অরিগ্যামির আকাশ জয়

কাগজের ভাঁজে নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসায়নি কিংবা প্লেন বানিয়ে বাতাসে উড়ায়নি, এমন মানুষ মনে হয় না খুঁজে পাওয়া যাবে। এক টুকরো কাগজ ভাঁজ করে বিভিন্ন আকৃতিতে রূপ দেওয়ার এই শিল্পকে বলা হয় অরিগ্যামি। এর জন্ম জাপানে। ধারণা করা হয়, ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা জাপানে কাগজ নিয়ে আসার পরপরই আবির্ভাব ঘটে এই শিল্পের।

তখনকার সময়ে কাগজের মূল্য বেশি হওয়ায় কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতেই ব্যবহার হতো এ শিল্প। সেই থেকে শুরু করে এখন অবধি অরিগ্যামি শিল্পটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসারতা পেয়েছে। এটি যে সারা বিশ্বে বেশ জনপ্রিয় তার নজির মেলে অরিগ্যামি ভিত্তিক বেশকিছু সংগঠন দেখলেই।

উদাহরণস্বরূপ দেখানো যায় The British Origami Society কিংবা OrigamiUSA–র নাম। পাশাপাশি অরিগ্যামিকে আরো বৈচিত্র্যময় কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন নাসা সম্প্রতি মহাকাশযানের ডিজাইন করেছে অরিগ্যামির কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। কেন? জানতে হলে প্রবেশ করতে হবে গভীরে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন মহাকাশের প্রতিটি নক্ষত্রে কম করে হলেও একটি গ্রহ রয়েছে। এর মধ্যে অনেক গ্রহ আছে যেগুলো প্রাণ ধারণের উপযোগী। প্রাণের বসবাসের উপযোগী যে গ্রহগুলো আমাদের সৌরজগতের বাইরে অবস্থান করছে তাদের বলা হয় এক্সোপ্লানেট। জ্যোতির্বিদরা এখন অবধি ৩৭০৮টি এক্সোপ্লানেটের সন্ধান পেয়েছেন।

বেশিরভাগ গ্রহই আবিষ্কৃত হয়েছে পরোক্ষভাবে। গ্রহটি কোনো নক্ষত্রকে আবর্তন করার সময় টেলিস্কোপ তাক করা হলে যদি সেটি টেলিস্কোপ ও নক্ষত্রের মাঝে বাধা হিসেবে অবস্থান করে তাহলে নক্ষত্রের একটি অংশ অন্ধকার থাকবে। এবং সে অংশটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে। যেহেতু গ্রহটি আবর্তন করছে সেহেতু অন্ধকার অংশটি এগিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। এরকম ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা পরোক্ষভাবে বলতে পারেন সেখানে একটি গ্রহের উপস্থিতি আছে।

গ্রহ শনাক্ত করার এ পদ্ধতিটিকে বলা হয় অতিক্রমণ পদ্ধতি (Transit method)। এ পদ্ধতির পাশাপাশি আরো কিছু পদ্ধতি আছে, যেগুলো ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পরোক্ষভাবে বেশকিছু গ্রহ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে সরাসরি ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে অল্প কিছু গ্রহের। ফলে বাকি গ্রহদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি এখনো।

চিত্র: ট্রানজিটের মাধ্যমে জানা যায় গ্রহের অস্তিত্ব

কোনো গ্রহের ছবি সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রধান একটি বাঁধা হচ্ছে গ্রহটির আশেপাশে কোনো নক্ষত্রের তীব্র উজ্জ্বল আলো। আলোর প্রচণ্ড বিচ্ছুরণ টেলিস্কোপের লেন্সে এসে পড়ে। প্রবল আলোর কারণে ছবির অনেক অংশ মুছে যায়। আলোর ঝলকানিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রহটিকে দেখাই যায় না। ঠিক যেমন তীব্র রোদে কারো ছবি তুলতে গেলে ছবির অনেক কিছুই আলোর তীব্রতায় ঢাকা পড়ে যায়।

নক্ষত্রগুলোর উজ্জ্বলতা তাদের গ্রহগুদের তুলনায় বিলিয়ন বিলিয়ন গুণ বেশি। ফলে সে এলাকার ছবি তুলতে গেলে ঐ উজ্জ্বল জিনিসই চলে আসবে সবার আগে, অনুজ্জ্বল গ্রহ আর স্থান পাবে না নক্ষত্রের প্রাবল্যে।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য নাসার বিজ্ঞানীরা একটি চমৎকার ভাবনা ভাবছেন। টেলিস্কোপকে যদি নক্ষত্রের আলো থেকে ঢেকে দেওয়া যায় তাহলে কেমন হয়? বাস্তব জীবনে আমরা প্রায় সময়ই এই পদ্ধতিটা ব্যবহার করি। দূরে কোথাও যদি তাকাতে চাই এবং তখন যদি প্রবল সূর্যালোক থাকে তখন কপালের উপর হাত দিয়ে আলোটা ঢেকে নিয়ে বিশেষভাবে তাকাই। এতে আলো সরাসরি চোখে লাগে না বলে লক্ষ্যবস্তুটি দেখা যায়। নাসার বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনাও অনেকটা সেরকম।

এর জন্য বিজ্ঞানীদের তৈরি করতে হবে বিশাল আকৃতির একধরনের চাকতি। এর নাম তারা দিয়েছেন স্টারশেড। এর আকৃতি হবে অনেকটা সূর্যমূখী ফুলের মতো। বিশাল গোলাকার গঠন আর কিনারায় পাপড়ির ন্যায় অবয়ব।

স্টারশেডের ধারণার উদ্ভাবক মূলত মহাকাশ টেলিস্কোপের জনক লেইম্যান স্পিটযার। সূর্যগ্রহণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯৬২ সালে ধারণাটি প্রস্তাব করেন। স্টারশেডের এমন আকৃতির উদ্ভাবকও তিনিই।

বিভিন্ন মডেল নিয়ে পরীক্ষা করে তারা ধারণা করছেন স্টারশেডের এরূপ আকৃতি পৃথিবীসম কোনো গ্রহের ছবি তোলার জন্য টেলিস্কোপকে ভালোভাবে ঢেকে দিতে পারবে। এটি টেলিস্কোপের লেন্সকে নক্ষত্রের আলো থেকে বিশেষভাবে ঢেকে দেবে। তবে বিশেষ প্রক্রিয়ায় গ্রহের দিকে ঠিকই নজর দেয়া যাবে। গ্রহ থেকে আসা আলো আরো ভালভাবে দৃশ্যমান হবে। প্রয়োজনে এটি তার অবস্থান পরিবর্তন করে ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র থেকে আলো আসতে বাঁধা দিতে পারবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা গ্রহ পর্যবেক্ষণ ছাড়াও অন্যান্য মহাকাশ গবেষণায়ও এধরনের স্টারশেড কাজে লাগানো যাবে।

এক্ষেত্রে তাদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যেমন, নক্ষত্র আর টেলিস্কোপের মাঝে কীভাবে একে ঠিক অবস্থানে বসানো হবে, এত বড় একটি বস্তুকে কীভাবে মহাকাশে নিয়ে যাওয়া হবে। একটি স্টারশেডের ব্যাস হবে প্রায় ১০০ ফুট বা ৩০ মিটার। যা একটি বাস্কেটবল কোর্টের সমান। যথেষ্ট বড়।

অন্যদিকে কোনো রকেটের ব্যাস খুব বেশি হলে ৫মিটার। ৫ মিটারের রকেটে করে ৩০ মিটারের বস্তু নিয়ে যাওয়া? কীভাবে? রকেটে করে একে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার এক সহজ সমাধান খুঁজে পেয়েছেন তারা। সেটি হলো অরিগ্যামির ও গণিতের কিছু কলাকৌশল।

অরিগামির সেই বিশেষ শাখাটির নাম রিজিড অরিগ্যামি। এতে কাগজের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় দৃঢ় পাত। দৃঢ় পাত যেহেতু ভাঁজ করা যায় না তাই যেখানে ভাঁজের প্রয়োজন সেখানে আলাদা আলাদা পাতকে কবজা দিয়ে জোড়া লাগানো হয়। ফলে বস্তুর আকৃতির কোনো পরিবর্তন হবে না। শুধু কাগজের স্থলে হবে দৃঢ় পাত।

রিজিড অরিগ্যামিকে কাজে লাগিয়ে বিশাল আকৃতির স্টারশেডকে ভাঁজ করে রকেটে বহন উপযোগী আকারে নিয়ে আসা হবে। এক্ষেত্রে যে প্যাটার্নে ভাঁজ করা হবে সেটি হলো আইরিশ ফোল্ডিং প্যাটার্ন। এভাবে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার পর আবার ভাঁজ খুলে ফেলা হবে। প্রত্যেকটি ভাঁজ বেশ সূক্ষ্মভাবে খুলতে হবে যাতে এর কিনারা পর্যন্ত প্রতিটি অংশ মিলিমিটার পর্যায়ে সঠিক অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা এই ভাঁজ সঠিকভাবে খুলতে পারার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন।

চিত্র: বিজ্ঞানীরা ভাজগুলো নিয়ে কাজ করছেন

মহাকাশ গবেষণায় অরিগ্যামিকে কাজে লাগানো এটাই প্রথম নয়। এর আগেও কিছু যন্ত্রে অরিগ্যামির ভাঁজ করার নীতিকে কাজে লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সোলার প্যানেল এবং স্যাটেলাইট। মহাকাশ গবেষণা ছাড়াও বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দেখা যায়। অল্প অল্প করে এভাবেই সীমিত গণ্ডি থেকে বের করে এনে অরিগ্যামিকে কাজে লাগানো হচ্ছে বিজ্ঞানের বিশাল জগতে।

তথ্যসূত্র

১) https://exoplanets.nasa.gov/resources/1015/

২) https://www.youtube.com/watch?v=XYNUpQrZISc

৩) https://www.youtube.com/watch?v=Ly3hMBD4h5E

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাধার

পৃথিবী বসবাসযোগ্য গ্রহ হবার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পানি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণের সব দিককে প্রভাবিত করছে পানি। পানি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী থাকতো না। বর্তমানে যেমন দেখতে তাই তার তুলনায় গ্রহটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ৭১% পানি দ্বারা আচ্ছাদিত, যার প্রায় ৯৬.৫% পানি সমুদ্রগুলো ধারণ করছে। এছাড়া নদীনালা, হ্রদ, বাতাসের জলীয় বাষ্প, হিমবাহ, মাটির আর্দ্রতা এবং আপনার-আমার মধ্যেও পানি রয়েছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধারের অবস্থান ভূপৃষ্ঠের উপরে কোথাও নয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মাইল অভ্যন্তরে এর অবস্থান।

পৃথিবীকে ভূতাত্ত্বিকভাবে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায় Crust, Mantle ও Core। এগুলোর মধ্যে Mantle স্তরটি খানিকটা জটিল। এর নিজেরই আবার স্বতন্ত্র চারটি স্তর রয়েছে- Lithosphere, Athenosphere, Upper mantle ও Lower mantle। এ স্তরগুলোর মধ্যেও আবার বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়। এগুলোর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। Mantle এর শেষোক্ত দুইটি স্তরের মধ্যবর্তী অংশকে বলা হয় Transition zone। এ অংশেই রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধার।

যে জলাধারের কথা বলছি তা ভূ-পৃষ্ঠের উপরের জলাশয়গুলোর মতো নয় যেখানে আমরা মাছ চলাচল করতে দেখি। পানির যে তিনটি রূপের সাথে আমরা পরিচিত, এটি তার থেকে আলাদা। বলা যেতে পারে পানির চতুর্থ অবস্থা সেটি। ভু-অভ্যন্তরে এত গভীরে অত্যাধিক তাপমাত্রা ও চাপের কারণে পানি বিভাজিত হয়ে হাইড্রক্সিল মুলক (OH¯) আকারে থাকে যা এক ধরনের শিলার মধ্যে আণবিক স্তরে চাপা পড়ে আছে। এ শিলার নাম দেয়া হয়েছে Ringwoodite। শিলাটি অনেকটা পানি দ্বারা সিক্ত স্পঞ্জের ন্যায় আচরণ করে। শিলাটির বিশেষ স্ফটিক গঠন হাইড্রোজেনকে আকর্ষণ করে পানিকে আটকে ফেলতে পারে। Ringwoodite পানির এক সুবিশাল আধার। Transition zone এর এই শিলার যদি এক শতাংশও গঠনগতভাবে তরল পানি হয় তাহলে তার দ্বারা পৃথিবীর সমুদ্রগুলোকে প্রায় তিন বার প্রতিস্থাপিত করা যাবে।

ভূ-অভ্যন্তরে এই সুবিশাল জলাধারের সন্ধান পেয়ে বিজ্ঞানীদের এখন ধারণা, ভূপৃষ্ঠের এ বিশাল সমুদ্রগুলোর পানির উৎস আসলে ভূ-অভ্যন্তরে আটকে থাকা পানিই। যদিও পূর্বে সর্বাধিক স্বীকৃত ধারণা ছিল- প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন বছর আগে বরফতুল্য ধূমকেতু ও গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ থেকেই এ সমুদ্রগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। তবে এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভূতাত্তিক কার্যকলাপ এবং অত্যাধিক চাপের কারণে ভু-অভ্যন্তরের আটকে থাকা পানির অণুগুলো ভূপৃষ্ঠের দিকে উঠে এসে এই সমুদ্রগুলোর জন্ম দিয়েছে। এর থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা পানি চক্র কেবল ভূ-পৃষ্ঠ এবং বায়ুমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভু-অভ্যন্তরের অনেক গভীরে পর্যন্ত প্রসারিত। এছাড়াও ধারণা করা হয় ভু-অভ্যন্তরের এই পানিই বাফার হিসেবে ক্রিয়া করছে যার জন্য কোটি কোটি বছরেও সমুদ্রের উচ্চতার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

আমাদের সৌভাগ্য যে এই সুবিশাল জলরাশি পৃথিবীর অভ্যন্তরেই চাপা পরে আছে। নতুবা যদি তা সম্পূর্ণভাবে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসতো তাহলে আমরা স্থলভাগ বলতে কেবল পর্বতচূড়াগুলোকেই দেখতে পেতাম।

নতুন প্রজাতির ভিন্নধর্মী খোঁজে

পৃথিবীতে ১ ট্রিলিয়ন প্রজাতির জীবের অস্তিত্ব আছে বলে ধারণা করা হয়। এদের মাঝে ১ শতাংশের মাত্র এক হাজার ভাগের এক ভাগ বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিছু গবেষণা অনুযায়ী এ পর্যন্ত প্রায় ১.৯ মিলিয়ন প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে কোনো কোনো গবেষকের মতে সংখ্যাটি ১.৫ মিলিয়ন। প্রতি বছরই নতুন নতুন প্রজাতির জীব উত্তরোত্তর আবিষ্কৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বছরে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার পরিমাণ নতুন নতুন প্রজাতি শনাক্ত ও নামকরণ করা হচ্ছে।

এরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি ফর সায়েন্স এক্সপ্লোরেশন কর্তৃক ২০০৮ সালে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র ২০০৬ সালেই ১৬ হাজার ৯৬৯ টি নতুন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী শনাক্ত ও বর্ণিত হয়েছে। তবে সংখ্যাটি আরো বড় হবে, কেননা সেখানে নব-আবিষ্কৃত অণুজীব প্রজাতির সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্রতি বছরে প্রায় ২ হাজার প্রজাতির নতুন উদ্ভিদই আবিষ্কৃত হচ্ছে। এছাড়াও জীবাশ্ম (ফসিল) থেকে আবিষ্কৃত নতুন প্রজাতির সংখ্যাও প্রতি বছরে প্রায় ২ হাজারের মতো। বর্তমানে পৃথিবীর সর্বত্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হলেও বিজ্ঞানীরা যে হারে নতুন নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করে চলেছে তা বিগত ২৫০ বছরের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এমনও হতে পারে যে, যতক্ষণ সময়ে আপনি লেখাটি পড়ে শেষ করবেন ততক্ষণে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও কোনো একটি নতুন প্রজাতি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

নতুন আবিষ্কৃত প্রজাতিগুলোর বেশিরভাগই পোকামাকড় ও অণুজীব। গবেষকরা যতই পৃথিবীর প্রান্তীয় অঞ্চলগুলোতে গবেষণা চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন, ততই নতুন নতুন উদ্ভিদ ও প্রাণীর সন্ধান পাচ্ছেন। আবার এমন অনেক নতুন আবিষ্কৃত প্রজাতি রয়েছে যা ভুলবশত অন্য কোনো গোত্র (Family) বা গণ (Genus)-এর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে মনে করা হতো। গণ ও প্রজাতিগত এমন ভুল হয়েছে কারণ তাদের

মধ্যে পার্থক্য ছিল খুব সূক্ষ্ম। এদের জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে সূক্ষ্ম গবেষণা করার পর তাদের প্রকৃত প্রজাতিগত পরিচয় উদ্ঘাটিত হয়েছে। এধরনের প্রজাতিগুলোকে বলা হয় ‘দুর্বোধ্য প্রজাতি’ বা ক্রিপটিক স্পিসিস। এছাড়া জাদুঘরে সংরক্ষিত নমুনা থেকেও নতুন নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে।

কখনো কখনো গবেষকরা দীর্ঘ অভিযান চালিয়ে অনেক অনুসন্ধানের পর নতুন কোনো প্রজাতির সন্ধান পান। আবার কখনো নতুন কোনো প্রজাতি খুঁজে পাওয়ার ঘটনাটি ঘটে একদমই অলৌকিকভাবে। নতুন প্রজাতি খুঁজে পাওয়ার এমনই কিছু ভিন্নধর্মী ঘটনা নিয়ে আলোচনা থাকছে আজকের লেখায়।

ফেসবুকে নতুন প্রজাতির সন্ধান

কোনো উদ্ভিদবিদই ভিন্ন এই প্রজাতিটির কথা জানতেন না। বিরল ও অপরিচিত এই উদ্ভিদটির একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করার পরই জানতে পারেন উদ্ভিদবিদেরা। রেজিনাল্ড নামের একজন শখের উদ্ভিদবিজ্ঞানী, ২০১৩ সালের কোনো এক সময় দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিলে তার বাড়ির কাছে একটি পাহাড়ে ভ্রমণ করতে যান। সেখানে তিনি বেশ কিছু উদ্ভিদের সাথে এই উদ্ভিদটিরও একটি ছবি তোলেন এবং সেটি ফেসবুকে পোস্ট করেন। এর প্রায় ১ বছর পরে উদ্ভিদ গবেষক পাউলো গনেলা ফেসবুকে ছবিটি লক্ষ্য করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, উদ্ভিদটি তার জানা সকল উদ্ভিদ থেকে আলাদা। পরবর্তীতে পাউলো গনেলা পাহাড়টিতে চলে যান এবং নিশ্চিত হন যে এটি একটি ব্যতিক্রমী প্রজাতি যা উদ্ভিদজগতে নতুন। পরে জার্মানির বোটানিক্যাল স্টেট কালেকশনের অন্যান্য গবেষকদের নিয়ে গবেষণা করার পর তারা উদ্ভিদটির নামকরণ করেন ড্রসেরা ম্যাগনিফিকা (Drosera magnifica)।

উদ্ভিদটির অবয়বের একটি আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এর ঝাড়বাতি সদৃশ পুস্পবিন্যাস। এটি আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম মাংসাশী উদ্ভিদ যা প্রায় ৫ ফুট লম্বা। এটি ফড়িংয়ের মতো বড় বড় পোকাকেও আটকে ফেলতে পারে। কিন্তু IUCN Red List অনুযায়ী উদ্ভিদটি অত্যন্ত বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় আছে।

বাজারে নতুন প্রজাতি

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ লাওস। ধারণা করা হয়, লাওসের অরণ্যে এখনো অনেক প্রজাতি অনাবিষ্কৃত অবস্থায় আছে। এমনই একটি প্রাণী পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ২০ বছর আগে। তবে গহীন অরণ্যে নয়, স্থানীয় এক বাজারে।

চিত্রঃ ড্রসেরা ম্যাগনিফিকার প্রথম ছবি যেটি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছিল।

বাজারের এক দোকানে শাকসবজির পাশেই বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল প্রাণীটিকে। স্থানীয়দের নিকট এটি ‘খাঁইয়’ নামে পরিচিত। প্রাণিবিদ রবার্ট টিমিন্সের-এর চোখে পড়ে এই প্রাণীটি, এবং এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি আবিষ্কার করেন তিনি। গবেষকরা দেখলেন, এটি Rodentia বর্গের অন্তর্ভুক্ত, তবে এই বর্গের অন্যান্য জীবিত প্রাণীদের তুলনায় এটি স্বতন্ত্র। তাই তারা একটি নতুন গোত্রের নাম দেন এবং প্রাণীটিকে সেই গোত্রের একটি প্রজাতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেন। বৈজ্ঞানিক নাম দেয়া হয় Laonastes aenigmamus। তবে পরবর্তীতে ২০০৬ সালে গবেষক মেরি ডাওসন জানান যে, এটি নতুন কোনো গোত্রের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং একটি প্রাচীন গোত্রের সদস্য যার অন্তর্ভুক্ত প্রাণীগুলো ১১ মিলিয়ন বছর পূর্বেই বিলুপ্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হতো। প্রাণীটির বৈশিষ্ট্য এবং জীবাশ্মবিদ্যার বিভিন্ন তথ্যের উপর নির্ভর করে এরূপ শ্রেণিকরণ করা হয়েছে। এ থেকেই প্রাণীটির গুরুত্ব কত বেশি তা উপলব্ধি করা যায়।

ঢাকাইয়া ব্যাঙ

নাম দেখার পরে আর বোঝার বাকি থাকার কথা নয় যে, প্রাণীটির আবিষ্কার দূরের কোনো দেশে নয়, এই দেশেরই প্রাণকেন্দ্র ঢাকাতে হয়েছিল এর আবিষ্কার। ঢাকার মতো একটি শহরে একটি নতুন প্রজাতির উভচর প্রাণীর আবিষ্কার কিছুটা আশ্চর্যজনকই বটে। এ বছরের মার্চে তরুণ প্রাণীবিজ্ঞানী সাজিদ আলী হাওলাদার প্রাণীটিকে শনাক্ত ও নামকরণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমানে University of Helsinki-তে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনে অধ্যয়নরত। তিনি প্রাণীটির নাম দেন Zakerana Dhaka। Zakerana নামটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাকের হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে রাখা হয়েছিল। এভাবে ঢাকার রাস্তার ব্যাঙ বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন পরিচয় পায়।

সংগ্রহের ১৮০ বছর পরে নামকরন

নতুন কোনো প্রজাতি খুঁজে পাওয়া সবসময়ই উত্তেজনাপূর্ণ। আর সেটি যদি চার্লস ডারউইনের সংগ্রহ করা কোনো নমুনা থেকে পাওয়া যায়, তাহলে তা সত্যিই আশ্চর্যজনক। ১৮৩২ সালে এইচএমএস বিগল জাহাজে ভ্রমণের সময় ডারউইন আর্জেন্টিনার একটি উপকূলীয় শহর থেকে কিছু জীবাশ্ম ও পোকার নমুনা

সংগ্রহ করেছিলেন। তার সংগ্রহে একটি গুবরে পোকা ছিল যেটি প্রায় ১৮০ বছরেও বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত ও নামকরণ করা হয়নি। নমুনাটি লন্ডনের Natural History Museumএ অন্তত কয়েক দশক যাবত ভুল লেবেল করে রাখা হয়েছিল।

টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পতঙ্গবিদ ড. স্টাইলিয়ান্স মিউজিয়ামটি থেকে কিছু পতঙ্গের নমুনা ধার করে আনেন। সেখানে তিনি ডারউইনের নাম যুক্ত লেবেল করা একটি নমুনা খুঁজে পান। তিনি আবিষ্কার করলেন যে আসলে এটি বিজ্ঞান জগতে নতুন একটি প্রজাতি যা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নামকরণ করা হয়নি। পরে ২০১৪ সালে ডারউইনের ২০৫ তম জন্মবার্ষিকীতে এ প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয় Darwinilus sedarisi। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো ডারউইন যেখান থেকে নমুনাটি সংগ্রহ করেছিলেন সেখানে এখন অধিকাংশই আবাদি জমি এবং ১৯৩৫ সালের পর এই প্রাণীটি আর দেখাও যায়নি।

সমুদ্রসৈকতে বিশাল জেলিফিশ

চিত্রঃ সমুদ্রসৈকতে পড়ে থাকা নতুন প্রজাতির জেলিফিশ।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জেলিফিশের একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। এধরনের জেলিফিশগুলো Cyanea গণের অন্তর্ভুক্ত। এদেরকে ‘সিংহের কেশর’ ও বলা হয়। এটিকে খুঁজে পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার এক পরিবার, ১২ বছর বয়সী বালক জেভিয়ার লিম প্রথম এ জেলিফিশটি দেখতে পায়। লিমের পরিবার তাসমানিয়ার সমুদ্রতীরে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে শামুকের খোল সংগ্রহের সময় তারা একটি অদ্ভুত জিনিস পড়ে থাকতে দেখে। তাদের কাছে এটি বিরাট আকৃতির শ্লেষ্মা জাতীয় কিছু মনে হয়েছিল। স্থানীয় সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীকে তারা এ সম্পর্কে অবহিত করেন। বিজ্ঞানী ড. লিসা-আন, যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে জেলিফিশ নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি জানান এটি ছিল এক বিস্ময়কর আবিষ্কার, কেননা এটি ছিল আসলেই বিশাল আকৃতির জেলিফিশ যার ব্যাস ছিল প্রায় ৫ ফুট। তার উপর বিজ্ঞান জগতে এটি একদমই নতুন প্রজাতির জেলিফিশ। পরবর্তীতে কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (CSIRO)এর বিজ্ঞানীরা জেলিফিশটি নিয়ে আরো গবেষণা করেন এবং এর নামকরণ করেন।

উৎসব সজ্জায় নতুন প্রজাতির খোঁজ

ব্রমিলিয়াড

মাছের বাজারে বিলুপ্ত প্রজাতি

ব্রমিলিয়াড (Bromeliad) নামে একটি উদ্ভিদ প্রজাতি স্থানীয়দের নিকট বহুদিন ধরে পরিচিত হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে তা সম্প্রতি আবিষ্কৃত। মেক্সিকোতে বড়দিন উদযাপনের সময় গ্রামবাসীরা সমবেত হয়ে যিশু খ্রিষ্টের জন্ম রহস্য ব্যাখ্যা করার সময় এই গাছটি দিয়ে বেদি সাজাতো। তবে সম্প্রতি গবেষকরা উপলব্ধি করলেন যে, এ উদ্ভিদটি বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্তকরণ ও নামকরণ করা হয়নি। পরবর্তীতে প্রক্রিয়া শেষে তারা এর নাম দেন Tillandsia religiosa। কাণ্ডবিহীন, গোলাপি রঙের স্পাইক ও সবুজ পাতাওয়ালা উদ্ভিদটির পুস্পবিন্যাস অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলের পাথুরে এলাকায় এদের আবাস।

১৯০২ সালে প্রকৃতিবিজ্ঞানী উইলহেম হেইন ইয়েমেন ভ্রমণ শেষে বেশ কয়েকটি উদ্ভিদ ও প্রাণীর নমুনা নিয়ে ফেরেন। সেগুলো তিনি ভিয়েনা মিউজিয়ামে দান করে দিয়েছিলেন। নমুনাগুলোর মধ্যে ছিল একটি মসৃণ দাঁতওয়ালা ও কালো অগ্রভাগ বিশিষ্ট হাঙ্গর। এটি প্রায় ৪০ বছর ধরে দৃষ্টির আড়ালে ছিল। ১৯৪৫ সালে এটি প্রথমবারের মতো বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত ও নামকরণ করা হয়, বৈজ্ঞানিক নাম Carcharhinus leiodon। তবে এটিই ছিল একমাত্র নমুনা।

প্রায় শতাব্দীব্যাপী এ প্রজাতির কোনো হাঙ্গরের সন্ধান বিজ্ঞানীরা পাননি। ধারণা করা হয়েছিল এরা হয়তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে শার্ক কনজারভেশন সোসাইটি অভিযান চালিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে কুয়েতের মাছের বাজারে এই প্রজাতির প্রায় ৪৭ টি হাঙ্গরের খোঁজ পেয়ে যায়। অথচ কুয়েত হচ্ছে প্রথম নমুনাটি সংগ্রহের স্থান থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে। এ ঘটনা সম্পর্কে গবেষক মুর জানান “বিশেষত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোতে সর্বদা ক্যামেরা নিয়ে মাছের বাজারে যান, এতে করে নতুন কিছুর সন্ধান পেয়ে যেতে পারেন।”

বিজ্ঞানের নিকট কখনো কখনো নতুন কোনো প্রজাতি আমাদের চোখের স্বাভাবিক গণ্ডিতেই থাকে। তাই আশপাশটা ভাল করে দেখে নিন। অলৌকিকভাবে পেয়ে যেতেও পারেন ভিন্ন কোনো প্রজাতির সন্ধান।

তথ্যসূত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Global_biodiversity
  2. http://www.smithsonianmag.com/smart-news/no-one-knew-plant-existed-until-it-was-posted-facebook-180956084/?no-ist
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Laotian_rock_rat
  4. http://dailyasianage.com/news/12588/new-frog-species-found-in-dhaka
  5. http://www.isciencetimes.com/articles/6813/20140212/new-beetle-species-named-both-charles-darwin.htm
  6. http://www.bbc.com/news/world-asia-26062303
  7. http://www.esf.edu/top10/2015/09.htm
  8. http://www.scientificamerican.com/article/shark-species-thought-to-be-extinct-found-in-fish-market/

 

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাধার

পৃথিবী বসবাসযোগ্য গ্রহ হবার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পানি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণের সব দিককে প্রভাবিত করছে পানি। পানি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী থাকতো না। বর্তমানে যেমন দেখতে তাই তার তুলনায় গ্রহটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ৭১% পানি দ্বারা আচ্ছাদিত, যার প্রায় ৯৬.৫% পানি সমুদ্রগুলো ধারণ করছে। এছাড়া নদীনালা, হ্রদ, বাতাসের জলীয় বাষ্প, হিমবাহ, মাটির আর্দ্রতা এবং আপনার-আমার মধ্যেও পানি রয়েছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধারের অবস্থান ভূপৃষ্ঠের উপরে কোথাও নয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মাইল অভ্যন্তরে এর অবস্থান।

পৃথিবীকে ভূতাত্ত্বিকভাবে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায় Crust, Mantle ও Core। এগুলোর মধ্যে Mantle স্তরটি খানিকটা জটিল। এর নিজেরই আবার স্বতন্ত্র চারটি স্তর রয়েছে- Lithosphere, Athenosphere, Upper mantle ও Lower mantle। এ স্তরগুলোর মধ্যেও আবার বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়। এগুলোর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। Mantle এর শেষোক্ত দুইটি স্তরের মধ্যবর্তী অংশকে বলা হয় Transition zone। এ অংশেই রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধার।

যে জলাধারের কথা বলছি তা ভূ-পৃষ্ঠের উপরের জলাশয়গুলোর মতো নয় যেখানে আমরা মাছ চলাচল করতে দেখি। পানির যে তিনটি রূপের সাথে আমরা পরিচিত, এটি তার থেকে আলাদা। বলা যেতে পারে পানির চতুর্থ অবস্থা সেটি। ভু-অভ্যন্তরে এত গভীরে অত্যাধিক তাপমাত্রা ও চাপের কারণে পানি বিভাজিত হয়ে হাইড্রক্সিল মুলক (OH¯) আকারে থাকে যা এক ধরনের শিলার মধ্যে আণবিক স্তরে চাপা পড়ে আছে। এ শিলার নাম দেয়া হয়েছে Ringwoodite। শিলাটি অনেকটা পানি দ্বারা সিক্ত স্পঞ্জের ন্যায় আচরণ করে। শিলাটির বিশেষ স্ফটিক গঠন হাইড্রোজেনকে আকর্ষণ করে পানিকে আটকে ফেলতে পারে। Ringwoodite পানির এক সুবিশাল আধার। Transition zone এর এই শিলার যদি এক শতাংশও গঠনগতভাবে তরল পানি হয় তাহলে তার দ্বারা পৃথিবীর সমুদ্রগুলোকে প্রায় তিন বার প্রতিস্থাপিত করা যাবে।

ভূ-অভ্যন্তরে এই সুবিশাল জলাধারের সন্ধান পেয়ে বিজ্ঞানীদের এখন ধারণা, ভূপৃষ্ঠের এ বিশাল সমুদ্রগুলোর পানির উৎস আসলে ভূ-অভ্যন্তরে আটকে থাকা পানিই। যদিও পূর্বে সর্বাধিক স্বীকৃত ধারণা ছিল- প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন বছর আগে বরফতুল্য ধূমকেতু ও গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ থেকেই এ সমুদ্রগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। তবে এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভূতাত্তিক কার্যকলাপ এবং অত্যাধিক চাপের কারণে ভু-অভ্যন্তরের আটকে থাকা পানির অণুগুলো ভূপৃষ্ঠের দিকে উঠে এসে এই সমুদ্রগুলোর জন্ম দিয়েছে। এর থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা পানি চক্র কেবল ভূ-পৃষ্ঠ এবং বায়ুমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভু-অভ্যন্তরের অনেক গভীরে পর্যন্ত প্রসারিত। এছাড়াও ধারণা করা হয় ভু-অভ্যন্তরের এই পানিই বাফার হিসেবে ক্রিয়া করছে যার জন্য কোটি কোটি বছরেও সমুদ্রের উচ্চতার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

আমাদের সৌভাগ্য যে এই সুবিশাল জলরাশি পৃথিবীর অভ্যন্তরেই চাপা পরে আছে। নতুবা যদি তা সম্পূর্ণভাবে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসতো তাহলে আমরা স্থলভাগ বলতে কেবল পর্বতচূড়াগুলোকেই দেখতে পেতাম।

যে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ না থাকলে অস্তিত্বই থাকতো না মানুষের

প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগেকার ঘটনা। পৃথিবী তখন অনেকটাই অন্যরকম ছিল। সেখানে কোনো পাতাবহুল উদ্ভিড, জন্তু-জানোয়ার, পোকামাকড় কিছুই ছিল না। তখন পৃথিবীতে রাজত্ব করতো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। পৃথিবীর সমুদ্রগুলো ছিল তাদের আবাস। তাদের জীবনচক্র ছিল খুবই সরল। ব্যাকটেরিয়াগুলো অক্সিজেন ছাড়াই শ্বসন ও বিপাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করত। তখনকার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কোনো মুক্ত অক্সিজেন ছিল না। অক্সিজেন কেবল পানির অণুতে আর ধাতব যৌগ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারপর শুরু হলো পরিবর্তন। আবির্ভাব ঘটল নতুন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যার নাম সায়ানোব্যাকটেরিয়া। এরা সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম। এরা সূর্যালোককে শক্তিতে পরিণত করতে এবং উপজাত হিসেবে অক্সিজেন উৎপন্ন করতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপন্ন মুক্ত অক্সিজেন সমুদ্রে দ্রবীভূত লোহা দ্বারা শোষিত হতো। যা সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়ে পাললিক শিলা গঠন করতে থাকে। এই সময়ে ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রচুর পরিমাণে জন্মাতে থাকে। খনিজগুলোও সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে আর অক্সিজেন শোষণ সম্ভব হচ্ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়া ছাড়া অন্য যে ব্যাকটেরিয়াগুলো ছিল, সেগুলো ছিল অবাত অর্থাৎ সেগুলোর জন্য মুক্ত অক্সিজেন ছিল বিষাক্ত। ফলে অসংখ্য ব্যাকটে-রিয়ার প্রজাতি ধ্বংস হতে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ঘটনাকে বলা হয় ‘The Great Oxygena-tion Event’।

এর আগ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে সক্রিয় অণুর উপস্থিতি কম ছিল। তবে সেখানে মিথেনের আধিক্য ছিল। মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড এর তুলনায় অধিক কার্যকর গ্রিন হাউজ গ্যাস। এই মিথেনই পৃথিবীকে উষ্ণ রাখছিল। কিন্তু যেহেতু অক্সিজেনের প্রাচুর্য বাড়তে শুরু করলো, এর কিছু অংশ মিথেনের সাথে মিলে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করতে থাকে। মিথেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায়

চিত্রঃ সায়ানোব্যাকটেরিয়া, যারা পৃথিবীতে অক্সিজেন তৈরির জন্য দায়ী।

পৃথিবীর তাপমাত্রাও কমে যেতে থাকে। ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেরাও ছিল বিপদাপন্ন। এদের সংখ্যাও কমে যেতে থাকে। এভাবেই পৃথিবীর বায়ুতে মুক্ত অক্সিজেনের আবির্ভাব ঘটে।

বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের যে অনুপাত জীবের উপযোগী তা গঠিত হয়েছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে, ‘Great Oxygenation Event’ এরও প্রায় ২ বিলিয়ন বছর পর।

প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয় প্রাচীন উদ্ভিদ, যেমন ব্রায়োফাইটা জাতীয় মস। এই উদ্ভিদগুলো সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম ছিল। এজন্য এদের কোষে ক্লোরোপ্লাস্ট নামের অঙ্গাণু ছিল। ক্লোরোপ্লাস্টের বিশেষ কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, এদের মাঝে সমান আকৃতির প্রায় ২০০টি ডিএনএ অণু থাকতে পারে, এদের রাইবোজোম আছে, এরা নিজস্ব প্রতিরূপ তৈরিতে সক্ষম, প্রয়োজনে নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন সংশ্লেষ করতে পারে, বংশানুসারে নিজেদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে ইত্যাদি।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ক্লোরোপ্লাস্ট হলো প্রকৃ্তপক্ষে সায়ানব্যাকটেরিয়া যা বিবর্তনের গতিপথে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সহজীবী (symbiotic)হিসেবে বসবাস করছে। মস উদ্ভিদ থেকে ক্লোরোপ্লাস্ট পর্যবেক্ষণ করে এর সাথে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মিল পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয় ব্যাকটেরিয়াগুলো কোনো এক প্রক্রিয়ায় প্রাচীন উদ্ভিদগুলোতে প্রবেশ করেছিল এবং নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। এগুলো সূর্যালোক থেকে শক্তি তৈরি করতো যা উদ্ভিদগুলো ব্যবহার করতো। এভাবে এরা উদ্ভিদদেহে স্থান পেয়েছিল এবং বিবর্তনের পথে ক্লোরোপ্লাস্টে পরিণত হয়েছে।

প্রাচীন এই উদ্ভিদগুলো পৃথিবীর বুকে সবুজ কার্পেটের মতো ছেয়ে গিয়েছিল। এই উদ্ভিদগুলোর জন্যই অক্সিজেনের মাত্রা বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। উদ্ভিদগুলো বায়ু থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং বায়ুতে মুক্ত অক্সিজেন ত্যাগ করে। উদ্ভিদগুলোর সালোকসংশ্লেষণের পুনরাবৃত্তিই বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে থাকে এবং একটি স্থিতিশীল অক্সিজেন চক্র গঠন করে। প্রাচীন এই উদ্ভিদগুলোই বায়ুমণ্ডলে ৩০% পরিমাণে অক্সিজেনের যোগান দিয়েছিল। উদ্ভিদগুলো আশ্চর্যজনকভাবে উৎপাদনশীল ছিল এবং তারাই ছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের প্রধান যোগানদাতা।

এখনকার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ৭৮% নাইট্রোজেন, ২১% অক্সিজেন, স্বল্প পরিমাণ আর্গন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প ও অন্যান্য গ্যাস রয়েছে। অক্সিজেন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে কেবল শ্বসন উপযোগীই করছে না, সেই সাথে ওজোন স্তর গঠন করে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে জীবদের রক্ষা করছে।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে এই নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদগুলো না থাকলে পৃথিবীতে আজ আজ আমাদের কারোই অস্তিত্ব থাকতো না।

তথ্যসূত্র

১. https://www.newscientist.com/article/2101032-without-oxygen-from-ancient-moss-you-wouldnt-be-alive-today/

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Great_Oxygenation_Event

৩. https://youtu.be/DE4CPmTH3xg

 

নতুন প্রজাতির ভিন্নধর্মী খোঁজে

পৃথিবীতে ১ ট্রিলিয়ন প্রজাতির জীবের অস্তিত্ব আছে বলে ধারণা করা হয়। এদের মাঝে ১ শতাংশের মাত্র এক হাজার ভাগের এক ভাগ বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিছু গবেষণা অনুযায়ী এ পর্যন্ত প্রায় ১.৯ মিলিয়ন প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে কোনো কোনো গবেষকের মতে সংখ্যাটি ১.৫ মিলিয়ন। প্রতি বছরই নতুন নতুন প্রজাতির জীব উত্তরোত্তর আবিষ্কৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বছরে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার পরিমাণ নতুন নতুন প্রজাতি শনাক্ত ও নামকরণ করা হচ্ছে।

এরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি ফর সায়েন্স এক্সপ্লোরেশন কর্তৃক ২০০৮ সালে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র ২০০৬ সালেই ১৬ হাজার ৯৬৯ টি নতুন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী শনাক্ত ও বর্ণিত হয়েছে। তবে সংখ্যাটি আরো বড় হবে, কেননা সেখানে নব-আবিষ্কৃত অণুজীব প্রজাতির সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্রতি বছরে প্রায় ২ হাজার প্রজাতির নতুন উদ্ভিদই আবিষ্কৃত হচ্ছে। এছাড়াও জীবাশ্ম (ফসিল) থেকে আবিষ্কৃত নতুন প্রজাতির সংখ্যাও প্রতি বছরে প্রায় ২ হাজারের মতো। বর্তমানে পৃথিবীর সর্বত্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হলেও বিজ্ঞানীরা যে হারে নতুন নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করে চলেছে তা বিগত ২৫০ বছরের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এমনও হতে পারে যে, যতক্ষণ সময়ে আপনি লেখাটি পড়ে শেষ করবেন ততক্ষণে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও কোনো একটি নতুন প্রজাতি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

নতুন আবিষ্কৃত প্রজাতিগুলোর বেশিরভাগই পোকামাকড় ও অণুজীব। গবেষকরা যতই পৃথিবীর প্রান্তীয় অঞ্চলগুলোতে গবেষণা চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন, ততই নতুন নতুন উদ্ভিদ ও প্রাণীর সন্ধান পাচ্ছেন। আবার এমন অনেক নতুন আবিষ্কৃত প্রজাতি রয়েছে যা ভুলবশত অন্য কোনো গোত্র (Family) বা গণ (Genus)-এর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে মনে করা হতো। গণ ও প্রজাতিগত এমন ভুল হয়েছে কারণ তাদের

মধ্যে পার্থক্য ছিল খুব সূক্ষ্ম। এদের জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে সূক্ষ্ম গবেষণা করার পর তাদের প্রকৃত প্রজাতিগত পরিচয় উদ্ঘাটিত হয়েছে। এধরনের প্রজাতিগুলোকে বলা হয় ‘দুর্বোধ্য প্রজাতি’ বা ক্রিপটিক স্পিসিস। এছাড়া জাদুঘরে সংরক্ষিত নমুনা থেকেও নতুন নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে।

কখনো কখনো গবেষকরা দীর্ঘ অভিযান চালিয়ে অনেক অনুসন্ধানের পর নতুন কোনো প্রজাতির সন্ধান পান। আবার কখনো নতুন কোনো প্রজাতি খুঁজে পাওয়ার ঘটনাটি ঘটে একদমই অলৌকিকভাবে। নতুন প্রজাতি খুঁজে পাওয়ার এমনই কিছু ভিন্নধর্মী ঘটনা নিয়ে আলোচনা থাকছে আজকের লেখায়।

ফেসবুকে নতুন প্রজাতির সন্ধান

কোনো উদ্ভিদবিদই ভিন্ন এই প্রজাতিটির কথা জানতেন না। বিরল ও অপরিচিত এই উদ্ভিদটির একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করার পরই জানতে পারেন উদ্ভিদবিদেরা। রেজিনাল্ড নামের একজন শখের উদ্ভিদবিজ্ঞানী, ২০১৩ সালের কোনো এক সময় দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিলে তার বাড়ির কাছে একটি পাহাড়ে ভ্রমণ করতে যান। সেখানে তিনি বেশ কিছু উদ্ভিদের সাথে এই উদ্ভিদটিরও একটি ছবি তোলেন এবং সেটি ফেসবুকে পোস্ট করেন। এর প্রায় ১ বছর পরে উদ্ভিদ গবেষক পাউলো গনেলা ফেসবুকে ছবিটি লক্ষ্য করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, উদ্ভিদটি তার জানা সকল উদ্ভিদ থেকে আলাদা। পরবর্তীতে পাউলো গনেলা পাহাড়টিতে চলে যান এবং নিশ্চিত হন যে এটি একটি ব্যতিক্রমী প্রজাতি যা উদ্ভিদজগতে নতুন। পরে জার্মানির বোটানিক্যাল স্টেট কালেকশনের অন্যান্য গবেষকদের নিয়ে গবেষণা করার পর তারা উদ্ভিদটির নামকরণ করেন ড্রসেরা ম্যাগনিফিকা (Drosera magnifica)।

উদ্ভিদটির অবয়বের একটি আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এর ঝাড়বাতি সদৃশ পুস্পবিন্যাস। এটি আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম মাংসাশী উদ্ভিদ যা প্রায় ৫ ফুট লম্বা। এটি ফড়িংয়ের মতো বড় বড় পোকাকেও আটকে ফেলতে পারে। কিন্তু IUCN Red List অনুযায়ী উদ্ভিদটি অত্যন্ত বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় আছে।

বাজারে নতুন প্রজাতি

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ লাওস। ধারণা করা হয়, লাওসের অরণ্যে এখনো অনেক প্রজাতি অনাবিষ্কৃত অবস্থায় আছে। এমনই একটি প্রাণী পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ২০ বছর আগে। তবে গহীন অরণ্যে নয়, স্থানীয় এক বাজারে।

চিত্রঃ ড্রসেরা ম্যাগনিফিকার প্রথম ছবি যেটি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছিল।

বাজারের এক দোকানে শাকসবজির পাশেই বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল প্রাণীটিকে। স্থানীয়দের নিকট এটি ‘খাঁইয়’ নামে পরিচিত। প্রাণিবিদ রবার্ট টিমিন্সের-এর চোখে পড়ে এই প্রাণীটি, এবং এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি আবিষ্কার করেন তিনি। গবেষকরা দেখলেন, এটি Rodentia বর্গের অন্তর্ভুক্ত, তবে এই বর্গের অন্যান্য জীবিত প্রাণীদের তুলনায় এটি স্বতন্ত্র। তাই তারা একটি নতুন গোত্রের নাম দেন এবং প্রাণীটিকে সেই গোত্রের একটি প্রজাতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেন। বৈজ্ঞানিক নাম দেয়া হয় Laonastes aenigmamus। তবে পরবর্তীতে ২০০৬ সালে গবেষক মেরি ডাওসন জানান যে, এটি নতুন কোনো গোত্রের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং একটি প্রাচীন গোত্রের সদস্য যার অন্তর্ভুক্ত প্রাণীগুলো ১১ মিলিয়ন বছর পূর্বেই বিলুপ্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হতো। প্রাণীটির বৈশিষ্ট্য এবং জীবাশ্মবিদ্যার বিভিন্ন তথ্যের উপর নির্ভর করে এরূপ শ্রেণিকরণ করা হয়েছে। এ থেকেই প্রাণীটির গুরুত্ব কত বেশি তা উপলব্ধি করা যায়।

ঢাকাইয়া ব্যাঙ

নাম দেখার পরে আর বোঝার বাকি থাকার কথা নয় যে, প্রাণীটির আবিষ্কার দূরের কোনো দেশে নয়, এই দেশেরই প্রাণকেন্দ্র ঢাকাতে হয়েছিল এর আবিষ্কার। ঢাকার মতো একটি শহরে একটি নতুন প্রজাতির উভচর প্রাণীর আবিষ্কার কিছুটা আশ্চর্যজনকই বটে। এ বছরের মার্চে তরুণ প্রাণীবিজ্ঞানী সাজিদ আলী হাওলাদার প্রাণীটিকে শনাক্ত ও নামকরণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমানে University of Helsinki-তে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনে অধ্যয়নরত। তিনি প্রাণীটির নাম দেন Zakerana Dhaka। Zakerana নামটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাকের হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে রাখা হয়েছিল। এভাবে ঢাকার রাস্তার ব্যাঙ বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন পরিচয় পায়।

সংগ্রহের ১৮০ বছর পরে নামকরন

নতুন কোনো প্রজাতি খুঁজে পাওয়া সবসময়ই উত্তেজনাপূর্ণ। আর সেটি যদি চার্লস ডারউইনের সংগ্রহ করা কোনো নমুনা থেকে পাওয়া যায়, তাহলে তা সত্যিই আশ্চর্যজনক। ১৮৩২ সালে এইচএমএস বিগল জাহাজে ভ্রমণের সময় ডারউইন আর্জেন্টিনার একটি উপকূলীয় শহর থেকে কিছু জীবাশ্ম ও পোকার নমুনা

সংগ্রহ করেছিলেন। তার সংগ্রহে একটি গুবরে পোকা ছিল যেটি প্রায় ১৮০ বছরেও বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত ও নামকরণ করা হয়নি। নমুনাটি লন্ডনের Natural History Museumএ অন্তত কয়েক দশক যাবত ভুল লেবেল করে রাখা হয়েছিল।

টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পতঙ্গবিদ ড. স্টাইলিয়ান্স মিউজিয়ামটি থেকে কিছু পতঙ্গের নমুনা ধার করে আনেন। সেখানে তিনি ডারউইনের নাম যুক্ত লেবেল করা একটি নমুনা খুঁজে পান। তিনি আবিষ্কার করলেন যে আসলে এটি বিজ্ঞান জগতে নতুন একটি প্রজাতি যা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নামকরণ করা হয়নি। পরে ২০১৪ সালে ডারউইনের ২০৫ তম জন্মবার্ষিকীতে এ প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয় Darwinilus sedarisi। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো ডারউইন যেখান থেকে নমুনাটি সংগ্রহ করেছিলেন সেখানে এখন অধিকাংশই আবাদি জমি এবং ১৯৩৫ সালের পর এই প্রাণীটি আর দেখাও যায়নি।

সমুদ্রসৈকতে বিশাল জেলিফিশ

চিত্রঃ সমুদ্রসৈকতে পড়ে থাকা নতুন প্রজাতির জেলিফিশ।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জেলিফিশের একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। এধরনের জেলিফিশগুলো Cyanea গণের অন্তর্ভুক্ত। এদেরকে ‘সিংহের কেশর’ ও বলা হয়। এটিকে খুঁজে পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার এক পরিবার, ১২ বছর বয়সী বালক জেভিয়ার লিম প্রথম এ জেলিফিশটি দেখতে পায়। লিমের পরিবার তাসমানিয়ার সমুদ্রতীরে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে শামুকের খোল সংগ্রহের সময় তারা একটি অদ্ভুত জিনিস পড়ে থাকতে দেখে। তাদের কাছে এটি বিরাট আকৃতির শ্লেষ্মা জাতীয় কিছু মনে হয়েছিল। স্থানীয় সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীকে তারা এ সম্পর্কে অবহিত করেন। বিজ্ঞানী ড. লিসা-আন, যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে জেলিফিশ নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি জানান এটি ছিল এক বিস্ময়কর আবিষ্কার, কেননা এটি ছিল আসলেই বিশাল আকৃতির জেলিফিশ যার ব্যাস ছিল প্রায় ৫ ফুট। তার উপর বিজ্ঞান জগতে এটি একদমই নতুন প্রজাতির জেলিফিশ। পরবর্তীতে কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (CSIRO)এর বিজ্ঞানীরা জেলিফিশটি নিয়ে আরো গবেষণা করেন এবং এর নামকরণ করেন।

উৎসব সজ্জায় নতুন প্রজাতির খোঁজ

ব্রমিলিয়াড

মাছের বাজারে বিলুপ্ত প্রজাতি

ব্রমিলিয়াড (Bromeliad) নামে একটি উদ্ভিদ প্রজাতি স্থানীয়দের নিকট বহুদিন ধরে পরিচিত হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে তা সম্প্রতি আবিষ্কৃত। মেক্সিকোতে বড়দিন উদযাপনের সময় গ্রামবাসীরা সমবেত হয়ে যিশু খ্রিষ্টের জন্ম রহস্য ব্যাখ্যা করার সময় এই গাছটি দিয়ে বেদি সাজাতো। তবে সম্প্রতি গবেষকরা উপলব্ধি করলেন যে, এ উদ্ভিদটি বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্তকরণ ও নামকরণ করা হয়নি। পরবর্তীতে প্রক্রিয়া শেষে তারা এর নাম দেন Tillandsia religiosa। কাণ্ডবিহীন, গোলাপি রঙের স্পাইক ও সবুজ পাতাওয়ালা উদ্ভিদটির পুস্পবিন্যাস অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলের পাথুরে এলাকায় এদের আবাস।

১৯০২ সালে প্রকৃতিবিজ্ঞানী উইলহেম হেইন ইয়েমেন ভ্রমণ শেষে বেশ কয়েকটি উদ্ভিদ ও প্রাণীর নমুনা নিয়ে ফেরেন। সেগুলো তিনি ভিয়েনা মিউজিয়ামে দান করে দিয়েছিলেন। নমুনাগুলোর মধ্যে ছিল একটি মসৃণ দাঁতওয়ালা ও কালো অগ্রভাগ বিশিষ্ট হাঙ্গর। এটি প্রায় ৪০ বছর ধরে দৃষ্টির আড়ালে ছিল। ১৯৪৫ সালে এটি প্রথমবারের মতো বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত ও নামকরণ করা হয়, বৈজ্ঞানিক নাম Carcharhinus leiodon। তবে এটিই ছিল একমাত্র নমুনা।

প্রায় শতাব্দীব্যাপী এ প্রজাতির কোনো হাঙ্গরের সন্ধান বিজ্ঞানীরা পাননি। ধারণা করা হয়েছিল এরা হয়তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে শার্ক কনজারভেশন সোসাইটি অভিযান চালিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে কুয়েতের মাছের বাজারে এই প্রজাতির প্রায় ৪৭ টি হাঙ্গরের খোঁজ পেয়ে যায়। অথচ কুয়েত হচ্ছে প্রথম নমুনাটি সংগ্রহের স্থান থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে। এ ঘটনা সম্পর্কে গবেষক মুর জানান “বিশেষত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোতে সর্বদা ক্যামেরা নিয়ে মাছের বাজারে যান, এতে করে নতুন কিছুর সন্ধান পেয়ে যেতে পারেন।”

বিজ্ঞানের নিকট কখনো কখনো নতুন কোনো প্রজাতি আমাদের চোখের স্বাভাবিক গণ্ডিতেই থাকে। তাই আশপাশটা ভাল করে দেখে নিন। অলৌকিকভাবে পেয়ে যেতেও পারেন ভিন্ন কোনো প্রজাতির সন্ধান।

তথ্যসূত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Global_biodiversity
  2. http://www.smithsonianmag.com/smart-news/no-one-knew-plant-existed-until-it-was-posted-facebook-180956084/?no-ist
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Laotian_rock_rat
  4. http://dailyasianage.com/news/12588/new-frog-species-found-in-dhaka
  5. http://www.isciencetimes.com/articles/6813/20140212/new-beetle-species-named-both-charles-darwin.htm
  6. http://www.bbc.com/news/world-asia-26062303
  7. http://www.esf.edu/top10/2015/09.htm
  8. http://www.scientificamerican.com/article/shark-species-thought-to-be-extinct-found-in-fish-market/

 

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাধার

পৃথিবী বসবাসযোগ্য গ্রহ হবার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পানি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণের সব দিককে প্রভাবিত করছে পানি। পানি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী থাকতো না। বর্তমানে যেমন দেখতে তাই তার তুলনায় গ্রহটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ৭১% পানি দ্বারা আচ্ছাদিত, যার প্রায় ৯৬.৫% পানি সমুদ্রগুলো ধারণ করছে। এছাড়া নদীনালা, হ্রদ, বাতাসের জলীয় বাষ্প, হিমবাহ, মাটির আর্দ্রতা এবং আপনার-আমার মধ্যেও পানি রয়েছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধারের অবস্থান ভূপৃষ্ঠের উপরে কোথাও নয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মাইল অভ্যন্তরে এর অবস্থান।

পৃথিবীকে ভূতাত্ত্বিকভাবে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায় Crust, Mantle ও Core। এগুলোর মধ্যে Mantle স্তরটি খানিকটা জটিল। এর নিজেরই আবার স্বতন্ত্র চারটি স্তর রয়েছে- Lithosphere, Athenosphere, Upper mantle ও Lower mantle। এ স্তরগুলোর মধ্যেও আবার বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়। এগুলোর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। Mantle এর শেষোক্ত দুইটি স্তরের মধ্যবর্তী অংশকে বলা হয় Transition zone। এ অংশেই রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধার।

যে জলাধারের কথা বলছি তা ভূ-পৃষ্ঠের উপরের জলাশয়গুলোর মতো নয় যেখানে আমরা মাছ চলাচল করতে দেখি। পানির যে তিনটি রূপের সাথে আমরা পরিচিত, এটি তার থেকে আলাদা। বলা যেতে পারে পানির চতুর্থ অবস্থা সেটি। ভু-অভ্যন্তরে এত গভীরে অত্যাধিক তাপমাত্রা ও চাপের কারণে পানি বিভাজিত হয়ে হাইড্রক্সিল মুলক (OH¯) আকারে থাকে যা এক ধরনের শিলার মধ্যে আণবিক স্তরে চাপা পড়ে আছে। এ শিলার নাম দেয়া হয়েছে Ringwoodite। শিলাটি অনেকটা পানি দ্বারা সিক্ত স্পঞ্জের ন্যায় আচরণ করে। শিলাটির বিশেষ স্ফটিক গঠন হাইড্রোজেনকে আকর্ষণ করে পানিকে আটকে ফেলতে পারে। Ringwoodite পানির এক সুবিশাল আধার। Transition zone এর এই শিলার যদি এক শতাংশও গঠনগতভাবে তরল পানি হয় তাহলে তার দ্বারা পৃথিবীর সমুদ্রগুলোকে প্রায় তিন বার প্রতিস্থাপিত করা যাবে।

ভূ-অভ্যন্তরে এই সুবিশাল জলাধারের সন্ধান পেয়ে বিজ্ঞানীদের এখন ধারণা, ভূপৃষ্ঠের এ বিশাল সমুদ্রগুলোর পানির উৎস আসলে ভূ-অভ্যন্তরে আটকে থাকা পানিই। যদিও পূর্বে সর্বাধিক স্বীকৃত ধারণা ছিল- প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন বছর আগে বরফতুল্য ধূমকেতু ও গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ থেকেই এ সমুদ্রগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। তবে এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভূতাত্তিক কার্যকলাপ এবং অত্যাধিক চাপের কারণে ভু-অভ্যন্তরের আটকে থাকা পানির অণুগুলো ভূপৃষ্ঠের দিকে উঠে এসে এই সমুদ্রগুলোর জন্ম দিয়েছে। এর থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা পানি চক্র কেবল ভূ-পৃষ্ঠ এবং বায়ুমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভু-অভ্যন্তরের অনেক গভীরে পর্যন্ত প্রসারিত। এছাড়াও ধারণা করা হয় ভু-অভ্যন্তরের এই পানিই বাফার হিসেবে ক্রিয়া করছে যার জন্য কোটি কোটি বছরেও সমুদ্রের উচ্চতার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

আমাদের সৌভাগ্য যে এই সুবিশাল জলরাশি পৃথিবীর অভ্যন্তরেই চাপা পরে আছে। নতুবা যদি তা সম্পূর্ণভাবে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসতো তাহলে আমরা স্থলভাগ বলতে কেবল পর্বতচূড়াগুলোকেই দেখতে পেতাম।

যে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ না থাকলে অস্তিত্বই থাকতো না মানুষের

প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগেকার ঘটনা। পৃথিবী তখন অনেকটাই অন্যরকম ছিল। সেখানে কোনো পাতাবহুল উদ্ভিড, জন্তু-জানোয়ার, পোকামাকড় কিছুই ছিল না। তখন পৃথিবীতে রাজত্ব করতো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। পৃথিবীর সমুদ্রগুলো ছিল তাদের আবাস। তাদের জীবনচক্র ছিল খুবই সরল। ব্যাকটেরিয়াগুলো অক্সিজেন ছাড়াই শ্বসন ও বিপাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করত। তখনকার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কোনো মুক্ত অক্সিজেন ছিল না। অক্সিজেন কেবল পানির অণুতে আর ধাতব যৌগ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারপর শুরু হলো পরিবর্তন। আবির্ভাব ঘটল নতুন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যার নাম সায়ানোব্যাকটেরিয়া। এরা সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম। এরা সূর্যালোককে শক্তিতে পরিণত করতে এবং উপজাত হিসেবে অক্সিজেন উৎপন্ন করতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপন্ন মুক্ত অক্সিজেন সমুদ্রে দ্রবীভূত লোহা দ্বারা শোষিত হতো। যা সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়ে পাললিক শিলা গঠন করতে থাকে। এই সময়ে ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রচুর পরিমাণে জন্মাতে থাকে। খনিজগুলোও সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে আর অক্সিজেন শোষণ সম্ভব হচ্ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়া ছাড়া অন্য যে ব্যাকটেরিয়াগুলো ছিল, সেগুলো ছিল অবাত অর্থাৎ সেগুলোর জন্য মুক্ত অক্সিজেন ছিল বিষাক্ত। ফলে অসংখ্য ব্যাকটে-রিয়ার প্রজাতি ধ্বংস হতে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ঘটনাকে বলা হয় ‘The Great Oxygena-tion Event’।

এর আগ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে সক্রিয় অণুর উপস্থিতি কম ছিল। তবে সেখানে মিথেনের আধিক্য ছিল। মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড এর তুলনায় অধিক কার্যকর গ্রিন হাউজ গ্যাস। এই মিথেনই পৃথিবীকে উষ্ণ রাখছিল। কিন্তু যেহেতু অক্সিজেনের প্রাচুর্য বাড়তে শুরু করলো, এর কিছু অংশ মিথেনের সাথে মিলে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করতে থাকে। মিথেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায়

চিত্রঃ সায়ানোব্যাকটেরিয়া, যারা পৃথিবীতে অক্সিজেন তৈরির জন্য দায়ী।

পৃথিবীর তাপমাত্রাও কমে যেতে থাকে। ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেরাও ছিল বিপদাপন্ন। এদের সংখ্যাও কমে যেতে থাকে। এভাবেই পৃথিবীর বায়ুতে মুক্ত অক্সিজেনের আবির্ভাব ঘটে।

বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের যে অনুপাত জীবের উপযোগী তা গঠিত হয়েছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে, ‘Great Oxygenation Event’ এরও প্রায় ২ বিলিয়ন বছর পর।

প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয় প্রাচীন উদ্ভিদ, যেমন ব্রায়োফাইটা জাতীয় মস। এই উদ্ভিদগুলো সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম ছিল। এজন্য এদের কোষে ক্লোরোপ্লাস্ট নামের অঙ্গাণু ছিল। ক্লোরোপ্লাস্টের বিশেষ কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, এদের মাঝে সমান আকৃতির প্রায় ২০০টি ডিএনএ অণু থাকতে পারে, এদের রাইবোজোম আছে, এরা নিজস্ব প্রতিরূপ তৈরিতে সক্ষম, প্রয়োজনে নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন সংশ্লেষ করতে পারে, বংশানুসারে নিজেদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে ইত্যাদি।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ক্লোরোপ্লাস্ট হলো প্রকৃ্তপক্ষে সায়ানব্যাকটেরিয়া যা বিবর্তনের গতিপথে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সহজীবী (symbiotic)হিসেবে বসবাস করছে। মস উদ্ভিদ থেকে ক্লোরোপ্লাস্ট পর্যবেক্ষণ করে এর সাথে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মিল পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয় ব্যাকটেরিয়াগুলো কোনো এক প্রক্রিয়ায় প্রাচীন উদ্ভিদগুলোতে প্রবেশ করেছিল এবং নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। এগুলো সূর্যালোক থেকে শক্তি তৈরি করতো যা উদ্ভিদগুলো ব্যবহার করতো। এভাবে এরা উদ্ভিদদেহে স্থান পেয়েছিল এবং বিবর্তনের পথে ক্লোরোপ্লাস্টে পরিণত হয়েছে।

প্রাচীন এই উদ্ভিদগুলো পৃথিবীর বুকে সবুজ কার্পেটের মতো ছেয়ে গিয়েছিল। এই উদ্ভিদগুলোর জন্যই অক্সিজেনের মাত্রা বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। উদ্ভিদগুলো বায়ু থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং বায়ুতে মুক্ত অক্সিজেন ত্যাগ করে। উদ্ভিদগুলোর সালোকসংশ্লেষণের পুনরাবৃত্তিই বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে থাকে এবং একটি স্থিতিশীল অক্সিজেন চক্র গঠন করে। প্রাচীন এই উদ্ভিদগুলোই বায়ুমণ্ডলে ৩০% পরিমাণে অক্সিজেনের যোগান দিয়েছিল। উদ্ভিদগুলো আশ্চর্যজনকভাবে উৎপাদনশীল ছিল এবং তারাই ছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের প্রধান যোগানদাতা।

এখনকার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ৭৮% নাইট্রোজেন, ২১% অক্সিজেন, স্বল্প পরিমাণ আর্গন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প ও অন্যান্য গ্যাস রয়েছে। অক্সিজেন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে কেবল শ্বসন উপযোগীই করছে না, সেই সাথে ওজোন স্তর গঠন করে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে জীবদের রক্ষা করছে।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে এই নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদগুলো না থাকলে পৃথিবীতে আজ আজ আমাদের কারোই অস্তিত্ব থাকতো না।

তথ্যসূত্র

১. https://www.newscientist.com/article/2101032-without-oxygen-from-ancient-moss-you-wouldnt-be-alive-today/

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Great_Oxygenation_Event

৩. https://youtu.be/DE4CPmTH3xg