গণিতের বরপুত্র জন ন্যাশ এবং অনন্য ‘গেম থিওরি’

১৯৫০ সাল; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর পর আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের ২১ বছর বয়সী একজন ছাত্র মাত্র ২৮ পৃষ্ঠার একটি পিএইচডি থিসিস জমা দেন। শিরোনাম ছিল, “Non Cooperative Games”। থিসিস পেপারটি কেবল দুইজন বিজ্ঞানীর (John von Neumann & Oskar Morgenstern) পূর্বের গবেষণার আলোকে লেখা হয়েছিল। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, স্বল্পদৈর্ঘ্য এই পেপারটির উপর ভিত্তি করে আবিষ্কৃত তত্ত্বের জন্যে অর্থনীতিতে ১৯৯৪ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

জন ন্যাশ

হ্যাঁ ! গণিত এবং অর্থনীতিতে গত শতাব্দীতে যাঁর অবদান জীববিজ্ঞানে ডিএনএ মডেল আবিষ্কারের সমতুল্য ধরা হয়, তিনি ‘অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড’ খ্যাত ‘জন ফোর্বস ন্যাশ’। তাঁর গবেষণাকর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ‘গেম থিওরি’। শুধুমাত্র গণিতে নয়; অর্থনীতি, বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা, নীতিশাস্ত্র, এবং বিশেষত বর্তমানে কম্পিউটার বিজ্ঞানের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা সাইবারনেটিক্সে ‘গেম থিওরি’র সফল ব্যবহার রয়েছে।

জন ন্যাশ ১৯২৮ সালের ১৩ জুন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ব্লু ফিল্ডে জন্ম গ্রহণ করেন। মা ল্যাটিন ভাষার শিক্ষক এবং বাবা তড়িৎ প্রকৌশলী। ছোটবেলা থেকেই ন্যাশের গণিতে আগ্রহ। গণিত নিয়ে পড়ে থাকা এই ছেলেটির বন্ধুমহলে তাই নাম জুটে গিয়েছিল ‘বড় মাথা’! বাবার কথামতো প্রথম জীবনে সে সময়ের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি টেক-এ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ালেখা শুরু করেন তিনি।

কিন্তু ক্রমশই বুঝতে পারেন, তাঁর উপলব্ধজ্ঞান প্রায়োগিক বিজ্ঞানের চাইতে বেশি কিছু। তাই প্রকৌশল থেকে রসায়ন এবং শেষে তাঁর স্বকীয়ক্ষেত্র- গণিতে স্থিত হন। গণিতের মূল চর্চাকেন্দ্র তখন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি। যেখানে আলবার্ট আইনস্টাইন, জন ভন নিউম্যান, রবার্ট ওপেনহেইমার, কার্ট গোয়েডলসহ আরো অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের আনাগোনা।

জন ন্যাশের পিএইচডি থিসিস শুরু হয় এখানেই। তাঁর সুপারভাইসর তাকে প্রথম দেখাতেই বলেছিলেন, ‘হি ইজ অ্যা মেথেমেটিক্যাল জিনিয়াস’। আসলেই তাই, ১৯৫৮ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সেই ফরচুন ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের সেরা গণিতবিদদের একজন বলে স্বীকৃতি দেয়।

যদিও বাস্তব জীবনে অসাধারণ প্রতিভার এই মানুষটি ছিলেন প্রচন্ড নিভৃতচারী। তাঁর আবিষ্কৃত তত্ত্বের স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এসময় তাঁর পারিবারিক এবং শারীরিক জীবনের নানা উত্থান-পতন ঘটে। অল্প বয়সেই তিনি স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হন। এছাড়া বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদ, একের পর এক প্রেমিকা বদল এবং একাধিক সমকামী সম্পর্কের জন্যে পুলিশের কাছে গ্রেফতারও হন।

এক গভীর অন্ধকার তাঁর জীবনে নেমে আসে। প্রায় উন্মাদের মতো প্যারিস আর লন্ডনের রাস্তায় হেঁটে বেড়াতেন। নিজেকে ভাবতে শুরু করলেন এ্যান্টার্ক্টিকার প্রেসিডেন্ট, যার কাছে টেরেস্ট্রিয়াল গোপন বার্তা পাঠানো হয়। এসময় তাঁর পাশে একজনই ছিলেন, স্ত্রী এ্যালিসিয়া। তার পরিচর্যায় ন্যাশ কিছুটা সুস্থতা লাভ করেন। এভাবে প্রথমে প্যারানয়েড স্কিৎজোফ্রেনিয়া, তারপর সেখান থেকে ক্রমশ সুস্থ হয়ে ফিরে আসা এবং তারও অনেক পরে তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি পান নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে।

যে কমিটি জন ন্যাশকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিল, তার প্রধান আসার লিন্ডবেক বলেছিলেন, ‘আমরা তাঁকে দিনের আলোতে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছি। নোবেল জেতা তাঁর জন্য ছিল পুনরুত্থান’। এরপর তিনি আরো অনেকগুলো পুরষ্কার পেয়েছেন। গণিতে নোবেল পুরস্কার খ্যাত ‘অ্যাবেল পুরস্কার’ পেয়েছিলেন ২০১৫-তে। এছাড়া সিলভিয়া নাসার লেখা জন ন্যাশের জীবনী নিয়ে ২০০১-এ ‘এ বিউটিফুল মাইন্ড’ সিনেমাটি ন্যাশকে রাতারাতি তারকা খ্যাতি এনে দেয়।

২০১৫ সালের ২৩ মে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্ত্রী এ্যালিসিয়া এবং জন ন্যাশ দুজনই মারা যান। অসম্ভব প্রতিভাবান গণিতের এই বরপুত্রকে তাই শুধুমাত্র তত্ত্ব আলোচনার জন্য নয়, স্মরণ করতে হয় নিভৃত অথচ বিকশিত সুন্দর মননের প্রতিচ্ছবি রূপে।

জন ন্যাশের ‘গেম থিওরি’, যাকে বাংলায় ‘ক্রীড়াতত্ত্ব’ বলা যায়, মূলত ফলিত গণিত এবং অর্থশাস্ত্রের একটি শাখা। গণিতের অন্যান্য তত্ত্বের চাইতে এটা ব্যাখ্যা করা তুলনামূলক সহজ। কারণ, বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ এতো বেশি যে, আমরা হরহামেশাই নিজের অজান্তে ‘গেম থিওরি’ ব্যবহার করে থাকি!

প্রথমে আমরা অর্থনীতির দিক থেকে ‘গেম থিওরি’কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো। অর্থনীতিতে এই তত্ত্ব এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক খেলাকে নির্দেশ করে, যেখানে খেলোয়াড়রা সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করবে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।

‘ওয়ালকন’ কোম্পানি কোনো একটা স্মার্টফোন প্রোডাক্ট থেকে মাসিক মুনাফা পায়- ৫০,০০,০০,০০০ টাকা।
অন্যদিকে ‘সিমকনি’ কোম্পানিও সমান কনফিগারেশনের একটা স্মার্টফোন থেকে মাসিক মুনাফা পায়- ৫০,০০,০০,০০০ টাকা।

এখন ওয়ালকন ভাবল যে, তাদের পণ্যের দাম যদি খানিকটা কমানো যায়, তাহলে বিক্রি বেশি হবে। তখন লাভ আগের চাইতে বেশি হবে। ধরা যাক, তখন লাভ হল, ৫৫,০০,০০,০০০ টাকা। এতে ওয়ালকনের বিক্রি ও লাভ বাড়লেও সিমকনির কিন্তু বিক্রি কমবে, লাভও কমবে। কারণ, একই জিনিস বেশি দাম দিয়ে কে কিনতে চাইবে! তাই সিম্ফনিও একইভাবে দাম কমিয়ে আনবে। তখন এই দু’টো কোম্পানির অ্যাবসলিউট লাভ হয়ত আগের চাইতে বাড়বে, কিন্তু রিলেটিভ লাভ আগে যা ছিল তাই থাকবে। ফলে, পুরো ব্যবস্থাটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

এই জিনিসটা আরেকটু গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। ১৯৯৪ সালে কর্ণেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক কৌশিক বসু এই অবস্থাটিকে ব্যাখ্যা করার জন্যে ‘গেম থিওরি’র একটা মজার সমস্যা প্রস্তাবনা করেন। যা ‘ট্রাভেলারস ডিলেমা’(travelers dilemma) বা, ভ্রমণকারীর উভয়সঙ্কট নামে পরিচিত।

লুসি এবং পিট দুজন যাত্রী। যারা শখের বসে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ শেষে প্লেনে করে ফিরছিল। দুইজনই একদম একই রকম ও একই দামের একটা মূর্তি কিনেছিল। যাত্রাশেষে দেখা গেল, জিনিস দুটোই ভেঙে গেছে।

এয়ারলাইন ম্যানেজার তাদেরকে বলল যে, তিনি ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি আছেন। কিন্তু তিনি ঠিক কতটা ক্ষতিপূরণ দেবেন তা বের করার জন্য তিনি একটা কৌশল অবলম্বন করলেন। তাদের দুজনকে আলাদা জায়গায় রেখে বলা হল জিনিসটার দাম লিখে ম্যানেজারকে লিখে দিতে। কিন্তু সেখানে কিছু শর্ত ছিলঃ

১। দামটা ২ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে হতে হবে।
২। যদি ২ জন একই দাম লিখে দেয়, তাহলে ম্যানেজার সেই ডলারই দুইজনকে দিয়ে দিবে। যেমনঃ লুসি এবং পিট দুইজনই যদি ৫০ ডলার লেখে, তাহলে দুইজনকেই ৫০ ডলার দিয়ে দেওয়া হবে।
৩। যদি দুইজনের মধ্যে কোন একজন আরেকজনের চেয়ে কম দাম লেখে, তাহলে ম্যানেজার কম পরিমানের ডলারটাকে আসল বা বেস ধরবে। একইসাথে যে কম ডলারটা লিখল তার ডলারের পরিমাণকে সত্যি ধরে সততার পুরস্কার হিসেবে তাকে ২ ডলার বেশি দিয়ে দিবে এবং যে বেশি পরিমাণ ডলার দাবি করল তাকে ২ ডলার কম দিবে। যেমনঃ লুসি যদি দাবি করে ৪৪ ডলার এবং পিট দাবি করে ৪৬ ডলার; তাহলে বেস ধরা হবে ৪৪ ডলার। লুসি যেহেতু কম বলল, সে পাবে (৪৪+২) বা ৪৬ ডলার। পিট যেহেতু বেশি বলল, সে পাবে (৪৪-২) বা ৪২ ডলার।

এই হল শর্ত। এগুলো আলাদা আলাদাভাবে বুঝিয়ে দিয়ে লুসি এবং পিটকে দু’টি আলাদা আলাদা ঘরে রাখা হলো এবং বলা হলো দামটা লিখে ম্যানেজারকে দিতে। এখানে ধরে নেওয়া যাক, লুসি এবং পিট দুজনই সমান এবং বেশ ভাল মানের বোধবুদ্ধিসম্পন্ন। অর্থাৎ দুজনেই যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করে। এবং তারা দু’জন দুজনের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কেও অবগত। সেইসাথে দুজনই অধিক মুনাফা লাভের ব্যাপারে আগ্রহী।

এখন আমরা যুক্তির বিচারে তাদের দুজনের অবস্থাকে বর্ণনা করব। লুসি কাগজ পাওয়ার সাথে সাথেই হয়ত ১০০ ডলার লিখে ফেলবে। কারণ এটাই সবচেয়ে বেশি মানের ডলার যা সে পেতে পারে। জিনিসটার দাম যদি ১০০ ডলারের কম হয় তাহলে ১০০ ডলার পেলে তো তার লাভই হয়!

কিন্তু ঠিক তখনি তার মাথায় আরেকটা ব্যাপারও আসবে। সে তখন ভাববে, পিটও হয়ত ১০০ ডলারই লিখবে। এর চেয়ে বরং আমি এক কাজ করি। আমি লিখে দেই ৯৯ ডলার। এতে করে সে সততার পুরস্কার হিসেবে (৯৯+২) বা ১০১ ডলার পেয়ে যাবে। ওদিকে পিট পাবে (৯৯-২) বা ৯৭ ডলার। ফলে, কৌশলগত কারণে লুসি পিটের চাইতে ৪ ডলার বেশি পাচ্ছে! এই ভেবে সে যখনই ৯৯ ডলার লিখে ফেলবে ঠিক তখনি তার মাথায় আরেকটা ব্যাপার খেলা করবে। সে ভাববে, পিটও নিশ্চয়ই আমি যা ভাবছি তা ভাবছে (কারণ দুজনই যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করে এবং তা উভয়েই জানে) তাহলে সেও তো ৯৯ ডলারই লিখবে! তাহলে আমি ৯৯ ডলার না লিখে বরং ৯৮ ডলার লিখি তাহলে আমি পাব (৯৮+২) বা ১০০ ডলার আর পিট পাবে (৯৮-২) ডলার বা ৯৬ ডলার! এখানেও ৪ ডলার বেশি।

এই যুক্তিকে আরো আগে বাড়তে দিলে দেখা যায় এই ব্যাপারটা একটা সিরিজের মত করে চলতে থাকবে আর লুসিও তার ডলারের পরিমানটা আস্তে আস্তে কমাতেই থাকবে! ৯৮ থেকে ৯৭, ৯৭ থেকে ৯৬, ৯৬ থেকে ৯৫- তাত্ত্বিকভাবে ডলারের পরিমানটা কমেই যেতে থাকবে। একটা সময় কমতে কমতে এটা তাত্ত্বিকভাবে ২ ডলারে গিয়ে থামবে! যেহেতু পণ্যের মূল্য সর্বনিম্ন ছিল ২। এই চিন্তাভাবনাগুলো কিন্তু পিটের মাথায়ও খেলা করতে থাকবে! কিভাবে নিজে একটু বেশি ডলার পাওয়া যায়, সেটার জন্য লুসি কম পেলে পাক!

এখানেই ‘গেম থিওরি’র শুরু। ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে লুসি এবং পিটের মধ্যে একটা অলিখিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়ে গেছে। অবশ্য অনেকেই বলতে পারে, দুজনেই যদি সত্যিটা লিখে, তাহলে তো আর কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু বাস্তব জীবনে ব্যবসার ক্ষেত্রে হিসেব-নিকেশগুলো এরকময়ই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। যাহোক, লুসি এবং পিটের বিভিন্ন স্ট্রাটেজি ও তার ফলাফলকে আমরা বোঝার সুবিধার্তে নিচের ম্যাট্রিক্স আকারে সাজিয়ে লিখতে পারি-

গেম থিওরিতে এ ধরণের ম্যাট্রিক্সকে বলা হয় পে-অফ ম্যাট্রিক্স। পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা খেয়াল করলে দেখা যাবে- এখানে লুসি এবং পিটের লেখা বিভিন্ন ডলার পরিমানের সাপেক্ষে তাদের প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণকে দেখানো হয়েছে।

যেমনঃ লুসি এবং পিট দু’জনই যদি ১০০ ডলার লেখে, আমরা জানি যে দুজনই ১০০ ডলার করে পাবে। একদম নিচে সবচেয়ে ডানের ঘরে তাই আমরা (100 100) দেখতে পাচ্ছি। আবার ধরি, লুসি লিখল ৩ ডলার, পিট লিখল ৪ ডলার। তাহলে আমরা জানি যে ম্যানেজার ৩ ডলারকে বেস হিসেবে ধরে লুসিকে দিবে (৩+২) বা ৫ ডলার। আর পিটকে দিবে (৩-২) বা ১ ডলার। (5 1) লেখা ঘরটা কিন্তু তাই নির্দেশ করে।

এই পুরো ব্যাপারটা থেকে আসলে যে সিদ্ধান্তটা নেওয়া যায় তা হচ্ছে, সবসময় অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদেরকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেয় না। সহযোগিতাপূর্ণ এবং নৈতিক চিন্তাভাবনা আমাদের জন্যে বেশি লাভজনক।

‘গেম থিওরি’র আরেকটা ব্যাপার পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, তা হল- ‘ন্যাশ সাম্যাবস্থা’ । পুরো পে-অফ ম্যাট্রিক্সের মধ্যে একটা বিশেষ ঘরের দিকে লক্ষ্য করা যাক। ঘরটা হচ্ছে (2 2)। মনে করে দেখি পিট এবং লুসির শেষমেশ দুইজনই ২ ডলার করে লিখেছিল। এই ঘরটার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য ঘরগুলোর নেই।

পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা একটু ভালভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই যে, যে কোন একজন প্লেয়ারের সিদ্ধান্তকে অপরিবর্তিত রেখে যদি আরেকজন তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে থাকে তাহলে এই (2 2) বাদে বাকি সব ঘরের জন্যই দুই প্লেয়ারের অন্তত একজন হলেও লাভবান হয় অর্থাৎ বেশি ডলার পায়। ব্যাপারটা একটু বিস্তারিতভাবে বলা যাক। (2 2) ছাড়া ম্যাট্রিক্সের যে কোনো একটা ঘর নিই।

ধরা যাক, লুসি লিখল ৩ এবং পিটও লিখল ৩। তাহলে আমরা পে-অফ ম্যাট্রিক্সের যে ঘরটায় থাকব তা হচ্ছে (3 3)। ধরে নিই পিট তার সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রাখবে অর্থাৎ সে ৩ ই লিখবে। এখন লুসি যদি তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করে তাহলে কি হয় দেখা যাক।

একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখতে পাব যে লুসি যদি ৩ না লিখে ২ লিখে তাহলে আমরা থাকব (4 0) ঘরে অর্থাৎ লুসি ৪ ডলার (২+২) পাবে, যেখানে আগে সে পেত ৩ ডলার। আর পিট পাবে ০ ডলার (২-২)। আবার ধরি লুসি তার সিধান্তের পরিবর্তন করবেনা অর্থাৎ সে ৩ ই লিখবে। পিট যদি তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করে ৩ না লিখে ২ লিখে তাহলে আমরা থাকব (0 4) ঘরে অর্থাৎ পিট পাবে ৪ ডলার, যেখানে আগে সে পেত ৩ ডলার। এখান থেকে আমরা যা বুঝতে পারি (3 3) ঘরে থাকলে লুসি তার পাওয়া ডলারের পরিমানটাকে কিন্তু বাড়িয়ে নিতে পারবে, যদি পিট তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। একই কথা পিটের জন্যেও খাটবে।

কিন্তু এবার (2 2) ঘরটার কথা ভাবা যাক। আমরা যদি পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা একটু ভালভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব, একজন প্লেয়ারের সিদ্ধান্তকে অপরিবর্তিত রেখে আরেকজন তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে সে কখনোই লাভবান হতে পারবেনা।

ব্যাপারটাকে এভাবে বলা যায় যে লুসি যদি ২ ডলার লিখে সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে পিট যাই লিখুক না কেন কখনোই ২ ডলারের চেয়ে বেশি পাবেনা আর সে নিজে অন্তত ২ ডলার পাবেই। আবার পিটও যদি ২ ডলার লিখে সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে লুসি কখনোই ২ ডলারের চেয়ে বেশি পাবেনা এবং সে নিজে অন্তত ২ ডলার পাবেই। কারণ, ২ ডলারই বেস। ২ ডলার যে-ই লিখুক না কেন, ম্যানেজার তখন ২-কে বেজ ধরবে। তাই (2 2) ঘরেই এসে শেষমেশ তারা স্থির হবে। ফলে (2 2) ঘরটা একটা সাম্যাবস্থা নির্দেশ করবে। একেই বলা হয় Nash Equilibrium বা ‘ন্যাশের সাম্যাবস্থা’।

এই তত্ত্বটি শুধুমাত্র কাগজে কলমে সত্যি এমন নয়। কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যদি বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আচরণের কারণে তার সমসাময়িক অন্য প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা না করে কোনো পণ্যের দাম কমিয়ে আনে এবং অন্য কোম্পানি না কমায়, তখন আলটিমেটলি লস হয়। এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। রবি ইয়োন্ডার মিউজিক অ্যাপ তাদের নতুন ক্যাম্পেইন ‘নো মানি ফর মিউজিক’ এর ঘোষণা দিয়েছে। এই ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে শ্রোতারা এখন ইন্টারনেট চার্জ ছাড়াই গান শুনতে পারেন। অন্যদিকে গ্রামীনফোনে মাসিক ৪২.৬১ টাকা দিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে গান শোনা যায়। এখানে একক বা ইনডিভিজুয়ালি রবির লাভ হলেও সামগ্রিকভাবে ‘মিউজিক অ্যাপ’ তৈরির যে ক্ষেত্র বাংলাদেশে হতে পারত, রবির কারণে তা অনেকাংশেই ব্যাহত হবে।

কারণ, বিখ্যাত একটা ব্রান্ড যেখানে ফ্রি সার্ভিস দিচ্ছে, সেখানে টাকা দিয়ে গান শোনার মতো অ্যাপ আর কে বানাতে যাবে? বানালেও মানুষ তো ফ্রি টা দিয়েই শুনবে! একই কথা ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জিরো ডট ফেসবুক এবং ফ্রি ম্যাসেঞ্জারের (ফ্রি বলতে ডেটা ছাড়াই ইউজ করা যায়) কারণেই বোধহয় বাংলাদেশ, এমনকি ভারতের টপ লিস্টেও এমন কোনো চ্যাট অ্যাপ দেখা যায় না, যেটা লোকাল ডেভেলপারদের তৈরি।

যাহোক, ট্রাভেলারস এলগোরিদম দিয়ে শেষ একটা তথ্য দেওয়া প্রয়োজন, তা হল- এই ডিলেমা বা, উভয়সঙ্কট নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা আসলেই করা হয়েছে। ইসরায়েলের একজন ইকোনোমিস্ট Ariel Rubinstein একবার একটা ওয়েব বেসড পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। যেখানে ৭টি দেশের ২৫০০ জনের মত মানুষ অংশ নিয়েছিল। একদম একই রকম পরীক্ষা, শুধু তাদের ১৮০ থেকে ৩০০ ডলারের মধ্যে কোন একটা ডলারের পরিমান লিখতে বলা হয়েছিল এবং শাস্তি বা পুরস্কার হিসেবে আমাদের উদাহরণের ২ ডলারের জায়গায় ছিল ৫ ডলার।

দেখা গিয়েছিল সাতজনের মধ্যে একজন মাত্র ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামের ডলার পরিমানটা লিখেছে। ৫৫ শতাংশ ৩০০ ডলার লিখে দিয়েছে। নিচে একটা পাই চার্টে ঐ পরীক্ষার রেসাল্ট এবং একইসাথে রেসপন্সের সময়টাও বার চার্ট দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া আছে। এটার দিকে একটু তাকালেই বোঝা যায় কতভাগ মানুষ আসলেই চিন্তা ভাবনা করে উত্তর করেছে, কতভাগ করেনি!

এখানে মনে হতে পারে, স্বতস্ফূর্তভাবে দাম লেখার সংখ্যা যেহেতু বেশি, তাই এটিই বেশি লাভজনক। আপাত দৃষ্টিতে এটা ঠিক। কারণ একক ব্যক্তির জন্যে হেড-টু-হেড ডিসিশনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার চাইতে স্বার্থপরতা অনেক সময় বেশি সাফল্য এনে দেয়। কিন্তু একের অধিক খেলোয়াড়, যারা পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত একজন আরেকজনের প্রতি, যেমনঃ একটা গোষ্ঠী বা অনেক মানুষের কথা চিন্তা করা হলে, তখন সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ বা ‘ন্যাশ সাম্যাবস্থা’ই আমাদেরকে অধিক লাভের দিকে নিয়ে যায়।

এখানে অধিক লাভ শুধুমাত্র একক ব্যক্তিস্বার্থের জন্যে ঘটে, এমন নয়। সিস্টেমে সকলের জন্যে তা মঙ্গলজনক হবে। এটাই ‘গেম থিওরি’র মূলকথা। ধ্রুপদী অর্থনীতিতে যেমন সবসময় পরিপূর্ণভাবে স্বার্থবাদী চিন্তা করা হয়, ‘গেম থিওরি’তে তা করা হয় না। ‘গেম থিওরি’ আমাদেরকে ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’ চিন্তা করতে শেখায়।

কারণ, ট্রাভেলারস ডিলেমা থেকে আমরা দেখেছি দু’জন মানুষ নিজেদের সেরাটা দিয়ে চিন্তা করেও সব থেকে ভালো পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে পারছেন না। এখানে মানুষের চিন্তাজগৎতে আমূল পরিবর্তন ঘটায় ‘গেম থিওরি’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার মাধ্যমে সর্বোচ্চ বুদ্ধি খরচ করে যে সিদ্ধান্তটি নেব, তা আমাদেরকে যে অভীষ্ট লক্ষ্য পোঁছে দেবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এই সহজ সত্যটা এই যুগে ক’জন বোঝে!

তথ্যসূত্রঃ
১। THE TRAVELER’S By Kaushik Basu
২। A Survey of Game Theory as Applied to Network Security by Sankardas Roy, Charles Ellis, Sajjan Shiva, Dipankar Dasgupta, Vivek Shandilya, Qishi Wu
৩। Game Theory Through Examples by Erich Prisner

featured image: houseofstaunton.com

‘পাই’ (π) কি তবে ভুল ছিল?

১. বৃত্তের ধ্রুবক

গণিতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা বলা হয়ে থাকে ‘পাই’কে। বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত থেকে আমরা পাইয়ের ধারণা পাই। জ্যামিতিতে বিভিন্ন আকৃতির যেসব বস্তু আমরা কল্পনা করতে পারি, তাদের মধ্যে বৃত্তের গঠনকে সবচেয়ে নিঁখুত ধরা হয়। আর পাই নামের সেই অমূলদ সংখ্যাটি, যেটি বৃত্ত সংক্রান্ত যেকোনো জ্যামিতির হিসাব নিকাশের জন্যে অপরিহার্য। তাই পাই নিয়ে গণিতজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণের শেষ নেই। তবে Bob Palais নামক এক গণিতবিদ Pi is Wrong শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। আমরা এই লেখার মাধ্যমে পাই সম্পর্কে এই গণিতবিদের ধারণাকে পর্যালোচনা করবো।

১.১ অস্বচ্ছ প্রস্তাবনা

পাই সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা রয়েছে, তা পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে পাইকে সঠিকভাবে অনুধাবণ করতে হবে। পাই সম্পর্কিত সর্বজনগৃহীত সংজ্ঞা হচ্ছ, পাই বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত।

π = C/D = 3.14159265… (C = বৃত্তের পরিধি, D = বৃত্তের ব্যাস)

পাইয়ের অনেক চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা একে বেশি পরিমাণে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যেমন: পাই সংখ্যাটি অমূলদ। অর্থাৎ, একে দুটি সংখ্যার ভগ্নাংশ আকারে প্রকাশ করা যায় না। এবং এটি একটি তুরীয় সংখ্যা (Transcendental Number)। যেসকল সংখ্যাকে কোনো বহুপদী সমীকরণের চলকসমূহের মূল (root) হিসেবে প্রকাশ করা যায় না, সেটাই তুরীয় সংখ্যা। এরকম অনেক গাণিতিক বিশেষত্ব নিয়ে পাই সংখ্যাটি বিশেষভাবে আলোচিত।

আসলে পাই সংখ্যাটি যে ভুল- ব্যাপারটি আদৌ এমন নয়। কিন্তু সত্যটি হলো, পাই সংখ্যাটি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। তাই যখন আমরা বলি, ‘পাই ভুল’, তার অর্থ এই যে, বৃত্তের একটি ধ্রুবক হিসেবে পাই সংখ্যাটি কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। আরো স্পষ্ট করতে বলতে গেলে, বৃত্ত হচ্ছে অসংখ্য বিন্দুর সমষ্টি, যে বিন্দুগুলো অপর একটি নির্দিষ্ট বিন্দু (বৃত্তের কেন্দ্র) হতে সর্বদা সমদূরবর্তী। এই সমদূরত্বটিই ঐ বৃত্তের ব্যাসার্ধকে নির্দেশ করে। বলে রাখা প্রয়োজন, ব্যাস হলো বৃত্তের পরিধির উপরিস্থ যেকোনো দুটি বিপরীত বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব। অন্যদিকে ব্যাসার্ধ হলো, বৃত্তের কেন্দ্র এবং পরিধির উপরিস্থ যেকোনো বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব। এখন নিচের চিত্রটা থেকে দেখা যায়, ব্যাসকে ধ্রুবক রেখে অসংখ্য আকৃতি গঠন করা সম্ভব। কিন্তু ব্যাসার্ধকে ধ্রুবক রাখলে কেবল একটি আকৃতি আসে। ফলে, এটি অনেক বেশি গঠনমূলক বৃত্তের ধ্রুবক তৈরি করে।

যেহেতু বৃত্তের ব্যাস এর ব্যাসার্ধের দ্বিগুণ, তাই নতুন এই ধ্রুবকটি হবে পাইয়ের দ্বিগুণ (ব্যাসার্ধ হর হিসেবে থাকায়)। পাইয়ের মতো এটিও তুরীয় এবং অমূলদ সংখ্যা হবে।

খেয়াল করলে দেখা যায় গণিত, পদার্থবিদ্যার অনেক সূত্রে 2π ব্যবহার করা হয়। Pi is Wrong প্রবন্ধে লেখক বৃত্তের ধ্রুবকের জন্যে ব্যাসার্ধ সংক্রান্ত সংজ্ঞাটিই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। তিনি একে বৃত্তের এক চক্র বা one turn বলে পরিচিত করেছেন। এবং চিহ্ন হিসেবে τ (tau) ‘কে বেছে নিয়েছেন।

τ = C/r = 6.283185307179586… (C = বৃত্তের পরিধি, r = বৃত্তের ব্যাসার্ধ)

১.২ পাই (π)-য়ের জনপ্রিয়তা

বৃত্তের ধ্রুবক হিসেবে যে টাউ (τ)-য়ের ব্যবহারই স্বাভাবিক হতে পারত, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে আমরা দেখে নিতে পারি- আমাদের মাঝে পাই কতটা জনপ্রিয়। প্রথমেই আমাদের এই সত্যটি স্বীকার করে নিতে হবে যে, প্রায় এক শতাব্দী জুড়ে আমাদের মাঝে পাইয়ের জনপ্রিয়তা একটা অন্ধ বিশ্বাসের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাই এর গুণাবলি নিয়ে উচ্চ প্রশংসা করে বিভিন্ন বইও লেখা হয়েছে। এমনকি পাইয়ের জন্যে অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ঈশ্বরের মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা। যেমন: ২০১০ সালে গুগল পাই দিবসকে উদযাপন করেছে, তাদের লোগো পরিবর্তনের মাধ্যমে।

গুগলের বিশেষ লোগো

কিছু কিছু পাইপ্রেমী মানুষ পাইয়ের মান শতক বা হাজার ঘর পর্যন্ত মুখস্ত করে ফেলে! তাই সত্যি কথা বলতে, টাউকে পাইয়ের মতো একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে। যদিও আমরা টাউ ব্যবহারের ক্ষেত্রেই বেশি যৌক্তিক পক্ষে অবস্থান করি।

২. টাউ সংখ্যাটি কী?

উপরের ১.১ অংশে আমরা দেখেছি ‘টাউ’ (τ)-কে 2π হিসেবে লেখা যায়। গণিতের বিভিন্ন সূত্রে আমরা এই 2π কে দেখতে পাই। যেমন:

$latex \int_0^{2\pi}\int_0^\infty f(r,\theta)\,r\,dr\,d\theta$

এই সূত্রে পোলার স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় একটি স্থানের সমাকলন করার সময় আমরা শূন্য (0) থেকে 2π ব্যবধানের মান বের করি।

$latex \frac{1}{\sqrt{2\pi}\sigma}e^{-\frac{(x-\mu)^2}{2\sigma^2}},$

২য় সূত্রটি পরিমিত বিন্যাস সম্পর্কিত। একে গসিয়ান ডিস্ট্রিবিউশনও বলা হয়। ‘পরিমিত বিন্যাস’ ব্যাপারটি একটি সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে। যেমন: বাংলাদেশের একজন পুরুষকে যদি দৈবচয়নে নির্বাচন করা হয়, তাহলে তার উচ্চতা ৫ ফুট থেকে ৫.৫ ফুটের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা কত? এই সম্ভাবনা বের করার জন্য যে সূত্র, সেক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই 2π কে।

$latex f(x) = \int_{-\infty}^\infty F(k)\, e^{2\pi ikx}\,dk$
$latex F(k) = \int_{-\infty}^\infty f(x)\, e^{-2\pi ikx}\,dx$

৩য় সূত্রটি ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম-এর। বিভিন্ন ধরণের তরঙ্গের কম্পাঙ্ক, অনুপাত ইত্যাদি বের করার জন্যে সূত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সূত্রেও 2π রয়েছে।

$latex f(a) = \frac{1}{2\pi i}\oint_\gamma\frac{f(z)}{z-a}\,dz,$

৪র্থ’টি গণিতবিদ অগাস্টিন লুইস কচির বিখ্যাত একটি সূত্র। জটিল সংখ্যা (complex number) ’কে ব্যবহার করে যে ফাংশন তৈরি করা হয়, তার সমাকলন করার জন্যে এই সূত্রটি ব্যবহৃত হয়। স্বাভাবিকভাবেই এখানেও 2π দেখা যাচ্ছে।

$latex z^n = 1 \Rightarrow z = e^{2\pi i/n},$

৫ নম্বরে এককের n তম বর্গমূল বের করার জন্যে e এর পাওয়ার হিসেবে 2π ব্যবহার করা হয়েছে।

$latex \zeta(2n)=\sum_{k=1}^\infty \frac{1}{k^{2n}}=\frac{B_n}{2(2n)!}\,(2\pi)^{2n}.\qquad n=1,2,3,\ldots$

সবশেষে, গণিতের একটি অসাধারণ সূত্র রেইম্যান-জেটা ফাংশন। বাস্তব অথবা জটিল সংখ্যা ব্যবহার করে একটি অসীম ধারা তৈরি করা হয়েছে, যা রেইম্যান-জেটা ফাংশন নামে পরিচিত। উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এখানেও 2π ব্যবহার করা হয়েছে।

[রেইম্যান-জেটা ফাংশনটি 2n এর পরিবর্তে -১ ব্যবহার করলে যে ধারাটি পাওয়া যায়, সেটি হলো ১+২+৩+৪+৫…∞,অর্থাৎ সমস্ত স্বাভাবিক সংখ্যার যোগফল। সূত্রের ফলাফল হিসেবে মানটি আসে -১/১২ । মজার ব্যাপার হলো, ভারতীয় গণিতবিদ রামানুজন আরেকটি ভিন্ন উপায়ে খুব সহজেই এই একই মান বের করেন।]

এখন কেউ কেউ ভাবতে পারেন উপরের এই সূত্রগুলো আমরা বেছে-বেছে নিয়েছি, যেখানে 2π -ই রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি আপনার গণিত অথবা পদার্থবিদ্যার বইটা খুলে দেখেন, তাহলে দেখবেন সেখানে অসংখ্য সূত্র রয়েছে, যেগুলোতে 2π ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এই রহস্যের সমাধান করতে আমাদেরকে বৃত্তের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশদ ধারণা লাভ করতে হবে। যদিও কমবেশি সবারই বৃত্তের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে, তারপরও ‘টাউ’ সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারনা পেতে আমাদেরকে বৃত্তের উপর একবার নতুন করে চোখ বুলিয়ে নিতেই হবে।

২.১ বৃত্ত এবং কোণ

বৃত্ত এবং কোণের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। নিচের ছবিতে একই কেন্দ্র বিশিষ্ট দু’টি ভিন্ন ব্যাসার্ধের বৃত্ত দেখা যাচ্ছে। যাদের পরিধি থেকে ভিন্ন দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট দু’টি অংশ বা ‘চাপ’ (arc lengths) কেটে নিলেও তাদের মধ্যবর্তী কোণের পরিমাণ (θ) একই থাকে। অন্যভাবে বলা যায়, বৃত্তের ‘চাপ’ পরিমাপ করার সময় ব্যাসার্ধ এবং কোণ পরস্পর স্বাধীনভাবে আচরণ করে। তবে যখন আমরা শুধুমাত্র একটি বৃত্ত নিয়ে বিভিন্ন পরিমাপ করতে চাই, তখন ব্যাসার্ধটি অবশ্যই অপরিবর্তনীয় থাকে এবং ঐ বৃত্তের দু’টি ব্যাসার্ধের মধ্যবর্তী অংশকে পরিমাপ করার জন্যেই আমরা ‘কোণ’ মেপে থাকি।

চিত্র- i

সম্ভবত কোণ পরিমাপের সবচেয়ে প্রাথমিক পদ্ধতি হলো ‘ডিগ্রি’। এটা বৃত্তকে ৩৬০ ভাগে ভাগ করে। নিচের ছবিতে ত্রিকোণমিতিতে ব্যবহৃত কিছু প্রচলিত কোণের পরিমাপ দেখানো হলো-

চিত্র- ii

কোণ পরিমাপের আরেকটি মৌলিক পদ্ধতি হলো, কোনো বৃত্তের চাপের দৈর্ঘ্যের সাথে ঐ বৃত্তের ব্যাসার্ধের অনুপাত বের করা। একে রেডিয়ান পদ্ধতি বলা হয়। উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বৃত্তের চাপ এবং ব্যাসার্ধ পরস্পরের সামাণুপাতিক। এবং সেখানে ধ্রুবক হলো ‘কোণ’। এখানে খেয়াল রাখতে হবে, যেহেতু ‘চাপ’ এবং ব্যাসার্ধ উভয়ের দৈর্ঘ্যের এককই সমান, তাই এর কোনো একক নেই। রেডিয়ান কোণের ব্যবহার গণিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করা সমাকলন বা ব্যবকলন করার সময় যে কোণের হিসাব করা হয়, সেগুলো সবই রেডিয়ান কোণ। যেমন: sinθ-কে যদি θ এর সাপেক্ষে ব্যবকলন করা হয়, তাহলে আমরা cosθ পাই। এখানে θ দ্বারা রেডিয়ান কোণই নির্দেশ করা হয়েছে। এবং এই ব্যবকলন শুধুমাত্র রেডিয়ান কোণের জন্যেই সঠিক হবে।

সাধারণত, ত্রিকোণমিতিতে কোণের হিসাব করার জন্যে রেডিয়ান কোণই ব্যবহার করা হয়। আমরা উচ্চমাধ্যমিকে ত্রিকোণমিতির যে বিশেষ কোণগুলোর (30, 45, 60, 90…) মান মনে রাখার চেষ্টা করতাম, সেগুলো আসলে ‘পাই-রেডিয়ান’ সিস্টেমে লেখা ছিল।

চিত্র- iii
চিত্র- iv

এখন আমরা সেই ‘পাই-রেডিয়ান’ সিস্টেমের একটা অন্যরূপ দেখাতে পারি। যেখানে আমাদের পরিচিত কোণগুলোকে লেখা হবে একটা বৃত্তের বিভিন্ন ভগ্নাংশরূপে। আর এই পদ্ধতি আমাদেরকে রেডিয়ান কোণ পরিমাপের সংজ্ঞাকে নতুনভাবে যাচাই করতে সাহায্য করবে। এখানে আমরা বৃত্তের চাপের (s) পরিবর্তে পুরো বৃত্তের পরিধির (C) ভগ্নাংশ (f)-কে লিখতে পারি। তাহলে, s = fC :

θ = s/r = fC/r = f (C/r) ≡ fτ

খেয়াল করলে দেখা যায়, খুব স্বাভাবিকভাবেই এখানে ‘টাও (τ)’ চলে এসেছে। যদি সত্যিকার অর্থেই আপনার ‘পাই’ এর প্রতি একটা অন্ধবিশ্বাস থেকে থাকে, তাহলে আমার আশঙ্কা- উপরের এই চিত্র এবং সমীকরণ আপনার সেই বিশ্বাসের মূলে একটা চিড় ধরাতে পেরেছে।

চিত্র- v

যদিও ‘টাও’ এর পক্ষে অনেক যুক্তিই রয়েছে, কিন্তু উপরের ছবিটা বোধহয় সবচেয়ে মারত্মক যুক্তি। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি Bob Palais এর সেই ‘এক চক্র’-র বাস্তব রূপ। যার সংজ্ঞাটা এখন সহজেই করা যাবে: ‘টাও’ হলোরেডিয়ান পদ্ধতিতে বৃত্তের এক চক্র পরিমাপের একটি একক। আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ‘টাও’কে মুখস্ত করার কিছু নেই। বৃত্তের বারো চক্রের একভাগ হলো τ/১২, আট চক্রের একভাগ হলো τ/৮ । তাই ‘টাও’ এর ব্যবহার আমাদেরকে বৃত্তের কোণ-ব্যাসার্ধ সম্পর্কে একটা বাস্তব ধারণা তৈরি করতে অত্যন্ত সহায়ক এবং হিসাবের নিকাশের জন্যেও সহায়ক। যেমন: τ/১২ কেবলমাত্র একটা সংখ্যাকে নির্দেশ করে-

বারো চক্রের একভাগ = τ/ ১২ ≈ ৬.২৮৩১৮৫…/১২ = ০.৫২৩৫৯৮৮…

সবশেষে আমরা আরেকবার, চিত্র-iii এবং চিত্র-v থেকে দেখে নিতে পারি যে, ২π ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝামেলাটা আসলে কোথায়। যদিও বৃত্তের এক চক্র ১τ মানে কিন্তু ২π –ই। তাই সংখ্যাগত দিক থেকে এই দুটি জিনিস এক হলেও, বাস্তবসম্মত চিন্তা করার ক্ষেত্রে ‘পাই’ এবং ‘টাও’ এর মধ্যে রয়েছে বিস্তার ফারাক।

featured image: supertv.it