টেলিস্কোপের চোখে

বিজ্ঞানের সবগুলো শাখার মাঝে খুব সম্ভবত জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথেই মানুষের সম্পর্ক সবচেয়ে প্রাচীন। আদিযুগের গুহা মানবেরা যখন জীবন বাঁচাতে পশুর সাথে লড়াই করতো বা খাবারের সন্ধানে বন-জঙ্গলে ঘুড়ে বেড়াতো তখনো হয়তো তারা বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত ও মুগ্ধ হতো।

কী আছে আকাশে? এই প্রশ্নটি হাজার হাজার বছর মানুষের ভাবনার জগতকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু আকাশে সত্যিকার অর্থে কী আছে সেটা জানতে মানুষকে সহস্র বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে মানুষের চোখের সামনে তুলে ধরার মতো অসাধ্য সাধন করেছে যে যন্ত্রটি, সেটি হচ্ছে টেলিস্কোপ।

আজকের আলোচনাও সাজানো হয়েছে টেলিস্কোপের ইতিহাস ও টেলিস্কোপ সম্পর্কিত খুটিনাটি জিনিস নিয়ে। টেলিস্কোপ যেহেতু জ্যোতির্বিজ্ঞানের অপরিহার্য একটি যন্ত্র, তাই জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে সামান্য একটু আলোচনা না করলে কি হয়? জ্যোতির্বিজ্ঞান কী?

খুব সহজ ভাষায়, জ্যোতির্বিজ্ঞান হচ্ছে মহাবিশ্বের চলমান জ্যোতিষ্কদের নিয়ে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের যে শাখা মহাবিশ্বের বস্তুগুলোর উৎপত্তি, গঠন, ক্রম পরিবর্তন, দূরত্ব এবং গতি নিয়ে আলোচনা করে, তাই হচ্ছে জ্যোতির্বিজ্ঞান।

তবে এখানে একটা ব্যাপার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান’ আর ‘জ্যোতিষশাস্ত্র’ কিন্তু এক জিনিস না। প্রসঙ্গটা টানলাম এ কারণে যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের নাম শুনলে কিছু মানুষকে নাক কুঁচকাতে দেখা যায়। মূল দোষটা আসলে তাদের না। তারা জ্যোতির্বিজ্ঞান আর জ্যোতিষশাস্ত্রকে একটির সাথে আরেকটি গুলিয়ে ফেলেন।

শুরু থেকে আজ পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান বিশাল একটা পথ পাড়ি দিয়েছে। এর ভেতরে ছিল নানা উথান-পতনের গল্প, আরো ছিল অজানাকে জানার মতো তীব্র দুঃসাহস। এসবের পরেই জ্যোতির্বিজ্ঞান আজকের এই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞান আর অন্যটি পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞান।

পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল কাজ হচ্ছে আকাশ পর্যবেক্ষণ করা, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংরহ করা, পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করা এবং এদের রক্ষণাবেক্ষণ করা।

আর তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণের সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় মডেল তৈরি করা। তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণের সাহায্যে সংগৃহীত তথ্যগুলোকে ব্যাখ্যা করা। এক কথায় তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে, পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তগুলো ব্যাখ্যা করা।

শুরুর দিকে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা মূলত আকাশ পর্যবেক্ষণের মধ্যেই স্বীমাবদ্ধ ছিল। মহাজাগতিক বস্তুগুলো পৃথিবী থেকে কোটি কোটি মেইল দূরে অবস্থান করে। এত দূরের বস্তু সেখানে গিয়ে দেখা সম্ভব নয়, তাই দূরের বস্তুগুলোকে যদি চোখের সামনে নিয়ে আসা যায়, তাহলে কেমন হয়? টেলিস্কোপ মূলত এই কাজটাই করে। দূরের মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে কাছে নিয়ে আসে। টেলিস্কোপ ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞান কোনোভাবেই আজকের এই অবস্থানে আসতে পারতো না।

টেলিস্কোপ হচ্ছে এক ধরনের আলোকীয় যন্ত্র, যা দূরের বস্তুর একটি প্রতিবিম্ব চোখের সামনে তুলে ধরে, ফলে দূরের বস্তুটিকে খুব সহজেই দেখতে পাওয়া যায়। সাধারণ আলোকীয় টেলিস্কোপগুলোতে মূলত একটি লম্বা ফাঁপা নলের দুই মুখে দুটি লেন্স বসিয়ে এ কাজটি করা হয়। কিছু টেলিস্কোপে আবার লেন্সের পরিবর্তে আয়না বসানো থাকে।

দূরের বস্তুটিকে দেখার সময় টেলিস্কোপের এক প্রান্ত সেই লক্ষবস্তুটির দিকে স্থির করতে হয়। টেলিস্কোপের এ প্রান্তটিকে বলা হয় অভিলক্ষ (Objective lens)। অপর প্রান্তটি চোখের সামনে ধরতে হয়। এ প্রান্তের নাম অভিনেত্র (Eyepiece)। টেলিস্কোপের অভিনেত্রের তুলনায় অভিলক্ষটি অনেক বড় হয়। ফলে টেলিস্কোপে অভিলক্ষটি দূরের মহাজাগতিক বস্তু হতে আসা আলো বেশি পরিমাণ সংগ্রহ করতে পারে। এতে করে বস্তুটিও বেশ স্পষ্ট দেখা যায়।

চিত্রঃ একটি প্রতিসরক টেলিস্কোপ।

টেলিস্কোপ আবিষ্কারের ইতিহাসের কথা বলতে গেলে যার নামটি না নিলে না হয় তিনি হচ্ছেন বিজ্ঞানী হাসান ইবনে আল হাইথাম। তাকে আধুনিক আলোকবিদ্যার জনক বলা হয়।

চিত্রঃ হাসান ইবনে আল হাইথাম, আধুনিক আলোকবিদ্যার জনক।

আল-হাইথাম আলোকবিদ্যা নিয়ে বেশ কিছু যুগান্তকারী কাজ করেন। তিনি একটি বই লিখেন, নাম ‘কিতাব আল মানাযির’ যা পরবর্তীতে ইংরেজী ভাষায় ‘The Book of Optics’ নামে অনূদিত হয়। এ বইয়ে তিনি সর্প্রথম প্রাচীন গ্রীক ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেন। ধারণাটি ছিল এমন- আলো চোখের মধ্যে থেকে আসে এবং বস্তুতে প্রতিফলিত হয়ে আবার চোখে ফিরে আসে।

এই বইয়ে চোখ কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে আরো ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করেন। চোখের ব্যবচ্ছেদের ব্যবহার করে এবং পূর্ববর্তী জ্ঞানীদের রেখে যাওয়া কাজের সহায়তায় নিয়ে, আলো কীভাবে চোখে প্রবেশ করে, ফোকাস হয়, এবং আবার চোখের পেছন দিকে অভিক্ষিপ্ত হয় সে ব্যাপারে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করেন।

পরবর্তীতে আল হাইথামের এ বইটি দ্বারা ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা প্রভাবিত হন এবং তার কাজের গুরুত্ব বুঝতে পারেন। যার ফলে, বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে চশমা, ক্যামেরা, দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপের প্রতি আগ্রহী হন এবং এদের নিয়ে কাজ করে উন্নতি সাধন করেন।

আল হাইথামের পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত টেলিস্কোপ নিয়ে কাজের তেমন কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে টেলিস্কোপের ইতিহাসে এরপরে দৃশ্যপটে একই সাথে হাজির হন তিনজন ব্যক্তি। তারা হলেন নেদারল্যান্ডের চশমা প্রস্তুতকারক হ্যান্স লিপার্সি, জাকারিয়াস জেনসন এবং জ্যাকব মিটাস।

হ্যান্স লিপার্সির টেলিস্কোপ আবিষ্কার নিয়ে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। তিনি একদিন দেখলেন তার দোকানের সামনে দুইটি শিশু কাঁচের লেন্স দিয়ে খেলা করছে। তারা দুইটি লেন্সের মধ্য দিয়ে দূরের জিনিস দেখছে এবং তাদের লেন্সটিকে সামনে পেছনে করছে। লেন্সের এই সামনে পেছনে করার ফলে চোখ থেকে দূরের বস্তুর দূরত্বের পরিবর্তন হচ্ছে। এই ঘটনা থেকেই তিনি টেলিস্কোপ তৈরির ধারণা পান।

আরেকটি ঘটনাও প্রচলিত। তিনি একদিন তার দোকানে বসানো একটি স্থির লেন্সের মধ্য দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন দূরের বস্তুগুলো কিছুটা কাছে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এখান থেকেই হঠাৎ করে তিনি টেলিস্কোপের আইডিয়া পেয়ে যান। তবে এসব ঘটনার সত্যাসত্য নিয়ে মতভেদ আছে। তবে যেখান থেকেই আইডিয়া পান না কেন, তিনি ১৬০৮ সালে একটি অল্প ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপ তৈরি করতে সক্ষম হন। তার এ টেলিস্কোপটি দিয়ে দূরের বস্তুকে তিন গুণ বিবর্ধিত করে দেখা যেতো।

চিত্রঃ হেন্স লিপার্সি ও তার তৈরি টেলিস্কোপ।

তখনকার সময়ের মানুষ এ ধরনের প্রযুক্তির সাথে অপরিচিত ছিল বলে এটা সহজেই জনসাধারণের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হলো এবং ধীরে ধীরে লোকমুখে হ্যান্স লিপার্সির  আবিষ্কারের কথা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল। এদিকে ইতালীর বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও পদার্থবিদ গ্যালিলিও গ্যালিলির কানে এই খবর যায়। হ্যান্স লিপার্সির টেলিস্কোপ আবিষ্কারের এক বছর পর ১৬০৯ সালে হ্যান্স লিপার্সির টেলিস্কোপের উপর ভিত্তি করে আরো উন্নত একটি টেলিস্কোপ নির্মাণ করেন।

এই টেলিস্কোপটি দিয়ে দূরের বস্তুকে ৩০ গুণ বিবর্ধিত করে দেখা যেত। এ ব্যাপারে তিনি তার এক প্রবন্ধে লিখেন “আজ থেকে প্রায় ১০ মাস পূর্বে আমার কাছে একটি সংবাদ এসে পৌছায়। সংবাদটি ছিল এক ওলন্দাজ চশমা নির্মাতা সম্পর্কে। এই চশমা নির্মাতা নাকি এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার করেছে যা দিয়ে দূরের বস্তুদের কাছের বস্তুর মতোই স্পষ্ট দেখা যায়। এ খবর পাওয়া মাত্রই কীভাবে এমন একটি যন্ত্র নির্মাণ করতে পারি সে ব্যাপারে ভাবতে লাগলাম।”

চিত্রঃ গ্যালিলিও গ্যালিলাই।

টেলিস্কোপের উন্নতি সাধনের পর গ্যালিলিও বিশ্ববাসীর সামনে তা তুলে ধরলেন। এটি দিয়ে তিনি আকাশ পর্যবেক্ষণ করা শুরু করেন। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে গ্যালিলিওই প্রথম ব্যক্তি যিনি দূরের গ্রহ-নক্ষত্রদের আলোক বিন্দু হিসেবে নয়, বরং তাদের প্রকৃত রূপ দেখতে পেরেছিলেন। গ্যালিলিও তাঁর নিজের টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণে মেতে রইলেন।

১৩ মার্চ, ১৬১০ সালে গ্যালিলিও টেলিস্কোপ দিয়ে দূরের জ্যোতিষ্কদের পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে একটি বই প্রকাশ করেন। নাম Sidereus Nuncius, যার বাংলা করলে দাড়ায় “নক্ষত্র থেকে সংবাদবাহক”। এ বইয়ে তিনি তাঁর চন্দ্র বিষয়ক বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করেন।

পর্যবেক্ষণের সময় তিনি চাঁদের পৃষ্ঠে অনেক খাদ লক্ষ্য করেন। পৃথিবী পৃষ্ঠের মতো চাঁদের পৃষ্ঠেও পাহাড়-পর্বত, উপত্যকা, নদী, জলাশয় প্রভৃতি আছে বলে তিনি অভিমত ব্যাক্ত করেন। চাঁদের পৃষ্ঠে তিনি কতগুলো ছোট-বড় দাগ দেখেছিলেন। তবে তিনি এগুলোকে চাঁদের সমুদ্র ভেবে ভুল করেছিলেন।

চিত্রঃ চন্দ্রপৃষ্ঠের দাগ।

গ্যালিলিওর জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ব্যাপারটি হলো, তিনি তাঁর টেলিস্কোপ দিয়ে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে একসময় সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণের জন্য পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান। সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি সম্পর্কে তখন জানা ছিল না।১৬১০ সালের শেষের দিকে পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়। এ সময় গ্যালিলিও সর্বপ্রথম সূর্যের পৃষ্ঠে কতগুলো কালো দাগ দেখতে পান। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুৎ কারণে ১৬১২ সালের মে মাসের আগে তিনি কথা প্রচার করেননি। কিন্তু গ্যালিলিওর দূর্ভাগ্য, ততদিনে জার্মানীর শাইনার, ইংল্যন্ডের টমাস হ্যারিয়ট আর নেদারল্যান্ডের জন ফ্যাব্রিসিয়াস প্রত্যেকেই আলাদাভাবে সূর্যপৃষ্ঠের কালো দাগগুলো আবিষ্কার করে ফেলেন। এগুলোকে আমরা সৌরকলঙ্ক নামে চিনি।

চিত্রঃ শিল্পীর তুলিতে, গ্যালিলিও দেখাচ্ছেন কীভাবে টেলিস্কোপ ব্যবহার করতে হয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে গ্যালিলিওর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বৃহস্পতির উপগ্রহ আবিষ্কার করা। তিনি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গ্রহরাজ বৃহষ্পতির মোট চারটি উপগ্রহ খুঁজে পান। এর মাধ্যমেই তখনকার সময়ে প্রচলিত ধারণা ‘গ্রহ-নক্ষত্র প্রভৃতি কেবল পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে’র সমাপ্তি ঘটে।

খালি চোখে দেখা যায় না এমন অনেক নক্ষত্র গ্যালিলিও তার সদ্য আবিষ্কৃত টেলিস্কোপ দিয়ে দেখতে লাগলেন। সে সময় কৃত্তিকা মণ্ডলের মাত্র ৬ টি নক্ষত্র দেখা যেত। কিন্তু গ্যালিলিও তাঁর জীবদ্দশাতে এই নক্ষত্রমণ্ডলে ৩৬ টি নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেন।

পর্যবেক্ষণ দ্বারা তিনি দেখান যে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি আসলে আগণিত নক্ষত্রের সমষ্টি। বেশ কিছু বিষমতারা, নক্ষত্রমণ্ডল এবং নীহারিকা আবিষ্কার করেন। পৃথিবী থেকে যে সকল নক্ষত্রের আপাত উজ্জ্বলতার মান পরিবর্তন হয় তাদের ভেরিয়েবল স্টার বা বিষম তারা বলে। হাইড্রোজেন গ্যাস, প্লাজমা ও ধূলিকণার সমন্বয়ে তৈরি এক ধরনের আন্তনাক্ষত্রিক মেঘকে নীহারিকা বলে।এই পর্বে আমাদের আলোচনা এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী পর্বগুলোতে আমরা গ্যালিলিওর তৈরি করা টেলিস্কোপটির গঠন, কার্যপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব।

featured image: shutterstock.com

উড়োজাহাজ যেভাবে ওড়ে

মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল আকাশে ওড়ার। একদিন আকাশে উড়তে শিখলো। তবে পাখির মতো নয়, এজন্য মানুষকে সাহায্য নিতে হয়েছে যন্ত্রের, যাদেরকে বলি আকাশযান। উড়োজাহাজের আবিষ্কার ছিল মানুষের জন্য যুগান্তকারী এক ঘটনা।

আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষ বিভিন্ন রকমের আকাশযান তৈরি করেছে। এ আকাশযানগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। বায়ু অপেক্ষা ভারী এবং বায়ু অপেক্ষা হালকা। ঘুড়ি, বেলুন, এয়ারশিপ ইত্যাদি হচ্ছে হালকা আকাশযানের উদাহরণ। উড়োজাহাজ, রকেট, গ্লাইডার, ড্রোন ইত্যাদি হচ্ছে ভারী আকাশযানের উদাহরণ। বায়ু অপেক্ষা ভারী এমন আরেকটি আকাশযান হচ্ছে হেলিকপ্টার,যাকে আদর করে ডাকা হয় উড়ন্ত ফড়িং নামে। উড়ন্ত ফড়িং কীভাবে উড়ে তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

সামরিক বা বেসামরিক প্রয়োজনে এমন একটি আকাশযানের প্রয়োজন হয় যা সরাসরি আকাশে উড়তে পারবে এবং প্রয়োজনে আকাশে স্থির অবস্থায় ভাসতে পারবে,যা সাধারণ বিমানগুলো পারে না। এ চাহিদা থেকেই তৈরি করা হয় হেলিকপ্টার।

আজকাল বিভিন্ন সামরিক প্রয়োজনে, যেমন সেনা বা গোলাবারুদ পরিবহন,আকাশ থেকে নজরদারী, নিরাপত্তা বিধানের কাজে কিংবা বিশেষ সেনা অপারেশনে হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার শান্তিকালীন অবস্থায় মালামাল পরিবহন থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ সরবরাহ কাজেও হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হচ্ছে।

চিত্রঃ যুদ্ধে ব্যবহৃত হেলিকপ্টার

উড্ডয়ন কৌশল

এয়ারক্রাফটের মতোই হেলিকপ্টারও চার ধরনের বলের উপর ভিত্তি করে আকাশে ওড়ে। বল চারটি হচ্ছেঃ ১. লিফট, যা হেলিকপ্টারের উপর ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি করে; ২. থ্রাস্ট, যা হেলিকপ্টারের ওপর সম্মুখী বল তৈরি করে; ৩. ওজন, যা সরাসরি নিচের দিকে ক্রিয়া করে; ও ৪. ড্র্যাগ, যা হেলিকপ্টারের সামনের দিক থেকে পেছনের দিকে থ্রাস্টের বিপরীতে ক্রিয়া করে।

চিত্রঃ হেলিকপ্টারের ওপর ক্রিয়ারত চারটি বল

ওপরের দিকে একটি বিরাট আকৃতির পাখা থাকে, একে প্রপেলার বলা হয়। এতে ২ থেকে ৫ টি ব্লেড থাকে। ব্লেডগুলো বিশেষভাবে বাঁকানো থাকে। একটি শক্তিশালী ইঞ্জিনের সাহায্যে প্রপেলার ঘোরানো হয়। যখন ঘুরতে শুরু করে, তখন ব্লেডগুলো কৌণিকভাবে সমান্তরাল অবস্থায় ঘুরতে থাকে। ঘূর্ণনের ফলে আশেপাশের বাতাস সজোরে ব্লেডের মধ্য দিয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এর পরবর্তী অবস্থা ব্যাখ্যা করে হয় নিউটনের বিখ্যাত তৃতীয় সূত্র। “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।”

বাতাস যখন সজোরে প্রপেলারের মধ্য দিয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়, তখন নিউটনের তৃতীয় সূত্রানুসারে প্রপেলারের উপর উর্ধ্বমুখী সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ করে। ফলে প্রপেলারের সাথে সংযুক্ত হেলিকপ্টারটি উড়তে শুরু করে। তবে প্রপেলারের ব্লেডের বিশেষ আকারের জন্য এখানে বার্নলীর সূত্রও কাজ করে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ যে বৈশিষ্ট্যটি হেলিকপ্টারকে অন্য সব আকাশযান থেকে আলাদা করে রেখেছে তা হলো এর হোভারিং ক্ষমতা। হোভারিং বলতে হেলিকপ্টারের স্থির অবস্থায় আকাশে উড্ডয়ন করার ক্ষমতাকে বোঝায়। হেলিকপ্টার আকাশে যে কোনো উচ্চতায় স্থিরভাবে অবস্থান করতে পারে এবং ঐ উচ্চতা থেকেই সরাসরি ডানে-বামে ও সামনে-পেছনে যেতে পারে। হোভারিং করার সময় হেলিকপ্টারের ওপর প্রযুক্ত ওপরের দিকের লিফট, এর নিচের দিকে ক্রিয়ারত ওজনের সমান থাকে এবং সম্মুখমুখী থ্রাস্ট, পশ্চাৎমুখী ড্রাগের সমান থাকে।

এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো হেলিকপ্টার কীভাবে সামনে-পেছনে, ডানে-বামে কিংবা উপরে-নিচে যায়। হোভারিং করা অবস্থায় যদি লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধি বল ও ওজন, ড্র্যাগের লব্ধি বলের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে হেলিকপ্টারটি উপরের দিকে উঠে যাবে। আর যদি ওজন ও ড্রাগের লব্ধি বল, লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধি বলের তুলনায় বেশি হয় তাহলে হেলিকপ্টারটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে থাকবে।

আকাশে স্থির অবস্থায় যদি হেলিকপ্টারটি ডান দিকে যেতে চায়, তাহলে হেলিকপ্টারের মেইন রোটর বা উপরের প্রপেলারটিকে সমান্তরাল অবস্থা থেকে ডানদিকে সামান্য বাঁকিয়ে দিতে হবে। এর ফলে লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধি বলের দিক পরিবর্তন হবে এবং হেলিকপ্টারটি ডান দিকে যেতে থাকবে। একইভাবে প্রপেলারটিকে সামান্য বাম দিকে বাঁকিয়ে দিলেই হেলিকপ্টারটি বাম দিকে যেতে থাকবে।

হোভারিং করা অবস্থায় সামনের দিকে যেতে হলে হেলিকপ্টারের উপরের প্রপেলারকে সামান্য সামনের দিকে বাঁকিয়ে দিলেই হবে। এতে লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধির দিক পরিবর্তিত হবে এবং হেলিকপ্টারটি সামনের দিকে ছুটতে থাকবে। একইভাবে পেছনের দিকে যেতে চাইলে উপরের প্রপেলারটিকে সমান্তরাল অবস্থা থেকে সামান্য পেছনের দিকে বাঁকিয়ে দিতে হবে। এতে থ্রাস্ট দিক পরিবর্তন করে হেলিকপ্টারের সামনের দিক থেকে পেছনের দিকে ক্রিয়া করে এবং থ্রাস্ট ও লিফটের লব্ধির দিক পরিবর্তনের ফলে হেলিকপ্টারটি পেছনের দিকে যেতে থাকে।

প্রপেলারকে বাঁকানোর কাজটি করা হয় কন্ট্রোল প্যানেলের একটি কন্ট্রোল স্টিকের সাহায্যে। কন্ট্রোল স্টিকটিকে ডানে নিলে প্রপেলার ডানে দিকে বেঁকে যায়, বামে নিলে বামদিকে বেঁকে যায়।

এয়ারক্রাফটের মতো হেলিকপ্টারে কোনো রাডার নেই। তাহলে হেলিকপ্টার দিক পরিবর্তন করে কীভাবে? এ কাজটি করা হয় এর পেছনের ‘টেইল’ এর সাথে সংযুক্ত আরেকটি ছোট প্রপেলারের সাহায্যে। এটি ‘এন্টি টর্ক প্রপেলার’ নামে পরিচিত।

হেলিকপ্টারের মূল প্রপেলার যখন ঘুরতে থাকে, তখন প্রপেলারের ঘূর্ণনের ফলে হেলিকপ্টারের মূল বডিতেও একটি ঘূর্ণন বল তৈরি হয়। প্রপেলার যেদিকে ঘোরে, হেলিকপ্টারের মূল বডি সেদিকে ঘুরতে চায়। এ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে এন্টি টর্ক প্রপেলারটি দিয়ে। হেলিকপ্টারের লেজের শেষের দিকে অবস্থান করে এই প্রপেলারটি।

মূল প্রপেলারের ঘূর্ণন বেগের সাথে একটি নির্দিষ্ট অনুপাত বজায় রেখে এন্টি টর্ক প্রপেলারটিকেও ঘোরানো হয়। এতে হেলিকপ্টারের মূল দেহের ঘূর্ণন প্রবণতা দূর হয়। মূলত এন্টি টর্ক প্রপেলারের ঘূর্ণন বেগ নিয়ন্ত্রণ করে এ কাজটি করা হয়। হেলিকপ্টারটি যখন একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা বজায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যায় তখন মূল প্রপেলারের ঘূর্ণনের ফলে হেলিকপ্টারের মূল বডির ঘূর্ণন প্রবণতা রোধ করে এন্টি টর্ক প্রপেলারটি।

পাইলটের যদি ডান দিকে যাওয়ার ইচ্ছা হয়, তাহলে পাইলট এন্টি টর্ক প্রপেলারের গতি মূল প্রপেলারের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা গতি থেকে কিছুটা কমিয়ে দেবেন, এর ফলে এন্টি টর্ক প্রপেলারটি হেলিকপ্টারের বডির ঘূর্ণন প্রবণতা আর সম্পূর্ণ রোধ করতে পারবে না। ফলে হেলিকপ্টারটি ডান দিকে ঘুরে যাবে। আবার বামদিকে যাওয়ার প্রয়োজন হলে পাইলট এন্টি টর্ক প্রপেলারের ঘূর্ণন বেগ মূল প্রপেলারের সাথে নির্দিষ্ট অনুপাত বজায় রাখা বেগের থেকে একটু বাড়িয়ে দিবেন। এর ফলে হেলিকপ্টারটি বাম দিকে ঘুরে যাবে।

চিত্রঃ এন্টি টর্ক প্রপেলার

হেলিকপ্টারের উচ্চতা বাড়ানো কমানো নিয়ন্ত্রণ করা হয় এর মূল প্রপেলারের ব্লেডগুলোর কৌণিক অবস্থান বাড়িয়ে কমিয়ে। প্রপেলার ব্লেডের কৌণিক অবস্থান বাড়ালে একই পরিমাণ ঘূর্ণনে প্রপেলার বেশি পরিমাণে লিফট তৈরি করে। তাই উচ্চতা বাড়ানোর প্রয়োজন হলে প্রপেলার ব্লেডের কৌণিক অবস্থান বাড়ানো হয়। পাশাপাশি মূল ইঞ্জিনের গতিও বাড়ানো হয়। ফলে বেশি পরিমাণ লিফট অর্থাৎ ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি হয় এবং হেলিকপ্টারের উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একইভাবে উচ্চতা কমানোর প্রয়োজন হলে ব্লেডের কৌণিক অবস্থান কমানোর পাশাপাশি ইঞ্জিনের পাওয়ার কমিয়ে দেয়া হয়। ফলে লিফটের পরিমাণ হ্রাস পায় এবং হেলিকপ্টার ক্রমেই উচ্চতা হারায়।

তথ্যসূত্রঃ

১. উড়োজাহাজ কেমন করে উড়ে- এ কে এম আতাউল হক

২. Theory of Flight

৩. www.helis.com

featured image: sandiegouniontribune.com

জেট ইঞ্জিনের গল্প

চাকার আবিষ্কার মানব সভ্যতার জন্য ছিল বিরাট এক বিপ্লব। এর উদ্ভাবন যোগাযোগকে করেছিল আরো সহজ, আরো গতিময়। চাকা আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষ যোগাযোগকে আরো গতিশীল করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো। প্রথম প্রথম বিভিন্ন প্রাণীর পেশি শক্তি ব্যবহার করে যানবাহনগুলো চলাচল করতো। এরপর আসে ইঞ্জিনের ধারণা। যানবাহনে ইঞ্জিনে ব্যবহার মানব সভ্যতার গতিকেই পাল্টে দেয়।

আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির অন্যতম এক বিস্ময় হলো উড়োজাহাজ। যেখানে যেতে মাসের পর মাস সময় লেগে যেতো, উড়োজাহাজের কল্যানে তা আজ এক দিনেরও কম সময়ে যাওয়া সম্ভব। আর উড়োজাহাজের এই প্রচণ্ড গতির পেছনের কারণ এর ইঞ্জিন। শুরুর দিকে উড়োজাহাজে পিস্টন ইঞ্জিন ব্যবহৃত হলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে পিস্টন ইঞ্জিনের পরিবর্তে উন্নতমানের ইঞ্জিনের দরকার হয়ে পড়ে। জেট ইঞ্জিনের আবিষ্কার মানুষের এ নতুন চাহিদাটি মেটালো। আজ আমরা এই জেট ইঞ্জিন নিয়েই আলোচনা করবো।

খুব সহজ ভাষায়, জেট ইঞ্জিন হলো এমন এক প্রকার ইঞ্জিন যা বায়ুমন্ডলের বাতাসকে এর ভেতরে টেনে নিয়ে প্রথমে ঘনীভূত করে এবং পরে জ্বালানী মিশ্রিত করে বিষ্ফোরণের মাধ্যমে প্রসারিত করে এর পেছন দিক দিয়ে নির্গত করে দেয়। জেট ইঞ্জিন বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। তবে প্রকারভেদ যেমনই হোক, সব জেট ইঞ্জিনই কাজ করে নিউটনের ৩য় সূত্রানুসারে। প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। এটিই হচ্ছে জেট ইঞ্জিনের মূলনীতি।

জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি

ইঞ্জিনের মূল কার্যপদ্ধতিতে যাওয়ার আগে নিউটনের ৩য় সূত্রটি আরো ভালো করে বোঝা প্রয়োজন। একটি বেলুনকে বাতাস দিয়ে ভর্তি করে এর মুখ বন্ধ করে রেখে দিলে বেলুনটি স্থির অবস্থাতেই থাকবে। কারণ ভেতরের বাতাসের চাপ বেলুনটির গায়ে সমানভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা যদি বেলুনটিকে মুখ খোলা অবস্থায় রেখে দেই, তাহলে দেখবো বেলুনটি কিছু বেগ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে বেলুনের খোলা মুখটি দিয়ে প্রচন্ড বেগে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটি নিউটনের সূত্রের সেই ক্রিয়া। এর ফলে বেলুনটি সামনের দিকে সম-পরিমাণ বল অনুভব করে এবং এগিয়ে যায়। অবাক লাগে, অত্যাধিক জটিল যান্ত্রিক কৌশলের সমন্বয়ে তৈরি একটি জেট ইঞ্জিন এ সহজ নিয়মটি ব্যবহার করেই কাজ করে থাকে।

যাহোক, এবার জেট ইঞ্জিনের মূল কার্যপদ্ধতিতে যাওয়ার আগে এর প্রধান অংশগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে নেয়া যাক। একটি জেট ইঞ্জিনের মূল অংশগুলো হচ্ছে- ১. ফ্যান ২. কম্প্রেশর ৩. কমবাস্টশন চেম্বার ৪. টারবাইন। তবে ইঞ্জিনের ধরন অনুযায়ী আরো বিভিন্ন অংশ যোগ করা হতে পারে।

মূল ইঞ্জিনের সামনের অংশে থাকে একটি ফ্যান। ফ্যানটির কাজ বাইরে থেকে বাতাস টেনে ইঞ্জিনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া। বিশেষ ডিজাইন সম্পন্ন ফ্যানের সাহায্যে এ কাজটি করা হয়। ফ্যানের ঠিক পেছনেই থাকে কম্প্রেশর। এর কাজ বাইরে থেকে টেনে আনা বাতাসকে চাপ দিয়ে সংকুচিত করা। এ ধাপে বাইরে থেকে টেনে আনা বাতাসের চাপ প্রায় ৮ গুণ বাড়ানো হয় এবং বাতাসের গতি ৬০ ভাগ কমিয়ে ঘন্টায় ৪০০ কিলোমিটার করা হয়।

ইঞ্জিনের ওপরে এয়ারক্রাফটের ডানার নিচে জ্বালানী ট্যাংক থাকে। বাতাসের সংকুচিত অবস্থায়, ট্যাংক থেকে জ্বালানী এনে বাতাসের সাথে মেশানো হয়। এরপর একটি নিয়ন্ত্রিত বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। এর ফলে প্রচন্ড উত্তপ্ত এগজস্ট গ্যাস (Exhaust Gas) উৎপন্ন হয়। এ সময় এগজস্ট গ্যাসের তাপমাত্রা প্রায় ৯০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড হয়।

প্রচন্ড উত্তাপের ফলে সংকুচিত গ্যাস হঠাৎ প্রসারিত হয়ে যায় এবং ইঞ্জিনের পেছন দিয়ে প্রচন্ড বেগে বাইরে নির্গত হয়। ইঞ্জিনের পেছনে রাখা থাকে বিশেষভাবে বাঁকানো একটি টার্বাইন। হঠাৎ প্রসারিত এগজস্ট গ্যাস এই টার্বাইনের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাইরে নির্গত হয় এবং বায়ু প্রবাহের ফলে টার্বাইনটি ঘুরতে থাকে, অনেকটা উইন্ডমিলের মতো।

ইঞ্জিনের পেছনের এ টার্বাইনটি আবার একটি শ্যাফটের মাধ্যমে কম্প্রেশর ও সামনের ফ্যানের সাথে যুক্ত থাকে। ফলে এগজস্ট গ্যাসের প্রভাবে যখন টার্বাইনটি ঘুরতে শুরু করে, তখন টার্বাইনের সাথে সাথে এর সাথে যুক্ত কম্প্রেশর এবং ফ্যানটিও ঘুরতে থাকে। অর্থাৎ প্রাথমিক অবস্থায় ইঞ্জিনটিকে একবার চালু করে দিলে জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ না করা পর্যন্ত ইঞ্জিনটি নিজে নিজেই চলতে থাকবে। সংক্ষেপে এবং খুব সহজে, এভাবেই একটি জেট ইঞ্জিন কাজ করে!

চিত্রঃ জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি।

এবার আসি জেট ইঞ্জিনের প্রকারভেদে। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রকারের জেট ইঞ্জিন তৈরি করা হয়েছে। তবে সব জেট ইঞ্জিনই উপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে কাজ করে থাকে। বিভিন্ন প্রকারের জেট ইঞ্জিনের নাম দেয়া হলো- ১. রেম জেট ২. পালস জেট ৩. রকেট জেট ৪. গ্যাস টারবাইন ইত্যাদি।

রেম জেটঃ রেম জেট একেবারেই প্রাথমিক স্তরের জেট ইঞ্জিনের ধারণা মাত্র। বাস্তব ক্ষেত্রে এর কোনো প্রয়োগ এখন আর নেই। শুধুমাত্র জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি সহজভাবে বোঝাতে রেম জেট ব্যবহৃত হয়। রেম জেট ইঞ্জিনকে প্রাথমিকভাবে সামনের দিকে গতিশীল করে এর ভেতরে বাতাস প্রবেশ করানো হয়। এরপর জ্বালানী মিশ্রিত করে নিয়ন্ত্রিত বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। বিষ্ফোরণের ফলে উৎপন্ন এগজস্ট গ্যাস ইঞ্জিনের পেছনের নজল দিয়ে বের হয়ে আসে এবং নিউটনের ৩য় সূত্রের নিয়মে ইঞ্জিনটিকে সামনের দিকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে দেয়।

পালস জেটঃ পালস জেট অনেকটা রেম জেটের মতোই। তবে এ ইঞ্জিনকে প্রাথমিকভাবে সামনের দিকে গতিশীল করার দরকার হয় না। এর পরিবর্তে ইঞ্জিনটি এর কম্প্রেশর দ্বারা বায়ুমন্ডল থেকে বাতাস টেনে এর ভেতরে নিয়ে যায়। এ ধরনের ইঞ্জিন অনেক টেকসই। তবে পালস-জেট ইঞ্জিনের জ্বালানী খরচ খুব বেশি। মূলত ফাইটার এয়ারক্রাফটে এ ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়।

চিত্রঃ পালস জেট ইঞ্জিন।

রকেট জেটঃ সাধারণ জেট ইঞ্জিনগুলো বায়ুমন্ডলের বাতাসকে ব্যবহার করে জেট তৈরি করে। কিন্তু রকেট জেট বায়ুমন্ডলের বাতাসের পরিবর্তে এর ভেতরে থাকা জ্বালানী আর অক্সিজেনের মিশ্রণ ব্যবহার করে জেট তৈরি করে থাকে। রকেট জেটের থ্রাস্ট খুব শক্তিশালী। তবে এর স্থায়িত্ব স্বল্প সময়ের জন্য হয়। স্পেস শিপ এবং মিসাইলে রকেট জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়।

চিত্রঃ রকেট জেট ইঞ্জিন।

গ্যাসে টারবাইন ইঞ্জিনঃ গ্যাসে টারবাইন ইঞ্জিন আধুনিক এয়ারক্রাফটগুলোতে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের ইঞ্জিন বায়ুমন্ডল থেকে বাতাস টেনে এর ভেতরে নিয়ে প্রথমে সংকুচিত করে। আমরা জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি এ ধরনের ইঞ্জিনের সাহায্যেই আলোচনা করেছি। গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিনকে এর ডিজাইনের উপর উপর ভিত্তি করে আবার ৩ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১. টার্বোজেট ২. টার্বোপ্রপ ৩. টার্বোফ্যান।

টার্বোজেটঃ টার্বোজেট ইঞ্জিনের সামনে একটি কম্প্রেশার থাকে। এর সাহায্যে ইঞ্জিনের ভেতরে প্রতি মিনিটে কয়েক হাজার টন করে বাতাস নিয়ে যাওয়া হয়। টারবাইনের সাথে একটি শ্যাফটের মাধ্যমে ইঞ্জিনের কম্প্রেশারটিও যুক্ত থাকে। ফলে প্রথমে বাহ্যিক একটি শক্তির সাহায্যে কম্প্রেশারটি একবার চালিয়ে দিলে পরবর্তীতে এটি নিজে নিজেই চলতে থাকে এবং ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় বাতাস টেনে আনতে থাকে।

টার্বোপ্রপ ইঞ্জিনঃ টার্বোপ্রপ জেট ইঞ্জিন অনেকটা টার্বোজেট ইঞ্জিনের মতোই। তবে এ ধরনের ইঞ্জিনের উৎপন্ন এগজস্ট গ্যাসকে ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট উৎপন্ন করার পরিবর্তে ইঞ্জিনের পেছনে থাকা টারবাইনটি ঘোরানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের ইঞ্জিনের টারবাইন থাকে অনেকগুলো, এগুলো তুলনামূলক ভাবে কিছুটা বড় হয়। ফলে উৎপন্ন জেটের প্রায় সবটুকু শক্তিই ব্যয় হয় এ টারবাইনগুলো ঘোরানোর কাজে।

সামনের দিকে থাকে একটি প্রপেলার। প্রপেলারে সাধারণত ৪-৬ টি করে ব্লেড থাকে। প্রপেলার বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে টারবাইন ও কম্পেশারের সাথে যুক্ত থাকে। টারবাইনের সাথে সাথে প্রপেলারটিও ঘুরে। এ প্রপেলারটিই এয়ারক্রাফটকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট তৈরি করে। ছোট আকারের এয়ারক্রাফটে এ ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়।

টার্বোফ্যানঃ অনেকটা টার্বোজেট ইঞ্জিনের মতোই কাজ করে এমন আরেকটি জেট ইঞ্জিন হচ্ছে টার্বোফ্যান জেট ইঞ্জিন। তবে টার্বোজেটের সাথে টার্বোফ্যান জেট ইঞ্জিনের মূল পার্থক্য হলো, এর সামনে থাকা কম্প্রেশারের ব্লেডগুলো অনেক বড় আকৃতির। ফলে বায়ুমন্ডল থেকে টেনে আনা বাতাসের পুরোটা ইঞ্জিনের ভেতর দিয়ে না গিয়ে কিছু অংশ ইঞ্জিনের বাইরের আবরণের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ বাতাসকে বাইপাস এয়ার বলা হয়। এর মূল সুবিধা হলো, বাইপাস এয়ারের কারণে ইঞ্জিনটি ঠান্ডা থাকে। আবার বিশেষ ব্যবস্থায় এ বাইপাস এয়ারকে জ্বালানী সহকারে বিষ্ফোরিত করে অতিরিক্ত এগজস্ট গ্যাস উৎপন্ন করা হয়। ফলে এয়ারক্রাফটের জন্য অতিরিক্ত থ্রাস্টও পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্রঃ
১. The Jet Engine- Rolls Royce
২. উড়োজাহাজ কেমন করে উড়ে- এ. কে. এম. আতাউল হক
৩. www.nasa.gov

featured image: maya.design