ডাচ দুর্ভিক্ষ ও আমাদের জিনের গল্প

১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়। নেদারল্যান্ডসের রেলওয়ে শ্রমিকেরা নাৎসি বাহিনীর এগিয়ে যাওয়া ঠেকাতে রেলপথ অবরোধ ঘোষণা করে। শাস্তিস্বরূপ, নাৎসি বাহিনী নেদারল্যান্ডসে বিশেষ করে পশ্চিম নেদারল্যান্ডসে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ৬ সপ্তাহ পর খাদ্য নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও বিধ্বস্ত রেলওয়ে ব্যবস্থা, জার্মান বাহিনীর খাদ্য বাজেয়াপ্তকরণ, আগের চার বছরের বিরূপ আবহাওয়া- সব মিলিয়ে নেদারল্যান্ডস মুখোমুখি হয় কিছুটা প্রাকৃতিক, কিছুটা মানবসৃষ্ট এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের।

১৯৪৫ সালে নাৎসি বাহিনীর কাছ মুক্তির আগে এই দূর্ভিক্ষে ততদিন পর্যন্ত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা পরিচিত Hunger winter (The Dutch famine, 1944-45) নামে।

কিছু অপ্রত্যাশিত কারণে এই ডাচ দুর্ভিক্ষ বেশ অনন্য। এর শুরু এবং শেষ বেশ আকস্মিক ছিল। যার কারণে একে তুলনা করা যায় জনস্বাস্থ্যের উপর ঘটে যাওয়া এক অপরিকল্পিত পরীক্ষা হিসেবে। গর্ভবতী মহিলারা এসময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। দুর্ভিক্ষের শিকার এই মায়েদের গর্ভ থেকে জন্মানো শিশুরা সারাজীবন এর ছাপ বয়ে বেড়িয়েছে।

চিত্র: ডাচ দুর্ভিক্ষের এক অসহায় শিকার

বিস্ময়কর ব্যাপার হলেও সত্য, খাদ্যাভাবে জন্মানো এই শিশুরাই তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবন এসে গড়পড়তা মানুষের তুলনায় কয়েক পাউন্ড বেশি ওজন বহন করেছে। মধ্য বয়সে এসে রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাদের।

মাতৃগর্ভ থেকে দুর্ভিক্ষের প্রভাবে বড় হয়ে উঠা এসব মানুষের মধ্যবয়স কেটেছে মোটাপন, ডায়াবেটিস, সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ মোকাবেলা করে। এই ঘটনার উপর গবেষণা চালানোর জন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে বেছে নিলেন, Retrospective research পদ্ধতি, অর্থাৎ পেছনে ফিরে গিয়ে এখন পর্যন্ত লিপিবদ্ধ তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে উপসংহারে পৌঁছানো।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এল এইচ লুমেই ১৯৪০ সালে জন্মানো মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানালেন, এই দুর্ভিক্ষের সময়ে জন্মানো মানুষের মাঝে স্বাভাবিকের তুলনায় মৃত্যুহার বেশি। তবে তা ৬৮ বছর বয়স পেরোনোর পর।

কিন্ত কীভাবে একজনের শরীর তার মাতৃগর্ভের পরিবেশ মনে রেখে দিতে পারে? শুধু মনে রেখে দিতে পারে তা-ই নয়, কীভাবে এর প্রভাব এত বছর পরেও পড়তে পারে? ড. হেইমেন, ড. লুমেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে জিন সাইলেন্সিং (Gene silencing)-এর মধ্যে।

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে একইরকম জিন থাকে। সব কোষের জিনের ভেতরকার গঠন একইরকম। অর্থাৎ ধরুন, আপনার চোখের কোষের জিনের একটি অংশ বলছে, তার গঠনের সজ্জা ATCCCGTA। আবার, হাড়ের কোষের একটি জিনের একটি অংশের গঠন ATCCCGTA। একইরকম। কিন্তু তারপও চোখের কোষ আর হাড়ের কোষ তো এক নয়। কেন তবে এই পার্থক্য? এক হয়েও কেন এক নয়?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে এপিজেনেটিক্সের মধ্যে। আমাদের দেহের ডিএনএ কিন্তু খুব সহজ-সরল লাঠির মতো আমাদের দেহে শুয়ে নেই। বরং তাদের অবস্থা অনেকটা স্প্রিংয়ের কুণ্ডলীর মতো। আমরা যখন বলি অমুক কোষে এই জিন প্রকাশিত নয়, তখন আসলে কী বোঝানো হয়? এই জিনের expression নেই বা এই জিন silenced বলতে আমরা বোঝাই এই জিন কোনো প্রোটিন তৈরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। Gene silencing অথবা expression অনেকভাবেই হতে পারে, যার মধ্যে একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে, ডিএনএ মিথাইলেশন।

ধরে নেওয়া যাক, এক একটি মিথাইল (CH3-) গ্রুপ এক একটি পাথরের মতো (পরবর্তী পৃষ্ঠার চিত্র খেয়াল করুন)। DNA-র জায়গায় জায়গায় এই পাথর বসতে পারে। যখন DNA-র উপর এই পাথর চেপে বসে তখন এই কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা DNA-র কুণ্ডলী কিছুটা খুলে যায়। ফলে বাইরের প্রোটিনের সাথে আর যোগাযোগ করতে পারে না। এই যোগাযোগহীনতার ফলশ্রুতিতে DNA বাইরের কিছু বিশেষ প্রোটিনের সাথে মিলেমিশে আর কাজ করতে পারে না। তাই আর নতুন প্রোটিনও তৈরী হয় না।

আবার ফিরে আসি ডাচ দুর্ভিক্ষের গল্পে। বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারে কাজ করতে শুরু করেছিলেন সেই ১৯৯০ সাল থেকে। ড. লুমেই ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় জন্মানো তৎকালীন মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের কাছ থেকে রক্ত নিলেন। তুলনামূলক পরীক্ষার জন্য আরো রক্ত নিলেন দুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মানো তাদের ভাইবোনদের। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রক্ত থেকে ডিএনএ নিয়ে তারা মনোযোগ দিলেন DNA-র কোথায় কেমন মিথাইলেশন ঘটেছে তা দেখায়।

তারা খুঁজছিলেন এমন কোনো জায়গায় কোনোভাবে মিথাইলেশন হয়েছে কিনা যা দুর্ভিক্ষের সময় জন্মগ্রহণকারীদুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মগ্রহণকারীর মধ্যে আলাদা। পেয়েও গেলেন তারা এরকম। যেমন- দুর্ভিক্ষের সময় জন্ম নেয়া লোকদের মাঝে এক মিথাইল গ্রুপ পাওয়া গেলো যারা PIM3 জিনের প্রকাশে বাধা দেয়। এই PIM3 জিন শরীরের ক্যালরি খরচে কাজ করে, এই জিন কাজ করতে না পারার ফলে ক্যালরি খরচ হয় না এবং ওজন বেড়ে যায়।

চিত্র: উপরের অংশে দেখা যাচ্ছে কুণ্ডলী পাকানো ডিএনএ কিছুটা খুলে এক বিশেষ প্রোটিন (সবুজ বর্ণের, RNA polymerase II) এর সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। ফলে জিনের প্রকাশ বা ট্রান্সক্রিপশন ঘটছে। ফলে RNA এবং পরবর্তীতে প্রোটিন তৈরী হবে।

নীচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে মিথাইলেশনের কারণে (ছোট ছোট গাঢ় ডট) DNA খুব শক্তভাবে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে, ফলে কোনো প্রোটিন (ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর) তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। যার কারণে কোনো RNA এবং প্রোটিন তৈরি হচ্ছে না।

তাই তত্ত্ব এই দাঁড়ালো যে, ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মায়ের গর্ভে থাকা শিশুর PIM3 জিনে মিথাইলগ্রুপ যোগ হয়, যা PIM3 জিনকে কম সক্রিয় বানায় এবং যা চলতে থাকে পুরো জীবন জুড়ে। ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় প্রচুর গর্ভপাত, অকাল মৃত্যু ঘটেছে। হয়তোবা যেসব শিশু তখন সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ করতে পেরেছে তাদের জিনে এই এপিজেনেটিক্স বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু বদল ঘটাতে পেরেছিল যার কারণে তাদের এই বেঁচে থাকা সম্ভব হয়েছে।

যেমন- যদি আপনি কম খাদ্য পান তবে কি কম ক্যালরি খরচ করতে পারা নাকি স্বাভাবিকভাবে ক্যালরি খরচ করতে পারা হবে আপনার জন্য সুবিধাজনক? ভেবে দেখুন।

তবে এখনো এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এখনো আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম এ ব্যাপারে নতুন সংবাদ শোনার জন্য।

তথ্যসূত্র

https://nytimes.com/2018/01/31/science/dutch-famine-genes.html

featured image: myajc.com

ভালোবাসা- শারীরবৃত্তীয় রাসায়নিক প্রক্রিয়া ছাড়া যা আর কিছুই নয়

“তোমরা যে বলো দিবস রজনী, ভালোবাসা, ভালোবাসা
সখী ভালোবাসা কারে কয়?”

‘তোরা যে যা বলিস ভাই’ ভালোবাসা কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা শারীরবৃত্তীয় রাসায়নিক প্রক্রিয়া ছাড়া তেমন কিছু না। বিশ্বাস হচ্ছে না? চলুন তাহলে ঘুরে আসি এক লম্বা সফরে। বিজ্ঞানীগণ ভালোবাসা নিয়ে কী বলেন-জেনে আসি। তবে এই যাত্রায় যাওয়ার আগেই বলে রাখি আমরা এই যাত্রাপথক প্রেমের আবেগ, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের উদ্দীপতা এবং হরমোনঘটিত পরিবর্তন অনুযায়ী তিন পর্বে ভাগ করে তবেই এগুচ্ছি।

প্রথম পর্বঃ প্রেমে পড়া বা “পলক তবু কেনো আর পড়ে না” ধাপ

আপনাদের ঐ গল্পটা জানা আছে? ঐ যে এক ছাত্র পরীক্ষার জন্য শিখে গেলো ‘ধান’ রচনা, কিন্তু পরীক্ষায় আসলো ‘রেলভ্রমণ’। ছাত্র লেখা শুরু করলো, “রেলে চড়ে আমরা একবার মামাবাড়ি গিয়েছিলাম। আদিগন্ত বিস্তৃ্ত ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে চলার সময় রেল লাইনচ্যুত হয়ে পড়লো ধানক্ষেতের মাঝে। সোনালী রঙ্গে ভরা সেই ধানক্ষেত হরেক ধানে পরিপূর্ণ। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-আউশ, আমন, বিরি ইত্যাদি। এই ধান আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। ….”

image source: theconversation.com

প্রেমের প্রথমদিকে মানুষের আচরণও ঠিক এই রকমই হয়ে যায়। নিজে প্রেমে পড়লে বা ঘনিষ্ঠ কোনো প্রেমাক্রান্ত বন্ধুকে লক্ষ্য করলে দেখবেন, এই সময় আমরা/তারা নিজের ভালোবাসার মানুষটার কথা বলা বা ভাবা ছাড়া আর তেমন কিছু করতে পারে না। এই সময়টায় প্রতিদিনকার ছোটোখাট কাজকর্মে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়াটাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

ব্যাপারটা আমাদের আমজনতার কাছে যতটা রোমান্টিক, স্নায়ুবিজ্ঞানীদের কাছে ঠিক ততটাই মানসিক অসংলগ্নতার সমার্থক। এমনকি অনেক বিজ্ঞানীরা ভালোবাসাবাসির প্রথম প্রহরগুলোকে Obsessive Compulsive disorder নামক খটোমটো মানসিক ব্যাধির সাথে তুলনা করতেও পিছপা হন না।

এ তো গেলো কথার কথা, কিন্তু আসলেই কি বিজ্ঞানীদের কাছে এ ব্যাপারে প্রমাণ আছে? দুঃখের কথা হচ্ছে, আছে। বিজ্ঞানী ভন স্টিন-বার্গেন এবং তার দল ৪৩ জন সদ্য প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন এমন ছাত্র-ছাত্রীর (২৩ জন ছাত্রী, ২০ জন ছাত্র) উপর পরীক্ষা চালান। তারা কী গভীর প্রেমে নিমগ্ন তা বুঝতে প্রথমে বিজ্ঞানীরা সাহায্য নেন Passionate Love scale এর।

হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, এরকম একটা স্কেল আছে বৈকী! এরপর আসল পরীক্ষায় যাবার আগে পরীক্ষণের পাত্রদের কিছু রোমান্টিক গান শোনানো হয় এবং তাদের সঙ্গীর সাথে কাটানো ভালো মুহূর্তগুলোর কথা ভাবতে বলা হয়। সকল ভাবাভাবি, গান শোনানো শেষে তাদের কিছু কাজ করতে দেওয়া হয় যেখানে তাদের নিজ নিজ চিন্তাশক্তি ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অসংখ্য অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য, সংখ্যা, চিহ্নের ভেতর থেকে সংগতিপূর্ণ সবকিছু বেছে নিতে হবে। এই পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, যারা Passionate Love scale এ উচ্চ নম্বর প্রাপ্ত তারা চিন্তাশক্তি ব্যবহার করে কাজ করতে তুলনামূলক অপারদর্শী।

এখন কি আপনি ভয় পেয়ে পুরো প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা শুরু করছেন? ভয় পাওয়ার কিছু নেই। “Nothing lasts forever….” আপনি সময়ের সাথে সাথে যত বেশি সম্পর্কের পরিপক্কতার দিকে এগুবেন, ততই আপনার বোধশক্তি ব্যবহার করে কাজ করার ক্ষমতা পুনরায় আগের মতো হয়ে পড়বে।
এই যে প্রথমের আকুলি-বিকুলি প্রেম, তারপর সময়ের সাথে সাথের স্বাভাবিকতা- এখানে কিউপিডের ভূমিকা কোথায় বলুন তো? উত্তর হচ্ছে, মানব প্রেমের ক্ষেত্রে এই ভালোবাসার তীর হাতে কিউপিড দেবতার কোনো ভূমিকাই নেই।

আপনার এই সমস্ত অভিজ্ঞতার নিয়ন্ত্রক আপনার মস্তিষ্ক, যা এই কাজটা করে হরমোন নামক কিছু রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে। হরমোন সম্পর্কে সবাই মোটামুটি কম বেশি জানি, তাও কিছুটা বলে রাখি। হরমোন হচ্ছে আমাদের শরীরের বিভিন্ন রস বা কেমিক্যাল যা শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তনকালে পরিমাণগতভাবে পরিবর্তিত হয়। অথবা বলা যায় এদের পরিমাণগত পরিবর্তনের কারণে শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে।

প্রেমের প্রথম দিকে কর্টিসল নামক হরমোনের প্রভাব খুব বেশি থাকে। এই হরমোন নতুন বা অপরিচিত কিছু গ্রহণ করার প্রাথমিক যে ভীতি তা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। এই সময় সেরোটোনিন নামক এক নিউরোট্রান্সমিটারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ভালোবাসার প্রথম প্রহরের আচ্ছন্নতার পিছনে সেরোটোনিনের পরিমাণ কমে যাওয়া বড়ো কালপ্রিট হিসেবে কাজ করে। এমনকি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের পরীক্ষাও এই ঘটনার পক্ষে সাক্ষী দেয়। ফ্রন্টাল কর্টেক্স নামক মস্তিষ্কের অঞ্চল এই সময় হ্রাসকৃত কার্যক্ষমতা দেখায়, যা আপনাকে আপনার সঙ্গীর আচরণ ও চরিত্র সঠিকভাবে যাচাই করার ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে; পড়িয়ে রাখে আপনাকে একটি রঙিন চশমা।

দ্বিতীয় ধাপঃ আবেগপূর্ণ ভালোবাসা

এই ধাপটা ভালোবাসার কিছুটা অস্থির পর্যায়ের পর কিছুটা স্থিরতা এনে দেয়। এই সময় সম্পর্কের মাঝে নিরাপত্তা, দৃঢ়তা আর ভারসাম্য আসে। আবেগ থাকে; সাথে সাথে ঘনিষ্টতা। এই সময়ে অঙ্গীকার বাড়ে। একদিকে কর্টিসল, সেরোটোনিনের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে আসে, অন্যদিকে অক্সিটোসিন আর ভেসোপ্রেসিনের পরিমাণ বাড়তে থাকে।

এই অক্সিটোসিন আর ভেসোপ্রেসিন করে টা কী? পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে নিঃসরণের পর এই হরমোনগুলো মস্তিষ্কের বিভিন্ন রিসেপ্টরের বা গ্রাহক প্রোটিনের সাথে বন্ধন তৈরি করতে চায়। ভেসোপ্রেসিন আর অক্সিটোসিনের রিসেপ্টর বা গ্রাহক প্রোটিনগুলো থাকে মস্তিষ্কের এমন এক অঞ্চলে যা ভালো লাগার অনুভূতি তৈরির জন্য কাজ করে। যখন এই হরমোন আর রিসেপ্টরের মিলন ঘটে, ডোপামিন নামে আরেকটি নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ হয় এবং প্রেমিক যুগল আনন্দ, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরে উঠে।

অক্সিটোসিন আর ভেসোপ্রেসিন যে একদম একই কাজ করে তা কিন্তু না। নারীদের অক্সিটোসিন তুলনামূলক বেশি থাকে এবং তা সঙ্গীর সাথে নিবিড় বন্ধনে জড়াতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, পুরুষদের বেশি থাকে ভেসোপ্রেসিন, যা কিনা যেকোনো ভীতিকর ও চাপদায়ক পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাহায্য করে।
একটু চিন্তা করলে বুঝতে পারবেন, এই হরমোনগুলো আদিকাল থেকে চলে আসা মাতা-পিতা-সন্তানের ভালোবাসার পেছনেও ভূমিকা রাখতো। যেখানে মা বাচ্চার যত্ন নিতেন এবং বাবা বাচ্চার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করতেন।

তৃতীয় ধাপঃ “আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে” ধাপ

সব সম্পর্ক অবশ্য বিষাদে শেষ হয় না। তবে আজ আমরা এই দিকটা নিয়েই একটু আলোচনা করি। আপনাদের কখনো এমন হয়েছে- দীর্ঘ দিনের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ায় বুকে ব্যথা? (গায়ক আসিফের গানের বুকের ব্যথা না, আক্ষরিক অর্থেই বুকের ব্যথা) এমনটি হয়ে থাকলে জেনে রাখুন, এ আপনাদের মনের ভুল নয়। বিজ্ঞানীরা আমাদের জানাচ্ছেন, শারীরিক ব্যথার সময় মস্তিষ্কের যে নেটওয়ার্কগুলো কাজ করে মানসিক ব্যথার সময়ও ঠিক একই নেটওয়ার্ক উদ্দীপ্ত হয়, তাই তখন এরকম বুকে ব্যথা হতে পারে, যা মোটে ও “বাজিলো বুকে সুখের মতন ব্যথা” নয়। যেকোনো বিষয়ে বিলম্বে সাড়া দেওয়ার মতো মানসিক পরিবর্তনও ঘটে এ সময়। কর্টিসল, এ্যাড্রেনালিনের মতো কিছু স্ট্রেস হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ক্লিনিকাল ডিপ্রেশনের ঝুকিতে ভুগতে থাকেন বেশিরভাগ বিষাদগ্রস্ত যুবক-যুবতী।

অনেক হলো ভালোবাসার বৈজ্ঞানিক ব্যাখার গল্প। এখন ভালোবাসার ত্রিভুজতত্ত্বের প্রবক্তা স্টার্নবার্গের একটি মতামত দিয়ে শেষ করি। চিরস্থায়ী সুখের ভালোবাসার সম্পর্ক নির্ভর করে আবেগ, ঘনিষ্টতা এবং অঙ্গীকার- এই তিনটিকে কাজে রূপান্তর করার মধ্যে। শুভকামনা সবার জন্য।

সম্মোহনের অন্য দিক

বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ ২০০১ সালে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাইকেল নাশকে সম্মোহনবিদ্যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রবন্ধ লেখার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল। পাশাপাশি অপবিজ্ঞানের প্রতি সোচ্চার এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের প্রতি ভালোবাসা ধারণকারী এই বিজ্ঞান সাময়িকীটি ড. নাশকে এই বলেও সাবধান করে দেয় যে, তারা ছাপানোর আগে এই প্রবন্ধটির যথার্থতা হাতে কলমে যাচাই করে দেখবে। যেই কথা সেই কাজ। ড. নাশ এবং মনোবিজ্ঞান গবেষক গ্রান্ট বেনহাম একেবারে উড়ে আসলেন সায়েন্টিফিক আমেরিকানের নিউ ইয়র্ক কার্যালয়ে, হাতে কলমে সাময়িকীটির কর্মচারীদের সম্মোহনের অভিজ্ঞতা দিতে। এরপর যা ঘটলো তা ঐখানকার বিজ্ঞানপিপাসুদের মোটেও কাম্য ছিল না।

ছয়জন কর্মচারীর তিনজন পুরুষ, তিনজন মহিলা- সবাইকেই সম্মোহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন দুই গবেষক। ঘটনাটি প্রমাণ দিচ্ছে সম্মোহনবিদ্যা শুধুমাত্র সিনেমা বা টিভি পর্দায় আবদ্ধ নয়, বাস্তব জীবনেও এর ভিত্তি আছে।

সম্মোহনের একদম কেতাবী সংজ্ঞায় যাওয়ার আগে আসুন দেখে নেই, সম্মোহিত অবস্থায় কী কী ঘটে আর কী কী ঘটে না। সম্মোহন পরিমাপের একটি স্কেল আছে Stanford Hypnotic Susceptibility Scales। এই স্কেল ০ থেকে ১২ পর্যন্ত স্কোর করা। স্কোর দেয়া হয় যেকোনো ১২ টি কাজের ভিত্তিতে। যেমন সম্মোহনের মাত্রা নির্ধারণের পরীক্ষার একটি সংস্করণে একদম কম স্কোরের একটি কাজ ছিল দুই হাত ছড়িয়ে বসে থাকা, আর বেশি স্কোরের সম্মোহিত অবস্থার মধ্যে ছিল অদৃশ্য বোতল থেকে গন্ধ শোঁকার চেষ্টা। একটি পরীক্ষায় সম্মোহিত ব্যক্তিদের বলা হলো, তারা একটি ভারী বল ধরে আছে, এবং যাদের

হাত অদৃশ্য ভারী বল নেবার কারণে ঝুঁকে পড়লো তাদের ‘পাশ মার্ক’ দেওয়া হলো। আরেকটি পরীক্ষায় পরীক্ষণ পাত্রদের বলা হলো, তাদের গন্ধ অনুধাবন করার মতো কোনো শক্তি নেই। তারপর তাদের সামনে অ্যামোনিয়ার বোতল খোলা হলো। যাদের ধারণা নেই অ্যামোনিয়ার গন্ধ কেমন, তাদের গণশৌচাগারের সামনে কিছুক্ষণ অবস্থানের অনুরোধ জানাচ্ছি! পরীক্ষার লোকদের মাঝে যাদের এই কড়া গন্ধেও কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না তাদের বলা হলো ‘উচ্চমাত্রায় সম্মোহিত’।

কেউ কি Stanford Hypnotic Susceptibility Scales এ স্কোর ১২ তুলতে সক্ষম? আমরা আবার ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ এর কর্মচারীদের উপর চালানো পরীক্ষায় ফিরে যাই। এই পরীক্ষায় একজন সর্বোচ্চ স্কোর ১২ করেছিলেন। ১২ প্রাপ্ত ব্যক্তি কোন পর্যায়ে সম্মোহিত হয়েছিলেন? তার সম্মোহিত অবস্থায় কী ঘটেছিল তা পরে আর মনে করতে পারেননি তিনি। কারণ, সম্মোহনকারী তাকে সম্মোহিত অবস্থায় তার করা যাবতীয় কাজ ভুলে যেতে প্রণোদনা (Suggestion) দিয়েছিলেন। সম্মোহনের এমন উচ্চমাত্রা অর্জন খুবই বিরল। বেশিরভাগ মানুষই সম্মোহিত অবস্থা শেষ হবার পর ঠিকই মনে করতে পারেন, তারা ঐ সময় কী কী করতে পেরেছিলেন বা পারেননি।

আমাদের উপর সম্মোহনের প্রভাব কেমন? বেশিরভাগ মানুষ Stanford Hypnotic Susceptibility Scales এ ৫-৭ স্কোর (মাঝারী পর্যায়) তুলতে সক্ষম। ৯৫% মানুষ ন্যূনতম স্কোর ১ তুলতে সক্ষম। অর্থাৎ আমাদের সকলেই মোটামুটি কিছু পরিমাণ সম্মোহনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে সক্ষম। খুব কম সংখ্যক মানুষ সর্বোচ্চ স্কোর ১২ তুলতে পারেন। যেমন- পূর্বে আলোচিত পরীক্ষায় ৬ জনের মধ্যে মাত্র ১ জন সর্বোচ্চ স্কোরের অধিকারী।

আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, আসলে সম্মোহনের কোনো ব্যাপারই নেই। সবই স্রেফ ধাপ্পাবাজি, অভিনয়। বিজ্ঞানীদের মনেও এই সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল। তাই তারা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্কের স্ক্যান করার ব্যবস্থা করলেন। এতে দেখা গেল, যারা আসলেই সম্মোহিত হয়েছে তাদের মস্তিষ্কে কিছু অঞ্চল, যেমন ডান সেরেবেলাম, বাম থ্যালামাস অঞ্চলে পরিবর্তন দেখা যায়। যারা সম্মোহনের ভান ধরে তাদের মস্তিষ্কে এই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় না। তাই ব্যাপারটি ভালোভাবে বিবেচনা করে দেখুন।

এবার আপনাদের বোঝার সুবিধার জন্য একটি কেতাবী সংজ্ঞা দেই। বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুসারে, সম্মোহিত অবস্থা আমাদের চেতন মনেরই একটা অবস্থা যেখানে কোনো বিষয়ের প্রতি আমাদের অখণ্ড কেন্দ্রীভুত মনোযোগ থাকে। এই সময় আশেপাশের অন্যান্য ভাবনা কমে যায় এবং এই আবিষ্ট অবস্থায় অন্যের Suggestion গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়ে। সম্মোহিত অবস্থার সাথে মনোযোগ দিয়ে বই পড়া বা টিভি দেখার মিল আছে। মনে করে দেখুন তো প্রিয় কোনো বইয়ে ডুবে গেলে আপনার আশেপাশের জগত সংসারের কথা খেয়াল থাকে কিনা? সম্মোহন ব্যাপারটিও এরকম।

সম্মোহিত অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের অবস্থা বুঝতে একটি উদাহরণ দেই। পরীক্ষার একটি অংশ আপনি নিজেই করতে পারেন। একটি খাতায় লাল কালি দিয়ে লিখুন ‘নীল’ আর নীল কালি দিয়ে লিখুন ‘লাল’, এভাবে আরো কয়েকটি রঙের নাম লিখবেন, তবে ভিন্ন রঙের কালি দিয়ে। এখন আপনার কোনো এক বন্ধুকে ডেকে কী রঙের নাম লেখা পড়তে বলুন। কাজটি যতটা সহজ ভাবছেন, ততটা সহজ কিন্তু নয়। আমাদের মস্তিষ্ক দ্বন্দে পড়ে যায় এসময় সঠিক রঙটি বলার ক্ষেত্রে। এখন, যদি রঙের নাম ইংরেজি বা বাংলায় না হয়ে আপনার অজানা কোনো ভাষায় লেখা হতো তাহলে কিন্তু আপনি বা আপনার বন্ধু মোটেও কোনো ঝামেলায় পড়তেন না।

একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, কিছু স্বেচ্ছাসেবককে সম্মোহিত করে বলা হয়েছিল, “এখানে লেখা শব্দগুলোর কোনো অর্থ নেই, এগুলো সোজা বাংলায় হিজিবিজি হিজিবিজি”। তারপর তাদের কাছ থেকে রঙগুলোর নাম জানতে চাওয়া হলো। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরাও বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে রঙ দেখেই বলে দিলেন। কী লেখা আছে তার ধারেকাছেও গেলেন না। এরকম হবার কারণ কী? স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের শব্দ পড়ার স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া আর চটজলদি রঙ বলতে চাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে যায়।

অপরদিকে, সম্মোহিত অবস্থায় আপনার কাছ থেকে যখন রঙের নাম জানতে চাওয়া হয়, তখনকার মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে দেখা গেছে, এসময় Angulate Cingulate Cortex অঞ্চল অপেক্ষাকৃত কম উদ্দীপনা দেখায়। এই অঞ্চলটি এমন দুই দিকের দ্বন্দ্ব নিরসনে ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি, Visual Cortex-ও কম উদ্দীপ্ত হয়। লিখিত শব্দ চেনার কাজে ভিজুয়াল কর্টেক্স দরকার হয়।

সম্মোহন কী তা নিয়ে অনেক বলা হলো, এবার দেখি সম্মোহন বা সম্মোহিত অবস্থা কী নয় তা নিয়ে।

সম্মোহন কল্পনাশক্তির উপর নির্ভর করে না। আপনার কল্পনাশক্তি ভালো, তার অর্থ এই নয় আপনি সম্মোহনের স্কেলে বেশি স্কোর তুলতে পারবেন। সম্মোহিত হবার জন্য আপনাকে শুয়ে বা বসে থাকতে হবে না। স্থির বাইসাইকেল চালানো অবস্থায়ও অনেক ব্যক্তিকে সম্মোহনের জালে আটকানো সম্ভব হয়েছে। সম্মোহিত ব্যক্তি নিজের মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে অনেক কাজ করতে পারেন- এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে, এটিও সম্পূর্ণ ভুল।

সম্মোহন কী কাজে লাগতে পারে? সম্মোহন দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কমাতে কার্যকর। International Journal of Clinical and Experimental Hypnosis-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সম্মোহনের মাধ্যমে দেয়া প্রণোদনায় ২৭ টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৩৩ জন পরীক্ষণ-পাত্রের প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যথা কমাতে সক্ষম হয়েছেন। তবে, সম্মোহন কখনোই একক চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। একজন রোগীর অবশ্যই আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজন অনুসারে অন্যান্য চিকিৎসার পাশাপাশি এর সাহায্য নেওয়া যাবে কিনা তা একমাত্র চিকিৎসকই ঠিক করে দিবেন।

তথ্যসূত্র

  1. The Truth and Hype of Hypnosys, Scientific American, July, 2001
  2. Watch: Does Hypnotysm has any scientific basis? Sciencealart, 19 Nov, 2015

     

সম্মোহনের অন্য দিক

বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ ২০০১ সালে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাইকেল নাশকে সম্মোহনবিদ্যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রবন্ধ লেখার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল। পাশাপাশি অপবিজ্ঞানের প্রতি সোচ্চার এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের প্রতি ভালোবাসা ধারণকারী এই বিজ্ঞান সাময়িকীটি ড. নাশকে এই বলেও সাবধান করে দেয় যে, তারা ছাপানোর আগে এই প্রবন্ধটির যথার্থতা হাতে কলমে যাচাই করে দেখবে। যেই কথা সেই কাজ। ড. নাশ এবং মনোবিজ্ঞান গবেষক গ্রান্ট বেনহাম একেবারে উড়ে আসলেন সায়েন্টিফিক আমেরিকানের নিউ ইয়র্ক কার্যালয়ে, হাতে কলমে সাময়িকীটির কর্মচারীদের সম্মোহনের অভিজ্ঞতা দিতে। এরপর যা ঘটলো তা ঐখানকার বিজ্ঞানপিপাসুদের মোটেও কাম্য ছিল না।

ছয়জন কর্মচারীর তিনজন পুরুষ, তিনজন মহিলা- সবাইকেই সম্মোহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন দুই গবেষক। ঘটনাটি প্রমাণ দিচ্ছে সম্মোহনবিদ্যা শুধুমাত্র সিনেমা বা টিভি পর্দায় আবদ্ধ নয়, বাস্তব জীবনেও এর ভিত্তি আছে।

সম্মোহনের একদম কেতাবী সংজ্ঞায় যাওয়ার আগে আসুন দেখে নেই, সম্মোহিত অবস্থায় কী কী ঘটে আর কী কী ঘটে না। সম্মোহন পরিমাপের একটি স্কেল আছে Stanford Hypnotic Susceptibility Scales। এই স্কেল ০ থেকে ১২ পর্যন্ত স্কোর করা। স্কোর দেয়া হয় যেকোনো ১২ টি কাজের ভিত্তিতে। যেমন সম্মোহনের মাত্রা নির্ধারণের পরীক্ষার একটি সংস্করণে একদম কম স্কোরের একটি কাজ ছিল দুই হাত ছড়িয়ে বসে থাকা, আর বেশি স্কোরের সম্মোহিত অবস্থার মধ্যে ছিল অদৃশ্য বোতল থেকে গন্ধ শোঁকার চেষ্টা। একটি পরীক্ষায় সম্মোহিত ব্যক্তিদের বলা হলো, তারা একটি ভারী বল ধরে আছে, এবং যাদের

হাত অদৃশ্য ভারী বল নেবার কারণে ঝুঁকে পড়লো তাদের ‘পাশ মার্ক’ দেওয়া হলো। আরেকটি পরীক্ষায় পরীক্ষণ পাত্রদের বলা হলো, তাদের গন্ধ অনুধাবন করার মতো কোনো শক্তি নেই। তারপর তাদের সামনে অ্যামোনিয়ার বোতল খোলা হলো। যাদের ধারণা নেই অ্যামোনিয়ার গন্ধ কেমন, তাদের গণশৌচাগারের সামনে কিছুক্ষণ অবস্থানের অনুরোধ জানাচ্ছি! পরীক্ষার লোকদের মাঝে যাদের এই কড়া গন্ধেও কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না তাদের বলা হলো ‘উচ্চমাত্রায় সম্মোহিত’।

কেউ কি Stanford Hypnotic Susceptibility Scales এ স্কোর ১২ তুলতে সক্ষম? আমরা আবার ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ এর কর্মচারীদের উপর চালানো পরীক্ষায় ফিরে যাই। এই পরীক্ষায় একজন সর্বোচ্চ স্কোর ১২ করেছিলেন। ১২ প্রাপ্ত ব্যক্তি কোন পর্যায়ে সম্মোহিত হয়েছিলেন? তার সম্মোহিত অবস্থায় কী ঘটেছিল তা পরে আর মনে করতে পারেননি তিনি। কারণ, সম্মোহনকারী তাকে সম্মোহিত অবস্থায় তার করা যাবতীয় কাজ ভুলে যেতে প্রণোদনা (Suggestion) দিয়েছিলেন। সম্মোহনের এমন উচ্চমাত্রা অর্জন খুবই বিরল। বেশিরভাগ মানুষই সম্মোহিত অবস্থা শেষ হবার পর ঠিকই মনে করতে পারেন, তারা ঐ সময় কী কী করতে পেরেছিলেন বা পারেননি।

আমাদের উপর সম্মোহনের প্রভাব কেমন? বেশিরভাগ মানুষ Stanford Hypnotic Susceptibility Scales এ ৫-৭ স্কোর (মাঝারী পর্যায়) তুলতে সক্ষম। ৯৫% মানুষ ন্যূনতম স্কোর ১ তুলতে সক্ষম। অর্থাৎ আমাদের সকলেই মোটামুটি কিছু পরিমাণ সম্মোহনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে সক্ষম। খুব কম সংখ্যক মানুষ সর্বোচ্চ স্কোর ১২ তুলতে পারেন। যেমন- পূর্বে আলোচিত পরীক্ষায় ৬ জনের মধ্যে মাত্র ১ জন সর্বোচ্চ স্কোরের অধিকারী।

আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, আসলে সম্মোহনের কোনো ব্যাপারই নেই। সবই স্রেফ ধাপ্পাবাজি, অভিনয়। বিজ্ঞানীদের মনেও এই সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল। তাই তারা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্কের স্ক্যান করার ব্যবস্থা করলেন। এতে দেখা গেল, যারা আসলেই সম্মোহিত হয়েছে তাদের মস্তিষ্কে কিছু অঞ্চল, যেমন ডান সেরেবেলাম, বাম থ্যালামাস অঞ্চলে পরিবর্তন দেখা যায়। যারা সম্মোহনের ভান ধরে তাদের মস্তিষ্কে এই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় না। তাই ব্যাপারটি ভালোভাবে বিবেচনা করে দেখুন।

এবার আপনাদের বোঝার সুবিধার জন্য একটি কেতাবী সংজ্ঞা দেই। বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুসারে, সম্মোহিত অবস্থা আমাদের চেতন মনেরই একটা অবস্থা যেখানে কোনো বিষয়ের প্রতি আমাদের অখণ্ড কেন্দ্রীভুত মনোযোগ থাকে। এই সময় আশেপাশের অন্যান্য ভাবনা কমে যায় এবং এই আবিষ্ট অবস্থায় অন্যের Suggestion গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়ে। সম্মোহিত অবস্থার সাথে মনোযোগ দিয়ে বই পড়া বা টিভি দেখার মিল আছে। মনে করে দেখুন তো প্রিয় কোনো বইয়ে ডুবে গেলে আপনার আশেপাশের জগত সংসারের কথা খেয়াল থাকে কিনা? সম্মোহন ব্যাপারটিও এরকম।

সম্মোহিত অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের অবস্থা বুঝতে একটি উদাহরণ দেই। পরীক্ষার একটি অংশ আপনি নিজেই করতে পারেন। একটি খাতায় লাল কালি দিয়ে লিখুন ‘নীল’ আর নীল কালি দিয়ে লিখুন ‘লাল’, এভাবে আরো কয়েকটি রঙের নাম লিখবেন, তবে ভিন্ন রঙের কালি দিয়ে। এখন আপনার কোনো এক বন্ধুকে ডেকে কী রঙের নাম লেখা পড়তে বলুন। কাজটি যতটা সহজ ভাবছেন, ততটা সহজ কিন্তু নয়। আমাদের মস্তিষ্ক দ্বন্দে পড়ে যায় এসময় সঠিক রঙটি বলার ক্ষেত্রে। এখন, যদি রঙের নাম ইংরেজি বা বাংলায় না হয়ে আপনার অজানা কোনো ভাষায় লেখা হতো তাহলে কিন্তু আপনি বা আপনার বন্ধু মোটেও কোনো ঝামেলায় পড়তেন না।

একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, কিছু স্বেচ্ছাসেবককে সম্মোহিত করে বলা হয়েছিল, “এখানে লেখা শব্দগুলোর কোনো অর্থ নেই, এগুলো সোজা বাংলায় হিজিবিজি হিজিবিজি”। তারপর তাদের কাছ থেকে রঙগুলোর নাম জানতে চাওয়া হলো। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরাও বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে রঙ দেখেই বলে দিলেন। কী লেখা আছে তার ধারেকাছেও গেলেন না। এরকম হবার কারণ কী? স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের শব্দ পড়ার স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া আর চটজলদি রঙ বলতে চাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে যায়।

অপরদিকে, সম্মোহিত অবস্থায় আপনার কাছ থেকে যখন রঙের নাম জানতে চাওয়া হয়, তখনকার মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে দেখা গেছে, এসময় Angulate Cingulate Cortex অঞ্চল অপেক্ষাকৃত কম উদ্দীপনা দেখায়। এই অঞ্চলটি এমন দুই দিকের দ্বন্দ্ব নিরসনে ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি, Visual Cortex-ও কম উদ্দীপ্ত হয়। লিখিত শব্দ চেনার কাজে ভিজুয়াল কর্টেক্স দরকার হয়।

সম্মোহন কী তা নিয়ে অনেক বলা হলো, এবার দেখি সম্মোহন বা সম্মোহিত অবস্থা কী নয় তা নিয়ে।

সম্মোহন কল্পনাশক্তির উপর নির্ভর করে না। আপনার কল্পনাশক্তি ভালো, তার অর্থ এই নয় আপনি সম্মোহনের স্কেলে বেশি স্কোর তুলতে পারবেন। সম্মোহিত হবার জন্য আপনাকে শুয়ে বা বসে থাকতে হবে না। স্থির বাইসাইকেল চালানো অবস্থায়ও অনেক ব্যক্তিকে সম্মোহনের জালে আটকানো সম্ভব হয়েছে। সম্মোহিত ব্যক্তি নিজের মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে অনেক কাজ করতে পারেন- এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে, এটিও সম্পূর্ণ ভুল।

সম্মোহন কী কাজে লাগতে পারে? সম্মোহন দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কমাতে কার্যকর। International Journal of Clinical and Experimental Hypnosis-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সম্মোহনের মাধ্যমে দেয়া প্রণোদনায় ২৭ টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৩৩ জন পরীক্ষণ-পাত্রের প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যথা কমাতে সক্ষম হয়েছেন। তবে, সম্মোহন কখনোই একক চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। একজন রোগীর অবশ্যই আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজন অনুসারে অন্যান্য চিকিৎসার পাশাপাশি এর সাহায্য নেওয়া যাবে কিনা তা একমাত্র চিকিৎসকই ঠিক করে দিবেন।

তথ্যসূত্র

  1. The Truth and Hype of Hypnosys, Scientific American, July, 2001
  2. Watch: Does Hypnotysm has any scientific basis? Sciencealart, 19 Nov, 2015