বিজ্ঞানের জগতে স্নায়ু যুদ্ধ

শীতল যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে স্কুলের একটা স্মৃতি মনে পড়লো। স্কুলে বন্ধু ফুয়াদ আর রোহান ছিল আমাদের ব্যাচের দুই ‘বিগ বয়’। দুজনের দ্বৈরথ ছিল দেখার মতো। সরাসরি মারামারিতে যদিও কখনো জড়ায়নি, কিন্তু সব ক্ষেত্রেই ছিল তুমুল প্রতিযোগিতা। ক্লাসে প্রথম হওয়া থেকে শুরু করে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান প্রজেক্ট সহ সব কিছুতেই ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী’ ধরনের মনোভাব।

এছাড়া আমরা যারা সাধারণ ছাত্র ছিলাম, তাদের মধ্যেও অলিখিতভাবে তারা গড়ে তুলেছিল দুটি দল। কোনো বিষয়ে রোহান কারো পক্ষে, তো ফুয়াদ বিপক্ষে। আমরা কেউ কখনো যদি ফুয়াদের সাথে বেশি মিশতাম, তো সাথে সাথে রোহানের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ। ওদের এই কট্টর বিরোধকে আমরা আড়ালে-আবডালে স্নায়ু যুদ্ধ বলে ডাকতাম। অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ু যুদ্ধের চেয়ে ওদের এ দ্বৈরথও খুব একটা ব্যতিক্রম ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে একইসাথে পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের। এই দুই পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে নিজস্ব অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রচারণা শক্তির মাধ্যমে ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং পৃথিবীকে মোটামুটি দুটি পরস্পর বিরোধী শিবিরে বিভক্ত করে ফেলে।

উভয় পক্ষের মধ্যকার তুমুল উত্তেজনার সময়টিকে অভিহিত করা হয় স্নায়ু যুদ্ধ হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠে এই যুদ্ধ। নিজেদের প্রভাব বলয় বাড়ানোর জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলতে থাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা।

দুই পরাশক্তির শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র থেকে বাদ পড়েনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতও। এ প্রতিযোগিতার চিত্র সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয় অস্ত্র ও মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। শুরুতে দুই পরাশক্তিই সবার আগে মনোযোগ দেয় নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে। দুই দেশই চেয়েছিল প্রতিপক্ষের চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী হতে। যেন অপর পক্ষ কখনো তাদেরকে আক্রমণ করার কথা চিন্তাও না করে।

এর ফলে সৃষ্টি হয় শক্তিশালী অস্ত্র ও বোমা তৈরির এক অস্বাভাবিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ইতিহাসে এটিকে ‘Arms Race’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া স্নায়ুযুদ্ধের আরেক ফসল হলো ‘Space Race’। মহাকাশের বিভিন্ন মিশনকে আগে সম্পন্ন করবে তার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা।

বাহুর বল বা Arms Race

শুরুতে দুই পরাশক্তিই অস্ত্র সমৃদ্ধ করার তুমুল প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে পারমাণবিক অস্ত্রের বিপুল পরিমাণ মজুদ গড়ে তুলতে শুরু করে। শীতল যুদ্ধের শেষ দিকে দেখা যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতীয় বাজেটের ২৭% ই সামরিক খাতে ব্যয় করেছে। যা তাদের অর্থনীতিতে ধ্বস নামিয়ে দিয়েছিল। চলুন দেখে নেই তাদের অস্ত্র প্রতিযোগিতার কিছু চিত্র।

পারমাণবিক বোমা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ম্যানহাটন প্রজেক্টের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রই সর্বপ্রথম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি শুরু করে। পারমাণবিক বোমা দিয়ে তারা জাপানের দুটি শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকিকে একদম ধ্বংস করে দিয়েছিল। পারমাণবিক বোমা অস্বাভাবিক ক্ষমতা সম্পন্ন এক অস্ত্র, যা ধ্বংস করে দিতে পারে একটি গোটা শহরকে। এটি মৃত্যুর কারণ হতে পারে হাজার হাজার মানুষের। স্নায়ু যুদ্ধে একটি বাস্তব সত্য ছিল যে, কোনো পক্ষই পারমাণবিক যুদ্ধে জড়াতে চাইতো না। কারণ এতে সভ্যতার বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল।

অস্ত্র প্রতিযোগিতার শুরু ২৯ শে আগস্ট ১৯৪৯। প্রথম বারের মতো পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। পুরো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যায়। কারণ তখন কেউই ভাবেনি সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের পারমাণবিক গবেষণায় এতটা এগিয়ে গেছে। এটা দেখে উঠে পড়ে লাগে আমেরিকাও। এভাবেই শুরু হয়ে যায় সেই তুমুল প্রতিযোগিতা।

১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এটি হলো পারমাণবিক বোমার সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণ। খুব বেশি দেরী করেনি সোভিয়েত ইউনিয়নও। পরের বছরেই তারা সফল বিস্ফোরণ ঘটায় হাইড্রোজেন বোমার। এছাড়া ১৯৫০ সালের দিকে দুই দেশই ICBM (ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল) তৈরি করা শুরু করে। এ মিসাইলগুলো অনেক দূরপাল্লা (প্রায় ৩৫ হাজার মাইল) থেকে নিক্ষেপ করা যেত।

প্রতিরক্ষা

যেহেতু দুই দেশই শক্তিশালী সব অস্ত্র উদ্ভাবন করা শুরু করেছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই আক্রান্ত হবার একটি ভয় কাজ করছিল। এ কারণে দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা খাতও শক্তিশালী করতে শুরু করেছিল। প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মধ্যে ছিল বিশাল রাডার কেন্দ্র স্থাপন। প্রতিপক্ষ কোনো মিসাইল নিক্ষেপ করলে তা ধরা পড়বে রাডারে।

তাছাড়া ICBM-কে প্রতিহত করার মতো প্রতিরক্ষা মিসাইল উদ্ভাবনের কাজও তারা করেছে। একই সাথে পারমাণবিক আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তৈরি করেছে আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কার ও বম্ব শেল্টার। এছাড়া সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য মাটির নিচে নিরাপদ ও অনেক সুবিধাসম্পন্ন ব্যবস্থা রাখা হতো।

MAD

স্নায়ুযুদ্ধের একটা বড় সত্য ছিল যে, দু’পক্ষ যে কোনো অবস্থাতে নিশ্চিতভাবেই একে অপরকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখতো। প্রথমে যে যত ভয়াবহভাবেই আক্রমণ করুক না কেন, তবুও আক্রমণকারী দেশকে ধ্বংস করার সক্ষমতা থাকতো অপরপক্ষের। স্নায়ুযুদ্ধের এ প্রভাবকেই বলা হয় Mutual Assured Destruction বা MAD।

অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ প্রতিযোগিতার কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য

১) নিউক্লিয়ার বোমা বানানোর জন্য ম্যানহাটন প্রজেক্ট ছিল খুবই গোপন একটি প্রকল্প। এমনকি প্রেসিডেন্ট হবার আগ পর্যন্ত আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান পর্যন্ত এ সম্পর্কে কিছুই জানতো না। কিন্তু নিজের শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সোভিয়েত নেতা স্টালিন এর সবটাই জানতো।

২) ধারণা করা হয় ১৯৬১ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হয়েছিল, তা পুরো পৃথিবী ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট ছিল।

৩) স্নায়ুযুদ্ধের এ সময়ে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নই তাদের অস্ত্র সমৃদ্ধ করেনি, পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীনের মতো দেশগুলোও।

অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ প্রতিযোগিতা যখন তুঙ্গে, তখন দুটি দেশের জন্যই এটি অনেক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ১৯৭০ সালের কাছাকাছি সময়ে এসে দুটি দেশই বুঝতে পারে কিছু একটা করা উচিৎ। উভয়পক্ষই সুর নরম করা শুরু করে। এরপর তারা অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ কমানোর লক্ষ্যে SALT ( Strategic Arms Limitation Talks) চুক্তির মাধ্যমে একমত হয়। অবশ্য এটি সম্পূর্ণভাবে শেষ হয় ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর।

মহাকাশ অভিযানে প্রতিযোগিতা বা Space Race

স্নায়ুযুদ্ধের সময় দু’পক্ষ মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিতে প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ে। কে প্রথম কক্ষপথে মানুষ বহনকারী মহাকাশযান স্থাপন করতে পারে, কোন দেশ প্রথম চাঁদে পা রাখতে পারে- এমন ঘটনাগুলো ছিল এ প্রতিযোগিতার উপলক্ষ্য। এ স্পেস রেস তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এর মাধ্যমে তারা দেখাতে পারতো, অপর পক্ষের চেয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা কতটা এগিয়ে।

চিত্রঃ চাঁদে পা রাখার প্রতিযোগিতা নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে যে, ভবিষ্যতে সামরিক ক্ষেত্রে রকেট গবেষণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে। তাই উভয়পক্ষই রকেট বিজ্ঞানে উন্নতি করতে জার্মানির বিখ্যাত সব রকেট বিজ্ঞানীকে নিয়োগ করে, যাদের মাঝে ছিল ভন ব্রাউনের মতো কিংবদন্তীও। আসল প্রতিযোগিতা শুরু হয় ১৯৫৫ সালে। তখন দুটি দেশই ঘোষণা দেয় যে তারা পৃথিবীর কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপন করতে যাচ্ছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে। এমনকি উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করার জন্য তারা একটি কমিশন পর্যন্ত গঠন করে ফেলে। ৪ অক্টোবর ১৯৫৭, সবার আগে পৃথিবীর কক্ষপথে রাশিয়া তাদের কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক -১ স্থাপন করে। এর মাধ্যমে তারা এ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়। দেরি করেনি আমেরিকানরাও। এর ঠিক চার মাস পরে তাদের উপগ্রহ এক্সপ্লোরার-১ কক্ষপথে জায়গা দখল করে।

মহাকাশে প্রথম মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রেও এগিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১২ এপ্রিল ১৯৬১, ইউরি গ্যাগারিন মহাকাশযান ভস্টক-১ এ করে সর্বপ্রথম পৃথিবীর কক্ষপথে পরিভ্রমণ করেন। কী ভাবছেন? যুক্তরাষ্ট্র কয় মাস পর তাদের মানুষ মহাকাশে পাঠিয়েছে?

না মাস নয়, মাত্র তিন সপ্তাহ পর ফ্রিডম-৭ মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করে তারা এবং এলান শেফার্ড হয়ে যায় মহাকাশ ভ্রমণকারী প্রথম আমেরিকান নভোচারী। কিন্তু শেফার্ডের মহাকাশযান পৃথিবীর কক্ষপথ পরিভ্রমণ করতে পারেনি। এর প্রায় এক বছর পর ২০ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৬২-তে আমেরিকান মহাকাশচারী জন গ্লেন মহাকাশযান ফ্রেন্ডশিপ-৭ এ করে পৃথিবীর কক্ষপথে পরিভ্রমণ করেন।

চাঁদে যাবে কে আগে?

মহাকাশ দৌড়ে পিছিয়ে পড়ায় আমেরিকানরা বেশ বিব্রত হয়েছিল। তাই প্রেসিডেন্ট কেনেডি ১৯৬১ সালে কংগ্রেসে ঘোষণা দেয়, তারা সবার আগে চাঁদে পা রাখতে চায়। আমেরিকা ও পশ্চিমাদের জন্য এটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে অনুধাবন করেছিলেন। এ উদ্দেশ্যে এপোলো মুন প্রকল্প শুরু করা হয়। এপোলো প্রোগ্রামের সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র জেমিনি প্রকল্পও চালু করে।

এ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল এপোলোর মহাকাশযানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন করা। এ প্রকল্পের আওতায় আমেরিকানরা মহাকাশের বিভিন্ন বিষয়ে আরো দক্ষ হয়ে উঠে। এর মধ্যে ছিল কীভাবে মহাকাশযানের কক্ষপথ বদল করতে হয়, কীভাবে দুটি মহাকাশযান মহাশূন্যে এক জায়গায় একত্রিত করা যায় এবং উল্লেখযোগ্য সময় মহাকাশে ব্যয় করার মাধ্যমে তারা পর্যবেক্ষণ করে মানুষের শরীরে এর প্রভাব কীরকম হয়।

কয়েক বছর ধরে অনেক গবেষণা, পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ও প্রশিক্ষণের পর অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। ১৬ জুলাই ১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং, বাজ অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স নামক তিন নভোচারীকে নিয়ে মহাশূন্যে পাড়ি জমায় এপোলো-১১। তিন দিনের ভ্রমণ শেষে তারা চাঁদে পৌঁছায়।

২০ জুলাই ১৯৬৯, নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন তাদের লুনার মডিউল ঈগলের মাধ্যমে চাঁদে অবতরণ করেন। প্রথম চাঁদের বুকে পা রাখার মাধ্যমে নীল আর্মস্ট্রং হয়ে যান মানব সভ্যতার এক বিশাল অর্জনের অংশ। এ অর্জন সম্পর্কে বলা নীল আর্মস্ট্রং এর উক্তিটি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন “That’s one small step for man, one giant leap for mankind”।

স্পেস রেসের সমাপ্তি

এপোলো ও জেমিনি প্রকল্পের সফলতার মাধ্যমে মহাকাশ দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র যোজন যোজন এগিয়ে যায়। তার উপর ১৯৭৫ সালের জুলাই এর দিকে দুইপক্ষের সম্পর্কের শীতলতাও কিছুটা কমতে শুরু করে। এরপর সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথভাবে করা এপোলো-সয়ুজ মিশনের মাধ্যমে স্পেস রেসের সম্পূর্ণ অবসান ঘটে।

স্পেস রেসের কিছু কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য

১) প্রেসিডেন্ট কেনেডির আমলে একসময় চাঁদে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার যৌথভাবে অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু আততায়ীর হামলায় কেনেডি নিহত হবার পর সোভিয়েত এ পরিকল্পনায় আর সাড়া দেয়নি।

২) যুক্তরাষ্ট্র যদি মহাকাশে সামরিক রকেট পাঠানোর অনুমোদন দিতো, তাহলে তারা সোভিয়েতের আগেই কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপনে সক্ষম হতো। কিন্তু অনেকে এটিকে যুদ্ধের প্ররোচনা হিসেবে দেখতে পারে ভেবে তারা এর থেকে বিরত থাকে এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা গবেষণামূলক উপগ্রহই স্থাপন করবে।

৩) মহাকাশ দৌড়ে কেবল সফলতাই ছিল না, উভয়পক্ষেই ছিল অসংখ্য ব্যর্থতার গল্পও। কখনো মহাকাশযান বিস্ফোরিত হয়েছে, কখনো মৃত্যুও ডেকে এনেছে অনেক নভোচারীর।

পরিশেষে বলা যায়, আর্মস রেস ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক আধিপত্য অর্জনের লড়াই। এর পেছনে বিশাল অর্থ ব্যয়কে সম্পূর্ণ অপচয় মনে হতে পারে। কেননা যুদ্ধ হলে তা MAD এর দিকে ধাবিত হতো এবং দু’পক্ষেরই নিশ্চিতভাবে ছিল অপর পক্ষকে ধ্বংস করার ক্ষমতা। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলও ছিল সোভিয়েতকে এদিকে অর্থ ব্যয়ে ব্যস্ত রেখে দীর্ঘমেয়াদে জয়ী হওয়ার জন্য। শেষে যুক্তরাষ্ট্র এতে সফলও হয়েছিল।

তবে স্পেস রেসের প্রভাব বিজ্ঞানের জগতে অপরিসীম। এটি স্রেফ তখনকার স্নায়ু যুদ্ধের একটি প্রভাবকই ছিল না, বরং এটি বদলে দিয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞান সম্পর্কে পৃথিবীর ধারণাকেই। সেই রাশিয়ার পাঠানো মহাশূন্যে প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে চাঁদে আমেরিকার মানুষের পদচিহ্ন বর্তমানে মহাকাশ বিজ্ঞানের এ পর্যায়ে আসার পেছনে এসব বিষয়ের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র

১. বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর, তারেক শামসুর রেহমান

২. http://www.ducksters.com/history/cold_war/summary.php

৩. http://www.ducksters.com/history/cold_war/arms_race.php

৪. http://www.ducksters.com/history/cold_war/space_race.php