দ্য বাটার্ড ক্যাট প্যারাডক্স

পাঁচিলের উপর থেকে বিড়ালকে কখনো লাফ দিয়ে নীচে নামতে দেখেছেন? অথবা জানালা দিয়ে বিড়ালকে তুলে উলটো করে ফেলে দেখেছেন কখনো? প্রশ্নটা অদ্ভুত। তবে কাজটি যদি করে দেখতেন তাহলে খেয়াল করতেন বিড়ালকে উপর থেকে যেভাবে যে ভঙ্গিতেই ফেলা হোক না কেন ভূমিতে পড়ার সময় পায়ের দিক দিয়েই পড়বে।

পতনের শুরুতে বিড়ালের দেহ উলটো হয়ে পড়লেও পরবর্তীতে যে কারণে আবার সোজা হয় তাকে বলা হয় রাইটিং রিফ্লেক্স (Righting Reflex)। এমনকি মাত্র তিন সপ্তাহ বয়সী বিড়ালের বাচ্চার বেলায়ও এই রিফ্লেক্স কাজ করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বিড়ালের শরীরের এই প্রতিক্রিয়া আরো বিকশিত হয়। এই প্রতিক্রিয়া আবার আরেকটি মজার বিষয়ের সাথে জড়িত। একে বলে The Buttered Cat Paradox।

আপনি যখন রুটি খান, রুটির একপাশে যদি মাখন লাগানো থাকে, আর রুটিটি যদি হাত থেকে পড়ে যায় তাহলে দেখবেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাখন লাগানো অংশটি মাটিতে লেপটে গেছে। এটি আর তুলে খাওয়ার উপায় নেই।

image source: mentalfloss.com

পাউরুটির তো আর বিড়ালের মতো কোনো রাইটিং রিফ্লেক্স নেই। মূলত কোমর সমান উচ্চতার টেবিল থেকে পড়তে দিলে পতনের স্বাভাবিক নিয়মেই মাখনের দিকটি নীচের দিকে মুখ করে পড়ে।

এখন যদি ধরে নেয়া হয় তারা এরকমই আচরণ করে সবসময়, এবং মাখন লাগানো একটি পাউরুটি বিড়ালের পিঠে বেধে দেয়া হয় তাহলে পতনের সময় কী হবে? বিড়াল যদি পা দিয়ে ভূমি স্পর্শ করে তাহলে পাউরুটি অক্ষত থেকে যাচ্ছে, যা সাধারণত হয় না। আবার পাউরুটি যদি নীচের দিকে পড়ে তাহলে বিড়ালের পা উপরের দিকে থাকছে, এটিও সাধারণত হয় না। তাহলে? এখান থেকে জন্ম নেয় প্যারাডক্স।

ফাউক্স প্যারাডক্স অনুযায়ী, বিড়ালের পতন ধীর হয়ে যাবে এবং ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি আসার পর পতন থেমে গিয়ে ভূ-পৃষ্ঠের ঠিক উপরে ঝুলে একবার মাখন লাগানো টোস্টের দিক আরেকবার পায়ের দিক ভূ-পৃষ্ঠের দিকে মুখ করে ঘুরতে থাকবে! ব্যাপারটি বাস্তবিক নয়, তবে প্যারাডক্স হিসেবে চমকপ্রদ।

featured image: behance.net

প্রাণিজগতের কিছু অদ্ভুত হৃৎপিণ্ড

হৃৎপিণ্ড। বুকের বাম পাশের এই ঢিপ ঢিপ করতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটা ঠিক কবে কীভাবে ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে তা বলা কঠিন। সত্যিকার অর্থে হৃৎপিণ্ড ঠিক বামদিকে থাকে না। থাকে আমাদের শরীরের মাঝবরাবর ঘেঁষে বামদিকে। আর হৃদয়ঘটিত কোনো ব্যাপারও হৃৎপিণ্ডে ঘটে না। ভালোবাসার প্রতীক হৃদয় ও সত্যিকারের হৃদয় দেখতেও এক নয়। প্রেম যদি হয়ে থাকে তবে তার উৎপত্তি মস্তিষ্কে যা আমাদের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রস্থল।

অন্যদিকে হৃৎপিণ্ডের কাজ রক্ত সঞ্চালন করা। আমাদের দেহের সবখানে রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করাই এর প্রধান কাজ। হ্যাঁ, ভালোবাসার মানুষটিকে দেখলে আমাদের হার্টবিট বেড়ে যায় বটে। তার পেছনেও কারণ আছে। সংক্ষেপে বললে, এর কারণ এড্রেনালিন ক্ষরণ।

যখন পছন্দের মানুষটিকে আমরা দেখি তখন মস্তিষ্ক সংকেত পাঠায় এড্রেনাল গ্ল্যান্ডে। সেখান থেকে হরমোন নিঃসরণের কারণেই পরবর্তীতে হার্টবিটসহ অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার ঘটে। এ কারণেই ভালোবাসলে অথবা ভালোবেসে কষ্ট পেলে হৃদয়ে তা অনুভব করি বেশি।

তবে আমাদের আজকের আলোচনা এই দিক নিয়ে নয়। এমনকি মানুষের হৃৎপিণ্ড নিয়েও নয়। প্রাণিজগতের কয়েকটি প্রাণীর হৃৎপিণ্ডের কথা আলোচনা থাকবে এখানে। এদের হৃৎপিণ্ড আমাদের চেয়ে আলাদা এবং কিছুটা অদ্ভুত রকমের।

মানুষের স্বাভাবিক হার্টবিট প্রতি মিনিটে ৭২ বার। কিন্তু কাঠবেড়ালির হার্টবিট প্রতি মিনিটে মাত্র ৫ বার। উড়তে থাকা ছোট্ট হামিংবার্ডের হার্টবিট মিনিটে অন্তত ১২৬০ বারের মতো। অবাক করা ব্যাপার। আমাদের হৃৎপিণ্ডের ভর বড়জোর ৩০০৩১০ গ্রাম। অন্যদিকে একটি জিরাফের হৃৎপিণ্ডের ভর প্রায় ১২ কেজি। জিরাফের লম্বা গলায় রক্ত সঞ্চালনের জন্যে বড় আর শক্তিশালী হৃৎপিণ্ডের প্রয়োজন আছে বৈকি। প্রাণিজগতে আরো কিছু ব্যতিক্রমী ।

তিনপ্রকোষ্ঠের হৃৎপিণ্ড

স্তন্যয়ায়ী প্রাণী (যেমন মানুষ) ও পাখিদের হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠ চারটি করে থাকে। কিন্তু ব্যাঙের হৃৎপিণ্ডে থাকে তিন প্রকোষ্ঠ। দুইটি অলিন্দ আর মাত্র একটি নিলয় দিয়ে তাদের হৃৎপিণ্ড গঠিত।

সাধারণত পুরো শরীর থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত হৃৎপিণ্ডে আসে। এরপর সেখান থেকে এ রক্ত ফুসফুসে যায় যেন বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিশতে পারে। তারপর তা আবার হৃৎপিণ্ডে আসলে হৃৎপিণ্ড সেই রক্ত পাম্প করে সমগ্র শরীরে পাঠিয়ে দেয়। মানুষের হৃৎপিণ্ডে এই অক্সিজেনযুক্ত আর অক্সিজেনবিহীন রক্ত আলাদা আলাদা প্রকোষ্ঠে থাকে। কিন্তু ব্যাঙের বেলায় একটা মাত্র নিলয়ে ট্র্যাবেকুলি নামক বিশেষ খাঁজের মাধ্যমে এই দুই ধরনের রক্ত আলাদা থাকে।

তিমির বিশালাকার হৃৎপিণ্ড

চিত্র: তিমির হৃৎপিণ্ড আস্ত মানুষের চেয়েও বড়

প্রায় ছোটখাটো একটা গাড়ির সমান বড় এবং ওজন প্রায় ৪৩০ কেজি। নীল তিমির হৃৎপিণ্ড জীবিত সকল প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের মতো এদের হৃৎপিণ্ডও চারপ্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট। প্রায় দুটি স্কুলবাসের সমান বিশালাকার তিমির দেহে রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই যন্ত্রটিই কাজ করে থাকে।

সেফালোপডদের তিন হৃৎপিণ্ড

অক্টোপাস, সস্কুইড, কাটলফিসসহ কর্ষিকাযুক্ত এই শামুক প্রজাতির হৃৎপিণ্ড অন্তত তিনটি। একদিকে শরীরের দুইপাশে দুটি হৃৎপিণ্ড ফুলকার রক্তবাহিকার মাধ্যমে আসা রক্তকে অক্সিজেনযুক্ত করে। অন্যদিকে শরীরের কেন্দ্রের হৃৎপিণ্ড সে অক্সিজেনযুক্ত রক্তকে পাম্প করে পুরা শরীরে ছড়িয়ে দেয়।

সেফালোপডরা মূলত নীল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী। এদের রক্তে কপারের উপস্থিতি রয়েছে বলে রক্ত নীল দেখায়। মানুষের রক্ত লাল কারণ মানুষের রক্তে রয়েছে রয়েছে হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিনের আছে আয়রন। অক্সিজেনযুক্ত হলে আয়রনের রঙ হয় লাল। কিন্তু সেফালোপডদের বিশেষ উপাদানের কারণে সেখানে অক্সিজেনযুক্ত রক্তের রঙ হয় নীল।

তেলাপোকার হৃৎপিণ্ড

তেলাপোকার রক্তসংবহনতন্ত্র হলো মুক্ত প্রকৃতির। অর্থাৎ এতে কোন ধমনীশিরা নামক আলাদা রক্তসরবরাহকারী নালী থাকে না। তার বদলে ১২ থেকে ১৩ প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট অঙ্গের মাধ্যমে রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।

তেলাপোকার দেহপৃষ্ঠের অবস্থিত সাইনাস এই ১৩ প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট হৃৎপিণ্ডে রক্ত পাঠাতে সহায়তা করে। কিন্তু এই হৃৎপিণ্ডকে তেলাপোকার দেহে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহের কাজ করতে হয় না। কারণ তেলাপোকার দেহে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র আছে। এদের স্পিরাকল বলে। এই এদের মাধ্যমে তেলাপোকার রক্ত বাতাস থেকে অক্সিজেন পেয়ে থাকে। তাই অক্সিজেন পাওয়ার জন্যে রক্তকে দেহের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে হয় না। তবে এদের হৃৎপিণ্ড কী কাজে লাগে? এদের মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান সমগ্র শরীরে প্রবাহিত হয়।

নকল হৃৎপিণ্ড

কেঁচোরা ‘হৃদয় দেয়া নেয়া’ করতে পারে না। কেননা এদের হৃৎপিণ্ডই নেই। এর বদলে এদের ৫টি ছদ্মহৃৎপিণ্ড থাকে। এগুলো খাদ্যনালীকে জড়িয়ে থাকে। এই ছদ্মহৃৎপিণ্ডগুলো রক্ত পাম্প করে না। বরং রক্তবাহিকাকে সংকুচিত করে রক্ত সরবরাহে সাযাহ্য করে। কেঁচোদের ফুসফুসও থাকে না। এরা দেহের সিক্ত আবরণের মাধ্যমে অক্সিজেন শোষণ করে।

মাটির নীচে কিংবা উপরে যখন কেঁচো সিক্ত থাকে তখন দেহাবরণের মাধ্যমে অক্সিজেন শোষণ করে কোষে প্রেরণ করে। এদের রক্তে হিমোগ্লোবিন থাকে যা অক্সিজেন বহন করে। কিন্তু মানুষের মতো রক্তসংবহনতন্ত্র বদ্ধ নয়, মুক্ত প্রকৃতির।

জলজ প্রাণীদের হৃৎপিণ্ড

যদি কোনো কারণে হৃদয় ভেঙে যায় তো জেব্রাফিশ তা আবার নতুন করে বানিয়ে নিতে পারে। হ্যাঁ, ২০০২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিখ্যাত সাময়িকী সায়েন্স জানায়, জেব্রাফিশ তাদের মাত্র দুই মাসের মধ্যে তাদের হৃৎপিণ্ড পুনরায় তৈরি করতে পারে।

মানুষের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিজে নিজেই ক্ষতিপূরণ করে নিতে পারে। উভচর আর টিকটিকি তাদের লেজ পুনরোৎপাদন করতে পারে। কিন্তু হৃৎপিণ্ড? এমনটা সাধারণত দেখা যায় না। জেব্রাফিশের হৃৎপিণ্ড পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতার নমুনা থেকে ভবিষ্যতে হার্ট সম্বন্ধীয় ব্যাপারে আবিষ্কার হতে পারে চমৎকার কিছু।

ছায়াপথে/পৃথিবীতে থাকা স্বর্ণের রহস্যময় উৎস কোথায়?

ইতিহাস আর লোককথা ঘাঁটলে দেখা যায় যে পৃথিবীতে মজুদ থাকা স্বর্ণের উৎস কোথায় এবং কীভাবে আরো বেশি পরিমাণে স্বর্ণ পাওয়া যায় এই চিন্তা বিভিন্ন সময়ে অনেক সুন্দর এবং চমকপ্রদ ব্যাখ্যার উদ্ভব ঘটিয়েছে। ইনকারা বিশ্বাস করতো সূর্য দেবতা ইনতি’র অশ্রু কিংবা ঘামের ফোঁটা আকাশ থেকে স্বর্ণ হিসেবে ঝরে পড়তো।

অ্যারিস্টটল মনে করতেন ভূপৃষ্ঠের গভীরে থাকা পানিতে কোনোভাবে সূর্যের রশ্মি প্রবেশ করলে তা সোনাতে পরিণত হতো। আইজ্যাক নিউটন পরশপাথর দিয়ে সোনা তৈরির রেসিপিই দিয়েছিলেন।আর রূপকথার রাম্পেলস্টিল্টস্কিন তো চরকি দিয়ে খড়কে সোনায় রূপান্তরিত করতে পারতো।

আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিদদের অবশ্য এ নিয়ে নিজেদের একটা ব্যাখ্যা রয়েছে। তা হলো আজ থেকে চার বিলিয়ন বছর আগে যখন পৃথিবী জায়মান ছিল অর্থাৎ উৎপত্তির শুরুর পর্যায়ে ছিল তখন উল্কাপিন্ডের ছিটেফোঁটা এসে ভূপৃষ্ঠে গেঁথে গিয়েছিল।এসব উল্কাপিন্ডে অন্যসব উপাদানের সাথে সোনাও ছিল।কিন্তু আসল প্রশ্নটা এখনো থেকেই যায়ঃ মহাবিশ্বের কোথায় কীভাবে এই স্বর্ণের উৎপত্তি হলো?

কয়েক দশক ধরে ভাবা হতো যে সুপারনোভা বিস্ফোরণের কারণে স্বর্ণসহ পর্যায় সারণির নিচের সারির ডজনখানেক ভারী মৌলের সৃষ্টি হয়েছে।কিন্তু বর্তমানে সুপারনোভার কম্পিউটার মডেল আরো উন্নততর হয়েছে এবং সেগুলো পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে,সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় সোনা তৈরি হওয়া আর আলকেমিস্টদের পরশপাথরের ছোঁয়ায় সোনা বানানোর উপকথার মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই।

বেশ কয়েক বছর হলো একটা বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। বেশিরভাগ বিজ্ঞানী মনে করেন, দুটি নিউট্রন তারার স্থান-প্রকম্পন সমবায়ের সময় এসব ভারী ধাতু উৎপন্ন হয়।অন্যরা এর বিরোধিতা করেন।তাদের মতে সুপারনোভা বিস্ফোরণেই যদি ব্যাপারটা না ঘটে থাকে তাহলে ভিন্ন কোনো কারণের দ্বারস্থ হতে হবে।

এই বিতর্ক নিরসনের জন্য জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীগণ অপরাসায়নিক(অ্যালকেমি) প্রক্রিয়ার কম্পিউটার বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে গামা রশ্মি টেলিস্কোপ, গভীর সমুদ্রতলের ম্যাঙ্গানিজ ভূত্বক ইত্যাদিতে সূত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ব্যাপারটির একটা সুরাহা করার জন্য তাদের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা চলছে যা মহাবিশ্বের অনেক জটিল একটি রহস্যের সমাধানের পথে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

১৯৫৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানী মার্গারেট ও জিওফ্রে বারবিডজ,উইলিয়াম ফাওলার এবং ফ্রেড হোয়েল নক্ষত্রের জীবন ও মৃত্যু কীভাবে পর্যায় সারণির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং এর সবগুলো স্থান পূরণ করতে পারে তার একটা কৌশল উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয় আমাদের দেহ কিংবা দেহ যেসব উপাদান দিয়ে গঠিত সেসব কোনো একসময় স্টারডাস্ট বা তারকা ধূলো ছিল। তার মানে স্বর্ণও তাই ছিল।

বিগ ব্যাং এর পরে হাইড্রোজেন,হিলিয়াম আর লিথিয়াম পড়ে থাকে।তারারা তারপরে এসব উপাদানকে একীভূত করে ভারী উপাদান তৈরি করে।কিন্তু এই প্রক্রিয়া লোহাতে এসে থেমে যায় কেননা লোহাই সবচেয়ে স্থিতিশীল মৌল। এরচে বড় নিউক্লিয়নে ধনাত্মক চার্জ এতো বেশি থাকে যে এদের একসাথে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরো নির্ভরযোগ্যভাবে ভারী কণা বানাতে লোহার নিউক্লিয়াসের সাথে চার্জমুক্ত নিউট্রনের উচ্চ গতিতে সংঘর্ষ ঘটাতে হয়। এতে করে নিউট্রন ক্ষয় হয়ে প্রোটনে পরিণত হয়( একটা ইলেকট্রন আর একটা অ্যান্টিনিউট্রিনো বের হয়ে যায়)।প্রোটনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় একটি নতুন ভারী মৌল তৈরি হয়। নিউক্লিয়াসে অতিরিক্ত নিউট্রন এদের ক্ষয় হবার তুলনায় ধীরে ধীরে নিক্ষিপ্ত করার প্রক্রিয়াকে বলা হয়, ধীর নিউট্রিন ক্যাপচার বা s প্রক্রিয়া।

এভাবে স্ট্রনশিয়াম, বেরিয়াম আর দস্তার মতো ধাতু উৎপন্ন হয়।কিন্তু যখন নিউট্রন ক্ষয় হবার চেয়ে দ্রুত গতিতে নিক্ষিপ্ত হয় তখন তাকে দ্রুত নিউট্রন ক্যাপচার বা r প্রক্রিয়া বলা হয়। আর এ প্রক্রিয়াতেই ইউরেনিয়াম আর স্বর্ণের মতো ভারী উপাদান তৈরি হয়।বারবিডজ ও তার সহকর্মীরা এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য কিছু জিনিসের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এজন্য আপনার দরকার হবে,অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ ভেজালহীন উৎস থেকে পাওয়া নিউট্রন।সাথে লাগবে ভারী নিউক্লিয়াস যা এসকল নিউট্রনকে বন্দী করবে।

এরপর এদেরকে একটি উত্তপ্ত ঘন মাধ্যমে একত্রিত করতে হবে।আপনি চাইবেন এ প্রক্রিয়াটি একটি বিস্ফোরক ঘটনার মধ্যে হোক যাতে উৎপন্ন উপাদান মহাকাশের বাইরে ছড়িয়ে যেতে পারে। অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী মনে করেন এসকল শর্ত শুধুমাত্র একটি বস্তুতেই সংশ্লেষিত হতে পারেঃ সুপারনোভা।

কোন বিশালকার তারকা তার মধ্যে থাকা অন্তর্বস্তুকে যদি পর্যায়ক্রমে একীভূত করে ভারী কোনো উপাদানে রূপান্তরিত করতে পারে বিশেষ করে লোহা পর্যন্ত তাহলে সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটবে।এরপর একসময় ফিউশন থেমে যায় আর তারকার ভিতরগত পরিবেশের অবনমন ঘটে।সূর্যের সমান ভর মাত্র দু কিলোমিটার ব্যাসার্ধের গোলকের মধ্যে ভেঙ্গে পড়ে।

অন্তর্বস্তু যখন তেজস্ক্রিয় উপাদানের সমান ঘনত্বে পৌঁছে যায় তখন এটি দৃঢ়তা বজায় রাখে।তারপর শক্তি বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে আর সংঘটিত হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণ যা বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূর থেকেও দৃশ্যমান। তারকার পতনের সময় ইলেকট্রন ও প্রোটন একত্রিত হতে বাধ্য হয়,নিউট্রন তৈরি হয় এবং এর কোর/অন্তর্বস্তু পরিণত হয় শিশু নিউট্রন তারকায়। এতে আয়রন প্রচুর থাকে।আর সহস্যাব্দ বছর ধরে উৎপাদিত উপাদানগুলো মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হতে থাকে।

১৯৯০ এর দশকের দিকে কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ছবি পাওয়া যায়। এতে দেখা যায় একটি বৃহদায়তন তারকা ভেঙ্গে যাবার অর্ধ সেকেন্ড পর এর নিউট্রন বাষ্পের বেগে বের হয়ে আসে যা প্রায় এক মিনিটের মতো স্থায়ী হয়। এতে আয়রনের নিউট্রন থাকতে পারে যা r প্রক্রিয়ায় ব্যবহার উপযোগী। কিন্তু সুপারনোভা মডেলকে আগের তুলনায় আরো বাস্তবধর্মী করার পর পরিস্থিতির মোড় ভিন্ন দিকে চলে যায়।

এতে নিউট্রিনো চালিত বাতাসে তাপমাত্রা যথেষ্ট বেশি পাওয়া যায়নি।বাতাসের বেগও খুব ধীর হয় যা প্রচুর পরিমাণে নিউক্লেই তৈরি করে কিন্তু এসকল নিউক্লেই ভারী উপাদান যেমন ইউরেনিয়াম তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত নিউট্রন পায়না।এক্ষত্রে নিউট্রিনো নিউট্রনকে পুনরায় প্রোটনে পরিণত করে ফেলতে পারে যার কারণেও নিউট্রনের সংকট দেখা দিবে।

এই ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের সুপারনোভা মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের দিকে নজর দিতে বাধ্য করে যেঃ সুপারনোভা থেকে নিউট্রন তারকা সৃষ্টি হয় যা এই প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ।

১৯৭৪ সালে রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথম বাইনারি নিউট্রিন তারকা পদ্ধতি আবিষ্কার করে।এতে প্রতি কক্ষপথের সাথে সাথে দুটি নিউট্রন তারকার শক্তি লোপ পেতে থাকে এবং একটা সময় এরা সংঘর্ষে লিপ্ত হবে।একই বছরে বিজ্ঞানী জেমস ল্যাটিমার ও ডেভিড স্ক্যাম দেখান যে, এই পরিস্থিতিতে দুটি নিউট্রন তারকার মধ্যে সংঘর্ষ হবে কিনা তা গণনা করা না গেলেও একটি নিউট্রন তারকা এবং ব্ল্যাকহোলের মধ্যে সমবায় ঘটবে।

যদিও সুপারনোভা বিস্ফোরণ মহাকাশের অনেক জায়গা থেকে দৃষ্টিগোচর হয় কিন্তু নিউট্রিন তারকার বেলায় তেমনটি ঘটেনা।যে সুপারনোভা ক্র্যাব নেবুলা তৈরি করেছিল তা ১০৫০ সালে অনেক স্থান দেখে পর্যবেক্ষিত হয়েছিল।কিন্তুএটি যে নিউট্রন তারকা রেখে গিয়েছিল তা ১৯৬৮ সালের আগে আমাদের দৃষ্টিসীমায় আসেনি। দুটি নিউট্রন তারকার সমবায় খুব সহজে দেখা যায়না বা বুঝাও যায়না।তবু এটা r প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী হতে পারে।

নিউট্রন তারকা অধিগ্রহণ কিংবা সুপারনোভা বিস্ফোরণ দুটোই প্রক্রিয়া তৈরিতে সক্ষম।কিন্তু এর মধ্যে একটা বিশাল ফারাক থেকে যায়। সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে বড়জোর চাঁদের উপযোগী স্বর্ণ উৎপাদিত হতে পারে যেখানে নিউট্রন তারকা অধিগ্রহণের ফলে উৎপাদিত স্বর্ণ বৃহস্পতি গ্রহের সমান ভরের কোনো গ্রহের উপযোগী যা সুপারনোভার চেয়ে দশ গুণ বেশি। একারণেই বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি r প্রক্রিয়ার উপাদানগুলোর বন্টনের উপর যাতে করে এদের উৎস সম্পর্কে আরো সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়।

এরই ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে এর ফলে উৎপাদিত যে উপজাত থেক যায় তার সন্ধান চালানো হয়।গভীর সমুদ্রের তলদেশে তেজক্রিয় আয়রন-৬০ পাওয়া গেছে কিছুদিন আগে।যদিও এটা r প্রক্রিয়ার কোনো উপাদান নয়;তবে অন্য একটি অস্থিতিশীল r উপাদান প্লুটোনয়াম-২৪৪ খুব অল্প পরিমাণে পাওয়া গেছে।

তবে অন্য একটি পরিষ্কার উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।অনেক বামন ছায়াপথ স্থিতিশীল হয়ে প্রতিষ্ঠিত হবার আগে একবার ছোটখাটো বিস্ফোরণ অভিজ্ঞতা লাভ করে যা এই প্রক্রিয়া ঘটার একটি সূক্ষ্ম সম্ভাবনা রেখে যায়।২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত কোনো বামন ছায়াপথে অবশ্য উপাদান সমৃদ্ধ কোনো গ্রহের দেখা পাওয়া যায়নি। এমআইটি’র স্নাতক ছাত্র অ্যালেক্স জি রেটিকুলাম-২ নামক একটি বামন ছায়াপথে r প্রক্রিয়ার উপাদান রয়েছে এমন সাতটি গ্রহ খুঁজে পান।

নিউট্রন তারকা সমবায় মডেলের সমর্থনকারীদের মতে এই মডেল বেশ ফিটফাট যদিও নিউট্রিন তারকা সংযুক্তি বেশ বিরল।আমাদের ছায়াপথে এ ধরনের সমবায় প্রতি একশো মিলিয়ন বছরে একবার বা দশ হাজার বছরে একবার ঘটে থাকে।

image source: uk.businessinsider.com

তবে একটি নিউট্রন তারকা ও ব্ল্যাকহোলের মধ্যে সমবায়ের ফলে কি হয় তা জানা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে LIGO(the Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory) কাজ করে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানের কাজ কখনোই শেষ হয়ে যায়না।একের পর এক নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে এই মহাবিশ্বকে আরো সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে জানার জন্য বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা থেমে নেই।পৃথিবীর স্বর্ণের উৎস কোথায় এবং কীভাবে তা এলো তা জানার জন্য আমাদের হয়তো আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবেনা।কিংবা তা জানা হয়ে গেলেও আরো নতুন কিছু জানার আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া থেমে থাকবেনা।

আমাদের কাজ শুধু চোখ কান খোলা রাখা আর কৌতুহলী মনকে সজাগ রাখা।হয়তো একদিন আমরাও বিজ্ঞানীদের কাতারে সামিল হয়ে এইসব গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় নিয়োজিত করতে পারবো।

তথ্যসূত্রঃ

১।https://www.quantamagazine.org/20170323-where-did-gold-come-from-neutron-stars-or-supernovas/

২।https://www.washingtonpost.com/national/health-science/origin-of-gold-found-in-rare-neutron-star-collision

featured image: smithsonianmag.com

হিপোক্রেটিস ও প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্র

এখন থেকে প্রায় ২৭০০ বছর আগে মূল অলিম্পিক গেমস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে গ্রীক সভ্যতার প্রভাব সমগ্র ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর মাত্র ২০০ বছর সময়ের মধ্যে গ্রিস তার ক্ল্যাসিকাল যুগে প্রবেশ করে। বিখ্যাত এই সভ্যতা তখন রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য আর দর্শনে চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। সেই প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সভ্যতার কেন্দ্রে আবির্ভাব ঘটে চিকিৎসাশাস্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিপোক্রেটিস (৪৬০-৩৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)-এর।

মিশরীয় চিকিৎসাশাস্ত্র থেকে গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্র নানা বিষয় ধার করলেও রোগ-শোক হবার পূর্ববর্তী ধারণা থেকে তারা সরে এসেছিল। আগের ধারণা ছিল রোগবালাই ঐশ্বরিকভাবে প্রদত্ত এক ধরনের শাস্তি। তার বদলে গ্রীক চিকিৎসকরা মনে করতেন চারটি ধাতুর মধ্যে ভারসাম্যহীনতার কারণে অসুখ দেখা দেয়। এই ধাতুগুলোকে হিউমর (Humor) বলা হয়।

image source: apessay.com

এ ধারণাটি পরবর্তী ২০০ বছর ধরে বলবৎ ছিল। এই হিউমরিজমের ধারণা সম্ভবত মিশর কিংবা মেসোপটেমিয়া থেকে গ্রিসে এসেছে। আবার হিপোক্রেটিসের কয়েক দশক আগে দার্শনিক এমপেডক্লেস-এর দেয়া “পৃথিবীর মৌলিক উপাদান মোট চারটি— মাটি, বাতাস, আগুন আর পানি’’— এই ধারণা থেকেও আসতে পারে।

উৎপত্তি যেখান থেকেই হোক, হিউমরিজমের ধারণা অনুসারে মানবদেহে রয়েছে চার ধরনের হিউমর বা ধাতু। এগুলো হলো—রক্ত, হলুদ পিত্ত, কালো পিত্ত এবং কফ। একটি সুস্থ দেহে এই হিউমারগুলি সুষম এবং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে। কিন্তু কোনোভাবে যদি এই ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটে তাহলে অসুস্থতা দেখা দেবে।

চিত্র: হিপোক্র্যাটিস

জীবদেহ থেকে নিঃসৃত রস কিংবা ধাতুগুলোর ভারসাম্যহীনতার ধরণ এবং বিশেষভাবে জড়িত বিশেষ কোনো ধাতু দ্বারা যেকোনো রোগকে সংজ্ঞায়িত করা যায়। কেননা প্রতিটা ধাতুর বিশেষ ও নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং এগুলো শুধু নিজেদের সাথেই নয় দেহের অন্যান্য অংশের সাথেও সম্পর্কযুক্ত।

রক্ত— বায়ু, যকৃত, বসন্তকাল, উষ্ণতা আর আর্দ্রতার সাথে যুক্ত। হলুদ পিত্ত সম্পর্কিত আগুন, প্লীহা, গ্রীষ্মকালের সাথে। কালো পিত্তের সাথে মাটি, পিত্তথলি, শরৎকাল, শীতলতা আর শুষ্কতার সম্পর্ক রয়েছে। এবং কফ সম্পর্কিত আছে পানি, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, শীতকাল, ঠান্ডা এবং ক্লেদাক্ততার সাথে।

উদাহরণস্বরূপ, ধাতু হিসেবে রক্তের পরিমাণ যদি বেড়ে যায় তাহলে অসুস্থতার ধরণ হবে শরীর উষ্ণ এবং আর্দ্র হয়ে যাওয়া। এছাড়া লালভাব, ফোলাভাব, নাড়ির দ্রুত স্পন্দন এবং ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস, ঘাম হওয়া, ঘুমে ব্যাঘাত, প্রলাপ বকা ইত্যাদি উপসর্গও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ এটা কোনো ধরনের সংক্রমণের কারণে হওয়া জ্বর। এর চিকিৎসা হবে রক্তপাত ঘটানো যাতে শরীরের রক্ত এবং এর সাথে সম্পর্কিত অন্য ধাতুর পরিমাণ কমে যায়।

মূলত তৎকালীন ইউরোপে বেশিরভাগ রোগের কারণ রক্তের সাথে সম্পর্কিত বলে ভাবা হতো। যার কারণে রক্ত-ঝরানোর অনুশীলন একদম সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠে তখন। এই ধাতু বা হিউমরগুলোর সাম্যতা বজায় রাখার অন্য পদ্ধতি হচ্ছে ভেষজ উদ্ভিদ এবং খাবারের সাথে বিশেষ ধরনের রস মিশিয়ে দেয়া।

হিউমরের পরিমাণ বাড়ানো হবে নাকি কমানো হবে তার উপর ভিত্তি করে এটি দেয়া হতো। হিপোক্রেটিস হিউমর বা ধাতু সম্পর্কে বিশদভাবে লিখে গেছেন তার ‘হিপোক্রেটিক করপাস’ নামক বিশাল এক সংকলনে। এ সংকলনে প্রায় ৬০ টি লিখিত নথি, বিক্ষিপ্ত নোট এবং ছোট বড় নানারকম যুক্তিসম্পন্ন গবেষণাপত্র ছাড়াও বিভিন্ন রোগীর রোগের ইতিহাসের বর্ণনাও রয়েছে।

তবে এখন ধারণা করা হয় যে এই সবগুলো নথিপত্র হিপোক্রেটিস একা লিখেননি। কেননা এদের রচনাশৈলী, লেখার প্রকৃতি এবং মতামতের মধ্যে ভিন্নতা পাওয়া যায়। এ থেকে বুঝা যায় পরবর্তী তিন থেকে চার শতাব্দী ধরে তার ছাত্র, শিষ্য ও অনুসারীরা এই সংকলনে অবদান রেখেছে।

এই সংকলনগুলোর বিষয়বস্তুতে দার্শনিকতা ও প্রাকৃতিক জ্ঞান থেকে শুরু করে চিকিৎসাশাস্ত্রের জ্বরের উপসর্গ, মহামারীর আক্রমণ, ভাঙ্গা হাড়ের সমস্যা, স্থানচ্যুত অস্থিসন্ধি ইত্যাদি অনেক কিছুই আছে। মহিলাদের বন্ধ্যাত্ব, শিরা, দাঁত, পরিচ্ছন্নতার স্বাস্থ্যবিধি, স্বপ্ন, অর্শ্বরোগ এবং মৃগীরোগ নিয়ে বিশাল পরিসরে বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে।

শেষের রোগটি মানে মৃগীরোগকে অনেক গ্রীক পণ্ডিত ‘পবিত্র রোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করতো। অনেকে ভাবতো শয়তান ভর করার কারণে এই রোগ দেখা দেয়। তবে হিপোক্রেটিসের মতামত এই ধারণাকে বাতিল করে দেয়। তিনি বলেন এই রোগ দেখা দেয়ার কারণ শরীরের মধ্যেই নিহিত। মানুষ কেবলমাত্র অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার জন্য একে ঐশ্বরিক রোগ হিসেবে বিশ্বাস করে।

তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে হিপোক্রেটিস সম্পর্কে তেমন বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি সক্রেটিসের সমসাময়িক ছিলেন এবং বিভিন্ন গ্রীক ব্যক্তিত্ব তার নাম উল্লেখ করেছেন নিজেদের গ্রন্থাবলীতে। এদের মধ্যে প্লেটো ও সক্রেটিসও রয়েছেন। হিপোক্রেটিসের মৃত্যুর সময় প্লেটোর বয়স ছিল ৩৫ এবং এরিস্টটল ছিলেন তখন তরুণ। হিপোক্রেটিসের বাবা সম্ভবত চিকিৎসক ছিলেন এবং তিনি তার জন্মস্থান গ্রিসের কস দ্বীপে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন।

অ্যাস্ক্লেপিয়ন (Asclepeion) হচ্ছে একটি মন্দির যা গ্রীক নিরাময় ও চিকিৎসার দেবতা অ্যাসক্লেপিওসকে উৎসর্গ করে বানানো হয়েছিল। সেখানে অসুস্থদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হতো। অ্যাসক্লেপিওস নিজে হয়তো প্রাচীন মিশরের দেবতা বনে যাওয়া চিকিৎসক ইমহোটোপের গ্রীক সংস্করণ। তার ট্রেডমার্ক ‘দ্য রড অব অ্যাসক্লেপিওস’ বা ‘অ্যাসক্লেপিওসের দণ্ড’ নামে পরিচিত যা একটির লাঠি এবং একে ঘিরে থাকা কুন্ডলিত সাপের প্রতীক। হয়তো সাপের বিষ অল্পমাত্রায় রোগ সারাবার কাজে ব্যবহৃত হতো বলে অথবা সাপের খোলস নির্মোচন পুরনো সমস্যা ও অসুস্থতা দূর করে নতুন জীবনের শুরুর ইঙ্গিত দেয় বলে ট্রেডমার্কটি এমন হয়েছে।

চিত্র: কস দ্বীপে অবস্থিত অ্যাসক্লেপিয়ন মন্দির।

উৎস যাই হোক না কেনো এই লাঠি এবং একে ঘিরে থাকা সর্প যুগযুগ ধরে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অ্যাস্ক্লেপিওসের দুই মেয়ে ছিল যারা চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষার মাধ্যমে আজও জীবন্ত। হাইজিয়া (Hygieia) সম্পর্কিত হাইজিন ‘Hygiene’ এর সাথে আর প্যানাসিয়া (Panacea) কে সর্বজনীন নিরাময়ের দেবী হিসেবে মনে করা হয়।

চিত্র: অ্যাস্ক্লেপিওসের দণ্ড।

জীবনের বেশ খানিকটা সময় হিপোক্রেটিস সম্ভবত ঈজিয়ান সাগরের উপকূলে এবং এর অন্তর্দেশীয় অঞ্চলে চড়ে বেড়িয়েছেন যা বর্তমানে বুলগেরিয়া ও তুরস্ক নামে পরিচিত। তিনি চিকিৎসক হিসেবে চর্চা করেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, ছাত্র পড়িয়েছেন এবং নিজের চিকিৎসা বিষয়ক ধ্যান-ধারণা-চর্চা নিয়ে মেতে ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, তিনি কুশলী ছিলেন সঙ্গীত, কবিতা, গণিত এমনকি শারীরচর্চাতে।

সম্ভবত এক পর্যায়ে তিনি ২০ বছরের জন্য কারারুদ্ধ হন। কারণ তিনি আত্মা কিংবা দেব-দেবীকে রোগ বালাইয়ের কারণ হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন। সেই সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে এই শাস্তি দিয়েছিল যারা নিজেদের মানুষ আর দেব-দেবীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ভাবতো।

হিপোক্রেটিসের শিক্ষা–দীক্ষা তাদের শক্তিকে ক্ষয় করে তুলছিল। দুঃখের বিষয়—এরপর হিপোক্রেটিসের কী হয়েছিল তা আর জানা যায়নি। এমনকি কোথায় তার মৃত্যু হয় তাও সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে অস্পষ্টভাবে যা জানা যায় তাতে বলা হয়েছে তিনি গ্রীসের উত্তরপশ্চিমের লারিসা নামক স্থানে মারা যান।

আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের অনেক কিছুই হিপোক্রেটিসের বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি থেকে এসেছে। আমরা অসুস্থতাকে তীব্র (হঠাৎ আরম্ভ হয় এবং স্বল্পস্থায়ী) এবং ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী)— এ দুভাগে ভাগ করি। আর রোগবালাইকে এন্ডেমিক (একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা জনগোষ্ঠী ঘন ঘন দেখা দেয়) এবং এপিডেমিক বা মহামারী (হঠাৎ জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশে ছড়িয়ে পড়ে)— এ দু’শ্রেণীতে বিভক্ত করি। এগুলো এসেছে হিপোক্রেটিস থেকে।

বর্তমানে চিকিৎসা রীতি অনুযায়ী যেভাবে রোগীর রোগের ইতিহাস, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ করা হয় তার মূল পথিকৃৎ হচ্ছে ‘হিপোক্রেটিক স্কুল অব মেডিসিন’। পর্যবেক্ষণ করা সেসময়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে হিপোক্রেটিস এটিকে একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার মাঝে নিয়ে আসেন। প্রতিদিন কমপক্ষে একবার রোগীকে পর্যবেক্ষণ করা হতো যাতে রোগ নির্ণয় এবং রোগের প্রাকৃতিক কারণ জানার মাধ্যমে পরবর্তীতে রোগের অবস্থা সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়া যায় আর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যায়।

হিপোক্রেটিস মনে করতেন রোগের ব্যাপারে পূর্বাভাস দেয়ার অভ্যাস চর্চা করা একটি চমৎকার ও কার্যকরী ব্যাপার। তার মতে, ‘সেই ভালো চিকিৎসা করতে পারবে যে রোগের বর্তমান উপসর্গ দেখে পরবর্তীতে কী হতে পারে তা ধারণা করে নিতে পারে।’ প্রত্যেক রোগীর জন্য সেসময় নথি রাখা হতো যাতে রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ যেমন— শ্বাস প্রশ্বাসের হার, তাপমাত্রা, ত্বক ও গাত্রবর্ণ, চোখ ও মুখের অবস্থা এবং রেচন পদার্থের প্রকৃতি ইত্যাদি।

মল-মূত্র অর্থাৎ রেচন পদার্থের প্রতি হিপোক্রেটিসের আগ্রহ ছিল কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন শরীরের বিভিন্ন কার্যাবলী জানতে এসব নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। একজন ব্যক্তির খাবারের অনুপাতের উপর নির্ভর করে দৈনিক এক কি দুইবার- বিশেষ করে সকালে মলত্যাগ হওয়াটাই সুস্থতার লক্ষণ। উদরস্ফীতি হবার চেয়ে নিয়িমিত পায়খানা হওয়াটাই শরীরের পক্ষে ভালো বলে তিনি মনে করতেন।

রেকটাল স্পেকুলাস— চিমটা জাতীয় এক ধরনের যন্ত্র যা শরীরে ক্ষুদ্র ছিদ্র করে শরীরের ভেতরের অবস্থা পর্বেক্ষণে ব্যবহার করা হতো। এটাই এখনকার এন্ডোসকপির প্রাচীনতম সংস্করণ। এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে আভ্যন্তরীণ অংশ দেখা কিংবা উদ্দেশ্যজনকভাবে শরীরে কাটাছেঁড়া করা হতো। এছাড়া কষ্টকর অর্শ্বরোগ থেকে শুধু করে বন্ধ্যাত্ব সব ক্ষেত্রেই ওষুধ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের মলম ব্যবহার করার কথা জানা যায়।

হিপোক্রেটিস পরামর্শ দেন, সকল নথি এমনভাবে লিপিবদ্ধ করা উচিত যাতে তা স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ, বিশৃঙ্খলামুক্ত এবং সহজ-সাবলীল হয়। এতে করে এসকল অভিজ্ঞতায় কাজে লাগিয়ে পরবর্তী চিকিৎসাক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা নেয়া সম্ভব হবে। অন্যান্য চিকিৎসকদের এইসব নথিপত্র কাজে লাগিয়ে চিকিৎসা করার সুযোগ থাকতে হবে।

অবাক হতে হয় সেসময়ে হিপোক্রেটিসের চিকিৎসাপদ্ধতির ধরণ ছিল রোগীর প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে সতর্ক ও সাবধানী হয়ে চিকিৎসা দেয়া যার উপর বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। সবচেয়ে কার্যকরী প্রতিকার ধরা হতো— পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, আরামদায়ক স্থানে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত পর্বেক্ষণে থাকা যাতে প্রাকৃতিক শক্তিই রোগ নিরাময়ে সহায়ক হয়। ব্যান্ডেজিং, ম্যাসেজিং এবং মলমের ব্যবহার থাকলেও শক্তিশালী ঔষধ আর নিষ্ঠুর ও কষ্টকর কিছু কৌশল ছিল একদম শেষ দিকের অবলম্বন।

চিকিৎসকদের জন্য প্রধান অনুশাসন ছিল- ‘প্রথমত, কোনো ক্ষতি করা যাবে না’। আক্রমণাত্মক এবং নিষ্ঠুর কৌশল যদিও বিরল ছিল। গ্রিসে এবং পরবর্তী প্রাচীন রোমে শারীর শিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ করা ছিল নিষিদ্ধ। সার্জারি বা অস্ত্রোপচার শুধুমাত্র ক্ষত এবং আকস্মিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। এই কারণে মানবদেহের ভেতরটা সেসময় রহস্য হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল।

হিপোক্রেটিসের নিকট পরীক্ষিত এবং বিশ্বাসযোগ্য বেশ কিছু প্রতিকার ব্যবস্থা ছিল। এসবের মধ্যে জলপাই তেল, মধু এবং প্রায় ২০০ রকমের শাকসবজি আর ভেষজ যেমন— ডুমুর, রসুন, পেঁয়াজ, পোস্তদানা, গোলাপ ফুল, ক্যামোমিল, জিরা, জাফরান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

অপরিণামদর্শী ও বোকার মতো খাদ্যগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার কারণ হতে পারে বলে মনে করতেন তিনি। হিপোক্রেটিসের মতে, ‘খাদ্যই তোমার ওষুধ এবং ওষুধই তোমার খাদ্য’। অসুস্থ থাকাকালীন সময়ে খাদ্য খাবার ব্যাপারে তিনি মনে করতেন এতে করে রোগটাকেই খাবার খাওয়ানো হচ্ছে!

হিপোক্রিটাসের চিন্তার আরেকটি দিক হলো, রোগীর ‘সঙ্কটাবস্থা’র ধরণ পর্যবেক্ষণ করা। হিপোক্রেটীয় তত্ত্বানুসারে, রোগ শুরু হওয়ার একটি বিশেষ সময় পরেই সঙ্কটের সময় শুরু হয়। এই নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে যদি সঙ্কট মুহুর্ত আসে, তবে তা বারবার ফিরে আসতে পারে। গ্যালেনের মতে, এই ধারণা হিপোক্রেটিস প্রথম প্রচলন করেন, যদিও তার পূর্ব থেকেই এই ধারণা প্রচলিত ছিল এমন মত রয়েছে।

অনেক রোগ আছে যেগুলো বর্ণনা প্রথমে হিপোক্রেটিস ও তার অনুসারীরা দিয়েছিল। নখ ও আঙ্গুল একত্র হয়ে যাওয়া এর মধ্যে একটি। এটি ‘হিপক্রেটিক ফিঙ্গার’ নামে পরিচিত। হিপোক্রেটিসের শিক্ষা ও রীতিনীতি অন্যান্য গ্রীক চিকিৎসকদেরও প্রভাবিত করেছিল। হেরোফিলাস (Herophilus) নামের আলেকজান্দ্রিয়ার এক চিকিৎসক তখন মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ করার অনুমতি পেয়েছিলেন।

তিনি ফুদফুদ, রক্তের নালী, মস্তিষ্ক, চোখ এবং স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাকেই প্রথম দিককার অন্যতম একজন এনাটোমিস্ট (অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ) হিসেবে গণ্য করা হয়। তার কিছুকাল পরে এরাসিস্ট্রাটোস (Erasistratus) নামের আলেকজান্দ্রিয়ার আরেকজন চিকিৎসক মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ফুসফুস ও রক্ত পরিবহন ব্যবস্থার উপর বিশেষ কাজ করেন।

ধীরে ধীরে হিপোক্রেটিক আন্দোলন চিকিৎসকদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলাতে ভূমিকা রেখেছিল। উল্লেখ্য, তৎকালীন সময়ে চিকিৎসকদের সামাজিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। কারণ পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে সমস্যা সমাধানের চেয়ে সমস্যা বৃদ্ধিতেই তাদের ভূমিকা বেশি ছিল। জনমনে ধারণা পরবর্তনে মূল ভূমিকা রেখেছিল অবশ্য বিখ্যাত ‘হিপোক্রেটিক স্বাস্থ্যসেবার আচরণবিধি’।

আমরা হিপোক্রেটিসের শপথের মাধ্যমে এর সম্পর্কে কিছুটা জানতে পারি এবং এর প্রয়োজনীয়তা যে যুগ যুগ ধরে রোগী ও সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া কে-ই বা চাইবে উন্মাদ, বেপরোয়া, অপরিচ্ছন্ন, খামখেয়ালী, অনৈতিক, অমানবিক এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে যোগাযোগহীন কোনো চিকিৎসকের কাছে যেতে?

‘হিপোক্রেটিক করপাস’-এ চিকিৎসক সম্পর্কিত অংশে একজন আদর্শ চিকিৎসক কেমন হবে তা বলে দেয়া আছে। একজন আদর্শ ডাক্তারকে হতে হবে সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দুর্নীতিমুক্ত এবং সেবা করার মানসিকতা সম্পন্ন। তাকে রোগীর সাথে ভদ্রভাবে সৌজন্যতার সাথে কথা বলতে হবে, রোগীর অবস্থার যত্ন নিতে হবে এবং রোগের লক্ষণগুলো গুছিয়ে লিপিবদ্ধ করতে হবে। ডাক্তারখানা হতে হবে পরিষ্কার-পরিপাটি এবং খোলামেলা পরিবেশযুক্ত।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য হিপোক্রেটিক মতাদর্শ হলো, রোগীর গোপনীয় তথ্য বিশ্বস্ততার সাথে গোপন রাখা। এতে চিকিৎসকগণ কেমন পোশাক পরবে কিংবা কীভাবে চলাফেরা করবে সে সম্পর্কেও বলে দেয়া হয়েছে এই নির্দেশনায়। হিপোক্রেটিসের এই আদর্শ ডাক্তারের ধারণা এসেছে হিপোক্রেটিসের শপথের সাথে বিভিন্ন নব্য সংযোজনের মাধ্যমে। শপথটির নানানরকম সংস্করণের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটা এখানে দেয়া হলো-

“আমি শপথ করছি নিরাময়ের দেবতা অ্যাপোলো ও অ্যাস্ক্লেপিয়স, হাইগিয়া এবং প্যানাসিয়ার নামে- সকল দেবতা ও দেবীদের সাক্ষী রেখে আমি আমার সামর্থ্য ও বিচারবুদ্ধি অনুসারে নিম্নলিখিত শপথ পালন করার চেষ্টা করবো।

আমি আমার সাধ্যমতো রোগীর উপকারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

আমি কখনো কারো ক্ষতি করবো না।

কোনো মারাত্মক পথ্য রোগীকে দেব না।

আমি আমার জীবন এবং অর্জিত জ্ঞানের শুদ্ধতা বজায় রাখবো।

প্রতিটি বাড়িতে আমি শুধুমাত্র রোগীর ভালো করার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করবো।

নিজেকে সকল প্রকার ইচ্ছাকৃত দুর্ব্যবহার এবং মোহাবিষ্ট করা থেকে বিরত থাকবো। বিশেষ করে নারী ও পুরুষ উভয়ের সাথে প্রেম আনন্দ করা থেকে দূরে থাকবো।

যা কিছু আমার জানার গোচরে আসে সেটা আমার পেশার সাথে সম্পর্কিত কিংবা সম্পর্কিত নয় তা আমি অবশ্যই গোপন রাখবো, কখনো কারো নিকট প্রকাশ করবো না।”

চিত্র: ‘হিপোক্রেটিসের শপথ’-এর ইংরেজি রূপ।

সারা বিশ্বজুড়ে মেডিকেল ছাত্ররা তাদের প্রতিষ্ঠান কর্তৃক চয়নকৃত হিপোক্রিটাসের শপথ নিয়ে থাকেন। যদিও মূলের সাথে বর্তমানকালের শপথের অনেকটা অমিল রয়েছে, তবুও এ শপথ নৈতিকতা, সতর্কতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সহানুভূতিশীলতার উপর জোর দিয়ে থাকে যাতে করে রোগীর এবং চিকিৎসক উভয়েরই মঙ্গল সাধিত হয়।

তথ্যসূত্র

১. Hippocrates and Greek Medicine, Kill or Cure: An Illustrated History of Medicine by Steve Parker

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Hippocrates

মাইকেলসন থেকে আইনস্টাইন- পদার্থবিজ্ঞানের পুনর্জাগরণ

ঊনিশ শতকের শেষের দিকে এসে বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত হলেন যে তারা বোধহয় পদার্থবিজ্ঞানের বেশিরভাগ রহস্যের সমাধান করে ফেলেছেন। বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব, গ্যাস, আলোকবিদ্যা, গতিবিদ্যা আর বলবিদ্যার মতো বিষয়াবলি ততদিনে বিজ্ঞানীদের জানা হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া ক্যাথোড রশ্মি, রঞ্জন রশ্মি, ইলেকট্রন, তেজস্ক্রিয়তা এসব কিছুও সেসময়েই আবিষ্কৃত হয়।

জানা হয়ে গেছে ওয়াট, ওহম, কেলভিন, জুল, আয়ম্পিয়ার ইত্যাদি এককের নাম ও ব্যবহার। বিখ্যাত সব সূত্রাবলীও বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছিলেন। তাই অনেক বিজ্ঞানী ভেবে বসলেন যে বিজ্ঞানের পক্ষে আর তেমন কিছুই নেই যা আবিষ্কার করা যায়।

১৮৭৫ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক নামে জার্মানির কিয়েল শহরের এক তরুণ তখন ভাবছিল পরবর্তী জীবনে গণিত নাকি পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করবে। যদিও তার উপর চাপ ছিল পদার্থবিজ্ঞান না নেয়ার জন্য। কেননা এর মধ্যেই এই বিষয়ে বড় বড় সব গবেষণা হয়ে গেছে। সেগুলোতে সাফল্যও এসেছে। প্ল্যাঙ্ককে বলা হলো, ‘বাছা, সামনের বছরগুলোতে নতুন কিছুই আবিষ্কার হবে না। বরং আগের আবিষ্কৃত জিনিসগুলোর সমন্বয় সাধন আর সংশোধন হতে পারে।’

কিন্ত সে কারো কথা শুনলো না। পড়াশুনা করলো তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে আর মনপ্রাণ উজাড় করে দিলো এনট্রপি তথা বিশৃঙ্খলা নিয়ে গবেষণার কাজে।

১৮৯১ সালে সে নিজের গবেষণার ফলাফল পেলো আর দুঃখজনকভাবে জানতে পারলো যে তার আগেই আরেক বিজ্ঞানী এই কাজ করে ফেলেছেন। যিনি কাজটা করেছেন তার নাম যে উইলার্ড গিবস। তিনি ছিলেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী। তিনি সেসব বিজ্ঞানীদের কাতারে যাদের নাম খুব বেশি মানুষ জানে না। খোলাসা করে বললে বলতে হয় তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন।

ইউরোপে তিন বছর পড়াশুনার সময়টুকু বাদে বাকি জীবন তিনি তার তিন ব্লকের সীমানা ঘেরা বাড়ি আর ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কাটিয়েছেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দশ বছর তিনি বেতন নিয়েও তেমন মাথা ঘামাননি। ১৮৭১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান থেকে শুরু করে ১৯০৩ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত এই সময়কালে তার কোর্সে প্রতি সেমিস্টারে মাত্র এক কি দুই জন ছাত্র আগ্রহ দেখাতো।

তার লিখিত কাজগুলো অনুসরণ করা ছিল বেশ কঠিন আর দুর্বোধ্য। কিন্তু এই রহস্যময় দুর্বোধ্য বর্ণনাগুলোতেই লুকিয়ে ছিল অতি উচ্চমানের তথ্যাবলী। উইলিয়াম ক্রপারের মতে, ‘১৯৭৫-৭৮ সালে গিবসের প্রকাশিত গবেষণাপত্রগুলোতে ভিন্নধর্মী পদার্থের ভারসাম্য শিরোনামে তাপগতীয় নীতির প্রায় সবকিছু যেমন- গ্যাস, মিশ্রণ, পৃষ্ঠতল, দশা পরিবর্তন, রাসায়নিক বিক্রিয়া, তড়িৎ-রাসায়নিক কোষ, অধঃক্ষেপণ, অভিস্রবণ ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা রয়েছে।’

গিবসের এই ভারসাম্যতাকে বলা হতো ‘প্রিন্সিপিয়া অব থার্মোডাইনামিক্স’। কিন্তু তিনি তার এই গবেষণাপত্রগুলো প্রকাশ করেন ‘কানেকটিকাট একাডেমি অব আর্টস এন্ড সায়েন্সেস’-এর জার্নালে যা তেমন পরিচিত ছিল না। এ কারণে প্ল্যাঙ্ক তার নিজের গবেষণার ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত গিবসের কাজ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। কিছুটা হতোদ্যম হয়ে আর কিছুটা পারিবারিক কারণে প্ল্যাঙ্ক অন্যদিকে মনোযোগ দেন।

চিত্র: উইলার্ড গিবস

আমরাও এবার আমাদের মনোযোগ নিয়ে যাবো সে সময়ের ওহাইওর একটি প্রতিষ্ঠানে যেটির তৎকালীন নাম ছিল ‘দ্য কেইস স্কুল অব সায়েন্স’। এখানে ১৮৮০ এর দশকে আলবার্ট মাইকেলসন এবং তার বন্ধু রসায়নবিদ এডওয়ার্ড মর্লি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। সেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। নিজেদের অজান্তেই যেন তারা এক নতুন জ্ঞানের দুয়ার খুলে ফেলেছিলেন।

মাইকেলসন আর মর্লির এই পরীক্ষা দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা একটা বিশ্বাসের ভীত নাড়িয়ে দেয়। তাদের পরীক্ষায় জানা গেলো যে, আলোকবাহী ইথারের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রসঙ্গত, ইথার হলো একটি কাল্পনিক মাধ্যম। যা বর্ণহীন, মানে অদৃশ্য, সান্দ্রতাহীন এবং ভরহীন এবং এটি সমস্ত মহাবিশ্ব জুড়ে বিদ্যমান।

দেকার্ত কর্তৃক প্রবর্তিত এই ইথারের ধারণা পরবর্তীতে নিউটন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা সমর্থন করেন। মূলত ঊনিশ শতকের বিজ্ঞানের পটভূমিতে এই ধারণাটির প্রয়োজন ছিল। কেননা আলো শূন্যস্থানের মধ্যে দিয়ে কীভাবে গমন করে তা জানার নিমিত্তেই এই ইথারের ধারণা অনেক জনপ্রিয়তা পায়।

১৮ শতকের দিকে আলো এবং তাড়িতচৌম্বককে দেখা হতো তরঙ্গ হিসেবে। আর তরঙ্গের কথা হলেই চলে আসে কম্পাংকের কথা। কিন্তু কম্পাংকের জন্য প্রয়োজন একটি মাধ্যম। আর সেই মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এসেছে ইথারের ধারণা।

চিত্র: বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক

পরে ১৯০৯ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জে জে থমসন জোর দিয়ে বলেন, ‘ইথার শুধুমাত্র কোনো এক খ্যাতনামা দার্শনিকের চমৎকার এক আবিষ্কার নয়; এটি আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য অপরিহার্য বায়ুর মতোই গুরুত্বপূর্ণ’। এই উক্তিটি তিনি করেন ইথারের অস্তিত্ব নেই তা প্রমাণ হবার চার বছর পরে। এ থেকে বোঝা যার, বিজ্ঞানীদের মনেও ইথারের ধারণা বেশ পাকাপোক্তভাবে গেঁথে গিয়েছিল।

ঊনিশ শতকের আমেরিকাকে অপার সুযোগের পীঠস্থান হিসেবে ভাবতে চাইলে আমাদেরকে আলবার্ট মাইকেলসনকে বাদ দিয়েই ভাবতে হবে। ১৮৫২ সালে জার্মান-পোলিশ সীমান্তে জন্মগ্রহণ করা মাইকেলসন বাবা-মা’র সাথে অল্প বয়সে চলে আসেন আমেরিকাতে। সেখানে ক্যালিফোর্নিয়ার এক কয়লা খনির ক্যাম্পে বেড়ে উঠেন তিনি। বাবা ছিলেন শুষ্ক পণ্যের (সুতা, ফ্রেব্রিক ইত্যাদি) ব্যবসায়ী।

দারিদ্রের কারণে কলেজের খরচ জোগাতে না পেরে মাইকেলসন চলে আসেন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে। সেখানে তিনি প্রতিদিন হোয়াইট হাউজের সামনের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতেন এই আশায় যে হয়তো তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্রান্টের সাথে দেখা হয়ে যাবে এবং তিনি তার পড়াশুনা করার একটা বিহিত করবেন। পরে মিঃ গ্রান্ট তাকে ‘ইউ এস নেভাল একাডেমি’তে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ করে দেন। সেখানেই মাইকেলসন পদার্থবিজ্ঞানের উপর জ্ঞানার্জন করেন।

দশ বছর পরে, ক্লিভল্যান্ডের কেস স্কুলের প্রফেসর হিসেবে মাইকেলসন ইথারের প্রবাহ নির্ণয় করতে আগ্রহী হলেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যা অনুসারে, কোনো পর্যবেক্ষক আলোর উৎসের দিকে যাচ্ছে না বিপরীত দিকে যাচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে আলোর বেগের তারতম্য বের করা যাবে। যদিও তখন পর্যন্ত কেউ এই বেগ মাপার কোনো উপায় বের করতে পারেনি। তবে ইথারের প্রবাহ বের করতে এই আলোর বেগকে কাজে লাগানো যাবে বলে মনে করলেন মাইকেলসন।

তিনি ভাবলেন, পৃথিবী যদি বছরের অর্ধেক সময় সূর্যের অভিমুখে যায় এবং বাকি অর্ধেক সময় সূর্য থেকে দূরে সরে যায় তাহলে এই দুই সময়ে পৃথিবীর বেগ নির্ণয় করে এই দুই সময়ে আলোর বেগের তুলনা করলে যদি তারতম্য পাওয়া যায় তবে ইথারের প্রবাহ বের করা যাবে। এবং ইথারের অস্তিত্ব যে আসলেই আছে তা প্রমাণ করা যাবে।

মাইকেলসন তার উদ্ভাবনী প্রতিভা কাজে লাগিয়ে ইন্টারফেরোমিটার নামের এক সংবেদনশীল ও কার্যকরী যন্ত্রের নকশা করেন যা দিয়ে সঠিকভাবে আলোর বেগ মাপা সম্ভব হবে। এটা বানানোর অর্থ জোগান পাবার জন্য তিনি সদ্য টেলিফোন আবিষ্কার করা বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের সাথে কথা বললেন। পরে বন্ধু ও সহকর্মী মর্লিকে নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিমাপ করলেন।

এই কাজটা এতোটাই ক্লান্তিকর আর পরিশ্রমের ছিল যে তারা একটা সময় নার্ভাস ব্রেক ডাউনের শিকার হয়ে হাল ছেড়ে দিতে বসেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ১৮৮৭ সালের দিকে তাদের কাজের ফলাফল বেরলো। কিন্তু এ কী! এ যে তারা যা ভেবেছিলেন তার একেবারে বিপরীত ফলাফল!

চিত্রঃ বিজ্ঞানী মাইকেলসন ও বিজ্ঞানী মর্লি

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে উইলিয়াম এইচ ক্রপার বলেন, ‘এটা সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে নেতিবাচক ফলাফল’। তবে মাইকেলসনকে এজন্য নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। তিনিই প্রথম আমেরিকান যিনি এই বিরল সম্মান লাভ করেছেন। তবে এরপর মাইকেলসনও বিখ্যাত ‘নেচার’ সাময়িকীতে জানান যে তিনি সেসব বিজ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত যারা মনে করেন বিজ্ঞানে আবিষ্কার ও গবেষণা করার মতো আর তেমন কিছু নেই।

এরপর এলো বিংশ শতাব্দী তার চমকপ্রদ সব ঘটনাবলী নিয়ে। বিজ্ঞানের জগতে আর কিছুদিনের মধ্যে এমন সব আবিষ্কার হবে যা মানুষকে হতবাক করে দেবে। পরিবর্তন করে দেবে মানুষের ভাবনার জগত। যার কিছু কিছু ব্যাপার সাধারণ মানুষের বোধগম্য হবে না।

বিজ্ঞানীরাও অল্পদিনের মাঝেই কণা ও প্রতিকণার মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবেন। বিজ্ঞান তখন ম্যাক্রোপদার্থবিজ্ঞান থেকে আস্তে আস্তে মাইক্রোপদার্থবিজ্ঞানের দিকে এগুচ্ছে। আর সেই সাথে জগত প্রবেশ করতে লাগলো কোয়ান্টাম যুগে যার প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক।

১৯০০ সাল। ৪৫ বছর বয়স্ক ‘ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন’-এর তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক নতুন একটা থিওরি দিলেন যার নাম ‘কোয়ান্টাম থিওরি’। থিওরিতে তিনি বলেন, ‘আলো পানির মতো প্রবাহিত হয় না বরং এটি প্যাকেট আকারে বা গুচ্ছাকারে প্রবাহিত হয়’। আর এই প্যাকেটের গুচ্ছকে তিনি অভিহিত করেন ‘কোয়ান্টা’ হিসেবে। এই ধারণাটি বেশ যুক্তিযুক্ত ছিল।

আর কিছুদিনের মাঝেই এটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত ‘আলোর গতি নির্ধারক পরীক্ষা’র ধাঁধার জট খুলতে সাহায্য করলো। আলোর তরঙ্গ হবার ধারণাকেও বদলে দিলো এই থিওরি। এরপর প্রায় অনেক বছর ধরে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মূল অংশে রাজত্ব করে বেড়ালো এই কোয়ান্টাম থিওরি। তাই এটাকে পদার্থবিজ্ঞানের বদলে যাবার প্রথম ইঙ্গিত হিসেবে অভিহিত করা যায়।

কিন্তু সত্যিকারের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ঘটলো ১৯০৫ সালে। সে সময় এক তরুণ যার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি ছিল না, ছিল না কোনো পরীক্ষাগারে যাতায়াতের সুবিধা, যে ছিল প্যাটেন্ট অফিসের তৃতীয় শ্রেণির এক কেরানি— সে ‘অ্যানালেন ডের ফিজিক’ নামে একটি জার্মান জার্নালে কিছু গবেষোণাপত্র প্রকাশ করলো। তরুণের নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। সে বছর ওই জার্নালে সে পাঁচটি গবেষণাপত্র দাখিল করে যার তিনটিই ছিল পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী।

এই তিনটির প্রথমটি ছিল, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম থিওরি অনুসারে আলোকতড়িৎ ক্রিয়ার প্রভাব ব্যাখ্যা নিয়ে। দ্বিতীয়টি, সাসপেনশনে ছোট ছোট কণার গতিপ্রকৃতি (ব্রাউনীয় গতি) নিয়ে এবং তৃতীয়টি ছিল আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব নিয়ে। এর মধ্যে প্রথমটির জন্য তিনি নোবেল পুরষ্কার পান যা আলোর প্রকৃতি কেমন তা বুঝতে মূল ভূমিকা রাখে। পরেরটি প্রমাণ করে যে, পরমাণুর অস্তিত্ব আছে এবং এরা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকে। আর সব শেষেরটি সম্ভবত আমাদের এই দুনিয়াটাকেই বদলে দিয়েছিল।

আইনস্টাইনের মহাবিশ্ব

১৮৭৯ সালে জার্মানির উলম শহরে জন্মগ্রহণ করলেও বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বেড়ে ওঠেন মিউনিখ শহরে। ভবিষ্যতে তিনি যে বিখ্যাত একজন পদার্থবিদ হবেন তার আভাস কিন্তু ছোটবেলায় পাওয়া যায়নি। এটা বোধহয় প্রায় সবাই জানে যে তিন বছর বয়স পর্যন্ত তার মুখে কথা ফুটেনি।

১৮৯০ এর দশকে আইনস্টাইনের বাবার ইলেক্ট্রিক ব্যবসায় লস হলে তাদের পরিবার মিলান শহরে চলে আসে। কিশোর আইনস্টাইন পড়াশুনার জন্য চলে যান সুইজারল্যান্ড। কিন্তু প্রথমবারের চেষ্টাতে কলেজ এন্ট্রাস (প্রবেশিকা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন। ১৮৯৬ সালে তিনি জার্মান নাগরিকত্ব ছেড়ে দেন যাতে মিলিটারিতে যোগদান করা না লাগে।

এরপর জুরিখ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে চার বছরের একটি কোর্সে ভর্তি হন। এটি ছিল স্কুলের বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষক তৈরি করার উদ্দেশ্যে প্রণয়িত একটি কোর্স। এই কোর্সে আইনস্টাইন ছিলেন মোটামুটি মানের একজন ছাত্র।

১৯০০ সালে স্নাতক পাশ করার কয়েকমাসের মধ্যেই তিনি জার্নালে নিজের গবেষণাপত্র প্রকাশ করা শুরু করেন। তার প্রথম গবেষণাপত্রটি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ‘কোয়ান্টাম থিওরি’র সাথে একই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ১৯০২ সাল থেকে ১৯০৪ সালের মাঝে তিনি কতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যেগুলো কানেকটিকাটের বিজ্ঞানী জে উইলার্ড গিবসের ‘পরিসংখ্যান বলবিদ্যার মৌলিক নীতি’কে সমর্থন করে এবং বোঝায় যে বিজ্ঞানী গিবসের কাজ ফেলনা ছিল না।

চিত্র: বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন

একই সময়ে আইনস্টাইন তার এক হাঙ্গেরিয়ান ছাত্রী মিলেভা মারিকের প্রেমে পড়েন। বিয়ের আগেই তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয় এবং বাচ্চাটিকে দত্তক দিয়ে দেয়া হয়। আইনস্টাইন তার মেয়েকে দেখার সুযোগ পাননি। এর দুই বছর পর তারা দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই সময়ের মধ্যে ১৯০২ সালে আইনস্টাইন সুইস প্যাটেন্ট অফিসে চাকরি নেন এবং পরবর্তী সাত বছর এই চাকরিতেই কাটিয়ে দেন।

আইনস্টাইন তার এই কাজ বেশ উপভোগ করতেন। যদিও এই কাজ যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং ছিল তবুও তা পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি তার ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র কমাতে পারেনি। বরং বলা চলে ১৯০৫ সালে তার দেয়া বিখ্যাত বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের পটভূমি এই প্যাটেন্ট অফিসের কাজে থাকতেই রচিত হয়েছিল।

তার গতিশীল বস্তুর তড়িৎগতিবিদ্যা সম্পর্কিত গবেষণাপত্রটিকে এযাবতকালের সবচেয়ে অসাধারণ গবেষণাপত্র বলে বিবেচনা করা হয়। এর উপস্থাপনার ভঙ্গি কিংবা ভেতরের তথ্যাবলী দুটোই ছিল অন্যান্য গবেষণাপত্র থেকে ভিন্ন। এতে কোনো পাদটিকা, উদ্ধৃতি কিংবা পূর্ববর্তী কোনো গবেষণাপত্রের উল্লেখ ছিল না। ছিল না তেমন কোনো গাণিতিক ব্যাখ্যা। তবে তার প্যাটেন্ট অফিসের একজন সহকর্মী, মিচেল বেসো’র সহায়তার কথা বলা হয়েছিল।

সি পি স্নো এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আইনস্টাইন কারো সহায়তা ছাড়াই শুদ্ধ চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। অন্য কারো মতামত না শুনেই তিনি বিশাল এক পরিসরের চিন্তা ভাবনা একাই করে ফেলেছিলেন।”

এই গবেষণাপত্রে তার ভুবন বিখ্যাত E = mc2 সমীকরণটি ছিল না। তবে এর কয়েক মাস পরেই তিনি এটি প্রকাশ করেন। সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায় যে এই সমীকরণ বলছে, বস্তুর ভর এবং শক্তি একটা ভারসাম্য অবস্থায় থাকে। মূলত প্রতিটি জিনিসই দুটি রূপে থাকে। একটি হলো শক্তি আর অন্যটি হলো বস্তু বা ভর। শক্তি হলো মুক্ত হয়ে যাওয়া বস্তু। আর বস্তু হলো যা শক্তিতে রূপান্তরের অপেক্ষায় আছে।

আলো বেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার, যেহেতু আলোর বেগের বর্গ একটা বিশাল বড় সংখ্যা সেহেতু বলা যায় প্রতিটা বস্তুতেই একটা বিশাল পরিমাণ শক্তি মজুদ আছে। একজন পরিণত মানুষের শরীরে প্রায় 7 × 1018 জুল পরিমাণ শক্তি রয়েছে যা ত্রিশটা বড় আকারের হাইড্রোজন বোমার শক্তির সমান। আসলে প্রত্যেক বস্তুতেই শক্তি সঞ্চিত আছে। আমরা শুধু তা ব্যবহার করার সঠিক উপায় এখনো জানতে পারিনি।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি শক্তি উৎপন্ন করতে পারে এমন জিনিস হলো ইউরেনিয়াম বোমা। এটি এর মূল শক্তির মাত্র এক শতাংশেরও কম শক্তি উৎপন্ন করে। আমরা আরো একটু চতুর হতে পারলে এর পুরোটাই শক্তিতে পরিণত করতে পারতাম।

চিত্রঃ ইউরেনিয়াম বোমা।

অন্যান্য আরো অনেক তত্ত্বের মধ্যে আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব তরঙ্গের প্রকৃতি সম্পর্কেও ধারণা দেয়। কীভাবে একটি ইউরেনিয়াম পিণ্ড বরফের মতো গলে না গিয়ে উচ্চ শক্তি উৎপন্ন করতে পারে তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। এই সমীকরণের কল্যাণে আমরা জানতে পেরেছি যে আলোর বেগ সবসময় একই থাকে অর্থাৎ ধ্রুব। কোনো কিছুই আলোকে অতিক্রম করতে পারে না।

সাথে সাথে আলোকবাহী ইথারের প্রকৃতি এবং এর অনস্তিত্বের কথাও জানা যায়। এর মাধ্যমে আমরা এই মহাবিশ্বের স্বরূপ সম্পর্কেও জানতে পারি। কীভাবে নক্ষত্রগুলো বিলিয়ন বছর ধরে জ্বলছে কিন্তু নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে না তাও আমরা এর মাধ্যমেই জানতে পেরেছি। আইনস্টাইন এই তত্ত্বের মাধ্যমে আমাদের নিকট এক নতুন মহাবিশ্বের দুয়ার খুলে দিয়েছেন।

নিয়ম অনুসারেই পদার্থবিদরা একজন প্যাটেন্ট অফিসের কেরানির প্রকাশিত গবেষণাপত্রের দিকে তেমন কোনো লক্ষপাত করেননি। যার কারণে আইনস্টাইনের এই বিখ্যাত আবিষ্কার খুব কম সাড়া ফেলে প্রথমদিকে। মহাবিশ্বের অল্পকিছু রহস্যের সমাধান করার পর আইনস্টাইন ইউনিভার্সিটির লেকচারার পদে যোগদানের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রত্যাখ্যাত হন। এরপর স্কুল শিক্ষক হিসেবে আবেদন করলে সেখানেও মনোনীত হননি।

শেষমেশ তিনি আগের সেই ছাপোষা তৃতীয় শ্রেণীর কেরানী পদে ফিরে যান। কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করা থামাননি। মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনের কাজের শেষ যে তিনি এখনো করে উঠতে পারেননি।

কবি পল ভালেরি আইনস্টাইনকে জিগ্যেস করেছিলেন তিনি তার আইডিয়াগুলো কোনো নোটবুকে লিখে রাখেন কিনা। জবাবে স্মিত হেসে আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘তার প্রয়োজন হবে না। তেমন কোনো আইডিয়া আমার মাথায় নেই’। কিন্তু আসলে এর পরে আইনস্টাইনের মাথায় যে চিন্তা ভাবনা এসেছিল তা ছিল জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সাড়া জাগানো এক আইডিয়া যা আমাদের চেনা জগতের চেহারা বদলে দিয়েছিল।

কোথাও কোথাও বলা হয় যে, ১৯০৭ সালের দিকে আইনস্টাইন একজন শ্রমিককে ছাদ থেকে পড়ে যেতে দেখেন এবং তখন থেকেই অভিকর্ষ নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। তার নিজের মত হচ্ছে, চেয়ারে বসে থাকার সময়ে তিনি অভিকর্ষের সমস্যা নিয়ে অবগত হন!

আইনস্টাইনের এই আইডিয়া অভিকর্ষের সমস্যা সমাধানের পথে প্রথম পদক্ষেপ বলা চলে। এমনিতেও আইনস্টাইনের মাথায় এটা ছিল যে তার বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে কিছু একটা নেই। আর তা ছিল অভিকর্ষ। ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’ সম্পর্কে বিশেষ ব্যাপার হলো এটি অভিকর্ষের প্রভাবে চলন্ত বস্তু নিয়ে কাজ করে।

কিন্তু যদি কোনো বস্তু অভিকর্ষের বাইরে থেকে গতিশীল হয় (যেমন-আলো) তখন কী ঘটবে? এই প্রশ্নটিই পরবর্তী এক দশক ধরে তার চিন্তাভাবনা জুড়ে ছিল এবং অবশেষে ১৯১৭ সালের শুরুতে তিনি প্রকাশ করেন তার ‘সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব’ শিরোনামে বিখ্যাত গবেষণাপত্র।

১৯০৫ সালে দেয়া ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’ বেশ গভীর এবং গুরুত্বপূর্ণ হলেও সি পি স্নো এর মতে, “আইনস্টাইন যদি এই বিশেষ তত্ত্ব না দিতেন তবে পরের পাঁচ বছরের মধ্যে কেউ না কেউ তা ঠিকই প্রকাশ করতেন। কিন্তু আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের ব্যাপার আলাদা। আইনস্টাইন এই তত্ত্ব না দিলে আমাদের হয়তো এখনো এর জন্য অপেক্ষা করতে হতো।”

তথ্যসূত্র

  1. Einstein’s Universe/A short History of nearly everything
  2. http://z2i.co/astronomy/aether-an-imaginary-medium/
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Max_Planck
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Albert_A._Michelson

পৃথিবীর কেন্দ্রে বৃহদায়তন ধাতব বস্তু

পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ কয়েকটি স্তরে গঠিত। সবচেয়ে গভীরে যে স্তরটি আছে তাকে বলে কেন্দ্রমণ্ডল। কেন্দ্রমণ্ডলের বাইরের পৃষ্ঠের এলাকায় র্পিলাকৃতির বিস্তৃত লোহার কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গেছে। বলা যায় এতদিন লুকায়িত ছিল এটি। প্রতি বছর প্রায় ৫১ কিলোমিটার ভ্রমণ করে এই লোহার স্তর। বর্তমানে এটি উত্তর গোলার্ধে অবস্থান করছে এবং ধীরে ধীরে পশ্চিমমুখী হয়ে আলাস্কা ও সাইবেরিয়ার দিকে এগুচ্ছে।

সান ফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত ‘আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়ন (AGU)-এর বার্ষিক এক সমাবেশে এই ঘোষণা করা হয়। এখানে বলা হয়, লোহার এই স্তর সম্ভবত পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। চৌম্বকক্ষেত্রের এর মধ্যে কিছুটা পরিবর্তনও ঘটছে।

অভ্যন্তরে অবস্থিত এই স্তুটি প্রথম শনাক্ত করা হয় ‘ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সী’র একটি প্রোগ্রামে ব্যবহৃত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের মানচিত্র তৈরি করার উদ্দেশ্যে এই প্রোগ্রামের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

বর্তমানে লোহার এই স্তর প্রায় ৪২০ কিলোমিটার চওড়া, যা এই গ্রহের প্রায় অর্ধেক পরিধি জুড়ে অবস্থান করছে। ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এর প্রশস্ততা রহস্যজনকভাবে বেড়েই চলেছে। প্রতি বছরে প্রায় ৪০ কিলোমিটার করে এটি দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি এতটাই শক্তিশালী চুম্বকে পরিণত হচ্ছে যে পৃথিবীর অন্তঃভাগের কঠিন কেন্দ্রমণ্ডলের আবর্তনকেও প্রভাবিত করছে।

এমনকি এই সর্পিলাকার লোহার স্তর আবিষ্কারের আগেও অর্ধতরল কেন্দ্রভাগে বাইরের স্তর ছিল অবিশ্বাস্যভাবে গতিশীল। বিশাল কেন্দ্রমণ্ডলে অবস্থিত আংশিক গলিত অবস্থায় থাকা এই স্তরটি মোটামুটিভাবে ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পুরু।

চিত্রঃ তরলিত লোহা। চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ঐ স্তর তরলিত লোহা দিয়ে গঠিত।

প্রায় ৭ হাজার ৩০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস উত্তপ্ত এই বহিঃস্থ কেন্দ্র এক ধরনের তাপ ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে। এর নিজস্ব পরিচলন স্রোত টেকটোনিক প্লেটের গতিকে আরো বাড়িয়ে দেয়। উল্লেখ্য টেকটোনিক প্লেটের চলনের ফলেই মহাদেশীয় সঞ্চরণ সম্পন্ন হয় এবং বিস্তৃত পর্বতমালার সৃষ্টি হয়।

এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরটি সম্পর্কে আরো অনেক তথ্য জানার বাকি আছে। অনেক কিছু বিজ্ঞানীরা এখনো বুঝতে পারছে না। তাই এ সম্পর্কে আরো বেশি গবেষণা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের জানার জগতে নতুন নতুন তথ্য সংযোজন করবে আর সেইসাথে পুরনো অনেক প্রশ্নের জবাব দেবে বলে আশা করা যায়।

তথ্যসূত্রঃ iflscience.com

featured image: crossfitmeppel.nl

জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এক দুর্ভাগা

খুব কাছের এক বন্ধু। নানা কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছাত্রজীবনের আপাত ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছে না। তার মতে সে যা-ই করে তাতেই বিপত্তি বাঁধে। ‘সাফল্য’ শব্দটা নাকি তার অভিধানেই নেই। এই দুঃখে কিছু করতেও চায় না। কিছুদিন আগে পথ চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে বসেছে। হাসপাতালের বেডে বসে ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখে।

সেদিন তাকে দেখতে গেলাম। একথা সেকথা বলার পর বন্ধু আমার জিগ্যেস করে বসল- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে অভাগা কে বলতে পারিস?’। জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই বললো- ‘এই যে মূর্তিমান আমি।’ হেসে মাথা নাড়লাম, ‘উহু। তোর চেয়েও অভাগা আছে রে।’ এই বলে তাকে এক দুর্ভাগা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাহিনী বললাম। শুনে তার মুখে আর রা কাড়ে না।

গুইলিয়াম জোসেফ হায়াসিন্থ জাঁ বাপটিস্ট লে জেন্টিল ডে লা গ্যালাইসিয়েরে। এই ইয়া বড় নামখানা আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোকের। আমরা তাকে লে জেন্টিল সাহেব বলবো। জন্ম ১৭২৫ সালে। জাতে ফরাসী। কাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা আর অংক কষা। মানে জ্যোতির্বিদ। এগারোটি বছর বেচারা এমন এক কাজের পিছনে সারা দুনিয়া জুড়ে দৌড়েছেন যেটা সম্পন্ন করতে পারলে অন্যভাবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হতো।

চিত্রঃ জ্যোতির্বিদ লে জেন্টিল।

এই ট্রানজিটগুলো খুবই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় পর পর ট্রানজিট ঘটে থাকে। শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে এ ক্রমটিকে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে- একটি শুক্র সরণের ঠিক ১০৫.৫ বছর পর আরেকটি শুক্র সরণ হয় যার ঠিক আট বছর পর আরো একটি শুক্র সরণ হয় আবার এই শুক্র সরণটির ১২১.৫ বছর পর একটি শুক্র সরণ হয় এবং এর আট বছর পর আবার একটি শুক্র সরণ ঘটে এভাবে প্রতি ২৪৩ বছরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।সেটা বলার আগে কিছু ভারী কথা বলে নেই।

১৫৪৩ সালে কোপার্নিকাসের এবং ১৫৮৮ সালে টাইকো ব্রাহের কোপার্নিকাসকে সমর্থন করে দেয়া সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী গ্রহ দুটির (বুধ ও শুক্র) ট্রানজিট ঘটে। ট্রানজিট মানে অতিক্রম। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে করতে এই গ্রহগুলো এক সময় পৃথিবীর সামনে দিয়ে যাবে। তখন সূর্য থেকে আসা আলোর কিছু অংশ এই গ্রহ বা জ্যোতিষ্ক ঢেকে দিবে যার ফলে পৃথিবী থেকে এদের স্পষ্ট দেখা যাবে এবং শনাক্ত করা যাবে।

কেপলার সর্বপ্রথম ১৬৩১ সালে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করলেও তার পর্যবেক্ষণে ত্রুটি ছিল। এর চেয়ে বড় কথা হলো তিনি এর আট বছর পরের শুক্র সরণটি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার হিসাব-নিকাশকে সংশোধন করে পরবর্তী শুক্র সরণের দিন তারিখ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সমর্থ হন আরেক প্রতিথযশা মেধাবী জ্যোতির্বিদ জেরেমিয়াহ হরকস্‌। তিনি সূর্য আর শুক্রের আকারের উপর ভিত্তি করে একটি প্যারালাক্স বা লম্বন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং তা থেকে পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে সমর্থ হন।

চিত্রঃ শুক্রের ট্রানজিট। সূর্যের সামনে শুক্রকে একটি বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তার ধারণা সঠিক ছিল না। এখন কী করা যায়? আমাদের তো সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব জানতে হবে। সেই লক্ষ্যে আরেক বিজ্ঞানী জেমস গ্রেগরি তার ‘Optica promota’ গ্রন্থে একটা ট্রানজিট শুরু ও শেষ হবার সময়কে হিসেবে ধরে আর সেই সাথে ত্রিকোণমিতির সূত্রকে কাজে লাগিয়ে একটা প্যারালাক্সের স্কেচ আঁকেন। এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভুবন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালি ১৫৭৭ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বুধের ট্রানজিট নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

তিনি ১৭১৬ সালে এক সম্মেলনে এই ধরনের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য সকল জ্যোতির্বিদদের অনুরোধ করেন। কারণ এ থেকে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্ব আরো নির্ভুলভাবে বের করা সম্ভব হবে। এবং আশা করেন যে, পৃথিবীর সকল জায়গা থেকেই পর্যবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হবে। হ্যালি যদিও অনেকদিন বেঁচে ছিলেন কিন্তু তিনি ১৭৬১ সালে সংঘটিত শুক্রের ট্রানজিট দেখে যেতে পারেননি।

১৭৫০ সালের দিকে জ্যোতির্বিদ মিখাইল লোমোনোসভ প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞানীকে ১৭৬১ সালের শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের সেরা সেরা টেলিস্কোপ আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন।

আমাদের লে জেন্টিল সাহেব French Academy of Science থেকে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচিত হলেন। তিনি ঠিক করলেন এই পর্যবেক্ষণের কাজ করার জন্য ভারতের ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে যাবেন। সেই লক্ষ্যে জাহাজে উঠলেন ১৭৬০ সালে। যেহেতু তখন সুয়েজ খাল বলে কিছু ছিল না তাই তাকে আফ্রিকা ঘুরে অনেক পথ অতিক্রম করে ভারতের পথে যেতে হবে। প্রায় পনের মাসের জাহাজ ভ্রমণ। ট্রানজিট হবে ১৭৬১ সালের জুন মাসে। তার আগেই তাকে পন্ডিচেরি পৌঁছতে হবে।

যাত্রাপথে তিনি থামলেন তখনকার Isle De France-এ, বর্তমানে যা Mauritis নামে পরিচিত। ১৭৬০ সালের মার্চে ফ্রান্স ছাড়েন আর মরিশাসে এসে পৌঁছেন জুলাইতে। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে পন্ডিচেরির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেন।

এই সময়ে তিনি জানতে পারেন, পন্ডিচেরিতে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের মধ্যে ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে। ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এবার তিনি একটা ফরাসী রণতরীতে উঠলেন যেটা যাচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের করোমানডেলে। হাতে আছে মাত্র তিন মাস।

কিন্তু এই না শুরু ভাগ্যের খেল। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন ব্রিটিশদের সাথে ফরাসীদের যুদ্ধের উন্নতির খবর পেয়ে জাহাজের নাক ঘুরিয়ে দিলেন আবার মরিশাসের দিকে। আর জেন্টিলকে জাহাজের উপর থেকেই শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের মহামূল্যবান উপদেশ দিলেন। বেচারা জেন্টিল আর কী করবে! জাহাজের উপর থেকেই কাজ চালালেন। কিন্তু জাহাজ তো নড়ছিল সবসময়ই। মাপজোখ সঠিক হলো না। তার পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো কাজেই আসবে না। হতাশ মনোরথে তিনি ফিরে এলেন মরিশাসে।

এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, আট বছর পরে আবার যে ট্রানজিট হবে তা তিনি এশিয়াতে থেকেই পর্যবেক্ষণ করবেন। এই সময় আর কোথাও যাবেন না। আট বছর থেকে যাবেন পন্ডিচেরির আশেপাশে। আবিষ্কারের নেশায় মানুষ কত কিছুই না করে। ১৭৬৯ সালের পর শুক্রের ট্রানজিট হবে আবার ১৮৬৯ সালে। মানে ঠিক একশ বছর পর। জেন্টিলের হাতে আর একবারই সুযোগ আছে।

সময় যেতে থাকলো। জেন্টিলও বসে রইলেন না। ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত, প্রাণীদের নমুনা এইসব সংগ্রহ করতে লাগলেন। মাটি, জোয়ার-ভাটা, চুম্বকত্ব, বায়ু ইত্যাদি সম্পর্কেও পড়াশুনা চালালেন। সাথে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যাটাও ঝালিয়ে নিলেন। বিখ্যাত মাদাগাস্তার দ্বীপে ঘুরাঘুরি করলেন এইসব কাজে।

চিত্রঃ জেন্টিলের গমনপথ।

সময় যায় আর শুক্রের সাথে তার অ্যাপয়নমেন্টও এগিয়ে আসে। এদিকে একাডেমী ঘোষণা দিলো যে, ফিলিপাইনের ম্যানিলা শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হবে। ম্যানিলা তখন ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ।

তিনি শেষমেশ ম্যানিলা যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৭৬৬ সালে একটা স্প্যানিশ জাহাজে চড়ে চলে এলেন ফিলিপাইনে। কিন্তু ফিলিপাইনে দিন খুব একটা ভালো কাটলো না। সেখানকার স্প্যানিশ গভর্নর তার সাথে বাজে ব্যবহার করলো এবং তাকে স্পাই ভেবে বসলো। ফলস্বরূপ ম্যানিলা থেকে বিতাড়িত জেন্টিল কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেন আবার সেই পন্ডিচেরিতে।

ভালো খবর এই যে, ইতোমধ্যে ফরাসী এবং ব্রিটিশদের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি হয়েছে। ব্রিটিশরাও তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো, এমনকি তাকে উন্নতমানের একটি টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণের অন্যান্য সব ব্যবস্থাও করে দিলো। তার হাতে এক বছর সময়। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আবহাওয়ার প্রতিও নজর রাখছেন।

১৭৬৯ সালের জুনের তিন তারিখ। ট্রানজিটের আগের দিন। ব্রিটিশ গভর্নরকে বৃহস্পতির দারুণ সব ভিউ দেখিয়ে সন্তষ্ট করালেন তিনি। পর্যবেক্ষণের জন্য মোটামুটি সবকিছুই তার অনুকূলে। ঐদিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কোনোমতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই চোখ বন্ধ করতে পারছিলাম না।’

পরদিন ট্রানজিটের সময়কাল জুড়ে হঠাৎ করেই সূর্যের সামনে কালো কালো মেঘ জমতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে কুয়াশা আর মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। ট্রানজিট শেষ হলো আর আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল। জেন্টিল হতাশায় নিমগ্ন হয়ে গেলেন। আট বছরের অপেক্ষা পুরো মাটি হয়ে গেল। কাটা গায়ে নুনের ছিটা হিসেবে সেদিন ম্যানিলার আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল। ঐ জায়গা ছিল ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য পারফেক্ট।

জেন্টিল তার জার্নালে লিখেন ‘আমি প্রায় দশ হাজার লিগ (এক লিগ প্রায় তিন মাইলের সমান) অতিক্রম করেছি। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজের মাতৃভূমি থেকে এতদূরে এসে রইলাম শুধু পর্যবেক্ষণের সময় সূর্যের সামনে এক টুকরো মেঘ দেখার জন্য? আমার কষ্ট আর ধৈর্য্যের ফলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যই যেন এই মেঘের আবির্ভাব হয়েছিল।’

এখানেই শেষ না। হতাশ, ক্লান্ত এবং ব্যর্থ জেন্টিল নয় বছর আগে ছেড়ে আসা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবার জন্য রওনা দিলেন। এখানে বলে নেই, রওনা হবার আগে তিনি ডায়রিয়াতে ভুগছিলেন। ফ্রান্সে যাবার পথে থামলেন মরিশাসে। সাল ১৭৭০। এখানে কিছুদিন থেকে আবার রওনা হলেন। এবার জাহাজ ‘কেপ অব গুড হোপ’ দ্বীপের কাছাকাছি জায়গায় ঝড়ের কবলে পড়ল। এবং ভাঙ্গা নড়বড়ে জাহাজ আবার ফিরে এলো মরিশাসে। সাল ১৭৭১।

এদিকে এখানে এসে ইউরোপে ফিরে যাবার জন্য কোনো জাহাজ পাচ্ছেন না। অনেক চেষ্টা আর খোঁজাখুঁজির পরে এক স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তাকে ইউরোপে নিতে রাজি হলো। এরপর কাডিজ নামক একটা বন্দর হয়ে ফ্রান্সে ফিরে এলেন ১৭৭১ সালের ৮ই আগস্ট। ১১ বছর পর।

কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। কাহিনীর নাটকীয়তা এবার চরমে। বহুদিন জেন্টিলের কোনো খবর না পাওয়ায় তার আত্মীয় স্বজনরা ধরে নিয়েছিল সে মারা গেছে। সে এসে জানল তার স্ত্রী অন্য একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। স্বজনরা তার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। অন্যদিকে একাডেমীতে তার সদস্যপদও অন্য একজনকে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

সম্পত্তি ফিরে পেতে জেন্টিল আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করল। তাকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে সে এখনো জীবিত! এই মামলা পরিচালনার জন্য যে টাকা দরকার তা ছিল মামলা পরিচালনা করার জন্য যে অ্যাটর্নি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার কাছে। অ্যাটর্নি আবার তার সাথে দেখা করতে আসার সময় ডাকাতদের কবলে পড়ে টাকা-পয়সা সব খোয়ায়।

মামলা পরিচালনার টাকা না থাকায় জেন্টিল হেরে যান। সম্পত্তি আর একাডেমীর সদস্যপদ হাতছাড়া হয়েই রইলো। বরং উল্টো তাকেই বিচারের রায়ে দণ্ডিত করা হয়। তবে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে মামলাটা একাডেমির বিরুদ্ধে ছিল। অবশ্য একাডেমি কিংবা আত্মীয় স্বজনদের দোষ ছিল না। তার এতদিনের বাইরে সফরকালে কোনো চিঠিই এসে ফ্রান্সে তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি।

তিনি আবার বিচারের জন্য আবেদন করেন। এবার রাজার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনি তার সদস্যপদ আর সহায়-সম্পত্তি ফিরে পান। কাহিনী শেষটুকু ভালোই। তিনি আবার বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে তার একটা কন্যাসন্তান হয়। শেষজীবনে এই কন্যার সেবা পেয়েই কাটে তার।

তবে আরো একটু দুঃখের খবর দেই। তার সংগৃহীত সকল প্রাকৃতিক নমুনা মরিশাস থেকে প্রথমবার ফ্রান্সে আসার সময় জাহাজ ঝড়ে কবলিত হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ১৯৩৫ সালে, বিজ্ঞানীরা তার নামে একটা লুনার ক্রেটারের নামকরণ করেন ‘লে জেন্টিল’। লুনার ক্রেটার হলো চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা বিভিন্ন গর্ত। জেন্টিলের নিজেরও কিছু অবদান আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানিক একশটি বস্তুর সেট- মেজার বস্তু, এম-৩২, এম-৩৬ এবং এম-৩৮ আবিষ্কার করেন। পাশাপাশি একটি নীহারিকার ক্যাটালগও তৈরি করেন তিনি।

তথ্যসূত্র

১. https://princetonastronomy.wordpress.com/2012/02/06/the-ordeal-of-guillaume-le-gentil

২. http://www.astroevents.no/venushist2aen.html

৩. https://thonyc.wordpress.com/2010/09/13/born-under-a-bad-sign

৪. https://www.youtube.com/watch?v=Qa8hFCoxx2E

featured image: astroevents.no