মৃতদেহের রূপান্তর প্রক্রিয়া

জনের মৃত্যুর পর প্রায় চার ঘন্টা কেটে গেছে। মৃতদেহ সৎকারের জন্য আনা হয়েছে। জীবনের বেশিরভাগ সময়ে সুস্থ থাকা জন কাজ করতেন টেক্সাসের তেল খনিতে। কাজের ধরনের জন্যই শারীরিকভাবে ছিলেন বেশ কর্মঠ আর শক্তিশালী। বছর দশেক আগেই ধূমপান আর মদ্যপান দুটোই ছেড়েছিলেন। তবুও একসময় হঠাৎ তার শরীরের অবনতি হতে থাকে এবং তারপর জানুয়ারির এক হিমশীতল সকালে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

এই মুহুর্তে তার মৃতদেহ রাখা হয়েছে সৎকারকর্মীর একটি ধাতব টেবিলে। ঠাণ্ডা আর প্রায় শক্ত হয়ে আসা শরীর আর ত্বকের ধূসর রক্তাভ বর্ণ ইতিমধ্যেই পচন শুরু হবার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমাদের কেউই সাধারণত মৃত্যুর পর নিজের কিংবা পরিচিতজনদের দেহের কি হাল অবস্থা হবে তা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি না। বেশিরভাগ মানুষই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। ঐতিহ্য অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়। মাঝে মাঝে হিমাগারে রেখে কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে মৃতদেহ কিছু সময়ের জন্য তাজা রাখার চেষ্টা করা হয়, যা শবের পচন প্রক্রিয়াকে কিছুক্ষণের জন্য ধীর করে দেয়। অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবশ্য ফরেনসিক সায়েন্স ব্যবহার করা হয় যেন মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সময়, কারণ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সম্বন্ধে জানা যায়। এক্ষেত্রে শবের পচনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপকে কাজে লাগানো হয়।

মরদেহ নিজে মৃত হলেও তা অন্য অনেক জীবের জীবনের সূচনা করে। অনেক বিজ্ঞানী মৃতদেহকে জটিল বাস্তুতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ বাস্তুতন্ত্র মৃত্যুর ঠিক পরপরই শুরু হয়। ধীরে ধীরে দেহকে পচিয়ে ফেলার মাধ্যমে এই তন্ত্র বিস্তার লাভ করে।

আত্ম-পরিপাক

‘অটোলাইসিস’ বা ‘আত্ম-পরিপাক’ নামে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় মৃত্যুর কয়েক মিনিট পর থেকেই মৃতদেহে পচন শুরু হয়। হৃৎস্পন্দন বন্ধ হবার সাথে সাথে কোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। কোষের অম্লতা বেড়ে গিয়ে বিষাক্ত পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এনজাইম কোষপর্দাকে হজম করে কোষের ভাঙ্গনের সূত্রপাত ঘটায়। এটা সাধারণত যকৃতেই প্রথম ঘটে, কেননা যকৃতে এনজাইমের পরিমাণ বেশি থাকে। রক্তকণিকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী ভেদ করে বের হয়ে আসে এবং অভিকর্ষের টানে কৈশিক নালিকা, ছোট শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে যায়। এতে করে মৃতদেহের চামড়া বিবর্ণরূপ ধারণ করতে থাকে। পাশাপাশি দেহের তাপমাত্রাও পড়তে শুরু করে। এরপর দেখা যায় ‘রিগর মর্টিস’- যার কারণে চোখের পাতা, চোয়াল, ঘাড়ের পেশী, হাত, পা সব শক্ত হয়ে যায়। জীবিত অবস্থায় আমাদের পেশীতে থাকা অ্যাকটিন আর মায়োসিন নামে দুটি সূত্রবৎ প্রোটিনের কারণে আমরা পেশী সংকুচিত-প্রসারিত করতে পারি। কিন্তু মারা যাবার পর পেশীতে শক্তি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবার কারণে এ প্রোটিনগুলো এক জায়গায় আটকা পড়ে যায়, ফলে পেশীসহ বিভিন্ন অস্থিসন্ধিকে নড়নে অক্ষম করে ফেলে।

মৃতদেহ থেকে নির্গত তীব্র গন্ধ প্রায় ৪০০ রকমের উদ্বায়ী জটিল রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে গঠিত। এই গ্যাস মিশ্রনের সঠিক গঠন মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। শব-বাস্তুতন্ত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য থাকে। আমাদের শরীর কিন্তু অসংখ্য ব্যাকটেরিয়ার পোষক হিসেবে ভূমিকা রাখে।

অনাক্রম্যতার অবসান

বেঁচে থাকাকালে দেহের বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অণুজীবমুক্ত থাকে। মৃত্যুর কিচ্ছুক্ষণের মাঝেই দেহের অনাক্রম্যতা বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে অণুজীবগুলো সুযোগ পেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র আর বৃহদান্ত্রের সংযোগস্থলে অণুজীবগুলোর আক্রমণ শুরু হয়। অন্ত্রের অণুজীব অন্ত্রকে হজম করে ফেলে। এরপর চারপাশের কোষকে হজম করতে করতে ভিতর থেকে বাইরের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত কোষ থেকে নির্গত রাসায়নিক মিশ্রণকে এরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

২০০৪ সালের আগস্টে ‘আলাবামা স্টেট ইউনিভার্সিটির’র ফরেনসিক বিজ্ঞানী গুনাল্‌জ জাভান এবং তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো ‘থ্যাটানোমাইক্রোবায়োম’ নামে নতুন একটি বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। গ্রীক শব্দ ‘থ্যাটানোস’ অর্থ ‘মৃত্যু’। জাভান ও তার দল মৃত্যুর পর ২০ থেকে ২৪০ ঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রায় ১১ টি মৃতদেহ থেকে যকৃত, প্লীহা, মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। তারা ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের দুটি ভিন্ন পদ্ধতির সাথে জৈবতথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে প্রতিটি নমুনার ব্যাকটেরিয়াল বস্তুর বিশ্লেষণ করে দেখেন। এর আগে ‘ইঁদুরের মৃতদেহ পচনপ্রক্রিয়া’ সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, মৃত্যুর পর দেহে থাকা অণুজীবগুলোর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলেও তা একটি সুনির্দিষ্ট এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে। এতে করে গবেষকরা মৃত্যুর তিন দিন থেকে তিন মাসের মধ্যে মৃত্যুর সময় সম্পর্কে একটি সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য ধারণা দিতে পারেন।

ব্যাকটেরিয়া পর্যবেক্ষণ

জাভান লক্ষ্য করে দেখেন, মৃত্যুর বিশ ঘন্টার মধ্যে ব্যাকটেরিয়াগুলো যকৃতে এসে পৌঁছায় এবং প্রায় ৫৮ ঘন্টার মধ্যে এরা সংগৃহীত নমুনাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এর অর্থ ব্যাকটেরিয়াগুলো একটি সুশৃঙ্খল নিয়মানুসারে মৃতদেহের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করে। এর ফলে কত সময়ের মাঝে এরা এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে পরিব্যাপ্ত হয় তা ব্যবহার করে মৃত্যুর পর কত সময় অতিবাহিত হয়েছে তা জানার একটা পথ খুলে যায়। জাভান বলেন- ‘মৃত্যুর পর দেহে থাকা ব্যাকটেরিয়ার কার্যপ্রণালী বদলে যায়। এরা হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং এক সময় প্রজনন সম্পর্কিত অঙ্গগুলোকেও ধ্বংস করে ফেলে। একটা বিষয় পরিষ্কার যে, ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন মৃতদেহ পচনের বিভিন্ন ধাপের সাথে সম্পর্কিত।’

প্রাকৃতিক ক্ষয়

অধিকাংশ মানুষের কাছে পচা, গলিত লাশের বীভৎস দৃশ্য অনেকটা বিরক্তিকর ভয়ানক দুঃস্বপ্নের মতো। কিন্তু কিছু গবেষকের কাছে বিষয়টি এতটা বিভীষিকাময় নয়। যেমন ‘সাউথঈস্ট টেক্সাস এপ্লাইড ফরেনসিক সায়েন্স’ ফ্যাকাল্টির গবেষকদের জন্য এটা নিতান্ত মামুলি ব্যাপার। ২০১১ সালের শেষের দিকে গবেষক সিভিল রুচেলি, অ্যারন লিন আর তাদের সহকর্মীরা ফ্যাকাল্টির একটা নির্দিষ্ট স্থানে দুটি নতুন মৃতদেহ এনে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয় হবার জন্য রেখে দেন।

মৃতদেহে যখন আত্ম-পরিপাক প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং একইসাথে ব্যাকটেরিয়াও আন্ত্রিক অংশে বিস্তার করে তখনই শুরু হয় ‘পচন প্রক্রিয়া’। এটাকে বলা হয় মৃতদেহের ‘আণবিক মৃত্যু’। নরম টিস্যুর ভাঙ্গনের মাধ্যমে তরল, গ্যাস কিংবা লবণে পরিণত হওয়া ইত্যাদি- এসবই দেহের আণবিক মৃত্যুর সূচনা করে।

এ পচন প্রক্রিয়া অক্সিজেন নির্ভর এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সাথে সম্পর্কিত। ব্যাকটেরিয়াগুলো দেহকে খেতে শুরু করে আর দেহে থাকা চিনিজাতীয় পদার্থকে গাঁজানোর মাধ্যমে মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়াসহ বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থ জমা করতে থাকে। ফলে মৃতদেহ ফুলে যায়। এ ফুলে যাওয়াকে বলা হয় ব্লোটিং (Bloating)। এর পরের ধাপে শুরু হয় বিবর্ণতা। ক্ষতিগ্রস্ত নালী থেকে নির্গত রক্তকণিকার মাঝে থাকা হিমোগ্লোবিনকে এক ধরনের অবাত ব্যাকটেরিয়া (বেঁচে থাকার জন্য যাদের অক্সিজেন অপরিহার্য নয়) সালফো-হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত করে। এদের উপস্থিতির কারণেই চামড়া শক্ত, সবুজাভ-কালো বর্ণ ধারণ করে।

বিশেষ ধরনের আবাসস্থল

দেহের ভেতরে গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে নরম এবং আলাদা হয়ে যাওয়া চামড়া ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। এক পর্যায়ে গ্যাস এবং তরলীকৃত টিস্যু বিশোধিত হয়ে দেহের মলদ্বারসহ অন্যান্য ছিদ্রাংশ সহ অন্যান্য ছেঁড়া চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসে।‘ব্লোটিং’ বা ফুলে যাওয়াকে পচন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক এবং শেষ ধাপের মধ্যে একটি চিহ্নিত অংশ হিসেবে ধরা হয়। সাম্প্রতিক আরেক পরীক্ষায় জানা যায়, এ রূপান্তর কিছু বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন লক্ষ্য করার মাধ্যমেও চিহ্নিত করা যায়। একজন পতঙ্গবিশারদ হিসেবে বুচেলি প্রধানত পোকামাকড় কীভাবে মৃতদেহে উপনিবেশ গড়ে তুলে সে ব্যাপারে আগ্রহী। তিনি লক্ষ্য করেন, মৃতদেহ কিছু বিশেষ ধরনের নেক্রোফ্যাগাস (মড়া-ভক্ষক) পতঙ্গের আবাসভূমি। এবং এদের সমগ্র জীবনচক্র মৃতদেহকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

শূককীট চক্র

দুই প্রজাতির মাছি মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়ার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। মৃতদেহ থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধময় এবং একইসাথে পল্কা-মিষ্টি গন্ধ ছড়ায় যা এই মাছিগুলোকে আকৃষ্ট করে। এরা এসে মৃতদেহের উপর বসে এবং খোলা ক্ষত স্থানে ডিম পাড়া শুরু করে। প্রতিটি মাছি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে প্রায় ২৫০ টি ডিম দেয় এবং এই সময়ের মাঝে ডিম থেকে শূককীট বের হয়ে আসে। এরা পচা মাংস ভক্ষণ করে বড় শূককীটে পরিণত হয়। কয়েক ঘন্টা বাদে খোলস নির্মোচন করে আরো খাদ্য গ্রহণ করে বড় আকারের মাছিতে পরিণত হয়। এ মাছিগুলো আবার ডিম পাড়া শুরু করে এবং এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত খাবার জন্য কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকে। এ মাছিগুলোর উপস্থিতি আবার অন্যান্য শিকারী প্রাণীকে মৃতদেহের অবস্থানের নিশানা দেয়। গুবরে পোকা, পরজীবী কীট, পিঁপড়ে, বোলতা, মাকড়সা এসে মৃতদেহে ভাগ বসানো শুরু করে। শকুন এবং বাকি আবর্জনা-ভুক এবং মাংসাশী জীবও মৃতদেহ ভোজনক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ ছাড়ে না।

প্রতিটি মৃতদেহেরই একটি অনন্য অণুজৈবনিক ভূমিকা আছে। মৃতদেহে অণুজীব-সম্প্রদায়ের গঠন, তাদের আন্তঃসম্পর্ক, পচনপ্রক্রিয়ার উপর তাদের প্রভাব ইত্যাদি ব্যাপারে আরো বিশদ ধারণা একদিন ফরেনসিক দলকে কোথায়, কীভাবে একজন মানুষ মারা গেল সে সম্পর্কে নিখুঁতভাবে জানতে সাহায্য করবে।

মৃতদেহের ডিএনএ সিকুয়েন্সিং কিংবা এতে লেগে থাকা মাটির ধরণ অপরাধ তদন্তকারীদের অপরাধস্থলের ভৌগোলিক অবস্থান, সূত্র খোঁজার এলাকা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যাপারে সহায়তা করে।

উন্নত-উর্বর মাটি

মানবদেহ প্রায় ৫০-৭৫% পানি দিয়ে গঠিত। শুষ্ক দেহের প্রতি কেজি হতে প্রায় ৩২ গ্রাম নাইট্রোজেন, ১০ গ্রাম ফসফরাস, ৪ গ্রাম পটাশিয়াম আর ১ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম মাটিতে মুক্ত হয়। প্রথমদিকে এ কারণে মাটির উপরিভাগের কিছু ছোট গাছপালা মরে যায়। নাইট্রোজেনের বিষাক্ততা কিংবা দেহনির্গত এন্টিবায়োটিক পদার্থের জন্য এমনটি হয়ে থাকতে পারে। তবে সব মিলিয়ে মৃতদেহের জৈবিক রূপান্তর মাটিকে করে তোলে উন্নত আর উর্বর। পাশাপাশি এ পচনপ্রক্রিয়া চারপাশের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের জন্যও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া কবরের মাটি পরীক্ষা করে মৃত্যুর সময় বের করার একটা সম্ভাব্য উপায় আছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। পচন প্রক্রিয়ার ফলে মৃতদেহে সংঘটিত রাসায়নিক পরিবর্তন সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, লাশ থেকে নির্গত লিপিড-ফসফরাস ৪০ দিন পর্যন্ত মাটির সাথে মিশতে থাকে যেখানে নাইট্রোজেন আর পৃথকযোগ্য ফসফরাস সময় নেয় প্রায় ৭২ থেকে ১০০ দিন। এ প্রক্রিয়ার আরো গভীর বিশ্লেষণ এবং কবরের মাটির বায়োরাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে হয়তো একদিন বের করা যাবে কতদিন আগে কোনো দেহকে মাটিতে কবরস্থ করা হয়েছে।

চিত্রঃ মৃতদেহের বিভিন্ন খনিজ পদার্থ মাটিকে জৈবশক্তি সম্পন্ন করে তোলে।

বলে রাখা ভালো, মমিকৃত লাশও একসময় পচনের শিকার হয়। কিন্তু এটা নির্ভর করে ঠিক কখন কোন পদ্ধতিতে মৃতদেহটিকে মমিকরণ করা হয়েছে তার উপর। তাছাড়া কফিনের ধরণ, কবর দেয়ার প্রক্রিয়ার উপরও মমিকৃত লাশের পচনের সময়সীমা নির্ভর করে।

আমাদের শরীরকে বলা যায় শক্তির এক আঁধার। যে শক্তি দেহের মধ্যে আটকা পড়ে অপেক্ষা করছে কখন মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। জীবিত অবস্থায় আমাদের শরীর তার অগণিত অণু-পরমাণুতে এ শক্তি ধরে রেখে স্থিতিশক্তি হিসেবে ব্যয় করে। এভাবেই দেহ নিজেকে শক্তির সাহায্যে প্রতিনিয়ত সচল রাখে।

তাপগতিবিদ্যার সূত্রানুসারে, শক্তি সৃষ্টি হয় না আবার ধ্বংসও হয় না। কেবল এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হয় মাত্র। মহাবিশ্বে মোট মুক্ত শক্তির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অন্যভাবে বলা যায়, বস্তু প্রতিনিয়ত ভেঙ্গে পড়ছে আর তাদের ভর রূপান্তরিত হচ্ছে শক্তিতে। মৃতদেহের পচনপ্রক্রিয়া যখন চুড়ান্তরূপ ধারণ করে তখন এটা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের সকল পদার্থই এই মৌলিক

আইন অনুসরণ করে চলে। আমাদের শরীর নশ্বর; পচনের মাধ্যমে এটা চারপাশের বস্তুজগতের সাথে ভারসাম্য তৈরি করে এবং অন্যান্য জীবিত প্রাণীর বেঁচে থাকায় সহায়তা করার জন্য পরিণত হতে থাকে শক্তিতে। যে শক্তি ছড়িয়ে পড়ে ছাই থেকে ছাইয়ে, ধূলা থেকে ধূলাতে।

(মোজাইক সায়েন্স, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ফিউচার-সহ বিভিন্ন বিখ্যাত অনলাইন পত্রিকাতে প্রকাশিত মোহেব কস্ট্যান্ডির প্রবন্ধ ‘This is what happens after you die’ এর সংক্ষেপিত বঙ্গানুবাদ)

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

ইতিহাসের উত্তরোত্তর উন্নতির সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রেও ঘটে যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এটি রূপ নিতে থকে এক অভিজাত শিল্প হিসেবে। এর কিছুটা ঝলক বা ছোঁয়া দেখা যায় তৎকালীন পশ্চিম এশিয়ার উর্বর সভ্যতাগুলোতে। বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায়। সেইসাথে তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরানের উর্বর ভূমিগুলোতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের সুমেরীয় এবং তার পরবর্তী আক্কাডীয়, অ্যাসেডীয় আর ব্যাবলনীয় সভ্যতার কিছু কীলক-লিপি থেকে সেই সময়কার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য কাজকর্মের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তখনকার অনেক চিকিৎসক মনে করতেন অসুখ-বিসুখ হয় মূলত জাদুবিদ্যা বা দুষ্ট প্রেতাত্মা দ্বারা এবং এর প্রতিকারও শুধুমাত্র জাদুবিদ্যা দ্বারাই সম্ভব। তারা তথাকথিত তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ আর গাল-মন্দ করে সেই দুষ্ট প্রেতাত্মা তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। এ ধরনের চিকিৎসক বা ওঝাদের নাম ছিল আসিপুস।

আরেক ধরনের চিকিৎসক যারা আসুস নামে পরিচিত ছিলেন তারা বিশ্বাস করতেন কার্যকরী পন্থাগুলোতে। তারা বিভিন্ন ভেষজ তরল মিশ্রণ, ক্ষতস্থান পরিষ্কারকরণ, আক্রান্ত স্থান ম্যাসাজ কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যান্ডেজ ও মলম ব্যবহার করতেন। আসিপুস আর আসুস- এ দু’দলই পাশাপাশি চিকিৎসা চালাতেন। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাহায্য-সহায়তাও করতেন। তবে বাণিজ্যিক ব্যাপারগুলো গোপন রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন।

চিত্রঃ আইনপ্রণেতা হাম্বুরাবি সূর্যদেবতা শামাস থেকে রাজকীয় মর্যাদা নিচ্ছেন।

৩,৮০০ কি ৩,৭৬০ বছর আগে হাম্বুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনের শাসক। কীলক-লিপিতে লিখিত আইনশাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বিশ্বের প্রথম আইন প্রণেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। আর এই আইনশাস্ত্রে চিকিৎসা বিষয়ক কিছু ঘোষণাও ছিল। এই ঘোষণাগুলো চিকিৎসকদের সফলতা আর ব্যর্থতা উভয়ের

জন্যই দায়ী ছিল। রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারলে যেমন পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও বলবৎ ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তির চিকিৎসা করে রোগ সারাতে পারলে ব্রোঞ্জের ল্যান্সেট (বর্তমান ইসরাইলি দশ শেকেলের সমান) দেয়া হতো যা কোনো সওদাগরের এক বছরের আয়েরও অনেক বেশি। আর কোনো দাসের জীবন বাঁচাতে পারলে দেয়া হতো দুই শেকেল। কিন্তু যদি কোনো সার্জনের ছুরির তলায় অভিজাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে সেই সার্জনের এক হাত কেটে নেয়া হতো। সেই সাথে তাকে একজন দাসও হারাতে হতো।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, হাম্বুরাবি আইনে খুব কম নির্দেশনা দেয়া থাকায় ঠিক কী উপায়ে তারা সেই সময় চিকিৎসা চালাতো তা জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো জাদুটোনা, দুষ্ট প্রেতাত্মা অথবা পাপের কারণে অসুখ-বিসুখ হয় এই ধারণা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন ব্যাবলনীয়দের আরোগ্যদেবী। তাকে চিকিৎসকদের পৃষ্টপোষোকতাকারী দেবীও বলা যায়। নিনকার্ককে সাধারণত এক নারীরূপে দেখানো হতো যার সঙ্গী একটি কুকুর কিংবা কুকুরের মাথার মতো কোন মুর্তিকেও নিনকার্ক হিসেবে দেখা হতো। সেসময় রোগীরা রোগমুক্তির জন্য নিনকার্কের মন্দিরে কুকুরের মুর্তি দিত। মাঝে মাঝে কুকুর বলিও দেয়া হতো বলে জানা যায়। কিছু কিছু সূত্র বলে, গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন নেকড়েমুখো কোনো দানবী। এই নিনকার্কের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩,৬০০ বছর আগে ক্যাসিটস নামক এক ব্যাবলনীয় সভ্যতার আমলে। নিনকার্কের প্রধান মন্দির ছিল ঈসিনে (বর্ত্মা ইশান-আল বাহরিয়া, ইরাক) এবং নিপ্পুরে (বর্ত্মান নুফফার-ইন আফক, ইরাক)।

ভেষজ ও অন্যান্য গুল্মলতা প্রতিকারক হিসেবে সেসময় ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। রোগ প্রতিকারের জন্য তারা ওয়াইন, আলুবোখারা (পাম ফলের চাটনি) আর পাইন গাছের রস ব্যবহার করতো। এরসাথে টিকটিকির মল মেশানো হতো যা ঔষধ সহজে গিলতে অসুবিধা সৃষ্টি করলেও ওষুধি ভাব আনতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। এসব ওষুধে অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণও বিদ্যমান ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাধারণ জনগণ ও অভিজাত লোকদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে দেবতা আর আত্মারা এতটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল যে বর্তমান আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখনকার চিকিৎসকদের ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক কাজ আলাদাভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটি আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন এই আলোচনায় ইমহোটেপ নামক এক পুরোহিত চিকিৎসক প্রশ্নবিদ্ধ হন। ইমহোটেপের আমল ছিল প্রায় ৪,৬৫০ বছর পূর্বে। ইমহোটেপ মিশরীয় রাজত্বকালের প্রথমদিকে ছিলেন। খুব দ্রুতই চারদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে জীবদ্দশাতেই তাকে ঈশ্বরপুত্র (Demi-God) হিসেবে সম্মান দেয়া হতো, যে সম্মান সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে সময় শুধুমাত্র রাজকীয় লোকদের এ ধরনের সম্মান জানানো হতো।

তিন হাজার বছর পূর্বে, মিশরীয় নতুন রাজত্বকালে তাকে পুরোপুরি দেবতারূপে গণ্য করা হতো। তাকে বলা হতো, তার পুত্র (Son Of Ptah), সৃষ্টির স্রষ্টা অথবা মহাবিশ্বের রূপকার। সেই সাথে কারিগরদের ত্রাণকর্তা বিশেষণও দেয়া হয়। তার সঙ্গী ছিলেন সেকমেট (Sekhmet)।

এ সেকমেট মিশরীয়দের সিংহকেশী সমর ও আরোগ্যের দেবী। সেই সাথে ইমহোটেপের মাও ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, ইমহোটেপ আসলে ছিলেন ঘেঁটে আর সন্ধি বাতের চিকিৎসক। তিনি এক ধরনের তরল মিশ্রণ বানাতে দক্ষ ছিলেন যা এ ধরনের রোগ ভালো করে দিতো। অন্যান্য সূত্র বলে, তিনি নাকি ছিলেন কিছু ধান্দাবাজ ওঝাদের দলনেতা যে তার অধীনস্থদের সফলতার সুফল ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায়ভার বা নিন্দা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

চিত্রঃ ইমহোটেপের মা দেবী সেকমেট। তিনি সমর এবং আরোগ্য দেবী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন গ্রীসেও ইমহোটেপের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। তবে কখনো কখনো তাকে প্রাচীন গ্রীক আরোগ্যদেবতা অ্যাসলেপিয়াস (Aselepios) এর যমজ ভাই মনে করা হতো। কখনোবা অ্যাসলেপিয়াসকেই ইমহোটেপ বলা হতো।

ইমহোটেপের সময়কালের আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন হেসি-রা, যিনি ফারাও জোসার এর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। হেসি-রা দন্ত চিকিৎসক হিসেবেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। শোনা যায়, দাঁত তোলা আর মুখের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে পটুত্ব ছিল তার। সেইসাথে বর্তমানকালে আমরা যাকে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগ বলি সেটা সম্পর্কেও অল্প বিস্তর ধারণা ছিল। রোগীদের বারবার মূত্র বিসর্জন দেখে এ ধারণা তার মাথায় আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদ অঞ্চলের হোগলাজাতীয় গুল্ম বা ঘাস জাতীয় প্যাপারি থেকে তৈরি প্যাপিরাস থেকে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়, যার একটির নাম- ‘স্মিথ প্যাপিরাস’। বিখ্যাত আমেরিকান মিশরীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংগ্রাহক এডউইন স্মিথের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। তিনিই প্রাচীন এ নথি ১৮৬২ সালে লুক্সর থেকে উদ্ধার করেন।

স্মিথ প্যাপিরাস একদম অসম্পূর্ণ। দেখলে মনে হবে মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া এটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর পুরনো। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক আর শব্দশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি আরো প্রাচীন এক নথি থেকে নকল করা হয়েছে। সেই প্রাচীন নথিটি যথাসম্ভব ইমহোটেপের নিজের হাতে লেখা বা তার অধীনে লেখা। সে সময়ের অন্যান্য প্রাচীন প্যাপিরাসের তুলনায় স্মিথ প্যাপিরাস ঐন্দ্রজালিক বা জাদুকরী চিকিৎসার চেয়ে সাধারণ জখম, ক্ষত, পচন আর অস্ত্রোপচার সম্পর্কেই বেশি তথ্য দেয়। শুধুমাত্র একটি স্থানে আরোগ্য লাভের জন্য ঈশ্বর বা দেবতার কৃপা কামনা করা হয়েছে। নথিটিতে মস্তকের সামনের অংশ থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি আর রক্তের সরবরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্যাপিরাসটি ৪৮ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগেই একদম পরিচিত আধুনিক পদ্ধতির মতো একেকটি সমস্যার বর্ণনা। কারণ, প্রতিকার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং তা সারাবার বিষয়াদিও বিস্তারিতভাবে আছে।

রোগীকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা, রোগীর ইতিহাস নেয়া বর্তমানকালের অত্যাধুনিক চিকিৎসার নিয়ম হলেও প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে দেবতারা শাসন করতেন, সেখানে এরকম পদ্ধতি ছিল কিছুটা অজ্ঞতার আড়ালে থাকা রহস্যের মতো।

এ স্মিথ প্যাপিরাসেই করোটিসন্ধি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া মেনিনজাইটিস (মস্তকের কোষপর্দা) এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা যায়। মাথার ও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যও এতে পাওয়া যায়। স্মিথ প্যাপিরাসে ক্ষতস্থানে সেলাই করা, কাঁচা মাংস ব্যবহার করে রক্তপাত বন্ধ করা এবং মধু ব্যবহার করে রোগ প্রতিকারের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ব্যাপারের কথা বলা যায়। যেমন- একজন লোক, যার মাথায় ক্ষত হয়েছে, তার জন্য প্রথমে মাথাটাকে সঠিকভাবে জায়গানুসারে বিভিন্ন অংশে সেলাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাজা কাঁচা মাংস ক্ষতস্থানে বেঁধে দিতে হবে। এরপর গ্রীজ, মধু এবং অন্যান্য ভেষজ তরল ব্যবহার করতে হবে যতদিন না লোকটি সুস্থ হয়ে উঠে। স্মিথ প্যাপিরসে মূলত অ্যাক্সিডেন্ট সম্পর্কিত কথা বেশি থাকায় ধারণা করা হয় এটি শুধুমাত্র যুদ্ধাহত সৈন্যদের কিংবা পিরামিড বানানোর কারিগরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো। স্মিথ প্যাপিরাসে বর্ণিত ৪৮টি চিকিৎসা ধরনের মধ্যে ১৪ টিকেই চিকিৎসার অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সকল রোগের প্রতিকার সেই সময় তাদের জানা ছিল না।

তখনকার আরেকটি বিখ্যাত পুরাতন নথি বা পুঁথি হলো ইবারস প্যাপিরাস (Ebers Papyrus)। এটি প্রায় স্মিথ প্যাপিরাসের মতোই। এটি ৩,৫০০ বছর আগের বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলেন এটিও অন্য আরেকটি পুঁথির নকল, যথাসম্ভব ইমহোটোপের আমলেরই কোনো নথি হবে।

১৮৭২ সালে জার্মান লেখন এবং মিশরীয় বিশেষজ্ঞ জর্জ ইবারস এ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। তিনি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। সেখানেই এ ইবারস প্যাপিরাস সংরক্ষিত আছে। এতে প্রায় ১১০ পৃষ্ঠা রয়েছে, লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬৬ ফুট আর প্রস্থে ১২ ইঞ্চির মতো।

স্মিথ প্যাপিরাসের সাথে তুলনা করলে ইবারস প্যাপিরাসে শত শত জাদুমন্ত্র আর অভিশাপের মাধ্যমে রোগ সারানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। তবে এটি অন্য নথিগুলোর দিক থেকে সাজসজ্জায় বেশ দুর্বল। তারা জাদুমন্ত্র দিয়ে বাজে, অশুভ প্রেতাত্মা তাড়াবার কৌশল কাজে লাগাতো। পরজীবীর কারণে ঘটিত বাত, ত্বকসমস্যা, আলসার বা পেটের ক্ষত, পায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, হৃদরোগ, প্রস্রাবে অসুবিধা, বিভিন্ন ক্ষত এবং প্রসূতিরোগের চিকিৎসার বিবিধ বিধান এতে পাওয়া যায়।

তবে প্রসূতিরোগ সম্পর্কিত প্যাপিরাস হলো ‘কাহুন গাইনোকোলজিক্যাল প্যাপিরাস। প্রায় ৩,৮০০ বছর আগের এ নথিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রথম নথিগুলার একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে সংরক্ষিত আছে। এতে মূলত নারীদের প্রজনন বিষয়ক ব্যাপার আলোচনা করা হয়েছে। গর্ভধারণে সক্ষমতা, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থার পরীক্ষণ এবং গর্ভনিরোধক ইত্যাদি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের মাসিক এবং সে সম্পর্কিত ব্যথার কথাও আছে। বলা আছে- যে গর্ভবতী মহিলা সবসময় বিছানায় থাকতে ভালোবাসে, তাকে কখনো উঠানো উচিৎ নয়। বরং তাকে নাড়াচাড়া করাও ঠিক নয়। এতে তার গর্ভের বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। তাকে খাওউই নামক একটি জিনিস এক গ্যালনের চতুর্থাংশ খাওয়ানো হয়।

আবার এক চিত্র-বিচিত্র পাত্রকে গর্ভবতীদের জন্য ঐশ্বরিক সুরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এতে করে শয়তান আত্মার হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে প্রাচীনকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো। মজার এবং একই সাথে ভয়ানক এক তথ্য- গর্ভনিরোধক হিসেবে তারা মধু, টক দই আর কুমিরের গোবরের একটা মিশ্রণ নারী যৌনাঙ্গে ব্যবহার করতো।

চিত্রঃ ঐশ্বরিক তাবিজ-কবজ যা অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হতো।

স্মিথ ও ইবারস প্যাপিরাসের কিছুকাল পরেই দ্য হার্স্ট, ব্রুগশ্চ এবং লন্ডন মেডিক্যাল প্যাপিরাস পাওয়া যায়। সমাধি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি, বিভিন্ন হস্ত নির্মিত তৈজসপত্রের সাথে সাথে মমিকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ত্থেকে পুরানো ইতিহাসের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মমিকরণের জন্য মিশরীয় চিকিৎসকরা যে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদিসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তা এমনিতেই বোঝা যায়। তারা এসব কাজে করাত, ড্রিল মেশিন, সাঁড়াশি, কাঁচি ইত্যাদি নানারকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন।

তবে অপারেশনের বা সার্জারি চিকিৎসা মূলত দূর্ঘটনাসমূহ চিকিৎসার সাথে জড়িত ছিল বেশি। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সুষম খাদ্যাভাসের প্রতিও জোর দিতেন। নকল চোখ, নকল দাঁত- এসব বানাতেও তারা দক্ষ ছিলেন। তারপরও সেই সময়কার মিশরীয় সমাজে আত্মিক এবং ঐন্দ্রজালিক চিকিৎসাই প্রধান ভূমিকা রাখতো। তারা ঘাড়, বাহু, হাত, কব্জি কিংবা গোড়ালিতে মাদুলি ব্যবহার করতো। এতে করে ভৌতিক অপদেবতা হতে রক্ষা পাবে বলে মনে করতো তারা। তবে কেউ যদি ভুলে অসুখে পড়ে যায় তবে যৌক্তিক মেডিক্যাল চিকিৎসার চেয়ে ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসাই বেশি প্রাধান্য পেতো।

প্রাচীন মিশরের অস্ত্রপচার ব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের আলাদাভাবে সম্মান দেয়া হতো। জীবনদানকারী ত্রাতারূপে তাঁদের গণ্য করা হতো সমাজের উঁচু স্তরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা করতো তারা। তারা কাটা অংশ সেলাই করতেন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেন। এছাড়া উইলো গাছের পাতা ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টিউমার অপারেশনও করা হতো। এসব অপারেশনে নানা রকম ছুরি ব্যবহার হতো। সেইসাথে পাথরের তৈরি ধারালো বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতিও কাজে লাগাতেন চিকিৎসকরা।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রাচীনকালে ব্যবহৃত নকল পায়ের গোড়ালি পেয়েছেন মিশরে, যার কিছুটা কাঠের আর কিছুটা চামড়ার ও কাপড়ের তৈরি। এ ধরনের প্রস্থেটিক

যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনায় অথবা গ্যাংগ্রিনের কারণে অঙ্গ হারানো মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। এতে করে রোগীরা সহজে ভারসাম্য রেখে প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারতো। বলে রাখা উচিৎ, প্রাচীন মিশরীয়রা ঐতিহ্যগতভাবে পায়ে স্যান্ডেল পরিধান করতো।

চিত্রঃ প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত নকল গোড়ালি।

মমিকরণ

অভিজাত, উঁচু বংশের কিংবা ধনী কেউ মারা গেলে তার মরদেহ মমি করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ বের করে ফেলা হতো। মিশরীয়রা মমি করার ব্যাপারে পরবর্তী অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মতো কুসংস্কারপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঠিক কী উপায়ে তারা এ মমি করতো তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

দ্বিতীয় শতকের রোমান সাম্রাজ্যের কুমির দেবতা সোবেক (Sobek) এর মন্দিরে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল ছুরি, চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেছে। তখন বিশাল এক হূঁকের মাধ্যমে নাকের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্ক বের করা হতো। আর অন্ত্র, যকৃত, পাকস্থলী, ফুফফুস ইত্যাদি শরীরের বাম পাশ কেটে সরানো হতো। এসব কাজ শরীরে পচন শুরু হবার আগেই সমাধা করা হতো।

হার্ট বা হৃদপিণ্ড, যা আবেগের এবং বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা সরানো হতো না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সেটি শরীরের মধ্যেই রেখে দেয়া হতো। আর বাকি সব অঙ্গ বের করে ফেলা হতো।

চিত্রঃ ক্যানোপিক বা অঙ্গ সংরণের পাত্র।

মমিকরণবিদরা শরীর হতে বের করা অঙ্গগুলোকে জলশূন্য করে পুনরায় শরীরে স্থাপন করতেন অথবা ক্যানোপিক (Canopic) নামক এক ধরনের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন। এ পাত্রগুলো ছোট আকৃতির কফিনের মতো দেখতে। এগুলো মমিকৃত দেহের কিংবা কবরের পাশাপাশি স্থানে রাখা হতো।

তথ্যসূত্র

The priest physician of Egypt

পাওয়া গেল হারিয়ে যাওয়া পেঙ্গুইনের ১৫ লক্ষ সদস্য

এন্টার্কটিকা মহাদেশের অসংখ্য দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিশেষ এক প্রজাতির পেঙ্গুইনের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। মূলত পশ্চিম এন্টার্কটিকা উপদ্বীপের অগ্রভাগে অবস্থিত ডেঞ্জার আইল্যান্ডসে অ্যাডিলে পেঙ্গুইন (Pygoscelis adeliae)  নামক প্রজাতিটির  দেখা মেলে।

ড্রোনের দিকে তাকিয়ে থাকা ডেঞ্জার দ্বীপস্থ হেরোইনা দ্বীপের এক অ্যাডিলে পেঙ্গুইন

জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এই ছোট্ট এন্টার্কটিক নিবাসী প্রজাতিটিকে গত ৪০ বছর ধরে বিলুুুপ্ত ধরা হচ্ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এদের মলের চিহ্নের সূত্র ধরে বিশাল সংখ্যক অ্যাডিলে পেঙ্গুইনদের আবাসস্থল শনাক্ত করেন। এই কলোনীতে বর্তমানে প্রায় ১৫ লক্ষ পেঙ্গুইনের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সমগ্র বিশ্বব্যাপী পেঙ্গুইনদের সংখ্যাকে নিয়ে গেছে প্রায় ৮০ লক্ষের কাতারে। এছাড়াও গেন্টো এবং চেইনস্ট্রিপ প্রজাতির পেঙ্গুইনদের ছোট ছোট কলোনিও আবিষ্কৃত হয়েছে।

স্যাটেলাইট ইমেজে এদের বাসস্থানের হদিস পাওয়ার পর স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটি, উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউট এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকদল এন্টার্কটিকায় অভিযান চালনা করেন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তারা দ্বীপে হাজার হাজার পেঙ্গুইনের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। ড্রোন ব্যবহার করে এদের সংখ্যা গণনা করা হয় এবং দেখা যায় এটিই পশ্চিম এন্টার্কটিক উপদ্বীপের সর্ববৃহৎ আবাসভূমি। ড্রোনের মাধ্যমে গ্রীড অনুসারে দ্বীপের ছবি তোলা হয়। প্রতি সেকেন্ডে একটি করে ছবি তুলে পরে কোলাজের মাধ্যমে পুরো ভূমির ল্যান্ডস্কেপ ছবি তৈরি করা হয়। পরে সফটওয়্যার ব্যবহার করে পিক্সেল বাই পিক্সেল অনুসারে পেঙ্গুইনদের বাসা শনাক্ত করা হয়।

ড্রোন থেকে তোলা ডেঞ্জার আইল্যান্ডীয় হেরোইনা দ্বীপে অবস্থিত পেঙ্গুইন

অন্যান্য স্থানে অল্প স্বল্প কিছু সংখ্যক অ্যাডিলে পেঙ্গুইনের অবস্থানের ইংগিত পাওয়া গেলেও পশ্চিম এন্টার্কটিকাতে এতকাল এদের তেমন কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি বললেই চলে। উষ্ণ আবহাওয়া আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপ এর পেছনে দায়ী বলে ধারণা করা হয়। তবে গবেষকরা আশা করছেন, নতুন পাওয়া এই আবাসস্থলে এদের টিকে থাকার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করে ক্রমে হ্রাস পাওয়া প্রজাতিটির ভবিষ্যত নিশ্চিতে কোন না কোন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র: IFLCsienceoceansentry