলটা রয়েছে যার ভর সূর্যের ভরের ৪ মিলিয়ন গুণ!

চিত্রঃ বাইনারি সিস্টেমের অপর নক্ষত্রটাকে ব্ল্যাকহোল গ্রাস করে ফেলছে।

সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো ব্ল্যাকহোলের আশ্চর্যজনক সব কাণ্ডকারখানা আমরা শুধুমাত্র বাইরে থেকেই দেখতে পারি কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ভেতরে সিঙ্গুলারিটিতে কী হয় তা আমরা কখনো জানতে পারবো না। আপেক্ষিকতার বিশেষ থেকে আমরা জানি কোনোকিছুই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না। যেহেতু আলোও ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্ত থেকে বাইরে বেরোতে পারে না, সেহেতু কেউ যে একটা মহাকাশ যান নিয়ে ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের ভেতরে ঢুকে সিঙ্গুলারিটিতে কি হচ্ছে দেখে আসবে তার কোনো উপায় নেই। ঘটনা দিগন্ত পার হয়ে ভেতরে ঢোকা মাত্র চিরদিনের জন্য বাইরের মহাবিশ্বের সাথে সকল যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাবে।

আমরা মাঝে মাঝেই বিজ্ঞান কল্পকাহিনী পড়ে পুলকিত হই। সত্যিকারের প্রকৃতি যে কল্পকাহিনির চেয়েও একশগুণ বেশি পুলক নিয়ে অপেক্ষা করছে তা কি আমরা মনে রাখি? [নক্ষত্রদের আরো কিছু জীবন বৈচিত্র্য নিয়ে আরেকদিন কথা হবে]

তথ্যসূত্র

  1. http://www.skyandtelescope.com/astronomy-resources/how-many-stars-are-there/
  2. http://www.esa.int/Our_Activities/Space_Science/Herschel/How_many_stars_are_there_in_the_Universe
  3. https://www.youtube.com/watch?v=EuC-yVzHhMI
  4. http://www.nasa.gov/audience/forstudents/5-8/features/nasa-knows/what-is-a-supernova.html
  5. http://hubblesite.org/gallery/album/star/supernova/titles/true/
  6. http://space-facts.com/m87-galaxy/
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/R136a1
  8. http://www.nasa.gov/feature/goddard/2016/nasa-s-hubble-finds-universe-is-expanding-faster-than-expected/
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_most_massive_stars

অজানা অদৃশ্য মহাবিশ্ব

আমাদের সূর্য আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘূর্ণায়মান বাহুর একপাশে অবস্থান করছে। রাতের আকাশের দিকে খালি চোখে তাকালে আমরা যে এক হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই তার বেশিরভাগই আকাশগঙ্গায় অবস্থিত। খালি চোখে না তাকিয়ে একটি সাধারণ মানের দূরবীন ব্যবহার করলে চোখের সামনে নক্ষত্রের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। যাকে এখন সাধারণ মানের দূরবীন বলা হচ্ছে একটা সময় কিন্তু বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপও এর সাথে পাল্লা দিতে পারতো না। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ধারণা ছিল আকাশগঙ্গা ছায়াপথই আমাদের সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। ১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশগঙ্গার চেয়ে বেশি কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের টেলিস্কোপের ক্ষমতাও বাড়তে লাগল। নতুন নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ আকাশের দিকে তাক করে বিজ্ঞানীরা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন।

১৯২০ সালের দিকে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল আবিষ্কার করলেন এই মহাবিশ্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেয়েও অনেক বেশি বড়। আগে যেসব ঝাপসা আলোর বিন্দুকে অনেক দূরবর্তী নক্ষত্র ভাবা হতো, তাদের অনেকগুলোই আসলে আকাশগঙ্গার মতোই আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি! জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতিদিন নতুন নতুন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। সেই সময় Fritz Zwicky ছিলেন ক্যালটেকের প্রফেসর। তিনি Coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আশেপাশের অন্যান্য গ্যালাক্সিগুলোর সাপেক্ষে কোনো একটি গ্যালাক্সির গতিবেগ পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে কতটুকু ভর আছে সেটি বের করা সম্ভব।

প্রফেসর Fritz Zwicky, coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলোর গতিবেগ মেপে নিয়ে তার মধ্যে ঠিক কতটুকু ভর থাকতে পারে তা হিসেব করে বের করে নিলেন। কিন্তু এই ভরকে দৃশ্যমান ভরের সাথে তুলনা করতে গিয়ে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারলেন না। দৃশ্যমান ভর বলতে বোঝানো হয় গ্যালাক্সির যেসব নক্ষত্র আলো বিকিরণ করে কিংবা যেসব ধূলিকণা, গ্যাসের মেঘ নক্ষত্রের আলোকে আটকে দেয়। মোটকথা গ্যলাক্সির দিকে তাকিয়ে আমরা যেটুকু দেখতে পাই তার মোট ভর। Fritz Zwicky-এর হিসেব অনুযায়ী ক্লাস্টারের মধ্যে গ্যালাক্সিগুলোর যে গতিবেগ ততটুকু গতিবেগ অর্জন করতে হলে গ্যালাক্সিগুলোতে তাদের দৃশ্যমান ভরের প্রায় ১৬০ গুণ বেশি ভর থাকা উচিৎ ছিল।

তার মানে অদৃশ্য কোনো ভর গ্যালাক্সিগুলোর এই গতিবেগের জন্য দায়ী। সেই অদৃশ্য ভরকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল না। তিনি অনেকভাবে হিসেব করে দেখলেন, একটি বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য ভর না থাকলে Coma cluster-এর ভারসাম্য বজায় থাকত না। তিনি এই অদৃশ্য ভরের নাম দিলেন ‘হারানো ভর’ বা Missing matter।

ধরা-ছোঁয়া যায় এমন প্রায় সবকিছুর ভরই দাঁড়িপাল্লার নীতি ব্যবহার করে মেপে বের করে ফেলা যায়। কিন্তু পৃথিবী থেকে অকল্পনীয় দূরত্বে অবস্থিত এসব নক্ষত্র কিংবা গ্যালাক্সির ভর বিজ্ঞানীরা ঠিক কীভাবে মাপেন? পৃথিবীর ভর প্রায়  কেজি, সূর্যের ভর প্রায়  কেজি, বৃহস্পতির ভর প্রায়  কেজি, মিল্কিওয়ের ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ।

কিন্তু এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কাছে গিয়ে গ্যালাক্সিটাকে একটা দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে ভর মেপে নেয়ার কোনো উপায় নেই। তাই বিজ্ঞানীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরের অনেক দূরবর্তী পদার্থের ভর মাপেন একটু বাঁকা পথে। পথটা বাঁকা হলেও পদ্ধতিটি খুব সহজ। আমরা জানি একটি বস্তুর ভর যত বেশি হবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ হবে তত বেশি। আর বস্তুটি থেকে দূরত্ব যত বাড়তে থাকবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণও ততই কমে যাবে (বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ এবং ঠিক এ কারণেই সূর্যের চারিদিকে নিজের কক্ষপথে ভারসাম্য বজায় রাখতে বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি। নেপচুনের গতিবেগ সেই তুলনায় অনেক অনেক কম)। তাই আশেপাশের গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘ ইত্যাদির গতিবেগ এবং দূরত্ব থেকে খুব সহজেই ভরটুক বের করে ফেলা যায়।

2চিত্রঃ বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ। তাই বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি।

একটি ভরকে ঘিরে ঘুরপাক খাওয়া পদার্থের আরেকটি উদাহরণ হলো সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। যেসব গ্যলাক্সির একটি অত্যন্ত ভারী কেন্দ্র থাকে এবং গ্যালাক্সির সকল নক্ষত্র সেই ভারী কেন্দ্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তদেরকে বলা হয় সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। তাই ঠিক একইরকম হওয়ার কথা সর্পিলাকার গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলোর ঘূর্ণন বেগ কেন্দ্রের দিকে নক্ষত্রগুলোর চেয়ে অনেক কম হবে। বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন কিন্তু সেরকমটি দেখলেন না।

3চিত্রঃ সর্পিলাকার গ্যালাক্সি।

মিল্কিওয়ের মতো সর্পিল গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন পর্যবেক্ষণ করতে করতে তিনি দেখলেন গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলে যেমন নক্ষত্র, গ্যাস আর ধুলিকণার মেঘের গতিবেগ কমে যাওয়ার কথা ছিল, তেমনটি হচ্ছে না। বরং গতিবেগ প্রায় সমান সমান।

ভেরা রুবিনের হিসেব অনুযায়ী গ্যালাক্সিগুলোতে দৃশ্যমান যতটুক ভর আছে এবং সেই ভরের জন্য গ্যালাক্সির মধ্যে নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘের যতটুক গতিবেগ নিয়ে ঘোরার কথা ছিল তার তুলনায় এ গতিবেগ প্রায় দশগুণ বেশি। তারমানে নিশ্চয়ই গ্যলাক্সির মধ্যে এমন কোনো পদার্থ আছে যা গ্যালাক্সির এই গতির জন্য দায়ী এবং কোনো এক কারণে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না। রুবিন হিসেব করে বের করলেন, এমনটা হবে যদি গ্যালাক্সির মধ্যে অদৃশ্য ভরের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের দশগুণ হয়।

অদৃশ্য পদার্থকে এখন বলা হয় ‘Dark matter’। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা শত শত গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছেন। সব ক্ষেত্রেই সেই একই ব্যাপার। কিন্তু বহুবার বহুভাবে চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পেলেন না। যে বস্তুকে চোখেই দেখা যায় না তাকে খুঁজে পাবেন কীভাবে?

ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় আর আশ্চর্যজনক বস্তুগুলোর মধ্যে একটি। ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত কোনো পদার্থের সাথে কোনোরকম মিথস্ক্রিয়া করে না। তবে আর কিছুই না হোক ডার্ক ম্যাটারের ভর আছে (এই ভর যেকোনো হিসেবে বিশাল, বিজ্ঞানীরা এখন জানেন আমাদের মহাবিশ্বের ২৩ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার)। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব থেকে আমরা দেখেছি, যেকোনো ভর তার আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলে। তাই মহাকাশে কোথাও ডার্ক ম্যাটার থাকলে তা নিজের ভরের জন্য আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলবে।

কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র আর আমাদের দৃষ্টির মাঝে যদি ডার্ক ম্যাটার চলে আসে তবে সেই গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র থেকে আসা আলো বেঁকে যাবে। আমরা বুঝে ফেলব মাঝে প্রচণ্ড ভারী কিছু একটা আছে। শুধু সেই ভরকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না! ভারী বস্তুর আলোকে বাঁকিয়ে দেয়ার ধর্মকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন Gravitational Lensing।

গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং শুনতে যতটা খটমটে, বাস্তবে ঠিক ততটাই কাজের জিনিস। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বুঝতে পারেন তাই নয়, কোনো জায়গায় ঠিক কতটুকু ডার্ক ম্যাটার আছে, কীভাবে বিন্যস্ত আছে সব বের করতে পারেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখেছেন একেকটি গ্যালাক্সির মোট ভরের বেশিরভাগই আসলে ডার্ক ম্যাটারের ভর। গ্যালাক্সিগুলোতে নক্ষত্র, ধূলিকণা এবং গ্যাসের মেঘ ছাড়া যেসব ফাঁকা স্থান আছে সেগুলো আসলে ঠিক ফাঁকা নয়, সেখানে আছে ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানীরা রীতিমতো ডার্ক ম্যাটারের ম্যাপও তৈরি করে ফেলেছেন।

4চিত্রঃ ডার্ক ম্যাটারের ভরের জন্য গালাক্সি থেকে আসা আলো বেঁকে যাচ্ছে।

ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পাওয়ার পর পরই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন, এটি তৈরি হয়েছে কী দিয়ে? আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু নাকি অজানা কোনো কণা দিয়ে?

সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে, ডার্ক ম্যাটার আসলে আমাদের চেনা জানা অণু-পরমাণু দিয়েই তৈরি। শুধু তারা আলো বিকিরণ করে না বলে আমরা দেখতে পাই না। অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি কিন্তু আলো বিকিরণ করে না এমন অনেক পদার্থের কথাই আমরা জানি। সবার প্রথমে আসে ব্ল্যাকহোল। ব্ল্যাকহোল আলো বিকিরণ করে না, প্রচণ্ড মহাকর্ষ বলে সবকিছু নিজের দিকে টানতে থাকে। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং ব্যবহার করে তাদের খুঁজে বের করতে হয়।

তারপরেই আসে M.A.C.H.O. বা Massive Compact Halo Object। এরা আসলে ছোট ছোট ভারী নক্ষত্র যারা খুব অল্প আলো বিকিরণ করে। এদেরকেও গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়। তাছাড়া আছে Brown dwarf. এরা যথেষ্ট ভারী কিন্তু খুব বেশি আলো বিকিরণ করে না। কিন্তু গ্যালাক্সি আর ক্লাস্টারগুলোতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ এতো বেশি যে এসব কিছুও যথেষ্ট না। এক একটি গ্যালাক্সিতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের প্রায় দশ গুণ। শুরুর দিকে নিউট্রিনো বা এক্সিওন এর কথাও চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু এরা খুবই হালকা ভরের কণিকা। এরপর আর একটি সম্ভাবনাই বাকি থাকে। হয়তো ডার্ক ম্যাটার নতুন ধরনের কোনো কণিকা দ্বারা তৈরি যাদের আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।

আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি না হলেও ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্য কীরকম হতে পারে তা বিজ্ঞানীরা বের করেছেন। এরা আলোর মতো দ্রুত গতির নয়। এরা আমাদের পরিচিত সাধারণ সকল পদার্থকে মহাকর্ষ বলে আকর্ষণ করে এবং মহাকর্ষ ছাড়া অন্য কোনোভাবে পদার্থের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না। আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ডার্ক ম্যাটারের কণিকা এপাশ থেকে ওপাশে চলে যাচ্ছে, আমরা টের পাচ্ছি না। কারণ তারা কোনোভাবেই অণু-পরমাণুকে প্রভাবিত করে না। বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাব্য কণিকার নাম দিয়েছেন WIMP (Weakly Interacting Massive Particle)। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে তারা খুবই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। তাই এখন পর্যন্ত WIMP আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

তাই বলে বিজ্ঞানীরা বসে থাকেননি। আমেরিকার Soudan-এ মাটির নিচে একটি পরিত্যাক্ত লোহার খনিতে প্রায় অর্ধমাইল নীচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। এই ল্যাবে শূন্য কেলভিনেরও কম তাপমাত্রায় ১৬টি জার্মেনিয়াম সেন্সর বসানো আছে। সেন্সরগুলোতে জার্মেনিয়ামের ঘনত্ব খুব বেশি, পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি, প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। সেন্সরটিকে যখন শূন্য কেলভিনের নিচে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এটি অনেকটা থার্মোমিটারের মতো কাজ করে। কোনো কণা বা রশ্মি এই সেন্সরের মধ্য দিয়ে চলে গেলেই বিজ্ঞানীরা কণা বা রশ্মির বৈশিষ্ট্য হিসেব করে বের করে ফেলতে পারেন।

এই সেন্সর থেকে খুব সূক্ষ্ম মান পাওয়া যায়। কিন্তু পৃথিবীপৃষ্ঠে এটি নিয়ে কাজ করার খুব বড় রকমের একটি সমস্যা আছে। অনেকে নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত নিউট্রিনো এসে পৃথিবীকে আঘাত করছে। সেই সাথে আছে মিউওন, বিভিন্ন মহাজাগতিক রশ্মি, পৃথিবীপৃষ্ঠে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন রশ্মি। সেন্সরগুলো এতটাই সংবেদনশীল যে যেকোনো ধরনের কণার আঘাতেই বিক্ষেপ দেখাবে। এতসব সমস্যাকে পাশ কাটাতে বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। মাটির বিভিন্ন স্তর ভেদ করে সব ধরনের কণা এবং রশ্মি সেন্সর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা জার্মেনিয়াম সেন্সরে কোনো একদিন একটি WIMP কণিকা আঘাত করবে। যদিও WIMP কণিকা অণু-পরমাণুর সাথে এতই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করার কথা যে, জার্মেনিয়াম সেন্সর দিয়ে WIMP কণিকা ধরা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা এখনো WIMP কণিকা ধরতে পারেননি, এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

5চিত্রঃ ভূমির গভীরে এই স্থানে অবস্থিত গবেষণাগার। পূর্বে এটি স্বর্ণ উত্তোলন খনি ছিল।

শুনতে অবাক লাগবে, মহাবিশ্বের প্রায় ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার হলেও টেলিস্কোপ দিয়ে দৃশ্যমান আলো ব্যবহার করে আমরা যতটুকু বস্তু দেখতে পাই সেটি মহাবিশ্বের ৪ শতাংশ মাত্র। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো সুষমভাবে না থেকে ছাড়াছাড়াভাবে ছড়িয়ে থাকার কারণও ডার্ক ম্যাটার। কঙ্কাল যেমন দেহের আকারের পেছনে কাজ করে ডার্ক ম্যাটারের ক্ষেত্রেও সেই একই ব্যাপার। এখানে ২৩ + ৪ = ২৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে মাত্র। সেটি নিশ্চয়ই অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল সেটা অজানা এক ধরনের Energy। বিজ্ঞানীরা বলেন ‘Dark Energy’।

একসময় ভাবা হতো আমাদের মহাবিশ্ব স্থির। সর্বপ্রথম ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখলেন মহাবিশ্ব মোটেও স্থির নয়। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আলোর শিফট দেখে বলে দেয়া যায় তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে নাকি দূরে সরে যাচ্ছে। রেড শিফট অর্থাৎ আলো লালের দিকে সরে গেলে বুঝতে হবে দূরে সরে যাচ্ছে, আর ব্লু শিফট হলে বা নীলের দিকে হলে বুঝতে হবে এগিয়ে আসছে। এডউইন হাবল আকাশের সবদিকের গ্যালাক্সি থেকেই রেড শিফট পেলেন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে পৃথিবী বুঝি মহাবিশ্বের কেন্দ্র আর বাকি সব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখা গেলো পৃথিবী থেকে একটি গ্যালাক্সি যত দূরে তার দূরে ছুটে যাওয়ার হারও ততই বেশি। যার একটিই অর্থ হতে পারে- পৃথিবী মোটেই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবীসহ মহাবিশ্বের সবকিছু একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সোজা বাংলায়, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা আবিষ্কৃত হবার পর সবার আগে যেটা মাথায় আসে, একটা সময় মহাবিশ্বের সবকিছু নিশ্চয়ই এক জায়গায় একত্রিত ছিল। তারপর একদিন হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো কারণে সব আলাদা হয়ে বাইরের দিকে ছুটে যেতে শুরু করলো। বিজ্ঞানীরা এ বিস্ফোরণকে বলেন বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাং-এর আগে মহাবিশ্বের সবকিছু একবিন্দুতে একত্রিত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল বিগ ব্যাং-এর প্রবল ধাক্কার ফলাফল হিসেবে মহাবিশ্ব এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিস্ফোরণের পরপরই মহাকর্ষ বল সম্প্রসারণের বেগটাকে কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই একসময় সম্প্রসারণের বেগ কমতে কমতে মহাবিশ্ব স্থির হয়ে যাবে। তারপর মহাকর্ষের প্রভাবে আবার সংকোচন শুরু হবে। এর মাঝে বলে নেই, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুধুমাত্র স্থানের মধ্যে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার মতো ঘটনা না। সেরকম কিছু হলে পৃথিবী ধীরে ধীরে সূর্য থেকে দূরে সরে যেতো। স্থান শাশ্বত কিছু নয়। বিগ ব্যাং এর ফলে পদার্থের সাথে সাথে স্থানও সৃষ্টি হয়েছিল এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বলতে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির মধ্যবর্তী স্থানের সম্প্রসারণ বোঝানো হয়েছে।

কেউ যদি প্রশ্ন করে আমাদের মহাবিশ্বের পরিণতি কী? একটি সম্ভাব্য উত্তর হবার কথা ছিল- এখন মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাকর্ষের কারণে ধীরে ধীরে এ সম্প্রসারণের বেগ কমে আসার কথা এবং শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে আবার একটি বিন্দুতে চলে আসার কথা। বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। তাই বছর কয়েক আগে কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী ভাবলেন সম্প্রসারণ কমে আসার হারটা বের করা যাক। সেটা বের করতে হলে প্রথমেই জানা দরকার বিগ ব্যাং-এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতিবেগ কেমন ছিল।

বর্তমান সময়ে বসে কীভাবে অতীতের সম্প্রসারণ বেগ বের করা যায়? তার জন্য খুব সহজ উপায় আছে। ধরা যাক, এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে দশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্যালাক্সি থেকে আলো আসছে। তার মানে হচ্ছে, গ্যলাক্সিটা থেকে দশ হাজার বছর আগে যে আলোটুকু পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছিল সেই আলোটুকু পৃথিবী আর গ্যালাক্সিটার মধ্যবর্তী দূরত্ব অতিক্রম করে এই মাত্র আমাদের কাছে এসে পৌঁছলো। আমরা যদি এই আলোর রেড শিফট মাপি তাহলে পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়ার যে বেগ পাবো সেটা হচ্ছে দশ হাজার বছর আগের সম্প্রসারণের গতিবেগ। বর্তমানে সেই গতিবেগ হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু এখনই সেটি জানার কোনো উপায় নেই। সেটি জানতে হলে আরো দশ হাজার বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

ঠিক একই পদ্ধতিতে আরও কাছের বা দূরের গ্যালাক্সি বা আলোকিত কোনো বস্তুর রেড শিফট মেপে বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণের বেগ বের করা সম্ভব (খুব সূক্ষ্মভাবে রেড শিফট মাপার জন্য দরকার খুব উজ্জ্বল লক্ষ্যবস্তু। বিজ্ঞানীরা তাই মহাকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল টাইপ-১ সুপারনোভা ব্যবহার করেন)। বিজ্ঞানীদের দুটি দল আলাদা আলাদাভাবে প্রায় ৬০ টি সুপারনোভার রেড শিফট মেপে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার মোটেই কমে যাচ্ছে না, বরং তা ত্বরিত হারে বাড়ছে।

বারবার ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণ করেও বিজ্ঞানীরা একই ফল পেলেন। যার অর্থ হচ্ছে মহাবিশ্বে এক ধরনের এনার্জি বিদ্যমান যা বিকর্ষণধর্মী বল সৃষ্টি করে স্থানের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। একেই বিজ্ঞানীরা বলেন Dark Energy। এই ডার্ক এনার্জিই মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জি বিগ ব্যাং-এর সাথে সাথেই সৃষ্টি হয়েছিল। সম্প্রসারণের হার বের করতে গিয়ে দেখা গেল, বিগ ব্যাং-এর পরে প্রথম ৯ বিলিয়ন বছর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছিল। ঠিক তার পরপরই হঠাৎ করে সম্প্রসারণের হার বাড়তে শুরু করেছিল এবং গত পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে এ হার বেড়েই চলেছে।

যার অর্থ হচ্ছে- প্রথমদিকে মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার আর সাধারণ পদার্থের মহাকর্ষের আধিপত্য ছিল। তাই সম্প্রসারণের হার কমে যাচ্ছিল। যতই সময় গেল আর মহাবিশ্ব বড় হতে লাগল, ধীরে ধীরে ডার্ক এনার্জির আধিপত্য শুরু হলো। সম্প্রসারণের বেগ আবার বেড়ে যেতে শুরু করল। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা উচ্চ তাপমাত্রা আর অধিক ঘনত্বে (মহাবিশ্বের শুরুর অবস্থা) ডার্ক এনার্জির ক্রিয়া ধর্তব্যের মাঝে আসবে না। তাপমাত্রা যতই কমে আসবে, ঘনত্ব যতই কমে আসবে, ডার্ক এনার্জি ততই মহাকর্ষ বলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে। পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এ কারণেই আবার সম্প্রসারণের বেগ বাড়তে শুরু করেছিল।

ডার্ক এনার্জিকে বলা যায় স্থানের এক রহস্যময় ধর্ম যা সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীরা এখনো জানে না ডার্ক এনার্জি এভাবেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে নাকি কোনো একসময় দিক পরিবর্তন করে ফেলবে। তাই শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হবে, নাকি এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে তা এ মুহূর্তেই বলা সম্ভব নয়। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মনে করেন মহাবিশ্ব এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে।

সেই উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীব্যাপী পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি Unified তত্ত্ব বের করার চেষ্টা করে আসছেন। একগুচ্ছ সমীকরণ, যার মাধ্যমে পুরো মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাবে। আইনস্টাইন তার জীবনের শেষ ত্রিশ বছর চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। তার পরে এখনো বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। যতই তারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, মহাবিশ্ব যেন ততই নতুন নতুন রহস্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। বাস্তব মহাবিশ্ব যে যেকোন রহস্য উপন্যাসের চেয়ে কোনো অংশেই কম না সেটা আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে বসে থাকি।

তথ্যসূত্র

১) http://pics-about-space.com/planet-mars-black-and-white?p=2#img7875126582525238326

২) en.wikipedia.org/wiki/Andromeda_Galaxy

৩) en.wikipedia.org/wiki/Solar_mass

৪) www.sudan.umn.edu/cdms/

৫) cdms.berkeley.edu/experiment.html

তারার জন্ম-মৃত্যু

খালি চোখে রাতের আকাশে তাকালে আমরা প্রায় ১০ হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই। সংখ্যার হিসাবে এটা খুবই কম। শুধুমাত্র আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথেই নক্ষত্র আছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন (এক হাজার মিলিয়নে এক বিলিয়ন, দশ লক্ষে এক মিলিয়ন)। দৃশ্যমান মহাবিশ্বে নক্ষত্র আছে প্রায় একশত হাজার মিলিয়নের মতো! একটা সময় মানুষের ধারণা ছিল নক্ষত্রগুলো এখন যেমন আছে সবসময় তেমনই ছিল। নক্ষত্রদেরও যে জন্ম মৃত্যুর মতো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় সে ধারণা মোটামুটি নতুনই বলা যায়। এই বিপুল পরিমাণ নক্ষত্রদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রক্রিয়াগুলো নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ। সেই গল্পই বলবো আজকে।

মহাকাশের কোথাও যদি হাইড্রোজেন গ্যাসের বিশাল সমাবেশ তৈরি হয় তখন গ্যাসের অণুগুলো নিজেরা নিজেদের আকর্ষণে (মহাকর্ষ বলের কারণে) সংকুচিত হতে শুরু করে। গ্যাস যতই সংকুচিত হতে থাকে ততই এর তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। কোনো গ্যাসকে সংকুচিত করলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া খুব পরিচিত ঘটনা। তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছে গেলে কিছুলে অবাক করা ব্যাপার ঘটে।

গ্যাসের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া মানে হলো গ্যাসের অণুগুলোর গতিবেগ বেড়ে যাওয়া। অণুগুলোর গতিবেগ বেড়ে যেতে থাকেলে এরা প্রচণ্ড বেগে নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। হাইড্রোজেনের ভাণ্ডার যখন খুব বেশি সংকুচিত হয়ে যায়, তাপমাত্রা যখন খুব বেশি বেড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছে যায় তখন গ্যাস অণুগুলোর গতিবেগ এত বেশি বেড়ে যায় যে একটা হাইড্রোজেন পরমাণু আরেকটা হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে মিলে হিলিয়াম নামে নতুন একটা পরমাণু গঠন করে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলে নিউক্লিয়ার ফিশন। নতুন এই হিলিয়াম পরমাণুটার ভর আগের হাইড্রোজেন পরমাণু দুটির ভরের যোগফলের চেয়ে কিছুটা কম হয়। এই বাড়তি ভরটুক আইনস্টাইনের  সূত্র অনুযায়ী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে বেরিয়ে আসে। এ শক্তির কিছু অংশ আমরা তাড়িৎচুম্বক তরঙ্গ হিসেবে দেখতে পাই।

এতক্ষণ হাইড্রোজেনের বিশাল ভাণ্ডারটি মহাকর্ষের কারণে লাগামহীনভাবে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যে মুহূর্ত থেকে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয় সেই মুহূর্ত থেকে নির্গত শক্তিটুকু সংকোচনের উল্টোদিকে বা বাইরের দিকে একটা চাপ তৈরি করে। যে আয়তনে এলে হাইড্রোজেনের ভাণ্ডারের মহাকর্ষীয় চাপ আর বাইরের দিকে প্রসারণের চাপ সমান হয় সেই আয়তনে এসে স্থির হয় এবং হঠাৎ করে জ্বলে ওঠে। এতে করে জন্ম হয় একটা নক্ষত্রের। নক্ষত্রটি তার বাকি জীবন হাইড্রোজেনের এই ভাণ্ডারকে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করে পার করে দেয়। কিন্তু যখন এই বিশাল হাইড্রোজেনের ভাণ্ডারটুকু শেষ হয়ে যায় তখন?

একটা নক্ষত্র আকারে যত বড় হয় তার জ্বালানীর পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই বড় নক্ষত্রের জীবনকালও বড়ই হবার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে নক্ষত্র যত বড় হয় তার তাপমাত্রা এবং নির্গত শক্তির পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই বড় বড় নক্ষত্রগুলো বেশি পরিমাণ জ্বালানীও খুব দ্রুতই শেষ করে ফেলে। সেই তুলনায় মাঝারী এবং ছোট নক্ষত্রগুলোর জীবনকাল মোটামুটি দীর্ঘ। আমাদের সূর্যও এরকম একটা নক্ষত্র এবং এর জীবনকাল মোটামুটিভাবে ১০ বিলিয়ন বছর। কিন্তু নক্ষত্র যত বড় বা ছোটই হোক একসময় তার কেন্দ্রের হাইড্রোজেন এবং অন্যান্য জ্বালানী শেষ হয়ে আসে। যতক্ষণ জ্বালানী থেকে শক্তি উৎপন্ন হচ্ছিল ততক্ষণ এ শক্তি মহাকর্ষীয় সংকোচনকে ঠেকিয়ে রেখেছিল। যে মুহূর্তে নক্ষত্রের জ্বালানী শেষ হয়ে শক্তি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে সেই মুহূর্ত থেকে মহাকর্ষকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য আর কিছু থাকবে না এবং নক্ষত্রটা আবার মহাকর্ষের কারণে সংকুচিত হতে শুরু করবে।

জ্বালানী শেষ হয়ে যাবার পর মহাকর্ষের ফলে মৃত নক্ষত্রটির ভাগ্যে কী ঘটে তা নিয়ে প্রথম চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর, ১৯২৮ সালে। তিনি তখন ছাত্র, ক্যামব্রিজে পড়তে যাচ্ছেন জাহাজে চড়ে। জাহাজে বসেই তিনি ভেবে ভেবে বের করলেন, একটা নক্ষত্র ঠিক কতটুকু পর্যন্ত বড় হলে জ্বালানী শেষ হবার পর সেটা সংকুচিত হতে হতে এক জায়গায় এসে থেমে যাবে।

চন্দ্রশেখর হিসাব করে দেখলেন, কোনো নক্ষত্রের ভর যদি আমাদের সূর্যের ভরের দেড় গুণ বা তার কম হয় তাহলে তার মহাকর্ষের জন্য সংকোচন এত শক্তিশালী হবে যে সেই নক্ষত্রগুলো জ্বালানী শেষ করে ফেলার পর নিজেদের সংকোচন আর বন্ধ করতে পারবে না। এ ধরনের নক্ষত্রের ক্ষেত্রে এমন একটা অবস্থা হবে যে সংকুচিত হতে হতে এর পরমাণুগুলো একেবারে গায়ে গায়ে লেগে যাবে। পরমাণুগুলো গায়ে গায়ে লেগে গেলে তাদের ইলেকট্রনগুলোর মধ্যে এক ধরনের তীব্র বিকর্ষণ কাজ করে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনার একটা কটকটে নাম আছে, এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল। এই তীব্র বিকর্ষণের ফলে শেষ পর্যন্ত মৃত নক্ষত্রটার সংকোচন থেমে গিয়ে মোটামুটি স্থিতিশীল একটা অবস্থায় চলে আসে। এ ধরনের মৃত নক্ষত্রকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন- white dwarf (শ্বেত বামন)।

শ্বেত বামনে পরিণত হয়ে যাবার পর নক্ষত্রটার বাকি জীবন খুব সাদামাটা। এরপর কিছুদিন নক্ষত্রটা তার উচ্চ তাপমাত্রার জন্য অল্প পরিমাণে শক্তি বিকিরণ করবে, তারপর ধীরে ধীরে শীতল হতে হতে শক্তি বিকিরণ বন্ধ করে দিয়ে একসময় নিবে যাবে। শ্বেত বামন হিসেবে একটি নক্ষত্রের মৃত্যু মোটামুটি শান্তিপূর্ণ মৃত্যু।

চিত্রঃ Messiar 4 গ্যালাক্সিতে অবস্থিত কিছু শ্বতবামন তারকা।

কিন্তু নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের দেড়গুণ বা তার চেয়ে অল্পকিছু বেশি হয় তাহলে জ্বালানী শেষ করে ফেলার পর আগের নক্ষত্রটার মতো শুধুমাত্র ইলেকট্রনগুলোর তীব্র বিকর্ষণ এর সংকোচনকে বন্ধ করতে পারবে না। সেই প্রচণ্ড মহাকর্ষের চাপে সংকুচিত হতে হতে পরমাণুগুলোর ইলেকট্রনগুলো কেন্দ্রে থাকা প্রোটনের সাথে মিশে নিউট্রন হয়ে যেতে থাকবে। যেহেতু সব পরমাণুতে প্রোটন আর ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান সমান তাই ইলেকট্রনগুলো প্রোটনের সাথে মিশে যেতে যেতে একসময় নক্ষত্রটাতে থাকবে শুধুই নিউট্রন। এসময় নিউট্রিনো নামে একটা কণিকাও তৈরি হয়। এই নিউট্রিনোর গতিবেগ খুব বেশি তাই তারা দ্রুত নক্ষত্র ছেড়ে বেড়িয়ে আসে।

এই অবস্থায় আবার এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল কাজ করা শুরু করবে (আগেরবার এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল কাজ করেছিল ইলেকট্রনের মধ্যে। এবার এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল কাজ করবে নিউট্রনের মাঝে) এবং নিউট্রনের মাঝে প্রচণ্ড বিকর্ষণের ফলে মৃত নক্ষত্রটার সংকোচন বন্ধ হয়ে স্থিতিশীলতা চলে আসবে। এ ধরনের নক্ষত্রকে বিজ্ঞানীরা বলেন Neutron star। ঠিক যত সহজে Neutron star এর কথা বলে ফেলা হলো Neutron star ঠিক ততটাই বিস্ময়কর বস্তু। সূর্যের প্রায় দ্বিগুণ ভর নিয়েও এক একটা Neutron star এর ব্যাসার্ধ হয় মাত্র ১১-১৫ কিলোমিটার (প্রায় ৭-৮ মাইলের মতো)।

এত বিশাল পরিমাণ ভরকে এতো ছোট জায়গায় আঁটিয়ে ফেলতে গিয়ে এর ঘনত্ব হয় ভয়াবহ। যদি কোনো একটা Neutron star থেকে কোনোভাবে এক চা-চামচ পরিমাণ পদার্থ পৃথিবীতে নিয়ে আসা যেত তাহলে তার ভর হতো কয়েক বিলিয়ন টন। তবে তার চেয়েও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এর স্পিন বা ঘূর্ণন। প্রচণ্ড ভর নিয়ে এক একটা Neutron star সেকেন্ডে প্রায় ৭০০ বারের মতো করে ঘুরতে থাকে (মিনিটে ৪৩,০০০ বার)।

নিউট্রন তারকার মধ্যে শতকরা ১০০ ভাগ নিউট্রন থাকার কথা হলেও আসলে এর মধ্যে কিছু প্রোটন আর কিছু ইলেকট্রন থেকে যায়। এই চার্জযুক্ত কণিকাগুলোকে নিয়ে এত অকল্পনীয় বেগে ঘোরার কারণে এর চারিদিকে এত শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি হয় যে মহাবিশ্বে Neutron star এর মতো শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র আর কিছুতে নেই।

তাপমাত্রার জন্য Neutron star থেকে সারাক্ষণই দৃশ্যমান আলো, গামা রশ্মি সহ অন্যান্য শক্তিশালী বিকিরণ বের হতে থাকে। এই বিকিরণের কায়দাও সাধারণ নক্ষত্রদের মতো না, এর দুই মেরু থেকে অনেকটা জেটের মতো করে এসকল শক্তিশালী রশ্মি নির্গত হতে থাকে। সেইসাথে বেশিরভাগ নিউট্রন তারকাই তার অক্ষের সাথে কিছুটা কোনাকুনিভাবে প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকে। অনেকটা পৃথিবীর মতো। পৃথিবীও তার অক্ষের সাথে প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি কোণ করে ঘোরে যার জন্য আমরা ঋতুবৈচিত্র্য দেখতে পাই।

পৃথিবী থেকে অনেক অনেক অনেক দূরের কোনো নিউট্রন তারকা থেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী বিকিরণ হয়তো পৃথিবীকে আঘাত করে কিন্তু নিজের অক্ষের সাথে কিছুটা হেলে ঘুরার কারণে এই বিকিরণকে সারাক্ষণ পাওয়া যায় না। একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর এই বিকিরণ পৃথিবীকে আঘাত করতে থাকে। নির্দিষ্ট সময় পর পর এসকল নিউট্রন তারকা থেকে pulse পাওয়া যায় বলে এদেরকে বলে pulsar। এই সময়ের পার্থক্যটুক সবসময় একই থাকে এবং এটা এতটাই নির্ভুল যে প্রথম যখন বিজ্ঞানীরা একটা নিউট্রিন তারকা থেকে আসা বিকিরণ সিগনাল ধরতে পেরেছিলেন তারা বিশ্বাসই করতে পারেননি যে এটা কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা হতে পারে। তারা ভেবেছিলেন হয়তোবা কোনো মহাজাগতিক প্রাণী পৃথিবীর মানুষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছে!

কিন্তু নক্ষত্রের ভর যে সবসময় সূর্যের ভরের দ্বিগুণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে তেমন কোনো কথা নেই। সত্যি কথা বলতে আমাদের সূর্য খুব ছোট একটা বামন প্রজাতির নক্ষত্র এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে ভারী নক্ষত্রটা সূর্যের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ ভারী! এত ভারী নক্ষত্রের মৃত্যু, অল্প ভরের নক্ষত্রের মতো সরল সোজা হয় না। সেই মৃত্যু প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিস্ময়কর।

সূর্যের দ্বিগুণের বেশি ভরসম্পন্ন নক্ষত্রগুলো যখন তাদের সব হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে পরিণত করে করে শেষ করে ফেলে তখন তাদেরও মহাকর্ষীয় সংকোচনকে আর ধরে রাখার মতো শক্তি থাকে না। ভর বেশি হওয়াতে তাদের সেই মহাকর্ষীয় আকর্ষণটাও হয় অনেক বেশি। সেই প্রচণ্ড আকর্ষণে সংকুচিত হতে হতে নক্ষত্রটার তাপমাত্রা এত বেড়ে যায় যে এর ভেতরে আরেকবার নিউক্লিয়ার ফিউশান বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এবারে হিলিয়াম থেকে কার্বন, কার্বন থেকে লোহা পর্যন্ত ভারী মৌলগুলো তৈরি হয় এবং বাড়তি ভরটুক শক্তি হিসেবে বেরিয়ে আসে।

নক্ষত্র যদি সূর্যের ৬ গুণের চেয়ে বেশি ভারী হয় তবে তার কেন্দ্রের প্রচণ্ড ভর বাইরের স্তরের সাথে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে না। যার কারণে প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে এর বাইরের স্তরটা

মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের এই স্তরের সাথে সাথে নক্ষত্রে তৈরি হওয়া ভারী মৌলগুলোও মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের রক্তে যে আয়রন, হাড়ের ক্যালসিয়াম এসব ভারী মৌলগুলো একসময় কোনো না কোনো নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হয়েছিল। তাই বলা যায় আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো নক্ষত্রের অংশ! এই বিস্ফোরণটাকে বিজ্ঞানীরা বলেন সুপারনোভা।

চিত্রঃ সুপারনোভার পর এক্স-রে, অবলাল আর দৃশ্যমান আলোতে কেপলারের অবশেষ।

সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের ভারী কেন্দ্রটি এর ভরের জন্য ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। যতই সংকুচিত হয় ততই এর ভর অল্প জায়গার মধ্যে এঁটে যেতে থাকে। যার কারণে এর মহাকর্ষ বল আরও শক্তিশালী হতে থাকে। আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি থেকে আমরা জানি কোনো বস্তুর ভর খুব বেশি হলে তা স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে, যার কারণে তার পাশ দিয়ে আলো আসার সময় বেঁকে যায়। এ কারণে দেখা যায় সূর্যগ্রহণের সময় দূরের নক্ষত্র থেকে আসা আলো সূর্যের মহাকর্ষের কারণে বেঁকে যায়।

নক্ষত্রের কেন্দ্রটা যতই সংকুচিত হতে থাকে ততই এর মহাকর্ষ শক্তিশালী হতে থাকে, এই শক্তিশালী মহাকর্ষের জন্য কেন্দ্রটা আরও বেশি সংকুচিত হতে থাকে। এবারে আর ইলেকট্রন বা নিউট্রনের এক্সক্লুসান প্রিন্সিপাল এই ভয়াবহ সংকোচনকে আটকাতে পারে না। এভাবে সংকুচিত হতে হতে একসময় কেন্দ্রটার মহাকর্ষ এতই বেড়ে যায় এবং তা স্থান-কালকে এতো বেশি বাঁকিয়ে ফেলে যে এর থেকে আর আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। বাইরে থেকে দেখলে দেখা যাবে নক্ষত্রের কেন্দ্রটি থেকে নির্গত আলোর পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসছে। কেন্দ্রটা যখন সংকুচিত হয়ে একটা নির্দিষ্ট আকারের চেয়ে ছোট হয়ে যাবে তখন আর কোনো আলোই বের হতে পারবে না। এরকম একটা অবস্থায় যখন পৌঁছে তখন তাকে বলে ব্ল্যাকহোল (কৃষ্ণবিবর)।

কৃষ্ণবিবর সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয়। তবে আশ্চর্যজনক হলেও একে বুঝতে হলে শুধুমাত্র ভর, চার্জ এবং কৌণিক ভরবেগ এই তিনটা রাশি জানাই যথেষ্ট! সব ব্ল্যাকহোলের চার্জ এবং কৌণিক ভরবেগ থাকতে হবে তা নয় কিন্তু সকল ব্ল্যাকহোলেরই ভর আছে। বেশি ভরের কারণেই আসলে ব্ল্যাকহোলটা সৃষ্টি হয়েছিল। তাই একটা ব্ল্যাকহোলকে বুঝতে হলে আসলে শুধু তার ভরটা জানলেই চলে!

চিত্রঃ একটা গ্যালাক্সি আর আমাদের দৃষ্টিসীমার মাঝে যদি একটা ব্ল্যাকহোল চলে আসে তবে আলো বাঁকিয়ে অনেকটা এমন দেখাবে।

ব্ল্যাকহোলের চারিদিকে যে ব্যাসার্ধের ভেতর থেকে এমনকি আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না তাকে বলে ঘটনা দিগন্ত। একটা ব্ল্যাকহোল যদি সূর্যের তুলনায় দশগুণ ভারী হয় তবে তার ঘটনা দিগন্তের পরিধি হবে মাত্র ১৮৫ কিলোমিটার। সেটা কত কম তা বোঝার জন্য বলা যায় যদি এর সম্পূর্ণ ভরটুকু ঘটনা দিগন্তের

ভেতরে সুষমভাবে ছড়ানো থাকতো তবে এর প্রতি সিসি (কিউবিক সেন্টিমিটার) আয়তনের ভর হতো ২০০ মিলিয়ন টন!

তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপারটা হলো ব্ল্যাকহোলের এই বিশাল পরিমাণ ভরটা কিন্তু ঘটনা দিগন্তের ভেতরে সুষমভাবে ছড়ানো থাকে না। যদি ব্ল্যাকহোলটা ঘূর্ণায়মান না হয় তবে ভরটা একটা অত্যন্ত ছোট বিন্দুর মধ্যে সংকুচিত হয়ে থাকে যার আকার  সেন্টিমিটারের মতো। সংখ্যাটা কতটা ছোট তা বোঝার জন্য বলা যায় পরমাণুর আকার  সেন্টিমিটার প্রায়, যা  থেকে একশো বিলিয়ন বিলিয়ন গুণ বড়। দশটা সূর্যের সমান ভর কী করে এত ছোট জায়গায় সংকুচিত হয়ে থাকে তার চেয়ে বড় বিস্ময় কি আর দুটো আছে? এই অত্যন্ত ছোট বিন্দুটার নাম সিঙ্গুলারিটি। অবশ্য ব্ল্যাকহোল ঘূর্ণায়মানও হতে পারে। সেক্ষেত্রে সিঙ্গুলারিটি বিন্দুর মতো না হয়ে রিংয়ের মতো হবে কিন্তু আকারের ক্ষেত্রে সেই একই ব্যাপার!

চিত্রঃ ঘূর্ণায়মান নয় এমন ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি।
চিত্রঃ ঘূর্ণায়মান ব্ল্যাকহোলের রিঙের মতো সিঙ্গুলারিটি।

যেহেতু ব্ল্যাকহোল থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না সেহেতু ব্ল্যাকহোলকে সরাসরি দেখার কোনো উপায় নেই। কিন্তু কোথাও যদি একটা ব্ল্যাকহোল থাকে তবে তার প্রচণ্ড আকর্ষণে চারদিকের ধূলিকণা, গ্যাসের অণু-পরমাণু সব তার দিকে আকৃষ্ট হতে থাকবে। এসব ধূলিকণা, অণু-পরমাণু যতই ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি যেতে থাকে ততই তাদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। যার কারণে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। তাপমাত্রা বাড়লে তার থেকে শক্তিটা আলো হিসেবে বের হয়ে আসে। বাল্বের ফিলামেন্ট, গরম লোহা ইত্যাদি তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।

এই তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে যখন কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে যাবে তখন এখান থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী আলোক রশ্মি (এক্স-রে) বের হতে থাকবে যা খালি চোখে দেখা যায় না। ব্ল্যাকহোলের কাছ থেকে বেরিয়ে আসা এক্স-রে দেখে বিজ্ঞানীরা প্রথম পৃথিবী থেকে প্রায় ছয় হাজার আলোকবর্ষ দূরে সিগনাস এক্স ওয়ান (Cygnus X-I) নামে একটি ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করেছিলেন।

চিত্রঃ Cygnus X-I ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়ে আসা এক্স-রে।

এছাড়াও কিছু কিছু ব্ল্যাকহোল প্রচণ্ড শক্তিশালী এক্স রশ্মি জেটের মতো করে মহাকাশে নিক্ষেপ করে। M 87 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে এমন একটা ব্ল্যাকহোল রয়েছে যেটা মহাকাশে প্লাজমা জেট নিক্ষেপ করে। এই জেটটা দৈর্ঘে প্রায় ৫০০ আলোকবর্ষ বিস্তৃত!

দুটি নক্ষত্র যদি একে অপরকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তবে পুরো সিস্টেমটাকে বলা হয় বাইনারি সিস্টেম। কোনো একটা বাইনারি সিস্টেমের একটা নক্ষত্র যদি মৃত্যুর পর ব্ল্যাকহোল হয়ে যায় তবে বাকি নক্ষত্রটার সেই ব্ল্যাকহোলটার প্রবল আকর্ষণ থেকে রক্ষা নেই। ব্ল্যাকহোলটা তখন সেই দুর্ভাগা নক্ষত্রটা থেকে সকল পদার্থ টেনে নিতে থাকে। এই অবস্থায় একটা ব্ল্যাকহোলকে শনাক্ত করা বেশ সহজ।

বিজ্ঞানীদের ধারণা বড় বড় গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্রে অকল্পনীয় ভরসম্পন্ন ব্ল্যাকহোল রয়েছে। সূর্যের ভরের বিলিয়ন গুণ ভরসম্পন্ন এসব ব্ল্যাকহোল সম্পূর্ণ গ্যালাক্সিকে ধরে রাখে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যে ব্ল্যাকহোলটা রয়েছে যার ভর সূর্যের ভরের ৪ মিলিয়ন গুণ!

চিত্রঃ বাইনারি সিস্টেমের অপর নক্ষত্রটাকে ব্ল্যাকহোল গ্রাস করে ফেলছে।

সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো ব্ল্যাকহোলের আশ্চর্যজনক সব কাণ্ডকারখানা আমরা শুধুমাত্র বাইরে থেকেই দেখতে পারি কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ভেতরে সিঙ্গুলারিটিতে কী হয় তা আমরা কখনো জানতে পারবো না। আপেক্ষিকতার বিশেষ থেকে আমরা জানি কোনোকিছুই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না। যেহেতু আলোও ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্ত থেকে বাইরে বেরোতে পারে না, সেহেতু কেউ যে একটা মহাকাশ যান নিয়ে ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের ভেতরে ঢুকে সিঙ্গুলারিটিতে কি হচ্ছে দেখে আসবে তার কোনো উপায় নেই। ঘটনা দিগন্ত পার হয়ে ভেতরে ঢোকা মাত্র চিরদিনের জন্য বাইরের মহাবিশ্বের সাথে সকল যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাবে।

আমরা মাঝে মাঝেই বিজ্ঞান কল্পকাহিনী পড়ে পুলকিত হই। সত্যিকারের প্রকৃতি যে কল্পকাহিনির চেয়েও একশগুণ বেশি পুলক নিয়ে অপেক্ষা করছে তা কি আমরা মনে রাখি? [নক্ষত্রদের আরো কিছু জীবন বৈচিত্র্য নিয়ে আরেকদিন কথা হবে]

তথ্যসূত্র

  1. http://www.skyandtelescope.com/astronomy-resources/how-many-stars-are-there/
  2. http://www.esa.int/Our_Activities/Space_Science/Herschel/How_many_stars_are_there_in_the_Universe
  3. https://www.youtube.com/watch?v=EuC-yVzHhMI
  4. http://www.nasa.gov/audience/forstudents/5-8/features/nasa-knows/what-is-a-supernova.html
  5. http://hubblesite.org/gallery/album/star/supernova/titles/true/
  6. http://space-facts.com/m87-galaxy/
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/R136a1
  8. http://www.nasa.gov/feature/goddard/2016/nasa-s-hubble-finds-universe-is-expanding-faster-than-expected/
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_most_massive_stars

অজানা অদৃশ্য মহাবিশ্ব

আমাদের সূর্য আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘূর্ণায়মান বাহুর একপাশে অবস্থান করছে। রাতের আকাশের দিকে খালি চোখে তাকালে আমরা যে এক হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই তার বেশিরভাগই আকাশগঙ্গায় অবস্থিত। খালি চোখে না তাকিয়ে একটি সাধারণ মানের দূরবীন ব্যবহার করলে চোখের সামনে নক্ষত্রের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। যাকে এখন সাধারণ মানের দূরবীন বলা হচ্ছে একটা সময় কিন্তু বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপও এর সাথে পাল্লা দিতে পারতো না। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ধারণা ছিল আকাশগঙ্গা ছায়াপথই আমাদের সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। ১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশগঙ্গার চেয়ে বেশি কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের টেলিস্কোপের ক্ষমতাও বাড়তে লাগল। নতুন নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ আকাশের দিকে তাক করে বিজ্ঞানীরা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন।

১৯২০ সালের দিকে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল আবিষ্কার করলেন এই মহাবিশ্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেয়েও অনেক বেশি বড়। আগে যেসব ঝাপসা আলোর বিন্দুকে অনেক দূরবর্তী নক্ষত্র ভাবা হতো, তাদের অনেকগুলোই আসলে আকাশগঙ্গার মতোই আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি! জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতিদিন নতুন নতুন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। সেই সময় Fritz Zwicky ছিলেন ক্যালটেকের প্রফেসর। তিনি Coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আশেপাশের অন্যান্য গ্যালাক্সিগুলোর সাপেক্ষে কোনো একটি গ্যালাক্সির গতিবেগ পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে কতটুকু ভর আছে সেটি বের করা সম্ভব।

প্রফেসর Fritz Zwicky, coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলোর গতিবেগ মেপে নিয়ে তার মধ্যে ঠিক কতটুকু ভর থাকতে পারে তা হিসেব করে বের করে নিলেন। কিন্তু এই ভরকে দৃশ্যমান ভরের সাথে তুলনা করতে গিয়ে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারলেন না। দৃশ্যমান ভর বলতে বোঝানো হয় গ্যালাক্সির যেসব নক্ষত্র আলো বিকিরণ করে কিংবা যেসব ধূলিকণা, গ্যাসের মেঘ নক্ষত্রের আলোকে আটকে দেয়। মোটকথা গ্যলাক্সির দিকে তাকিয়ে আমরা যেটুকু দেখতে পাই তার মোট ভর। Fritz Zwicky-এর হিসেব অনুযায়ী ক্লাস্টারের মধ্যে গ্যালাক্সিগুলোর যে গতিবেগ ততটুকু গতিবেগ অর্জন করতে হলে গ্যালাক্সিগুলোতে তাদের দৃশ্যমান ভরের প্রায় ১৬০ গুণ বেশি ভর থাকা উচিৎ ছিল।

তার মানে অদৃশ্য কোনো ভর গ্যালাক্সিগুলোর এই গতিবেগের জন্য দায়ী। সেই অদৃশ্য ভরকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল না। তিনি অনেকভাবে হিসেব করে দেখলেন, একটি বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য ভর না থাকলে Coma cluster-এর ভারসাম্য বজায় থাকত না। তিনি এই অদৃশ্য ভরের নাম দিলেন ‘হারানো ভর’ বা Missing matter।

ধরা-ছোঁয়া যায় এমন প্রায় সবকিছুর ভরই দাঁড়িপাল্লার নীতি ব্যবহার করে মেপে বের করে ফেলা যায়। কিন্তু পৃথিবী থেকে অকল্পনীয় দূরত্বে অবস্থিত এসব নক্ষত্র কিংবা গ্যালাক্সির ভর বিজ্ঞানীরা ঠিক কীভাবে মাপেন? পৃথিবীর ভর প্রায়  কেজি, সূর্যের ভর প্রায়  কেজি, বৃহস্পতির ভর প্রায়  কেজি, মিল্কিওয়ের ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ।

কিন্তু এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কাছে গিয়ে গ্যালাক্সিটাকে একটা দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে ভর মেপে নেয়ার কোনো উপায় নেই। তাই বিজ্ঞানীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরের অনেক দূরবর্তী পদার্থের ভর মাপেন একটু বাঁকা পথে। পথটা বাঁকা হলেও পদ্ধতিটি খুব সহজ। আমরা জানি একটি বস্তুর ভর যত বেশি হবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ হবে তত বেশি। আর বস্তুটি থেকে দূরত্ব যত বাড়তে থাকবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণও ততই কমে যাবে (বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ এবং ঠিক এ কারণেই সূর্যের চারিদিকে নিজের কক্ষপথে ভারসাম্য বজায় রাখতে বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি। নেপচুনের গতিবেগ সেই তুলনায় অনেক অনেক কম)। তাই আশেপাশের গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘ ইত্যাদির গতিবেগ এবং দূরত্ব থেকে খুব সহজেই ভরটুক বের করে ফেলা যায়।

2চিত্রঃ বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ। তাই বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি।

একটি ভরকে ঘিরে ঘুরপাক খাওয়া পদার্থের আরেকটি উদাহরণ হলো সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। যেসব গ্যলাক্সির একটি অত্যন্ত ভারী কেন্দ্র থাকে এবং গ্যালাক্সির সকল নক্ষত্র সেই ভারী কেন্দ্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তদেরকে বলা হয় সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। তাই ঠিক একইরকম হওয়ার কথা সর্পিলাকার গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলোর ঘূর্ণন বেগ কেন্দ্রের দিকে নক্ষত্রগুলোর চেয়ে অনেক কম হবে। বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন কিন্তু সেরকমটি দেখলেন না।

3চিত্রঃ সর্পিলাকার গ্যালাক্সি।

মিল্কিওয়ের মতো সর্পিল গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন পর্যবেক্ষণ করতে করতে তিনি দেখলেন গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলে যেমন নক্ষত্র, গ্যাস আর ধুলিকণার মেঘের গতিবেগ কমে যাওয়ার কথা ছিল, তেমনটি হচ্ছে না। বরং গতিবেগ প্রায় সমান সমান।

ভেরা রুবিনের হিসেব অনুযায়ী গ্যালাক্সিগুলোতে দৃশ্যমান যতটুক ভর আছে এবং সেই ভরের জন্য গ্যালাক্সির মধ্যে নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘের যতটুক গতিবেগ নিয়ে ঘোরার কথা ছিল তার তুলনায় এ গতিবেগ প্রায় দশগুণ বেশি। তারমানে নিশ্চয়ই গ্যলাক্সির মধ্যে এমন কোনো পদার্থ আছে যা গ্যালাক্সির এই গতির জন্য দায়ী এবং কোনো এক কারণে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না। রুবিন হিসেব করে বের করলেন, এমনটা হবে যদি গ্যালাক্সির মধ্যে অদৃশ্য ভরের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের দশগুণ হয়।

অদৃশ্য পদার্থকে এখন বলা হয় ‘Dark matter’। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা শত শত গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছেন। সব ক্ষেত্রেই সেই একই ব্যাপার। কিন্তু বহুবার বহুভাবে চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পেলেন না। যে বস্তুকে চোখেই দেখা যায় না তাকে খুঁজে পাবেন কীভাবে?

ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় আর আশ্চর্যজনক বস্তুগুলোর মধ্যে একটি। ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত কোনো পদার্থের সাথে কোনোরকম মিথস্ক্রিয়া করে না। তবে আর কিছুই না হোক ডার্ক ম্যাটারের ভর আছে (এই ভর যেকোনো হিসেবে বিশাল, বিজ্ঞানীরা এখন জানেন আমাদের মহাবিশ্বের ২৩ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার)। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব থেকে আমরা দেখেছি, যেকোনো ভর তার আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলে। তাই মহাকাশে কোথাও ডার্ক ম্যাটার থাকলে তা নিজের ভরের জন্য আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলবে।

কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র আর আমাদের দৃষ্টির মাঝে যদি ডার্ক ম্যাটার চলে আসে তবে সেই গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র থেকে আসা আলো বেঁকে যাবে। আমরা বুঝে ফেলব মাঝে প্রচণ্ড ভারী কিছু একটা আছে। শুধু সেই ভরকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না! ভারী বস্তুর আলোকে বাঁকিয়ে দেয়ার ধর্মকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন Gravitational Lensing।

গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং শুনতে যতটা খটমটে, বাস্তবে ঠিক ততটাই কাজের জিনিস। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বুঝতে পারেন তাই নয়, কোনো জায়গায় ঠিক কতটুকু ডার্ক ম্যাটার আছে, কীভাবে বিন্যস্ত আছে সব বের করতে পারেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখেছেন একেকটি গ্যালাক্সির মোট ভরের বেশিরভাগই আসলে ডার্ক ম্যাটারের ভর। গ্যালাক্সিগুলোতে নক্ষত্র, ধূলিকণা এবং গ্যাসের মেঘ ছাড়া যেসব ফাঁকা স্থান আছে সেগুলো আসলে ঠিক ফাঁকা নয়, সেখানে আছে ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানীরা রীতিমতো ডার্ক ম্যাটারের ম্যাপও তৈরি করে ফেলেছেন।

4চিত্রঃ ডার্ক ম্যাটারের ভরের জন্য গালাক্সি থেকে আসা আলো বেঁকে যাচ্ছে।

ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পাওয়ার পর পরই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন, এটি তৈরি হয়েছে কী দিয়ে? আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু নাকি অজানা কোনো কণা দিয়ে?

সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে, ডার্ক ম্যাটার আসলে আমাদের চেনা জানা অণু-পরমাণু দিয়েই তৈরি। শুধু তারা আলো বিকিরণ করে না বলে আমরা দেখতে পাই না। অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি কিন্তু আলো বিকিরণ করে না এমন অনেক পদার্থের কথাই আমরা জানি। সবার প্রথমে আসে ব্ল্যাকহোল। ব্ল্যাকহোল আলো বিকিরণ করে না, প্রচণ্ড মহাকর্ষ বলে সবকিছু নিজের দিকে টানতে থাকে। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং ব্যবহার করে তাদের খুঁজে বের করতে হয়।

তারপরেই আসে M.A.C.H.O. বা Massive Compact Halo Object। এরা আসলে ছোট ছোট ভারী নক্ষত্র যারা খুব অল্প আলো বিকিরণ করে। এদেরকেও গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়। তাছাড়া আছে Brown dwarf. এরা যথেষ্ট ভারী কিন্তু খুব বেশি আলো বিকিরণ করে না। কিন্তু গ্যালাক্সি আর ক্লাস্টারগুলোতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ এতো বেশি যে এসব কিছুও যথেষ্ট না। এক একটি গ্যালাক্সিতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের প্রায় দশ গুণ। শুরুর দিকে নিউট্রিনো বা এক্সিওন এর কথাও চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু এরা খুবই হালকা ভরের কণিকা। এরপর আর একটি সম্ভাবনাই বাকি থাকে। হয়তো ডার্ক ম্যাটার নতুন ধরনের কোনো কণিকা দ্বারা তৈরি যাদের আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।

আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি না হলেও ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্য কীরকম হতে পারে তা বিজ্ঞানীরা বের করেছেন। এরা আলোর মতো দ্রুত গতির নয়। এরা আমাদের পরিচিত সাধারণ সকল পদার্থকে মহাকর্ষ বলে আকর্ষণ করে এবং মহাকর্ষ ছাড়া অন্য কোনোভাবে পদার্থের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না। আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ডার্ক ম্যাটারের কণিকা এপাশ থেকে ওপাশে চলে যাচ্ছে, আমরা টের পাচ্ছি না। কারণ তারা কোনোভাবেই অণু-পরমাণুকে প্রভাবিত করে না। বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাব্য কণিকার নাম দিয়েছেন WIMP (Weakly Interacting Massive Particle)। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে তারা খুবই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। তাই এখন পর্যন্ত WIMP আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

তাই বলে বিজ্ঞানীরা বসে থাকেননি। আমেরিকার Soudan-এ মাটির নিচে একটি পরিত্যাক্ত লোহার খনিতে প্রায় অর্ধমাইল নীচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। এই ল্যাবে শূন্য কেলভিনেরও কম তাপমাত্রায় ১৬টি জার্মেনিয়াম সেন্সর বসানো আছে। সেন্সরগুলোতে জার্মেনিয়ামের ঘনত্ব খুব বেশি, পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি, প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। সেন্সরটিকে যখন শূন্য কেলভিনের নিচে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এটি অনেকটা থার্মোমিটারের মতো কাজ করে। কোনো কণা বা রশ্মি এই সেন্সরের মধ্য দিয়ে চলে গেলেই বিজ্ঞানীরা কণা বা রশ্মির বৈশিষ্ট্য হিসেব করে বের করে ফেলতে পারেন।

এই সেন্সর থেকে খুব সূক্ষ্ম মান পাওয়া যায়। কিন্তু পৃথিবীপৃষ্ঠে এটি নিয়ে কাজ করার খুব বড় রকমের একটি সমস্যা আছে। অনেকে নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত নিউট্রিনো এসে পৃথিবীকে আঘাত করছে। সেই সাথে আছে মিউওন, বিভিন্ন মহাজাগতিক রশ্মি, পৃথিবীপৃষ্ঠে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন রশ্মি। সেন্সরগুলো এতটাই সংবেদনশীল যে যেকোনো ধরনের কণার আঘাতেই বিক্ষেপ দেখাবে। এতসব সমস্যাকে পাশ কাটাতে বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। মাটির বিভিন্ন স্তর ভেদ করে সব ধরনের কণা এবং রশ্মি সেন্সর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা জার্মেনিয়াম সেন্সরে কোনো একদিন একটি WIMP কণিকা আঘাত করবে। যদিও WIMP কণিকা অণু-পরমাণুর সাথে এতই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করার কথা যে, জার্মেনিয়াম সেন্সর দিয়ে WIMP কণিকা ধরা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা এখনো WIMP কণিকা ধরতে পারেননি, এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

5চিত্রঃ ভূমির গভীরে এই স্থানে অবস্থিত গবেষণাগার। পূর্বে এটি স্বর্ণ উত্তোলন খনি ছিল।

শুনতে অবাক লাগবে, মহাবিশ্বের প্রায় ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার হলেও টেলিস্কোপ দিয়ে দৃশ্যমান আলো ব্যবহার করে আমরা যতটুকু বস্তু দেখতে পাই সেটি মহাবিশ্বের ৪ শতাংশ মাত্র। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো সুষমভাবে না থেকে ছাড়াছাড়াভাবে ছড়িয়ে থাকার কারণও ডার্ক ম্যাটার। কঙ্কাল যেমন দেহের আকারের পেছনে কাজ করে ডার্ক ম্যাটারের ক্ষেত্রেও সেই একই ব্যাপার। এখানে ২৩ + ৪ = ২৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে মাত্র। সেটি নিশ্চয়ই অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল সেটা অজানা এক ধরনের Energy। বিজ্ঞানীরা বলেন ‘Dark Energy’।

একসময় ভাবা হতো আমাদের মহাবিশ্ব স্থির। সর্বপ্রথম ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখলেন মহাবিশ্ব মোটেও স্থির নয়। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আলোর শিফট দেখে বলে দেয়া যায় তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে নাকি দূরে সরে যাচ্ছে। রেড শিফট অর্থাৎ আলো লালের দিকে সরে গেলে বুঝতে হবে দূরে সরে যাচ্ছে, আর ব্লু শিফট হলে বা নীলের দিকে হলে বুঝতে হবে এগিয়ে আসছে। এডউইন হাবল আকাশের সবদিকের গ্যালাক্সি থেকেই রেড শিফট পেলেন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে পৃথিবী বুঝি মহাবিশ্বের কেন্দ্র আর বাকি সব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখা গেলো পৃথিবী থেকে একটি গ্যালাক্সি যত দূরে তার দূরে ছুটে যাওয়ার হারও ততই বেশি। যার একটিই অর্থ হতে পারে- পৃথিবী মোটেই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবীসহ মহাবিশ্বের সবকিছু একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সোজা বাংলায়, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা আবিষ্কৃত হবার পর সবার আগে যেটা মাথায় আসে, একটা সময় মহাবিশ্বের সবকিছু নিশ্চয়ই এক জায়গায় একত্রিত ছিল। তারপর একদিন হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো কারণে সব আলাদা হয়ে বাইরের দিকে ছুটে যেতে শুরু করলো। বিজ্ঞানীরা এ বিস্ফোরণকে বলেন বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাং-এর আগে মহাবিশ্বের সবকিছু একবিন্দুতে একত্রিত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল বিগ ব্যাং-এর প্রবল ধাক্কার ফলাফল হিসেবে মহাবিশ্ব এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিস্ফোরণের পরপরই মহাকর্ষ বল সম্প্রসারণের বেগটাকে কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই একসময় সম্প্রসারণের বেগ কমতে কমতে মহাবিশ্ব স্থির হয়ে যাবে। তারপর মহাকর্ষের প্রভাবে আবার সংকোচন শুরু হবে। এর মাঝে বলে নেই, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুধুমাত্র স্থানের মধ্যে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার মতো ঘটনা না। সেরকম কিছু হলে পৃথিবী ধীরে ধীরে সূর্য থেকে দূরে সরে যেতো। স্থান শাশ্বত কিছু নয়। বিগ ব্যাং এর ফলে পদার্থের সাথে সাথে স্থানও সৃষ্টি হয়েছিল এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বলতে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির মধ্যবর্তী স্থানের সম্প্রসারণ বোঝানো হয়েছে।

কেউ যদি প্রশ্ন করে আমাদের মহাবিশ্বের পরিণতি কী? একটি সম্ভাব্য উত্তর হবার কথা ছিল- এখন মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাকর্ষের কারণে ধীরে ধীরে এ সম্প্রসারণের বেগ কমে আসার কথা এবং শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে আবার একটি বিন্দুতে চলে আসার কথা। বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। তাই বছর কয়েক আগে কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী ভাবলেন সম্প্রসারণ কমে আসার হারটা বের করা যাক। সেটা বের করতে হলে প্রথমেই জানা দরকার বিগ ব্যাং-এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতিবেগ কেমন ছিল।

বর্তমান সময়ে বসে কীভাবে অতীতের সম্প্রসারণ বেগ বের করা যায়? তার জন্য খুব সহজ উপায় আছে। ধরা যাক, এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে দশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্যালাক্সি থেকে আলো আসছে। তার মানে হচ্ছে, গ্যলাক্সিটা থেকে দশ হাজার বছর আগে যে আলোটুকু পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছিল সেই আলোটুকু পৃথিবী আর গ্যালাক্সিটার মধ্যবর্তী দূরত্ব অতিক্রম করে এই মাত্র আমাদের কাছে এসে পৌঁছলো। আমরা যদি এই আলোর রেড শিফট মাপি তাহলে পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়ার যে বেগ পাবো সেটা হচ্ছে দশ হাজার বছর আগের সম্প্রসারণের গতিবেগ। বর্তমানে সেই গতিবেগ হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু এখনই সেটি জানার কোনো উপায় নেই। সেটি জানতে হলে আরো দশ হাজার বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

ঠিক একই পদ্ধতিতে আরও কাছের বা দূরের গ্যালাক্সি বা আলোকিত কোনো বস্তুর রেড শিফট মেপে বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণের বেগ বের করা সম্ভব (খুব সূক্ষ্মভাবে রেড শিফট মাপার জন্য দরকার খুব উজ্জ্বল লক্ষ্যবস্তু। বিজ্ঞানীরা তাই মহাকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল টাইপ-১ সুপারনোভা ব্যবহার করেন)। বিজ্ঞানীদের দুটি দল আলাদা আলাদাভাবে প্রায় ৬০ টি সুপারনোভার রেড শিফট মেপে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার মোটেই কমে যাচ্ছে না, বরং তা ত্বরিত হারে বাড়ছে।

বারবার ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণ করেও বিজ্ঞানীরা একই ফল পেলেন। যার অর্থ হচ্ছে মহাবিশ্বে এক ধরনের এনার্জি বিদ্যমান যা বিকর্ষণধর্মী বল সৃষ্টি করে স্থানের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। একেই বিজ্ঞানীরা বলেন Dark Energy। এই ডার্ক এনার্জিই মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জি বিগ ব্যাং-এর সাথে সাথেই সৃষ্টি হয়েছিল। সম্প্রসারণের হার বের করতে গিয়ে দেখা গেল, বিগ ব্যাং-এর পরে প্রথম ৯ বিলিয়ন বছর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছিল। ঠিক তার পরপরই হঠাৎ করে সম্প্রসারণের হার বাড়তে শুরু করেছিল এবং গত পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে এ হার বেড়েই চলেছে।

যার অর্থ হচ্ছে- প্রথমদিকে মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার আর সাধারণ পদার্থের মহাকর্ষের আধিপত্য ছিল। তাই সম্প্রসারণের হার কমে যাচ্ছিল। যতই সময় গেল আর মহাবিশ্ব বড় হতে লাগল, ধীরে ধীরে ডার্ক এনার্জির আধিপত্য শুরু হলো। সম্প্রসারণের বেগ আবার বেড়ে যেতে শুরু করল। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা উচ্চ তাপমাত্রা আর অধিক ঘনত্বে (মহাবিশ্বের শুরুর অবস্থা) ডার্ক এনার্জির ক্রিয়া ধর্তব্যের মাঝে আসবে না। তাপমাত্রা যতই কমে আসবে, ঘনত্ব যতই কমে আসবে, ডার্ক এনার্জি ততই মহাকর্ষ বলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে। পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এ কারণেই আবার সম্প্রসারণের বেগ বাড়তে শুরু করেছিল।

ডার্ক এনার্জিকে বলা যায় স্থানের এক রহস্যময় ধর্ম যা সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীরা এখনো জানে না ডার্ক এনার্জি এভাবেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে নাকি কোনো একসময় দিক পরিবর্তন করে ফেলবে। তাই শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হবে, নাকি এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে তা এ মুহূর্তেই বলা সম্ভব নয়। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মনে করেন মহাবিশ্ব এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে।

সেই উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীব্যাপী পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি Unified তত্ত্ব বের করার চেষ্টা করে আসছেন। একগুচ্ছ সমীকরণ, যার মাধ্যমে পুরো মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাবে। আইনস্টাইন তার জীবনের শেষ ত্রিশ বছর চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। তার পরে এখনো বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। যতই তারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, মহাবিশ্ব যেন ততই নতুন নতুন রহস্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। বাস্তব মহাবিশ্ব যে যেকোন রহস্য উপন্যাসের চেয়ে কোনো অংশেই কম না সেটা আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে বসে থাকি।

তথ্যসূত্র

১) http://pics-about-space.com/planet-mars-black-and-white?p=2#img7875126582525238326

২) en.wikipedia.org/wiki/Andromeda_Galaxy

৩) en.wikipedia.org/wiki/Solar_mass

৪) www.sudan.umn.edu/cdms/

৫) cdms.berkeley.edu/experiment.html