কেলাসিত বরফঃ বিমান যাত্রার অদৃশ্য হুমকি

২০০৯ সালে রিওডিজেনিরো থেকে ছেড়ে যাওয়া প্যারিস গামী ফ্লাইট ৪৪৭ উড্ডয়নের কিছু সময় পরই ঝড়ের কবলে পড়ে। প্রথমে ব্যাপারটি হালকাভাবে নেয়া হলেও যারা সে সময়ের পত্রিকার শিরোনাম গুলোতে চোখ বুলিয়েছিলেন তারা জানেন ব্যাপারটির শেষটা কতটা ভয়াবহ ছিল। এটা ছিল সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়ানক বিমান দুর্ঘটনা। ২২৮ জন যাত্রীর সকলেরই মৃত্যু ঘটে। আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ থেকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারকরতে লেগে যায় প্রায় দুই বছর। যখন ব্ল্যাকবাক্স বের করা হয় তখন সেখান থেকে সফটওয়ার ত্রুটি,পাইলটের অমনোযোগিতা সহ বিভিন্ন কারণ পাওয়া যায়। কিন্তু ছোট্ট একটি কারণ সমগ্র ব্যাপারটিকে নতুন একটি তাৎপর্যপূর্ণ  দিকে  আলোকপাত  করে।

বায়ুর গতিবেগ মাপার জন্য ব্যবহৃত ‘পিটটটিউব’ নামে একটি যন্ত্রাংশে বরফের প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যায়। কিন্তু সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ফুট উপরে এমনটি হওয়ার কথা নয়। আবহাওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান বলে, সচরাচর এই উচ্চতায় পানি জমে বরফের কেলাস হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু  ফ্লাইট ৪৪৭-ই একা নয়। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে

আকাশ থেকে বিমান পতনের সবচেয়ে ভয়ানক কারণ এই বরফের প্রতিবন্ধকতা বা‘কেলাসিত বরফ’।

পঞ্চাশের দশকের আগ পর্যন্ত বিমান পতনের কোনোকারণ বের করা সম্ভব হয়নি। তারপর বেশ কিছু গবেষণা হলেও সেগুলোর ফলাফল স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। এরপর ১৯৯৪ সালে আমেরিকান ঈগল ফ্লাইট ৪১৪৪ ইন্ডিয়ানার উপর দিয়ে যাবার সময় অজানা জমাট বরফের কারণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে সয়াবিনেরবাগানে পতিত হলে এ ঘটনা আবারো চিন্তার উদ্রেক করে। উল্লেখ্য,এই দূর্ঘটনায় ৬৩ যাত্রীর সকলেই মৃত্যুবরণ করে। এ ব্যাপারে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন(FAA)তদন্ত শুরু করে এবং পরবর্তীতে আরো ৩২ টি ঘটনা র ক্ষেত্রে এমন ব্যাপার আবিষ্কার করে। তাদের তদন্তে অতিউচ্চতায় ইঞ্জিনের হঠাৎ থেমে যাওয়া,সেন্সরের অদ্ভুতত্রুটি ,রহস্যজনক ভারীবৃষ্টির আবির্ভাব ,আকাশ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং রাডারে আবহাওয়া পরিবর্তনের কোনো আভাস না পাওয়া ইত্যাদি অদ্ভুত সব সমস্যার দেখা মিলে।

untitled-4

কানাডার আবহ-পদার্থবিদ ওয়াল্টারস্ট্যাপ বলেন ‘লোকজন বুঝতেই পারেনা ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে। অতি উচ্চতায় পানির জমাট বেঁধে যাওয়া নিয়ে বিভিন্নতত্ত্ব আছে।’ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাইলট ১০ হাজার ফুট(৩০০০মিটার) এর নীচে ইঞ্জিনকে আবার চালু করতে সক্ষম হন। এবং যাত্রীরা সেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান যদি ও তাদেরকে ভয়ানক ঝাঁকুনির অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে হয়। তবে একটা ক্ষেত্রে ইঞ্জিন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় আর পাইলট কোনোমতে বিমান কে অবতরণ করতে সক্ষম হন।

FAA-র তদন্তে পাওয়া যায় ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দেয় এক ধরনের জমাট বরফের কারণে।যদিও শুধুমাত্র বিমানের উত্তপ্ত অংশগুলোতেই কেন প্রভাব ফেল তোতা বুঝা যায় নি। সাধারণভাবে পানি জমাট বেঁধে বরফ হবার কারণ হিসেবে ধরা হয়-পানি যখন বিমানের শীতলঅংশে আসে তখন তা অতিহিমায়িত হয়ে বরফে পরিণত হয়। পাইলটরা বিমানের উইনশিল্ডের উপর এ ধরনের জমাট বরফ দেখতে পান। কানাডার ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের বিজ্ঞানী ভ্যানফুয়েলকিবলেন,‘এটা খুবই স্পষ্ট। এটা শুধু মাত্র ২২ হাজার ফুটের নীচে ঘটে এবং জমাট বৃষ্টির ব্যাপারটি রাডারেও দৃশ্যমান হয়।’ আর সে জন্য বিমানে নতুন ধরনের সেন্সর লাগানো হয় যাতে করে পাখা হতে বরফ-অপসারকস্প্রে করা যায়।

কিন্তু এসবের কিছুই কেলাসিত বরফের ক্ষেত্রে খাটে না। স্বাভাবিক বরফজমাট বাঁধার পদ্ধতি থেকে ভিন্ন এক পদ্ধতিতে স্ফটিক বরফ জমাট বাঁধে।এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পানি আর তরল থাকতে পারে না।

মূল সমস্যা সৃষ্টি করে কেলাসিত বরফের ছোট ধূম বা কণা গুলো।এদের ব্যাস ৪০ মাইক্রোমিটারের মতো। এগুলো বৃষ্টিপরিমাপক রাডারে ও ধরা পড়েনা। এই কেলাসগুলো কঠিন হবার দরুন বিমানের উইনশিল্ড এবং অন্যান্য অংশ আঘাত প্রাপ্ত হয়। যখনই বিমানের উত্তপ্ত অংশ যেমন ইঞ্জিন কিংবা পিটটটিউবের সংস্পর্শে আসে তখনই এরা গলতে শুরু করে। মাঝে মাঝে গরম উইনশিল্ডে লেগেও এরা গলে যায় আর ফলশ্রুতিতে একধরনের অদ্ভুত বৃষ্টি দেখা দেয়। এরকথা প্রতিবেদন গুলোতে পাওয়া যায়।

untitled-4

এসব কেলাসের একটি স্তর গলতে শুরু করলে আরো কেলাস তৈরি হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এরা ইঞ্জিনের উপর জমতে থাকে এবং এইস্তূপীকৃত কেলাস গুচ্ছ ইঞ্জিনকে ক্ষতি গ্রস্তকরে দেয়। সেন্সরের মধ্যে সৃষ্টকেলাস আরো ভয়ানক ক্ষতি করে। ফ্লাইট ৪৪৭ এর ক্ষেত্রে বরফের কেলাস পিটটটিউবকে অবরুদ্ধ করে দেয় যার কারণে এটি ভুল পাঠ দেয়া শুরু করে। ফলস্বরূপ অটো-পাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মূল পাইলটরা ও বিভ্রান্ত হয়ে তাদের স্বাভাবিক ট্রেনিং এর বিপরীত ব্যবস্থা নিতে থাকে। তারা মনে করে ছিল বিমানটি তার উচ্চতা হারাচ্ছে। সেই কারণে বিমানটিকে তারা কৌণিক ভাবে উর্দ্ধগামী করে দেন যা বিমানটিকে একেবারে থামিয়ে দেয়।

বিমান দূর্ঘটনার কারণ হিসেবে যতই কেলাসিত বরফকে দায়ীকরা হয় ততই ব্যাপারটি স্পষ্ট হতে থাকে এবং গ্রহণযোগ্য কিছু কারণ ও পাওয়া যায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত নাসার একটি প্রতিবেদন FAA এর পূর্বেকার অনুমান সংশোধন করে বলে যে,

১৯৮০ সাল থেকে প্রায় ১৪০ টি ঘটনার সাথে এই কেলাস বরফ সংশ্লিষ্ট এবং প্রতিবেদনটি একে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখার জন্য সাবধান করে দেয়।

সুতরাং বিমানের ইঞ্জিন নতুন ভাবে নকশা করার এটাই উপযুক্ত সময় যেন এ ধরনের কেলাসিত বরফ বিমানের কোনোরূপ ক্ষতি করতে না পারে। এউদ্দেশ্যেই ২০০৬ সালের একটি মাল্টিন্যাশনাল প্রোগ্রামে নাসা ,ন্যাসনালরিসার্চ সেন্টার- কানাডা,এয়ারবাস ও বোয়িং সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যোগ দিয়েছিল। কিন্তু ইঞ্জিন ডিজাইন করার আগে তাদের জানা দরকার ছিল কীভাবে উত্তপ্ত ইঞ্জিনে এই কেলাসিত বরফ দানা বাঁধে। তার মানে ঠিক একই পরিস্থিতি ল্যাবে সৃষ্টি করতে হবে। ওহায়োও’ রক্লিভল্যান্ডে অবস্থিত নাসারল্যাবে হিমশীতল তাপমাত্রা সহ ঘণ্টায় একশত মাইল গতিবেগের বাতাস এবং খুবই অল্প চাপের ব্যবস্থা করা হয় যে রকমটি একটি বিমান ৩০ হাজার ফুট উপরে সহ্য করে।

প্রায় এক বছর কাজকরার পর,কেলাসিত বরফ বিশেষজ্ঞ জুডিভ্যানজ্যান্টে এবং এরোস্পেস প্রকৌশলী অ্যাশলিফ্রেজেল একটি ‘আইসবার’-এর বিন্যাস করতে সক্ষম হন যা মিনিটের মধ্যে কেলাসিত বরফের মতো একইরকম আকৃতি এবং ঘনত্ব বিশিষ্ট কেলাস তৈরি করে ইঞ্জিনের মধ্যে দিয়ে স্প্রে করতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেগুলো গরম ব্লেডের উপর জমতে শুরু করে। কিন্তু পরিকল্পনা মতো কাজ এগোলো না। তারা যখন বরফ-মেঘ জেনারেটর (তৈরিকৃত যন্ত্র) চালু করলেন তাতে একটি প্রতিবন্ধকতা দেখা দিল। সৃষ্টি হওয়া কেলাস বরফগুলো বালু-বিস্ফোরক কণার মতো আচরণ করা শুরু করল এবং সংবেদনশীল পরিমাপক যন্ত্র গুলোকে নষ্ট করে দিল। যে সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়নি সেগুলো ভুল পরিমাপ দিতে থাকল।ভ্যানজ্যান্টে বলেন ‘আমাদের আরো উন্নত মানের এবং শক্তিশালি কোনো যন্ত্র নির্মাণ করতে হবে।’

তাদের কাজ বরফ জমাট বাঁধার একটি জটিল কাঠামো উন্মোচন করল। বরফের কেলাস গুলো প্রথম দশাতেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং ছোট ছোট কণার মেঘ তৈরি করে। তাদের এই সমীক্ষা ভিত্তিক মডেল কে কার্যকরী মডেলে রূপান্তর করা পদার্থবিদ্যার এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। এখনকার জন্য তারা নতুন একটি সহজ মডেল তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন যেন বরফ তৈরির ঝুঁকি কিছুটা কমে আসে।

‘একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক মডেল বানাতে হয়তো আরো বছর দশেক লাগবে’ ফ্রজেল বললেন। এরপর মডেলটিকে ইঞ্জিনে পুনরায় রূপ দিতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে। কিন্তু বিমানকে আকাশে উড্ডয়নে ধরে রাখতে এবং এই রহস্যজনক কেলাসিত বরফের সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের একটি তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন।

বোয়িং কোম্পানি পূর্বে এই কেলাসবরফ এবং ক্ষীয় মাণ পরিচলন ঝড়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে ছিল। এই ঝড় ব্জ্রপাত সহকারে বিশাল পরিমাণ পানি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে যায় যা সাধারণ বৃষ্টিপাতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে, এই ঝড় গুলোর জন্য তাপ প্রয়োজন যার কারণে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসা ঝড়গুলো অপেক্ষাকৃত উষ্ণতর অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে।

টমরাটভ্‌স্কি এবং তার সহকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিলেন,সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই ব্যাপারটি একে বারে একই পরিস্থিতিতে সরাসরি বিমানচালিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তারা যুতসই আবহাওয়ায় সেন্সরযুক্ত একটি জেটপ্লেন সমস্যাযুক্ত হটস্পটে চালিয়ে দেখলেন আর ফলাফলও পেলেন। পরিকল্পিত ভাবে জেট প্লেনকে তথাকথিত High Water Ice Condition(HWIC) এর মধ্যে দিয়ে চালিয়ে দেখলেন তাপমাত্রা হিমাংকের ও নীচে নেমে যায় যা কেলাস বরফ সৃষ্টি করার জন্য একদম আদর্শ। রাটভস্কি HWIC এবং পরিচলন ঝড়ের মধ্যকার সম্পর্ককে নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। তিনি আবিষ্কার করেন,পরিচলন ঝড় পানির কণাগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ অক্ষাংশে তাড়িয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এব্যাপারটি কেবল মাত্র তখনই ঘটে যখন ঝড় কমতিরদিকে থাকে। কেন কমতির দিকে থাকলে এই ব্যাপারটি ঘটেতা জানা সম্ভব হয় নি। এটা আশা করা যায়,সবগুলো তথ্য এক ত্রক রলে HWIC সম্পর্কিত বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। গবেষকরা স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে কোথায় কোথায় কেলাসিত বরফ সৃষ্টিহতে পারে তার পূর্বাভাস দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেইসাথে রাডারের মাধ্যমেও এর শনাক্ত করণের জোর চেষ্টা চলছে। আর হয়তো কয়েক বছরের মধ্যের ইঞ্জিনেরপুনঃনকশাও করা যাবে।

অদৃশ্য হত্যাকারী

ফুয়েল কি এবং তার দল সফলভাবে বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দুটি সেন্সর তৈরি করতে সক্ষম হন। প্রথমটি, একটি বিয়ার ক্যানের আকৃতির যন্ত্র যারনাম দেয়া হয়েছে পার্টিক্যাল আইস প্রোব,যা বিমানের বাইরের দিকে লাগানো যাবে। এটি বাতাসের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে ছোটছোট কণার উপস্থিতি শণাক্ত করতে পারে। এটি আসলে বিমানের ধ্বংসাবশেষ শণাক্তকরণের জন্য বানানো হয়েছিল। কিন্তু দলটি একে পরিবর্তন করে কেলাসিত বরফের বিশেষ সংকেত শনাক্ত করণের কাজেলাগাতে সক্ষম হয়। অন্য যন্ত্রটি একটি শব্দোত্ত র জমাট-বরফ শনাক্তকরণের সেন্সর। এটি সরাসরি ইঞ্জিনেরভেতর কার জমাট বরফ পরিমাপ করতে পারে। কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথেসাথে পরিবর্তিত হয়। দুটো যন্ত্রই এতটা উন্নত যে জনাব ফুয়েলকি এগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার কথা ভাবছেন।

কিন্তু বিমানে এই সেন্সর আর রাডার লাগানোর পর ও মূল সমস্যার সমাধান হলো না। একটা কারণ হলো,এখনো কেলাসিত বরফের প্রকৃত পরিমাণ মাপা সম্ভব হয়নি। যার ফলে এখনো বিমান দূর্ঘটনা ঘটেই চলছে। উদাহরণস্বরূপ,২০১৪ সালের এয়ার আলজেরিয়ার ফ্লাইট ৫০১৭ এর কথা বলা যায় যেখানে ১১৬ জনের মতো যাত্রী মারা যায়।

ফ্লাইট ৪৪৭ এর পিটটটিউব অবরুদ্ধ হবার কথা ব্ল্যাকবাক্সের মাধ্যমে জানাসম্ভব হলেও একই রকম অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে সেটাও জানা সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে বিমানের অল্পবিস্তর ক্ষতি সাধিত হয়ে ইঞ্জিন আবার পুনরায় সচল করা সম্ভব হয়। কিন্তু ঠিক কী কারণে ১০ হাজার ফুটের নীচে আসলেই কেলাসিত বরফের সকল চিহ্ন উধাও হয়ে যায় তা জানা সম্ভব হয়নি।

সমস্যাটি আরো প্রকোপ আকার ধারণ করার সুযোগ আছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী দিনদিন উত্তপ্ত হচ্ছে যার ফলে আবহাওয়ার অস্থিরতাও বাড়ছে। আর এমন পরিস্থিতিতে কেলাসিত বরফসৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ও প্রবল। যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটিঅবরিডিং’ এর আবহাওয়া বিদ সুগ্রেবলেন, ‘এ অবস্থা আরো সক্রিয় হবে এবং বারবার ঘটবে’। সাম্প্রতিক কালে রোলসরয়েস ইঞ্জিন ল্যাবের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে কেলাসিত বরফ আরো প্রসার লাভ করবে এবং সহজেই সৃষ্ট হতে পারবে। এই কোম্পানির এক ইঞ্জিন বিশেষজ্ঞ ররিক্লার্কসন কোম্পানিকে এক অসুবিধা জনক কিন্তু নিরাপদ উপায় বাতলে দেন।তাহ লো,‘খারাপ আবহাওয়ায় বিমান উড্ডয়ন বন্ধরাখুন’।

তথ্যসূত্র

Hot Ice:The Invisible threat making planes fall out of the sky, New Scientist

https://www.newscientist.com/article/mg23130800-700-hot-ice-the-race-to-understand-a-sinister-threat-to-aircraft/

 

মৃতদেহের রূপান্তর প্রক্রিয়া

জনের মৃত্যুর পর প্রায় চার ঘন্টা কেটে গেছে। মৃতদেহ সৎকারের জন্য আনা হয়েছে। জীবনের বেশিরভাগ সময়ে সুস্থ থাকা জন কাজ করতেন টেক্সাসের তেল খনিতে। কাজের ধরনের জন্যই শারীরিকভাবে ছিলেন বেশ কর্মঠ আর শক্তিশালী। বছর দশেক আগেই ধূমপান আর মদ্যপান দুটোই ছেড়েছিলেন। তবুও একসময় হঠাৎ তার শরীরের অবনতি হতে থাকে এবং তারপর জানুয়ারির এক হিমশীতল সকালে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

এই মুহুর্তে তার মৃতদেহ রাখা হয়েছে সৎকারকর্মীর একটি ধাতব টেবিলে। ঠাণ্ডা আর প্রায় শক্ত হয়ে আসা শরীর আর ত্বকের ধূসর রক্তাভ বর্ণ ইতিমধ্যেই পচন শুরু হবার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমাদের কেউই সাধারণত মৃত্যুর পর নিজের কিংবা পরিচিতজনদের দেহের কি হাল অবস্থা হবে তা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি না। বেশিরভাগ মানুষই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। ঐতিহ্য অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়। মাঝে মাঝে হিমাগারে রেখে কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে মৃতদেহ কিছু সময়ের জন্য তাজা রাখার চেষ্টা করা হয়, যা শবের পচন প্রক্রিয়াকে কিছুক্ষণের জন্য ধীর করে দেয়। অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবশ্য ফরেনসিক সায়েন্স ব্যবহার করা হয় যেন মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সময়, কারণ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সম্বন্ধে জানা যায়। এক্ষেত্রে শবের পচনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপকে কাজে লাগানো হয়।

মরদেহ নিজে মৃত হলেও তা অন্য অনেক জীবের জীবনের সূচনা করে। অনেক বিজ্ঞানী মৃতদেহকে জটিল বাস্তুতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ বাস্তুতন্ত্র মৃত্যুর ঠিক পরপরই শুরু হয়। ধীরে ধীরে দেহকে পচিয়ে ফেলার মাধ্যমে এই তন্ত্র বিস্তার লাভ করে।

আত্ম-পরিপাক

‘অটোলাইসিস’ বা ‘আত্ম-পরিপাক’ নামে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় মৃত্যুর কয়েক মিনিট পর থেকেই মৃতদেহে পচন শুরু হয়। হৃৎস্পন্দন বন্ধ হবার সাথে সাথে কোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। কোষের অম্লতা বেড়ে গিয়ে বিষাক্ত পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এনজাইম কোষপর্দাকে হজম করে কোষের ভাঙ্গনের সূত্রপাত ঘটায়। এটা সাধারণত যকৃতেই প্রথম ঘটে, কেননা যকৃতে এনজাইমের পরিমাণ বেশি থাকে। রক্তকণিকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী ভেদ করে বের হয়ে আসে এবং অভিকর্ষের টানে কৈশিক নালিকা, ছোট শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে যায়। এতে করে মৃতদেহের চামড়া বিবর্ণরূপ ধারণ করতে থাকে। পাশাপাশি দেহের তাপমাত্রাও পড়তে শুরু করে। এরপর দেখা যায় ‘রিগর মর্টিস’- যার কারণে চোখের পাতা, চোয়াল, ঘাড়ের পেশী, হাত, পা সব শক্ত হয়ে যায়। জীবিত অবস্থায় আমাদের পেশীতে থাকা অ্যাকটিন আর মায়োসিন নামে দুটি সূত্রবৎ প্রোটিনের কারণে আমরা পেশী সংকুচিত-প্রসারিত করতে পারি। কিন্তু মারা যাবার পর পেশীতে শক্তি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবার কারণে এ প্রোটিনগুলো এক জায়গায় আটকা পড়ে যায়, ফলে পেশীসহ বিভিন্ন অস্থিসন্ধিকে নড়নে অক্ষম করে ফেলে।

মৃতদেহ থেকে নির্গত তীব্র গন্ধ প্রায় ৪০০ রকমের উদ্বায়ী জটিল রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে গঠিত। এই গ্যাস মিশ্রনের সঠিক গঠন মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। শব-বাস্তুতন্ত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য থাকে। আমাদের শরীর কিন্তু অসংখ্য ব্যাকটেরিয়ার পোষক হিসেবে ভূমিকা রাখে।

অনাক্রম্যতার অবসান

বেঁচে থাকাকালে দেহের বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অণুজীবমুক্ত থাকে। মৃত্যুর কিচ্ছুক্ষণের মাঝেই দেহের অনাক্রম্যতা বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে অণুজীবগুলো সুযোগ পেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র আর বৃহদান্ত্রের সংযোগস্থলে অণুজীবগুলোর আক্রমণ শুরু হয়। অন্ত্রের অণুজীব অন্ত্রকে হজম করে ফেলে। এরপর চারপাশের কোষকে হজম করতে করতে ভিতর থেকে বাইরের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত কোষ থেকে নির্গত রাসায়নিক মিশ্রণকে এরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

২০০৪ সালের আগস্টে ‘আলাবামা স্টেট ইউনিভার্সিটির’র ফরেনসিক বিজ্ঞানী গুনাল্‌জ জাভান এবং তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো ‘থ্যাটানোমাইক্রোবায়োম’ নামে নতুন একটি বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। গ্রীক শব্দ ‘থ্যাটানোস’ অর্থ ‘মৃত্যু’। জাভান ও তার দল মৃত্যুর পর ২০ থেকে ২৪০ ঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রায় ১১ টি মৃতদেহ থেকে যকৃত, প্লীহা, মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। তারা ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের দুটি ভিন্ন পদ্ধতির সাথে জৈবতথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে প্রতিটি নমুনার ব্যাকটেরিয়াল বস্তুর বিশ্লেষণ করে দেখেন। এর আগে ‘ইঁদুরের মৃতদেহ পচনপ্রক্রিয়া’ সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, মৃত্যুর পর দেহে থাকা অণুজীবগুলোর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলেও তা একটি সুনির্দিষ্ট এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে। এতে করে গবেষকরা মৃত্যুর তিন দিন থেকে তিন মাসের মধ্যে মৃত্যুর সময় সম্পর্কে একটি সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য ধারণা দিতে পারেন।

ব্যাকটেরিয়া পর্যবেক্ষণ

জাভান লক্ষ্য করে দেখেন, মৃত্যুর বিশ ঘন্টার মধ্যে ব্যাকটেরিয়াগুলো যকৃতে এসে পৌঁছায় এবং প্রায় ৫৮ ঘন্টার মধ্যে এরা সংগৃহীত নমুনাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এর অর্থ ব্যাকটেরিয়াগুলো একটি সুশৃঙ্খল নিয়মানুসারে মৃতদেহের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করে। এর ফলে কত সময়ের মাঝে এরা এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে পরিব্যাপ্ত হয় তা ব্যবহার করে মৃত্যুর পর কত সময় অতিবাহিত হয়েছে তা জানার একটা পথ খুলে যায়। জাভান বলেন- ‘মৃত্যুর পর দেহে থাকা ব্যাকটেরিয়ার কার্যপ্রণালী বদলে যায়। এরা হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং এক সময় প্রজনন সম্পর্কিত অঙ্গগুলোকেও ধ্বংস করে ফেলে। একটা বিষয় পরিষ্কার যে, ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন মৃতদেহ পচনের বিভিন্ন ধাপের সাথে সম্পর্কিত।’

প্রাকৃতিক ক্ষয়

অধিকাংশ মানুষের কাছে পচা, গলিত লাশের বীভৎস দৃশ্য অনেকটা বিরক্তিকর ভয়ানক দুঃস্বপ্নের মতো। কিন্তু কিছু গবেষকের কাছে বিষয়টি এতটা বিভীষিকাময় নয়। যেমন ‘সাউথঈস্ট টেক্সাস এপ্লাইড ফরেনসিক সায়েন্স’ ফ্যাকাল্টির গবেষকদের জন্য এটা নিতান্ত মামুলি ব্যাপার। ২০১১ সালের শেষের দিকে গবেষক সিভিল রুচেলি, অ্যারন লিন আর তাদের সহকর্মীরা ফ্যাকাল্টির একটা নির্দিষ্ট স্থানে দুটি নতুন মৃতদেহ এনে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয় হবার জন্য রেখে দেন।

মৃতদেহে যখন আত্ম-পরিপাক প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং একইসাথে ব্যাকটেরিয়াও আন্ত্রিক অংশে বিস্তার করে তখনই শুরু হয় ‘পচন প্রক্রিয়া’। এটাকে বলা হয় মৃতদেহের ‘আণবিক মৃত্যু’। নরম টিস্যুর ভাঙ্গনের মাধ্যমে তরল, গ্যাস কিংবা লবণে পরিণত হওয়া ইত্যাদি- এসবই দেহের আণবিক মৃত্যুর সূচনা করে।

এ পচন প্রক্রিয়া অক্সিজেন নির্ভর এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সাথে সম্পর্কিত। ব্যাকটেরিয়াগুলো দেহকে খেতে শুরু করে আর দেহে থাকা চিনিজাতীয় পদার্থকে গাঁজানোর মাধ্যমে মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়াসহ বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থ জমা করতে থাকে। ফলে মৃতদেহ ফুলে যায়। এ ফুলে যাওয়াকে বলা হয় ব্লোটিং (Bloating)। এর পরের ধাপে শুরু হয় বিবর্ণতা। ক্ষতিগ্রস্ত নালী থেকে নির্গত রক্তকণিকার মাঝে থাকা হিমোগ্লোবিনকে এক ধরনের অবাত ব্যাকটেরিয়া (বেঁচে থাকার জন্য যাদের অক্সিজেন অপরিহার্য নয়) সালফো-হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত করে। এদের উপস্থিতির কারণেই চামড়া শক্ত, সবুজাভ-কালো বর্ণ ধারণ করে।

বিশেষ ধরনের আবাসস্থল

দেহের ভেতরে গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে নরম এবং আলাদা হয়ে যাওয়া চামড়া ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। এক পর্যায়ে গ্যাস এবং তরলীকৃত টিস্যু বিশোধিত হয়ে দেহের মলদ্বারসহ অন্যান্য ছিদ্রাংশ সহ অন্যান্য ছেঁড়া চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসে।‘ব্লোটিং’ বা ফুলে যাওয়াকে পচন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক এবং শেষ ধাপের মধ্যে একটি চিহ্নিত অংশ হিসেবে ধরা হয়। সাম্প্রতিক আরেক পরীক্ষায় জানা যায়, এ রূপান্তর কিছু বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন লক্ষ্য করার মাধ্যমেও চিহ্নিত করা যায়। একজন পতঙ্গবিশারদ হিসেবে বুচেলি প্রধানত পোকামাকড় কীভাবে মৃতদেহে উপনিবেশ গড়ে তুলে সে ব্যাপারে আগ্রহী। তিনি লক্ষ্য করেন, মৃতদেহ কিছু বিশেষ ধরনের নেক্রোফ্যাগাস (মড়া-ভক্ষক) পতঙ্গের আবাসভূমি। এবং এদের সমগ্র জীবনচক্র মৃতদেহকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

শূককীট চক্র

দুই প্রজাতির মাছি মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়ার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। মৃতদেহ থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধময় এবং একইসাথে পল্কা-মিষ্টি গন্ধ ছড়ায় যা এই মাছিগুলোকে আকৃষ্ট করে। এরা এসে মৃতদেহের উপর বসে এবং খোলা ক্ষত স্থানে ডিম পাড়া শুরু করে। প্রতিটি মাছি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে প্রায় ২৫০ টি ডিম দেয় এবং এই সময়ের মাঝে ডিম থেকে শূককীট বের হয়ে আসে। এরা পচা মাংস ভক্ষণ করে বড় শূককীটে পরিণত হয়। কয়েক ঘন্টা বাদে খোলস নির্মোচন করে আরো খাদ্য গ্রহণ করে বড় আকারের মাছিতে পরিণত হয়। এ মাছিগুলো আবার ডিম পাড়া শুরু করে এবং এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত খাবার জন্য কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকে। এ মাছিগুলোর উপস্থিতি আবার অন্যান্য শিকারী প্রাণীকে মৃতদেহের অবস্থানের নিশানা দেয়। গুবরে পোকা, পরজীবী কীট, পিঁপড়ে, বোলতা, মাকড়সা এসে মৃতদেহে ভাগ বসানো শুরু করে। শকুন এবং বাকি আবর্জনা-ভুক এবং মাংসাশী জীবও মৃতদেহ ভোজনক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ ছাড়ে না।

প্রতিটি মৃতদেহেরই একটি অনন্য অণুজৈবনিক ভূমিকা আছে। মৃতদেহে অণুজীব-সম্প্রদায়ের গঠন, তাদের আন্তঃসম্পর্ক, পচনপ্রক্রিয়ার উপর তাদের প্রভাব ইত্যাদি ব্যাপারে আরো বিশদ ধারণা একদিন ফরেনসিক দলকে কোথায়, কীভাবে একজন মানুষ মারা গেল সে সম্পর্কে নিখুঁতভাবে জানতে সাহায্য করবে।

মৃতদেহের ডিএনএ সিকুয়েন্সিং কিংবা এতে লেগে থাকা মাটির ধরণ অপরাধ তদন্তকারীদের অপরাধস্থলের ভৌগোলিক অবস্থান, সূত্র খোঁজার এলাকা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যাপারে সহায়তা করে।

উন্নত-উর্বর মাটি

মানবদেহ প্রায় ৫০-৭৫% পানি দিয়ে গঠিত। শুষ্ক দেহের প্রতি কেজি হতে প্রায় ৩২ গ্রাম নাইট্রোজেন, ১০ গ্রাম ফসফরাস, ৪ গ্রাম পটাশিয়াম আর ১ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম মাটিতে মুক্ত হয়। প্রথমদিকে এ কারণে মাটির উপরিভাগের কিছু ছোট গাছপালা মরে যায়। নাইট্রোজেনের বিষাক্ততা কিংবা দেহনির্গত এন্টিবায়োটিক পদার্থের জন্য এমনটি হয়ে থাকতে পারে। তবে সব মিলিয়ে মৃতদেহের জৈবিক রূপান্তর মাটিকে করে তোলে উন্নত আর উর্বর। পাশাপাশি এ পচনপ্রক্রিয়া চারপাশের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের জন্যও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া কবরের মাটি পরীক্ষা করে মৃত্যুর সময় বের করার একটা সম্ভাব্য উপায় আছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। পচন প্রক্রিয়ার ফলে মৃতদেহে সংঘটিত রাসায়নিক পরিবর্তন সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, লাশ থেকে নির্গত লিপিড-ফসফরাস ৪০ দিন পর্যন্ত মাটির সাথে মিশতে থাকে যেখানে নাইট্রোজেন আর পৃথকযোগ্য ফসফরাস সময় নেয় প্রায় ৭২ থেকে ১০০ দিন। এ প্রক্রিয়ার আরো গভীর বিশ্লেষণ এবং কবরের মাটির বায়োরাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে হয়তো একদিন বের করা যাবে কতদিন আগে কোনো দেহকে মাটিতে কবরস্থ করা হয়েছে।

চিত্রঃ মৃতদেহের বিভিন্ন খনিজ পদার্থ মাটিকে জৈবশক্তি সম্পন্ন করে তোলে।

বলে রাখা ভালো, মমিকৃত লাশও একসময় পচনের শিকার হয়। কিন্তু এটা নির্ভর করে ঠিক কখন কোন পদ্ধতিতে মৃতদেহটিকে মমিকরণ করা হয়েছে তার উপর। তাছাড়া কফিনের ধরণ, কবর দেয়ার প্রক্রিয়ার উপরও মমিকৃত লাশের পচনের সময়সীমা নির্ভর করে।

আমাদের শরীরকে বলা যায় শক্তির এক আঁধার। যে শক্তি দেহের মধ্যে আটকা পড়ে অপেক্ষা করছে কখন মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। জীবিত অবস্থায় আমাদের শরীর তার অগণিত অণু-পরমাণুতে এ শক্তি ধরে রেখে স্থিতিশক্তি হিসেবে ব্যয় করে। এভাবেই দেহ নিজেকে শক্তির সাহায্যে প্রতিনিয়ত সচল রাখে।

তাপগতিবিদ্যার সূত্রানুসারে, শক্তি সৃষ্টি হয় না আবার ধ্বংসও হয় না। কেবল এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হয় মাত্র। মহাবিশ্বে মোট মুক্ত শক্তির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অন্যভাবে বলা যায়, বস্তু প্রতিনিয়ত ভেঙ্গে পড়ছে আর তাদের ভর রূপান্তরিত হচ্ছে শক্তিতে। মৃতদেহের পচনপ্রক্রিয়া যখন চুড়ান্তরূপ ধারণ করে তখন এটা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের সকল পদার্থই এই মৌলিক

আইন অনুসরণ করে চলে। আমাদের শরীর নশ্বর; পচনের মাধ্যমে এটা চারপাশের বস্তুজগতের সাথে ভারসাম্য তৈরি করে এবং অন্যান্য জীবিত প্রাণীর বেঁচে থাকায় সহায়তা করার জন্য পরিণত হতে থাকে শক্তিতে। যে শক্তি ছড়িয়ে পড়ে ছাই থেকে ছাইয়ে, ধূলা থেকে ধূলাতে।

(মোজাইক সায়েন্স, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ফিউচার-সহ বিভিন্ন বিখ্যাত অনলাইন পত্রিকাতে প্রকাশিত মোহেব কস্ট্যান্ডির প্রবন্ধ ‘This is what happens after you die’ এর সংক্ষেপিত বঙ্গানুবাদ)

এবারের ইগ নোবেল

২০১৬ সালের ‘ইগ নোবেল’ পুরস্কার ঘোষণা করা হয় গত সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ। ১৯৯১ সাল থেকে ‘প্রথমে হাসুন আর তারপর ভাবুন’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতি বছর বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে আজব ও অদ্ভুত আবিষ্কারের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। ‘ইগ নোবেল’ শব্দটি ইংরেজি ‘Ignobel’ আর ‘Nobel Prize’ এর মিশ্রণ থেকে এসেছে।

মূলত নোবেল পুরস্কারের প্যারোডি হিসেবে এ পুরস্কারের প্রচলন শুরু করে দ্বিমাসিক রঙ্গ-ব্যাঙ্গ সাময়িকী ‘Annals of Improbable Research’ এর সম্পাদক ও যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা মার্ক আব্রাহামস। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটারে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা শাস্ত্রসহ দশটি ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০১৬ সালে ছাব্বিশতম বছরে পা রাখলো ‘ইগ নোবেল’ পুরস্কার।


পুরস্কারের অর্থমূল্য ধরা হয় দশ ট্রিলিয়ন জিম্বাবুয়ান ডলার! এখানেও আছে ব্যাঙ্গাত্মক ইঙ্গিত। জিম্বাবুয়ান ডলারের মূল্যমান অনেক কম। জিম্বাবুয়ের দশ ট্রিলিয়ন ডলার শুনতে অনেক বিশাল মনে হলেও এর সমমানের মার্কিন ডলার খুব বেশি হবে না।
এ বছরের বিভিন্ন শাখায় দেয়া ইগ নোবেল নিয়ে আলোচনা করা হলো।

প্রজননঃ

মিশরের প্রয়াত আহমেদ শফিক এবারের ইগ নোবেল জিতে নেন এই বিভাগে। পলিস্টার প্যান্ট ইঁদুরের যৌন জীবনে কী ভূমিকা রাখে সে বিষয়ে গবেষণা করার জন্য এই পুরষ্কারে ভূষিত হন তিনি। পলিস্টার, সুতি আর পশমি প্যান্ট পরিয়ে ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালান তিনি। পরে মানুষের উপরও একই গবেষণা করেন। এ বিষয়ে ১৯৯৩ সালে ‘জার্নাল কন্ট্রাসেপশন’-এ তার দুটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশিত হয়।
পদার্থবিজ্ঞানঃ হাঙ্গেরি, স্পেন, সুইডেন আর সুইজারল্যান্ডের নয়জন বিজ্ঞানী তাদের দুটি আবিষ্কারের জন্য ইগ নোবেল পুরষ্কার বাগিয়ে নেন পদার্থবিজ্ঞানে। কেন সাদা কেশরওয়ালা ঘোড়াই কেবল ‘হর্সফ্লাই’কে দূরে রাখতে সক্ষম হয় এবং ‘গঙ্গা-ফড়িং’ কেন কালো সমাধিফলকের প্রতি আকৃষ্ট হয় এ বিষয়ে পরীক্ষা চালান তারা। গবেষকরা হাঙ্গেরির এক কবরস্থানে গিয়ে দেখেন, পাঁচ রকমের গঙ্গা-ফড়িং পলিশ করা কালো সমাধি-ফলকের প্রতি আকৃষ্ট হয়। মূলত এ ধরনের গঙ্গাফড়িংগুলো গাঢ় যেকোনো রঙয়ের প্রতিই আকৃষ্ট হয়। সেই হিসেবে পানি পৃষ্ঠেও এরা আকর্ষণ লাভ করে। গঙ্গা ফড়িংয়ের শূককীট আর নিম্ফ তাদের জীবনচক্র পানিতেই সম্পন্ন করে।

রসায়নঃ

এই বিভাবে ইগ নোবেল দেয়া হয় চমকপ্রদ এক আবিষ্কারের জন্য। পরীক্ষাগারে গাড়ির বায়ুদূষণের পরিমাণ কম দেখানোর জালিয়াতির কৌশল আবিষ্কার করে জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগন! তবে এজন্য তাদেরকে জরিমানাও গুনতে হয়েছে। গাড়িতে সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম দূষিত বায়ু নির্গমনের এ পদ্ধতি বের করার জন্য কোম্পানিটি ১৪.৭ বিলিয়ন ডলার গচ্ছা দিয়েছে। যদিও রাস্তায় তাদের গাড়ি বায়ুদূষণের নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশিই দূষণ করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে জার্মানির পাঁচজন বিজ্ঞানীকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। তারা গবেষণা করে বের করেছেন, যদি কারো শরীরের বাম পাশে খোসপাঁচড়া হয় আর তারা আয়নায় তাকিয়ে ডান পাশে চুলকান তবে ফল পাওয়া যায়! এটাকে তারা ‘mirror scratching’ বলে অভিহিত করেন। এ পাঁচ বিজ্ঞানী হলেন ক্রিস্টফ হেলমশেন, ক্যারিনা পালজার, থমাস মুনেট, সিল্কে অ্যান্ডার্স আর আন্দ্রেজ স্প্রেঙ্গার।
মনস্তত্ববিদ্যায় এক দারুণ গবেষণার জন্য এবারের ইগ নোবেল বাগিয়ে নেন পাঁচজন গবেষক। তারা ৬ থেকে ৭৭ বছর বয়স্ক ১,০০০ জন মানুষের মিথ্যা কথা বলার উপর ভিত্তি করে এ গবেষণা করেন। একজন মানুষ সমগ্র জীবনকালে কখন কতবার মিথ্যা বলেন এবং বয়সের সাথে সাথে এর প্রভাব কীভাবে পরিবর্তিত হয় সে ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করেন। তারা লক্ষ্য করেন, মিথ্যা বলার দক্ষতা শৈশবে বেড়ে তরুণ বয়সে পরিপক্কতা অর্জন করে। পরে বয়সকালে তা ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। এ ব্যাপারে গবেষকগণ ‘এক্টা সাইকোলজিকা’ জার্নালে তাদের গবেষণা প্রকাশ করেছেন।
অর্থনীতিতে এবারের পুরস্কার দেয়া হয় বিক্রয় ও বিপণনের দৃষ্টিকোণ থেকে পাথরের ব্যক্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করার জন্য! তিনজন গবেষক- মার্ক এভিস, সারাহ ফোর্বস আর শেলাগ ফার্গুসনকে যৌথভাবে এ সম্মাননা দেয়া হয়। তারা ২০১৪ সালে ‘মার্কেটিং জার্নাল’-এ জেনিফার আকের-এর প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখিত ‘ব্যান্ড পার্সোনালিটি’ বা বিপি স্কেলের উপর ভিত্তি করে পাথরের ব্যক্তিত্ব নিয়ে আলোকপাত করেন। এই বিপি পাঁচটি মাত্রা দ্বারা বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। মাত্রাগুলো হলোঃ আন্তরিকতা, উত্তেজনা, যোগ্যতা, বিশুদ্ধতা আর দৃঢ়তা। এক্ষেত্রে তারা পাথর বেছে নিয়েছেন। কারণ তারা মনে করেন, প্রতিটি পাথরেরই একটি স্বতন্ত্র বিপি রয়েছে এবং পাথরের ব্যক্তিত্ব মাঝে মাঝে আশ্চর্যজনকভাবে বিকশিত হয়!
শান্তিতে পুরস্কার দেয়া হয় ফাঁকা বুলি নিয়ে গবেষণা করার জন্য! গর্ডন পেনিকক, জেমস অ্যালেন চেইন, নাথানিয়েল বার, ডেরেক কোহলার এবং জোনাথন ফুগেনস্যাং এ বিষয়ে গবেষণা করার জন্য এ পুরস্কার জয় করে নেন। তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ‘ফাঁকা বুলির অভ্যর্থনা এবং ছদ্ম-গভীরতা শনাক্তকরণ’। তারা বলেন, আপাত দৃষ্টিতে চিত্তাকর্ষকভাবে যেসব তথ্যকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, সেগুলোর অন্তর্গত অর্থ আসলে শূন্য। এ নিয়ে তারা ‘জার্জমেন্ট এন্ড ডিসিশন মেকিং’ জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। বিজ্ঞানীরাও মাঝে মাঝে তাদের বাক্যে গাম্ভীর্যপূর্ণ ফাঁকা বুলি ব্যবহার করেন যার আসলে কোনো অর্থই হয় না। মানুষের সংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের উপর নির্ভর করে তারা এসব বুলি গ্রহণ করবে নাকি করবে না।
উপলব্ধি বিষয়ে পুরস্কার পান জাপানের আতসুকি হিগাশিয়ামা এবং কোহেই আদাচি। তারা তদন্ত করে বের করেন, স্বাভাবিকভাবে মানুষ যা দেখে, দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে তা ভিন্নভাবে দেখা যায়। তাদের গবেষণার বিস্তারিত তথ্য ‘ভিশন রিসার্চ’ জার্নালে ২০০৬ সালে প্রকাশ করেন। তাদের ভাষায়- যেকোনো বস্তু দু পায়ের ফাঁক দিয়ে উল্টো হয়ে দেখলে তা বেশি উজ্জ্বল এবং স্পষ্টভাবে দেখা যায়!
জীববিজ্ঞানে ইগ নোবেল দেয়া হয় কিছু প্রাণী যেমন- ছাগল, হরিণ ইত্যাদিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য। দুজন বিজ্ঞানী এ পুরস্কার বাগিয়ে নেন। বিজ্ঞানী চার্লস ফস্টার বন্য পরিবেশে বিভিন্ন প্রাণীর অনুকরণ করে দেখান। তিনি হরিণ, ভোদঁড়, শেয়াল ও পাখির মতো জীবনযাপন করেন। আরেকজন বিজ্ঞানী থমাস থয়াইটসন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছাগলের সাহচর্যে চার হাত-পা বাড়িয়ে ছাগলের অনুকরণ করেন। তিনি তার ‘Goat Man: How I Took a Holiday from Being Human’ বইতে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখেন। তিনি ‘ছাগল মানব’ হিসেবে বেশ পরিচিতিও পান। অন্যদিকে মিস্টার ফস্টার তার বুনো জীবনযাপনের তথ্য ‘Being a Beast’ বইতে লিপিবদ্ধ করেন।

সাহিত্যে এ সম্মাননা পান ফ্রেডেরিক সোবার্গ নামক এক ব্যক্তি। তিনি তার তিন খণ্ডের আত্মজীবনীমূলক বইতে মৃত মাছি এবং এখনো মৃত নয় এমন মাছির সংগ্রহ দেখান। তার প্রথম খণ্ডের নাম ‘Fly Trap’ এবং শেষ খণ্ডের নাম ‘The Path of a Fly Collector’।

তথ্যসূত্র

 https://en.wikipedia.org/wiki/Ig_Nobel_Prize
 http://somewhereinblog.net/blog/lollipopman/29948552
 http://livescience.com/56228-ig-nobel-prize-winners.html

 

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

ইতিহাসের উত্তরোত্তর উন্নতির সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রেও ঘটে যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এটি রূপ নিতে থকে এক অভিজাত শিল্প হিসেবে। এর কিছুটা ঝলক বা ছোঁয়া দেখা যায় তৎকালীন পশ্চিম এশিয়ার উর্বর সভ্যতাগুলোতে। বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায়। সেইসাথে তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরানের উর্বর ভূমিগুলোতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের সুমেরীয় এবং তার পরবর্তী আক্কাডীয়, অ্যাসেডীয় আর ব্যাবলনীয় সভ্যতার কিছু কীলক-লিপি থেকে সেই সময়কার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য কাজকর্মের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তখনকার অনেক চিকিৎসক মনে করতেন অসুখ-বিসুখ হয় মূলত জাদুবিদ্যা বা দুষ্ট প্রেতাত্মা দ্বারা এবং এর প্রতিকারও শুধুমাত্র জাদুবিদ্যা দ্বারাই সম্ভব। তারা তথাকথিত তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ আর গাল-মন্দ করে সেই দুষ্ট প্রেতাত্মা তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। এ ধরনের চিকিৎসক বা ওঝাদের নাম ছিল আসিপুস।

আরেক ধরনের চিকিৎসক যারা আসুস নামে পরিচিত ছিলেন তারা বিশ্বাস করতেন কার্যকরী পন্থাগুলোতে। তারা বিভিন্ন ভেষজ তরল মিশ্রণ, ক্ষতস্থান পরিষ্কারকরণ, আক্রান্ত স্থান ম্যাসাজ কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যান্ডেজ ও মলম ব্যবহার করতেন। আসিপুস আর আসুস- এ দু’দলই পাশাপাশি চিকিৎসা চালাতেন। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাহায্য-সহায়তাও করতেন। তবে বাণিজ্যিক ব্যাপারগুলো গোপন রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন।

চিত্রঃ আইনপ্রণেতা হাম্বুরাবি সূর্যদেবতা শামাস থেকে রাজকীয় মর্যাদা নিচ্ছেন।

৩,৮০০ কি ৩,৭৬০ বছর আগে হাম্বুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনের শাসক। কীলক-লিপিতে লিখিত আইনশাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বিশ্বের প্রথম আইন প্রণেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। আর এই আইনশাস্ত্রে চিকিৎসা বিষয়ক কিছু ঘোষণাও ছিল। এই ঘোষণাগুলো চিকিৎসকদের সফলতা আর ব্যর্থতা উভয়ের

জন্যই দায়ী ছিল। রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারলে যেমন পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও বলবৎ ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তির চিকিৎসা করে রোগ সারাতে পারলে ব্রোঞ্জের ল্যান্সেট (বর্তমান ইসরাইলি দশ শেকেলের সমান) দেয়া হতো যা কোনো সওদাগরের এক বছরের আয়েরও অনেক বেশি। আর কোনো দাসের জীবন বাঁচাতে পারলে দেয়া হতো দুই শেকেল। কিন্তু যদি কোনো সার্জনের ছুরির তলায় অভিজাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে সেই সার্জনের এক হাত কেটে নেয়া হতো। সেই সাথে তাকে একজন দাসও হারাতে হতো।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, হাম্বুরাবি আইনে খুব কম নির্দেশনা দেয়া থাকায় ঠিক কী উপায়ে তারা সেই সময় চিকিৎসা চালাতো তা জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো জাদুটোনা, দুষ্ট প্রেতাত্মা অথবা পাপের কারণে অসুখ-বিসুখ হয় এই ধারণা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন ব্যাবলনীয়দের আরোগ্যদেবী। তাকে চিকিৎসকদের পৃষ্টপোষোকতাকারী দেবীও বলা যায়। নিনকার্ককে সাধারণত এক নারীরূপে দেখানো হতো যার সঙ্গী একটি কুকুর কিংবা কুকুরের মাথার মতো কোন মুর্তিকেও নিনকার্ক হিসেবে দেখা হতো। সেসময় রোগীরা রোগমুক্তির জন্য নিনকার্কের মন্দিরে কুকুরের মুর্তি দিত। মাঝে মাঝে কুকুর বলিও দেয়া হতো বলে জানা যায়। কিছু কিছু সূত্র বলে, গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন নেকড়েমুখো কোনো দানবী। এই নিনকার্কের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩,৬০০ বছর আগে ক্যাসিটস নামক এক ব্যাবলনীয় সভ্যতার আমলে। নিনকার্কের প্রধান মন্দির ছিল ঈসিনে (বর্ত্মা ইশান-আল বাহরিয়া, ইরাক) এবং নিপ্পুরে (বর্ত্মান নুফফার-ইন আফক, ইরাক)।

ভেষজ ও অন্যান্য গুল্মলতা প্রতিকারক হিসেবে সেসময় ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। রোগ প্রতিকারের জন্য তারা ওয়াইন, আলুবোখারা (পাম ফলের চাটনি) আর পাইন গাছের রস ব্যবহার করতো। এরসাথে টিকটিকির মল মেশানো হতো যা ঔষধ সহজে গিলতে অসুবিধা সৃষ্টি করলেও ওষুধি ভাব আনতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। এসব ওষুধে অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণও বিদ্যমান ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাধারণ জনগণ ও অভিজাত লোকদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে দেবতা আর আত্মারা এতটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল যে বর্তমান আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখনকার চিকিৎসকদের ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক কাজ আলাদাভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটি আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন এই আলোচনায় ইমহোটেপ নামক এক পুরোহিত চিকিৎসক প্রশ্নবিদ্ধ হন। ইমহোটেপের আমল ছিল প্রায় ৪,৬৫০ বছর পূর্বে। ইমহোটেপ মিশরীয় রাজত্বকালের প্রথমদিকে ছিলেন। খুব দ্রুতই চারদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে জীবদ্দশাতেই তাকে ঈশ্বরপুত্র (Demi-God) হিসেবে সম্মান দেয়া হতো, যে সম্মান সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে সময় শুধুমাত্র রাজকীয় লোকদের এ ধরনের সম্মান জানানো হতো।

তিন হাজার বছর পূর্বে, মিশরীয় নতুন রাজত্বকালে তাকে পুরোপুরি দেবতারূপে গণ্য করা হতো। তাকে বলা হতো, তার পুত্র (Son Of Ptah), সৃষ্টির স্রষ্টা অথবা মহাবিশ্বের রূপকার। সেই সাথে কারিগরদের ত্রাণকর্তা বিশেষণও দেয়া হয়। তার সঙ্গী ছিলেন সেকমেট (Sekhmet)।

এ সেকমেট মিশরীয়দের সিংহকেশী সমর ও আরোগ্যের দেবী। সেই সাথে ইমহোটেপের মাও ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, ইমহোটেপ আসলে ছিলেন ঘেঁটে আর সন্ধি বাতের চিকিৎসক। তিনি এক ধরনের তরল মিশ্রণ বানাতে দক্ষ ছিলেন যা এ ধরনের রোগ ভালো করে দিতো। অন্যান্য সূত্র বলে, তিনি নাকি ছিলেন কিছু ধান্দাবাজ ওঝাদের দলনেতা যে তার অধীনস্থদের সফলতার সুফল ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায়ভার বা নিন্দা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

চিত্রঃ ইমহোটেপের মা দেবী সেকমেট। তিনি সমর এবং আরোগ্য দেবী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন গ্রীসেও ইমহোটেপের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। তবে কখনো কখনো তাকে প্রাচীন গ্রীক আরোগ্যদেবতা অ্যাসলেপিয়াস (Aselepios) এর যমজ ভাই মনে করা হতো। কখনোবা অ্যাসলেপিয়াসকেই ইমহোটেপ বলা হতো।

ইমহোটেপের সময়কালের আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন হেসি-রা, যিনি ফারাও জোসার এর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। হেসি-রা দন্ত চিকিৎসক হিসেবেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। শোনা যায়, দাঁত তোলা আর মুখের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে পটুত্ব ছিল তার। সেইসাথে বর্তমানকালে আমরা যাকে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগ বলি সেটা সম্পর্কেও অল্প বিস্তর ধারণা ছিল। রোগীদের বারবার মূত্র বিসর্জন দেখে এ ধারণা তার মাথায় আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদ অঞ্চলের হোগলাজাতীয় গুল্ম বা ঘাস জাতীয় প্যাপারি থেকে তৈরি প্যাপিরাস থেকে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়, যার একটির নাম- ‘স্মিথ প্যাপিরাস’। বিখ্যাত আমেরিকান মিশরীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংগ্রাহক এডউইন স্মিথের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। তিনিই প্রাচীন এ নথি ১৮৬২ সালে লুক্সর থেকে উদ্ধার করেন।

স্মিথ প্যাপিরাস একদম অসম্পূর্ণ। দেখলে মনে হবে মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া এটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর পুরনো। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক আর শব্দশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি আরো প্রাচীন এক নথি থেকে নকল করা হয়েছে। সেই প্রাচীন নথিটি যথাসম্ভব ইমহোটেপের নিজের হাতে লেখা বা তার অধীনে লেখা। সে সময়ের অন্যান্য প্রাচীন প্যাপিরাসের তুলনায় স্মিথ প্যাপিরাস ঐন্দ্রজালিক বা জাদুকরী চিকিৎসার চেয়ে সাধারণ জখম, ক্ষত, পচন আর অস্ত্রোপচার সম্পর্কেই বেশি তথ্য দেয়। শুধুমাত্র একটি স্থানে আরোগ্য লাভের জন্য ঈশ্বর বা দেবতার কৃপা কামনা করা হয়েছে। নথিটিতে মস্তকের সামনের অংশ থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি আর রক্তের সরবরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্যাপিরাসটি ৪৮ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগেই একদম পরিচিত আধুনিক পদ্ধতির মতো একেকটি সমস্যার বর্ণনা। কারণ, প্রতিকার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং তা সারাবার বিষয়াদিও বিস্তারিতভাবে আছে।

রোগীকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা, রোগীর ইতিহাস নেয়া বর্তমানকালের অত্যাধুনিক চিকিৎসার নিয়ম হলেও প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে দেবতারা শাসন করতেন, সেখানে এরকম পদ্ধতি ছিল কিছুটা অজ্ঞতার আড়ালে থাকা রহস্যের মতো।

এ স্মিথ প্যাপিরাসেই করোটিসন্ধি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া মেনিনজাইটিস (মস্তকের কোষপর্দা) এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা যায়। মাথার ও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যও এতে পাওয়া যায়। স্মিথ প্যাপিরাসে ক্ষতস্থানে সেলাই করা, কাঁচা মাংস ব্যবহার করে রক্তপাত বন্ধ করা এবং মধু ব্যবহার করে রোগ প্রতিকারের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ব্যাপারের কথা বলা যায়। যেমন- একজন লোক, যার মাথায় ক্ষত হয়েছে, তার জন্য প্রথমে মাথাটাকে সঠিকভাবে জায়গানুসারে বিভিন্ন অংশে সেলাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাজা কাঁচা মাংস ক্ষতস্থানে বেঁধে দিতে হবে। এরপর গ্রীজ, মধু এবং অন্যান্য ভেষজ তরল ব্যবহার করতে হবে যতদিন না লোকটি সুস্থ হয়ে উঠে। স্মিথ প্যাপিরসে মূলত অ্যাক্সিডেন্ট সম্পর্কিত কথা বেশি থাকায় ধারণা করা হয় এটি শুধুমাত্র যুদ্ধাহত সৈন্যদের কিংবা পিরামিড বানানোর কারিগরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো। স্মিথ প্যাপিরাসে বর্ণিত ৪৮টি চিকিৎসা ধরনের মধ্যে ১৪ টিকেই চিকিৎসার অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সকল রোগের প্রতিকার সেই সময় তাদের জানা ছিল না।

তখনকার আরেকটি বিখ্যাত পুরাতন নথি বা পুঁথি হলো ইবারস প্যাপিরাস (Ebers Papyrus)। এটি প্রায় স্মিথ প্যাপিরাসের মতোই। এটি ৩,৫০০ বছর আগের বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলেন এটিও অন্য আরেকটি পুঁথির নকল, যথাসম্ভব ইমহোটোপের আমলেরই কোনো নথি হবে।

১৮৭২ সালে জার্মান লেখন এবং মিশরীয় বিশেষজ্ঞ জর্জ ইবারস এ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। তিনি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। সেখানেই এ ইবারস প্যাপিরাস সংরক্ষিত আছে। এতে প্রায় ১১০ পৃষ্ঠা রয়েছে, লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬৬ ফুট আর প্রস্থে ১২ ইঞ্চির মতো।

স্মিথ প্যাপিরাসের সাথে তুলনা করলে ইবারস প্যাপিরাসে শত শত জাদুমন্ত্র আর অভিশাপের মাধ্যমে রোগ সারানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। তবে এটি অন্য নথিগুলোর দিক থেকে সাজসজ্জায় বেশ দুর্বল। তারা জাদুমন্ত্র দিয়ে বাজে, অশুভ প্রেতাত্মা তাড়াবার কৌশল কাজে লাগাতো। পরজীবীর কারণে ঘটিত বাত, ত্বকসমস্যা, আলসার বা পেটের ক্ষত, পায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, হৃদরোগ, প্রস্রাবে অসুবিধা, বিভিন্ন ক্ষত এবং প্রসূতিরোগের চিকিৎসার বিবিধ বিধান এতে পাওয়া যায়।

তবে প্রসূতিরোগ সম্পর্কিত প্যাপিরাস হলো ‘কাহুন গাইনোকোলজিক্যাল প্যাপিরাস। প্রায় ৩,৮০০ বছর আগের এ নথিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রথম নথিগুলার একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে সংরক্ষিত আছে। এতে মূলত নারীদের প্রজনন বিষয়ক ব্যাপার আলোচনা করা হয়েছে। গর্ভধারণে সক্ষমতা, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থার পরীক্ষণ এবং গর্ভনিরোধক ইত্যাদি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের মাসিক এবং সে সম্পর্কিত ব্যথার কথাও আছে। বলা আছে- যে গর্ভবতী মহিলা সবসময় বিছানায় থাকতে ভালোবাসে, তাকে কখনো উঠানো উচিৎ নয়। বরং তাকে নাড়াচাড়া করাও ঠিক নয়। এতে তার গর্ভের বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। তাকে খাওউই নামক একটি জিনিস এক গ্যালনের চতুর্থাংশ খাওয়ানো হয়।

আবার এক চিত্র-বিচিত্র পাত্রকে গর্ভবতীদের জন্য ঐশ্বরিক সুরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এতে করে শয়তান আত্মার হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে প্রাচীনকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো। মজার এবং একই সাথে ভয়ানক এক তথ্য- গর্ভনিরোধক হিসেবে তারা মধু, টক দই আর কুমিরের গোবরের একটা মিশ্রণ নারী যৌনাঙ্গে ব্যবহার করতো।

চিত্রঃ ঐশ্বরিক তাবিজ-কবজ যা অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হতো।

স্মিথ ও ইবারস প্যাপিরাসের কিছুকাল পরেই দ্য হার্স্ট, ব্রুগশ্চ এবং লন্ডন মেডিক্যাল প্যাপিরাস পাওয়া যায়। সমাধি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি, বিভিন্ন হস্ত নির্মিত তৈজসপত্রের সাথে সাথে মমিকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ত্থেকে পুরানো ইতিহাসের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মমিকরণের জন্য মিশরীয় চিকিৎসকরা যে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদিসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তা এমনিতেই বোঝা যায়। তারা এসব কাজে করাত, ড্রিল মেশিন, সাঁড়াশি, কাঁচি ইত্যাদি নানারকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন।

তবে অপারেশনের বা সার্জারি চিকিৎসা মূলত দূর্ঘটনাসমূহ চিকিৎসার সাথে জড়িত ছিল বেশি। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সুষম খাদ্যাভাসের প্রতিও জোর দিতেন। নকল চোখ, নকল দাঁত- এসব বানাতেও তারা দক্ষ ছিলেন। তারপরও সেই সময়কার মিশরীয় সমাজে আত্মিক এবং ঐন্দ্রজালিক চিকিৎসাই প্রধান ভূমিকা রাখতো। তারা ঘাড়, বাহু, হাত, কব্জি কিংবা গোড়ালিতে মাদুলি ব্যবহার করতো। এতে করে ভৌতিক অপদেবতা হতে রক্ষা পাবে বলে মনে করতো তারা। তবে কেউ যদি ভুলে অসুখে পড়ে যায় তবে যৌক্তিক মেডিক্যাল চিকিৎসার চেয়ে ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসাই বেশি প্রাধান্য পেতো।

প্রাচীন মিশরের অস্ত্রপচার ব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের আলাদাভাবে সম্মান দেয়া হতো। জীবনদানকারী ত্রাতারূপে তাঁদের গণ্য করা হতো সমাজের উঁচু স্তরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা করতো তারা। তারা কাটা অংশ সেলাই করতেন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেন। এছাড়া উইলো গাছের পাতা ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টিউমার অপারেশনও করা হতো। এসব অপারেশনে নানা রকম ছুরি ব্যবহার হতো। সেইসাথে পাথরের তৈরি ধারালো বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতিও কাজে লাগাতেন চিকিৎসকরা।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রাচীনকালে ব্যবহৃত নকল পায়ের গোড়ালি পেয়েছেন মিশরে, যার কিছুটা কাঠের আর কিছুটা চামড়ার ও কাপড়ের তৈরি। এ ধরনের প্রস্থেটিক

যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনায় অথবা গ্যাংগ্রিনের কারণে অঙ্গ হারানো মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। এতে করে রোগীরা সহজে ভারসাম্য রেখে প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারতো। বলে রাখা উচিৎ, প্রাচীন মিশরীয়রা ঐতিহ্যগতভাবে পায়ে স্যান্ডেল পরিধান করতো।

চিত্রঃ প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত নকল গোড়ালি।

মমিকরণ

অভিজাত, উঁচু বংশের কিংবা ধনী কেউ মারা গেলে তার মরদেহ মমি করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ বের করে ফেলা হতো। মিশরীয়রা মমি করার ব্যাপারে পরবর্তী অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মতো কুসংস্কারপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঠিক কী উপায়ে তারা এ মমি করতো তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

দ্বিতীয় শতকের রোমান সাম্রাজ্যের কুমির দেবতা সোবেক (Sobek) এর মন্দিরে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল ছুরি, চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেছে। তখন বিশাল এক হূঁকের মাধ্যমে নাকের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্ক বের করা হতো। আর অন্ত্র, যকৃত, পাকস্থলী, ফুফফুস ইত্যাদি শরীরের বাম পাশ কেটে সরানো হতো। এসব কাজ শরীরে পচন শুরু হবার আগেই সমাধা করা হতো।

হার্ট বা হৃদপিণ্ড, যা আবেগের এবং বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা সরানো হতো না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সেটি শরীরের মধ্যেই রেখে দেয়া হতো। আর বাকি সব অঙ্গ বের করে ফেলা হতো।

চিত্রঃ ক্যানোপিক বা অঙ্গ সংরণের পাত্র।

মমিকরণবিদরা শরীর হতে বের করা অঙ্গগুলোকে জলশূন্য করে পুনরায় শরীরে স্থাপন করতেন অথবা ক্যানোপিক (Canopic) নামক এক ধরনের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন। এ পাত্রগুলো ছোট আকৃতির কফিনের মতো দেখতে। এগুলো মমিকৃত দেহের কিংবা কবরের পাশাপাশি স্থানে রাখা হতো।

তথ্যসূত্র

The priest physician of Egypt

কেলাসিত বরফঃ বিমান যাত্রার অদৃশ্য হুমকি

২০০৯ সালে রিওডিজেনিরো থেকে ছেড়ে যাওয়া প্যারিস গামী ফ্লাইট ৪৪৭ উড্ডয়নের কিছু সময় পরই ঝড়ের কবলে পড়ে। প্রথমে ব্যাপারটি হালকাভাবে নেয়া হলেও যারা সে সময়ের পত্রিকার শিরোনাম গুলোতে চোখ বুলিয়েছিলেন তারা জানেন ব্যাপারটির শেষটা কতটা ভয়াবহ ছিল। এটা ছিল সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়ানক বিমান দুর্ঘটনা। ২২৮ জন যাত্রীর সকলেরই মৃত্যু ঘটে। আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ থেকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারকরতে লেগে যায় প্রায় দুই বছর। যখন ব্ল্যাকবাক্স বের করা হয় তখন সেখান থেকে সফটওয়ার ত্রুটি,পাইলটের অমনোযোগিতা সহ বিভিন্ন কারণ পাওয়া যায়। কিন্তু ছোট্ট একটি কারণ সমগ্র ব্যাপারটিকে নতুন একটি তাৎপর্যপূর্ণ  দিকে  আলোকপাত  করে।

বায়ুর গতিবেগ মাপার জন্য ব্যবহৃত ‘পিটটটিউব’ নামে একটি যন্ত্রাংশে বরফের প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যায়। কিন্তু সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ফুট উপরে এমনটি হওয়ার কথা নয়। আবহাওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান বলে, সচরাচর এই উচ্চতায় পানি জমে বরফের কেলাস হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু  ফ্লাইট ৪৪৭-ই একা নয়। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে

আকাশ থেকে বিমান পতনের সবচেয়ে ভয়ানক কারণ এই বরফের প্রতিবন্ধকতা বা‘কেলাসিত বরফ’।

পঞ্চাশের দশকের আগ পর্যন্ত বিমান পতনের কোনোকারণ বের করা সম্ভব হয়নি। তারপর বেশ কিছু গবেষণা হলেও সেগুলোর ফলাফল স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। এরপর ১৯৯৪ সালে আমেরিকান ঈগল ফ্লাইট ৪১৪৪ ইন্ডিয়ানার উপর দিয়ে যাবার সময় অজানা জমাট বরফের কারণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে সয়াবিনেরবাগানে পতিত হলে এ ঘটনা আবারো চিন্তার উদ্রেক করে। উল্লেখ্য,এই দূর্ঘটনায় ৬৩ যাত্রীর সকলেই মৃত্যুবরণ করে। এ ব্যাপারে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন(FAA)তদন্ত শুরু করে এবং পরবর্তীতে আরো ৩২ টি ঘটনা র ক্ষেত্রে এমন ব্যাপার আবিষ্কার করে। তাদের তদন্তে অতিউচ্চতায় ইঞ্জিনের হঠাৎ থেমে যাওয়া,সেন্সরের অদ্ভুতত্রুটি ,রহস্যজনক ভারীবৃষ্টির আবির্ভাব ,আকাশ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং রাডারে আবহাওয়া পরিবর্তনের কোনো আভাস না পাওয়া ইত্যাদি অদ্ভুত সব সমস্যার দেখা মিলে।

untitled-4

কানাডার আবহ-পদার্থবিদ ওয়াল্টারস্ট্যাপ বলেন ‘লোকজন বুঝতেই পারেনা ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে। অতি উচ্চতায় পানির জমাট বেঁধে যাওয়া নিয়ে বিভিন্নতত্ত্ব আছে।’ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাইলট ১০ হাজার ফুট(৩০০০মিটার) এর নীচে ইঞ্জিনকে আবার চালু করতে সক্ষম হন। এবং যাত্রীরা সেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান যদি ও তাদেরকে ভয়ানক ঝাঁকুনির অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে হয়। তবে একটা ক্ষেত্রে ইঞ্জিন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় আর পাইলট কোনোমতে বিমান কে অবতরণ করতে সক্ষম হন।

FAA-র তদন্তে পাওয়া যায় ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দেয় এক ধরনের জমাট বরফের কারণে।যদিও শুধুমাত্র বিমানের উত্তপ্ত অংশগুলোতেই কেন প্রভাব ফেল তোতা বুঝা যায় নি। সাধারণভাবে পানি জমাট বেঁধে বরফ হবার কারণ হিসেবে ধরা হয়-পানি যখন বিমানের শীতলঅংশে আসে তখন তা অতিহিমায়িত হয়ে বরফে পরিণত হয়। পাইলটরা বিমানের উইনশিল্ডের উপর এ ধরনের জমাট বরফ দেখতে পান। কানাডার ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের বিজ্ঞানী ভ্যানফুয়েলকিবলেন,‘এটা খুবই স্পষ্ট। এটা শুধু মাত্র ২২ হাজার ফুটের নীচে ঘটে এবং জমাট বৃষ্টির ব্যাপারটি রাডারেও দৃশ্যমান হয়।’ আর সে জন্য বিমানে নতুন ধরনের সেন্সর লাগানো হয় যাতে করে পাখা হতে বরফ-অপসারকস্প্রে করা যায়।

কিন্তু এসবের কিছুই কেলাসিত বরফের ক্ষেত্রে খাটে না। স্বাভাবিক বরফজমাট বাঁধার পদ্ধতি থেকে ভিন্ন এক পদ্ধতিতে স্ফটিক বরফ জমাট বাঁধে।এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পানি আর তরল থাকতে পারে না।

মূল সমস্যা সৃষ্টি করে কেলাসিত বরফের ছোট ধূম বা কণা গুলো।এদের ব্যাস ৪০ মাইক্রোমিটারের মতো। এগুলো বৃষ্টিপরিমাপক রাডারে ও ধরা পড়েনা। এই কেলাসগুলো কঠিন হবার দরুন বিমানের উইনশিল্ড এবং অন্যান্য অংশ আঘাত প্রাপ্ত হয়। যখনই বিমানের উত্তপ্ত অংশ যেমন ইঞ্জিন কিংবা পিটটটিউবের সংস্পর্শে আসে তখনই এরা গলতে শুরু করে। মাঝে মাঝে গরম উইনশিল্ডে লেগেও এরা গলে যায় আর ফলশ্রুতিতে একধরনের অদ্ভুত বৃষ্টি দেখা দেয়। এরকথা প্রতিবেদন গুলোতে পাওয়া যায়।

untitled-4

এসব কেলাসের একটি স্তর গলতে শুরু করলে আরো কেলাস তৈরি হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এরা ইঞ্জিনের উপর জমতে থাকে এবং এইস্তূপীকৃত কেলাস গুচ্ছ ইঞ্জিনকে ক্ষতি গ্রস্তকরে দেয়। সেন্সরের মধ্যে সৃষ্টকেলাস আরো ভয়ানক ক্ষতি করে। ফ্লাইট ৪৪৭ এর ক্ষেত্রে বরফের কেলাস পিটটটিউবকে অবরুদ্ধ করে দেয় যার কারণে এটি ভুল পাঠ দেয়া শুরু করে। ফলস্বরূপ অটো-পাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মূল পাইলটরা ও বিভ্রান্ত হয়ে তাদের স্বাভাবিক ট্রেনিং এর বিপরীত ব্যবস্থা নিতে থাকে। তারা মনে করে ছিল বিমানটি তার উচ্চতা হারাচ্ছে। সেই কারণে বিমানটিকে তারা কৌণিক ভাবে উর্দ্ধগামী করে দেন যা বিমানটিকে একেবারে থামিয়ে দেয়।

বিমান দূর্ঘটনার কারণ হিসেবে যতই কেলাসিত বরফকে দায়ীকরা হয় ততই ব্যাপারটি স্পষ্ট হতে থাকে এবং গ্রহণযোগ্য কিছু কারণ ও পাওয়া যায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত নাসার একটি প্রতিবেদন FAA এর পূর্বেকার অনুমান সংশোধন করে বলে যে,

১৯৮০ সাল থেকে প্রায় ১৪০ টি ঘটনার সাথে এই কেলাস বরফ সংশ্লিষ্ট এবং প্রতিবেদনটি একে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখার জন্য সাবধান করে দেয়।

সুতরাং বিমানের ইঞ্জিন নতুন ভাবে নকশা করার এটাই উপযুক্ত সময় যেন এ ধরনের কেলাসিত বরফ বিমানের কোনোরূপ ক্ষতি করতে না পারে। এউদ্দেশ্যেই ২০০৬ সালের একটি মাল্টিন্যাশনাল প্রোগ্রামে নাসা ,ন্যাসনালরিসার্চ সেন্টার- কানাডা,এয়ারবাস ও বোয়িং সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যোগ দিয়েছিল। কিন্তু ইঞ্জিন ডিজাইন করার আগে তাদের জানা দরকার ছিল কীভাবে উত্তপ্ত ইঞ্জিনে এই কেলাসিত বরফ দানা বাঁধে। তার মানে ঠিক একই পরিস্থিতি ল্যাবে সৃষ্টি করতে হবে। ওহায়োও’ রক্লিভল্যান্ডে অবস্থিত নাসারল্যাবে হিমশীতল তাপমাত্রা সহ ঘণ্টায় একশত মাইল গতিবেগের বাতাস এবং খুবই অল্প চাপের ব্যবস্থা করা হয় যে রকমটি একটি বিমান ৩০ হাজার ফুট উপরে সহ্য করে।

প্রায় এক বছর কাজকরার পর,কেলাসিত বরফ বিশেষজ্ঞ জুডিভ্যানজ্যান্টে এবং এরোস্পেস প্রকৌশলী অ্যাশলিফ্রেজেল একটি ‘আইসবার’-এর বিন্যাস করতে সক্ষম হন যা মিনিটের মধ্যে কেলাসিত বরফের মতো একইরকম আকৃতি এবং ঘনত্ব বিশিষ্ট কেলাস তৈরি করে ইঞ্জিনের মধ্যে দিয়ে স্প্রে করতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেগুলো গরম ব্লেডের উপর জমতে শুরু করে। কিন্তু পরিকল্পনা মতো কাজ এগোলো না। তারা যখন বরফ-মেঘ জেনারেটর (তৈরিকৃত যন্ত্র) চালু করলেন তাতে একটি প্রতিবন্ধকতা দেখা দিল। সৃষ্টি হওয়া কেলাস বরফগুলো বালু-বিস্ফোরক কণার মতো আচরণ করা শুরু করল এবং সংবেদনশীল পরিমাপক যন্ত্র গুলোকে নষ্ট করে দিল। যে সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়নি সেগুলো ভুল পরিমাপ দিতে থাকল।ভ্যানজ্যান্টে বলেন ‘আমাদের আরো উন্নত মানের এবং শক্তিশালি কোনো যন্ত্র নির্মাণ করতে হবে।’

তাদের কাজ বরফ জমাট বাঁধার একটি জটিল কাঠামো উন্মোচন করল। বরফের কেলাস গুলো প্রথম দশাতেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং ছোট ছোট কণার মেঘ তৈরি করে। তাদের এই সমীক্ষা ভিত্তিক মডেল কে কার্যকরী মডেলে রূপান্তর করা পদার্থবিদ্যার এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। এখনকার জন্য তারা নতুন একটি সহজ মডেল তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন যেন বরফ তৈরির ঝুঁকি কিছুটা কমে আসে।

‘একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক মডেল বানাতে হয়তো আরো বছর দশেক লাগবে’ ফ্রজেল বললেন। এরপর মডেলটিকে ইঞ্জিনে পুনরায় রূপ দিতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে। কিন্তু বিমানকে আকাশে উড্ডয়নে ধরে রাখতে এবং এই রহস্যজনক কেলাসিত বরফের সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের একটি তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন।

বোয়িং কোম্পানি পূর্বে এই কেলাসবরফ এবং ক্ষীয় মাণ পরিচলন ঝড়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে ছিল। এই ঝড় ব্জ্রপাত সহকারে বিশাল পরিমাণ পানি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে যায় যা সাধারণ বৃষ্টিপাতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে, এই ঝড় গুলোর জন্য তাপ প্রয়োজন যার কারণে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসা ঝড়গুলো অপেক্ষাকৃত উষ্ণতর অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে।

টমরাটভ্‌স্কি এবং তার সহকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিলেন,সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই ব্যাপারটি একে বারে একই পরিস্থিতিতে সরাসরি বিমানচালিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তারা যুতসই আবহাওয়ায় সেন্সরযুক্ত একটি জেটপ্লেন সমস্যাযুক্ত হটস্পটে চালিয়ে দেখলেন আর ফলাফলও পেলেন। পরিকল্পিত ভাবে জেট প্লেনকে তথাকথিত High Water Ice Condition(HWIC) এর মধ্যে দিয়ে চালিয়ে দেখলেন তাপমাত্রা হিমাংকের ও নীচে নেমে যায় যা কেলাস বরফ সৃষ্টি করার জন্য একদম আদর্শ। রাটভস্কি HWIC এবং পরিচলন ঝড়ের মধ্যকার সম্পর্ককে নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। তিনি আবিষ্কার করেন,পরিচলন ঝড় পানির কণাগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ অক্ষাংশে তাড়িয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এব্যাপারটি কেবল মাত্র তখনই ঘটে যখন ঝড় কমতিরদিকে থাকে। কেন কমতির দিকে থাকলে এই ব্যাপারটি ঘটেতা জানা সম্ভব হয় নি। এটা আশা করা যায়,সবগুলো তথ্য এক ত্রক রলে HWIC সম্পর্কিত বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। গবেষকরা স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে কোথায় কোথায় কেলাসিত বরফ সৃষ্টিহতে পারে তার পূর্বাভাস দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেইসাথে রাডারের মাধ্যমেও এর শনাক্ত করণের জোর চেষ্টা চলছে। আর হয়তো কয়েক বছরের মধ্যের ইঞ্জিনেরপুনঃনকশাও করা যাবে।

অদৃশ্য হত্যাকারী

ফুয়েল কি এবং তার দল সফলভাবে বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দুটি সেন্সর তৈরি করতে সক্ষম হন। প্রথমটি, একটি বিয়ার ক্যানের আকৃতির যন্ত্র যারনাম দেয়া হয়েছে পার্টিক্যাল আইস প্রোব,যা বিমানের বাইরের দিকে লাগানো যাবে। এটি বাতাসের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে ছোটছোট কণার উপস্থিতি শণাক্ত করতে পারে। এটি আসলে বিমানের ধ্বংসাবশেষ শণাক্তকরণের জন্য বানানো হয়েছিল। কিন্তু দলটি একে পরিবর্তন করে কেলাসিত বরফের বিশেষ সংকেত শনাক্ত করণের কাজেলাগাতে সক্ষম হয়। অন্য যন্ত্রটি একটি শব্দোত্ত র জমাট-বরফ শনাক্তকরণের সেন্সর। এটি সরাসরি ইঞ্জিনেরভেতর কার জমাট বরফ পরিমাপ করতে পারে। কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথেসাথে পরিবর্তিত হয়। দুটো যন্ত্রই এতটা উন্নত যে জনাব ফুয়েলকি এগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার কথা ভাবছেন।

কিন্তু বিমানে এই সেন্সর আর রাডার লাগানোর পর ও মূল সমস্যার সমাধান হলো না। একটা কারণ হলো,এখনো কেলাসিত বরফের প্রকৃত পরিমাণ মাপা সম্ভব হয়নি। যার ফলে এখনো বিমান দূর্ঘটনা ঘটেই চলছে। উদাহরণস্বরূপ,২০১৪ সালের এয়ার আলজেরিয়ার ফ্লাইট ৫০১৭ এর কথা বলা যায় যেখানে ১১৬ জনের মতো যাত্রী মারা যায়।

ফ্লাইট ৪৪৭ এর পিটটটিউব অবরুদ্ধ হবার কথা ব্ল্যাকবাক্সের মাধ্যমে জানাসম্ভব হলেও একই রকম অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে সেটাও জানা সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে বিমানের অল্পবিস্তর ক্ষতি সাধিত হয়ে ইঞ্জিন আবার পুনরায় সচল করা সম্ভব হয়। কিন্তু ঠিক কী কারণে ১০ হাজার ফুটের নীচে আসলেই কেলাসিত বরফের সকল চিহ্ন উধাও হয়ে যায় তা জানা সম্ভব হয়নি।

সমস্যাটি আরো প্রকোপ আকার ধারণ করার সুযোগ আছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী দিনদিন উত্তপ্ত হচ্ছে যার ফলে আবহাওয়ার অস্থিরতাও বাড়ছে। আর এমন পরিস্থিতিতে কেলাসিত বরফসৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ও প্রবল। যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটিঅবরিডিং’ এর আবহাওয়া বিদ সুগ্রেবলেন, ‘এ অবস্থা আরো সক্রিয় হবে এবং বারবার ঘটবে’। সাম্প্রতিক কালে রোলসরয়েস ইঞ্জিন ল্যাবের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে কেলাসিত বরফ আরো প্রসার লাভ করবে এবং সহজেই সৃষ্ট হতে পারবে। এই কোম্পানির এক ইঞ্জিন বিশেষজ্ঞ ররিক্লার্কসন কোম্পানিকে এক অসুবিধা জনক কিন্তু নিরাপদ উপায় বাতলে দেন।তাহ লো,‘খারাপ আবহাওয়ায় বিমান উড্ডয়ন বন্ধরাখুন’।

তথ্যসূত্র

Hot Ice:The Invisible threat making planes fall out of the sky, New Scientist

https://www.newscientist.com/article/mg23130800-700-hot-ice-the-race-to-understand-a-sinister-threat-to-aircraft/

 

নোবেল পদক গলানোর সেই ঘটনা

নোবেল পদক কি লুকিয়ে ফেলার জন্য?নাকি আত্মতুষ্টিতে সকলকে প্রদর্শনের জন্য? নিশ্চয়ই পরেরটা। আর      যাই                                                                   untitled-1

হোক অন্ততলুকিয়ে ফেলার জন্য তো নয়ই। আর সেকারণেই মেডেলগুলো অনেকেই মিউজিয়মে দিয়ে দেন। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতিও আসে যে নোবেল পদকও লুকানোর প্রয়োজন হতে পারে। আজকে আমরা এমনই এক পরিস্থতি সম্পর্কে জানবো।

১৯৪০ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়। হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসী বাহিনী অপ্রতিরোধ্য গতিতে ইউরোপের বড় বড় শহরগুলো একের পর এক দখল করে নিচ্ছে। এবার তাদের থাবা পড়লো ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। কোপেনহেগেনের প্রতিটি রাস্তায় রাস্তায় নাৎসী সৈন্যরা মার্চ করে বেড়াচ্ছে আর বাড়ি-ঘর,প্রতিষ্ঠান আর বিজ্ঞানাগার লুট করে চলেছে। সাথে চলছে নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ।

নীলস বোর। নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত পদার্থবিদ। ঐ মুহূর্তে আছেন ‘বোর ইন্সটিউট অব থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’এর ল্যাবে। হাতে সময় খুব কম। হয়তো এক ঘণ্টাও নেই। কিংবা কে বলতে পারে মিনিটখানেক পরেই হয়তো এসে হানা দিবে হিটলারের কুখ্যাত বাহিনী। অথচ তার আগেই বোরকে দুই দুইটা নোবেল পদক লুকিয়ে ফেলতে হবে। সম্ভব হলে সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে দিতে হবে।

নোবেল পদকগুলো বানানো হয় ২৩ ক্যারট স্বর্ণ দিয়ে। খোদাইকৃত আর চকচকে বলে লুকিয়ে রাখা কঠিন। বেশ ভারীও বটে। এদিকে নাৎসীরা ঘোষণা দিয়েছে,জার্মানী থেকে কোনো ধরনের স্বর্ণই বের হতে পারবেনা। বিশেষ করে ১৯৩৫ সালে একজন জেলেবন্দী শান্তিকর্মী নোবেল পাবার পর তাদের নোবেল বিদ্বেষ চরমে রূপ নেয়। দুজন জার্মান নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী, যারা জন্মসূত্রে ইহুদী, তারা আগেই বুদ্ধি করে তাদের মেডেলগুলো পাঠিয়ে দিয়েছেন বোর ইন্সটিউটে। আশা একটাই, যুদ্ধকালীন সময়ে এগুলো অন্তত নিরাপদে থাকবে। এদের একজন আবার ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টির বিরোধী। যদি কোনোভাবে বোর ইন্সটিটিউটে এই মেডেলগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায় তবে সর্বোচ্চ শাস্তি ছাড়া অন্য কিছু ভাবাই যায়না।

দুঃখজনকভাবে মেডেলগুলো এখন বোর ল্যাবে জলজ্যান্ত প্রমাণ হিসেবে এই দুই বিজ্ঞানীর মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। বোর জানেন,নাৎসিদের চোখ এই ইন্সটিটিউটে পড়বেই। তাছাড়া গত এক বছর ধরেই ইহুদিদের ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে বোর ইন্সটিউট। অনেক ইহুদিকে রক্ষা করার করার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অগ্রগণ্য। এসব তথ্য নাৎসিদের

অজানা নয়। নীলস বোর নিজেও যে তাদের টার্গেট সেটাও স্পষ্ট। এখন তিনি এই মেডেল দুটো নিয়ে কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

niels-bohr
চিত্রঃ নীলস বোর

‘There will be always a solution to every problem’সেজন্যেই বোধ হয় ঐদিন বোর ল্যাবে কাজ করছিলেন এক হাঙ্গেরিয়ান রসায়নবিদ। নাম তার জর্জ দ্য হ্যাভসে। যিনি আর কয়েক বছর পরে নিজেই নোবেল পুরষ্কার পাবেন। তো তিনি বোরকে পরামর্শ দিলেন মেডেলগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলতে। বোর চিন্তা করে দেখলেননাৎসিদের আচরণ অনুযায়ী তারা এই মেডেল পাবার জন্য সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখবে এমনকি বাগান,আশেপাশের খোলা জায়গাও বাদদিবেনা। এই পরামর্শ মানা গেলনা।

এবার হ্যাভসে রসায়নের দ্বারস্থ হলেন। রসায়নকে কাজে লাগিয়ে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার একটা উপায় খুঁজে পেলেন। তা হলো মেডেলগুলোকেঅদৃশ্য করে ফেলবেন। বোরকে বললেন,‘আমি এগুলোকে দ্রবীভূত করে ফেলবো’।যখন দখলদার বাহিনীর সৈন্যরা কোপেনহেগেনের রাস্তায় মার্চ করে বেড়াচ্ছিল তিনি তখন ব্যস্ত ছিলেন নোবেল পদকগুলোকে গলাতে।

গলানোর কাজে কোনো সাধারণ মিশ্রণ ব্যবহার হয়নি। যেহেতু স্বর্ণ অনেক নিষ্ক্রিয় ধাতু, সহজে ক্ষয় হয়না,মিশেও না এমনকি দ্রবীভুতও হয়না তাই এই কাজটা করতে হয়েছিল বিশেষ এক ধরনের মিশ্রণের সাহায্যে। মিশ্রণের নাম,‘একুয়া রেজিয়া’। বাংলায়‘অম্লরাজ’। হাইড্রোক্লোরিক এসিডের তিন ভাগ আর নাইট্রিক এসিডের এক ভাগ মিশিয়ে তৈরি করা হয় একুয়া রেজিয়া। তবেএই প্রক্রিয়া খুবই ধীর। যেকোনো অনুপাতের নাইট্রিক এসিড আর হাইড্রোক্লোরিক এসিড কিন্তু স্বর্ণকে গলাতে পারেনা। এরজন্য ঠিক ঠিক ১:৩ অনুপাতেরই নাইট্রিক এসিড আর হাইড্রোক্লোরিক এসিড লাগবে। রাজঅম্ল বা একুয়া রেজিয়া দ্বারা প্লাটিনাম,ইরিডিয়াম, টাইটেনিয়াম,রুথেনিয়াম প্রভৃতি ধাতুকেও দ্রবীভূত করা যায়।

কীভাবে কাজ করে রাজঅম্ল?নাইট্রিক এসিড খুব শক্তিশালী জারক। এটি স্বর্ণকে দ্রবীভূত করে (Au3+)আয়নে পরিণত করে। আর হাইড্রোক্লোরিক এসিড দ্রবণে অনবরতক্লোরাইড (Cl)আয়নের যোগান দিতে থাকে। ক্লোরাইড আয়ন আবার স্বর্ণের আয়নের সাথে বিক্রিয়া করে টেট্রাক্লোরোঅয়েট(III)আয়ন তৈরি করে। হাইড্রোক্লোরিক এসিডের সাথে

এই বিক্রিয়াটা মূলত একটি সাম্যাবস্থার বিক্রিয়া যা পরেঅধিক ক্লোরাইড আয়নের সাথে বিক্রিয়া করে ক্লোরোঅয়েট(AuCl4−)আয়ন উৎপন্ন করে। এভাবে দ্রবণ থেকে স্বর্ণের আয়ন অপসারিত হতে থাকে আর ক্লোরোঅরিক এসিডে পরিণত হয়।

বিক্রিয়াটি-

Au + 3HNO3 + 4HCl → HAuCl4 + 3NO2 + 3H2O

Au(s) + 3NO3-(aq) + 6 H+ (aq) → Au3 + (aq) + 3 NO2 (g) + 3H2O (l)

Au3+ (aq) + 4Cl(aq) → AuCl4-(aq)

untitled-2
  চিত্রঃজর্জদ্যাহ্যাভসে

পরে হ্যাভসে তার আত্মজীবনীতে বলেছিলেন, ‘সেই বিকেলটা ছিল শ্বাসরুদ্ধকর এক ঘটনা। একেতো অনেক ভারী মেডেল ছিল, তার উপরআর স্বর্ণও সহজে গলতে চায়না। কিন্তু ভাগ্য ভালো যে সময় যাচ্ছিলো আর স্বর্ণও ধীরে ধীরে বর্ণ হারিয়ে মিশ্রণে পরিণত হচ্ছিল। একসময় কমলা বর্ণের একটা মিশ্রণ পাওয়া গেল।’ নাৎসিরা আসার আগেই এই তরল পদার্থটুকু পরীক্ষাগারের নিরাপদ একটা শেলফে বোতলে করে রেখে দেয়া সম্ভব হয়েছিল। ওরা এসে ভাংচুর, তছনছ করা শুরু করল। লুটপাট করে ওরা ফিরে গেল। কিন্তু অক্ষত রইলো নোবেল মেডেলের ৪৬ ক্যারট স্বর্ণ।

পরবর্তীতেযুদ্ধ শেষের অনেক পরে হ্যাভসে দারুণ এক কাজ করলেন। তিনি পুরো প্রক্রিয়াটার বিপরীত পন্থা চালালেন। তিনি ওই মিশ্রণটাতে প্রথমে ইউরিয়া যোগ করলেন যাতে নাইট্রিক এসিড দ্রবণ থেকে দূরীভূত হয়।

6HNO3 + 5CO(NH2)2 = 8N2 + 5CO2 + 13H2O

এরপর এতে সোডিয়াম মেটা-বাইসালফেট যোগ করে বিক্রিয়া ঘটালেন যাতে কাঙ্ক্ষিত স্বর্ণ পাওয়া যায়।

2HAuCl4 + 2NaHSO3 = 2Au + 4HCl + Na2 SO4 + SO2

উল্লেখ্যহাইড্রোজেন পার-অক্সাইড(H2O2)এবং সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড(NaOH) যোগ করেও বিপরীত বিক্রিয়া চালনো যায়। সবশেষে প্রাপ্ত উৎপাদককে গরম পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে ধাতুতে পরিণত করার জন্য প্রস্তুত করা হয়।

যাহোক,হ্যাভসে স্বর্ণগুলোকে আবার নিজের রূপে ফিরিয়ে আনলেন। ১৯৫০ সালের জানুয়ারীতে ঐ কাঁচা ধাতু তিনি পাঠিয়ে দেন সুইডেনের স্টকহোমে

নোবেল কমিটির কাছে। তারা এই স্বর্ণকে আবার মেডেলে পরিণত করেন এবং দুই বিজ্ঞানীর কাছে ফিরিয়ে দেন যথাযথভাবে।

এত কথা বললাম অথচ এই দুইজন বিজ্ঞানীর নামই বলা হলোনা। তারা হলেন ম্যাক্স ভন লুই(১৯১৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান) আর জেমস ফ্রাংক(১৯২৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান)।

নীলস বোরের নিজেরও নোবেল পদক ছিল। কিন্তু তিনি একই বছরের মার্চের ১২ তারিখে তা নিলামে বিক্রি করে দেন ফিনিশীয় দুর্গতদের জন্য টাকা তোলার উদ্দেশ্যে। নিলামে ক্রেতা নিজেকে প্রকাশ করেননি। পরে অবশ্য তিনি তা ফেরত দেন যা এখন ড্যানিশ হিস্টোরিক্যাল মিউজিয়াম অব ফ্রেডিকবর্গে গেলেই দেখা যাবে। তিনজন নোবেলজয়ী-তিনটা মেডেল। যেগুলো হয় বিক্রি হয়েছে কিংবা দ্রবীভুত হয়েছে,আবার সেই আগের জায়গাতেই ফিরে এলো। যুদ্ধের সময় মেডেলগুলো একটু অন্য ধরনের ভ্রমণ করতে ভালোবাসে বৈকি।

                                                                                                                    হাসনাত বিন জুবায়ের

 

তথ্যসূত্র

১. http://www.npr.org/sections/krulwich/2011/10/03/140815154/dissolve-my-nobel-prize-fast-a-true-story

২. http://goldprocessing.blogspot.com/2011/06/chemical-reaction-aqua-regia-for-gold.html

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

ইতিহাসের উত্তরোত্তর উন্নতির সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রেও ঘটে যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এটি রূপ নিতে থকে এক অভিজাত শিল্প হিসেবে। এর কিছুটা ঝলক বা ছোঁয়া দেখা যায় তৎকালীন পশ্চিম এশিয়ার উর্বর সভ্যতাগুলোতে। বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায়। সেইসাথে তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরানের উর্বর ভূমিগুলোতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের সুমেরীয় এবং তার পরবর্তী আক্কাডীয়, অ্যাসেডীয় আর ব্যাবলনীয় সভ্যতার কিছু কীলক-লিপি থেকে সেই সময়কার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য কাজকর্মের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তখনকার অনেক চিকিৎসক মনে করতেন অসুখ-বিসুখ হয় মূলত জাদুবিদ্যা বা দুষ্ট প্রেতাত্মা দ্বারা এবং এর প্রতিকারও শুধুমাত্র জাদুবিদ্যা দ্বারাই সম্ভব। তারা তথাকথিত তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ আর গাল-মন্দ করে সেই দুষ্ট প্রেতাত্মা তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। এ ধরনের চিকিৎসক বা ওঝাদের নাম ছিল আসিপুস।

আরেক ধরনের চিকিৎসক যারা আসুস নামে পরিচিত ছিলেন তারা বিশ্বাস করতেন কার্যকরী পন্থাগুলোতে। তারা বিভিন্ন ভেষজ তরল মিশ্রণ, ক্ষতস্থান পরিষ্কারকরণ, আক্রান্ত স্থান ম্যাসাজ কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যান্ডেজ ও মলম ব্যবহার করতেন। আসিপুস আর আসুস- এ দু’দলই পাশাপাশি চিকিৎসা চালাতেন। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাহায্য-সহায়তাও করতেন। তবে বাণিজ্যিক ব্যাপারগুলো গোপন রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন।

চিত্রঃ আইনপ্রণেতা হাম্বুরাবি সূর্যদেবতা শামাস থেকে রাজকীয় মর্যাদা নিচ্ছেন।

৩,৮০০ কি ৩,৭৬০ বছর আগে হাম্বুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনের শাসক। কীলক-লিপিতে লিখিত আইনশাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বিশ্বের প্রথম আইন প্রণেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। আর এই আইনশাস্ত্রে চিকিৎসা বিষয়ক কিছু ঘোষণাও ছিল। এই ঘোষণাগুলো চিকিৎসকদের সফলতা আর ব্যর্থতা উভয়ের

জন্যই দায়ী ছিল। রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারলে যেমন পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও বলবৎ ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তির চিকিৎসা করে রোগ সারাতে পারলে ব্রোঞ্জের ল্যান্সেট (বর্তমান ইসরাইলি দশ শেকেলের সমান) দেয়া হতো যা কোনো সওদাগরের এক বছরের আয়েরও অনেক বেশি। আর কোনো দাসের জীবন বাঁচাতে পারলে দেয়া হতো দুই শেকেল। কিন্তু যদি কোনো সার্জনের ছুরির তলায় অভিজাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে সেই সার্জনের এক হাত কেটে নেয়া হতো। সেই সাথে তাকে একজন দাসও হারাতে হতো।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, হাম্বুরাবি আইনে খুব কম নির্দেশনা দেয়া থাকায় ঠিক কী উপায়ে তারা সেই সময় চিকিৎসা চালাতো তা জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো জাদুটোনা, দুষ্ট প্রেতাত্মা অথবা পাপের কারণে অসুখ-বিসুখ হয় এই ধারণা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন ব্যাবলনীয়দের আরোগ্যদেবী। তাকে চিকিৎসকদের পৃষ্টপোষোকতাকারী দেবীও বলা যায়। নিনকার্ককে সাধারণত এক নারীরূপে দেখানো হতো যার সঙ্গী একটি কুকুর কিংবা কুকুরের মাথার মতো কোন মুর্তিকেও নিনকার্ক হিসেবে দেখা হতো। সেসময় রোগীরা রোগমুক্তির জন্য নিনকার্কের মন্দিরে কুকুরের মুর্তি দিত। মাঝে মাঝে কুকুর বলিও দেয়া হতো বলে জানা যায়। কিছু কিছু সূত্র বলে, গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন নেকড়েমুখো কোনো দানবী। এই নিনকার্কের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩,৬০০ বছর আগে ক্যাসিটস নামক এক ব্যাবলনীয় সভ্যতার আমলে। নিনকার্কের প্রধান মন্দির ছিল ঈসিনে (বর্ত্মা ইশান-আল বাহরিয়া, ইরাক) এবং নিপ্পুরে (বর্ত্মান নুফফার-ইন আফক, ইরাক)।

ভেষজ ও অন্যান্য গুল্মলতা প্রতিকারক হিসেবে সেসময় ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। রোগ প্রতিকারের জন্য তারা ওয়াইন, আলুবোখারা (পাম ফলের চাটনি) আর পাইন গাছের রস ব্যবহার করতো। এরসাথে টিকটিকির মল মেশানো হতো যা ঔষধ সহজে গিলতে অসুবিধা সৃষ্টি করলেও ওষুধি ভাব আনতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। এসব ওষুধে অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণও বিদ্যমান ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাধারণ জনগণ ও অভিজাত লোকদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে দেবতা আর আত্মারা এতটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল যে বর্তমান আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখনকার চিকিৎসকদের ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক কাজ আলাদাভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটি আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন এই আলোচনায় ইমহোটেপ নামক এক পুরোহিত চিকিৎসক প্রশ্নবিদ্ধ হন। ইমহোটেপের আমল ছিল প্রায় ৪,৬৫০ বছর পূর্বে। ইমহোটেপ মিশরীয় রাজত্বকালের প্রথমদিকে ছিলেন। খুব দ্রুতই চারদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে জীবদ্দশাতেই তাকে ঈশ্বরপুত্র (Demi-God) হিসেবে সম্মান দেয়া হতো, যে সম্মান সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে সময় শুধুমাত্র রাজকীয় লোকদের এ ধরনের সম্মান জানানো হতো।

তিন হাজার বছর পূর্বে, মিশরীয় নতুন রাজত্বকালে তাকে পুরোপুরি দেবতারূপে গণ্য করা হতো। তাকে বলা হতো, তার পুত্র (Son Of Ptah), সৃষ্টির স্রষ্টা অথবা মহাবিশ্বের রূপকার। সেই সাথে কারিগরদের ত্রাণকর্তা বিশেষণও দেয়া হয়। তার সঙ্গী ছিলেন সেকমেট (Sekhmet)।

এ সেকমেট মিশরীয়দের সিংহকেশী সমর ও আরোগ্যের দেবী। সেই সাথে ইমহোটেপের মাও ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, ইমহোটেপ আসলে ছিলেন ঘেঁটে আর সন্ধি বাতের চিকিৎসক। তিনি এক ধরনের তরল মিশ্রণ বানাতে দক্ষ ছিলেন যা এ ধরনের রোগ ভালো করে দিতো। অন্যান্য সূত্র বলে, তিনি নাকি ছিলেন কিছু ধান্দাবাজ ওঝাদের দলনেতা যে তার অধীনস্থদের সফলতার সুফল ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায়ভার বা নিন্দা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

চিত্রঃ ইমহোটেপের মা দেবী সেকমেট। তিনি সমর এবং আরোগ্য দেবী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন গ্রীসেও ইমহোটেপের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। তবে কখনো কখনো তাকে প্রাচীন গ্রীক আরোগ্যদেবতা অ্যাসলেপিয়াস (Aselepios) এর যমজ ভাই মনে করা হতো। কখনোবা অ্যাসলেপিয়াসকেই ইমহোটেপ বলা হতো।

ইমহোটেপের সময়কালের আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন হেসি-রা, যিনি ফারাও জোসার এর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। হেসি-রা দন্ত চিকিৎসক হিসেবেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। শোনা যায়, দাঁত তোলা আর মুখের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে পটুত্ব ছিল তার। সেইসাথে বর্তমানকালে আমরা যাকে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগ বলি সেটা সম্পর্কেও অল্প বিস্তর ধারণা ছিল। রোগীদের বারবার মূত্র বিসর্জন দেখে এ ধারণা তার মাথায় আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদ অঞ্চলের হোগলাজাতীয় গুল্ম বা ঘাস জাতীয় প্যাপারি থেকে তৈরি প্যাপিরাস থেকে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়, যার একটির নাম- ‘স্মিথ প্যাপিরাস’। বিখ্যাত আমেরিকান মিশরীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংগ্রাহক এডউইন স্মিথের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। তিনিই প্রাচীন এ নথি ১৮৬২ সালে লুক্সর থেকে উদ্ধার করেন।

স্মিথ প্যাপিরাস একদম অসম্পূর্ণ। দেখলে মনে হবে মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া এটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর পুরনো। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক আর শব্দশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি আরো প্রাচীন এক নথি থেকে নকল করা হয়েছে। সেই প্রাচীন নথিটি যথাসম্ভব ইমহোটেপের নিজের হাতে লেখা বা তার অধীনে লেখা। সে সময়ের অন্যান্য প্রাচীন প্যাপিরাসের তুলনায় স্মিথ প্যাপিরাস ঐন্দ্রজালিক বা জাদুকরী চিকিৎসার চেয়ে সাধারণ জখম, ক্ষত, পচন আর অস্ত্রোপচার সম্পর্কেই বেশি তথ্য দেয়। শুধুমাত্র একটি স্থানে আরোগ্য লাভের জন্য ঈশ্বর বা দেবতার কৃপা কামনা করা হয়েছে। নথিটিতে মস্তকের সামনের অংশ থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি আর রক্তের সরবরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্যাপিরাসটি ৪৮ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগেই একদম পরিচিত আধুনিক পদ্ধতির মতো একেকটি সমস্যার বর্ণনা। কারণ, প্রতিকার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং তা সারাবার বিষয়াদিও বিস্তারিতভাবে আছে।

রোগীকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা, রোগীর ইতিহাস নেয়া বর্তমানকালের অত্যাধুনিক চিকিৎসার নিয়ম হলেও প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে দেবতারা শাসন করতেন, সেখানে এরকম পদ্ধতি ছিল কিছুটা অজ্ঞতার আড়ালে থাকা রহস্যের মতো।

এ স্মিথ প্যাপিরাসেই করোটিসন্ধি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া মেনিনজাইটিস (মস্তকের কোষপর্দা) এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা যায়। মাথার ও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যও এতে পাওয়া যায়। স্মিথ প্যাপিরাসে ক্ষতস্থানে সেলাই করা, কাঁচা মাংস ব্যবহার করে রক্তপাত বন্ধ করা এবং মধু ব্যবহার করে রোগ প্রতিকারের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ব্যাপারের কথা বলা যায়। যেমন- একজন লোক, যার মাথায় ক্ষত হয়েছে, তার জন্য প্রথমে মাথাটাকে সঠিকভাবে জায়গানুসারে বিভিন্ন অংশে সেলাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাজা কাঁচা মাংস ক্ষতস্থানে বেঁধে দিতে হবে। এরপর গ্রীজ, মধু এবং অন্যান্য ভেষজ তরল ব্যবহার করতে হবে যতদিন না লোকটি সুস্থ হয়ে উঠে। স্মিথ প্যাপিরসে মূলত অ্যাক্সিডেন্ট সম্পর্কিত কথা বেশি থাকায় ধারণা করা হয় এটি শুধুমাত্র যুদ্ধাহত সৈন্যদের কিংবা পিরামিড বানানোর কারিগরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো। স্মিথ প্যাপিরাসে বর্ণিত ৪৮টি চিকিৎসা ধরনের মধ্যে ১৪ টিকেই চিকিৎসার অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সকল রোগের প্রতিকার সেই সময় তাদের জানা ছিল না।

তখনকার আরেকটি বিখ্যাত পুরাতন নথি বা পুঁথি হলো ইবারস প্যাপিরাস (Ebers Papyrus)। এটি প্রায় স্মিথ প্যাপিরাসের মতোই। এটি ৩,৫০০ বছর আগের বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলেন এটিও অন্য আরেকটি পুঁথির নকল, যথাসম্ভব ইমহোটোপের আমলেরই কোনো নথি হবে।

১৮৭২ সালে জার্মান লেখন এবং মিশরীয় বিশেষজ্ঞ জর্জ ইবারস এ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। তিনি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। সেখানেই এ ইবারস প্যাপিরাস সংরক্ষিত আছে। এতে প্রায় ১১০ পৃষ্ঠা রয়েছে, লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬৬ ফুট আর প্রস্থে ১২ ইঞ্চির মতো।

স্মিথ প্যাপিরাসের সাথে তুলনা করলে ইবারস প্যাপিরাসে শত শত জাদুমন্ত্র আর অভিশাপের মাধ্যমে রোগ সারানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। তবে এটি অন্য নথিগুলোর দিক থেকে সাজসজ্জায় বেশ দুর্বল। তারা জাদুমন্ত্র দিয়ে বাজে, অশুভ প্রেতাত্মা তাড়াবার কৌশল কাজে লাগাতো। পরজীবীর কারণে ঘটিত বাত, ত্বকসমস্যা, আলসার বা পেটের ক্ষত, পায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, হৃদরোগ, প্রস্রাবে অসুবিধা, বিভিন্ন ক্ষত এবং প্রসূতিরোগের চিকিৎসার বিবিধ বিধান এতে পাওয়া যায়।

তবে প্রসূতিরোগ সম্পর্কিত প্যাপিরাস হলো ‘কাহুন গাইনোকোলজিক্যাল প্যাপিরাস। প্রায় ৩,৮০০ বছর আগের এ নথিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রথম নথিগুলার একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে সংরক্ষিত আছে। এতে মূলত নারীদের প্রজনন বিষয়ক ব্যাপার আলোচনা করা হয়েছে। গর্ভধারণে সক্ষমতা, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থার পরীক্ষণ এবং গর্ভনিরোধক ইত্যাদি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের মাসিক এবং সে সম্পর্কিত ব্যথার কথাও আছে। বলা আছে- যে গর্ভবতী মহিলা সবসময় বিছানায় থাকতে ভালোবাসে, তাকে কখনো উঠানো উচিৎ নয়। বরং তাকে নাড়াচাড়া করাও ঠিক নয়। এতে তার গর্ভের বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। তাকে খাওউই নামক একটি জিনিস এক গ্যালনের চতুর্থাংশ খাওয়ানো হয়।

আবার এক চিত্র-বিচিত্র পাত্রকে গর্ভবতীদের জন্য ঐশ্বরিক সুরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এতে করে শয়তান আত্মার হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে প্রাচীনকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো। মজার এবং একই সাথে ভয়ানক এক তথ্য- গর্ভনিরোধক হিসেবে তারা মধু, টক দই আর কুমিরের গোবরের একটা মিশ্রণ নারী যৌনাঙ্গে ব্যবহার করতো।

চিত্রঃ ঐশ্বরিক তাবিজ-কবজ যা অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হতো।

স্মিথ ও ইবারস প্যাপিরাসের কিছুকাল পরেই দ্য হার্স্ট, ব্রুগশ্চ এবং লন্ডন মেডিক্যাল প্যাপিরাস পাওয়া যায়। সমাধি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি, বিভিন্ন হস্ত নির্মিত তৈজসপত্রের সাথে সাথে মমিকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ত্থেকে পুরানো ইতিহাসের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মমিকরণের জন্য মিশরীয় চিকিৎসকরা যে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদিসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তা এমনিতেই বোঝা যায়। তারা এসব কাজে করাত, ড্রিল মেশিন, সাঁড়াশি, কাঁচি ইত্যাদি নানারকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন।

তবে অপারেশনের বা সার্জারি চিকিৎসা মূলত দূর্ঘটনাসমূহ চিকিৎসার সাথে জড়িত ছিল বেশি। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সুষম খাদ্যাভাসের প্রতিও জোর দিতেন। নকল চোখ, নকল দাঁত- এসব বানাতেও তারা দক্ষ ছিলেন। তারপরও সেই সময়কার মিশরীয় সমাজে আত্মিক এবং ঐন্দ্রজালিক চিকিৎসাই প্রধান ভূমিকা রাখতো। তারা ঘাড়, বাহু, হাত, কব্জি কিংবা গোড়ালিতে মাদুলি ব্যবহার করতো। এতে করে ভৌতিক অপদেবতা হতে রক্ষা পাবে বলে মনে করতো তারা। তবে কেউ যদি ভুলে অসুখে পড়ে যায় তবে যৌক্তিক মেডিক্যাল চিকিৎসার চেয়ে ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসাই বেশি প্রাধান্য পেতো।

প্রাচীন মিশরের অস্ত্রপচার ব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের আলাদাভাবে সম্মান দেয়া হতো। জীবনদানকারী ত্রাতারূপে তাঁদের গণ্য করা হতো সমাজের উঁচু স্তরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা করতো তারা। তারা কাটা অংশ সেলাই করতেন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেন। এছাড়া উইলো গাছের পাতা ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টিউমার অপারেশনও করা হতো। এসব অপারেশনে নানা রকম ছুরি ব্যবহার হতো। সেইসাথে পাথরের তৈরি ধারালো বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতিও কাজে লাগাতেন চিকিৎসকরা।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রাচীনকালে ব্যবহৃত নকল পায়ের গোড়ালি পেয়েছেন মিশরে, যার কিছুটা কাঠের আর কিছুটা চামড়ার ও কাপড়ের তৈরি। এ ধরনের প্রস্থেটিক

যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনায় অথবা গ্যাংগ্রিনের কারণে অঙ্গ হারানো মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। এতে করে রোগীরা সহজে ভারসাম্য রেখে প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারতো। বলে রাখা উচিৎ, প্রাচীন মিশরীয়রা ঐতিহ্যগতভাবে পায়ে স্যান্ডেল পরিধান করতো।

চিত্রঃ প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত নকল গোড়ালি।

মমিকরণ

অভিজাত, উঁচু বংশের কিংবা ধনী কেউ মারা গেলে তার মরদেহ মমি করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ বের করে ফেলা হতো। মিশরীয়রা মমি করার ব্যাপারে পরবর্তী অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মতো কুসংস্কারপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঠিক কী উপায়ে তারা এ মমি করতো তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

দ্বিতীয় শতকের রোমান সাম্রাজ্যের কুমির দেবতা সোবেক (Sobek) এর মন্দিরে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল ছুরি, চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেছে। তখন বিশাল এক হূঁকের মাধ্যমে নাকের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্ক বের করা হতো। আর অন্ত্র, যকৃত, পাকস্থলী, ফুফফুস ইত্যাদি শরীরের বাম পাশ কেটে সরানো হতো। এসব কাজ শরীরে পচন শুরু হবার আগেই সমাধা করা হতো।

হার্ট বা হৃদপিণ্ড, যা আবেগের এবং বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা সরানো হতো না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সেটি শরীরের মধ্যেই রেখে দেয়া হতো। আর বাকি সব অঙ্গ বের করে ফেলা হতো।

চিত্রঃ ক্যানোপিক বা অঙ্গ সংরণের পাত্র।

মমিকরণবিদরা শরীর হতে বের করা অঙ্গগুলোকে জলশূন্য করে পুনরায় শরীরে স্থাপন করতেন অথবা ক্যানোপিক (Canopic) নামক এক ধরনের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন। এ পাত্রগুলো ছোট আকৃতির কফিনের মতো দেখতে। এগুলো মমিকৃত দেহের কিংবা কবরের পাশাপাশি স্থানে রাখা হতো।

তথ্যসূত্র

The priest physician of Egypt

পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবী এবং বাঙ্গালী ডাক্তারের আত্মহত্যা

গুটি গুটি পায়ে গ্যালিলিও এসে বিচারকক্ষে প্রবেশ করলেন। বিশাল কক্ষটিতে বিচারকদের আসনে বসে আছেন ধর্মীয় যাজকরা। বাইরে অনেক মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে। একসময় বিচার শুরু হলো। প্রধান ধর্মযাজক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। গ্যালিলিওর দিকে আঙ্গুল তাক করে জিজ্ঞেস করলেন- “এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র হলো পৃথিবী। সকল গ্রহ-নক্ষত্র এমনকি সূর্যও একে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। আপনি কি বাইবেলের এই মহাসত্যকে অস্বীকার করছেন?” গ্যালিলিও তার মাথাটা উঁচু করলেন। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ প্রধান যাজকের দিকে। হঠাৎ তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো, ভ্র জোড়া কুঁচকে ফেললেন। কী যেন ভাবলেন। এরপর মাথাটা নীচের দিকে নামিয়ে কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে আস্তে আস্তে বলে উঠলেন, ‘না’। যাজকদের মধ্যে বিজয়ের ক্রুর হাসি দেখা দিলো। দশর্কদের মধ্যে মৃদু গুজন উঠল। একজন কে জানি বলে উঠল, ‘সত্যকে হত্যা করা হলো’।

ঠিক একইরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল কলকাতার অদূরে। ১৯৭৮ সালের ১৮ ই নভেম্বর। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে গঠিত একটি ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’কে নিযুক্ত করলেন ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় নামক এক অভিযুক্তের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দাবি করেছেন তিনি দূর্গা নামে এক টেস্টটিউব বেবির স্থপতি। দ্বিতীয় অভিযোগ তিনি তার গবেষণার কথা দপ্তরের আমলাদেরকে আগে না জানিয়ে কেন মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন?

কীভাবে তিনি তার সার্দান অ্যাভিনিউর ছোট ফ্ল্যাটে সামান্য কিছু উপকরণ আর একটা ছোট ফ্রিজ ব্যবহার করে এমন একটি অসম্ভব কাজকে সম্ভব করলেন যেখানে অন্যরা গবেষণার সকল উন্নত সুযোগ-সুবিধা পেয়েও সে চিন্তা করতে পারছে না? আর সবচেয়ে বড় অভিযোগ এই যে, তিনি কারো কাছে মাথা নোয়াতেন না। এই বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতি ছিলেন একজন রেডিওফিজিসিস্ট। কমিটির সদস্যদের মধ্যে একজন গাইনোকলোজিস্ট, একজন ফিজিওলজিস্ট আর একজন নিউরোফিজিওলজিস্ট ছিলেন।

মজার বিষয় হলো এদের কারোরই আধুনিক প্রজনন পদ্ধতি (আইভিএফ-ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। একজন বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ওই ভ্রূণগুলো কোথায় রেখেছিলেন?’ ডাঃ মুখোপাধ্যায় জবাব দিলেন, ‘সীল করা অ্যাম্পুলের মধ্যে’। উল্লেখ্য অ্যাম্পুল হলো ইনজেকশনের ওষুধ রাখার জন্য ছোট কাচের বোতল। ফের প্রশ্ন করা হলো, ‘অ্যাম্পুলটাকে সীল করেছেন কীভাবে?’ জবাব এলো, ‘সাধারণভাবে যেভাবে করে। তাপ দিয়ে।’ এভাবেই শুরু হলো জেরা-পাল্টা জেরা। কিছু অবান্তর ভিত্তিহীন, গবেষণার সাথে সম্পর্কহীন প্রশ্ন করে তাকে অপমানের চুড়ান্ত করা হলো। বলা হলো, ‘ওহ-তার মানে আপনি বলতে চাইছেন তাপের কারণে ভ্রূণগুলো নষ্ট হয়ে যায়নি?

এই কমিটি কী রায় দিবে তা যখন পূর্বনির্ধারিতই তখন এটা আর বলার প্রয়োজন নেই যে এর সব কিছুই আমলাতান্ত্রিক কূটনৈতিক চালের কারণে হচ্ছে। কমিটি চূড়ান্ত রায় দিলো, “Everything that Dr. Mukhopadhyay claims is bogus.”

চিত্রঃ ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের অধীনে টেস্টটিউব বেবির জন্মের মাত্র ৬৭ দিন আগে ১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই রাত ১১ টা ৪৫ মিনিটে ইংল্যান্ডের ওল্ডহ্যাম জেনারেল হাসপাতালে পৃথিবীর প্রথম টেস্টটিউব বেবী লুইস ব্রাউন জন্ম নেয়। স্থপতি ছিলেন রবার্ট এডওয়ার্ডস এবং প্যাট্রিক স্টেপটো। এ প্রক্রিয়ায় তারা ল্যাপোরোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্যে ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। এর আগে দীর্ঘ সময় নিয়ে ডিম্বাণুর বিভাজন ও পরিস্ফুটন পর্যবেক্ষণ করেন। তারপর কর্তন প্রক্রিয়ায় ডিম্বাণু সংগ্রহ করে একটা ডিস্কে শুক্রাণুর সাহায্যে সেটাকে নিষিক্ত করেন। এরপর এ থেকে ভ্রূণ উৎপন্ন হলে সেটাকে আবার জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করেন।

কিন্তু ডাঃ মুখোপাধ্যায় এক্ষেত্রে ল্যাপোরোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। এজন্য তিনি এক প্রকার হরমোনের সাহায্যে ডিম্বাণুর সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটান এবং ওখানেই এর বিকাশ সাধন করেন। এরপর ছোট একটা অপারেশনের সাহায্য নিয়ে ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। আর একারণে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও অনেকাংশে বেড়ে যায়।
কিন্তু সহকর্মী এবং সরকারের রোষানলে পড়ে তাকে বরণ করে নিতে হলো করূন পরিণতি।

চিত্রঃ ডা. প্যাট্রিক স্টেপটো এবং ডা. রবার্ট এডওয়ার্ডস।

প্রথমে তাকে বদলী করে দেয়া হলো কলকাতা থেকে বাঁকুড়ার একটি হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে। যাতে তিনি পরবর্তীতে তার গবেষণা চালিয়ে যেতে না পারেন। এরপর তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। ফের চলে এলেন কলকাতায়। চারতলার সিঁড়ি বেয়ে তাকে রোজ কাজ করতে যেতে হতো। জাপান থেকে তার কাজের উপর একটা সেমিনারে বক্তৃতা করার আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে যেতে দেয়া হয়নি। চুড়ান্ত অপমান, উপহাস আর লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করার পর ১৯৮২ সালে ১৯ শে জুন এই মহান প্রতিভাবান ফিজিশিয়ান নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন।

আরো একবার যেন সত্যকে হত্যা করা হলো। ভারতের সরকার স্বীকৃত প্রথম টেস্টটিউব বেবীর স্থপতি হলেন ডা. টি এস আনন্দ কুমার যিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিচার্সের ডিরেক্টর। ১৯৮৬ সালের ১৬ ই আগস্ট তার অধীনে জন্ম নেয় ভারতের প্রথম (পড়ুন দ্বিতীয়) টেস্টটিউব বেবী হর্ষ।

১৯৯৭ সালে ডা. আনন্দ একটা বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিতে আসেন। তখন ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণার সকল কাগজপত্র তার হাতে তুলে দেয়া হয়। নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করে এবং সেই টেস্টটিউব বেবী যার জন্ম হয়েছিল ডাঃ সুভাষের অধীনে-দূর্গা সেই শিশুটির মা-বাবার সাথে আলাপ-আলোচনা করে তিনি নিশ্চিত হন যে, ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের প্রথম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবীর স্থপতি। ডাঃ টি সি আনন্দ কুমারের উদ্যোগেই তিনি পরে ভারতবর্ষের স্বীকৃতি পান।

চিত্রঃ দূর্গা।

দূর্গা এখন দিল্লীতে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি তার ২৫ তম জন্ম বার্ষিকীতে প্রথম মিডিয়ার সামনে আসেন এবং নিজের জনক ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ব্যাপারে কথা বলেন। সেই সাথে এটাও প্রমাণ করে দেন যে ডা. সুভাষের দাবী নিতান্তই অমূলক বা বোগাস ছিল না।

ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন প্রকাশিত মেডিক্যাল ‘ডিকশনারী অব মেডিক্যাল বায়োগ্রাফি’ প্রকাশিত বইতে পৃথিবীর ১০০ দেশের ১১০০ মেডিক্যাল সায়েন্টিস্টের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে যারা এই চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন। আর এই তালিকায় ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নামও রয়েছে।

যুগে যুগে মানুষের কাজের স্বীকৃতি পেতে মানুষকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে, বরণ করে নিতে হয়েছে লাঞ্ছনা, অপমান আর উপহাস-ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। যেকোনো নতুন কাজের শুরুতেই সমাজ বাধা দিয়ে এসেছে। কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। আর আমরা বাঙালীরা এই দিক দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে। কি সাহিত্য কি বিজ্ঞান কি অন্য যেকোনো বিষয়, সবক্ষেত্রেই আমরা জীবদ্দশায় কৃতী ব্যক্তির সম্মান দিতে অপারগ থেকেছি। ডা. সুভাষের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। উল্লেখ্য, ডা. সুভাষের কাজের উপর ভিত্তি করে গুণী পরিচালক তপন সিনহা ১৯৯০ সালে একটি সিনেমা বানিয়েছেন। নাম ‘এক ডাক্তার কি মউত’। এই সিনেমার জন্য তিনি বেস্ট ডিরেকশনের অ্যাওয়ার্ড পান।

চিত্রঃ ‘এক ডাক্তার কি মউত’ সিনেমার একটি দৃশ্য।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের প্রথম টেস্টটিউব বেবীর জন্ম হয় ২০০১ সালে ২৯ মে ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালে। একইসাথে হীরা, মণি ও মুক্তা নামে তিনটি শিশুর জন্ম হয়। ডাক্তার ছিলেন পারভীন ফাতেমা।

চিত্রঃ মা-বাবার কোলে হীরা, মণি আর মুক্তা।

২০১০ সালে স্যার রবার্ট এডওয়ার্ডকে ইন-ভিট্রো পদ্ধতি উদ্ভাবন করে চিকিৎসাশাস্ত্রে অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় ভাইরাস কলেজের ছাত্রদের একটা কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, চাঁদে প্রথম পা রেখেছিলেন কে? প্রায় সকলেই উত্তর দিতে পেরেছিল। কিন্তু কে দ্বিতীয় হয়েছেন তা কেউ বলতে পারেনি। ডাঃ সুভাষের ক্ষেত্রে এমনই ঘটলো। মাত্র অল্প ক’দিনের ব্যবধানে তিনি প্রথম টেস্টটিঊবের জনক হতে পারলেন না। তাতে কী হয়েছে? তিনি বাঙ্গালী। আর সে কারণেই আমাদের তাকে স্মরণ করা উচিত। হয়তো ২০১০ সালের নোবেল বাঙ্গালীদের ঘরেই আসতো। সে আফসোস করে লাভ নেই। বরং এদেশীয় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে যারা কাজ করছেন তারা অনুপ্রাণিত হয়ে সঠিকভাবে পৃথিবীর মঞ্চতে মাথা উঁচু করতে পারবেন সেই চেষ্টা যাতে অব্যাহত থাকে এই কামনা করতে পারি।

তথ্যসূত্রঃ

লেখাটি The Great Scientist Dr.Subash Mukhopadhyay এর স্বেচ্ছাচারী বঙ্গানুবাদ। পাশাপাশি অন্যান্য সূত্র থেকেও সাহায্য নেয়া হয়েছে।

জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এক দুর্ভাগা

খুব কাছের এক বন্ধু। নানা কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছাত্রজীবনের আপাত ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছে না। তার মতে সে যা-ই করে তাতেই বিপত্তি বাঁধে। ‘সাফল্য’ শব্দটা নাকি তার অভিধানেই নেই। এই দুঃখে কিছু করতেও চায় না। কিছুদিন আগে পথ চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে বসেছে। হাসপাতালের বেডে বসে ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখে।

সেদিন তাকে দেখতে গেলাম। একথা সেকথা বলার পর বন্ধু আমার জিগ্যেস করে বসল- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে অভাগা কে বলতে পারিস?’। জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই বললো- ‘এই যে মূর্তিমান আমি।’ হেসে মাথা নাড়লাম, ‘উহু। তোর চেয়েও অভাগা আছে রে।’ এই বলে তাকে এক দুর্ভাগা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাহিনী বললাম। শুনে তার মুখে আর রা কাড়ে না।

গুইলিয়াম জোসেফ হায়াসিন্থ জাঁ বাপটিস্ট লে জেন্টিল ডে লা গ্যালাইসিয়েরে। এই ইয়া বড় নামখানা আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোকের। আমরা তাকে লে জেন্টিল সাহেব বলবো। জন্ম ১৭২৫ সালে। জাতে ফরাসী। কাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা আর অংক কষা। মানে জ্যোতির্বিদ। এগারোটি বছর বেচারা এমন এক কাজের পিছনে সারা দুনিয়া জুড়ে দৌড়েছেন যেটা সম্পন্ন করতে পারলে অন্যভাবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হতো।

চিত্রঃ জ্যোতির্বিদ লে জেন্টিল।

সেটা বলার আগে কিছু ভারী কথা বলে নেই। ১৫৪৩ সালে কোপার্নিকাসের এবং ১৫৮৮ সালে টাইকো ব্রাহের কোপার্নিকাসকে সমর্থন করে দেয়া সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী গ্রহ দুটির (বুধ ও শুক্র) ট্রানজিট ঘটে। ট্রানজিট মানে অতিক্রম। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে করতে এই গ্রহগুলো এক সময় পৃথিবীর সামনে দিয়ে যাবে। তখন সূর্য থেকে আসা আলোর কিছু অংশ এই গ্রহ বা জ্যোতিষ্ক ঢেকে দিবে যার ফলে পৃথিবী থেকে এদের স্পষ্ট দেখা যাবে এবং শনাক্ত করা যাবে।

এই ট্রানজিটগুলো খুবই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় পর পর ট্রানজিট ঘটে থাকে। শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে এ ক্রমটিকে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে- একটি শুক্র সরণের ঠিক ১০৫.৫ বছর পর আরেকটি শুক্র সরণ হয় যার ঠিক আট বছর পর আরো একটি শুক্র সরণ হয় আবার এই শুক্র সরণটির ১২১.৫ বছর পর একটি শুক্র সরণ হয় এবং এর আট বছর পর আবার একটি শুক্র সরণ ঘটে এভাবে প্রতি ২৪৩ বছরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

কেপলার সর্বপ্রথম ১৬৩১ সালে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করলেও তার পর্যবেক্ষণে ত্রুটি ছিল। এর চেয়ে বড় কথা হলো তিনি এর আট বছর পরের শুক্র সরণটি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার হিসাব-নিকাশকে সংশোধন করে পরবর্তী শুক্র সরণের দিন তারিখ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সমর্থ হন আরেক প্রতিথযশা মেধাবী জ্যোতির্বিদ জেরেমিয়াহ হরকস্‌। তিনি সূর্য আর শুক্রের আকারের উপর ভিত্তি করে একটি প্যারালাক্স বা লম্বন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং তা থেকে পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে সমর্থ হন।

চিত্রঃ শুক্রের ট্রানজিট। সূর্যের সামনে শুক্রকে একটি বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তার ধারণা সঠিক ছিল না। এখন কী করা যায়? আমাদের তো সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব জানতে হবে। সেই লক্ষ্যে আরেক বিজ্ঞানী জেমস গ্রেগরি তার ‘Optica promota’ গ্রন্থে একটা ট্রানজিট শুরু ও শেষ হবার সময়কে হিসেবে ধরে আর সেই সাথে ত্রিকোণমিতির সূত্রকে কাজে লাগিয়ে একটা প্যারালাক্সের স্কেচ আঁকেন। এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভুবন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালি ১৫৭৭ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বুধের ট্রানজিট নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি ১৭১৬ সালে এক সম্মেলনে এই ধরনের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য সকল জ্যোতির্বিদদের অনুরোধ করেন। কারণ এ থেকে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্ব আরো নির্ভুলভাবে বের করা সম্ভব হবে। এবং আশা করেন যে, পৃথিবীর সকল জায়গা থেকেই পর্যবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হবে। হ্যালি যদিও অনেকদিন বেঁচে ছিলেন কিন্তু তিনি ১৭৬১ সালে সংঘটিত শুক্রের ট্রানজিট দেখে যেতে পারেননি।

১৭৫০ সালের দিকে জ্যোতির্বিদ মিখাইল লোমোনোসভ প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞানীকে ১৭৬১ সালের শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের সেরা সেরা টেলিস্কোপ আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন।

আমাদের লে জেন্টিল সাহেব French Academy of Science থেকে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচিত হলেন। তিনি ঠিক করলেন এই পর্যবেক্ষণের কাজ করার জন্য ভারতের ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে যাবেন। সেই লক্ষ্যে জাহাজে উঠলেন ১৭৬০ সালে। যেহেতু তখন সুয়েজ খাল বলে কিছু ছিল না তাই তাকে আফ্রিকা ঘুরে অনেক পথ অতিক্রম করে ভারতের পথে যেতে হবে। প্রায় পনের মাসের জাহাজ ভ্রমণ। ট্রানজিট হবে ১৭৬১ সালের জুন মাসে। তার আগেই তাকে পন্ডিচেরি পৌঁছতে হবে। যাত্রাপথে তিনি থামলেন তখনকার Isle De France-এ, বর্তমানে যা Mauritis নামে পরিচিত। ১৭৬০ সালের মার্চে ফ্রান্স ছাড়েন আর মরিশাসে এসে পৌঁছেন জুলাইতে। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে পন্ডিচেরির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেন।

এই সময়ে তিনি জানতে পারেন, পন্ডিচেরিতে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের মধ্যে ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে। ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এবার তিনি একটা ফরাসী রণতরীতে উঠলেন যেটা যাচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের করোমানডেলে। হাতে আছে মাত্র তিন মাস।

কিন্তু এই না শুরু ভাগ্যের খেল। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন ব্রিটিশদের সাথে ফরাসীদের যুদ্ধের উন্নতির খবর পেয়ে জাহাজের নাক ঘুরিয়ে দিলেন আবার মরিশাসের দিকে। আর জেন্টিলকে জাহাজের উপর থেকেই শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের মহামূল্যবান উপদেশ দিলেন। বেচারা জেন্টিল আর কী করবে! জাহাজের উপর থেকেই কাজ চালালেন। কিন্তু জাহাজ তো নড়ছিল সবসময়ই। মাপজোখ সঠিক হলো না। তার পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো কাজেই আসবে না। হতাশ মনোরথে তিনি ফিরে এলেন মরিশাসে।

এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, আট বছর পরে আবার যে ট্রানজিট হবে তা তিনি এশিয়াতে থেকেই পর্যবেক্ষণ করবেন। এই সময় আর কোথাও যাবেন না। আট বছর থেকে যাবেন পন্ডিচেরির আশেপাশে। আবিষ্কারের নেশায় মানুষ কত কিছুই না করে। ১৭৬৯ সালের পর শুক্রের ট্রানজিট হবে আবার ১৮৬৯ সালে। মানে ঠিক একশ বছর পর। জেন্টিলের হাতে আর একবারই সুযোগ আছে।

সময় যেতে থাকলো। জেন্টিলও বসে রইলেন না। ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত, প্রাণীদের নমুনা এইসব সংগ্রহ করতে লাগলেন। মাটি, জোয়ার-ভাটা, চুম্বকত্ব, বায়ু ইত্যাদি সম্পর্কেও পড়াশুনা চালালেন। সাথে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যাটাও ঝালিয়ে নিলেন। বিখ্যাত মাদাগাস্তার দ্বীপে ঘুরাঘুরি করলেন এইসব কাজে।

চিত্রঃ জেন্টিলের গমনপথ।

সময় যায় আর শুক্রের সাথে তার অ্যাপয়নমেন্টও এগিয়ে আসে। এদিকে একাডেমী ঘোষণা দিলো যে, ফিলিপাইনের ম্যানিলা শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হবে। ম্যানিলা তখন ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ।

তিনি শেষমেশ ম্যানিলা যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৭৬৬ সালে একটা স্প্যানিশ জাহাজে চড়ে চলে এলেন ফিলিপাইনে। কিন্তু ফিলিপাইনে দিন খুব একটা ভালো কাটলো না। সেখানকার স্প্যানিশ গভর্নর তার সাথে বাজে ব্যবহার করলো এবং তাকে স্পাই ভেবে বসলো। ফলস্বরূপ ম্যানিলা থেকে বিতাড়িত জেন্টিল কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেন আবার সেই পন্ডিচেরিতে। ভালো খবর এই যে, ইতোমধ্যে ফরাসী এবং ব্রিটিশদের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি হয়েছে। ব্রিটিশরাও তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো, এমনকি তাকে উন্নতমানের একটি টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণের অন্যান্য সব ব্যবস্থাও করে দিলো। তার হাতে এক বছর সময়। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আবহাওয়ার প্রতিও নজর রাখছেন।

১৭৬৯ সালের জুনের তিন তারিখ। ট্রানজিটের আগের দিন। ব্রিটিশ গভর্নরকে বৃহস্পতির দারুণ সব ভিউ দেখিয়ে সন্তষ্ট করালেন তিনি। পর্যবেক্ষণের জন্য মোটামুটি সবকিছুই তার অনুকূলে। ঐদিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কোনোমতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই চোখ বন্ধ করতে পারছিলাম না।’ পরদিন ট্রানজিটের সময়কাল জুড়ে হঠাৎ করেই সূর্যের সামনে কালো কালো মেঘ জমতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে কুয়াশা আর মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। ট্রানজিট শেষ হলো আর আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল। জেন্টিল হতাশায় নিমগ্ন হয়ে গেলেন। আট বছরের অপেক্ষা পুরো মাটি হয়ে গেল। কাটা গায়ে নুনের ছিটা হিসেবে সেদিন ম্যানিলার আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল। ঐ জায়গা ছিল ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য পারফেক্ট।

জেন্টিল তার জার্নালে লিখেন ‘আমি প্রায় দশ হাজার লিগ (এক লিগ প্রায় তিন মাইলের সমান) অতিক্রম করেছি। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজের মাতৃভূমি থেকে এতদূরে এসে রইলাম শুধু পর্যবেক্ষণের সময় সূর্যের সামনে এক টুকরো মেঘ দেখার জন্য? আমার কষ্ট আর ধৈর্য্যের ফলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যই যেন এই মেঘের আবির্ভাব হয়েছিল।’

এখানেই শেষ না। হতাশ, ক্লান্ত এবং ব্যর্থ জেন্টিল নয় বছর আগে ছেড়ে আসা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবার জন্য রওনা দিলেন। এখানে বলে নেই, রওনা হবার আগে তিনি ডায়রিয়াতে ভুগছিলেন। ফ্রান্সে যাবার পথে থামলেন মরিশাসে। সাল ১৭৭০। এখানে কিছুদিন থেকে আবার রওনা হলেন। এবার জাহাজ ‘কেপ অব গুড হোপ’ দ্বীপের কাছাকাছি জায়গায় ঝড়ের কবলে পড়ল। এবং ভাঙ্গা নড়বড়ে জাহাজ আবার ফিরে এলো মরিশাসে। সাল ১৭৭১।

এদিকে এখানে এসে ইউরোপে ফিরে যাবার জন্য কোনো জাহাজ পাচ্ছেন না। অনেক চেষ্টা আর খোঁজাখুঁজির পরে এক স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তাকে ইউরোপে নিতে রাজি হলো। এরপর কাডিজ নামক একটা বন্দর হয়ে ফ্রান্সে ফিরে এলেন ১৭৭১ সালের ৮ই আগস্ট। ১১ বছর পর।

কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। কাহিনীর নাটকীয়তা এবার চরমে। বহুদিন জেন্টিলের কোনো খবর না পাওয়ায় তার আত্মীয় স্বজনরা ধরে নিয়েছিল সে মারা গেছে। সে এসে জানল তার স্ত্রী অন্য একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। স্বজনরা তার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। অন্যদিকে একাডেমীতে তার সদস্যপদও অন্য একজনকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। সম্পত্তি ফিরে পেতে জেন্টিল আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করল। তাকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে সে এখনো জীবিত! এই মামলা পরিচালনার জন্য যে টাকা দরকার তা ছিল মামলা পরিচালনা করার জন্য যে অ্যাটর্নি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার কাছে। অ্যাটর্নি আবার তার সাথে দেখা করতে আসার সময় ডাকাতদের কবলে পড়ে টাকা-পয়সা সব খোয়ায়।

মামলা পরিচালনার টাকা না থাকায় জেন্টিল হেরে যান। সম্পত্তি আর একাডেমীর সদস্যপদ হাতছাড়া হয়েই রইলো। বরং উল্টো তাকেই বিচারের রায়ে দণ্ডিত করা হয়। তবে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে মামলাটা একাডেমির বিরুদ্ধে ছিল। অবশ্য একাডেমি কিংবা আত্মীয় স্বজনদের দোষ ছিল না। তার এতদিনের বাইরে সফরকালে কোনো চিঠিই এসে ফ্রান্সে তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি।

তিনি আবার বিচারের জন্য আবেদন করেন। এবার রাজার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনি তার সদস্যপদ আর সহায়-সম্পত্তি ফিরে পান। কাহিনী শেষটুকু ভালোই। তিনি আবার বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে তার একটা কন্যাসন্তান হয়। শেষজীবনে এই কন্যার সেবা পেয়েই কাটে তার।

তবে আরো একটু দুঃখের খবর দেই। তার সংগৃহীত সকল প্রাকৃতিক নমুনা মরিশাস থেকে প্রথমবার ফ্রান্সে আসার সময় জাহাজ ঝড়ে কবলিত হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ১৯৩৫ সালে, বিজ্ঞানীরা তার নামে একটা লুনার ক্রেটারের নামকরণ করেন ‘লে জেন্টিল’। লুনার ক্রেটার হলো চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা বিভিন্ন গর্ত। জেন্টিলের নিজেরও কিছু অবদান আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানিক একশটি বস্তুর সেট- মেজার বস্তু, এম-৩২, এম-৩৬ এবং এম-৩৮ আবিষ্কার করেন। পাশাপাশি একটি নীহারিকার ক্যাটালগও তৈরি করেন তিনি।

তথ্যসূত্র

১. https://princetonastronomy.wordpress.com/2012/02/06/the-ordeal-of-guillaume-le-gentil

২. http://www.astroevents.no/venushist2aen.html

৩. https://thonyc.wordpress.com/2010/09/13/born-under-a-bad-sign

৪. https://www.youtube.com/watch?v=Qa8hFCoxx2E

জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এক দুর্ভাগা

খুব কাছের এক বন্ধু। নানা কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছাত্রজীবনের আপাত ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছে না। তার মতে সে যা-ই করে তাতেই বিপত্তি বাঁধে। ‘সাফল্য’ শব্দটা নাকি তার অভিধানেই নেই। এই দুঃখে কিছু করতেও চায় না। কিছুদিন আগে পথ চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে বসেছে। হাসপাতালের বেডে বসে ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখে।

সেদিন তাকে দেখতে গেলাম। একথা সেকথা বলার পর বন্ধু আমার জিগ্যেস করে বসল- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে অভাগা কে বলতে পারিস?’। জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই বললো- ‘এই যে মূর্তিমান আমি।’ হেসে মাথা নাড়লাম, ‘উহু। তোর চেয়েও অভাগা আছে রে।’ এই বলে তাকে এক দুর্ভাগা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাহিনী বললাম। শুনে তার মুখে আর রা কাড়ে না।

গুইলিয়াম জোসেফ হায়াসিন্থ জাঁ বাপটিস্ট লে জেন্টিল ডে লা গ্যালাইসিয়েরে। এই ইয়া বড় নামখানা আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোকের। আমরা তাকে লে জেন্টিল সাহেব বলবো। জন্ম ১৭২৫ সালে। জাতে ফরাসী। কাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা আর অংক কষা। মানে জ্যোতির্বিদ। এগারোটি বছর বেচারা এমন এক কাজের পিছনে সারা দুনিয়া জুড়ে দৌড়েছেন যেটা সম্পন্ন করতে পারলে অন্যভাবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হতো।

চিত্রঃ জ্যোতির্বিদ লে জেন্টিল।

সেটা বলার আগে কিছু ভারী কথা বলে নেই। ১৫৪৩ সালে কোপার্নিকাসের এবং ১৫৮৮ সালে টাইকো ব্রাহের কোপার্নিকাসকে সমর্থন করে দেয়া সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী গ্রহ দুটির (বুধ ও শুক্র) ট্রানজিট ঘটে। ট্রানজিট মানে অতিক্রম। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে করতে এই গ্রহগুলো এক সময় পৃথিবীর সামনে দিয়ে যাবে। তখন সূর্য থেকে আসা আলোর কিছু অংশ এই গ্রহ বা জ্যোতিষ্ক ঢেকে দিবে যার ফলে পৃথিবী থেকে এদের স্পষ্ট দেখা যাবে এবং শনাক্ত করা যাবে।

এই ট্রানজিটগুলো খুবই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় পর পর ট্রানজিট ঘটে থাকে। শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে এ ক্রমটিকে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে- একটি শুক্র সরণের ঠিক ১০৫.৫ বছর পর আরেকটি শুক্র সরণ হয় যার ঠিক আট বছর পর আরো একটি শুক্র সরণ হয় আবার এই শুক্র সরণটির ১২১.৫ বছর পর একটি শুক্র সরণ হয় এবং এর আট বছর পর আবার একটি শুক্র সরণ ঘটে এভাবে প্রতি ২৪৩ বছরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

কেপলার সর্বপ্রথম ১৬৩১ সালে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করলেও তার পর্যবেক্ষণে ত্রুটি ছিল। এর চেয়ে বড় কথা হলো তিনি এর আট বছর পরের শুক্র সরণটি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার হিসাব-নিকাশকে সংশোধন করে পরবর্তী শুক্র সরণের দিন তারিখ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সমর্থ হন আরেক প্রতিথযশা মেধাবী জ্যোতির্বিদ জেরেমিয়াহ হরকস্‌। তিনি সূর্য আর শুক্রের আকারের উপর ভিত্তি করে একটি প্যারালাক্স বা লম্বন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং তা থেকে পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে সমর্থ হন।

চিত্রঃ শুক্রের ট্রানজিট। সূর্যের সামনে শুক্রকে একটি বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তার ধারণা সঠিক ছিল না। এখন কী করা যায়? আমাদের তো সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব জানতে হবে। সেই লক্ষ্যে আরেক বিজ্ঞানী জেমস গ্রেগরি তার ‘Optica promota’ গ্রন্থে একটা ট্রানজিট শুরু ও শেষ হবার সময়কে হিসেবে ধরে আর সেই সাথে ত্রিকোণমিতির সূত্রকে কাজে লাগিয়ে একটা প্যারালাক্সের স্কেচ আঁকেন। এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভুবন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালি ১৫৭৭ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বুধের ট্রানজিট নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি ১৭১৬ সালে এক সম্মেলনে এই ধরনের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য সকল জ্যোতির্বিদদের অনুরোধ করেন। কারণ এ থেকে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্ব আরো নির্ভুলভাবে বের করা সম্ভব হবে। এবং আশা করেন যে, পৃথিবীর সকল জায়গা থেকেই পর্যবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হবে। হ্যালি যদিও অনেকদিন বেঁচে ছিলেন কিন্তু তিনি ১৭৬১ সালে সংঘটিত শুক্রের ট্রানজিট দেখে যেতে পারেননি।

১৭৫০ সালের দিকে জ্যোতির্বিদ মিখাইল লোমোনোসভ প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞানীকে ১৭৬১ সালের শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের সেরা সেরা টেলিস্কোপ আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন।

আমাদের লে জেন্টিল সাহেব French Academy of Science থেকে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচিত হলেন। তিনি ঠিক করলেন এই পর্যবেক্ষণের কাজ করার জন্য ভারতের ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে যাবেন। সেই লক্ষ্যে জাহাজে উঠলেন ১৭৬০ সালে। যেহেতু তখন সুয়েজ খাল বলে কিছু ছিল না তাই তাকে আফ্রিকা ঘুরে অনেক পথ অতিক্রম করে ভারতের পথে যেতে হবে। প্রায় পনের মাসের জাহাজ ভ্রমণ। ট্রানজিট হবে ১৭৬১ সালের জুন মাসে। তার আগেই তাকে পন্ডিচেরি পৌঁছতে হবে। যাত্রাপথে তিনি থামলেন তখনকার Isle De France-এ, বর্তমানে যা Mauritis নামে পরিচিত। ১৭৬০ সালের মার্চে ফ্রান্স ছাড়েন আর মরিশাসে এসে পৌঁছেন জুলাইতে। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে পন্ডিচেরির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেন।

এই সময়ে তিনি জানতে পারেন, পন্ডিচেরিতে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের মধ্যে ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে। ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এবার তিনি একটা ফরাসী রণতরীতে উঠলেন যেটা যাচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের করোমানডেলে। হাতে আছে মাত্র তিন মাস।

কিন্তু এই না শুরু ভাগ্যের খেল। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন ব্রিটিশদের সাথে ফরাসীদের যুদ্ধের উন্নতির খবর পেয়ে জাহাজের নাক ঘুরিয়ে দিলেন আবার মরিশাসের দিকে। আর জেন্টিলকে জাহাজের উপর থেকেই শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের মহামূল্যবান উপদেশ দিলেন। বেচারা জেন্টিল আর কী করবে! জাহাজের উপর থেকেই কাজ চালালেন। কিন্তু জাহাজ তো নড়ছিল সবসময়ই। মাপজোখ সঠিক হলো না। তার পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো কাজেই আসবে না। হতাশ মনোরথে তিনি ফিরে এলেন মরিশাসে।

এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, আট বছর পরে আবার যে ট্রানজিট হবে তা তিনি এশিয়াতে থেকেই পর্যবেক্ষণ করবেন। এই সময় আর কোথাও যাবেন না। আট বছর থেকে যাবেন পন্ডিচেরির আশেপাশে। আবিষ্কারের নেশায় মানুষ কত কিছুই না করে। ১৭৬৯ সালের পর শুক্রের ট্রানজিট হবে আবার ১৮৬৯ সালে। মানে ঠিক একশ বছর পর। জেন্টিলের হাতে আর একবারই সুযোগ আছে।

সময় যেতে থাকলো। জেন্টিলও বসে রইলেন না। ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত, প্রাণীদের নমুনা এইসব সংগ্রহ করতে লাগলেন। মাটি, জোয়ার-ভাটা, চুম্বকত্ব, বায়ু ইত্যাদি সম্পর্কেও পড়াশুনা চালালেন। সাথে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যাটাও ঝালিয়ে নিলেন। বিখ্যাত মাদাগাস্তার দ্বীপে ঘুরাঘুরি করলেন এইসব কাজে।

চিত্রঃ জেন্টিলের গমনপথ।

সময় যায় আর শুক্রের সাথে তার অ্যাপয়নমেন্টও এগিয়ে আসে। এদিকে একাডেমী ঘোষণা দিলো যে, ফিলিপাইনের ম্যানিলা শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হবে। ম্যানিলা তখন ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ।

তিনি শেষমেশ ম্যানিলা যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৭৬৬ সালে একটা স্প্যানিশ জাহাজে চড়ে চলে এলেন ফিলিপাইনে। কিন্তু ফিলিপাইনে দিন খুব একটা ভালো কাটলো না। সেখানকার স্প্যানিশ গভর্নর তার সাথে বাজে ব্যবহার করলো এবং তাকে স্পাই ভেবে বসলো। ফলস্বরূপ ম্যানিলা থেকে বিতাড়িত জেন্টিল কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেন আবার সেই পন্ডিচেরিতে। ভালো খবর এই যে, ইতোমধ্যে ফরাসী এবং ব্রিটিশদের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি হয়েছে। ব্রিটিশরাও তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো, এমনকি তাকে উন্নতমানের একটি টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণের অন্যান্য সব ব্যবস্থাও করে দিলো। তার হাতে এক বছর সময়। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আবহাওয়ার প্রতিও নজর রাখছেন।

১৭৬৯ সালের জুনের তিন তারিখ। ট্রানজিটের আগের দিন। ব্রিটিশ গভর্নরকে বৃহস্পতির দারুণ সব ভিউ দেখিয়ে সন্তষ্ট করালেন তিনি। পর্যবেক্ষণের জন্য মোটামুটি সবকিছুই তার অনুকূলে। ঐদিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কোনোমতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই চোখ বন্ধ করতে পারছিলাম না।’ পরদিন ট্রানজিটের সময়কাল জুড়ে হঠাৎ করেই সূর্যের সামনে কালো কালো মেঘ জমতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে কুয়াশা আর মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। ট্রানজিট শেষ হলো আর আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল। জেন্টিল হতাশায় নিমগ্ন হয়ে গেলেন। আট বছরের অপেক্ষা পুরো মাটি হয়ে গেল। কাটা গায়ে নুনের ছিটা হিসেবে সেদিন ম্যানিলার আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল। ঐ জায়গা ছিল ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য পারফেক্ট।

জেন্টিল তার জার্নালে লিখেন ‘আমি প্রায় দশ হাজার লিগ (এক লিগ প্রায় তিন মাইলের সমান) অতিক্রম করেছি। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজের মাতৃভূমি থেকে এতদূরে এসে রইলাম শুধু পর্যবেক্ষণের সময় সূর্যের সামনে এক টুকরো মেঘ দেখার জন্য? আমার কষ্ট আর ধৈর্য্যের ফলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যই যেন এই মেঘের আবির্ভাব হয়েছিল।’

এখানেই শেষ না। হতাশ, ক্লান্ত এবং ব্যর্থ জেন্টিল নয় বছর আগে ছেড়ে আসা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবার জন্য রওনা দিলেন। এখানে বলে নেই, রওনা হবার আগে তিনি ডায়রিয়াতে ভুগছিলেন। ফ্রান্সে যাবার পথে থামলেন মরিশাসে। সাল ১৭৭০। এখানে কিছুদিন থেকে আবার রওনা হলেন। এবার জাহাজ ‘কেপ অব গুড হোপ’ দ্বীপের কাছাকাছি জায়গায় ঝড়ের কবলে পড়ল। এবং ভাঙ্গা নড়বড়ে জাহাজ আবার ফিরে এলো মরিশাসে। সাল ১৭৭১।

এদিকে এখানে এসে ইউরোপে ফিরে যাবার জন্য কোনো জাহাজ পাচ্ছেন না। অনেক চেষ্টা আর খোঁজাখুঁজির পরে এক স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তাকে ইউরোপে নিতে রাজি হলো। এরপর কাডিজ নামক একটা বন্দর হয়ে ফ্রান্সে ফিরে এলেন ১৭৭১ সালের ৮ই আগস্ট। ১১ বছর পর।

কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। কাহিনীর নাটকীয়তা এবার চরমে। বহুদিন জেন্টিলের কোনো খবর না পাওয়ায় তার আত্মীয় স্বজনরা ধরে নিয়েছিল সে মারা গেছে। সে এসে জানল তার স্ত্রী অন্য একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। স্বজনরা তার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। অন্যদিকে একাডেমীতে তার সদস্যপদও অন্য একজনকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। সম্পত্তি ফিরে পেতে জেন্টিল আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করল। তাকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে সে এখনো জীবিত! এই মামলা পরিচালনার জন্য যে টাকা দরকার তা ছিল মামলা পরিচালনা করার জন্য যে অ্যাটর্নি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার কাছে। অ্যাটর্নি আবার তার সাথে দেখা করতে আসার সময় ডাকাতদের কবলে পড়ে টাকা-পয়সা সব খোয়ায়।

মামলা পরিচালনার টাকা না থাকায় জেন্টিল হেরে যান। সম্পত্তি আর একাডেমীর সদস্যপদ হাতছাড়া হয়েই রইলো। বরং উল্টো তাকেই বিচারের রায়ে দণ্ডিত করা হয়। তবে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে মামলাটা একাডেমির বিরুদ্ধে ছিল। অবশ্য একাডেমি কিংবা আত্মীয় স্বজনদের দোষ ছিল না। তার এতদিনের বাইরে সফরকালে কোনো চিঠিই এসে ফ্রান্সে তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি।

তিনি আবার বিচারের জন্য আবেদন করেন। এবার রাজার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনি তার সদস্যপদ আর সহায়-সম্পত্তি ফিরে পান। কাহিনী শেষটুকু ভালোই। তিনি আবার বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে তার একটা কন্যাসন্তান হয়। শেষজীবনে এই কন্যার সেবা পেয়েই কাটে তার।

তবে আরো একটু দুঃখের খবর দেই। তার সংগৃহীত সকল প্রাকৃতিক নমুনা মরিশাস থেকে প্রথমবার ফ্রান্সে আসার সময় জাহাজ ঝড়ে কবলিত হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ১৯৩৫ সালে, বিজ্ঞানীরা তার নামে একটা লুনার ক্রেটারের নামকরণ করেন ‘লে জেন্টিল’। লুনার ক্রেটার হলো চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা বিভিন্ন গর্ত। জেন্টিলের নিজেরও কিছু অবদান আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানিক একশটি বস্তুর সেট- মেজার বস্তু, এম-৩২, এম-৩৬ এবং এম-৩৮ আবিষ্কার করেন। পাশাপাশি একটি নীহারিকার ক্যাটালগও তৈরি করেন তিনি।

তথ্যসূত্র

১. https://princetonastronomy.wordpress.com/2012/02/06/the-ordeal-of-guillaume-le-gentil

২. http://www.astroevents.no/venushist2aen.html

৩. https://thonyc.wordpress.com/2010/09/13/born-under-a-bad-sign

৪. https://www.youtube.com/watch?v=Qa8hFCoxx2E

পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবী এবং বাঙ্গালী ডাক্তারের আত্মহত্যা

গুটি গুটি পায়ে গ্যালিলিও এসে বিচারকক্ষে প্রবেশ করলেন। বিশাল কক্ষটিতে বিচারকদের আসনে বসে আছেন ধর্মীয় যাজকরা। বাইরে অনেক মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে। একসময় বিচার শুরু হলো। প্রধান ধর্মযাজক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। গ্যালিলিওর দিকে আঙ্গুল তাক করে জিজ্ঞেস করলেন- “এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র হলো পৃথিবী। সকল গ্রহ-নক্ষত্র এমনকি সূর্যও একে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। আপনি কি বাইবেলের এই মহাসত্যকে অস্বীকার করছেন?” গ্যালিলিও তার মাথাটা উঁচু করলেন। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ প্রধান যাজকের দিকে। হঠাৎ তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো, ভ্র জোড়া কুঁচকে ফেললেন। কী যেন ভাবলেন। এরপর মাথাটা নীচের দিকে নামিয়ে কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে আস্তে আস্তে বলে উঠলেন, ‘না’। যাজকদের মধ্যে বিজয়ের ক্রুর হাসি দেখা দিলো। দশর্কদের মধ্যে মৃদু গুজন উঠল। একজন কে জানি বলে উঠল, ‘সত্যকে হত্যা করা হলো’।

ঠিক একইরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল কলকাতার অদূরে। ১৯৭৮ সালের ১৮ ই নভেম্বর। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে গঠিত একটি ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’কে নিযুক্ত করলেন ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় নামক এক অভিযুক্তের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দাবি করেছেন তিনি দূর্গা নামে এক টেস্টটিউব বেবির স্থপতি। দ্বিতীয় অভিযোগ তিনি তার গবেষণার কথা দপ্তরের আমলাদেরকে আগে না জানিয়ে কেন মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন?

কীভাবে তিনি তার সার্দান অ্যাভিনিউর ছোট ফ্ল্যাটে সামান্য কিছু উপকরণ আর একটা ছোট ফ্রিজ ব্যবহার করে এমন একটি অসম্ভব কাজকে সম্ভব করলেন যেখানে অন্যরা গবেষণার সকল উন্নত সুযোগ-সুবিধা পেয়েও সে চিন্তা করতে পারছে না? আর সবচেয়ে বড় অভিযোগ এই যে, তিনি কারো কাছে মাথা নোয়াতেন না। এই বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতি ছিলেন একজন রেডিওফিজিসিস্ট। কমিটির সদস্যদের মধ্যে একজন গাইনোকলোজিস্ট, একজন ফিজিওলজিস্ট আর একজন নিউরোফিজিওলজিস্ট ছিলেন।

মজার বিষয় হলো এদের কারোরই আধুনিক প্রজনন পদ্ধতি (আইভিএফ-ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। একজন বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ওই ভ্রূণগুলো কোথায় রেখেছিলেন?’ ডাঃ মুখোপাধ্যায় জবাব দিলেন, ‘সীল করা অ্যাম্পুলের মধ্যে’। উল্লেখ্য অ্যাম্পুল হলো ইনজেকশনের ওষুধ রাখার জন্য ছোট কাচের বোতল। ফের প্রশ্ন করা হলো, ‘অ্যাম্পুলটাকে সীল করেছেন কীভাবে?’ জবাব এলো, ‘সাধারণভাবে যেভাবে করে। তাপ দিয়ে।’ এভাবেই শুরু হলো জেরা-পাল্টা জেরা। কিছু অবান্তর ভিত্তিহীন, গবেষণার সাথে সম্পর্কহীন প্রশ্ন করে তাকে অপমানের চুড়ান্ত করা হলো। বলা হলো, ‘ওহ-তার মানে আপনি বলতে চাইছেন তাপের কারণে ভ্রূণগুলো নষ্ট হয়ে যায়নি?

এই কমিটি কী রায় দিবে তা যখন পূর্বনির্ধারিতই তখন এটা আর বলার প্রয়োজন নেই যে এর সব কিছুই আমলাতান্ত্রিক কূটনৈতিক চালের কারণে হচ্ছে। কমিটি চূড়ান্ত রায় দিলো, “Everything that Dr. Mukhopadhyay claims is bogus.”

চিত্রঃ ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের অধীনে টেস্টটিউব বেবির জন্মের মাত্র ৬৭ দিন আগে ১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই রাত ১১ টা ৪৫ মিনিটে ইংল্যান্ডের ওল্ডহ্যাম জেনারেল হাসপাতালে পৃথিবীর প্রথম টেস্টটিউব বেবী লুইস ব্রাউন জন্ম নেয়। স্থপতি ছিলেন রবার্ট এডওয়ার্ডস এবং প্যাট্রিক স্টেপটো। এ প্রক্রিয়ায় তারা ল্যাপোরোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্যে ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। এর আগে দীর্ঘ সময় নিয়ে ডিম্বাণুর বিভাজন ও পরিস্ফুটন পর্যবেক্ষণ করেন। তারপর কর্তন প্রক্রিয়ায় ডিম্বাণু সংগ্রহ করে একটা ডিস্কে শুক্রাণুর সাহায্যে সেটাকে নিষিক্ত করেন। এরপর এ থেকে ভ্রূণ উৎপন্ন হলে সেটাকে আবার জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করেন।

কিন্তু ডাঃ মুখোপাধ্যায় এক্ষেত্রে ল্যাপোরোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। এজন্য তিনি এক প্রকার হরমোনের সাহায্যে ডিম্বাণুর সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটান এবং ওখানেই এর বিকাশ সাধন করেন। এরপর ছোট একটা অপারেশনের সাহায্য নিয়ে ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। আর একারণে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও অনেকাংশে বেড়ে যায়।
কিন্তু সহকর্মী এবং সরকারের রোষানলে পড়ে তাকে বরণ করে নিতে হলো করূন পরিণতি।

চিত্রঃ ডা. প্যাট্রিক স্টেপটো এবং ডা. রবার্ট এডওয়ার্ডস।

প্রথমে তাকে বদলী করে দেয়া হলো কলকাতা থেকে বাঁকুড়ার একটি হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে। যাতে তিনি পরবর্তীতে তার গবেষণা চালিয়ে যেতে না পারেন। এরপর তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। ফের চলে এলেন কলকাতায়। চারতলার সিঁড়ি বেয়ে তাকে রোজ কাজ করতে যেতে হতো। জাপান থেকে তার কাজের উপর একটা সেমিনারে বক্তৃতা করার আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে যেতে দেয়া হয়নি। চুড়ান্ত অপমান, উপহাস আর লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করার পর ১৯৮২ সালে ১৯ শে জুন এই মহান প্রতিভাবান ফিজিশিয়ান নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন।

আরো একবার যেন সত্যকে হত্যা করা হলো। ভারতের সরকার স্বীকৃত প্রথম টেস্টটিউব বেবীর স্থপতি হলেন ডা. টি এস আনন্দ কুমার যিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিচার্সের ডিরেক্টর। ১৯৮৬ সালের ১৬ ই আগস্ট তার অধীনে জন্ম নেয় ভারতের প্রথম (পড়ুন দ্বিতীয়) টেস্টটিউব বেবী হর্ষ।

১৯৯৭ সালে ডা. আনন্দ একটা বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিতে আসেন। তখন ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণার সকল কাগজপত্র তার হাতে তুলে দেয়া হয়। নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করে এবং সেই টেস্টটিউব বেবী যার জন্ম হয়েছিল ডাঃ সুভাষের অধীনে-দূর্গা সেই শিশুটির মা-বাবার সাথে আলাপ-আলোচনা করে তিনি নিশ্চিত হন যে, ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের প্রথম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবীর স্থপতি। ডাঃ টি সি আনন্দ কুমারের উদ্যোগেই তিনি পরে ভারতবর্ষের স্বীকৃতি পান।

চিত্রঃ দূর্গা।

দূর্গা এখন দিল্লীতে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি তার ২৫ তম জন্ম বার্ষিকীতে প্রথম মিডিয়ার সামনে আসেন এবং নিজের জনক ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ব্যাপারে কথা বলেন। সেই সাথে এটাও প্রমাণ করে দেন যে ডা. সুভাষের দাবী নিতান্তই অমূলক বা বোগাস ছিল না।

ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন প্রকাশিত মেডিক্যাল ‘ডিকশনারী অব মেডিক্যাল বায়োগ্রাফি’ প্রকাশিত বইতে পৃথিবীর ১০০ দেশের ১১০০ মেডিক্যাল সায়েন্টিস্টের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে যারা এই চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন। আর এই তালিকায় ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নামও রয়েছে।

যুগে যুগে মানুষের কাজের স্বীকৃতি পেতে মানুষকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে, বরণ করে নিতে হয়েছে লাঞ্ছনা, অপমান আর উপহাস-ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। যেকোনো নতুন কাজের শুরুতেই সমাজ বাধা দিয়ে এসেছে। কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। আর আমরা বাঙালীরা এই দিক দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে। কি সাহিত্য কি বিজ্ঞান কি অন্য যেকোনো বিষয়, সবক্ষেত্রেই আমরা জীবদ্দশায় কৃতী ব্যক্তির সম্মান দিতে অপারগ থেকেছি। ডা. সুভাষের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। উল্লেখ্য, ডা. সুভাষের কাজের উপর ভিত্তি করে গুণী পরিচালক তপন সিনহা ১৯৯০ সালে একটি সিনেমা বানিয়েছেন। নাম ‘এক ডাক্তার কি মউত’। এই সিনেমার জন্য তিনি বেস্ট ডিরেকশনের অ্যাওয়ার্ড পান।

চিত্রঃ ‘এক ডাক্তার কি মউত’ সিনেমার একটি দৃশ্য।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের প্রথম টেস্টটিউব বেবীর জন্ম হয় ২০০১ সালে ২৯ মে ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালে। একইসাথে হীরা, মণি ও মুক্তা নামে তিনটি শিশুর জন্ম হয়। ডাক্তার ছিলেন পারভীন ফাতেমা।

চিত্রঃ মা-বাবার কোলে হীরা, মণি আর মুক্তা।

২০১০ সালে স্যার রবার্ট এডওয়ার্ডকে ইন-ভিট্রো পদ্ধতি উদ্ভাবন করে চিকিৎসাশাস্ত্রে অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় ভাইরাস কলেজের ছাত্রদের একটা কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, চাঁদে প্রথম পা রেখেছিলেন কে? প্রায় সকলেই উত্তর দিতে পেরেছিল। কিন্তু কে দ্বিতীয় হয়েছেন তা কেউ বলতে পারেনি। ডাঃ সুভাষের ক্ষেত্রে এমনই ঘটলো। মাত্র অল্প ক’দিনের ব্যবধানে তিনি প্রথম টেস্টটিঊবের জনক হতে পারলেন না। তাতে কী হয়েছে? তিনি বাঙ্গালী। আর সে কারণেই আমাদের তাকে স্মরণ করা উচিত। হয়তো ২০১০ সালের নোবেল বাঙ্গালীদের ঘরেই আসতো। সে আফসোস করে লাভ নেই। বরং এদেশীয় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে যারা কাজ করছেন তারা অনুপ্রাণিত হয়ে সঠিকভাবে পৃথিবীর মঞ্চতে মাথা উঁচু করতে পারবেন সেই চেষ্টা যাতে অব্যাহত থাকে এই কামনা করতে পারি।

তথ্যসূত্রঃ

লেখাটি The Great Scientist Dr.Subash Mukhopadhyay এর স্বেচ্ছাচারী বঙ্গানুবাদ। পাশাপাশি অন্যান্য সূত্র থেকেও সাহায্য নেয়া হয়েছে।

মৃতদেহের রূপান্তর প্রক্রিয়া

জনের মৃত্যুর পর প্রায় চার ঘন্টা কেটে গেছে। মৃতদেহ সৎকারের জন্য আনা হয়েছে। জীবনের বেশিরভাগ সময়ে সুস্থ থাকা জন কাজ করতেন টেক্সাসের তেল খনিতে। কাজের ধরনের জন্যই শারীরিকভাবে ছিলেন বেশ কর্মঠ আর শক্তিশালী। বছর দশেক আগেই ধূমপান আর মদ্যপান দুটোই ছেড়েছিলেন। তবুও একসময় হঠাৎ তার শরীরের অবনতি হতে থাকে এবং তারপর জানুয়ারির এক হিমশীতল সকালে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

এই মুহুর্তে তার মৃতদেহ রাখা হয়েছে সৎকারকর্মীর একটি ধাতব টেবিলে। ঠাণ্ডা আর প্রায় শক্ত হয়ে আসা শরীর আর ত্বকের ধূসর রক্তাভ বর্ণ ইতিমধ্যেই পচন শুরু হবার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমাদের কেউই সাধারণত মৃত্যুর পর নিজের কিংবা পরিচিতজনদের দেহের কি হাল অবস্থা হবে তা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি না। বেশিরভাগ মানুষই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। ঐতিহ্য অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়। মাঝে মাঝে হিমাগারে রেখে কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে মৃতদেহ কিছু সময়ের জন্য তাজা রাখার চেষ্টা করা হয়, যা শবের পচন প্রক্রিয়াকে কিছুক্ষণের জন্য ধীর করে দেয়। অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবশ্য ফরেনসিক সায়েন্স ব্যবহার করা হয় যেন মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সময়, কারণ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সম্বন্ধে জানা যায়। এক্ষেত্রে শবের পচনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপকে কাজে লাগানো হয়।

মরদেহ নিজে মৃত হলেও তা অন্য অনেক জীবের জীবনের সূচনা করে। অনেক বিজ্ঞানী মৃতদেহকে জটিল বাস্তুতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ বাস্তুতন্ত্র মৃত্যুর ঠিক পরপরই শুরু হয়। ধীরে ধীরে দেহকে পচিয়ে ফেলার মাধ্যমে এই তন্ত্র বিস্তার লাভ করে।

আত্ম-পরিপাক

‘অটোলাইসিস’ বা ‘আত্ম-পরিপাক’ নামে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় মৃত্যুর কয়েক মিনিট পর থেকেই মৃতদেহে পচন শুরু হয়। হৃৎস্পন্দন বন্ধ হবার সাথে সাথে কোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। কোষের অম্লতা বেড়ে গিয়ে বিষাক্ত পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এনজাইম কোষপর্দাকে হজম করে কোষের ভাঙ্গনের সূত্রপাত ঘটায়। এটা সাধারণত যকৃতেই প্রথম ঘটে, কেননা যকৃতে এনজাইমের পরিমাণ বেশি থাকে। রক্তকণিকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী ভেদ করে বের হয়ে আসে এবং অভিকর্ষের টানে কৈশিক নালিকা, ছোট শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে যায়। এতে করে মৃতদেহের চামড়া বিবর্ণরূপ ধারণ করতে থাকে। পাশাপাশি দেহের তাপমাত্রাও পড়তে শুরু করে। এরপর দেখা যায় ‘রিগর মর্টিস’- যার কারণে চোখের পাতা, চোয়াল, ঘাড়ের পেশী, হাত, পা সব শক্ত হয়ে যায়। জীবিত অবস্থায় আমাদের পেশীতে থাকা অ্যাকটিন আর মায়োসিন নামে দুটি সূত্রবৎ প্রোটিনের কারণে আমরা পেশী সংকুচিত-প্রসারিত করতে পারি। কিন্তু মারা যাবার পর পেশীতে শক্তি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবার কারণে এ প্রোটিনগুলো এক জায়গায় আটকা পড়ে যায়, ফলে পেশীসহ বিভিন্ন অস্থিসন্ধিকে নড়নে অক্ষম করে ফেলে।

মৃতদেহ থেকে নির্গত তীব্র গন্ধ প্রায় ৪০০ রকমের উদ্বায়ী জটিল রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে গঠিত। এই গ্যাস মিশ্রনের সঠিক গঠন মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। শব-বাস্তুতন্ত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য থাকে। আমাদের শরীর কিন্তু অসংখ্য ব্যাকটেরিয়ার পোষক হিসেবে ভূমিকা রাখে।

অনাক্রম্যতার অবসান

বেঁচে থাকাকালে দেহের বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অণুজীবমুক্ত থাকে। মৃত্যুর কিচ্ছুক্ষণের মাঝেই দেহের অনাক্রম্যতা বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে অণুজীবগুলো সুযোগ পেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র আর বৃহদান্ত্রের সংযোগস্থলে অণুজীবগুলোর আক্রমণ শুরু হয়। অন্ত্রের অণুজীব অন্ত্রকে হজম করে ফেলে। এরপর চারপাশের কোষকে হজম করতে করতে ভিতর থেকে বাইরের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত কোষ থেকে নির্গত রাসায়নিক মিশ্রণকে এরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

২০০৪ সালের আগস্টে ‘আলাবামা স্টেট ইউনিভার্সিটির’র ফরেনসিক বিজ্ঞানী গুনাল্‌জ জাভান এবং তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো ‘থ্যাটানোমাইক্রোবায়োম’ নামে নতুন একটি বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। গ্রীক শব্দ ‘থ্যাটানোস’ অর্থ ‘মৃত্যু’। জাভান ও তার দল মৃত্যুর পর ২০ থেকে ২৪০ ঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রায় ১১ টি মৃতদেহ থেকে যকৃত, প্লীহা, মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। তারা ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের দুটি ভিন্ন পদ্ধতির সাথে জৈবতথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে প্রতিটি নমুনার ব্যাকটেরিয়াল বস্তুর বিশ্লেষণ করে দেখেন। এর আগে ‘ইঁদুরের মৃতদেহ পচনপ্রক্রিয়া’ সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, মৃত্যুর পর দেহে থাকা অণুজীবগুলোর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলেও তা একটি সুনির্দিষ্ট এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে। এতে করে গবেষকরা মৃত্যুর তিন দিন থেকে তিন মাসের মধ্যে মৃত্যুর সময় সম্পর্কে একটি সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য ধারণা দিতে পারেন।

ব্যাকটেরিয়া পর্যবেক্ষণ

জাভান লক্ষ্য করে দেখেন, মৃত্যুর বিশ ঘন্টার মধ্যে ব্যাকটেরিয়াগুলো যকৃতে এসে পৌঁছায় এবং প্রায় ৫৮ ঘন্টার মধ্যে এরা সংগৃহীত নমুনাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এর অর্থ ব্যাকটেরিয়াগুলো একটি সুশৃঙ্খল নিয়মানুসারে মৃতদেহের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করে। এর ফলে কত সময়ের মাঝে এরা এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে পরিব্যাপ্ত হয় তা ব্যবহার করে মৃত্যুর পর কত সময় অতিবাহিত হয়েছে তা জানার একটা পথ খুলে যায়। জাভান বলেন- ‘মৃত্যুর পর দেহে থাকা ব্যাকটেরিয়ার কার্যপ্রণালী বদলে যায়। এরা হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং এক সময় প্রজনন সম্পর্কিত অঙ্গগুলোকেও ধ্বংস করে ফেলে। একটা বিষয় পরিষ্কার যে, ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন মৃতদেহ পচনের বিভিন্ন ধাপের সাথে সম্পর্কিত।’

প্রাকৃতিক ক্ষয়

অধিকাংশ মানুষের কাছে পচা, গলিত লাশের বীভৎস দৃশ্য অনেকটা বিরক্তিকর ভয়ানক দুঃস্বপ্নের মতো। কিন্তু কিছু গবেষকের কাছে বিষয়টি এতটা বিভীষিকাময় নয়। যেমন ‘সাউথঈস্ট টেক্সাস এপ্লাইড ফরেনসিক সায়েন্স’ ফ্যাকাল্টির গবেষকদের জন্য এটা নিতান্ত মামুলি ব্যাপার। ২০১১ সালের শেষের দিকে গবেষক সিভিল রুচেলি, অ্যারন লিন আর তাদের সহকর্মীরা ফ্যাকাল্টির একটা নির্দিষ্ট স্থানে দুটি নতুন মৃতদেহ এনে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয় হবার জন্য রেখে দেন।

মৃতদেহে যখন আত্ম-পরিপাক প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং একইসাথে ব্যাকটেরিয়াও আন্ত্রিক অংশে বিস্তার করে তখনই শুরু হয় ‘পচন প্রক্রিয়া’। এটাকে বলা হয় মৃতদেহের ‘আণবিক মৃত্যু’। নরম টিস্যুর ভাঙ্গনের মাধ্যমে তরল, গ্যাস কিংবা লবণে পরিণত হওয়া ইত্যাদি- এসবই দেহের আণবিক মৃত্যুর সূচনা করে।

এ পচন প্রক্রিয়া অক্সিজেন নির্ভর এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সাথে সম্পর্কিত। ব্যাকটেরিয়াগুলো দেহকে খেতে শুরু করে আর দেহে থাকা চিনিজাতীয় পদার্থকে গাঁজানোর মাধ্যমে মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়াসহ বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থ জমা করতে থাকে। ফলে মৃতদেহ ফুলে যায়। এ ফুলে যাওয়াকে বলা হয় ব্লোটিং (Bloating)। এর পরের ধাপে শুরু হয় বিবর্ণতা। ক্ষতিগ্রস্ত নালী থেকে নির্গত রক্তকণিকার মাঝে থাকা হিমোগ্লোবিনকে এক ধরনের অবাত ব্যাকটেরিয়া (বেঁচে থাকার জন্য যাদের অক্সিজেন অপরিহার্য নয়) সালফো-হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত করে। এদের উপস্থিতির কারণেই চামড়া শক্ত, সবুজাভ-কালো বর্ণ ধারণ করে।

বিশেষ ধরনের আবাসস্থল

দেহের ভেতরে গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে নরম এবং আলাদা হয়ে যাওয়া চামড়া ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। এক পর্যায়ে গ্যাস এবং তরলীকৃত টিস্যু বিশোধিত হয়ে দেহের মলদ্বারসহ অন্যান্য ছিদ্রাংশ সহ অন্যান্য ছেঁড়া চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসে।‘ব্লোটিং’ বা ফুলে যাওয়াকে পচন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক এবং শেষ ধাপের মধ্যে একটি চিহ্নিত অংশ হিসেবে ধরা হয়। সাম্প্রতিক আরেক পরীক্ষায় জানা যায়, এ রূপান্তর কিছু বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন লক্ষ্য করার মাধ্যমেও চিহ্নিত করা যায়। একজন পতঙ্গবিশারদ হিসেবে বুচেলি প্রধানত পোকামাকড় কীভাবে মৃতদেহে উপনিবেশ গড়ে তুলে সে ব্যাপারে আগ্রহী। তিনি লক্ষ্য করেন, মৃতদেহ কিছু বিশেষ ধরনের নেক্রোফ্যাগাস (মড়া-ভক্ষক) পতঙ্গের আবাসভূমি। এবং এদের সমগ্র জীবনচক্র মৃতদেহকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

শূককীট চক্র

দুই প্রজাতির মাছি মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়ার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। মৃতদেহ থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধময় এবং একইসাথে পল্কা-মিষ্টি গন্ধ ছড়ায় যা এই মাছিগুলোকে আকৃষ্ট করে। এরা এসে মৃতদেহের উপর বসে এবং খোলা ক্ষত স্থানে ডিম পাড়া শুরু করে। প্রতিটি মাছি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে প্রায় ২৫০ টি ডিম দেয় এবং এই সময়ের মাঝে ডিম থেকে শূককীট বের হয়ে আসে। এরা পচা মাংস ভক্ষণ করে বড় শূককীটে পরিণত হয়। কয়েক ঘন্টা বাদে খোলস নির্মোচন করে আরো খাদ্য গ্রহণ করে বড় আকারের মাছিতে পরিণত হয়। এ মাছিগুলো আবার ডিম পাড়া শুরু করে এবং এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত খাবার জন্য কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকে। এ মাছিগুলোর উপস্থিতি আবার অন্যান্য শিকারী প্রাণীকে মৃতদেহের অবস্থানের নিশানা দেয়। গুবরে পোকা, পরজীবী কীট, পিঁপড়ে, বোলতা, মাকড়সা এসে মৃতদেহে ভাগ বসানো শুরু করে। শকুন এবং বাকি আবর্জনা-ভুক এবং মাংসাশী জীবও মৃতদেহ ভোজনক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ ছাড়ে না।

প্রতিটি মৃতদেহেরই একটি অনন্য অণুজৈবনিক ভূমিকা আছে। মৃতদেহে অণুজীব-সম্প্রদায়ের গঠন, তাদের আন্তঃসম্পর্ক, পচনপ্রক্রিয়ার উপর তাদের প্রভাব ইত্যাদি ব্যাপারে আরো বিশদ ধারণা একদিন ফরেনসিক দলকে কোথায়, কীভাবে একজন মানুষ মারা গেল সে সম্পর্কে নিখুঁতভাবে জানতে সাহায্য করবে।

মৃতদেহের ডিএনএ সিকুয়েন্সিং কিংবা এতে লেগে থাকা মাটির ধরণ অপরাধ তদন্তকারীদের অপরাধস্থলের ভৌগোলিক অবস্থান, সূত্র খোঁজার এলাকা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যাপারে সহায়তা করে।

উন্নত-উর্বর মাটি

মানবদেহ প্রায় ৫০-৭৫% পানি দিয়ে গঠিত। শুষ্ক দেহের প্রতি কেজি হতে প্রায় ৩২ গ্রাম নাইট্রোজেন, ১০ গ্রাম ফসফরাস, ৪ গ্রাম পটাশিয়াম আর ১ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম মাটিতে মুক্ত হয়। প্রথমদিকে এ কারণে মাটির উপরিভাগের কিছু ছোট গাছপালা মরে যায়। নাইট্রোজেনের বিষাক্ততা কিংবা দেহনির্গত এন্টিবায়োটিক পদার্থের জন্য এমনটি হয়ে থাকতে পারে। তবে সব মিলিয়ে মৃতদেহের জৈবিক রূপান্তর মাটিকে করে তোলে উন্নত আর উর্বর। পাশাপাশি এ পচনপ্রক্রিয়া চারপাশের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের জন্যও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া কবরের মাটি পরীক্ষা করে মৃত্যুর সময় বের করার একটা সম্ভাব্য উপায় আছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। পচন প্রক্রিয়ার ফলে মৃতদেহে সংঘটিত রাসায়নিক পরিবর্তন সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, লাশ থেকে নির্গত লিপিড-ফসফরাস ৪০ দিন পর্যন্ত মাটির সাথে মিশতে থাকে যেখানে নাইট্রোজেন আর পৃথকযোগ্য ফসফরাস সময় নেয় প্রায় ৭২ থেকে ১০০ দিন। এ প্রক্রিয়ার আরো গভীর বিশ্লেষণ এবং কবরের মাটির বায়োরাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে হয়তো একদিন বের করা যাবে কতদিন আগে কোনো দেহকে মাটিতে কবরস্থ করা হয়েছে।

চিত্রঃ মৃতদেহের বিভিন্ন খনিজ পদার্থ মাটিকে জৈবশক্তি সম্পন্ন করে তোলে।

বলে রাখা ভালো, মমিকৃত লাশও একসময় পচনের শিকার হয়। কিন্তু এটা নির্ভর করে ঠিক কখন কোন পদ্ধতিতে মৃতদেহটিকে মমিকরণ করা হয়েছে তার উপর। তাছাড়া কফিনের ধরণ, কবর দেয়ার প্রক্রিয়ার উপরও মমিকৃত লাশের পচনের সময়সীমা নির্ভর করে।

আমাদের শরীরকে বলা যায় শক্তির এক আঁধার। যে শক্তি দেহের মধ্যে আটকা পড়ে অপেক্ষা করছে কখন মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। জীবিত অবস্থায় আমাদের শরীর তার অগণিত অণু-পরমাণুতে এ শক্তি ধরে রেখে স্থিতিশক্তি হিসেবে ব্যয় করে। এভাবেই দেহ নিজেকে শক্তির সাহায্যে প্রতিনিয়ত সচল রাখে।

তাপগতিবিদ্যার সূত্রানুসারে, শক্তি সৃষ্টি হয় না আবার ধ্বংসও হয় না। কেবল এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হয় মাত্র। মহাবিশ্বে মোট মুক্ত শক্তির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অন্যভাবে বলা যায়, বস্তু প্রতিনিয়ত ভেঙ্গে পড়ছে আর তাদের ভর রূপান্তরিত হচ্ছে শক্তিতে। মৃতদেহের পচনপ্রক্রিয়া যখন চুড়ান্তরূপ ধারণ করে তখন এটা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের সকল পদার্থই এই মৌলিক

আইন অনুসরণ করে চলে। আমাদের শরীর নশ্বর; পচনের মাধ্যমে এটা চারপাশের বস্তুজগতের সাথে ভারসাম্য তৈরি করে এবং অন্যান্য জীবিত প্রাণীর বেঁচে থাকায় সহায়তা করার জন্য পরিণত হতে থাকে শক্তিতে। যে শক্তি ছড়িয়ে পড়ে ছাই থেকে ছাইয়ে, ধূলা থেকে ধূলাতে।

(মোজাইক সায়েন্স, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ফিউচার-সহ বিভিন্ন বিখ্যাত অনলাইন পত্রিকাতে প্রকাশিত মোহেব কস্ট্যান্ডির প্রবন্ধ ‘This is what happens after you die’ এর সংক্ষেপিত বঙ্গানুবাদ)

এবারের ইগ নোবেল

২০১৬ সালের ‘ইগ নোবেল’ পুরস্কার ঘোষণা করা হয় গত সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ। ১৯৯১ সাল থেকে ‘প্রথমে হাসুন আর তারপর ভাবুন’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতি বছর বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে আজব ও অদ্ভুত আবিষ্কারের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। ‘ইগ নোবেল’ শব্দটি ইংরেজি ‘Ignobel’ আর ‘Nobel Prize’ এর মিশ্রণ থেকে এসেছে।

মূলত নোবেল পুরস্কারের প্যারোডি হিসেবে এ পুরস্কারের প্রচলন শুরু করে দ্বিমাসিক রঙ্গ-ব্যাঙ্গ সাময়িকী ‘Annals of Improbable Research’ এর সম্পাদক ও যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা মার্ক আব্রাহামস। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটারে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা শাস্ত্রসহ দশটি ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০১৬ সালে ছাব্বিশতম বছরে পা রাখলো ‘ইগ নোবেল’ পুরস্কার।


পুরস্কারের অর্থমূল্য ধরা হয় দশ ট্রিলিয়ন জিম্বাবুয়ান ডলার! এখানেও আছে ব্যাঙ্গাত্মক ইঙ্গিত। জিম্বাবুয়ান ডলারের মূল্যমান অনেক কম। জিম্বাবুয়ের দশ ট্রিলিয়ন ডলার শুনতে অনেক বিশাল মনে হলেও এর সমমানের মার্কিন ডলার খুব বেশি হবে না।
এ বছরের বিভিন্ন শাখায় দেয়া ইগ নোবেল নিয়ে আলোচনা করা হলো।

প্রজননঃ

মিশরের প্রয়াত আহমেদ শফিক এবারের ইগ নোবেল জিতে নেন এই বিভাগে। পলিস্টার প্যান্ট ইঁদুরের যৌন জীবনে কী ভূমিকা রাখে সে বিষয়ে গবেষণা করার জন্য এই পুরষ্কারে ভূষিত হন তিনি। পলিস্টার, সুতি আর পশমি প্যান্ট পরিয়ে ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালান তিনি। পরে মানুষের উপরও একই গবেষণা করেন। এ বিষয়ে ১৯৯৩ সালে ‘জার্নাল কন্ট্রাসেপশন’-এ তার দুটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশিত হয়।
পদার্থবিজ্ঞানঃ হাঙ্গেরি, স্পেন, সুইডেন আর সুইজারল্যান্ডের নয়জন বিজ্ঞানী তাদের দুটি আবিষ্কারের জন্য ইগ নোবেল পুরষ্কার বাগিয়ে নেন পদার্থবিজ্ঞানে। কেন সাদা কেশরওয়ালা ঘোড়াই কেবল ‘হর্সফ্লাই’কে দূরে রাখতে সক্ষম হয় এবং ‘গঙ্গা-ফড়িং’ কেন কালো সমাধিফলকের প্রতি আকৃষ্ট হয় এ বিষয়ে পরীক্ষা চালান তারা। গবেষকরা হাঙ্গেরির এক কবরস্থানে গিয়ে দেখেন, পাঁচ রকমের গঙ্গা-ফড়িং পলিশ করা কালো সমাধি-ফলকের প্রতি আকৃষ্ট হয়। মূলত এ ধরনের গঙ্গাফড়িংগুলো গাঢ় যেকোনো রঙয়ের প্রতিই আকৃষ্ট হয়। সেই হিসেবে পানি পৃষ্ঠেও এরা আকর্ষণ লাভ করে। গঙ্গা ফড়িংয়ের শূককীট আর নিম্ফ তাদের জীবনচক্র পানিতেই সম্পন্ন করে।

রসায়নঃ

এই বিভাবে ইগ নোবেল দেয়া হয় চমকপ্রদ এক আবিষ্কারের জন্য। পরীক্ষাগারে গাড়ির বায়ুদূষণের পরিমাণ কম দেখানোর জালিয়াতির কৌশল আবিষ্কার করে জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগন! তবে এজন্য তাদেরকে জরিমানাও গুনতে হয়েছে। গাড়িতে সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম দূষিত বায়ু নির্গমনের এ পদ্ধতি বের করার জন্য কোম্পানিটি ১৪.৭ বিলিয়ন ডলার গচ্ছা দিয়েছে। যদিও রাস্তায় তাদের গাড়ি বায়ুদূষণের নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশিই দূষণ করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে জার্মানির পাঁচজন বিজ্ঞানীকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। তারা গবেষণা করে বের করেছেন, যদি কারো শরীরের বাম পাশে খোসপাঁচড়া হয় আর তারা আয়নায় তাকিয়ে ডান পাশে চুলকান তবে ফল পাওয়া যায়! এটাকে তারা ‘mirror scratching’ বলে অভিহিত করেন। এ পাঁচ বিজ্ঞানী হলেন ক্রিস্টফ হেলমশেন, ক্যারিনা পালজার, থমাস মুনেট, সিল্কে অ্যান্ডার্স আর আন্দ্রেজ স্প্রেঙ্গার।
মনস্তত্ববিদ্যায় এক দারুণ গবেষণার জন্য এবারের ইগ নোবেল বাগিয়ে নেন পাঁচজন গবেষক। তারা ৬ থেকে ৭৭ বছর বয়স্ক ১,০০০ জন মানুষের মিথ্যা কথা বলার উপর ভিত্তি করে এ গবেষণা করেন। একজন মানুষ সমগ্র জীবনকালে কখন কতবার মিথ্যা বলেন এবং বয়সের সাথে সাথে এর প্রভাব কীভাবে পরিবর্তিত হয় সে ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করেন। তারা লক্ষ্য করেন, মিথ্যা বলার দক্ষতা শৈশবে বেড়ে তরুণ বয়সে পরিপক্কতা অর্জন করে। পরে বয়সকালে তা ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। এ ব্যাপারে গবেষকগণ ‘এক্টা সাইকোলজিকা’ জার্নালে তাদের গবেষণা প্রকাশ করেছেন।
অর্থনীতিতে এবারের পুরস্কার দেয়া হয় বিক্রয় ও বিপণনের দৃষ্টিকোণ থেকে পাথরের ব্যক্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করার জন্য! তিনজন গবেষক- মার্ক এভিস, সারাহ ফোর্বস আর শেলাগ ফার্গুসনকে যৌথভাবে এ সম্মাননা দেয়া হয়। তারা ২০১৪ সালে ‘মার্কেটিং জার্নাল’-এ জেনিফার আকের-এর প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখিত ‘ব্যান্ড পার্সোনালিটি’ বা বিপি স্কেলের উপর ভিত্তি করে পাথরের ব্যক্তিত্ব নিয়ে আলোকপাত করেন। এই বিপি পাঁচটি মাত্রা দ্বারা বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। মাত্রাগুলো হলোঃ আন্তরিকতা, উত্তেজনা, যোগ্যতা, বিশুদ্ধতা আর দৃঢ়তা। এক্ষেত্রে তারা পাথর বেছে নিয়েছেন। কারণ তারা মনে করেন, প্রতিটি পাথরেরই একটি স্বতন্ত্র বিপি রয়েছে এবং পাথরের ব্যক্তিত্ব মাঝে মাঝে আশ্চর্যজনকভাবে বিকশিত হয়!
শান্তিতে পুরস্কার দেয়া হয় ফাঁকা বুলি নিয়ে গবেষণা করার জন্য! গর্ডন পেনিকক, জেমস অ্যালেন চেইন, নাথানিয়েল বার, ডেরেক কোহলার এবং জোনাথন ফুগেনস্যাং এ বিষয়ে গবেষণা করার জন্য এ পুরস্কার জয় করে নেন। তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ‘ফাঁকা বুলির অভ্যর্থনা এবং ছদ্ম-গভীরতা শনাক্তকরণ’। তারা বলেন, আপাত দৃষ্টিতে চিত্তাকর্ষকভাবে যেসব তথ্যকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, সেগুলোর অন্তর্গত অর্থ আসলে শূন্য। এ নিয়ে তারা ‘জার্জমেন্ট এন্ড ডিসিশন মেকিং’ জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। বিজ্ঞানীরাও মাঝে মাঝে তাদের বাক্যে গাম্ভীর্যপূর্ণ ফাঁকা বুলি ব্যবহার করেন যার আসলে কোনো অর্থই হয় না। মানুষের সংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের উপর নির্ভর করে তারা এসব বুলি গ্রহণ করবে নাকি করবে না।
উপলব্ধি বিষয়ে পুরস্কার পান জাপানের আতসুকি হিগাশিয়ামা এবং কোহেই আদাচি। তারা তদন্ত করে বের করেন, স্বাভাবিকভাবে মানুষ যা দেখে, দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে তা ভিন্নভাবে দেখা যায়। তাদের গবেষণার বিস্তারিত তথ্য ‘ভিশন রিসার্চ’ জার্নালে ২০০৬ সালে প্রকাশ করেন। তাদের ভাষায়- যেকোনো বস্তু দু পায়ের ফাঁক দিয়ে উল্টো হয়ে দেখলে তা বেশি উজ্জ্বল এবং স্পষ্টভাবে দেখা যায়!
জীববিজ্ঞানে ইগ নোবেল দেয়া হয় কিছু প্রাণী যেমন- ছাগল, হরিণ ইত্যাদিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য। দুজন বিজ্ঞানী এ পুরস্কার বাগিয়ে নেন। বিজ্ঞানী চার্লস ফস্টার বন্য পরিবেশে বিভিন্ন প্রাণীর অনুকরণ করে দেখান। তিনি হরিণ, ভোদঁড়, শেয়াল ও পাখির মতো জীবনযাপন করেন। আরেকজন বিজ্ঞানী থমাস থয়াইটসন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছাগলের সাহচর্যে চার হাত-পা বাড়িয়ে ছাগলের অনুকরণ করেন। তিনি তার ‘Goat Man: How I Took a Holiday from Being Human’ বইতে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখেন। তিনি ‘ছাগল মানব’ হিসেবে বেশ পরিচিতিও পান। অন্যদিকে মিস্টার ফস্টার তার বুনো জীবনযাপনের তথ্য ‘Being a Beast’ বইতে লিপিবদ্ধ করেন।

সাহিত্যে এ সম্মাননা পান ফ্রেডেরিক সোবার্গ নামক এক ব্যক্তি। তিনি তার তিন খণ্ডের আত্মজীবনীমূলক বইতে মৃত মাছি এবং এখনো মৃত নয় এমন মাছির সংগ্রহ দেখান। তার প্রথম খণ্ডের নাম ‘Fly Trap’ এবং শেষ খণ্ডের নাম ‘The Path of a Fly Collector’।

তথ্যসূত্র

 https://en.wikipedia.org/wiki/Ig_Nobel_Prize
 http://somewhereinblog.net/blog/lollipopman/29948552
 http://livescience.com/56228-ig-nobel-prize-winners.html

 

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

ইতিহাসের উত্তরোত্তর উন্নতির সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রেও ঘটে যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এটি রূপ নিতে থকে এক অভিজাত শিল্প হিসেবে। এর কিছুটা ঝলক বা ছোঁয়া দেখা যায় তৎকালীন পশ্চিম এশিয়ার উর্বর সভ্যতাগুলোতে। বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায়। সেইসাথে তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরানের উর্বর ভূমিগুলোতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের সুমেরীয় এবং তার পরবর্তী আক্কাডীয়, অ্যাসেডীয় আর ব্যাবলনীয় সভ্যতার কিছু কীলক-লিপি থেকে সেই সময়কার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য কাজকর্মের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তখনকার অনেক চিকিৎসক মনে করতেন অসুখ-বিসুখ হয় মূলত জাদুবিদ্যা বা দুষ্ট প্রেতাত্মা দ্বারা এবং এর প্রতিকারও শুধুমাত্র জাদুবিদ্যা দ্বারাই সম্ভব। তারা তথাকথিত তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ আর গাল-মন্দ করে সেই দুষ্ট প্রেতাত্মা তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। এ ধরনের চিকিৎসক বা ওঝাদের নাম ছিল আসিপুস।

আরেক ধরনের চিকিৎসক যারা আসুস নামে পরিচিত ছিলেন তারা বিশ্বাস করতেন কার্যকরী পন্থাগুলোতে। তারা বিভিন্ন ভেষজ তরল মিশ্রণ, ক্ষতস্থান পরিষ্কারকরণ, আক্রান্ত স্থান ম্যাসাজ কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যান্ডেজ ও মলম ব্যবহার করতেন। আসিপুস আর আসুস- এ দু’দলই পাশাপাশি চিকিৎসা চালাতেন। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাহায্য-সহায়তাও করতেন। তবে বাণিজ্যিক ব্যাপারগুলো গোপন রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন।

চিত্রঃ আইনপ্রণেতা হাম্বুরাবি সূর্যদেবতা শামাস থেকে রাজকীয় মর্যাদা নিচ্ছেন।

৩,৮০০ কি ৩,৭৬০ বছর আগে হাম্বুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনের শাসক। কীলক-লিপিতে লিখিত আইনশাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বিশ্বের প্রথম আইন প্রণেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। আর এই আইনশাস্ত্রে চিকিৎসা বিষয়ক কিছু ঘোষণাও ছিল। এই ঘোষণাগুলো চিকিৎসকদের সফলতা আর ব্যর্থতা উভয়ের

জন্যই দায়ী ছিল। রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারলে যেমন পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও বলবৎ ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তির চিকিৎসা করে রোগ সারাতে পারলে ব্রোঞ্জের ল্যান্সেট (বর্তমান ইসরাইলি দশ শেকেলের সমান) দেয়া হতো যা কোনো সওদাগরের এক বছরের আয়েরও অনেক বেশি। আর কোনো দাসের জীবন বাঁচাতে পারলে দেয়া হতো দুই শেকেল। কিন্তু যদি কোনো সার্জনের ছুরির তলায় অভিজাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে সেই সার্জনের এক হাত কেটে নেয়া হতো। সেই সাথে তাকে একজন দাসও হারাতে হতো।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, হাম্বুরাবি আইনে খুব কম নির্দেশনা দেয়া থাকায় ঠিক কী উপায়ে তারা সেই সময় চিকিৎসা চালাতো তা জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো জাদুটোনা, দুষ্ট প্রেতাত্মা অথবা পাপের কারণে অসুখ-বিসুখ হয় এই ধারণা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন ব্যাবলনীয়দের আরোগ্যদেবী। তাকে চিকিৎসকদের পৃষ্টপোষোকতাকারী দেবীও বলা যায়। নিনকার্ককে সাধারণত এক নারীরূপে দেখানো হতো যার সঙ্গী একটি কুকুর কিংবা কুকুরের মাথার মতো কোন মুর্তিকেও নিনকার্ক হিসেবে দেখা হতো। সেসময় রোগীরা রোগমুক্তির জন্য নিনকার্কের মন্দিরে কুকুরের মুর্তি দিত। মাঝে মাঝে কুকুর বলিও দেয়া হতো বলে জানা যায়। কিছু কিছু সূত্র বলে, গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন নেকড়েমুখো কোনো দানবী। এই নিনকার্কের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩,৬০০ বছর আগে ক্যাসিটস নামক এক ব্যাবলনীয় সভ্যতার আমলে। নিনকার্কের প্রধান মন্দির ছিল ঈসিনে (বর্ত্মা ইশান-আল বাহরিয়া, ইরাক) এবং নিপ্পুরে (বর্ত্মান নুফফার-ইন আফক, ইরাক)।

ভেষজ ও অন্যান্য গুল্মলতা প্রতিকারক হিসেবে সেসময় ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। রোগ প্রতিকারের জন্য তারা ওয়াইন, আলুবোখারা (পাম ফলের চাটনি) আর পাইন গাছের রস ব্যবহার করতো। এরসাথে টিকটিকির মল মেশানো হতো যা ঔষধ সহজে গিলতে অসুবিধা সৃষ্টি করলেও ওষুধি ভাব আনতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। এসব ওষুধে অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণও বিদ্যমান ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাধারণ জনগণ ও অভিজাত লোকদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে দেবতা আর আত্মারা এতটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল যে বর্তমান আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখনকার চিকিৎসকদের ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক কাজ আলাদাভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটি আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন এই আলোচনায় ইমহোটেপ নামক এক পুরোহিত চিকিৎসক প্রশ্নবিদ্ধ হন। ইমহোটেপের আমল ছিল প্রায় ৪,৬৫০ বছর পূর্বে। ইমহোটেপ মিশরীয় রাজত্বকালের প্রথমদিকে ছিলেন। খুব দ্রুতই চারদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে জীবদ্দশাতেই তাকে ঈশ্বরপুত্র (Demi-God) হিসেবে সম্মান দেয়া হতো, যে সম্মান সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে সময় শুধুমাত্র রাজকীয় লোকদের এ ধরনের সম্মান জানানো হতো।

তিন হাজার বছর পূর্বে, মিশরীয় নতুন রাজত্বকালে তাকে পুরোপুরি দেবতারূপে গণ্য করা হতো। তাকে বলা হতো, তার পুত্র (Son Of Ptah), সৃষ্টির স্রষ্টা অথবা মহাবিশ্বের রূপকার। সেই সাথে কারিগরদের ত্রাণকর্তা বিশেষণও দেয়া হয়। তার সঙ্গী ছিলেন সেকমেট (Sekhmet)।

এ সেকমেট মিশরীয়দের সিংহকেশী সমর ও আরোগ্যের দেবী। সেই সাথে ইমহোটেপের মাও ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, ইমহোটেপ আসলে ছিলেন ঘেঁটে আর সন্ধি বাতের চিকিৎসক। তিনি এক ধরনের তরল মিশ্রণ বানাতে দক্ষ ছিলেন যা এ ধরনের রোগ ভালো করে দিতো। অন্যান্য সূত্র বলে, তিনি নাকি ছিলেন কিছু ধান্দাবাজ ওঝাদের দলনেতা যে তার অধীনস্থদের সফলতার সুফল ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায়ভার বা নিন্দা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

চিত্রঃ ইমহোটেপের মা দেবী সেকমেট। তিনি সমর এবং আরোগ্য দেবী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন গ্রীসেও ইমহোটেপের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। তবে কখনো কখনো তাকে প্রাচীন গ্রীক আরোগ্যদেবতা অ্যাসলেপিয়াস (Aselepios) এর যমজ ভাই মনে করা হতো। কখনোবা অ্যাসলেপিয়াসকেই ইমহোটেপ বলা হতো।

ইমহোটেপের সময়কালের আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন হেসি-রা, যিনি ফারাও জোসার এর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। হেসি-রা দন্ত চিকিৎসক হিসেবেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। শোনা যায়, দাঁত তোলা আর মুখের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে পটুত্ব ছিল তার। সেইসাথে বর্তমানকালে আমরা যাকে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগ বলি সেটা সম্পর্কেও অল্প বিস্তর ধারণা ছিল। রোগীদের বারবার মূত্র বিসর্জন দেখে এ ধারণা তার মাথায় আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদ অঞ্চলের হোগলাজাতীয় গুল্ম বা ঘাস জাতীয় প্যাপারি থেকে তৈরি প্যাপিরাস থেকে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়, যার একটির নাম- ‘স্মিথ প্যাপিরাস’। বিখ্যাত আমেরিকান মিশরীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংগ্রাহক এডউইন স্মিথের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। তিনিই প্রাচীন এ নথি ১৮৬২ সালে লুক্সর থেকে উদ্ধার করেন।

স্মিথ প্যাপিরাস একদম অসম্পূর্ণ। দেখলে মনে হবে মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া এটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর পুরনো। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক আর শব্দশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি আরো প্রাচীন এক নথি থেকে নকল করা হয়েছে। সেই প্রাচীন নথিটি যথাসম্ভব ইমহোটেপের নিজের হাতে লেখা বা তার অধীনে লেখা। সে সময়ের অন্যান্য প্রাচীন প্যাপিরাসের তুলনায় স্মিথ প্যাপিরাস ঐন্দ্রজালিক বা জাদুকরী চিকিৎসার চেয়ে সাধারণ জখম, ক্ষত, পচন আর অস্ত্রোপচার সম্পর্কেই বেশি তথ্য দেয়। শুধুমাত্র একটি স্থানে আরোগ্য লাভের জন্য ঈশ্বর বা দেবতার কৃপা কামনা করা হয়েছে। নথিটিতে মস্তকের সামনের অংশ থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি আর রক্তের সরবরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্যাপিরাসটি ৪৮ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগেই একদম পরিচিত আধুনিক পদ্ধতির মতো একেকটি সমস্যার বর্ণনা। কারণ, প্রতিকার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং তা সারাবার বিষয়াদিও বিস্তারিতভাবে আছে।

রোগীকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা, রোগীর ইতিহাস নেয়া বর্তমানকালের অত্যাধুনিক চিকিৎসার নিয়ম হলেও প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে দেবতারা শাসন করতেন, সেখানে এরকম পদ্ধতি ছিল কিছুটা অজ্ঞতার আড়ালে থাকা রহস্যের মতো।

এ স্মিথ প্যাপিরাসেই করোটিসন্ধি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া মেনিনজাইটিস (মস্তকের কোষপর্দা) এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা যায়। মাথার ও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যও এতে পাওয়া যায়। স্মিথ প্যাপিরাসে ক্ষতস্থানে সেলাই করা, কাঁচা মাংস ব্যবহার করে রক্তপাত বন্ধ করা এবং মধু ব্যবহার করে রোগ প্রতিকারের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ব্যাপারের কথা বলা যায়। যেমন- একজন লোক, যার মাথায় ক্ষত হয়েছে, তার জন্য প্রথমে মাথাটাকে সঠিকভাবে জায়গানুসারে বিভিন্ন অংশে সেলাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাজা কাঁচা মাংস ক্ষতস্থানে বেঁধে দিতে হবে। এরপর গ্রীজ, মধু এবং অন্যান্য ভেষজ তরল ব্যবহার করতে হবে যতদিন না লোকটি সুস্থ হয়ে উঠে। স্মিথ প্যাপিরসে মূলত অ্যাক্সিডেন্ট সম্পর্কিত কথা বেশি থাকায় ধারণা করা হয় এটি শুধুমাত্র যুদ্ধাহত সৈন্যদের কিংবা পিরামিড বানানোর কারিগরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো। স্মিথ প্যাপিরাসে বর্ণিত ৪৮টি চিকিৎসা ধরনের মধ্যে ১৪ টিকেই চিকিৎসার অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সকল রোগের প্রতিকার সেই সময় তাদের জানা ছিল না।

তখনকার আরেকটি বিখ্যাত পুরাতন নথি বা পুঁথি হলো ইবারস প্যাপিরাস (Ebers Papyrus)। এটি প্রায় স্মিথ প্যাপিরাসের মতোই। এটি ৩,৫০০ বছর আগের বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলেন এটিও অন্য আরেকটি পুঁথির নকল, যথাসম্ভব ইমহোটোপের আমলেরই কোনো নথি হবে।

১৮৭২ সালে জার্মান লেখন এবং মিশরীয় বিশেষজ্ঞ জর্জ ইবারস এ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। তিনি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। সেখানেই এ ইবারস প্যাপিরাস সংরক্ষিত আছে। এতে প্রায় ১১০ পৃষ্ঠা রয়েছে, লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬৬ ফুট আর প্রস্থে ১২ ইঞ্চির মতো।

স্মিথ প্যাপিরাসের সাথে তুলনা করলে ইবারস প্যাপিরাসে শত শত জাদুমন্ত্র আর অভিশাপের মাধ্যমে রোগ সারানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। তবে এটি অন্য নথিগুলোর দিক থেকে সাজসজ্জায় বেশ দুর্বল। তারা জাদুমন্ত্র দিয়ে বাজে, অশুভ প্রেতাত্মা তাড়াবার কৌশল কাজে লাগাতো। পরজীবীর কারণে ঘটিত বাত, ত্বকসমস্যা, আলসার বা পেটের ক্ষত, পায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, হৃদরোগ, প্রস্রাবে অসুবিধা, বিভিন্ন ক্ষত এবং প্রসূতিরোগের চিকিৎসার বিবিধ বিধান এতে পাওয়া যায়।

তবে প্রসূতিরোগ সম্পর্কিত প্যাপিরাস হলো ‘কাহুন গাইনোকোলজিক্যাল প্যাপিরাস। প্রায় ৩,৮০০ বছর আগের এ নথিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রথম নথিগুলার একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে সংরক্ষিত আছে। এতে মূলত নারীদের প্রজনন বিষয়ক ব্যাপার আলোচনা করা হয়েছে। গর্ভধারণে সক্ষমতা, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থার পরীক্ষণ এবং গর্ভনিরোধক ইত্যাদি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের মাসিক এবং সে সম্পর্কিত ব্যথার কথাও আছে। বলা আছে- যে গর্ভবতী মহিলা সবসময় বিছানায় থাকতে ভালোবাসে, তাকে কখনো উঠানো উচিৎ নয়। বরং তাকে নাড়াচাড়া করাও ঠিক নয়। এতে তার গর্ভের বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। তাকে খাওউই নামক একটি জিনিস এক গ্যালনের চতুর্থাংশ খাওয়ানো হয়।

আবার এক চিত্র-বিচিত্র পাত্রকে গর্ভবতীদের জন্য ঐশ্বরিক সুরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এতে করে শয়তান আত্মার হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে প্রাচীনকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো। মজার এবং একই সাথে ভয়ানক এক তথ্য- গর্ভনিরোধক হিসেবে তারা মধু, টক দই আর কুমিরের গোবরের একটা মিশ্রণ নারী যৌনাঙ্গে ব্যবহার করতো।

চিত্রঃ ঐশ্বরিক তাবিজ-কবজ যা অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হতো।

স্মিথ ও ইবারস প্যাপিরাসের কিছুকাল পরেই দ্য হার্স্ট, ব্রুগশ্চ এবং লন্ডন মেডিক্যাল প্যাপিরাস পাওয়া যায়। সমাধি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি, বিভিন্ন হস্ত নির্মিত তৈজসপত্রের সাথে সাথে মমিকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ত্থেকে পুরানো ইতিহাসের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মমিকরণের জন্য মিশরীয় চিকিৎসকরা যে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদিসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তা এমনিতেই বোঝা যায়। তারা এসব কাজে করাত, ড্রিল মেশিন, সাঁড়াশি, কাঁচি ইত্যাদি নানারকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন।

তবে অপারেশনের বা সার্জারি চিকিৎসা মূলত দূর্ঘটনাসমূহ চিকিৎসার সাথে জড়িত ছিল বেশি। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সুষম খাদ্যাভাসের প্রতিও জোর দিতেন। নকল চোখ, নকল দাঁত- এসব বানাতেও তারা দক্ষ ছিলেন। তারপরও সেই সময়কার মিশরীয় সমাজে আত্মিক এবং ঐন্দ্রজালিক চিকিৎসাই প্রধান ভূমিকা রাখতো। তারা ঘাড়, বাহু, হাত, কব্জি কিংবা গোড়ালিতে মাদুলি ব্যবহার করতো। এতে করে ভৌতিক অপদেবতা হতে রক্ষা পাবে বলে মনে করতো তারা। তবে কেউ যদি ভুলে অসুখে পড়ে যায় তবে যৌক্তিক মেডিক্যাল চিকিৎসার চেয়ে ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসাই বেশি প্রাধান্য পেতো।

প্রাচীন মিশরের অস্ত্রপচার ব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের আলাদাভাবে সম্মান দেয়া হতো। জীবনদানকারী ত্রাতারূপে তাঁদের গণ্য করা হতো সমাজের উঁচু স্তরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা করতো তারা। তারা কাটা অংশ সেলাই করতেন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেন। এছাড়া উইলো গাছের পাতা ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টিউমার অপারেশনও করা হতো। এসব অপারেশনে নানা রকম ছুরি ব্যবহার হতো। সেইসাথে পাথরের তৈরি ধারালো বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতিও কাজে লাগাতেন চিকিৎসকরা।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রাচীনকালে ব্যবহৃত নকল পায়ের গোড়ালি পেয়েছেন মিশরে, যার কিছুটা কাঠের আর কিছুটা চামড়ার ও কাপড়ের তৈরি। এ ধরনের প্রস্থেটিক

যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনায় অথবা গ্যাংগ্রিনের কারণে অঙ্গ হারানো মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। এতে করে রোগীরা সহজে ভারসাম্য রেখে প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারতো। বলে রাখা উচিৎ, প্রাচীন মিশরীয়রা ঐতিহ্যগতভাবে পায়ে স্যান্ডেল পরিধান করতো।

চিত্রঃ প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত নকল গোড়ালি।

মমিকরণ

অভিজাত, উঁচু বংশের কিংবা ধনী কেউ মারা গেলে তার মরদেহ মমি করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ বের করে ফেলা হতো। মিশরীয়রা মমি করার ব্যাপারে পরবর্তী অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মতো কুসংস্কারপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঠিক কী উপায়ে তারা এ মমি করতো তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

দ্বিতীয় শতকের রোমান সাম্রাজ্যের কুমির দেবতা সোবেক (Sobek) এর মন্দিরে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল ছুরি, চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেছে। তখন বিশাল এক হূঁকের মাধ্যমে নাকের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্ক বের করা হতো। আর অন্ত্র, যকৃত, পাকস্থলী, ফুফফুস ইত্যাদি শরীরের বাম পাশ কেটে সরানো হতো। এসব কাজ শরীরে পচন শুরু হবার আগেই সমাধা করা হতো।

হার্ট বা হৃদপিণ্ড, যা আবেগের এবং বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা সরানো হতো না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সেটি শরীরের মধ্যেই রেখে দেয়া হতো। আর বাকি সব অঙ্গ বের করে ফেলা হতো।

চিত্রঃ ক্যানোপিক বা অঙ্গ সংরণের পাত্র।

মমিকরণবিদরা শরীর হতে বের করা অঙ্গগুলোকে জলশূন্য করে পুনরায় শরীরে স্থাপন করতেন অথবা ক্যানোপিক (Canopic) নামক এক ধরনের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন। এ পাত্রগুলো ছোট আকৃতির কফিনের মতো দেখতে। এগুলো মমিকৃত দেহের কিংবা কবরের পাশাপাশি স্থানে রাখা হতো।

তথ্যসূত্র

The priest physician of Egypt

কেলাসিত বরফঃ বিমান যাত্রার অদৃশ্য হুমকি

২০০৯ সালে রিওডিজেনিরো থেকে ছেড়ে যাওয়া প্যারিস গামী ফ্লাইট ৪৪৭ উড্ডয়নের কিছু সময় পরই ঝড়ের কবলে পড়ে। প্রথমে ব্যাপারটি হালকাভাবে নেয়া হলেও যারা সে সময়ের পত্রিকার শিরোনাম গুলোতে চোখ বুলিয়েছিলেন তারা জানেন ব্যাপারটির শেষটা কতটা ভয়াবহ ছিল। এটা ছিল সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়ানক বিমান দুর্ঘটনা। ২২৮ জন যাত্রীর সকলেরই মৃত্যু ঘটে। আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ থেকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারকরতে লেগে যায় প্রায় দুই বছর। যখন ব্ল্যাকবাক্স বের করা হয় তখন সেখান থেকে সফটওয়ার ত্রুটি,পাইলটের অমনোযোগিতা সহ বিভিন্ন কারণ পাওয়া যায়। কিন্তু ছোট্ট একটি কারণ সমগ্র ব্যাপারটিকে নতুন একটি তাৎপর্যপূর্ণ  দিকে  আলোকপাত  করে।

বায়ুর গতিবেগ মাপার জন্য ব্যবহৃত ‘পিটটটিউব’ নামে একটি যন্ত্রাংশে বরফের প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যায়। কিন্তু সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ফুট উপরে এমনটি হওয়ার কথা নয়। আবহাওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান বলে, সচরাচর এই উচ্চতায় পানি জমে বরফের কেলাস হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু  ফ্লাইট ৪৪৭-ই একা নয়। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে

আকাশ থেকে বিমান পতনের সবচেয়ে ভয়ানক কারণ এই বরফের প্রতিবন্ধকতা বা‘কেলাসিত বরফ’।

পঞ্চাশের দশকের আগ পর্যন্ত বিমান পতনের কোনোকারণ বের করা সম্ভব হয়নি। তারপর বেশ কিছু গবেষণা হলেও সেগুলোর ফলাফল স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। এরপর ১৯৯৪ সালে আমেরিকান ঈগল ফ্লাইট ৪১৪৪ ইন্ডিয়ানার উপর দিয়ে যাবার সময় অজানা জমাট বরফের কারণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে সয়াবিনেরবাগানে পতিত হলে এ ঘটনা আবারো চিন্তার উদ্রেক করে। উল্লেখ্য,এই দূর্ঘটনায় ৬৩ যাত্রীর সকলেই মৃত্যুবরণ করে। এ ব্যাপারে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন(FAA)তদন্ত শুরু করে এবং পরবর্তীতে আরো ৩২ টি ঘটনা র ক্ষেত্রে এমন ব্যাপার আবিষ্কার করে। তাদের তদন্তে অতিউচ্চতায় ইঞ্জিনের হঠাৎ থেমে যাওয়া,সেন্সরের অদ্ভুতত্রুটি ,রহস্যজনক ভারীবৃষ্টির আবির্ভাব ,আকাশ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং রাডারে আবহাওয়া পরিবর্তনের কোনো আভাস না পাওয়া ইত্যাদি অদ্ভুত সব সমস্যার দেখা মিলে।

untitled-4

কানাডার আবহ-পদার্থবিদ ওয়াল্টারস্ট্যাপ বলেন ‘লোকজন বুঝতেই পারেনা ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে। অতি উচ্চতায় পানির জমাট বেঁধে যাওয়া নিয়ে বিভিন্নতত্ত্ব আছে।’ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাইলট ১০ হাজার ফুট(৩০০০মিটার) এর নীচে ইঞ্জিনকে আবার চালু করতে সক্ষম হন। এবং যাত্রীরা সেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান যদি ও তাদেরকে ভয়ানক ঝাঁকুনির অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে হয়। তবে একটা ক্ষেত্রে ইঞ্জিন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় আর পাইলট কোনোমতে বিমান কে অবতরণ করতে সক্ষম হন।

FAA-র তদন্তে পাওয়া যায় ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দেয় এক ধরনের জমাট বরফের কারণে।যদিও শুধুমাত্র বিমানের উত্তপ্ত অংশগুলোতেই কেন প্রভাব ফেল তোতা বুঝা যায় নি। সাধারণভাবে পানি জমাট বেঁধে বরফ হবার কারণ হিসেবে ধরা হয়-পানি যখন বিমানের শীতলঅংশে আসে তখন তা অতিহিমায়িত হয়ে বরফে পরিণত হয়। পাইলটরা বিমানের উইনশিল্ডের উপর এ ধরনের জমাট বরফ দেখতে পান। কানাডার ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের বিজ্ঞানী ভ্যানফুয়েলকিবলেন,‘এটা খুবই স্পষ্ট। এটা শুধু মাত্র ২২ হাজার ফুটের নীচে ঘটে এবং জমাট বৃষ্টির ব্যাপারটি রাডারেও দৃশ্যমান হয়।’ আর সে জন্য বিমানে নতুন ধরনের সেন্সর লাগানো হয় যাতে করে পাখা হতে বরফ-অপসারকস্প্রে করা যায়।

কিন্তু এসবের কিছুই কেলাসিত বরফের ক্ষেত্রে খাটে না। স্বাভাবিক বরফজমাট বাঁধার পদ্ধতি থেকে ভিন্ন এক পদ্ধতিতে স্ফটিক বরফ জমাট বাঁধে।এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পানি আর তরল থাকতে পারে না।

মূল সমস্যা সৃষ্টি করে কেলাসিত বরফের ছোট ধূম বা কণা গুলো।এদের ব্যাস ৪০ মাইক্রোমিটারের মতো। এগুলো বৃষ্টিপরিমাপক রাডারে ও ধরা পড়েনা। এই কেলাসগুলো কঠিন হবার দরুন বিমানের উইনশিল্ড এবং অন্যান্য অংশ আঘাত প্রাপ্ত হয়। যখনই বিমানের উত্তপ্ত অংশ যেমন ইঞ্জিন কিংবা পিটটটিউবের সংস্পর্শে আসে তখনই এরা গলতে শুরু করে। মাঝে মাঝে গরম উইনশিল্ডে লেগেও এরা গলে যায় আর ফলশ্রুতিতে একধরনের অদ্ভুত বৃষ্টি দেখা দেয়। এরকথা প্রতিবেদন গুলোতে পাওয়া যায়।

untitled-4

এসব কেলাসের একটি স্তর গলতে শুরু করলে আরো কেলাস তৈরি হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এরা ইঞ্জিনের উপর জমতে থাকে এবং এইস্তূপীকৃত কেলাস গুচ্ছ ইঞ্জিনকে ক্ষতি গ্রস্তকরে দেয়। সেন্সরের মধ্যে সৃষ্টকেলাস আরো ভয়ানক ক্ষতি করে। ফ্লাইট ৪৪৭ এর ক্ষেত্রে বরফের কেলাস পিটটটিউবকে অবরুদ্ধ করে দেয় যার কারণে এটি ভুল পাঠ দেয়া শুরু করে। ফলস্বরূপ অটো-পাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মূল পাইলটরা ও বিভ্রান্ত হয়ে তাদের স্বাভাবিক ট্রেনিং এর বিপরীত ব্যবস্থা নিতে থাকে। তারা মনে করে ছিল বিমানটি তার উচ্চতা হারাচ্ছে। সেই কারণে বিমানটিকে তারা কৌণিক ভাবে উর্দ্ধগামী করে দেন যা বিমানটিকে একেবারে থামিয়ে দেয়।

বিমান দূর্ঘটনার কারণ হিসেবে যতই কেলাসিত বরফকে দায়ীকরা হয় ততই ব্যাপারটি স্পষ্ট হতে থাকে এবং গ্রহণযোগ্য কিছু কারণ ও পাওয়া যায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত নাসার একটি প্রতিবেদন FAA এর পূর্বেকার অনুমান সংশোধন করে বলে যে,

১৯৮০ সাল থেকে প্রায় ১৪০ টি ঘটনার সাথে এই কেলাস বরফ সংশ্লিষ্ট এবং প্রতিবেদনটি একে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখার জন্য সাবধান করে দেয়।

সুতরাং বিমানের ইঞ্জিন নতুন ভাবে নকশা করার এটাই উপযুক্ত সময় যেন এ ধরনের কেলাসিত বরফ বিমানের কোনোরূপ ক্ষতি করতে না পারে। এউদ্দেশ্যেই ২০০৬ সালের একটি মাল্টিন্যাশনাল প্রোগ্রামে নাসা ,ন্যাসনালরিসার্চ সেন্টার- কানাডা,এয়ারবাস ও বোয়িং সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যোগ দিয়েছিল। কিন্তু ইঞ্জিন ডিজাইন করার আগে তাদের জানা দরকার ছিল কীভাবে উত্তপ্ত ইঞ্জিনে এই কেলাসিত বরফ দানা বাঁধে। তার মানে ঠিক একই পরিস্থিতি ল্যাবে সৃষ্টি করতে হবে। ওহায়োও’ রক্লিভল্যান্ডে অবস্থিত নাসারল্যাবে হিমশীতল তাপমাত্রা সহ ঘণ্টায় একশত মাইল গতিবেগের বাতাস এবং খুবই অল্প চাপের ব্যবস্থা করা হয় যে রকমটি একটি বিমান ৩০ হাজার ফুট উপরে সহ্য করে।

প্রায় এক বছর কাজকরার পর,কেলাসিত বরফ বিশেষজ্ঞ জুডিভ্যানজ্যান্টে এবং এরোস্পেস প্রকৌশলী অ্যাশলিফ্রেজেল একটি ‘আইসবার’-এর বিন্যাস করতে সক্ষম হন যা মিনিটের মধ্যে কেলাসিত বরফের মতো একইরকম আকৃতি এবং ঘনত্ব বিশিষ্ট কেলাস তৈরি করে ইঞ্জিনের মধ্যে দিয়ে স্প্রে করতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেগুলো গরম ব্লেডের উপর জমতে শুরু করে। কিন্তু পরিকল্পনা মতো কাজ এগোলো না। তারা যখন বরফ-মেঘ জেনারেটর (তৈরিকৃত যন্ত্র) চালু করলেন তাতে একটি প্রতিবন্ধকতা দেখা দিল। সৃষ্টি হওয়া কেলাস বরফগুলো বালু-বিস্ফোরক কণার মতো আচরণ করা শুরু করল এবং সংবেদনশীল পরিমাপক যন্ত্র গুলোকে নষ্ট করে দিল। যে সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়নি সেগুলো ভুল পরিমাপ দিতে থাকল।ভ্যানজ্যান্টে বলেন ‘আমাদের আরো উন্নত মানের এবং শক্তিশালি কোনো যন্ত্র নির্মাণ করতে হবে।’

তাদের কাজ বরফ জমাট বাঁধার একটি জটিল কাঠামো উন্মোচন করল। বরফের কেলাস গুলো প্রথম দশাতেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং ছোট ছোট কণার মেঘ তৈরি করে। তাদের এই সমীক্ষা ভিত্তিক মডেল কে কার্যকরী মডেলে রূপান্তর করা পদার্থবিদ্যার এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। এখনকার জন্য তারা নতুন একটি সহজ মডেল তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন যেন বরফ তৈরির ঝুঁকি কিছুটা কমে আসে।

‘একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক মডেল বানাতে হয়তো আরো বছর দশেক লাগবে’ ফ্রজেল বললেন। এরপর মডেলটিকে ইঞ্জিনে পুনরায় রূপ দিতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে। কিন্তু বিমানকে আকাশে উড্ডয়নে ধরে রাখতে এবং এই রহস্যজনক কেলাসিত বরফের সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের একটি তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন।

বোয়িং কোম্পানি পূর্বে এই কেলাসবরফ এবং ক্ষীয় মাণ পরিচলন ঝড়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে ছিল। এই ঝড় ব্জ্রপাত সহকারে বিশাল পরিমাণ পানি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে যায় যা সাধারণ বৃষ্টিপাতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে, এই ঝড় গুলোর জন্য তাপ প্রয়োজন যার কারণে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসা ঝড়গুলো অপেক্ষাকৃত উষ্ণতর অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে।

টমরাটভ্‌স্কি এবং তার সহকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিলেন,সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই ব্যাপারটি একে বারে একই পরিস্থিতিতে সরাসরি বিমানচালিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তারা যুতসই আবহাওয়ায় সেন্সরযুক্ত একটি জেটপ্লেন সমস্যাযুক্ত হটস্পটে চালিয়ে দেখলেন আর ফলাফলও পেলেন। পরিকল্পিত ভাবে জেট প্লেনকে তথাকথিত High Water Ice Condition(HWIC) এর মধ্যে দিয়ে চালিয়ে দেখলেন তাপমাত্রা হিমাংকের ও নীচে নেমে যায় যা কেলাস বরফ সৃষ্টি করার জন্য একদম আদর্শ। রাটভস্কি HWIC এবং পরিচলন ঝড়ের মধ্যকার সম্পর্ককে নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। তিনি আবিষ্কার করেন,পরিচলন ঝড় পানির কণাগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ অক্ষাংশে তাড়িয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এব্যাপারটি কেবল মাত্র তখনই ঘটে যখন ঝড় কমতিরদিকে থাকে। কেন কমতির দিকে থাকলে এই ব্যাপারটি ঘটেতা জানা সম্ভব হয় নি। এটা আশা করা যায়,সবগুলো তথ্য এক ত্রক রলে HWIC সম্পর্কিত বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। গবেষকরা স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে কোথায় কোথায় কেলাসিত বরফ সৃষ্টিহতে পারে তার পূর্বাভাস দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেইসাথে রাডারের মাধ্যমেও এর শনাক্ত করণের জোর চেষ্টা চলছে। আর হয়তো কয়েক বছরের মধ্যের ইঞ্জিনেরপুনঃনকশাও করা যাবে।

অদৃশ্য হত্যাকারী

ফুয়েল কি এবং তার দল সফলভাবে বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দুটি সেন্সর তৈরি করতে সক্ষম হন। প্রথমটি, একটি বিয়ার ক্যানের আকৃতির যন্ত্র যারনাম দেয়া হয়েছে পার্টিক্যাল আইস প্রোব,যা বিমানের বাইরের দিকে লাগানো যাবে। এটি বাতাসের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে ছোটছোট কণার উপস্থিতি শণাক্ত করতে পারে। এটি আসলে বিমানের ধ্বংসাবশেষ শণাক্তকরণের জন্য বানানো হয়েছিল। কিন্তু দলটি একে পরিবর্তন করে কেলাসিত বরফের বিশেষ সংকেত শনাক্ত করণের কাজেলাগাতে সক্ষম হয়। অন্য যন্ত্রটি একটি শব্দোত্ত র জমাট-বরফ শনাক্তকরণের সেন্সর। এটি সরাসরি ইঞ্জিনেরভেতর কার জমাট বরফ পরিমাপ করতে পারে। কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথেসাথে পরিবর্তিত হয়। দুটো যন্ত্রই এতটা উন্নত যে জনাব ফুয়েলকি এগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার কথা ভাবছেন।

কিন্তু বিমানে এই সেন্সর আর রাডার লাগানোর পর ও মূল সমস্যার সমাধান হলো না। একটা কারণ হলো,এখনো কেলাসিত বরফের প্রকৃত পরিমাণ মাপা সম্ভব হয়নি। যার ফলে এখনো বিমান দূর্ঘটনা ঘটেই চলছে। উদাহরণস্বরূপ,২০১৪ সালের এয়ার আলজেরিয়ার ফ্লাইট ৫০১৭ এর কথা বলা যায় যেখানে ১১৬ জনের মতো যাত্রী মারা যায়।

ফ্লাইট ৪৪৭ এর পিটটটিউব অবরুদ্ধ হবার কথা ব্ল্যাকবাক্সের মাধ্যমে জানাসম্ভব হলেও একই রকম অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে সেটাও জানা সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে বিমানের অল্পবিস্তর ক্ষতি সাধিত হয়ে ইঞ্জিন আবার পুনরায় সচল করা সম্ভব হয়। কিন্তু ঠিক কী কারণে ১০ হাজার ফুটের নীচে আসলেই কেলাসিত বরফের সকল চিহ্ন উধাও হয়ে যায় তা জানা সম্ভব হয়নি।

সমস্যাটি আরো প্রকোপ আকার ধারণ করার সুযোগ আছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী দিনদিন উত্তপ্ত হচ্ছে যার ফলে আবহাওয়ার অস্থিরতাও বাড়ছে। আর এমন পরিস্থিতিতে কেলাসিত বরফসৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ও প্রবল। যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটিঅবরিডিং’ এর আবহাওয়া বিদ সুগ্রেবলেন, ‘এ অবস্থা আরো সক্রিয় হবে এবং বারবার ঘটবে’। সাম্প্রতিক কালে রোলসরয়েস ইঞ্জিন ল্যাবের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে কেলাসিত বরফ আরো প্রসার লাভ করবে এবং সহজেই সৃষ্ট হতে পারবে। এই কোম্পানির এক ইঞ্জিন বিশেষজ্ঞ ররিক্লার্কসন কোম্পানিকে এক অসুবিধা জনক কিন্তু নিরাপদ উপায় বাতলে দেন।তাহ লো,‘খারাপ আবহাওয়ায় বিমান উড্ডয়ন বন্ধরাখুন’।

তথ্যসূত্র

Hot Ice:The Invisible threat making planes fall out of the sky, New Scientist

https://www.newscientist.com/article/mg23130800-700-hot-ice-the-race-to-understand-a-sinister-threat-to-aircraft/