প্রজেক্ট সীলঃ সমুদ্রের বুকে মানবসৃষ্ট সুনামী

২০০৪ সালের কথা। তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সেদিন খবর দেখতে টিভি চালু করেই বেশ বড় রকমের ধাক্কা খেলাম। স্ক্রিনের নীচে ভেসে চলা ব্রেকিং নিউজে দেখাচ্ছে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামির খবর। একটু পরেই ঢেউয়ের তোড়ে গাড়ি-বাড়ি-নৌকা-মানুষ ভেসে যেতে দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষমতা যে এত ভয়াবহ হতে পারে সেদিন স্বচক্ষে দেখেও যেন তা বিশ্বাস হচ্ছিল না। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ সংঘটিত সেই দুর্যোগের জন্য দায়ী ছিল ৯.১ – ৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্প, যার ফলশ্রুতিতে মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২ লক্ষ ৩০ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৮০ হাজারের মতো। নীচের ছবিগুলো দেখলেই সুনামিটির ভয়াবহতা আঁচ করা সম্ভব।

‘সুনামি’ একটি জাপানী শব্দ যার অর্থ পোতাশ্রয়ে ঢেউ। ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, সমুদ্রের তলদেশে কোনো বিষ্ফোরণ, আগ্নেয়গিরির উদ্‌গীরণ ইত্যাদির প্রভাবে নদী, সাগর প্রভৃতি জলাধারে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসকে বলে সুনামি।

প্রজেক্ট সীলের শিরোনামে কেন সুনামির কথা বলছি? এর উত্তর কিছু দূর গেলেই পাওয়া যাবে। তার আগে প্রাসঙ্গিক আরেকটি বিষয় সম্পর্কে জেনে নেই। ‘টেকটোনিক ওয়েপন’ এটি এমন একটি হাইপোথেটিক্যাল যন্ত্র বা প্রক্রিয়া যার সাহায্যে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে চাহিদামতো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্ম দেয়া যাবে! ১৯৯২ সালে রুশ বিজ্ঞান একাডেমির অ্যালেক্সে সেভোলোভিদিচ নিকোলায়েভ এটির সংজ্ঞা

দিয়েছিলেন এভাবে- “A tectonic or seismic weapon would be the use of the accumulated tectonic energy of the Earth’s deeper layers to induce a destructive earthquake”।

‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ এই শব্দ দুটি কানে গেলেই মানসপটে দু’জোড়া শব্দ ভেসে ওঠে- ‘অ্যাডল্‌ফ হিটলার’ এবং ‘পারমাণবিক বোমা’। হিটলার কিংবা পারমাণবিক বোমা যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরই প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে তা বোধহয় না বললেও চলে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানুষ তার স্বজাতির উপর কত রকম অমানবিক অত্যাচার, নির্যাতন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে তার ইতিহাস কম-বেশি আমাদের সবারই জানা। আবার এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করতে আশ্রয় নিয়েছিল নানান রকমের কৌশলের। পাশাপাশি উদ্ভাবন করেছিল ভয়ানক সব মারণাস্ত্র। প্রজেক্ট সীল ছিল তেমনই এক মারণাস্ত্র উদ্ভাবনের পরিকল্পনা।

প্রায় ৭০ বছর আগেকার কথা। ১৯৪৪ সালের দিকে মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার ই. এ. গিবসন এক অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন, সাগরের পানিতে ডুবে থাকা বিভিন্ন প্রবাল প্রাচীর দূরীকরণে যে বিষ্ফোরণ ঘটানো হয় তার ফলে বেশ বড় রকমের ঢেউয়ের উৎপত্তি ঘটে। এখান থেকেই তার মাথায় অন্য এক পরিকল্পনা জন্ম নিল- আচ্ছা, এ ঢেউকে কাজে লাগিয়ে কি শত্রুপক্ষের কোনো নির্দিষ্ট এলাকাকে ভাসিয়ে দেয়া যায় না? যেমন চিন্তা তেমন কাজ। সাথে সাথেই যোগাযোগ করলেন নিউজিল্যান্ডের চিফ অব জেনারেল স্টাফ স্যার এডওয়ার্ড পুটিকের সাথে, খুলে বললেন তার বিস্তারিত পরিকল্পনা। গিবসনের পরিকল্পনাটি মনে ধরলো পুটিকের। তাই তিনি যুদ্ধ পরিষদের পরবর্তী সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। সেখানেও প্রস্তাবটিকে সমর্থন করে সবাই। ফলে সিদ্ধান্ত হলো আমেরিকা এবং নিউজিল্যান্ড যৌথভাবে নিউ ক্যালিডোনিয়ায় প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে।

এখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রজেক্ট সীল। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল- ‘আক্রমণের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে তৈরী জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে প্লাবন তৈরির সম্ভাব্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করা’।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণাগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস লীচ। গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হচ্ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার কমান্ডার অ্যাডমিরাল হ্যালসিকে। হ্যালসি প্রাথমিক পরীক্ষার ফলাফলে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, নিউজিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষকে তিনি অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রজেক্টটি যথাসম্ভব এগিয়ে নিতে। তিনি চাইছিলেন মানবসৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে শত্রুপক্ষের বিভিন্ন স্থাপনা যতদূর সম্ভব ভাসিয়ে দিতে। এজন্য তিনি লিখেছিলেন- “আমার মতে- এ পরীক্ষাগুলোর ফলাফল বলছে যে, উভচর যুদ্ধে শত্রুপক্ষের এলাকা প্লাবিত করে দেয়া বেশ সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী এক সম্ভাবনময় আক্রমণাত্মক যুদ্ধাস্ত্র হতে পারে।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণামূলক কাজগুলো বেশ দ্রুততার সাথেই এগোচ্ছিল। ১৯৪৪ সালের ৫ মে নিউজিল্যান্ডের যুদ্ধ পরিষদে হ্যালসির প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রফেসর লীচের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অ্যারে রিসার্চ ইউনিট, যার কাজ ছিল একেবারেই নতুন ঘরানার এ বোমাটি নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো। প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই ইউনিটটি। তাদের কাজের জন্য ঠিক করা হয়েছিল হ্যাঙ্গাপারাওয়া উপদ্বীপে অবস্থিত একটি দূর্গ। এখানেই গোপনীয়তার সাথে এগিয়ে চলেছিল প্রজেক্ট সীলের কাজকারবার। এগোচ্ছিল স্বজাতিকে শেষ করার আরো কার্যকরী পদ্ধতি উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা। প্রজেক্টের কাজগুলো মূলত নিউজিল্যান্ডের প্রকৌশলীরাই করতেন কিন্তু বিষ্ফোরক সরবরাহ করা কিংবা আদেশ দেয়ার কাজটি করে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রই।

প্রজেক্টটি সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে বিপুল পরিমাণ বিশেষায়িত উপকরণের প্রয়োজন ছিল। এগুলোর মাঝে ছিল রিমোট-ওয়েভ রেকর্ডিং ডিভাইস, রেডিও কন্ট্রোল্‌ড ফায়ারিং মেকানিজম, মেরিন এক্সপ্লোসিভ ইত্যাদি। ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীদেরও সমুদ্রে বিষ্ফোরণ ঘটানোর এ মহাযজ্ঞ নিয়ে আগ্রহের কমতি ছিল না। তাই একদল ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল প্রজেক্টটির অগ্রগতি দেখে যাবার জন্য।

নতুন আঙ্গিকে গঠিত হবার পর প্রজেক্ট সীলের প্রথম পরীক্ষামূলক বিষ্ফোরণটি ঘটানো হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ৬ জুন। আর এটি চলেছিল পরের বছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।

প্রজেক্ট সীলের পুরো সময়কাল জুড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টি সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। বোমাগুলো দিয়ে কৃত্রিমভাবে সুনামির মতো পরিস্থিতি তৈরি করাই ছিল উদ্দেশ্য, তাই এগুলোর এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। বোমাগুলোতে বিষ্ফোরকের পরিমাণ কয়েক গ্রাম থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত পরিবর্তন করে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। বিষ্ফোরক হিসেবে মূলত টিএনটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে কখনো কখনো নাইট্রো-স্টার্চ কিংবা গেলিগনাইটও ব্যবহার করা হতো।

শুরুতে অবশ্য প্রজেক্ট সীলের গবেষকেরা ভুল উপায়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। ব্রিটিশরাও সমুদ্রের তলদেশে বিষ্ফোরণ নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল। তাদের কাজ থেকে ধারণা করা হচ্ছিল যে, বোমটি সমুদ্রের যত তলদেশে থাকবে, বিষ্ফোরণের ফলে সৃষ্ট গ্যাসের বুদবুদ ততটাই কার্যকর উপায়ে নির্ধারিত এলাকায় প্লাবন ঘটাতে সক্ষম হবে। অবশ্য পরবর্তীতে প্রজেক্ট সীলের অনেক অনেক গবেষণার পর ব্রিটিশদের সেই তত্ত্বটি বাতিল হয়ে যায়। তারা দেখান, বোমটি সমুদ্রপৃষ্ঠের যত কাছাকাছি থাকবে, এটি ততই কার্যকর ঢেউ তৈরি করে প্লাবনের উদ্ভব ঘটাতে সক্ষম হবে। গবেষকেরা সেই সাথে বুঝেছিলেন, মাত্র একটি বোমার বিষ্ফোরণ দিয়ে সৃষ্ট ঢেউয়ের সাহায্যে কেবল ঢেউয়ের বুকে সার্ফিং করাই সম্ভব, শত্রুর স্থাপনা ভাসিয়ে নেয়া তো বহু দূরের কথা। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন একসাথে অনেকগুলো সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানোর।

এজন্য প্রায় ২০ লক্ষ কেজি বিষ্ফোরক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। বিষ্ফোরককে সমান ১০ ভাগে ভাগ করে সমুদ্র উপকূল থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে বিষ্ফোরিত করলেই তা সমুদ্রের বুকে ভয়াবহ আলোড়ন তুলতে সক্ষম হবে। এর ফলে ১০ – ১২ মিটার উচ্চতার যে ঢেউ তৈরি হবে সেটিই ভাসিয়ে দিবে শত্রুর সব স্থাপনা। তবে এখানেও সমস্যা ছিল। গবেষকরা দেখেছিলেন, সমুদ্রের কতটা তলদেশে বোমটি রাখা হচ্ছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। কারণ উচ্চতার সামান্য হেরফেরও ঢেউয়ের শক্তি অনেকখানি কমিয়ে দিচ্ছিল।

প্রজেক্ট সীল যখন শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে যাচ্ছিল, তখন একে পারমাণবিক বোমার বিকল্প হিসেবেই ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে এসে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে। তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মিত্রপক্ষের আধিপত্য বিস্তার পেতে শুরু করে। এর ফলে ধীরে ধীরে প্রজেক্ট সীলের মাধ্যমে তৈরি সুনামি বোমার সাহায্যে কৃত্রিম সুনামী তৈরির প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৮ জানুয়ারি প্রজেক্টটি বন্ধই করে দেয়া হয়। তখন পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য কোনো সুনামী বোমা বানানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি, সবই ছিল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। তাই বাস্তবক্ষেত্রে এ বোমাটির কার্যকারিতা কেমন হতে পারে তা আসলে কেউই আর বলতে পারবে না।

প্রজেক্ট সীলের আয়ু ফুরিয়ে গেলেও ১৯৫০ সালে অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের চল্লিশের দশকের সেই প্রজেক্টটি নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে দেখা গেছে। রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল- The Generation of Waves by Means of Explosives।

১৯৯৯ সালে নিউজিল্যান্ডের মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স এন্ড ট্রেড প্রজেক্ট সীলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কিত তথ্য সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। বর্তমানে এ সংক্রান্ত তথ্যাদি ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের জাতীয় আর্কাইভে এবং ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোতে অবস্থিত স্ক্রিপ্‌স ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফি আর্কাইভসে রাখা আছে।

এতক্ষণ ধরে একবারও বলিনি ঠিক কোনো দেশকে আক্রমণ করতে এ বোমাটি বানানো হচ্ছিল। প্রতিবার শুধু ‘শত্রুপক্ষ’ কথাটি লিখেই পার পেয়ে গেছি। আসলে ১৯৯৯ সালে যে গোপন নথিগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল, সেখানেও বিশেষ কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছিলেন তখন বেঁচে থাকা প্রজেক্ট সীলেরই এক সদস্য। ১৯৯৯ সালে তার বয়স ছিল ৮৭ বছর।

তার মতে, প্রজেক্টটিতে কাজ করা সবাই জানতো যে এই বোমা জাপানকে ভাসিয়ে দিতেই তৈরি করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র

 (১) en.wikipedia.org/wiki/Tsunami_bomb
 (২) nbr.co.nz/article/best-kept-secret-world-war-two-—-project-seal-tsunami-bomb-ck-134614
 (৩) cnsnews.com/news/article/new-details-emerge-world-war-ii-tsunami-bomb-project

বিভিন্ন গোপন গোয়েন্দা যন্ত্রের কাহিনী

“The number one benefit of information technology is that it empowers people to do what they want to do. It lets people be creative. It lets people be productive. It lets people learn things they didn’t think they could learn before, and so in a sense it is all about potential.”- Steve Ballmer

তথ্য-প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভ বলমারের উক্তিটির জুড়ি খুঁজে পাওয়া আসলেই ভার। কেননা তথ্য ছাড়া আজকের দিনে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরেই কেউ বসেন পেপারের পাতা উল্টাতে, কেউ স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্লাইড করতে, কেউ আবার টেলিভিশন চালু করে রিমোট কন্ট্রোলের বাটনে ঝড় তুলতে। উপরে উল্লেখিত তিন শ্রেণির মানুষের সবার উদ্দেশ্যই এক- ‘তথ্য জানা’।

চা বানাবেন? তাহলে আগে আপনাকে জানতে হবে চায়ের পাতি ঘরে আছে কিনা সেই তথ্য। ভাত খাবেন? তাহলে আগে খোঁজ নিন চালের ড্রামে চাল আছে কিনা সেদিকে। গোসল করবেন? তাহলে আগে জানতে হবে পানির ট্যাংকিতে পানি আছে কিনা সেই খবরটি। এগুলো তো দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত দরকারি কিছু তথ্যের নমুনা।

এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা, পড়াশোনা, গবেষণাসহ জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তথ্য ছাড়া আমরা চলতে পারবো। ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হোক না কেন, এতক্ষণ ধরে তথ্যের এতসব উপযোগিতা তুলে ধরার পর একে যদি দ্বিতীয় অক্সিজেন বলা হয়, তাহলে কি খুব বেশি কিছু বলা হয়ে যাবে?

এবার আসুন পরবর্তী প্রশ্নে- ‘আসলেই কি পৃথিবীর সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত?’ না-বোধক উত্তর দিতে কেউ এক মুহুর্তের জন্যও দেরি করবে না। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় কিছু ব্যাপার স্যাপার আছে যা গুটিকতক আস্থাভাজন লোক ছাড়া আর কারো কাছেই প্রকাশ করা হবে না।

একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কখনোই চাইবে না যে তার পানীয় বানানোর রেসিপি সবাই জেনে যাক। সারা পৃথিবীতে অসংখ্য গুপ্ত সংঘ আছে, আছে নানা অপরাধী চক্রও। তারাও কোনোদিন চায় না তাদের ভেতরের তথ্য কোনোদিন বাইরে পাচার হয়ে যাক। অর্থাৎ জায়গামতো সবাই নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষায় শতভাগ সচেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে কি গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া কখনো থেমেছে? অবশ্যই না। হাল আমলের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেনরা আমাদের সামনে রয়েছেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। এছাড়া ইতিহাসের পাতা উল্টালেও এমন শত শত মানুষের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর আঙিনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ছদ্মবেশে, খুঁজেছেন কিছু অত্যন্ত দরকারি তথ্য।

কেউ সফল হয়ে জীবন নিয়ে ফেরত আসতে পেরেছেন, কেউবা ব্যর্থ হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের জীবনটিই বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের আজকের আলোচনা এ গোপন তথ্যানুসন্ধান নিয়েই। গোপন তথ্যানুসন্ধানের নানা কৌশলের ইতিহাস দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখাটি।

বেলী বাস্টার

গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বেলী বাস্টার নামের এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতো সিআইএ। দেয়াল ছিদ্র করে তাতে গোপনে শত্রুপক্ষের কথাবার্তা শোনার জন্য কোনো ডিভাইস রেখে দেয়াই ছিলো এর মূল উদ্দেশ্য। পুরো যন্ত্রটি ঠিকমতো জোড়া লাগানোর পর এর ড্রিল বিটের অপর প্রান্ত পেটের সাথে সজোরে চেপে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়াল ছিদ্র করার কাজটি সারা হতো।

লেটার রিমুভার

ধরুন, শত্রুপক্ষের খামে আটকানো একটি চিঠি সৌভাগ্যক্রমে আপনার হাতে এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি চাইবেন চিঠিটি পড়ে দেখতে। একইসাথে আপনার শত্রু যেন ব্যাপারটি বুঝতে না পারে এটাও আপনি চাইবেন। তো এজন্য আপনাকে চিঠিটি এমনভাবে বের করতে হবে যেন চিঠিও বেরোয়, আবার খামেরও কোনো ক্ষতি না হয়।

এমন কাজ সারার জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হতো সরু লেটার রিমুভার। খামের একেবারে উপরের কোনা, যেখানে আঠা খুব কমই লাগানো হয়, সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো ডিভাইসটি। তারপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিঠিকে পেঁচিয়ে ফেলা হতো এর সাথে। তারপরই ধীরে ধীরে বের করে আনা হতো আকাঙ্ক্ষিত চিঠি।

স্টেরিওস্কোপ

স্টেরিওস্কোপ (Stereoscopy) শব্দটি এসেছে দুটি গ্রীক শব্দ স্টেরিওস (দৃঢ়) ও স্কোপিও (দেখা) থেকে। এ পদ্ধতিতে একজন দর্শকের বাম ও ডান চোখের জন্য একই ছবি কিছুটা আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ দুটো দ্বিমাত্রিক ছবিকে আমাদের মস্তিষ্ক তখন প্রক্রিয়াজাত করে ত্রিমাত্রিক ছবি দেখার অনুভূতি দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ নানা স্টেরিওস্কোপিক ছবি দেখেই শত্রুপক্ষের সম্পর্কে ধারণা নিতো। এজন্য প্রথমে তারা এরোপ্লেন থেকে শত্রুর এলাকার নানা ছবি তুলে আনতো। তারপর এসব স্টেরিওস্কোপের সাহায্যে সেসব ছবির ত্রিমাত্রিক ধারণা নেয়ার চেষ্টা করতেন ছবি বিশ্লেষকেরা।

ড্রাগনফ্লাই ইনসেক্টোথপ্টার

ঘরের ভেতর একটি ফড়িং কিংবা প্রজাপতি উড়ে বেড়ালে আপনি কি কিছু মনে করবেন? অবশ্যই না। বরং এক নজর সেদিকে চোখ বুলিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিবে অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এ প্রাণীটি যদি জৈবিক না হয়ে যান্ত্রিক হয়? যদি সে জৈবিক প্রাণীর ছদ্মবেশে আপনার উপরই নজরদারি করতে থাকে তাহলে কেমন হবে?

ছবিতে আসলে এমনই একটি ইউএভি (আনম্যান্‌ড এরিয়াল ভেহিকল) দেখানো হয়েছে। ১৯৭০ সালের দিকে সিআইএ’র রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে বানানো হয়েছিলো ফড়িংয়ের মতো দেখতে এ ডিভাইসটি যা নানা তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হতো।

মাইক্রোডট ক্যামেরা

গোপনে ছবি তোলার নানা কৌশল বিভিন্ন অ্যাকশন বা থ্রিলার সিনেমায় দেখেছি। এরই এক বাস্তব উদাহরণ হলো এই মাইক্রোডট ক্যামেরা। কোনো ছবি কিংবা টেক্সটকে আকারে অনেক ছোট করে কোনো ছোট ডিস্কে ধারণ করার কৌশলকে বলা হয় মাইক্রোডট।

মাইক্রোডটগুলো সাধারণত বৃত্তাকার এবং ১ মিলিমিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। তবে চাহিদামতো এর আকার কিংবা আকৃতি পরিবর্তন করা যায়। গত শতাব্দীতে চলা কোল্ড ওয়্যারের সময় বিবিন্ন গোপন তথ্যের আদান-প্রদানের কাজে এটি ব্যবহার করা হতো। হাতের আংটি, ফাঁপা কয়েন ইত্যাদি নানা জায়গায় মাইক্রোডট লুকিয়ে রাখা যেতো।

ম্যাচবক্স ক্যামেরা

হাতে একটি ম্যাচবক্স নিয়ে যদি আপনি ঘোরাঘুরি করেন, তাহলে অধিকাংশ মানুষই ভাববে আপনি হয়তো সিগারেট ধরাতে যাচ্ছেন। ম্যাচবক্সের ভেতর যে দেশলাইয়ের কাঠি ছাড়া অন্য কিছুও থাকতে পারে এটা কেউ চিন্তাই করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির নাম ছিলো ‘অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (ওএসএস)’। একে বর্তমানের সিআইএ’র পূর্বপুরুষও বলা যেতে পারে।

এ ওএসএস-এর জন্যই ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি তৈরি করেছিলো এসব ম্যাচবক্স ক্যামেরা। এগুলোর ভেতরে দেশলাইয়ের কাঠির বদলে ভরা থাকতো আস্ত ক্যামেরা। আর একজন গোয়েন্দা যে দেশে যাচ্ছেন, তিনি সেই দেশের প্রচলিত কোনো ম্যাচের মোড়ক এর গায়ে লাগিয়ে নিলেই কাজ হয়ে যেতো। তখন কেউ আর সন্দেহের অবকাশ পেতো না যে লোকটি সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে নাকি তার দেশের নিরাপত্তায় আগুন জ্বালাচ্ছে!

ডেড ড্রপ স্পাইক

মনে করুন, কোনো একটি এলাকায় কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য দুজন ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে। তারা যদি একসাথে কোথাও দেখা করেন তাহলে শত্রুপক্ষ সন্দেহ করার অবকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু এমনটা হতে দেয়া যাবে না। আবার মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের মাঝে কিছু তথ্যের বিনিময়ও দরকার। কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহও করতে না পারে।

এমন পরিস্থিতির জন্য আসলে বানানো হয়েছিলো এ ডেড ড্রপ স্পাইক। এর ভেতরের ফাঁপা জায়গায় দরকারি তথ্য ভরে তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জায়গায় মাটিতে পুঁতে রেখে যেতো এক এজেন্ট। পরে অন্যজন এসে সুবিধামতো তা তুলে নিয়ে যা বোঝার বুঝে নিতো।

পিজিয়ন ক্যামেরা

নামটা দেখেই ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেছে, তাই না? ভাবছেন কবুতর দিয়ে আবার ছবি তোলানো হতো নাকি অতীতে? আসলে আপনি যা ভাবছেন তার আংশিক সত্য, আংশিক আপনার অজানা যা এখন আপনাকে জানাবো। আসলে ছবিগুলো তোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো কবুতরকে। ১৯০৭ সালে জার্মান ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা জুলিয়াস নিউব্রোনার এর উদ্ভাবন করেন।

কোনো পোষা কবুতরের গায়ে ছোট ও হালকা এ ক্যামেরাগুলো লাগিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেয়া হতো। ছবি তোলার জন্য ছিল সেলফ টাইম ডিলে মেকানিজম। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর আপনাআপনিই ছবি উঠতে থাকতো, কবুতরটির কাজ ছিল শুধু জায়গামতো উড়ে যাওয়া। তবে প্রযুক্তির অগ্রসরতা একসময় এ কৌশলকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়।

সেই সাথে কবুতরগুলোকে ঠিকমতো ট্রেনিং দেয়া, বাড়তি একটি জিনিস নিয়ে উড়তে অভ্যস্ত করানো, জায়গামতো সে আসলেই যাবে কিনা, তার গতি ইত্যাদি নানা বিষয় কবুতর দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর নজরদারিকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।

গোপন সংকেত দেখানো আয়না

এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। একজন মহিলাকে যদি আপনার সামনে ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করেনিজের চেহারা সাজাতে দেখেন, তাহলে আপনি কী ভাববেন? নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিবেন, “আরে ভাই, এত ভাবার কী আছে? উনার সাজার ইচ্ছা হইছে, তাই আয়না বের করে সাজতেছে। আর কী?”

আসলে ঘটনার মোড় লুকিয়ে আছে এখানেই। কারণ নারী এজেন্টদের জন্য এমন আয়নাও ছিল (হয়তো এখনো আছে) যা দিয়ে সবার সামনে তিনি হয়তো সাজগোজ করতেন। কিন্তু আসলে সেটি থাকতো বিশেষ এক ধরনের আয়না যা একটু বিশেষ কোণে ধরলে ভেসে উঠতো তার মিশনের গোপন কোনো কোড! সেখান থেকে সহজেই পরবর্তী নির্দেশনা নিতে পারতেন তিনি।

পালিয়ে যাবার মানচিত্র

সিল্কের উপর প্রিন্ট করা এই মানচিত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন এজেন্টের পালিয়ে যাবার পথ চিনিয়ে দেয়া। তবে কাপড়ের উপর আঁকা বলে একজন চাইলে কৌশল হিসেবে এটিকে গায়ে জড়িয়ে কিংবা ভাঁজ করে রাখতে পারতেন। পানিরোধী রং দিয়ে এটি আঁকা হতো বলে যদি এজেন্টকে সাঁতরানো লাগতো, তাহলেও ভয়ের কিছু ছিল না। চুপচাপ জলাশয়ের অন্য পাড়ে গিয়ে শুকিয়ে নিলেই চলতো।

ফাঁপা কয়েন

বাইরে থেকে এ কয়েনটিকে নিরেট মনে হলেও আসলে এটি ফাঁপা! এর ভেতরে করে সহজেই কোনো ফিল্ম বা মেসেজ বিনিময় করা যেতো।

মিনক্স ক্যামেরা

লাটভিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্টার জ্যাপ ১৯৩৭ সালে এ ক্যামেরাটির ডিজাইন করেন। খুব সহজেই একে হাতের তালুর ভেতর লুকিয়ে রাখা যেতো। এর সাহায্যে তোলা ছবিগুলোর মানও ছিল বেশ ভালো। ফলে গোয়ান্দাগিরির কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলোর মাঝে এটিই শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

অনাহূত অতিথি দূরীকরণ

নিজের বাড়িতে অন্যের ছড়ি ঘোরানো কেউই সহ্য করতে পারে না। আর সেটা যদি হয় কোনো এলাকা বা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন, তাহলে তো কথাই নেই। অবৈধভাবে যেন একজন মানুষও কোনো বিশেষ স্থানে ঢুকে পড়তে না পারে এজন্য নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীর প্রচেষ্টার অন্ত নেই।

ছবিতে দেখানো ডিভাইসটি এমন কাজেই ব্যবহার করা হতো। মেটে রঙের বলে সহজে কারো চোখে ধরাও পড়ে না এটি। ভূ-কম্পনের সাহায্য নিয়ে তিনশ মিটার দূর থেকে এটি মানুষসহ অন্যান্য যেকোনো কিছুর আগমনকে শনাক্ত করতে পারতো। ছোট ব্যাটারি দিয়ে চালিত এ ডিভাইসে থাকতো বিল্ট-ইন এন্টেনা। এটি কোড করা পালসের সাহায্যে কোনো তথ্য পাঠাতে পারতো।

সিগারেট ক্যারিয়ারে ক্যামেরা

যাদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাদের অনেকেই কেবল দোকানে কিনতে পাওয়া প্যাকেটের উপর নির্ভর করেন না। বরং নিজের খুশি মতো বাজার থেকে কিনে নেন চমৎকার কোনো বক্স। কোথাও যখন কেউ সেই বক্স থেকে সিগারেট বের করে, তখন কেউ ঐ বক্সের দিকে ওভাবে তাকায়ও না। আর এ জিনিসটি মাথায় রেখেই ছোট এ ক্যামেরাটি বানানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। একে সহজেই সিগারেটের বক্সে লুকিয়ে রাখা যেতো।

বোতামে লুকোনো ক্যামেরা

কোট-টাই পরে যখন আপনি সবার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন সবাই কিন্তু আপনার কাপড়ের রং-মান এসবই খেয়াল করে ঠিকমতো। কাউকে শোনা যায় না বোতামের দিকে তাকিয়ে থেকে সেটির ভালো-মন্দ বিচার করতে।

এ বিষয়টি খেয়াল করেই বিচিত্র এক কৌশল অবলম্বন করেছিল কেজিবি। গত শতকের সত্তরের দশকে তারা অ্যাজাক্স নামের বোতামের ভেতর লুকানো এ ক্যামেরার ডিজাইন করে। ক্যামেরার লেন্স থাকতো ডানদিকের মাঝের বোতামে। যখনই সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়তো, তখনই একজন গোয়ান্দা তার পকেটে থাকা ক্যামেরার শাটারে চাপ দিতেন। সাথে সাথে উঠে যেতো ছবি। কেউই বুঝতে পারতো না!

জুতার নিচে ট্রান্সমিটার

গোপন তথ্য সংগ্রহের কৌশল যে আসলে শরীরের সম্ভাব্য সব জায়গাকেই ব্যবহার করেছে এ জুতাটি তার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। ১৯৬০-৭০ সালের দিকে আমেরিকান কূটনীতিকদের উপর নজর রাখতে এটি ব্যবহার করতো রোমানিয়ার সিক্রেট সার্ভিস।

কূটনীতিকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে ব্যবহার করতেন না। নিজেদের দেশ থেকেই দরকারি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। রোমানিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা সেগুলো পোস্ট অফিসে আটক করে আগে সেখানে ছবিতে দেখানো উপায়ে ট্রান্সমিটার লাগিয়ে তারপর ছাড়পত্র দিতো। এরপর সেই কূটনীতিকের যাবতীয় আলাপ-আলোচনা সহজেই তারা রেকর্ড করে রাখতে পারতেন!

বিষ্ঠার ভেতরেও ট্রান্সমিটার

রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় যখন গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি নানা প্রাণীর মল আমাদের চোখের সামনে পড়ে, তখন সাবধানে পা সরিয়ে হেঁটে যাই আমরা সবাই। দুর্গন্ধময় ওসব জিনিস কে ঘাঁটাতে যাবে? এজন্যই সিআইএ মলের মতো দেখতে এই ট্রান্সমিটারটি ডিজাইন করেছিল যেন কেউ এটা নাড়াতে আগ্রহী না হয়।

শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোতে আগেই এগুলো রেখে আসা হতো। এরপর এগুলো সিগনাল পাঠাতো আকাশে থাকা পাইলটদের। সেখান থেকেই এ সিগনাল অনুসরণ করে তারা বোম নিক্ষেপ করে আবার নির্বিঘ্নে ফেরত যেতো।

ঘড়ির ভেতর ক্যামেরা

শার্টের বোতাম, হাতের তালু আর সিগারেটের বক্সে যদি ক্যামেরা রাখা যায়, তাহলে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ঘড়িই বা বাদ যাবে কেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির এক এজেন্টের কাছে এমন ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল। এর মূল সমস্যা হলো আন্দাজের উপর ভিত্তি করে ছবি তুলতে হতো। কারণ চোখ রেখে যার বা যে জিনিসের ছবি তোলা হচ্ছে সেটি দেখার ব্যবস্থা এতে রাখা হয়নি। একেকটি ফিল্মে আটটি করে ছবি তোলা যেতো।

গাছের ভেতর বাগ

এখন যে গোপন তথ্য চুরির পদ্ধতি বলতে যাচ্ছি সেটা বেশ চমৎকার। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুর দিককার কথা। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন একটি কৃত্রিম কাটা গাছের মতো অংশে একটি বাগ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর এটিকে তারা মস্কোর বাইরে এক গাছপালা ঘেরা জায়গায় এমনভাবে স্থাপন করলেন যেন সহজেই একটি সোভিয়েত মিসাইল সিস্টেমের রাডার ও কমিউনিকেশন সিগনালের উপর তারা নজরদারি করতে পারেন!

প্রাপ্ত সিগনালগুলো এখানে সংরক্ষণ করে পরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানো হতো। এর উপরের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করে ভেতরের সোলার ব্যাটারিগুলো চার্জের ব্যবস্থা করতো। এতকিছু করেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কেজিবি একসময় ঠিকই বাগটির অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

ফাউন্টেন পেন

ক্যামেরা নিয়ে আজ বোধহয় বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, তাই না? কিন্তু কী করবো বলুন? কারণ এ ক্যামেরা লুকোনোর পদ্ধতিগুলোই যে ছিল বেশ চমৎকার।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে ফাউন্টেন পেনের ভেতর ট্রোপেল লেন্স লুকিয়ে রাখার কৌশল নেয় সিআইএ। বিভিন্ন দলিলপত্র কিংবা যন্ত্রের ছবি গোপনে তুলতেই একে কাজে লাগানো হতো। যেমন- এখানে যে ফাউন্টেন পেনটি দেখা যাচ্ছে সেটি ব্যবহার করতেন আলেকজান্ডার ওগোরোদনিক, যার কোড নেম ছিল ট্রাইগন। তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র সোভিয়েত কূটনীতিক। সিআইএ তাকে হাত করে নিয়েছিল।

ওগোরোদনিক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি কেজিবির হাতে ধরা পড়ে যান। অবশ্য কেজিবি তার কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি। এর আগেই তিনি সিআইএর কাছ থেকে পাওয়া পয়জন পিল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

আপাতত বিদায় নিচ্ছি গোপনীয়তার জগত থেকে। পরবর্তী কোনো লেখায় আশা করি গোপনীয়তায় ভরপুর অন্য কোনো জগতের গল্প নিয়ে সবার সামনে আবার হাজির হবো।

featured image: dreamstime.com

প্রাণিজগতের নানান বাবাদের গল্প

শৈশবে যারা সত্যিকার অর্থেই বাবার ভালোবাসা পেয়েছে তারা জানে বাবার ভালোবাসা অন্য এক জিনিস। ‘Silent, But Dominant’ কথাটা বোধহয় বাবাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রেই খাটে। একজন মা যখন তার প্রতিটি আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সন্তানটির জন্য ভালোবাসা ব্যক্ত করেন, একজন বাবা সেখানে থাকেন নিশ্চুপ। পর্দার আড়ালে থেকেই তিনি সন্তানের প্রতিটি কার্যকলাপ সম্পর্কে খেয়াল রেখে যান। মুখ ফুটে কদাচিৎ হয়তো তিনি সন্তানের প্রতি অনুভূতি প্রকাশ করেন, তবে মুখে ফুটে উঠা ভাবভঙ্গি দিয়েই তিনি ভালোবাসা প্রকাশে সক্ষম!

প্রাণিজগতের অন্যান্য প্রজাতিতেও বাবারা বেশ ভালোই সার্ভিস দেয়। মা প্রাণীর ডিম পাড়ার পর সেটি দেখাশোনা করা, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে তার লালনপালন করার মতো গুরু দায়িত্বগুলো বাবারাই পালন করে থাকে। একজন আদর্শ বাবা কেমন হতে পারেন তার চমৎকার উদাহরণ হতে পারে সেসব প্রাণী। তেমনই কিছু প্রাণীর গল্প শোনাতেই আজকের এ লেখা।

পেঙ্গুইন (Penguin)

ডিম পাড়ার পরপরই মা পেঙ্গুইন ডিমটি দিয়ে দেয় বাবাটির দিকে। এরপর শুরু হয় বাবার সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব। বাচ্চা বেরোবার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ ডিমটি আগলে রাখে বাবা। বাচ্চাটি যতদিনে ডিমের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে, ততদিনে বাবার উপোসের প্রায় চার মাস হয়ে যায়!

মা ফিরে আসার আগে যদি বাচ্চা ডিম থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে বাবা নিজের খাদ্যনালী থেকে এক ধরনের পুষ্টিকর খাবার তার সন্তানকে খেতে দেন। নিজের কোলে নিয়েই বড় করতে থাকেন সন্তানকে। ঠান্ডার হাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বাবা তাকে পায়ের উপরে নিয়েই ঘুরে বেড়ান।

কমন মিডওয়াইফ টড (Common Midwife Toads)

এ প্রজাতির স্ত্রী ব্যাঙেরা যখন ডিম পাড়ে, তখন সেগুলো জেলীর মতো এক ধরনের আঠালো পদার্থে আটকানো থাকে। এরপর সেগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে বাবাদের ঘাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর আগে ৩-৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সেগুলো বয়ে বেড়ায় বাবা ব্যাঙেরা। এ সময় ডিমের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে তারা ঘুরে বেড়ায় নানা আর্দ্র জায়গায়।

রেড ফক্স (Red Fox)

বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর প্রথম এক মাস পর্যন্ত এ প্রজাতির স্ত্রী খেঁকশেয়ালরা তাদের ডেরা ছেড়ে বেরোতে পারে না। সন্তানের লালনপালন, খাওয়াদাওয়া, উষ্ণ রাখার মতো কাজগুলো করতে করতেই কেটে যায় মায়ের প্রতিটি মুহুর্ত। আর এ সময় বাবা খেঁকশেয়ালের দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর সেবা-যত্ন করা।

স্ত্রী যতদিন না তার ডেরা থেকে বেরোতে পারছে, ততদিন ৪-৬ ঘন্টা পরপর তার খাবার যোগানোর গুরুদায়িত্ব কিন্তু স্বামীরই। এখানে সে আদর্শ স্বামী, তাহলে আদর্শ বাবা কীভাবে? জনাব, মা সুস্থ থাকলেই তো তার সন্তানেরা সুস্থ থাকবে, তাই না?

এ তো গেলো পরোক্ষভাবে সন্তানদের দেখাশোনার কথা, প্রত্যক্ষভাবেও কিন্তু বাবা তার দায়িত্ব পালন করে পুরোপুরিই। বাচ্চার বয়স যখন তিন মাস ছোঁয় তখনই বাবা তার আসল কাজটি শুরু করে- ‘ভবিষ্যতের জন্য সন্তানকে গড়ে তোলা’। মানবসমাজ হলে নাহয় এ ‘গড়ে তোলা’র মানে হতো সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, কিন্তু শেয়াল সমাজে তো আর সেই কথা খাটবে না। সেখানে ‘গড়ে তোলা’র মানে সন্তানকে শিকার করার জন্য প্রস্তুত করে তোলা। এজন্য বাবা খেঁকশেয়াল তাদের উদ্বৃত্ত খাবারের কিছু অংশ ডেরার আশেপাশেই গর্ত করে লুকিয়ে রাখে, ঢেকে দেয় গাছের ঝরে পড়া পাতা ও ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে।

ছোট্ট শেয়ালছানাটির তখন দায়িত্ব পড়ে সেগুলো খুঁজে বের করার। এভাবেই খেলার ছলে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে শেয়ালছানাটি, গভীর হতে থাকে বাবার সাথে তার ভালোবাসার বন্ধন।

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

ছবিতে দেখানো মাছটির নাম ইয়েলো-হেডেড জফিশ। স্ত্রী ডিম পাড়ার পরই শুরু হয় তার স্বামীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- ডিমগুলোর দেখাশোনা করা। আর এ দেখাশোনার জন্য পুরুষটি ডিমগুলো একেবারে মুখে পুরে নেয়! সাধারণত ৭-৯ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। এতদিন ধরে সন্তানদের মুখে নিয়েই ঘুরে বেড়ায় বাবা। আর মুখে সন্তানদের স্থান দেয়ার ফলে কিছু খেতেও পারে না সে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর পরই মেলে তার মুক্তি!

সী হর্স (Sea Horse)

সমুদ্রের পানিতে বাস করা ঘোড়ামুখো এ প্রাণীদের পুরুষ প্রজাতিরাও কিন্তু বাবা হিসেবে বেশ দায়িত্ববান। স্ত্রী সী হর্স ডিম পেড়ে সেগুলো পুরুষ সঙ্গীর গায়ে থাকা থলেতে জমা করে। সেখানে চলতে থাকে ডিমগুলোর লালনপালন। এভাবে চলে প্রায় দেড় মাস। এরপর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর সময় হয়, বাবা তার সন্তানদেরকে তখন পেশীর সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে সমুদ্রের নোনা পানির জগতের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়।

এতক্ষণ ধরে প্রাণিজগতে বাবাদের ভালো ভূমিকা পড়ে যদি মানব-বাবা হিসেবে বেশ ভালো লাগা শুরু করেন, তাহলে এবার দেখা যাক মুদ্রার উল্টো পিঠও।

ব্যাস (Bass)

জন্মানোর পর অসহায় বাচ্চাগুলোকে দেখাশোনার কাজ অত্যন্ত যত্ন সহকারেই করে থাকে মাছটি। শিকারী মাছের হাত থেকে রক্ষা করা কিংবা দলবদ্ধভাবে সন্তানদের নিপুণভাবে পরিচালনাও করে। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার আচরণ একেবারে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে যায়। বাংলায় প্রচলিত ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’ প্রবাদের বাস্তব উদাহরণ হয়ে যায় বাবা ব্যাস মাছ। সে-ই এখন তার সন্তানদের ধরে ধরে খেতে শুরু করে!

এ সময় বাবার রাক্ষুসে স্বভাব থেকে কৌশল খাটিয়ে রেহাই পাওয়া বাচ্চা ব্যাসেরাই তাদের বংশের ধারা অব্যাহত রেখে যায়। একসময় তারাও বাবা হয়, তারাও তাদের বাচ্চাদের খেতে শুরু করে, কিছু বাচ্চা আবারো বেঁচে যায়। এভাবেই চলতে থাকে বাবার গ্রাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য সন্তানদের প্রজন্মান্তরের এ সংগ্রাম।

চিত্রঃ ব্যাস মাছ।

স্যান্ড গোবি (Sand Goby)

ব্যাসদের মতো স্যান্ড গোবিদের বাসও সমুদ্রে। তারাও দায়িত্ববান বাবার মতোই ডিমগুলোর দেখাশোনা করতে থাকে। কিন্তু ডিমগুলো যেই না পরিপক্ব হয়ে ওঠে, সাথে সাথেই বাবাদের আচরণ যায় বদলে। আশেপাশে যত খাবারই থাকুক না কেন, বাবা তার নিজের ডিমই খেতে শুরু করে দেয়। এভাবে নিজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সন্তানকে খেয়ে তবেই থামে বাবা স্যান্ড গোবি।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাবারা সাধারণত বড় ডিমগুলো খেয়ে থাকে। বড় ডিম মানেই বেশি পুষ্টি উপাদান, তাই তো? আসলে কিন্তু তা না। বাবা স্যান্ড গোবি জানে বড় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে বেশি সময় লাগবে। কিন্তু অতদিন চুপচাপ পাহারা দেয়ার ধৈর্য যে তার নেই! তাই বড়গুলোকে খেয়ে অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্যবান সন্তানগুলোকে ছেড়ে দেয় সে। তাহলেই ডিম দেখাশোনার দায়িত্ব থেকে মুক্তি মেলে তার। এরপরই সে বেরিয়ে পড়ে নতুন সঙ্গিনীর খোঁজে। নতুন করে মিলিত হবার আশায়!

চিত্রঃ স্যান্ড গোবি মাছ।

গ্রিজলি বিয়ার (Grizzly Bears)

এ ভালুকগুলোর দেখা মেলে উত্তর আমেরিকায়। ছোটবেলায় ইতিহাস পড়ার সময় আমরা দেখেছি, সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে কিংবা সেটি দখল করতে বিভিন্ন সময়ই মায়ের পেটের ভাইয়েরাও একে অপরের শত্রুতে পাল্টে গেছে। শৈশবে একসাথে খেলাধুলা করা ভাইকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাতে কিংবা কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ছুঁড়ে ফেলতে অপর ভাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। মাঝে মাঝে এমন ঘটনা নিজেদের বাবা-মায়ের সাথেও ঘটেছে। প্রাণিজগতে এমন স্বভাবের সার্থক উদাহরণ এ গ্রিজলি বিয়ার।

নিজেদের এলাকার মাঝে অন্য কারো অনুপ্রবেশ মেনে নিতে নারাজ এ প্রজাতির বাবা ভালুকেরা। কখনো কখনো তাদের সেই এলাকা ১,৫০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। বিশাল এ এলাকায় যদি কারো অনুপ্রবেশ নজরে পড়ে তার, হোক না সে তার আপন সন্তান, তাকে খুন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না বাবারা। এজন্য মা ভালুকেরা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকে। ভুলেও যেন আদরের সন্তানটি তার বাবার এলাকায় পা না রাখে, সেই ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে সে।

বাবাদের সরব-নীরব ভালোবাসায় ভরে উঠুক প্রতিটি সন্তানের জীবন, এ কামনায় আজকের লেখাটি এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

১. thescienceexplorer.com

২. mentalfloss.com

featured image: pets4homes.co.uk

অটোকী সাইফার- গোপন বার্তা আদান-প্রদান এবং ‘কী’ না জেনেও তা ভাঙ্গার কৌশল

আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগেকার কথা। ইতালীয় আইনজ্ঞ ফাজিও কার্দানো ও চিয়ারা মিচেরির ভালোবাসার ফলস্বরুপ ১৫০১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর অধিবাসীদের তালিকায় নাম যোগ হয় এক ছেলের, বাবার নামের সাথে মিলিয়ে যার নাম রাখা হয় জিরোলামো কার্দানো। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, জিরোলামো তার বাবা-মায়ের বৈধ সন্তান ছিল না। জন্মগত এ অবৈধতা তার বাকি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিরুপ প্রভাব ফেলেছে বিভিন্নভাবে।

মানুষের ভেতরে যদি আসলেই কোনো গুণ থাকে তাহলে একদিন যে তা ঠিকই প্রকাশ পায়, মানুষের জন্ম নয় বরং কর্মই যে অমর করে রাখে, বাকি জীবন জুড়ে এ কথাগুলোর বাস্তব প্রমাণই দিয়ে গেছেন জিরোলামো কার্দানো।

রেনেসাঁ যুগের সেরা গণিতবিদ বলে স্বীকৃত কার্দানো ছিলেন একাধারে একজন গণিতবিদ, চিকিৎসক, জীববিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিষী, দার্শনিক, লেখক ও জুয়াড়ি! পরবর্তী সময়ে তার কাজের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন ব্লেইজ প্যাসকেল, পিয়েরে দ্য ফার্মা, আইজ্যাক নিউটন, গটফ্রেড লিবনিজ, মারিয়া অ্যাগনেসি, জোসেফ লুইস ল্যাগ্রাঞ্জ ও কার্ল ফ্রেডরিখ গাউসের মতো মানুষেরা।

অনাগত ভবিষ্যতের বুকে নিজের নামটি খোঁদাই করে রাখতে মানুষের প্রচেষ্টার কোনো অন্ত নেই। জিরোলামো কার্দানোও ছিলেন এমনই একজন। জীবদ্দশায় মোট ২৪২ টি বই লিখেছিলেন তিনি! এর মাঝে ১৩১ টি বই তাঁর জীবিত অবস্থাতেই প্রকাশিত হয়। বাকি ১১১ টি পান্ডুলিপিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। দুই শতাধিক বইয়ে তিনি কী নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তা জিজ্ঞেস না করে বরং কী নিয়ে আলোচনা করেননি তা জিজ্ঞেস করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষশাস্ত্র, দাবা, পদার্থবিজ্ঞান, জুয়া, আত্মার অমরত্ম, সক্রেটিসের ভাবধারা, রত্ন, বিষ, বাতাস, পানি, পুষ্টিবিদ্যা, স্বপ্ন, মূত্র, দাঁত, সঙ্গীত, নীতিশাস্ত্র ইত্যাদি বহুবিধ বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেছেন তিনি।

মজার ব্যাপার হলো, আমাদের আজকের আলোচ্য ক্রিপ্টোলজির অটোকী সাইফার (Autokey Cipher) নিয়ে কিন্তু কার্দানোর আলাদা কোনো বই নেই। তার সর্বাধিক বিক্রিত দুটি বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ে তিনি ক্রিপ্টোলজি সম্বন্ধে অল্প বিস্তর আলোচনা করেছিলেন অবশ্য।

এর মাঝে প্রথমটি ছিল De Subtilitate। এ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৫৫০ সালে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে কার্দানোর চমৎকার উপস্থাপনা পাঠক সমাজকে সহজেই আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। বইটির সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাই ছয় বছর পর তিনি বের করেন এর দ্বিতীয় খন্ড- De Rerum Varietate। বিপুল জনপ্রিয়তার ফলে দুটি বই-ই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং নকল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপ জুড়ে।

অটোকী সাইফারকে অটোক্লেভ (Autoclave) সাইফারও বলা হয়ে থাকে। এ সাইফারে Key বানানো হয় Plain Text এর উপর ভিত্তি করে অর্থাৎ অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চলতে থাকে এর Key। এজন্য Key-এর আগে Auto বসিয়ে সাইফারটির নাম হয়েছে Autokey সাইফার। এ সাইফারের সাহায্যে কোনো মেসেজকে এনক্রিপ্ট করতে আমাদের দরকার একটি টেবুলা রেক্টা (Tabula Recta) টেবিল।

এনক্রিপশন

ধরা যাক, আমরা যে মেসেজটি এনক্রিপ্ট করবো সেটি হলো- “To be prepared is half the victory”। এটি মিগুয়েল ডি সার্ভেন্টেসের উক্তি। ধরে নিই, আমাদের Key হলো Miguel। যেহেতু অটোকী সাইফারে আমাদের দরকার Keystream, তাই Plain Text এর সাথে Keystream-কে সাজাতে হবে নিচের মতো করেঃ

ভালো করে একবার Keystream সাজানোর পদ্ধতিটি দেখুন। প্রথমে আমি Key Miguel লিখেছি। এরপর থেকে Plain Text এর মেসেজটিই হুবহু লিখে গিয়েছি। এভাবে Plain Text এর শেষ পর্যন্ত Keystream লিখে যেতে হবে। এখানে Key নিজে বারবার না এসে Plain Text-ই Keystream এ রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে।

এবার আসা যাক দ্বিতীয় ধাপে। এখন আমাদের টেবুলা রেক্টার সাহায্য লাগবে। পাশের চিত্র দ্রষ্টব্য। আমরা প্রথম যে বর্ণটি এনক্রিপ্ট করবো তা হলো ‘t’। তাহলে টেবুলা রেক্টার একেবারে উপরের সারি থেকে (গাঢ় কাল অক্ষর) প্রথমেই t এর নিচে থাকা Keystream ‘m’ কে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর একেবারে বামের কলাম থেকে (গাঢ় কালো অক্ষর) Plaintext ‘t’ কে খুঁজতে হবে।

m ও t থেকে যদি আমরা যথাক্রমে উপর থেকে নিচে এবং বাম থেকে ডানে এগোই তাহলে তারা পরস্পরকে F এ ছেদ করবে। অর্থাৎ F হলো t এর এনক্রিপ্ট করা রূপ।

এবার আসা যাক Plaintext এর ২য় বর্ণ ‘o’তে। এর নিচে থাকা Keystream হলো ‘i’। এবারও আগের মতোই টেবুলা রেক্টার সবার উপরের সারি থেকে i এবং একেবারে বামপাশের কলাম থেকে o-কে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর I থেকে নিচে এবং o থেকে ডানে এগোতে থাকলে একসময় তারা পরস্পরকে W-এ ছেদ করবে। অর্থাৎ W হলো o এর এনক্রিপ্ট করা রূপ।

এভাবে Plain Text এর বাকি বর্ণগুলোকেও টেবুলা রেক্টা ও Keystream এর সাহায্যে এনক্রিপ্ট করা যাবে। পুরো মেসেজটি এনক্রিপ্ট করলে তাহলে আমরা পাচ্ছিঃ

ডিক্রিপশন

ধরা যাক, আমাদের কাছে এনক্রিপ্ট করা একটি মেসেজ এসেছে যেখানে লেখা আছে- BIOXJZA BG FSZK”। প্রেরক আমাদের জানিয়েছে, এ মেসেজের Key হলো ‘Game’। এবার মেসেজটি ডিক্রিপ্ট করে মূল মেসেজ বের করাই আমাদের লক্ষ্য। প্রথমেই তাহলে আগের মতো করে একটি টেবিলে Keystream ও Cipher Text সাজিয়ে নেয়া যাক। যেহেতু আমরা Keystream-এর কেবল ‘game’ অংশটুকু জানি, তাই বাকি ঘরগুলো ফাঁকা রাখতে হবে।

এখন আবারো যেতে হবে টেবুলা রেক্টার কাছে। Cipher Text এ আমাদের প্রথম বর্ণ ‘B’। অন্যদিকে Keystream-এ প্রথম বর্ণ ‘g’। টেবুলা রেক্টার একেবারে উপরের সারি থেকে প্রথমে তাই g-কে খুঁজে বের করতে হবে। এরপর g-এর কলাম ধরে নিচে নামতে হবে যতক্ষণ না B-কে পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ। B পাওয়া গেলে এরপর সেখান থেকে একেবারে বামের কলামে যে বর্ণটি আমরা পাবো সেটিই হবে B এর ডিক্রিপ্ট করা বর্ণ। এক্ষেত্রে এটি V। নিচের চিত্রে পুরো ব্যাপারটি দেখানো হয়েছে।

যেহেতু আমরা Plain Text এর একটি বর্ণ পেয়েছি তাই টেবিলকে নিচের মতো করে আপডেট করে নিতে হবে। এনক্রিপশনের সময় আমরা দেখেছিলাম, Keystream এ Key এর পর থেকেই Plain Text শুরু হচ্ছে। এবারও তাই ‘game’ এর পরই এসেছে ‘V’।

এবার আসা যাক Cipher Text এর দ্বিতীয় বর্ণ I এর কাছে। এক্ষেত্রে Keystream হলো ‘a’। তাহলে আগের মতো করেই প্রথমে টেবুলা রেক্টার উপরের সারি থেকে ‘a’ খুঁজে সেখান থেকে নিচে নেমে ‘I’ কে বের করতে হবে। I থেকে একেবারে বামের কলামে গেলে আমরা পাবো এর ডিক্রিপ্ট করা রূপ। এক্ষেত্রে সেটি ‘I’।

আবারো আগের মতো করে টেবিলকে নিচের মতো করে আপডেট করতে হবেঃ

এভাবে Cipher Text এর বাকি বর্ণগুলোকেও Keystream আর টেবুলা রেক্টার সাহায্যে ডিক্রিপ্ট করলে আমরা মূল মেসেজটি পেয়ে যাবো।

গল্প করতে করতে কখন যে আপনাকে একজন পলিম্যাথের আবিষ্কার করা একটি সাইফার সিস্টেম শিখে নিলাম তা নিজেও খেয়াল করিনি! তবে ঠান্ডা মাথায় পুরো পদ্ধতিটুকু যদি আপনি পড়ে থাকেন, তাহলে নিঃসন্দেহে মাথা খাটানোর অনেক কিছুই আছে এখানে।

দুর্গে ফাটল

এতক্ষণ ধরে অটোকী সাইফার নিয়ে পড়ার পর যে কেউই মেনে নিতে বাধ্য যে এ সাইফারটি বেশ সুরক্ষিত। কিন্তু সুরক্ষিত এ দুর্গের কি কোনো ফাটল নেই? অবশ্যই আছে। এবার সেই ফাটলেই সাথেই পরিচিত হওয়া যাক।

অটোকী সাইফারের Keystream বানানো হয় Plain Text কে ব্যবহার করে। Plain Text এ কোনো বহুল ব্যবহৃত শব্দ আসতেই পারে; যেমন- AND, THE ইত্যাদি। এ শব্দগুলোকে ক্লু হিসেবে ব্যবহার করেই পুরো অটোকী সিস্টেমকে ডিক্রিপ্ট করা সম্ভব।

ধরে নিচ্ছি, আমাদের কাছে একটি একটি মেসেজ এসেছে যাতে লেখা আছে PKBNEOAMMHGLRXTRSGUEWX। আমাদেরকে এটাও বলে দেয়া হয়েছে যে, এখানে অটোকী সাইফার ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু Key জানা না থাকায় আমরা Plain Text পর্যন্ত যেতে পারছি না। কাজে এগোনোর স্বার্থে ধরে নিই, Plain Text এ ‘THE’ শব্দটি অন্তত একবার হলেও এসেছে। তাহলে ‘THE’ Keystream-এও এসেছে ধরে নিয়ে এগোনো যাক।

Keystream এর প্রতিটি ঘরে THE বসালে আমাদের হাতে থাকে Keystream ও Cipher Text। তখন একটু আগেই আলোচনা করা ডিক্রিপশনের নিয়মটি অনুসরণ করলে আমরা নিচের টেবিলটি পাবোঃ

Keystream এ THE এর অবস্থান সামনে-পেছনে নিয়ে আমরা নিচের আরো দু’ধরনের বিন্যাস পেতে পারি।

এখন এ তিনটি টেবিল ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা যাক। আমরা মূলত এখন ঘোরাঘুরি করবো Plain Text এর ঘরগুলোতে। সেখানে কোনো অর্থপূর্ণ শব্দাংশ খুঁজে বের করাই আমাদের লক্ষ্য।

যেমন- ২য় টেবিলের ‘ihw’ কিংবা ৩য় টেবিলের ‘skt’ একেবারেই নিরর্থক। কিন্তু ৩য় টেবিলেরই ‘tac’ কিংবা ‘ako’ এর কোনো শব্দাংশ হবার সম্ভাবনাকে একেবারে নাকচ করে দেয়া যায় না। আমরা তাই ‘tac’ নিয়ে এগোবো। যেহেতু অটোকী সাইফারে একই জিনিস Plain Text ও Keystream এ থাকে, তাই আমাদের আলোচ্য THE ও tac এ দু’জায়গায়ই আছে বলে ধরে নিচ্ছি।

প্রথমে মনে করি, আমাদের অজানা Key এর দৈর্ঘ্য ৪ অর্থাৎ এটি ৪টি বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত। তাহলে Plain Text এ থাকা the এর t থেকে Keystream এর THE এর T ৪ বর্ণ পরিমাণ দূরে থাকবে। একই কথা বলা যাবে tac এর ক্ষেত্রেও।

Plain Text ও Keystream এর ঘরগুলো যথাক্রমে ‘the’, ‘tac’, ‘THE’ ও ‘TAC’ দিয়ে পূরণ করার পর যে ঘরগুলো বাকি থাকবে সেগুলোকে পূর্বে আলোচনা করা এনক্রিপশন-ডিক্রিপশনের পদ্ধতিতে টেবুলা রেক্টার সাহায্যে ভরাট করতে হবে। যে ঘরগুলো এভাবে ভরাট করতে হবে, পরবর্তী টেবিলে সেগুলো ডিম্বাকৃতির বক্সের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে।

এখান থেকে পাওয়া ‘yxr’ Plain Text শব্দাংশ হিসেবে গ্রহণযোগ্য না। তাই নিচের টেবিল দুটোতে যথাক্রমে ৫ ও ৬ বর্ণবিশিষ্ট Key ধরে এগোনো হয়েছে। এ টেবিল দুটোতেও যে ঘরগুলো ফাঁকা থাকবে তা টেবুলা রেক্টা দিয়ে পূরণ করতে হবে।

উপরের টেবিল দুটি থেকেও আমরা কোনো গ্রহণযোগ্য শব্দাংশ (‘etp’ ও ‘arq’) পেলাম না। তাই এখন আমরা ‘tac’ বাদ দিয়ে এখন ‘ako’ দিয়ে এগোতে থাকবো। তাহলে আবার এ অংশের শুরুতে আলোচনা করা তিনটি টেবিলের মাঝে তৃতীয়টির শরণাপন্ন হতে হবে। Key এর দৈর্ঘ্য এক এক করে বৃদ্ধি করে এগোনো যাক।

প্রথমে Key এর দৈর্ঘ্য ৪। তখন Plain Text হিসেবে পাওয়া ‘uui’ কোনো গ্রহণযোগ্য শব্দাংশ হতে পারে না। তবে Keystream অংশে থাকা ‘NEN’ এর সেই সম্ভাবনা আছে।

অনুসন্ধান চলতে থাকুক আগের মতোই। নিচের টেবিল দুটিতে Key এর দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৫ ও ৬।

শেষের টেবিলের Keystream এ পাওয়া ‘TAC’ ও Plain Text এ পাওয়া ‘wn’ দুটোরই অর্থপূর্ণ শব্দাংশ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন আগের মতোই এগোতে হবে আমাদের। যেহেতু ‘TAC’ Keystream এ আছে, সুতরাং এটি Plain Text-এও থাকবে। সেক্ষেত্রে আমরা নিচের টেবিলটি পাবো। এ টেবিলে কিন্তু ঠিক আগের টেবিলের তথ্যগুলোই আছে। ফলে এখানেও Key এর দৈর্ঘ্য ৬-ই থাকছে।

দুর্গের ফাটল এতক্ষণে ধরা দিতে শুরু করেছে। আমরা ধরেছিলাম, Keystream এ Key এর দৈর্ঘ্য ৬। উপরের টেবিলের Keystream এ ‘INC’ দখল করেছে যথাক্রমে ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম স্থান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ‘INC’ এর সামনে-পেছনে বর্ণ বসিয়ে একে ৬ বর্ণের একটি Key-তেই রূপান্তর করা সম্ভব! কীভাবে?

‘Prince’ কিংবা ‘Flinch’ এর মতো শব্দ যে ঠিকই আছে ইংরেজী শব্দের ভান্ডারে! রাজপুত্র অর্থাৎ Prince কে দিয়েই তাহলে সম্ভাব্য জয়যাত্রা শুরু করা যাক। Key হিসেবে Prince লেখার পর এর উপরের Plain Text এর ফাঁকা জায়গাগুলো টেবুলা রেক্টার সাহায্য নিয়ে পূরণ করা হয়েছে।

কী আনন্দ! আরেকটি অর্থপূর্ণ শব্দ পেয়ে গেলাম আমরা, ‘attack’! আক্রমণ আরো জোরদার করা দরকার এখন। দূর্গের দেয়াল ভেঙে পড়তে বুঝি আর বেশি দেরি নেই আমার ক্লান্ত সৈনিকেরা। ঐ তো দেয়ালের পাথরগুলো এক এক করে খসে পড়ছে। যেহেতু Key পাওয়া গেছে, তাহলে এখন Plain Text কে Keystream এ বসানো শুরু করতে পারি আমরা। এভাবে PRINCE এর পর ATTACK আসলে নিচের টেবিলটি পাবো আমরা।

এভাবে Plain Text এর ফাঁকা জায়গাগুলো টেবুলা রেক্টার সাহায্যে এবং Keystream এর ফাঁকা জায়গাগুলো আবার Plain Text এর সাহায্যে ভরাট করলেই একসময় আমরা পেয়ে যাবো আমাদের কাঙ্ক্ষিত মেসেজ- ‘attack at the break of dawn’।

মারহাবা, মারহাবা! শত্রুপক্ষের দুর্গ একেবারেই ভেঙে পড়েছে। অনেক মাথা খাটিয়ে বিজয়ের সন্ধান পেলাম আমরা অবশেষে।

প্রকৃতপক্ষে অটোকী সাইফারের Key জানা না থাকলেও কীভাবে তার মর্মোদ্ধার করা যায় তার খুব সহজ উদাহরণ ছিল এটি। এখানে এমন একটি মেসেজই দেয়া হয়েছে যাতে ‘THE’ শব্দটি ছিল। বাস্তবে কিন্তু অনেক শব্দ ঘাটাঘাটি করে পরেই পাওয়া যেতে পারে কাঙ্ক্ষিত শব্দটি!

আবার আমরা কিন্তু ‘tac’ দিয়ে কাজ না হবার পরপরই সোজাসুজি ‘ako’-তে চলে এসেছি। বাস্তব জগতের সমস্যা এতটা সহজ হবে এমন আশা করা বৃথা! Key হিসেবে আমরা এ উদাহরণে পেয়েছি Prince যা একটি শব্দ। কিন্তু তথ্যের সুরক্ষার জন্য কেউই প্রকৃতপক্ষে চেনা-পরিচিত কোনো শব্দ ব্যবহার করবে না। বরং অর্থহীন কোনোকিছু এক্ষেত্রে বেশি সুরক্ষা দিবে।

ক্রিপ্টোলজির নিয়মিত পাঠকেরা আজকের এ লেখার মাধ্যমে অনেক উঁচু কোনো পাহাড়কে ছোঁয়ার আনন্দ পেয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস। সাথেই থাকুন, কারণ সামনে আসছে আরো অসাধারণ সব সাইফার, অসাধারণ অনেক ঐতিহাসিক কাহিনী যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অ্যাডভেঞ্চার।

featured image: disneydude-94.deviantart.com

নেপোলিয়নের হারানো ‘সম্পদ’

এখনো মনে পড়ে বাংলা ২য় পত্র পড়ার সময় রচনার জন্য বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির বাণী খুঁজতাম। এর মাঝে নেপোলিয়নের বাণীগুলো বেশ প্রচলিত ছিল। ‘শ্রমের মর্যাদা’ অথবা ‘অধ্যবসায়’ পড়ার সময় Impossible is a word to be found only in the dictionary of fools। ‘সংবাদপত্র’ রচনায় এর ভয়াবহ দিক নিয়েও ছিল তার উক্তি, Four hostile newspapers are more to be feared than a thousand bayonets। এছাড়া ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ছবির সাথে ক্যাপশন দেখেছি A picture is worth a thousand words যা আসলে নেপোলিয়নেরই উক্তি।

চিত্রঃ নেপোলিয়নের প্রতিকৃতি।

চমৎকার, উদ্দীপনামূলক এসব উক্তির জনক নেপোলিয়নের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে খুবই কষ্টের মাঝে। বন্দী করার পর তাকে আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। এখানেই এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ১৮২১ সালের ৫ মে মারা যান তিনি। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চি ময়নাতদন্ত শেষে মৃত্যুর কারণ হিসেবে পাকস্থলীর ক্যান্সারের কথা জানান। পরবর্তীতে অবশ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম হয়, যেখানে দাবি করা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার পানীয়র সাথে আর্সেনিক প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে খুন করা হয়েছিল তাকে। সর্বশেষ ২০০৭-০৮ সালের দিকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উড়িয়ে দিয়ে বলা হয় পেপটিক আলসার ও গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারই নেপোলিয়নের মৃত্যুর কারণ। আজকের কাহিনী শুরু হচ্ছে নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর থেকেই।

ডাক্তার ফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চি ১৭৮০ সালের ৫ জুলাই ফ্রান্সের কর্সিকা দ্বীপের মর্সিগ্লিয়া কমিউনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর তিনি সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। চলে যান সেখানে। নেপোলিয়নের মৃত্যুর

আগ পর্যন্ত তিনি এ পদেই বহাল ছিলেন। তবে চিকিৎসাশাস্ত্রে অ্যান্টোম্মার্চির দক্ষতায় খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না নেপোলিয়ান। বেশ কয়েকবারই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। একবার চিন্তা করুন তো, আপনার অফিসের বস যদি আপনাকে বার বার বলে, “You are fired” কিন্তু তবুও দুর্ব্যবহার করে আপনাকে রেখেই দেয় তাহলে তার প্রতি কি আপনার কোনো শ্রদ্ধাবোধ অবশিষ্ট থাকবে? এই কাল্পনিক অংশটুকুর কথা মাথায় রাখুন।

চিত্রঃ ফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চি।

ময়নাতদন্তের টেবিলে পড়ে আছে নেপোলিয়নের নিথর দেহ। সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নেপোলিয়নের বাড়িতেই সারা হয়েছিল এই আনুষ্ঠানিকতা। সেদিন লাশটির চারদিকে ছিলেন মোট ১৭ জন মানুষ। এদের মাঝে ছিলেন কয়েকজন ব্রিটিশ ও ফরাসী কর্মকর্তা, ৭ জন ব্রিটিশ ডাক্তার, নেপোলিয়নের দুজন সহকারী, ফাদার আঞ্জে ভিগনালি এবং আলী নামক এক ভৃত্য। এদের সকলের সামনেই নেপোলিয়নের যকৃৎ, পাকস্থলী ও পুরুষাঙ্গ (!) কেটে ইথাইল অ্যালকোহল ভর্তি এক জারে রাখেন অ্যান্টোম্মার্চি। অনেকেই অবশ্য ধারণা করেন, অ্যান্টোম্মার্চি ইচ্ছে করে পুরুষাঙ্গটি কাটেননি। বরং দুর্ঘটনাবশতই ওটা কেটে যায়। আবার অনেকেই অ্যান্টোম্মার্চির প্রতি নেপোলিয়নের পুরনো বিদ্বেষের গন্ধও এখানে খুঁজে পান। আসল কারণ যা-ই হোক, যা যাওয়ার তা তো চলেই গেল!

নেপোলিয়নের জীবনী লেখক রবার্ট অ্যাসপ্রে অবশ্য দাবি করেছেন অন্য কথা। তার মতে, অ্যান্টোম্মার্চি আর ভিগনালি হয়তো লাশটি নিয়ে কিছু সময় আলাদা থাকতে পেরেছিলেন। তখনই এ ঘটনাটি ঘটতে পারে। ওদিকে ১৮৫২ সালে প্রকাশিত এক স্মৃতিকথায় আলী জানায়, সেদিন ময়নাতদন্তের এক ফাঁকেই সে এবং ভিগনালি নেপোলিয়নের শরীরের কিছু অংশ কেটে ফেলে। এ ‘কিছু অংশ’ নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গকেও বোঝাচ্ছে কিনা তা অবশ্য নিশ্চিত না। তবে অনেকের মতে এসময়ই আসলে ওটা কাটা হয়ে গিয়েছিল।

ওদিকে নেপোলিয়নের ময়নাতদন্তের কিছু সময় পরই প্যারিসে গুঁজব ছড়িয়ে পড়ে যে ডাক্তারের সহকারীরা রক্তাক্ত বিছানার চাদর, দাঁত, নেইল ক্লিপিং, পাঁজরের কিছু টুকরা, চুলের গোছা এবং নাড়ী-ভুড়ি গোপনে সরিয়ে ফেলেছে। অ্যান্টোম্মার্চি নিজেও নেপোলিয়নের ডেথ মাস্ক ও অন্ত্রের দু’টুকরো নিয়ে সটকে পড়েন। তিনি এগুলো লন্ডনে তার বন্ধুদের কাছে রেখে যান।

নেপোলিয়নের শেষকৃত্যানুষ্ঠান তিনিই পরিচালনা করেছিলেন। উইল মারফত তিনি ১,০০,০০০ ফ্রাঙ্ক লাভ করেন। এছাড়া সম্রাটের ছুরি, কাটা চামচ, একটি রূপার কাপ এবং আরো কিছু ব্যক্তিগত জিনিসও তিনি পান। প্রায় দু’দশক পর ব্রিটিশ সরকার নেপোলিয়নের দেহাবশেষ প্যারিসে নিয়ে আসার অনুমতি দেয়। তখন এক অকাজ করে ভিগনালির আত্মীয়-স্বজনেরা। তারা নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গটি রেখে দেয় নিজেদের কাছে!

১৯১৬ সাল পর্যন্ত নেপোলিয়নের ব্যবহার্য বিভিন্ন দ্রব্যাদি ও শরীরের অংশবিশেষ ভিগনালির বংশধরদের কাছেই থাকে। ১৯১৬-তে তারা এগুলো নিলামে তুলে। সেখানে নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গের ক্যাটালগে লেখা ছিল, ‘a mummified tendon taken from [Napoleon’s] body during post-mortem’। এক ব্রিটিশ বইয়ের ফার্ম সেগুলো কিনে নেয়। পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে তারা এগুলো ফিলাডেলফিয়ার এ.এস.ডব্লিউ. রোসেনবাকের কাছে ২,০০০ ডলারে বিক্রি করে দেয়। এর কয়েক বছর পর রোসেনবাক নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অফ ফ্রেঞ্চ আর্টে চমৎকার নীল রঙের মরক্কো চামড়া (ছাগলের ছাল থেকে তৈরি নরম ও পাকা চামড়া) ও মখমলের চাদরে পুরুষাঙ্গটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। তৎকালীন এক পত্রিকা এ নিয়ে লিখেছিল, ‘In a glass case [spectators] saw something looking like a maltreated strip of buckskin shoelace or shriveled eel’।

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ ভুলেও বিখ্যাত হতে যাবেন না। বিখ্যাত হয়েছেন, তো নেপোলিয়ানের মতো হারিয়েছেন।১৯৬৯ সালে সংগ্রহগুলো নিয়ে আসা হয় লন্ডনে। কিন্তু নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গটি তখন বিক্রি হয়নি। আট বছর পর প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক নিলাম থেকে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. জন কে. ল্যাটিমার প্রায় ২,৯০০ ডলারে পুরুষাঙ্গটি কিনে নেন। তিনি ছিলেন আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় একজন ইউরোলজিস্ট। কলাম্বিয়া প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতাল থেকে এক্স-রে করে তিনি নিশ্চিত হয়ে নেন যে এটি আসলেই একটি পুরুষাঙ্গ। এরপর তিনি এটি নিয়ে চলে আসেন নিউ জার্সিতে তার বাসায়। সেখানে ২০০৭ সালে তার মৃত্যুর আগপর্যন্ত এটি তার খাটের নিচে রাখা সুটকেসেই বন্দী ছিল। পরবর্তীতে তার মেয়ে এটি বিক্রির জন্য ১,০০,০০০ ডলার দাবি করেন। এটি তিনি শুধু লেখক Tony Perrottet-কেই দেখিয়েছেন যিনি দেখার পর বলেছেন, ‘certainly small, shrunken to the size of a baby’s finger, with white shriveled skin and desiccated beige flesh’। নেপোলিয়নের হারানো সম্পদের বর্ণনা আজ এখানেই শেষ করছি। ধন্যবাদ।

তথ্যসূত্র

১. en.wikipedia.org

২. www.straightdope.com

৩. www.wondersandmarvels.com

প্রজেক্ট সীলঃ সমুদ্রের বুকে মানবসৃষ্ট সুনামী

২০০৪ সালের কথা। তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সেদিন খবর দেখতে টিভি চালু করেই বেশ বড় রকমের ধাক্কা খেলাম। স্ক্রিনের নীচে ভেসে চলা ব্রেকিং নিউজে দেখাচ্ছে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামির খবর। একটু পরেই ঢেউয়ের তোড়ে গাড়ি-বাড়ি-নৌকা-মানুষ ভেসে যেতে দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষমতা যে এত ভয়াবহ হতে পারে সেদিন স্বচক্ষে দেখেও যেন তা বিশ্বাস হচ্ছিল না। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ সংঘটিত সেই দুর্যোগের জন্য দায়ী ছিল ৯.১ – ৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্প, যার ফলশ্রুতিতে মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২ লক্ষ ৩০ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৮০ হাজারের মতো। নীচের ছবিগুলো দেখলেই সুনামিটির ভয়াবহতা আঁচ করা সম্ভব।

‘সুনামি’ একটি জাপানী শব্দ যার অর্থ পোতাশ্রয়ে ঢেউ। ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, সমুদ্রের তলদেশে কোনো বিষ্ফোরণ, আগ্নেয়গিরির উদ্‌গীরণ ইত্যাদির প্রভাবে নদী, সাগর প্রভৃতি জলাধারে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসকে বলে সুনামি।

প্রজেক্ট সীলের শিরোনামে কেন সুনামির কথা বলছি? এর উত্তর কিছু দূর গেলেই পাওয়া যাবে। তার আগে প্রাসঙ্গিক আরেকটি বিষয় সম্পর্কে জেনে নেই। ‘টেকটোনিক ওয়েপন’ এটি এমন একটি হাইপোথেটিক্যাল যন্ত্র বা প্রক্রিয়া যার সাহায্যে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে চাহিদামতো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্ম দেয়া যাবে! ১৯৯২ সালে রুশ বিজ্ঞান একাডেমির অ্যালেক্সে সেভোলোভিদিচ নিকোলায়েভ এটির সংজ্ঞা

দিয়েছিলেন এভাবে- “A tectonic or seismic weapon would be the use of the accumulated tectonic energy of the Earth’s deeper layers to induce a destructive earthquake”।

‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ এই শব্দ দুটি কানে গেলেই মানসপটে দু’জোড়া শব্দ ভেসে ওঠে- ‘অ্যাডল্‌ফ হিটলার’ এবং ‘পারমাণবিক বোমা’। হিটলার কিংবা পারমাণবিক বোমা যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরই প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে তা বোধহয় না বললেও চলে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানুষ তার স্বজাতির উপর কত রকম অমানবিক অত্যাচার, নির্যাতন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে তার ইতিহাস কম-বেশি আমাদের সবারই জানা। আবার এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করতে আশ্রয় নিয়েছিল নানান রকমের কৌশলের। পাশাপাশি উদ্ভাবন করেছিল ভয়ানক সব মারণাস্ত্র। প্রজেক্ট সীল ছিল তেমনই এক মারণাস্ত্র উদ্ভাবনের পরিকল্পনা।

প্রায় ৭০ বছর আগেকার কথা। ১৯৪৪ সালের দিকে মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার ই. এ. গিবসন এক অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন, সাগরের পানিতে ডুবে থাকা বিভিন্ন প্রবাল প্রাচীর দূরীকরণে যে বিষ্ফোরণ ঘটানো হয় তার ফলে বেশ বড় রকমের ঢেউয়ের উৎপত্তি ঘটে। এখান থেকেই তার মাথায় অন্য এক পরিকল্পনা জন্ম নিল- আচ্ছা, এ ঢেউকে কাজে লাগিয়ে কি শত্রুপক্ষের কোনো নির্দিষ্ট এলাকাকে ভাসিয়ে দেয়া যায় না? যেমন চিন্তা তেমন কাজ। সাথে সাথেই যোগাযোগ করলেন নিউজিল্যান্ডের চিফ অব জেনারেল স্টাফ স্যার এডওয়ার্ড পুটিকের সাথে, খুলে বললেন তার বিস্তারিত পরিকল্পনা। গিবসনের পরিকল্পনাটি মনে ধরলো পুটিকের। তাই তিনি যুদ্ধ পরিষদের পরবর্তী সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। সেখানেও প্রস্তাবটিকে সমর্থন করে সবাই। ফলে সিদ্ধান্ত হলো আমেরিকা এবং নিউজিল্যান্ড যৌথভাবে নিউ ক্যালিডোনিয়ায় প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে।

এখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রজেক্ট সীল। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল- ‘আক্রমণের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে তৈরী জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে প্লাবন তৈরির সম্ভাব্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করা’।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণাগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস লীচ। গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হচ্ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার কমান্ডার অ্যাডমিরাল হ্যালসিকে। হ্যালসি প্রাথমিক পরীক্ষার ফলাফলে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, নিউজিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষকে তিনি অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রজেক্টটি যথাসম্ভব এগিয়ে নিতে। তিনি চাইছিলেন মানবসৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে শত্রুপক্ষের বিভিন্ন স্থাপনা যতদূর সম্ভব ভাসিয়ে দিতে। এজন্য তিনি লিখেছিলেন- “আমার মতে- এ পরীক্ষাগুলোর ফলাফল বলছে যে, উভচর যুদ্ধে শত্রুপক্ষের এলাকা প্লাবিত করে দেয়া বেশ সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী এক সম্ভাবনময় আক্রমণাত্মক যুদ্ধাস্ত্র হতে পারে।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণামূলক কাজগুলো বেশ দ্রুততার সাথেই এগোচ্ছিল। ১৯৪৪ সালের ৫ মে নিউজিল্যান্ডের যুদ্ধ পরিষদে হ্যালসির প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রফেসর লীচের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অ্যারে রিসার্চ ইউনিট, যার কাজ ছিল একেবারেই নতুন ঘরানার এ বোমাটি নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো। প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই ইউনিটটি। তাদের কাজের জন্য ঠিক করা হয়েছিল হ্যাঙ্গাপারাওয়া উপদ্বীপে অবস্থিত একটি দূর্গ। এখানেই গোপনীয়তার সাথে এগিয়ে চলেছিল প্রজেক্ট সীলের কাজকারবার। এগোচ্ছিল স্বজাতিকে শেষ করার আরো কার্যকরী পদ্ধতি উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা। প্রজেক্টের কাজগুলো মূলত নিউজিল্যান্ডের প্রকৌশলীরাই করতেন কিন্তু বিষ্ফোরক সরবরাহ করা কিংবা আদেশ দেয়ার কাজটি করে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রই।

প্রজেক্টটি সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে বিপুল পরিমাণ বিশেষায়িত উপকরণের প্রয়োজন ছিল। এগুলোর মাঝে ছিল রিমোট-ওয়েভ রেকর্ডিং ডিভাইস, রেডিও কন্ট্রোল্‌ড ফায়ারিং মেকানিজম, মেরিন এক্সপ্লোসিভ ইত্যাদি। ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীদেরও সমুদ্রে বিষ্ফোরণ ঘটানোর এ মহাযজ্ঞ নিয়ে আগ্রহের কমতি ছিল না। তাই একদল ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল প্রজেক্টটির অগ্রগতি দেখে যাবার জন্য।

নতুন আঙ্গিকে গঠিত হবার পর প্রজেক্ট সীলের প্রথম পরীক্ষামূলক বিষ্ফোরণটি ঘটানো হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ৬ জুন। আর এটি চলেছিল পরের বছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।

প্রজেক্ট সীলের পুরো সময়কাল জুড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টি সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। বোমাগুলো দিয়ে কৃত্রিমভাবে সুনামির মতো পরিস্থিতি তৈরি করাই ছিল উদ্দেশ্য, তাই এগুলোর এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। বোমাগুলোতে বিষ্ফোরকের পরিমাণ কয়েক গ্রাম থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত পরিবর্তন করে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। বিষ্ফোরক হিসেবে মূলত টিএনটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে কখনো কখনো নাইট্রো-স্টার্চ কিংবা গেলিগনাইটও ব্যবহার করা হতো।

শুরুতে অবশ্য প্রজেক্ট সীলের গবেষকেরা ভুল উপায়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। ব্রিটিশরাও সমুদ্রের তলদেশে বিষ্ফোরণ নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল। তাদের কাজ থেকে ধারণা করা হচ্ছিল যে, বোমটি সমুদ্রের যত তলদেশে থাকবে, বিষ্ফোরণের ফলে সৃষ্ট গ্যাসের বুদবুদ ততটাই কার্যকর উপায়ে নির্ধারিত এলাকায় প্লাবন ঘটাতে সক্ষম হবে। অবশ্য পরবর্তীতে প্রজেক্ট সীলের অনেক অনেক গবেষণার পর ব্রিটিশদের সেই তত্ত্বটি বাতিল হয়ে যায়। তারা দেখান, বোমটি সমুদ্রপৃষ্ঠের যত কাছাকাছি থাকবে, এটি ততই কার্যকর ঢেউ তৈরি করে প্লাবনের উদ্ভব ঘটাতে সক্ষম হবে। গবেষকেরা সেই সাথে বুঝেছিলেন, মাত্র একটি বোমার বিষ্ফোরণ দিয়ে সৃষ্ট ঢেউয়ের সাহায্যে কেবল ঢেউয়ের বুকে সার্ফিং করাই সম্ভব, শত্রুর স্থাপনা ভাসিয়ে নেয়া তো বহু দূরের কথা। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন একসাথে অনেকগুলো সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানোর।

এজন্য প্রায় ২০ লক্ষ কেজি বিষ্ফোরক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। বিষ্ফোরককে সমান ১০ ভাগে ভাগ করে সমুদ্র উপকূল থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে বিষ্ফোরিত করলেই তা সমুদ্রের বুকে ভয়াবহ আলোড়ন তুলতে সক্ষম হবে। এর ফলে ১০ – ১২ মিটার উচ্চতার যে ঢেউ তৈরি হবে সেটিই ভাসিয়ে দিবে শত্রুর সব স্থাপনা। তবে এখানেও সমস্যা ছিল। গবেষকরা দেখেছিলেন, সমুদ্রের কতটা তলদেশে বোমটি রাখা হচ্ছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। কারণ উচ্চতার সামান্য হেরফেরও ঢেউয়ের শক্তি অনেকখানি কমিয়ে দিচ্ছিল।

প্রজেক্ট সীল যখন শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে যাচ্ছিল, তখন একে পারমাণবিক বোমার বিকল্প হিসেবেই ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে এসে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে। তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মিত্রপক্ষের আধিপত্য বিস্তার পেতে শুরু করে। এর ফলে ধীরে ধীরে প্রজেক্ট সীলের মাধ্যমে তৈরি সুনামি বোমার সাহায্যে কৃত্রিম সুনামী তৈরির প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৮ জানুয়ারি প্রজেক্টটি বন্ধই করে দেয়া হয়। তখন পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য কোনো সুনামী বোমা বানানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি, সবই ছিল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। তাই বাস্তবক্ষেত্রে এ বোমাটির কার্যকারিতা কেমন হতে পারে তা আসলে কেউই আর বলতে পারবে না।

প্রজেক্ট সীলের আয়ু ফুরিয়ে গেলেও ১৯৫০ সালে অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের চল্লিশের দশকের সেই প্রজেক্টটি নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে দেখা গেছে। রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল- The Generation of Waves by Means of Explosives।

১৯৯৯ সালে নিউজিল্যান্ডের মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স এন্ড ট্রেড প্রজেক্ট সীলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কিত তথ্য সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। বর্তমানে এ সংক্রান্ত তথ্যাদি ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের জাতীয় আর্কাইভে এবং ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোতে অবস্থিত স্ক্রিপ্‌স ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফি আর্কাইভসে রাখা আছে।

এতক্ষণ ধরে একবারও বলিনি ঠিক কোনো দেশকে আক্রমণ করতে এ বোমাটি বানানো হচ্ছিল। প্রতিবার শুধু ‘শত্রুপক্ষ’ কথাটি লিখেই পার পেয়ে গেছি। আসলে ১৯৯৯ সালে যে গোপন নথিগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল, সেখানেও বিশেষ কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছিলেন তখন বেঁচে থাকা প্রজেক্ট সীলেরই এক সদস্য। ১৯৯৯ সালে তার বয়স ছিল ৮৭ বছর।

তার মতে, প্রজেক্টটিতে কাজ করা সবাই জানতো যে এই বোমা জাপানকে ভাসিয়ে দিতেই তৈরি করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র

 (১) en.wikipedia.org/wiki/Tsunami_bomb
 (২) nbr.co.nz/article/best-kept-secret-world-war-two-—-project-seal-tsunami-bomb-ck-134614
 (৩) cnsnews.com/news/article/new-details-emerge-world-war-ii-tsunami-bomb-project

গোপন গোয়েন্দা যন্ত্র

“The number one benefit of information technology is that it empowers people to do what they want to do. It lets people be creative. It lets people be productive. It lets people learn things they didn’t think they could learn before, and so in a sense it is all about potential.”- Steve Ballmer

তথ্য-প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভ বলমারের উক্তিটির জুড়ি খুঁজে পাওয়া আসলেই ভার। কেননা তথ্য ছাড়া আজকের দিনে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরেই কেউ বসেন পেপারের পাতা উল্টাতে, কেউ স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্লাইড করতে, কেউ আবার টেলিভিশন চালু করে রিমোট কন্ট্রোলের বাটনে ঝড় তুলতে। উপরে উল্লেখিত তিন শ্রেণির মানুষের সবার উদ্দেশ্যই এক- ‘তথ্য জানা’।

চা বানাবেন? তাহলে আগে আপনাকে জানতে হবে চায়ের পাতি ঘরে আছে কিনা সেই তথ্য। ভাত খাবেন? তাহলে আগে খোঁজ নিন চালের ড্রামে চাল আছে কিনা সেদিকে। গোসল করবেন? তাহলে আগে জানতে হবে পানির ট্যাংকিতে পানি আছে কিনা সেই খবরটি। এগুলো তো দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত দরকারি কিছু তথ্যের নমুনা। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা, পড়াশোনা, গবেষণাসহ জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তথ্য ছাড়া আমরা চলতে পারবো। ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হোক না কেন, এতক্ষণ ধরে তথ্যের এতসব উপযোগিতা তুলে ধরার পর একে যদি দ্বিতীয় অক্সিজেন বলা হয়, তাহলে কি খুব বেশি কিছু বলা হয়ে যাবে?

এবার আসুন পরবর্তী প্রশ্নে- ‘আসলেই কি পৃথিবীর সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত?’ না-বোধক উত্তর দিতে কেউ এক মুহুর্তের জন্যও দেরি করবে না। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় কিছু ব্যাপার স্যাপার আছে যা গুটিকতক আস্থাভাজন লোক ছাড়া আর কারো কাছেই প্রকাশ করা হবে না। একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কখনোই চাইবে না যে তার পানীয় বানানোর রেসিপি সবাই জেনে যাক। সারা পৃথিবীতে অসংখ্য গুপ্ত সংঘ আছে, আছে নানা অপরাধী চক্রও। তারাও কোনোদিন চায় না তাদের ভেতরের তথ্য কোনোদিন বাইরে পাচার হয়ে যাক। অর্থাৎ জায়গামতো সবাই নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষায় শতভাগ সচেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে কি গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া কখনো থেমেছে? অবশ্যই না। হাল আমলের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেনরা আমাদের সামনে রয়েছেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। এছাড়া ইতিহাসের পাতা উল্টালেও এমন শত শত মানুষের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর আঙিনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ছদ্মবেশে, খুঁজেছেন কিছু অত্যন্ত দরকারি তথ্য। কেউ সফল হয়ে জীবন নিয়ে ফেরত আসতে পেরেছেন, কেউবা ব্যর্থ হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের জীবনটিই বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের আজকের আলোচনা এ গোপন তথ্যানুসন্ধান নিয়েই। গোপন তথ্যানুসন্ধানের নানা কৌশলের ইতিহাস দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখাটি।

বেলী বাস্টার

1

গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বেলী বাস্টার নামের এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতো সিআইএ। দেয়াল ছিদ্র করে তাতে গোপনে শত্রুপক্ষের কথাবার্তা শোনার জন্য কোনো ডিভাইস রেখে দেয়াই ছিলো এর মূল উদ্দেশ্য। পুরো যন্ত্রটি ঠিকমতো জোড়া লাগানোর পর এর ড্রিল বিটের অপর প্রান্ত পেটের সাথে সজোরে চেপে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়াল ছিদ্র করার কাজটি সারা হতো।

লেটার রিমুভার

2

ধরুন, শত্রুপক্ষের খামে আটকানো একটি চিঠি সৌভাগ্যক্রমে আপনার হাতে এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি চাইবেন চিঠিটি পড়ে দেখতে। একইসাথে আপনার শত্রু যেন ব্যাপারটি বুঝতে না পারে এটাও আপনি চাইবেন। তো এজন্য আপনাকে চিঠিটি এমনভাবে বের করতে হবে যেন চিঠিও বেরোয়, আবার খামেরও কোনো ক্ষতি না হয়। এমন কাজ সারার জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হতো সরু লেটার রিমুভার। খামের একেবারে উপরের কোনা, যেখানে আঠা খুব কমই লাগানো হয়, সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো ডিভাইসটি। তারপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিঠিকে পেঁচিয়ে ফেলা হতো এর সাথে। তারপরই ধীরে ধীরে বের করে আনা হতো আকাঙ্ক্ষিত চিঠি।

স্টেরিওস্কোপ

3

স্টেরিওস্কোপ (Stereoscopy) শব্দটি এসেছে দুটি গ্রীক শব্দ স্টেরিওস (দৃঢ়) ও স্কোপিও (দেখা) থেকে। এ পদ্ধতিতে একজন দর্শকের বাম ও ডান চোখের জন্য একই ছবি কিছুটা আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ দুটো দ্বিমাত্রিক ছবিকে আমাদের মস্তিষ্ক তখন প্রক্রিয়াজাত করে ত্রিমাত্রিক ছবি দেখার অনুভূতি দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ নানা স্টেরিওস্কোপিক ছবি দেখেই শত্রুপক্ষের সম্পর্কে ধারণা নিতো। এজন্য প্রথমে তারা এরোপ্লেন থেকে শত্রুর এলাকার নানা ছবি তুলে আনতো। তারপর এসব স্টেরিওস্কোপের সাহায্যে সেসব ছবির ত্রিমাত্রিক ধারণা নেয়ার চেষ্টা করতেন ছবি বিশ্লেষকেরা।

ড্রাগনফ্লাই ইনসেক্টোথপ্টার

4

ঘরের ভেতর একটি ফড়িং কিংবা প্রজাপতি উড়ে বেড়ালে আপনি কি কিছু মনে করবেন? অবশ্যই না। বরং এক নজর সেদিকে চোখ বুলিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিবে অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এ প্রাণীটি যদি জৈবিক না হয়ে যান্ত্রিক হয়? যদি সে জৈবিক প্রাণীর ছদ্মবেশে আপনার উপরই নজরদারি করতে থাকে তাহলে কেমন হবে? ছবিতে আসলে এমনই একটি ইউএভি (আনম্যান্‌ড এরিয়াল ভেহিকল) দেখানো হয়েছে। ১৯৭০ সালের দিকে সিআইএ’র রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে বানানো হয়েছিলো ফড়িংয়ের মতো দেখতে এ ডিভাইসটি যা নানা তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হতো।

মাইক্রোডট ক্যামেরা

5

গোপনে ছবি তোলার নানা কৌশল বিভিন্ন অ্যাকশন বা থ্রিলার সিনেমায় দেখেছি। এরই এক বাস্তব উদাহরণ হলো এই মাইক্রোডট ক্যামেরা। কোনো ছবি কিংবা টেক্সটকে আকারে অনেক ছোট করে কোনো ছোট ডিস্কে ধারণ করার কৌশলকে বলা হয় মাইক্রোডট। মাইক্রোডটগুলো সাধারণত বৃত্তাকার এবং ১ মিলিমিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। তবে চাহিদামতো এর আকার কিংবা আকৃতি পরিবর্তন করা যায়। গত শতাব্দীতে চলা কোল্ড ওয়্যারের সময় বিবিন্ন গোপন তথ্যের আদান-প্রদানের কাজে এটি ব্যবহার করা হতো। হাতের আংটি, ফাঁপা কয়েন ইত্যাদি নানা জায়গায় মাইক্রোডট লুকিয়ে রাখা যেতো।

ম্যাচবক্স ক্যামেরা

6

হাতে একটি ম্যাচবক্স নিয়ে যদি আপনি ঘোরাঘুরি করেন, তাহলে অধিকাংশ মানুষই ভাববে আপনি হয়তো সিগারেট ধরাতে যাচ্ছেন। ম্যাচবক্সের ভেতর যে দেশলাইয়ের কাঠি ছাড়া অন্য কিছুও থাকতে পারে এটা কেউ চিন্তাই করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির নাম ছিলো ‘অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (ওএসএস)’। একে বর্তমানের সিআইএ’র পূর্বপুরুষও বলা যেতে পারে। এ ওএসএস-এর জন্যই ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি তৈরি করেছিলো এসব ম্যাচবক্স ক্যামেরা। এগুলোর ভেতরে দেশলাইয়ের কাঠির বদলে ভরা থাকতো আস্ত ক্যামেরা। আর একজন গোয়েন্দা যে দেশে যাচ্ছেন, তিনি সেই দেশের প্রচলিত কোনো ম্যাচের মোড়ক এর গায়ে লাগিয়ে নিলেই কাজ হয়ে যেতো। তখন কেউ আর সন্দেহের অবকাশ পেতো না যে লোকটি সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে নাকি তার দেশের নিরাপত্তায় আগুন জ্বালাচ্ছে!

ডেড ড্রপ স্পাইক

7

মনে করুন, কোনো একটি এলাকায় কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য দুজন ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে। তারা যদি একসাথে কোথাও দেখা করেন তাহলে শত্রুপক্ষ সন্দেহ করার অবকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু এমনটা হতে দেয়া যাবে না। আবার মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের মাঝে কিছু তথ্যের বিনিময়ও দরকার। কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহও করতে না পারে।

এমন পরিস্থিতির জন্য আসলে বানানো হয়েছিলো এ ডেড ড্রপ স্পাইক। এর ভেতরের ফাঁপা জায়গায় দরকারি তথ্য ভরে তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জায়গায় মাটিতে পুঁতে রেখে যেতো এক এজেন্ট। পরে অন্যজন এসে সুবিধামতো তা তুলে নিয়ে যা বোঝার বুঝে নিতো।

পিজিয়ন ক্যামেরা

8

নামটা দেখেই ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেছে, তাই না? ভাবছেন কবুতর দিয়ে আবার ছবি তোলানো হতো নাকি অতীতে? আসলে আপনি যা ভাবছেন তার আংশিক সত্য, আংশিক আপনার অজানা যা এখন আপনাকে জানাবো। আসলে ছবিগুলো তোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো কবুতরকে। ১৯০৭ সালে জার্মান ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা জুলিয়াস নিউব্রোনার এর উদ্ভাবন করেন। কোনো পোষা কবুতরের গায়ে ছোট ও হালকা এ ক্যামেরাগুলো লাগিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেয়া হতো। ছবি তোলার জন্য ছিল সেলফ টাইম ডিলে মেকানিজম। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর আপনাআপনিই ছবি উঠতে থাকতো, কবুতরটির কাজ ছিল শুধু জায়গামতো উড়ে যাওয়া। তবে প্রযুক্তির অগ্রসরতা একসময় এ কৌশলকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়। সেই সাথে কবুতরগুলোকে ঠিকমতো ট্রেনিং দেয়া, বাড়তি একটি জিনিস নিয়ে উড়তে অভ্যস্ত করানো, জায়গামতো সে আসলেই যাবে কিনা, তার গতি ইত্যাদি নানা বিষয় কবুতর দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর নজরদারিকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।

গোপন সংকেত দেখানো আয়না

9

এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। একজন মহিলাকে যদি আপনার সামনে ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করেনিজের চেহারা সাজাতে দেখেন, তাহলে আপনি কী ভাববেন? নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিবেন, “আরে ভাই, এত ভাবার কী আছে? উনার সাজার ইচ্ছা হইছে, তাই আয়না বের করে সাজতেছে। আর কী?”

আসলে ঘটনার মোড় লুকিয়ে আছে এখানেই। কারণ নারী এজেন্টদের জন্য এমন আয়নাও ছিল (হয়তো এখনো আছে) যা দিয়ে সবার সামনে তিনি হয়তো সাজগোজ করতেন। কিন্তু আসলে সেটি থাকতো বিশেষ এক ধরনের আয়না যা একটু বিশেষ কোণে ধরলে ভেসে উঠতো তার মিশনের গোপন কোনো কোড! সেখান থেকে সহজেই পরবর্তী নির্দেশনা নিতে পারতেন তিনি।

পালিয়ে যাবার মানচিত্র

সিল্কের উপর প্রিন্ট করা এই মানচিত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন এজেন্টের পালিয়ে যাবার পথ চিনিয়ে দেয়া। তবে কাপড়ের উপর আঁকা বলে একজন চাইলে কৌশল হিসেবে এটিকে গায়ে জড়িয়ে কিংবা ভাঁজ করে রাখতে পারতেন। পানিরোধী রং দিয়ে এটি আঁকা হতো বলে যদি এজেন্টকে সাঁতরানো লাগতো, তাহলেও ভয়ের কিছু ছিল না। চুপচাপ জলাশয়ের অন্য পাড়ে গিয়ে শুকিয়ে নিলেই চলতো।

ফাঁপা কয়েন

10

বাইরে থেকে এ কয়েনটিকে নিরেট মনে হলেও আসলে এটি ফাঁপা! এর ভেতরে করে সহজেই কোনো ফিল্ম বা মেসেজ বিনিময় করা যেতো।

মিনক্স ক্যামেরা

11

লাটভিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্টার জ্যাপ ১৯৩৭ সালে এ ক্যামেরাটির ডিজাইন করেন। খুব সহজেই একে হাতের তালুর ভেতর লুকিয়ে রাখা যেতো। এর সাহায্যে তোলা ছবিগুলোর মানও ছিল বেশ ভালো। ফলে গোয়ান্দাগিরির কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলোর মাঝে এটিই শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

অনাহূত অতিথি দূরীকরণ

19

নিজের বাড়িতে অন্যের ছড়ি ঘোরানো কেউই সহ্য করতে পারে না। আর সেটা যদি হয় কোনো এলাকা বা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন, তাহলে তো কথাই নেই। অবৈধভাবে যেন একজন মানুষও কোনো বিশেষ স্থানে ঢুকে পড়তে না পারে এজন্য নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীর প্রচেষ্টার অন্ত নেই। ছবিতে দেখানো ডিভাইসটি এমন কাজেই ব্যবহার করা হতো। মেটে রঙের বলে সহজে কারো চোখে ধরাও পড়ে না এটি। ভূ-কম্পনের সাহায্য নিয়ে তিনশ মিটার দূর থেকে এটি মানুষসহ অন্যান্য যেকোনো কিছুর আগমনকে শনাক্ত করতে পারতো। ছোট ব্যাটারি দিয়ে চালিত এ ডিভাইসে থাকতো বিল্ট-ইন এন্টেনা। এটি কোড করা পালসের সাহায্যে কোনো তথ্য পাঠাতে পারতো।

সিগারেট ক্যারিয়ারে ক্যামেরা

12

যাদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাদের অনেকেই কেবল দোকানে কিনতে পাওয়া প্যাকেটের উপর নির্ভর করেন না। বরং নিজের খুশি মতো বাজার থেকে কিনে নেন চমৎকার কোনো বক্স। কোথাও যখন কেউ সেই বক্স থেকে সিগারেট বের করে, তখন কেউ ঐ বক্সের দিকে ওভাবে তাকায়ও না। আর এ জিনিসটি মাথায় রেখেই ছোট এ ক্যামেরাটি বানানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। একে সহজেই সিগারেটের বক্সে লুকিয়ে রাখা যেতো।

বোতামে লুকোনো ক্যামেরা

13

কোট-টাই পরে যখন আপনি সবার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন সবাই কিন্তু আপনার কাপড়ের রং-মান এসবই খেয়াল করে ঠিকমতো। কাউকে শোনা যায় না বোতামের দিকে তাকিয়ে থেকে সেটির ভালো-মন্দ বিচার করতে।

এ বিষয়টি খেয়াল করেই বিচিত্র এক কৌশল অবলম্বন করেছিল কেজিবি। গত শতকের সত্তরের দশকে তারা অ্যাজাক্স নামের বোতামের ভেতর লুকানো এ ক্যামেরার ডিজাইন করে। ক্যামেরার লেন্স থাকতো ডানদিকের মাঝের বোতামে। যখনই সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়তো, তখনই একজন গোয়ান্দা তার পকেটে থাকা ক্যামেরার শাটারে চাপ দিতেন। সাথে সাথে উঠে যেতো ছবি। কেউই বুঝতে পারতো না!

জুতার নিচে ট্রান্সমিটার

14

গোপন তথ্য সংগ্রহের কৌশল যে আসলে শরীরের সম্ভাব্য সব জায়গাকেই ব্যবহার করেছে এ জুতাটি তার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। ১৯৬০-৭০ সালের দিকে আমেরিকান কূটনীতিকদের উপর নজর রাখতে এটি ব্যবহার করতো রোমানিয়ার সিক্রেট সার্ভিস। কূটনীতিকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে ব্যবহার করতেন না। নিজেদের দেশ থেকেই দরকারি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। রোমানিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা সেগুলো পোস্ট অফিসে আটক করে আগে সেখানে ছবিতে দেখানো উপায়ে ট্রান্সমিটার লাগিয়ে তারপর ছাড়পত্র দিতো। এরপর সেই কূটনীতিকের যাবতীয় আলাপ-আলোচনা সহজেই তারা রেকর্ড করে রাখতে পারতেন!

বিষ্ঠার ভেতরেও ট্রান্সমিটার

15

রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় যখন গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি নানা প্রাণীর মল আমাদের চোখের সামনে পড়ে, তখন সাবধানে পা সরিয়ে হেঁটে যাই আমরা সবাই। দুর্গন্ধময় ওসব জিনিস কে ঘাঁটাতে যাবে? এজন্যই সিআইএ মলের মতো দেখতে এই ট্রান্সমিটারটি ডিজাইন করেছিল যেন কেউ এটা নাড়াতে আগ্রহী না হয়। শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোতে আগেই এগুলো রেখে আসা হতো। এরপর এগুলো সিগনাল পাঠাতো আকাশে থাকা পাইলটদের। সেখান থেকেই এ সিগনাল অনুসরণ করে তারা বোম নিক্ষেপ করে আবার নির্বিঘ্নে ফেরত যেতো।

ঘড়ির ভেতর ক্যামেরা

16

শার্টের বোতাম, হাতের তালু আর সিগারেটের বক্সে যদি ক্যামেরা রাখা যায়, তাহলে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ঘড়িই বা বাদ যাবে কেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির এক এজেন্টের কাছে এমন ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল। এর মূল সমস্যা হলো আন্দাজের উপর ভিত্তি করে ছবি তুলতে হতো। কারণ চোখ রেখে যার বা যে জিনিসের ছবি তোলা হচ্ছে সেটি দেখার ব্যবস্থা এতে রাখা হয়নি। একেকটি ফিল্মে আটটি করে ছবি তোলা যেতো।

গাছের ভেতর বাগ

17

এখন যে গোপন তথ্য চুরির পদ্ধতি বলতে যাচ্ছি সেটা বেশ চমৎকার। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুর দিককার কথা। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন একটি কৃত্রিম কাটা গাছের মতো অংশে একটি বাগ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর এটিকে তারা মস্কোর বাইরে এক গাছপালা ঘেরা জায়গায় এমনভাবে স্থাপন করলেন যেন সহজেই একটি সোভিয়েত মিসাইল সিস্টেমের রাডার ও কমিউনিকেশন সিগনালের উপর তারা নজরদারি করতে পারেন! প্রাপ্ত সিগনালগুলো এখানে সংরক্ষণ করে পরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানো হতো। এর উপরের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করে ভেতরের সোলার ব্যাটারিগুলো চার্জের ব্যবস্থা করতো। এতকিছু করেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কেজিবি একসময় ঠিকই বাগটির অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

ফাউন্টেন পেন

ক্যামেরা নিয়ে আজ বোধহয় বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, তাই না? কিন্তু কী করবো বলুন? কারণ এ ক্যামেরা লুকোনোর পদ্ধতিগুলোই যে ছিল বেশ চমৎকার।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে ফাউন্টেন পেনের ভেতর ট্রোপেল লেন্স লুকিয়ে রাখার কৌশল নেয় সিআইএ। বিভিন্ন দলিলপত্র কিংবা যন্ত্রের ছবি গোপনে তুলতেই একে কাজে লাগানো হতো। যেমন- এখানে যে ফাউন্টেন পেনটি দেখা যাচ্ছে সেটি ব্যবহার করতেন আলেকজান্ডার ওগোরোদনিক, যার কোড নেম ছিল ট্রাইগন। তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র সোভিয়েত কূটনীতিক। সিআইএ তাকে হাত করে নিয়েছিল। ওগোরোদনিক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি কেজিবির হাতে ধরা পড়ে যান। অবশ্য কেজিবি তার কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি। এর আগেই তিনি সিআইএর কাছ থেকে পাওয়া পয়জন পিল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

আপাতত বিদায় নিচ্ছি গোপনীয়তার জগত থেকে। পরবর্তী কোনো লেখায় আশা করি গোপনীয়তায় ভরপুর অন্য কোনো জগতের গল্প নিয়ে সবার সামনে আবার হাজির হবো।

লেখকঃ মুহাইমিনুল ইসলাম

সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি

fb.com/muhaiminul.islamantik

প্রাণিজগতের নানান বাবাদের গল্প

শৈশবে যারা সত্যিকার অর্থেই বাবার ভালোবাসা পেয়েছে তারা জানে বাবার ভালোবাসা অন্য এক জিনিস। ‘Silent, But Dominant’ কথাটা বোধহয় বাবাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রেই খাটে। একজন মা যখন তার প্রতিটি আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সন্তানটির জন্য ভালোবাসা ব্যক্ত করেন, একজন বাবা সেখানে থাকেন নিশ্চুপ। পর্দার আড়ালে থেকেই তিনি সন্তানের প্রতিটি কার্যকলাপ সম্পর্কে খেয়াল রেখে যান। মুখ ফুটে কদাচিৎ হয়তো তিনি সন্তানের প্রতি অনুভূতি প্রকাশ করেন, তবে মুখে ফুটে উঠা ভাবভঙ্গি দিয়েই তিনি ভালোবাসা প্রকাশে সক্ষম!
প্রাণিজগতের অন্যান্য প্রজাতিতেও বাবারা বেশ ভালোই সার্ভিস দেয়। মা প্রাণীর ডিম পাড়ার পর সেটি দেখাশোনা করা, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে তার লালনপালন করার মতো গুরু দায়িত্বগুলো বাবারাই পালন করে থাকে। একজন আদর্শ বাবা কেমন হতে পারেন তার চমৎকার উদাহরণ হতে পারে সেসব প্রাণী। তেমনই কিছু প্রাণীর গল্প শোনাতেই আজকের এ লেখা।

পেঙ্গুইন (Penguin)

ডিম পাড়ার পরপরই মা পেঙ্গুইন ডিমটি দিয়ে দেয় বাবাটির দিকে। এরপর শুরু হয় বাবার সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব। বাচ্চা বেরোবার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ ডিমটি আগলে রাখে বাবা। বাচ্চাটি যতদিনে ডিমের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে, ততদিনে বাবার উপোসের প্রায় চার মাস হয়ে যায়! মা ফিরে আসার আগে যদি বাচ্চা ডিম থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে বাবা নিজের খাদ্যনালী থেকে এক ধরনের পুষ্টিকর খাবার তার সন্তানকে খেতে দেন। নিজের কোলে নিয়েই বড় করতে থাকেন সন্তানকে। ঠান্ডার হাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বাবা তাকে পায়ের উপরে নিয়েই ঘুরে বেড়ান।

কমন মিডওয়াইফ টড (Common Midwife Toads)

এ প্রজাতির স্ত্রী ব্যাঙেরা যখন ডিম পাড়ে, তখন সেগুলো জেলীর মতো এক ধরনের আঠালো পদার্থে আটকানো থাকে। এরপর সেগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে বাবাদের ঘাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর আগে ৩-৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সেগুলো বয়ে বেড়ায় বাবা ব্যাঙেরা। এ সময় ডিমের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে তারা ঘুরে বেড়ায় নানা আর্দ্র জায়গায়।

রেড ফক্স (Red Fox)

বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর প্রথম এক মাস পর্যন্ত এ প্রজাতির স্ত্রী খেঁকশেয়ালরা তাদের ডেরা ছেড়ে বেরোতে পারে না। সন্তানের লালনপালন, খাওয়াদাওয়া, উষ্ণ রাখার মতো কাজগুলো করতে করতেই কেটে যায় মায়ের প্রতিটি মুহুর্ত। আর এ সময় বাবা খেঁকশেয়ালের দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর সেবা-যত্ন করা। স্ত্রী যতদিন না তার ডেরা থেকে বেরোতে পারছে, ততদিন ৪-৬ ঘন্টা পরপর তার খাবার যোগানোর গুরুদায়িত্ব কিন্তু স্বামীরই। এখানে সে আদর্শ স্বামী, তাহলে আদর্শ বাবা কীভাবে? জনাব, মা সুস্থ থাকলেই তো তার সন্তানেরা সুস্থ থাকবে, তাই না?
এ তো গেলো পরোক্ষভাবে সন্তানদের দেখাশোনার কথা, প্রত্যক্ষভাবেও কিন্তু বাবা তার দায়িত্ব পালন করে পুরোপুরিই। বাচ্চার বয়স যখন তিন মাস ছোঁয় তখনই বাবা তার আসল কাজটি শুরু করে- ‘ভবিষ্যতের জন্য সন্তানকে গড়ে তোলা’। মানবসমাজ হলে নাহয় এ ‘গড়ে তোলা’র মানে হতো সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, কিন্তু শেয়াল সমাজে তো আর সেই কথা খাটবে না। সেখানে ‘গড়ে তোলা’র মানে সন্তানকে শিকার করার জন্য প্রস্তুত করে তোলা। এজন্য বাবা খেঁকশেয়াল তাদের উদ্বৃত্ত খাবারের কিছু অংশ ডেরার আশেপাশেই গর্ত করে লুকিয়ে রাখে, ঢেকে দেয় গাছের ঝরে পড়া পাতা ও ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে। ছোট্ট শেয়ালছানাটির তখন দায়িত্ব পড়ে সেগুলো খুঁজে বের করার। এভাবেই খেলার ছলে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে শেয়ালছানাটি, গভীর হতে থাকে বাবার সাথে তার ভালোবাসার বন্ধন।

রেড ফক্স (Red Fox)

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

ছবিতে দেখানো মাছটির নাম ইয়েলো-হেডেড জফিশ। স্ত্রী ডিম পাড়ার পরই শুরু হয় তার স্বামীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- ডিমগুলোর দেখাশোনা করা। আর এ দেখাশোনার জন্য পুরুষটি ডিমগুলো একেবারে মুখে পুরে নেয়! সাধারণত ৭-৯ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। এতদিন ধরে সন্তানদের মুখে নিয়েই ঘুরে বেড়ায় বাবা। আর মুখে সন্তানদের স্থান দেয়ার ফলে কিছু খেতেও পারে না সে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর পরই মেলে তার মুক্তি!

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

সী হর্স (Sea Horse)

সমুদ্রের পানিতে বাস করা ঘোড়ামুখো এ প্রাণীদের পুরুষ প্রজাতিরাও কিন্তু বাবা হিসেবে বেশ দায়িত্ববান। স্ত্রী সী হর্স ডিম পেড়ে সেগুলো পুরুষ সঙ্গীর গায়ে থাকা থলেতে জমা করে। সেখানে চলতে থাকে ডিমগুলোর লালনপালন। এভাবে চলে প্রায় দেড় মাস। এরপর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর সময় হয়, বাবা তার সন্তানদেরকে তখন পেশীর সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে সমুদ্রের নোনা পানির জগতের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়।
এতক্ষণ ধরে প্রাণিজগতে বাবাদের ভালো ভূমিকা পড়ে যদি মানব-বাবা হিসেবে বেশ ভালো লাগা শুরু করেন, তাহলে এবার দেখা যাক মুদ্রার উল্টো পিঠও।

সী হর্স

ব্যাস (Bass)

জন্মানোর পর অসহায় বাচ্চাগুলোকে দেখাশোনার কাজ অত্যন্ত যত্ন সহকারেই করে থাকে মাছটি। শিকারী মাছের হাত থেকে রক্ষা করা কিংবা দলবদ্ধভাবে সন্তানদের নিপুণভাবে পরিচালনাও করে। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার আচরণ একেবারে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে যায়। বাংলায় প্রচলিত ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’ প্রবাদের বাস্তব উদাহরণ হয়ে যায় বাবা ব্যাস মাছ। সে-ই এখন তার সন্তানদের ধরে ধরে খেতে শুরু করে! এ সময় বাবার রাক্ষুসে স্বভাব থেকে কৌশল খাটিয়ে রেহাই পাওয়া বাচ্চা ব্যাসেরাই তাদের বংশের ধারা অব্যাহত রেখে যায়। একসময় তারাও বাবা হয়, তারাও তাদের বাচ্চাদের খেতে শুরু করে, কিছু বাচ্চা আবারো বেঁচে যায়। এভাবেই চলতে থাকে বাবার গ্রাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য সন্তানদের প্রজন্মান্তরের এ সংগ্রাম।

চিত্রঃ ব্যাস মাছ।

স্যান্ড গোবি (Sand Goby)

ব্যাসদের মতো স্যান্ড গোবিদের বাসও সমুদ্রে। তারাও দায়িত্ববান বাবার মতোই ডিমগুলোর দেখাশোনা করতে থাকে। কিন্তু ডিমগুলো যেই না পরিপক্ব হয়ে ওঠে, সাথে সাথেই বাবাদের আচরণ যায় বদলে। আশেপাশে যত খাবারই থাকুক না কেন, বাবা তার নিজের ডিমই খেতে শুরু করে দেয়। এভাবে নিজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সন্তানকে খেয়ে তবেই থামে বাবা স্যান্ড গোবি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবারা সাধারণত বড় ডিমগুলো খেয়ে থাকে। বড় ডিম মানেই বেশি পুষ্টি উপাদান, তাই তো? আসলে কিন্তু তা না। বাবা স্যান্ড গোবি জানে বড় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে বেশি সময় লাগবে। কিন্তু অতদিন চুপচাপ পাহারা দেয়ার ধৈর্য যে তার নেই! তাই বড়গুলোকে খেয়ে অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্যবান সন্তানগুলোকে ছেড়ে দেয় সে। তাহলেই ডিম দেখাশোনার দায়িত্ব থেকে মুক্তি মেলে তার। এরপরই সে বেরিয়ে পড়ে নতুন সঙ্গিনীর খোঁজে। নতুন করে মিলিত হবার আশায়!

চিত্রঃ স্যান্ড গোবি মাছ।

গ্রিজলি বিয়ার (Grizzly Bears)

এ ভালুকগুলোর দেখা মেলে উত্তর আমেরিকায়। ছোটবেলায় ইতিহাস পড়ার সময় আমরা দেখেছি, সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে কিংবা সেটি দখল করতে বিভিন্ন সময়ই মায়ের পেটের ভাইয়েরাও একে অপরের শত্রুতে পাল্টে গেছে। শৈশবে একসাথে খেলাধুলা করা ভাইকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাতে কিংবা কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ছুঁড়ে ফেলতে অপর ভাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। মাঝে মাঝে এমন ঘটনা নিজেদের বাবা-মায়ের সাথেও ঘটেছে। প্রাণিজগতে এমন স্বভাবের সার্থক উদাহরণ এ গ্রিজলি বিয়ার।

গ্রিজলি বিয়ার

নিজেদের এলাকার মাঝে অন্য কারো অনুপ্রবেশ মেনে নিতে নারাজ এ প্রজাতির বাবা ভালুকেরা। কখনো কখনো তাদের সেই এলাকা ১,৫০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। বিশাল এ এলাকায় যদি কারো অনুপ্রবেশ নজরে পড়ে তার, হোক না সে তার আপন সন্তান, তাকে খুন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না বাবারা। এজন্য মা ভালুকেরা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকে। ভুলেও যেন আদরের সন্তানটি তার বাবার এলাকায় পা না রাখে, সেই ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে সে।
বাবাদের সরব-নীরব ভালোবাসায় ভরে উঠুক প্রতিটি সন্তানের জীবন, এ কামনায় আজকের লেখাটি এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

 ১.thescienceexplorer.com
 ২.mentalfloss.com

 

গোপন গোয়েন্দা যন্ত্র

“The number one benefit of information technology is that it empowers people to do what they want to do. It lets people be creative. It lets people be productive. It lets people learn things they didn’t think they could learn before, and so in a sense it is all about potential.”- Steve Ballmer

তথ্য-প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভ বলমারের উক্তিটির জুড়ি খুঁজে পাওয়া আসলেই ভার। কেননা তথ্য ছাড়া আজকের দিনে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরেই কেউ বসেন পেপারের পাতা উল্টাতে, কেউ স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্লাইড করতে, কেউ আবার টেলিভিশন চালু করে রিমোট কন্ট্রোলের বাটনে ঝড় তুলতে। উপরে উল্লেখিত তিন শ্রেণির মানুষের সবার উদ্দেশ্যই এক- ‘তথ্য জানা’।

চা বানাবেন? তাহলে আগে আপনাকে জানতে হবে চায়ের পাতি ঘরে আছে কিনা সেই তথ্য। ভাত খাবেন? তাহলে আগে খোঁজ নিন চালের ড্রামে চাল আছে কিনা সেদিকে। গোসল করবেন? তাহলে আগে জানতে হবে পানির ট্যাংকিতে পানি আছে কিনা সেই খবরটি। এগুলো তো দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত দরকারি কিছু তথ্যের নমুনা। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা, পড়াশোনা, গবেষণাসহ জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তথ্য ছাড়া আমরা চলতে পারবো। ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হোক না কেন, এতক্ষণ ধরে তথ্যের এতসব উপযোগিতা তুলে ধরার পর একে যদি দ্বিতীয় অক্সিজেন বলা হয়, তাহলে কি খুব বেশি কিছু বলা হয়ে যাবে?

এবার আসুন পরবর্তী প্রশ্নে- ‘আসলেই কি পৃথিবীর সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত?’ না-বোধক উত্তর দিতে কেউ এক মুহুর্তের জন্যও দেরি করবে না। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় কিছু ব্যাপার স্যাপার আছে যা গুটিকতক আস্থাভাজন লোক ছাড়া আর কারো কাছেই প্রকাশ করা হবে না। একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কখনোই চাইবে না যে তার পানীয় বানানোর রেসিপি সবাই জেনে যাক। সারা পৃথিবীতে অসংখ্য গুপ্ত সংঘ আছে, আছে নানা অপরাধী চক্রও। তারাও কোনোদিন চায় না তাদের ভেতরের তথ্য কোনোদিন বাইরে পাচার হয়ে যাক। অর্থাৎ জায়গামতো সবাই নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষায় শতভাগ সচেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে কি গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া কখনো থেমেছে? অবশ্যই না। হাল আমলের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেনরা আমাদের সামনে রয়েছেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। এছাড়া ইতিহাসের পাতা উল্টালেও এমন শত শত মানুষের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর আঙিনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ছদ্মবেশে, খুঁজেছেন কিছু অত্যন্ত দরকারি তথ্য। কেউ সফল হয়ে জীবন নিয়ে ফেরত আসতে পেরেছেন, কেউবা ব্যর্থ হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের জীবনটিই বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের আজকের আলোচনা এ গোপন তথ্যানুসন্ধান নিয়েই। গোপন তথ্যানুসন্ধানের নানা কৌশলের ইতিহাস দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখাটি।

বেলী বাস্টার

1

গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বেলী বাস্টার নামের এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতো সিআইএ। দেয়াল ছিদ্র করে তাতে গোপনে শত্রুপক্ষের কথাবার্তা শোনার জন্য কোনো ডিভাইস রেখে দেয়াই ছিলো এর মূল উদ্দেশ্য। পুরো যন্ত্রটি ঠিকমতো জোড়া লাগানোর পর এর ড্রিল বিটের অপর প্রান্ত পেটের সাথে সজোরে চেপে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়াল ছিদ্র করার কাজটি সারা হতো।

লেটার রিমুভার

2

ধরুন, শত্রুপক্ষের খামে আটকানো একটি চিঠি সৌভাগ্যক্রমে আপনার হাতে এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি চাইবেন চিঠিটি পড়ে দেখতে। একইসাথে আপনার শত্রু যেন ব্যাপারটি বুঝতে না পারে এটাও আপনি চাইবেন। তো এজন্য আপনাকে চিঠিটি এমনভাবে বের করতে হবে যেন চিঠিও বেরোয়, আবার খামেরও কোনো ক্ষতি না হয়। এমন কাজ সারার জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হতো সরু লেটার রিমুভার। খামের একেবারে উপরের কোনা, যেখানে আঠা খুব কমই লাগানো হয়, সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো ডিভাইসটি। তারপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিঠিকে পেঁচিয়ে ফেলা হতো এর সাথে। তারপরই ধীরে ধীরে বের করে আনা হতো আকাঙ্ক্ষিত চিঠি।

স্টেরিওস্কোপ

3

স্টেরিওস্কোপ (Stereoscopy) শব্দটি এসেছে দুটি গ্রীক শব্দ স্টেরিওস (দৃঢ়) ও স্কোপিও (দেখা) থেকে। এ পদ্ধতিতে একজন দর্শকের বাম ও ডান চোখের জন্য একই ছবি কিছুটা আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ দুটো দ্বিমাত্রিক ছবিকে আমাদের মস্তিষ্ক তখন প্রক্রিয়াজাত করে ত্রিমাত্রিক ছবি দেখার অনুভূতি দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ নানা স্টেরিওস্কোপিক ছবি দেখেই শত্রুপক্ষের সম্পর্কে ধারণা নিতো। এজন্য প্রথমে তারা এরোপ্লেন থেকে শত্রুর এলাকার নানা ছবি তুলে আনতো। তারপর এসব স্টেরিওস্কোপের সাহায্যে সেসব ছবির ত্রিমাত্রিক ধারণা নেয়ার চেষ্টা করতেন ছবি বিশ্লেষকেরা।

ড্রাগনফ্লাই ইনসেক্টোথপ্টার

4

ঘরের ভেতর একটি ফড়িং কিংবা প্রজাপতি উড়ে বেড়ালে আপনি কি কিছু মনে করবেন? অবশ্যই না। বরং এক নজর সেদিকে চোখ বুলিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিবে অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এ প্রাণীটি যদি জৈবিক না হয়ে যান্ত্রিক হয়? যদি সে জৈবিক প্রাণীর ছদ্মবেশে আপনার উপরই নজরদারি করতে থাকে তাহলে কেমন হবে? ছবিতে আসলে এমনই একটি ইউএভি (আনম্যান্‌ড এরিয়াল ভেহিকল) দেখানো হয়েছে। ১৯৭০ সালের দিকে সিআইএ’র রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে বানানো হয়েছিলো ফড়িংয়ের মতো দেখতে এ ডিভাইসটি যা নানা তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হতো।

মাইক্রোডট ক্যামেরা

5

গোপনে ছবি তোলার নানা কৌশল বিভিন্ন অ্যাকশন বা থ্রিলার সিনেমায় দেখেছি। এরই এক বাস্তব উদাহরণ হলো এই মাইক্রোডট ক্যামেরা। কোনো ছবি কিংবা টেক্সটকে আকারে অনেক ছোট করে কোনো ছোট ডিস্কে ধারণ করার কৌশলকে বলা হয় মাইক্রোডট। মাইক্রোডটগুলো সাধারণত বৃত্তাকার এবং ১ মিলিমিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। তবে চাহিদামতো এর আকার কিংবা আকৃতি পরিবর্তন করা যায়। গত শতাব্দীতে চলা কোল্ড ওয়্যারের সময় বিবিন্ন গোপন তথ্যের আদান-প্রদানের কাজে এটি ব্যবহার করা হতো। হাতের আংটি, ফাঁপা কয়েন ইত্যাদি নানা জায়গায় মাইক্রোডট লুকিয়ে রাখা যেতো।

ম্যাচবক্স ক্যামেরা

6

হাতে একটি ম্যাচবক্স নিয়ে যদি আপনি ঘোরাঘুরি করেন, তাহলে অধিকাংশ মানুষই ভাববে আপনি হয়তো সিগারেট ধরাতে যাচ্ছেন। ম্যাচবক্সের ভেতর যে দেশলাইয়ের কাঠি ছাড়া অন্য কিছুও থাকতে পারে এটা কেউ চিন্তাই করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির নাম ছিলো ‘অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (ওএসএস)’। একে বর্তমানের সিআইএ’র পূর্বপুরুষও বলা যেতে পারে। এ ওএসএস-এর জন্যই ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি তৈরি করেছিলো এসব ম্যাচবক্স ক্যামেরা। এগুলোর ভেতরে দেশলাইয়ের কাঠির বদলে ভরা থাকতো আস্ত ক্যামেরা। আর একজন গোয়েন্দা যে দেশে যাচ্ছেন, তিনি সেই দেশের প্রচলিত কোনো ম্যাচের মোড়ক এর গায়ে লাগিয়ে নিলেই কাজ হয়ে যেতো। তখন কেউ আর সন্দেহের অবকাশ পেতো না যে লোকটি সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে নাকি তার দেশের নিরাপত্তায় আগুন জ্বালাচ্ছে!

ডেড ড্রপ স্পাইক

7

মনে করুন, কোনো একটি এলাকায় কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য দুজন ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে। তারা যদি একসাথে কোথাও দেখা করেন তাহলে শত্রুপক্ষ সন্দেহ করার অবকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু এমনটা হতে দেয়া যাবে না। আবার মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের মাঝে কিছু তথ্যের বিনিময়ও দরকার। কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহও করতে না পারে।

এমন পরিস্থিতির জন্য আসলে বানানো হয়েছিলো এ ডেড ড্রপ স্পাইক। এর ভেতরের ফাঁপা জায়গায় দরকারি তথ্য ভরে তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জায়গায় মাটিতে পুঁতে রেখে যেতো এক এজেন্ট। পরে অন্যজন এসে সুবিধামতো তা তুলে নিয়ে যা বোঝার বুঝে নিতো।

পিজিয়ন ক্যামেরা

8

নামটা দেখেই ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেছে, তাই না? ভাবছেন কবুতর দিয়ে আবার ছবি তোলানো হতো নাকি অতীতে? আসলে আপনি যা ভাবছেন তার আংশিক সত্য, আংশিক আপনার অজানা যা এখন আপনাকে জানাবো। আসলে ছবিগুলো তোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো কবুতরকে। ১৯০৭ সালে জার্মান ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা জুলিয়াস নিউব্রোনার এর উদ্ভাবন করেন। কোনো পোষা কবুতরের গায়ে ছোট ও হালকা এ ক্যামেরাগুলো লাগিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেয়া হতো। ছবি তোলার জন্য ছিল সেলফ টাইম ডিলে মেকানিজম। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর আপনাআপনিই ছবি উঠতে থাকতো, কবুতরটির কাজ ছিল শুধু জায়গামতো উড়ে যাওয়া। তবে প্রযুক্তির অগ্রসরতা একসময় এ কৌশলকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়। সেই সাথে কবুতরগুলোকে ঠিকমতো ট্রেনিং দেয়া, বাড়তি একটি জিনিস নিয়ে উড়তে অভ্যস্ত করানো, জায়গামতো সে আসলেই যাবে কিনা, তার গতি ইত্যাদি নানা বিষয় কবুতর দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর নজরদারিকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।

গোপন সংকেত দেখানো আয়না

9

এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। একজন মহিলাকে যদি আপনার সামনে ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করেনিজের চেহারা সাজাতে দেখেন, তাহলে আপনি কী ভাববেন? নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিবেন, “আরে ভাই, এত ভাবার কী আছে? উনার সাজার ইচ্ছা হইছে, তাই আয়না বের করে সাজতেছে। আর কী?”

আসলে ঘটনার মোড় লুকিয়ে আছে এখানেই। কারণ নারী এজেন্টদের জন্য এমন আয়নাও ছিল (হয়তো এখনো আছে) যা দিয়ে সবার সামনে তিনি হয়তো সাজগোজ করতেন। কিন্তু আসলে সেটি থাকতো বিশেষ এক ধরনের আয়না যা একটু বিশেষ কোণে ধরলে ভেসে উঠতো তার মিশনের গোপন কোনো কোড! সেখান থেকে সহজেই পরবর্তী নির্দেশনা নিতে পারতেন তিনি।

পালিয়ে যাবার মানচিত্র

সিল্কের উপর প্রিন্ট করা এই মানচিত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন এজেন্টের পালিয়ে যাবার পথ চিনিয়ে দেয়া। তবে কাপড়ের উপর আঁকা বলে একজন চাইলে কৌশল হিসেবে এটিকে গায়ে জড়িয়ে কিংবা ভাঁজ করে রাখতে পারতেন। পানিরোধী রং দিয়ে এটি আঁকা হতো বলে যদি এজেন্টকে সাঁতরানো লাগতো, তাহলেও ভয়ের কিছু ছিল না। চুপচাপ জলাশয়ের অন্য পাড়ে গিয়ে শুকিয়ে নিলেই চলতো।

ফাঁপা কয়েন

10

বাইরে থেকে এ কয়েনটিকে নিরেট মনে হলেও আসলে এটি ফাঁপা! এর ভেতরে করে সহজেই কোনো ফিল্ম বা মেসেজ বিনিময় করা যেতো।

মিনক্স ক্যামেরা

11

লাটভিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্টার জ্যাপ ১৯৩৭ সালে এ ক্যামেরাটির ডিজাইন করেন। খুব সহজেই একে হাতের তালুর ভেতর লুকিয়ে রাখা যেতো। এর সাহায্যে তোলা ছবিগুলোর মানও ছিল বেশ ভালো। ফলে গোয়ান্দাগিরির কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলোর মাঝে এটিই শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

অনাহূত অতিথি দূরীকরণ

19

নিজের বাড়িতে অন্যের ছড়ি ঘোরানো কেউই সহ্য করতে পারে না। আর সেটা যদি হয় কোনো এলাকা বা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন, তাহলে তো কথাই নেই। অবৈধভাবে যেন একজন মানুষও কোনো বিশেষ স্থানে ঢুকে পড়তে না পারে এজন্য নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীর প্রচেষ্টার অন্ত নেই। ছবিতে দেখানো ডিভাইসটি এমন কাজেই ব্যবহার করা হতো। মেটে রঙের বলে সহজে কারো চোখে ধরাও পড়ে না এটি। ভূ-কম্পনের সাহায্য নিয়ে তিনশ মিটার দূর থেকে এটি মানুষসহ অন্যান্য যেকোনো কিছুর আগমনকে শনাক্ত করতে পারতো। ছোট ব্যাটারি দিয়ে চালিত এ ডিভাইসে থাকতো বিল্ট-ইন এন্টেনা। এটি কোড করা পালসের সাহায্যে কোনো তথ্য পাঠাতে পারতো।

সিগারেট ক্যারিয়ারে ক্যামেরা

12

যাদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাদের অনেকেই কেবল দোকানে কিনতে পাওয়া প্যাকেটের উপর নির্ভর করেন না। বরং নিজের খুশি মতো বাজার থেকে কিনে নেন চমৎকার কোনো বক্স। কোথাও যখন কেউ সেই বক্স থেকে সিগারেট বের করে, তখন কেউ ঐ বক্সের দিকে ওভাবে তাকায়ও না। আর এ জিনিসটি মাথায় রেখেই ছোট এ ক্যামেরাটি বানানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। একে সহজেই সিগারেটের বক্সে লুকিয়ে রাখা যেতো।

বোতামে লুকোনো ক্যামেরা

13

কোট-টাই পরে যখন আপনি সবার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন সবাই কিন্তু আপনার কাপড়ের রং-মান এসবই খেয়াল করে ঠিকমতো। কাউকে শোনা যায় না বোতামের দিকে তাকিয়ে থেকে সেটির ভালো-মন্দ বিচার করতে।

এ বিষয়টি খেয়াল করেই বিচিত্র এক কৌশল অবলম্বন করেছিল কেজিবি। গত শতকের সত্তরের দশকে তারা অ্যাজাক্স নামের বোতামের ভেতর লুকানো এ ক্যামেরার ডিজাইন করে। ক্যামেরার লেন্স থাকতো ডানদিকের মাঝের বোতামে। যখনই সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়তো, তখনই একজন গোয়ান্দা তার পকেটে থাকা ক্যামেরার শাটারে চাপ দিতেন। সাথে সাথে উঠে যেতো ছবি। কেউই বুঝতে পারতো না!

জুতার নিচে ট্রান্সমিটার

14

গোপন তথ্য সংগ্রহের কৌশল যে আসলে শরীরের সম্ভাব্য সব জায়গাকেই ব্যবহার করেছে এ জুতাটি তার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। ১৯৬০-৭০ সালের দিকে আমেরিকান কূটনীতিকদের উপর নজর রাখতে এটি ব্যবহার করতো রোমানিয়ার সিক্রেট সার্ভিস। কূটনীতিকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে ব্যবহার করতেন না। নিজেদের দেশ থেকেই দরকারি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। রোমানিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা সেগুলো পোস্ট অফিসে আটক করে আগে সেখানে ছবিতে দেখানো উপায়ে ট্রান্সমিটার লাগিয়ে তারপর ছাড়পত্র দিতো। এরপর সেই কূটনীতিকের যাবতীয় আলাপ-আলোচনা সহজেই তারা রেকর্ড করে রাখতে পারতেন!

বিষ্ঠার ভেতরেও ট্রান্সমিটার

15

রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় যখন গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি নানা প্রাণীর মল আমাদের চোখের সামনে পড়ে, তখন সাবধানে পা সরিয়ে হেঁটে যাই আমরা সবাই। দুর্গন্ধময় ওসব জিনিস কে ঘাঁটাতে যাবে? এজন্যই সিআইএ মলের মতো দেখতে এই ট্রান্সমিটারটি ডিজাইন করেছিল যেন কেউ এটা নাড়াতে আগ্রহী না হয়। শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোতে আগেই এগুলো রেখে আসা হতো। এরপর এগুলো সিগনাল পাঠাতো আকাশে থাকা পাইলটদের। সেখান থেকেই এ সিগনাল অনুসরণ করে তারা বোম নিক্ষেপ করে আবার নির্বিঘ্নে ফেরত যেতো।

ঘড়ির ভেতর ক্যামেরা

16

শার্টের বোতাম, হাতের তালু আর সিগারেটের বক্সে যদি ক্যামেরা রাখা যায়, তাহলে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ঘড়িই বা বাদ যাবে কেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির এক এজেন্টের কাছে এমন ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল। এর মূল সমস্যা হলো আন্দাজের উপর ভিত্তি করে ছবি তুলতে হতো। কারণ চোখ রেখে যার বা যে জিনিসের ছবি তোলা হচ্ছে সেটি দেখার ব্যবস্থা এতে রাখা হয়নি। একেকটি ফিল্মে আটটি করে ছবি তোলা যেতো।

গাছের ভেতর বাগ

17

এখন যে গোপন তথ্য চুরির পদ্ধতি বলতে যাচ্ছি সেটা বেশ চমৎকার। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুর দিককার কথা। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন একটি কৃত্রিম কাটা গাছের মতো অংশে একটি বাগ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর এটিকে তারা মস্কোর বাইরে এক গাছপালা ঘেরা জায়গায় এমনভাবে স্থাপন করলেন যেন সহজেই একটি সোভিয়েত মিসাইল সিস্টেমের রাডার ও কমিউনিকেশন সিগনালের উপর তারা নজরদারি করতে পারেন! প্রাপ্ত সিগনালগুলো এখানে সংরক্ষণ করে পরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানো হতো। এর উপরের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করে ভেতরের সোলার ব্যাটারিগুলো চার্জের ব্যবস্থা করতো। এতকিছু করেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কেজিবি একসময় ঠিকই বাগটির অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

ফাউন্টেন পেন

ক্যামেরা নিয়ে আজ বোধহয় বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, তাই না? কিন্তু কী করবো বলুন? কারণ এ ক্যামেরা লুকোনোর পদ্ধতিগুলোই যে ছিল বেশ চমৎকার।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে ফাউন্টেন পেনের ভেতর ট্রোপেল লেন্স লুকিয়ে রাখার কৌশল নেয় সিআইএ। বিভিন্ন দলিলপত্র কিংবা যন্ত্রের ছবি গোপনে তুলতেই একে কাজে লাগানো হতো। যেমন- এখানে যে ফাউন্টেন পেনটি দেখা যাচ্ছে সেটি ব্যবহার করতেন আলেকজান্ডার ওগোরোদনিক, যার কোড নেম ছিল ট্রাইগন। তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র সোভিয়েত কূটনীতিক। সিআইএ তাকে হাত করে নিয়েছিল। ওগোরোদনিক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি কেজিবির হাতে ধরা পড়ে যান। অবশ্য কেজিবি তার কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি। এর আগেই তিনি সিআইএর কাছ থেকে পাওয়া পয়জন পিল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

আপাতত বিদায় নিচ্ছি গোপনীয়তার জগত থেকে। পরবর্তী কোনো লেখায় আশা করি গোপনীয়তায় ভরপুর অন্য কোনো জগতের গল্প নিয়ে সবার সামনে আবার হাজির হবো।

লেখকঃ মুহাইমিনুল ইসলাম

সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি

fb.com/muhaiminul.islamantik

নেপোলিয়নের হারানো ‘সম্পদ’

এখনো মনে পড়ে বাংলা ২য় পত্র পড়ার সময় রচনার জন্য বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির বাণী খুঁজতাম। এর মাঝে নেপোলিয়নের বাণীগুলো বেশ প্রচলিত ছিল। ‘শ্রমের মর্যাদা’ অথবা ‘অধ্যবসায়’ পড়ার সময় Impossible is a word to be found only in the dictionary of fools। ‘সংবাদপত্র’ রচনায় এর ভয়াবহ দিক নিয়েও ছিল তার উক্তি, Four hostile newspapers are more to be feared than a thousand bayonets। এছাড়া ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ছবির সাথে ক্যাপশন দেখেছি A picture is worth a thousand words যা আসলে নেপোলিয়নেরই উক্তি।

চিত্রঃ নেপোলিয়নের প্রতিকৃতি।

চমৎকার, উদ্দীপনামূলক এসব উক্তির জনক নেপোলিয়নের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে খুবই কষ্টের মাঝে। বন্দী করার পর তাকে আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। এখানেই এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ১৮২১ সালের ৫ মে মারা যান তিনি। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চি ময়নাতদন্ত শেষে মৃত্যুর কারণ হিসেবে পাকস্থলীর ক্যান্সারের কথা জানান। পরবর্তীতে অবশ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম হয়, যেখানে দাবি করা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার পানীয়র সাথে আর্সেনিক প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে খুন করা হয়েছিল তাকে। সর্বশেষ ২০০৭-০৮ সালের দিকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উড়িয়ে দিয়ে বলা হয় পেপটিক আলসার ও গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারই নেপোলিয়নের মৃত্যুর কারণ। আজকের কাহিনী শুরু হচ্ছে নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর থেকেই।

ডাক্তার ফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চি ১৭৮০ সালের ৫ জুলাই ফ্রান্সের কর্সিকা দ্বীপের মর্সিগ্লিয়া কমিউনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর তিনি সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। চলে যান সেখানে। নেপোলিয়নের মৃত্যুর

আগ পর্যন্ত তিনি এ পদেই বহাল ছিলেন। তবে চিকিৎসাশাস্ত্রে অ্যান্টোম্মার্চির দক্ষতায় খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না নেপোলিয়ান। বেশ কয়েকবারই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। একবার চিন্তা করুন তো, আপনার অফিসের বস যদি আপনাকে বার বার বলে, “You are fired” কিন্তু তবুও দুর্ব্যবহার করে আপনাকে রেখেই দেয় তাহলে তার প্রতি কি আপনার কোনো শ্রদ্ধাবোধ অবশিষ্ট থাকবে? এই কাল্পনিক অংশটুকুর কথা মাথায় রাখুন।

চিত্রঃ ফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চি।

ময়নাতদন্তের টেবিলে পড়ে আছে নেপোলিয়নের নিথর দেহ। সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নেপোলিয়নের বাড়িতেই সারা হয়েছিল এই আনুষ্ঠানিকতা। সেদিন লাশটির চারদিকে ছিলেন মোট ১৭ জন মানুষ। এদের মাঝে ছিলেন কয়েকজন ব্রিটিশ ও ফরাসী কর্মকর্তা, ৭ জন ব্রিটিশ ডাক্তার, নেপোলিয়নের দুজন সহকারী, ফাদার আঞ্জে ভিগনালি এবং আলী নামক এক ভৃত্য। এদের সকলের সামনেই নেপোলিয়নের যকৃৎ, পাকস্থলী ও পুরুষাঙ্গ (!) কেটে ইথাইল অ্যালকোহল ভর্তি এক জারে রাখেন অ্যান্টোম্মার্চি। অনেকেই অবশ্য ধারণা করেন, অ্যান্টোম্মার্চি ইচ্ছে করে পুরুষাঙ্গটি কাটেননি। বরং দুর্ঘটনাবশতই ওটা কেটে যায়। আবার অনেকেই অ্যান্টোম্মার্চির প্রতি নেপোলিয়নের পুরনো বিদ্বেষের গন্ধও এখানে খুঁজে পান। আসল কারণ যা-ই হোক, যা যাওয়ার তা তো চলেই গেল!

নেপোলিয়নের জীবনী লেখক রবার্ট অ্যাসপ্রে অবশ্য দাবি করেছেন অন্য কথা। তার মতে, অ্যান্টোম্মার্চি আর ভিগনালি হয়তো লাশটি নিয়ে কিছু সময় আলাদা থাকতে পেরেছিলেন। তখনই এ ঘটনাটি ঘটতে পারে। ওদিকে ১৮৫২ সালে প্রকাশিত এক স্মৃতিকথায় আলী জানায়, সেদিন ময়নাতদন্তের এক ফাঁকেই সে এবং ভিগনালি নেপোলিয়নের শরীরের কিছু অংশ কেটে ফেলে। এ ‘কিছু অংশ’ নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গকেও বোঝাচ্ছে কিনা তা অবশ্য নিশ্চিত না। তবে অনেকের মতে এসময়ই আসলে ওটা কাটা হয়ে গিয়েছিল।

ওদিকে নেপোলিয়নের ময়নাতদন্তের কিছু সময় পরই প্যারিসে গুঁজব ছড়িয়ে পড়ে যে ডাক্তারের সহকারীরা রক্তাক্ত বিছানার চাদর, দাঁত, নেইল ক্লিপিং, পাঁজরের কিছু টুকরা, চুলের গোছা এবং নাড়ী-ভুড়ি গোপনে সরিয়ে ফেলেছে। অ্যান্টোম্মার্চি নিজেও নেপোলিয়নের ডেথ মাস্ক ও অন্ত্রের দু’টুকরো নিয়ে সটকে পড়েন। তিনি এগুলো লন্ডনে তার বন্ধুদের কাছে রেখে যান।

নেপোলিয়নের শেষকৃত্যানুষ্ঠান তিনিই পরিচালনা করেছিলেন। উইল মারফত তিনি ১,০০,০০০ ফ্রাঙ্ক লাভ করেন। এছাড়া সম্রাটের ছুরি, কাটা চামচ, একটি রূপার কাপ এবং আরো কিছু ব্যক্তিগত জিনিসও তিনি পান। প্রায় দু’দশক পর ব্রিটিশ সরকার নেপোলিয়নের দেহাবশেষ প্যারিসে নিয়ে আসার অনুমতি দেয়। তখন এক অকাজ করে ভিগনালির আত্মীয়-স্বজনেরা। তারা নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গটি রেখে দেয় নিজেদের কাছে!

১৯১৬ সাল পর্যন্ত নেপোলিয়নের ব্যবহার্য বিভিন্ন দ্রব্যাদি ও শরীরের অংশবিশেষ ভিগনালির বংশধরদের কাছেই থাকে। ১৯১৬-তে তারা এগুলো নিলামে তুলে। সেখানে নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গের ক্যাটালগে লেখা ছিল, ‘a mummified tendon taken from [Napoleon’s] body during post-mortem’। এক ব্রিটিশ বইয়ের ফার্ম সেগুলো কিনে নেয়। পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে তারা এগুলো ফিলাডেলফিয়ার এ.এস.ডব্লিউ. রোসেনবাকের কাছে ২,০০০ ডলারে বিক্রি করে দেয়। এর কয়েক বছর পর রোসেনবাক নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অফ ফ্রেঞ্চ আর্টে চমৎকার নীল রঙের মরক্কো চামড়া (ছাগলের ছাল থেকে তৈরি নরম ও পাকা চামড়া) ও মখমলের চাদরে পুরুষাঙ্গটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। তৎকালীন এক পত্রিকা এ নিয়ে লিখেছিল, ‘In a glass case [spectators] saw something looking like a maltreated strip of buckskin shoelace or shriveled eel’।

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ ভুলেও বিখ্যাত হতে যাবেন না। বিখ্যাত হয়েছেন, তো নেপোলিয়ানের মতো হারিয়েছেন।১৯৬৯ সালে সংগ্রহগুলো নিয়ে আসা হয় লন্ডনে। কিন্তু নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গটি তখন বিক্রি হয়নি। আট বছর পর প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক নিলাম থেকে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. জন কে. ল্যাটিমার প্রায় ২,৯০০ ডলারে পুরুষাঙ্গটি কিনে নেন। তিনি ছিলেন আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় একজন ইউরোলজিস্ট। কলাম্বিয়া প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতাল থেকে এক্স-রে করে তিনি নিশ্চিত হয়ে নেন যে এটি আসলেই একটি পুরুষাঙ্গ। এরপর তিনি এটি নিয়ে চলে আসেন নিউ জার্সিতে তার বাসায়। সেখানে ২০০৭ সালে তার মৃত্যুর আগপর্যন্ত এটি তার খাটের নিচে রাখা সুটকেসেই বন্দী ছিল। পরবর্তীতে তার মেয়ে এটি বিক্রির জন্য ১,০০,০০০ ডলার দাবি করেন। এটি তিনি শুধু লেখক Tony Perrottet-কেই দেখিয়েছেন যিনি দেখার পর বলেছেন, ‘certainly small, shrunken to the size of a baby’s finger, with white shriveled skin and desiccated beige flesh’। নেপোলিয়নের হারানো সম্পদের বর্ণনা আজ এখানেই শেষ করছি। ধন্যবাদ।

তথ্যসূত্র

১. en.wikipedia.org

২. www.straightdope.com

৩. www.wondersandmarvels.com

প্রাণিজগতের নানান বাবাদের গল্প

শৈশবে যারা সত্যিকার অর্থেই বাবার ভালোবাসা পেয়েছে তারা জানে বাবার ভালোবাসা অন্য এক জিনিস। ‘Silent, But Dominant’ কথাটা বোধহয় বাবাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রেই খাটে। একজন মা যখন তার প্রতিটি আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সন্তানটির জন্য ভালোবাসা ব্যক্ত করেন, একজন বাবা সেখানে থাকেন নিশ্চুপ। পর্দার আড়ালে থেকেই তিনি সন্তানের প্রতিটি কার্যকলাপ সম্পর্কে খেয়াল রেখে যান। মুখ ফুটে কদাচিৎ হয়তো তিনি সন্তানের প্রতি অনুভূতি প্রকাশ করেন, তবে মুখে ফুটে উঠা ভাবভঙ্গি দিয়েই তিনি ভালোবাসা প্রকাশে সক্ষম!
প্রাণিজগতের অন্যান্য প্রজাতিতেও বাবারা বেশ ভালোই সার্ভিস দেয়। মা প্রাণীর ডিম পাড়ার পর সেটি দেখাশোনা করা, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে তার লালনপালন করার মতো গুরু দায়িত্বগুলো বাবারাই পালন করে থাকে। একজন আদর্শ বাবা কেমন হতে পারেন তার চমৎকার উদাহরণ হতে পারে সেসব প্রাণী। তেমনই কিছু প্রাণীর গল্প শোনাতেই আজকের এ লেখা।

পেঙ্গুইন (Penguin)

ডিম পাড়ার পরপরই মা পেঙ্গুইন ডিমটি দিয়ে দেয় বাবাটির দিকে। এরপর শুরু হয় বাবার সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব। বাচ্চা বেরোবার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ ডিমটি আগলে রাখে বাবা। বাচ্চাটি যতদিনে ডিমের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে, ততদিনে বাবার উপোসের প্রায় চার মাস হয়ে যায়! মা ফিরে আসার আগে যদি বাচ্চা ডিম থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে বাবা নিজের খাদ্যনালী থেকে এক ধরনের পুষ্টিকর খাবার তার সন্তানকে খেতে দেন। নিজের কোলে নিয়েই বড় করতে থাকেন সন্তানকে। ঠান্ডার হাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বাবা তাকে পায়ের উপরে নিয়েই ঘুরে বেড়ান।

কমন মিডওয়াইফ টড (Common Midwife Toads)

এ প্রজাতির স্ত্রী ব্যাঙেরা যখন ডিম পাড়ে, তখন সেগুলো জেলীর মতো এক ধরনের আঠালো পদার্থে আটকানো থাকে। এরপর সেগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে বাবাদের ঘাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর আগে ৩-৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সেগুলো বয়ে বেড়ায় বাবা ব্যাঙেরা। এ সময় ডিমের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে তারা ঘুরে বেড়ায় নানা আর্দ্র জায়গায়।

রেড ফক্স (Red Fox)

বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর প্রথম এক মাস পর্যন্ত এ প্রজাতির স্ত্রী খেঁকশেয়ালরা তাদের ডেরা ছেড়ে বেরোতে পারে না। সন্তানের লালনপালন, খাওয়াদাওয়া, উষ্ণ রাখার মতো কাজগুলো করতে করতেই কেটে যায় মায়ের প্রতিটি মুহুর্ত। আর এ সময় বাবা খেঁকশেয়ালের দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর সেবা-যত্ন করা। স্ত্রী যতদিন না তার ডেরা থেকে বেরোতে পারছে, ততদিন ৪-৬ ঘন্টা পরপর তার খাবার যোগানোর গুরুদায়িত্ব কিন্তু স্বামীরই। এখানে সে আদর্শ স্বামী, তাহলে আদর্শ বাবা কীভাবে? জনাব, মা সুস্থ থাকলেই তো তার সন্তানেরা সুস্থ থাকবে, তাই না?
এ তো গেলো পরোক্ষভাবে সন্তানদের দেখাশোনার কথা, প্রত্যক্ষভাবেও কিন্তু বাবা তার দায়িত্ব পালন করে পুরোপুরিই। বাচ্চার বয়স যখন তিন মাস ছোঁয় তখনই বাবা তার আসল কাজটি শুরু করে- ‘ভবিষ্যতের জন্য সন্তানকে গড়ে তোলা’। মানবসমাজ হলে নাহয় এ ‘গড়ে তোলা’র মানে হতো সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, কিন্তু শেয়াল সমাজে তো আর সেই কথা খাটবে না। সেখানে ‘গড়ে তোলা’র মানে সন্তানকে শিকার করার জন্য প্রস্তুত করে তোলা। এজন্য বাবা খেঁকশেয়াল তাদের উদ্বৃত্ত খাবারের কিছু অংশ ডেরার আশেপাশেই গর্ত করে লুকিয়ে রাখে, ঢেকে দেয় গাছের ঝরে পড়া পাতা ও ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে। ছোট্ট শেয়ালছানাটির তখন দায়িত্ব পড়ে সেগুলো খুঁজে বের করার। এভাবেই খেলার ছলে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে শেয়ালছানাটি, গভীর হতে থাকে বাবার সাথে তার ভালোবাসার বন্ধন।

রেড ফক্স (Red Fox)

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

ছবিতে দেখানো মাছটির নাম ইয়েলো-হেডেড জফিশ। স্ত্রী ডিম পাড়ার পরই শুরু হয় তার স্বামীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- ডিমগুলোর দেখাশোনা করা। আর এ দেখাশোনার জন্য পুরুষটি ডিমগুলো একেবারে মুখে পুরে নেয়! সাধারণত ৭-৯ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। এতদিন ধরে সন্তানদের মুখে নিয়েই ঘুরে বেড়ায় বাবা। আর মুখে সন্তানদের স্থান দেয়ার ফলে কিছু খেতেও পারে না সে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর পরই মেলে তার মুক্তি!

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

সী হর্স (Sea Horse)

সমুদ্রের পানিতে বাস করা ঘোড়ামুখো এ প্রাণীদের পুরুষ প্রজাতিরাও কিন্তু বাবা হিসেবে বেশ দায়িত্ববান। স্ত্রী সী হর্স ডিম পেড়ে সেগুলো পুরুষ সঙ্গীর গায়ে থাকা থলেতে জমা করে। সেখানে চলতে থাকে ডিমগুলোর লালনপালন। এভাবে চলে প্রায় দেড় মাস। এরপর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর সময় হয়, বাবা তার সন্তানদেরকে তখন পেশীর সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে সমুদ্রের নোনা পানির জগতের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়।
এতক্ষণ ধরে প্রাণিজগতে বাবাদের ভালো ভূমিকা পড়ে যদি মানব-বাবা হিসেবে বেশ ভালো লাগা শুরু করেন, তাহলে এবার দেখা যাক মুদ্রার উল্টো পিঠও।

সী হর্স

ব্যাস (Bass)

জন্মানোর পর অসহায় বাচ্চাগুলোকে দেখাশোনার কাজ অত্যন্ত যত্ন সহকারেই করে থাকে মাছটি। শিকারী মাছের হাত থেকে রক্ষা করা কিংবা দলবদ্ধভাবে সন্তানদের নিপুণভাবে পরিচালনাও করে। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার আচরণ একেবারে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে যায়। বাংলায় প্রচলিত ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’ প্রবাদের বাস্তব উদাহরণ হয়ে যায় বাবা ব্যাস মাছ। সে-ই এখন তার সন্তানদের ধরে ধরে খেতে শুরু করে! এ সময় বাবার রাক্ষুসে স্বভাব থেকে কৌশল খাটিয়ে রেহাই পাওয়া বাচ্চা ব্যাসেরাই তাদের বংশের ধারা অব্যাহত রেখে যায়। একসময় তারাও বাবা হয়, তারাও তাদের বাচ্চাদের খেতে শুরু করে, কিছু বাচ্চা আবারো বেঁচে যায়। এভাবেই চলতে থাকে বাবার গ্রাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য সন্তানদের প্রজন্মান্তরের এ সংগ্রাম।

চিত্রঃ ব্যাস মাছ।

স্যান্ড গোবি (Sand Goby)

ব্যাসদের মতো স্যান্ড গোবিদের বাসও সমুদ্রে। তারাও দায়িত্ববান বাবার মতোই ডিমগুলোর দেখাশোনা করতে থাকে। কিন্তু ডিমগুলো যেই না পরিপক্ব হয়ে ওঠে, সাথে সাথেই বাবাদের আচরণ যায় বদলে। আশেপাশে যত খাবারই থাকুক না কেন, বাবা তার নিজের ডিমই খেতে শুরু করে দেয়। এভাবে নিজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সন্তানকে খেয়ে তবেই থামে বাবা স্যান্ড গোবি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবারা সাধারণত বড় ডিমগুলো খেয়ে থাকে। বড় ডিম মানেই বেশি পুষ্টি উপাদান, তাই তো? আসলে কিন্তু তা না। বাবা স্যান্ড গোবি জানে বড় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে বেশি সময় লাগবে। কিন্তু অতদিন চুপচাপ পাহারা দেয়ার ধৈর্য যে তার নেই! তাই বড়গুলোকে খেয়ে অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্যবান সন্তানগুলোকে ছেড়ে দেয় সে। তাহলেই ডিম দেখাশোনার দায়িত্ব থেকে মুক্তি মেলে তার। এরপরই সে বেরিয়ে পড়ে নতুন সঙ্গিনীর খোঁজে। নতুন করে মিলিত হবার আশায়!

চিত্রঃ স্যান্ড গোবি মাছ।

গ্রিজলি বিয়ার (Grizzly Bears)

এ ভালুকগুলোর দেখা মেলে উত্তর আমেরিকায়। ছোটবেলায় ইতিহাস পড়ার সময় আমরা দেখেছি, সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে কিংবা সেটি দখল করতে বিভিন্ন সময়ই মায়ের পেটের ভাইয়েরাও একে অপরের শত্রুতে পাল্টে গেছে। শৈশবে একসাথে খেলাধুলা করা ভাইকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাতে কিংবা কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ছুঁড়ে ফেলতে অপর ভাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। মাঝে মাঝে এমন ঘটনা নিজেদের বাবা-মায়ের সাথেও ঘটেছে। প্রাণিজগতে এমন স্বভাবের সার্থক উদাহরণ এ গ্রিজলি বিয়ার।

গ্রিজলি বিয়ার

নিজেদের এলাকার মাঝে অন্য কারো অনুপ্রবেশ মেনে নিতে নারাজ এ প্রজাতির বাবা ভালুকেরা। কখনো কখনো তাদের সেই এলাকা ১,৫০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। বিশাল এ এলাকায় যদি কারো অনুপ্রবেশ নজরে পড়ে তার, হোক না সে তার আপন সন্তান, তাকে খুন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না বাবারা। এজন্য মা ভালুকেরা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকে। ভুলেও যেন আদরের সন্তানটি তার বাবার এলাকায় পা না রাখে, সেই ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে সে।
বাবাদের সরব-নীরব ভালোবাসায় ভরে উঠুক প্রতিটি সন্তানের জীবন, এ কামনায় আজকের লেখাটি এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

 ১.thescienceexplorer.com
 ২.mentalfloss.com

 

প্রজেক্ট সীলঃ সমুদ্রের বুকে মানবসৃষ্ট সুনামী

২০০৪ সালের কথা। তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সেদিন খবর দেখতে টিভি চালু করেই বেশ বড় রকমের ধাক্কা খেলাম। স্ক্রিনের নীচে ভেসে চলা ব্রেকিং নিউজে দেখাচ্ছে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামির খবর। একটু পরেই ঢেউয়ের তোড়ে গাড়ি-বাড়ি-নৌকা-মানুষ ভেসে যেতে দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষমতা যে এত ভয়াবহ হতে পারে সেদিন স্বচক্ষে দেখেও যেন তা বিশ্বাস হচ্ছিল না। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ সংঘটিত সেই দুর্যোগের জন্য দায়ী ছিল ৯.১ – ৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্প, যার ফলশ্রুতিতে মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২ লক্ষ ৩০ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৮০ হাজারের মতো। নীচের ছবিগুলো দেখলেই সুনামিটির ভয়াবহতা আঁচ করা সম্ভব।

‘সুনামি’ একটি জাপানী শব্দ যার অর্থ পোতাশ্রয়ে ঢেউ। ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, সমুদ্রের তলদেশে কোনো বিষ্ফোরণ, আগ্নেয়গিরির উদ্‌গীরণ ইত্যাদির প্রভাবে নদী, সাগর প্রভৃতি জলাধারে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসকে বলে সুনামি।

প্রজেক্ট সীলের শিরোনামে কেন সুনামির কথা বলছি? এর উত্তর কিছু দূর গেলেই পাওয়া যাবে। তার আগে প্রাসঙ্গিক আরেকটি বিষয় সম্পর্কে জেনে নেই। ‘টেকটোনিক ওয়েপন’ এটি এমন একটি হাইপোথেটিক্যাল যন্ত্র বা প্রক্রিয়া যার সাহায্যে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে চাহিদামতো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্ম দেয়া যাবে! ১৯৯২ সালে রুশ বিজ্ঞান একাডেমির অ্যালেক্সে সেভোলোভিদিচ নিকোলায়েভ এটির সংজ্ঞা

দিয়েছিলেন এভাবে- “A tectonic or seismic weapon would be the use of the accumulated tectonic energy of the Earth’s deeper layers to induce a destructive earthquake”।

‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ এই শব্দ দুটি কানে গেলেই মানসপটে দু’জোড়া শব্দ ভেসে ওঠে- ‘অ্যাডল্‌ফ হিটলার’ এবং ‘পারমাণবিক বোমা’। হিটলার কিংবা পারমাণবিক বোমা যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরই প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে তা বোধহয় না বললেও চলে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানুষ তার স্বজাতির উপর কত রকম অমানবিক অত্যাচার, নির্যাতন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে তার ইতিহাস কম-বেশি আমাদের সবারই জানা। আবার এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করতে আশ্রয় নিয়েছিল নানান রকমের কৌশলের। পাশাপাশি উদ্ভাবন করেছিল ভয়ানক সব মারণাস্ত্র। প্রজেক্ট সীল ছিল তেমনই এক মারণাস্ত্র উদ্ভাবনের পরিকল্পনা।

প্রায় ৭০ বছর আগেকার কথা। ১৯৪৪ সালের দিকে মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার ই. এ. গিবসন এক অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন, সাগরের পানিতে ডুবে থাকা বিভিন্ন প্রবাল প্রাচীর দূরীকরণে যে বিষ্ফোরণ ঘটানো হয় তার ফলে বেশ বড় রকমের ঢেউয়ের উৎপত্তি ঘটে। এখান থেকেই তার মাথায় অন্য এক পরিকল্পনা জন্ম নিল- আচ্ছা, এ ঢেউকে কাজে লাগিয়ে কি শত্রুপক্ষের কোনো নির্দিষ্ট এলাকাকে ভাসিয়ে দেয়া যায় না? যেমন চিন্তা তেমন কাজ। সাথে সাথেই যোগাযোগ করলেন নিউজিল্যান্ডের চিফ অব জেনারেল স্টাফ স্যার এডওয়ার্ড পুটিকের সাথে, খুলে বললেন তার বিস্তারিত পরিকল্পনা। গিবসনের পরিকল্পনাটি মনে ধরলো পুটিকের। তাই তিনি যুদ্ধ পরিষদের পরবর্তী সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। সেখানেও প্রস্তাবটিকে সমর্থন করে সবাই। ফলে সিদ্ধান্ত হলো আমেরিকা এবং নিউজিল্যান্ড যৌথভাবে নিউ ক্যালিডোনিয়ায় প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে।

এখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রজেক্ট সীল। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল- ‘আক্রমণের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে তৈরী জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে প্লাবন তৈরির সম্ভাব্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করা’।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণাগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস লীচ। গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হচ্ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার কমান্ডার অ্যাডমিরাল হ্যালসিকে। হ্যালসি প্রাথমিক পরীক্ষার ফলাফলে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, নিউজিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষকে তিনি অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রজেক্টটি যথাসম্ভব এগিয়ে নিতে। তিনি চাইছিলেন মানবসৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে শত্রুপক্ষের বিভিন্ন স্থাপনা যতদূর সম্ভব ভাসিয়ে দিতে। এজন্য তিনি লিখেছিলেন- “আমার মতে- এ পরীক্ষাগুলোর ফলাফল বলছে যে, উভচর যুদ্ধে শত্রুপক্ষের এলাকা প্লাবিত করে দেয়া বেশ সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী এক সম্ভাবনময় আক্রমণাত্মক যুদ্ধাস্ত্র হতে পারে।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণামূলক কাজগুলো বেশ দ্রুততার সাথেই এগোচ্ছিল। ১৯৪৪ সালের ৫ মে নিউজিল্যান্ডের যুদ্ধ পরিষদে হ্যালসির প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রফেসর লীচের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অ্যারে রিসার্চ ইউনিট, যার কাজ ছিল একেবারেই নতুন ঘরানার এ বোমাটি নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো। প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই ইউনিটটি। তাদের কাজের জন্য ঠিক করা হয়েছিল হ্যাঙ্গাপারাওয়া উপদ্বীপে অবস্থিত একটি দূর্গ। এখানেই গোপনীয়তার সাথে এগিয়ে চলেছিল প্রজেক্ট সীলের কাজকারবার। এগোচ্ছিল স্বজাতিকে শেষ করার আরো কার্যকরী পদ্ধতি উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা। প্রজেক্টের কাজগুলো মূলত নিউজিল্যান্ডের প্রকৌশলীরাই করতেন কিন্তু বিষ্ফোরক সরবরাহ করা কিংবা আদেশ দেয়ার কাজটি করে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রই।

প্রজেক্টটি সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে বিপুল পরিমাণ বিশেষায়িত উপকরণের প্রয়োজন ছিল। এগুলোর মাঝে ছিল রিমোট-ওয়েভ রেকর্ডিং ডিভাইস, রেডিও কন্ট্রোল্‌ড ফায়ারিং মেকানিজম, মেরিন এক্সপ্লোসিভ ইত্যাদি। ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীদেরও সমুদ্রে বিষ্ফোরণ ঘটানোর এ মহাযজ্ঞ নিয়ে আগ্রহের কমতি ছিল না। তাই একদল ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল প্রজেক্টটির অগ্রগতি দেখে যাবার জন্য।

নতুন আঙ্গিকে গঠিত হবার পর প্রজেক্ট সীলের প্রথম পরীক্ষামূলক বিষ্ফোরণটি ঘটানো হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ৬ জুন। আর এটি চলেছিল পরের বছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।

প্রজেক্ট সীলের পুরো সময়কাল জুড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টি সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। বোমাগুলো দিয়ে কৃত্রিমভাবে সুনামির মতো পরিস্থিতি তৈরি করাই ছিল উদ্দেশ্য, তাই এগুলোর এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। বোমাগুলোতে বিষ্ফোরকের পরিমাণ কয়েক গ্রাম থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত পরিবর্তন করে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। বিষ্ফোরক হিসেবে মূলত টিএনটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে কখনো কখনো নাইট্রো-স্টার্চ কিংবা গেলিগনাইটও ব্যবহার করা হতো।

শুরুতে অবশ্য প্রজেক্ট সীলের গবেষকেরা ভুল উপায়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। ব্রিটিশরাও সমুদ্রের তলদেশে বিষ্ফোরণ নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল। তাদের কাজ থেকে ধারণা করা হচ্ছিল যে, বোমটি সমুদ্রের যত তলদেশে থাকবে, বিষ্ফোরণের ফলে সৃষ্ট গ্যাসের বুদবুদ ততটাই কার্যকর উপায়ে নির্ধারিত এলাকায় প্লাবন ঘটাতে সক্ষম হবে। অবশ্য পরবর্তীতে প্রজেক্ট সীলের অনেক অনেক গবেষণার পর ব্রিটিশদের সেই তত্ত্বটি বাতিল হয়ে যায়। তারা দেখান, বোমটি সমুদ্রপৃষ্ঠের যত কাছাকাছি থাকবে, এটি ততই কার্যকর ঢেউ তৈরি করে প্লাবনের উদ্ভব ঘটাতে সক্ষম হবে। গবেষকেরা সেই সাথে বুঝেছিলেন, মাত্র একটি বোমার বিষ্ফোরণ দিয়ে সৃষ্ট ঢেউয়ের সাহায্যে কেবল ঢেউয়ের বুকে সার্ফিং করাই সম্ভব, শত্রুর স্থাপনা ভাসিয়ে নেয়া তো বহু দূরের কথা। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন একসাথে অনেকগুলো সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানোর।

এজন্য প্রায় ২০ লক্ষ কেজি বিষ্ফোরক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। বিষ্ফোরককে সমান ১০ ভাগে ভাগ করে সমুদ্র উপকূল থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে বিষ্ফোরিত করলেই তা সমুদ্রের বুকে ভয়াবহ আলোড়ন তুলতে সক্ষম হবে। এর ফলে ১০ – ১২ মিটার উচ্চতার যে ঢেউ তৈরি হবে সেটিই ভাসিয়ে দিবে শত্রুর সব স্থাপনা। তবে এখানেও সমস্যা ছিল। গবেষকরা দেখেছিলেন, সমুদ্রের কতটা তলদেশে বোমটি রাখা হচ্ছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। কারণ উচ্চতার সামান্য হেরফেরও ঢেউয়ের শক্তি অনেকখানি কমিয়ে দিচ্ছিল।

প্রজেক্ট সীল যখন শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে যাচ্ছিল, তখন একে পারমাণবিক বোমার বিকল্প হিসেবেই ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে এসে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে। তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মিত্রপক্ষের আধিপত্য বিস্তার পেতে শুরু করে। এর ফলে ধীরে ধীরে প্রজেক্ট সীলের মাধ্যমে তৈরি সুনামি বোমার সাহায্যে কৃত্রিম সুনামী তৈরির প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৮ জানুয়ারি প্রজেক্টটি বন্ধই করে দেয়া হয়। তখন পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য কোনো সুনামী বোমা বানানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি, সবই ছিল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। তাই বাস্তবক্ষেত্রে এ বোমাটির কার্যকারিতা কেমন হতে পারে তা আসলে কেউই আর বলতে পারবে না।

প্রজেক্ট সীলের আয়ু ফুরিয়ে গেলেও ১৯৫০ সালে অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের চল্লিশের দশকের সেই প্রজেক্টটি নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে দেখা গেছে। রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল- The Generation of Waves by Means of Explosives।

১৯৯৯ সালে নিউজিল্যান্ডের মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স এন্ড ট্রেড প্রজেক্ট সীলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কিত তথ্য সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। বর্তমানে এ সংক্রান্ত তথ্যাদি ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের জাতীয় আর্কাইভে এবং ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোতে অবস্থিত স্ক্রিপ্‌স ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফি আর্কাইভসে রাখা আছে।

এতক্ষণ ধরে একবারও বলিনি ঠিক কোনো দেশকে আক্রমণ করতে এ বোমাটি বানানো হচ্ছিল। প্রতিবার শুধু ‘শত্রুপক্ষ’ কথাটি লিখেই পার পেয়ে গেছি। আসলে ১৯৯৯ সালে যে গোপন নথিগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল, সেখানেও বিশেষ কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছিলেন তখন বেঁচে থাকা প্রজেক্ট সীলেরই এক সদস্য। ১৯৯৯ সালে তার বয়স ছিল ৮৭ বছর।

তার মতে, প্রজেক্টটিতে কাজ করা সবাই জানতো যে এই বোমা জাপানকে ভাসিয়ে দিতেই তৈরি করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র

 (১) en.wikipedia.org/wiki/Tsunami_bomb
 (২) nbr.co.nz/article/best-kept-secret-world-war-two-—-project-seal-tsunami-bomb-ck-134614
 (৩) cnsnews.com/news/article/new-details-emerge-world-war-ii-tsunami-bomb-project

গোপন গোয়েন্দা যন্ত্র

“The number one benefit of information technology is that it empowers people to do what they want to do. It lets people be creative. It lets people be productive. It lets people learn things they didn’t think they could learn before, and so in a sense it is all about potential.”- Steve Ballmer

তথ্য-প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভ বলমারের উক্তিটির জুড়ি খুঁজে পাওয়া আসলেই ভার। কেননা তথ্য ছাড়া আজকের দিনে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরেই কেউ বসেন পেপারের পাতা উল্টাতে, কেউ স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্লাইড করতে, কেউ আবার টেলিভিশন চালু করে রিমোট কন্ট্রোলের বাটনে ঝড় তুলতে। উপরে উল্লেখিত তিন শ্রেণির মানুষের সবার উদ্দেশ্যই এক- ‘তথ্য জানা’।

চা বানাবেন? তাহলে আগে আপনাকে জানতে হবে চায়ের পাতি ঘরে আছে কিনা সেই তথ্য। ভাত খাবেন? তাহলে আগে খোঁজ নিন চালের ড্রামে চাল আছে কিনা সেদিকে। গোসল করবেন? তাহলে আগে জানতে হবে পানির ট্যাংকিতে পানি আছে কিনা সেই খবরটি। এগুলো তো দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত দরকারি কিছু তথ্যের নমুনা। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা, পড়াশোনা, গবেষণাসহ জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তথ্য ছাড়া আমরা চলতে পারবো। ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হোক না কেন, এতক্ষণ ধরে তথ্যের এতসব উপযোগিতা তুলে ধরার পর একে যদি দ্বিতীয় অক্সিজেন বলা হয়, তাহলে কি খুব বেশি কিছু বলা হয়ে যাবে?

এবার আসুন পরবর্তী প্রশ্নে- ‘আসলেই কি পৃথিবীর সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত?’ না-বোধক উত্তর দিতে কেউ এক মুহুর্তের জন্যও দেরি করবে না। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় কিছু ব্যাপার স্যাপার আছে যা গুটিকতক আস্থাভাজন লোক ছাড়া আর কারো কাছেই প্রকাশ করা হবে না। একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কখনোই চাইবে না যে তার পানীয় বানানোর রেসিপি সবাই জেনে যাক। সারা পৃথিবীতে অসংখ্য গুপ্ত সংঘ আছে, আছে নানা অপরাধী চক্রও। তারাও কোনোদিন চায় না তাদের ভেতরের তথ্য কোনোদিন বাইরে পাচার হয়ে যাক। অর্থাৎ জায়গামতো সবাই নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষায় শতভাগ সচেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে কি গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া কখনো থেমেছে? অবশ্যই না। হাল আমলের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেনরা আমাদের সামনে রয়েছেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। এছাড়া ইতিহাসের পাতা উল্টালেও এমন শত শত মানুষের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর আঙিনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ছদ্মবেশে, খুঁজেছেন কিছু অত্যন্ত দরকারি তথ্য। কেউ সফল হয়ে জীবন নিয়ে ফেরত আসতে পেরেছেন, কেউবা ব্যর্থ হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের জীবনটিই বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের আজকের আলোচনা এ গোপন তথ্যানুসন্ধান নিয়েই। গোপন তথ্যানুসন্ধানের নানা কৌশলের ইতিহাস দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখাটি।

বেলী বাস্টার

1

গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বেলী বাস্টার নামের এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতো সিআইএ। দেয়াল ছিদ্র করে তাতে গোপনে শত্রুপক্ষের কথাবার্তা শোনার জন্য কোনো ডিভাইস রেখে দেয়াই ছিলো এর মূল উদ্দেশ্য। পুরো যন্ত্রটি ঠিকমতো জোড়া লাগানোর পর এর ড্রিল বিটের অপর প্রান্ত পেটের সাথে সজোরে চেপে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়াল ছিদ্র করার কাজটি সারা হতো।

লেটার রিমুভার

2

ধরুন, শত্রুপক্ষের খামে আটকানো একটি চিঠি সৌভাগ্যক্রমে আপনার হাতে এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি চাইবেন চিঠিটি পড়ে দেখতে। একইসাথে আপনার শত্রু যেন ব্যাপারটি বুঝতে না পারে এটাও আপনি চাইবেন। তো এজন্য আপনাকে চিঠিটি এমনভাবে বের করতে হবে যেন চিঠিও বেরোয়, আবার খামেরও কোনো ক্ষতি না হয়। এমন কাজ সারার জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হতো সরু লেটার রিমুভার। খামের একেবারে উপরের কোনা, যেখানে আঠা খুব কমই লাগানো হয়, সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো ডিভাইসটি। তারপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিঠিকে পেঁচিয়ে ফেলা হতো এর সাথে। তারপরই ধীরে ধীরে বের করে আনা হতো আকাঙ্ক্ষিত চিঠি।

স্টেরিওস্কোপ

3

স্টেরিওস্কোপ (Stereoscopy) শব্দটি এসেছে দুটি গ্রীক শব্দ স্টেরিওস (দৃঢ়) ও স্কোপিও (দেখা) থেকে। এ পদ্ধতিতে একজন দর্শকের বাম ও ডান চোখের জন্য একই ছবি কিছুটা আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ দুটো দ্বিমাত্রিক ছবিকে আমাদের মস্তিষ্ক তখন প্রক্রিয়াজাত করে ত্রিমাত্রিক ছবি দেখার অনুভূতি দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ নানা স্টেরিওস্কোপিক ছবি দেখেই শত্রুপক্ষের সম্পর্কে ধারণা নিতো। এজন্য প্রথমে তারা এরোপ্লেন থেকে শত্রুর এলাকার নানা ছবি তুলে আনতো। তারপর এসব স্টেরিওস্কোপের সাহায্যে সেসব ছবির ত্রিমাত্রিক ধারণা নেয়ার চেষ্টা করতেন ছবি বিশ্লেষকেরা।

ড্রাগনফ্লাই ইনসেক্টোথপ্টার

4

ঘরের ভেতর একটি ফড়িং কিংবা প্রজাপতি উড়ে বেড়ালে আপনি কি কিছু মনে করবেন? অবশ্যই না। বরং এক নজর সেদিকে চোখ বুলিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিবে অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এ প্রাণীটি যদি জৈবিক না হয়ে যান্ত্রিক হয়? যদি সে জৈবিক প্রাণীর ছদ্মবেশে আপনার উপরই নজরদারি করতে থাকে তাহলে কেমন হবে? ছবিতে আসলে এমনই একটি ইউএভি (আনম্যান্‌ড এরিয়াল ভেহিকল) দেখানো হয়েছে। ১৯৭০ সালের দিকে সিআইএ’র রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে বানানো হয়েছিলো ফড়িংয়ের মতো দেখতে এ ডিভাইসটি যা নানা তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হতো।

মাইক্রোডট ক্যামেরা

5

গোপনে ছবি তোলার নানা কৌশল বিভিন্ন অ্যাকশন বা থ্রিলার সিনেমায় দেখেছি। এরই এক বাস্তব উদাহরণ হলো এই মাইক্রোডট ক্যামেরা। কোনো ছবি কিংবা টেক্সটকে আকারে অনেক ছোট করে কোনো ছোট ডিস্কে ধারণ করার কৌশলকে বলা হয় মাইক্রোডট। মাইক্রোডটগুলো সাধারণত বৃত্তাকার এবং ১ মিলিমিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। তবে চাহিদামতো এর আকার কিংবা আকৃতি পরিবর্তন করা যায়। গত শতাব্দীতে চলা কোল্ড ওয়্যারের সময় বিবিন্ন গোপন তথ্যের আদান-প্রদানের কাজে এটি ব্যবহার করা হতো। হাতের আংটি, ফাঁপা কয়েন ইত্যাদি নানা জায়গায় মাইক্রোডট লুকিয়ে রাখা যেতো।

ম্যাচবক্স ক্যামেরা

6

হাতে একটি ম্যাচবক্স নিয়ে যদি আপনি ঘোরাঘুরি করেন, তাহলে অধিকাংশ মানুষই ভাববে আপনি হয়তো সিগারেট ধরাতে যাচ্ছেন। ম্যাচবক্সের ভেতর যে দেশলাইয়ের কাঠি ছাড়া অন্য কিছুও থাকতে পারে এটা কেউ চিন্তাই করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির নাম ছিলো ‘অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (ওএসএস)’। একে বর্তমানের সিআইএ’র পূর্বপুরুষও বলা যেতে পারে। এ ওএসএস-এর জন্যই ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি তৈরি করেছিলো এসব ম্যাচবক্স ক্যামেরা। এগুলোর ভেতরে দেশলাইয়ের কাঠির বদলে ভরা থাকতো আস্ত ক্যামেরা। আর একজন গোয়েন্দা যে দেশে যাচ্ছেন, তিনি সেই দেশের প্রচলিত কোনো ম্যাচের মোড়ক এর গায়ে লাগিয়ে নিলেই কাজ হয়ে যেতো। তখন কেউ আর সন্দেহের অবকাশ পেতো না যে লোকটি সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে নাকি তার দেশের নিরাপত্তায় আগুন জ্বালাচ্ছে!

ডেড ড্রপ স্পাইক

7

মনে করুন, কোনো একটি এলাকায় কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য দুজন ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে। তারা যদি একসাথে কোথাও দেখা করেন তাহলে শত্রুপক্ষ সন্দেহ করার অবকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু এমনটা হতে দেয়া যাবে না। আবার মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের মাঝে কিছু তথ্যের বিনিময়ও দরকার। কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহও করতে না পারে।

এমন পরিস্থিতির জন্য আসলে বানানো হয়েছিলো এ ডেড ড্রপ স্পাইক। এর ভেতরের ফাঁপা জায়গায় দরকারি তথ্য ভরে তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জায়গায় মাটিতে পুঁতে রেখে যেতো এক এজেন্ট। পরে অন্যজন এসে সুবিধামতো তা তুলে নিয়ে যা বোঝার বুঝে নিতো।

পিজিয়ন ক্যামেরা

8

নামটা দেখেই ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেছে, তাই না? ভাবছেন কবুতর দিয়ে আবার ছবি তোলানো হতো নাকি অতীতে? আসলে আপনি যা ভাবছেন তার আংশিক সত্য, আংশিক আপনার অজানা যা এখন আপনাকে জানাবো। আসলে ছবিগুলো তোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো কবুতরকে। ১৯০৭ সালে জার্মান ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা জুলিয়াস নিউব্রোনার এর উদ্ভাবন করেন। কোনো পোষা কবুতরের গায়ে ছোট ও হালকা এ ক্যামেরাগুলো লাগিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেয়া হতো। ছবি তোলার জন্য ছিল সেলফ টাইম ডিলে মেকানিজম। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর আপনাআপনিই ছবি উঠতে থাকতো, কবুতরটির কাজ ছিল শুধু জায়গামতো উড়ে যাওয়া। তবে প্রযুক্তির অগ্রসরতা একসময় এ কৌশলকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়। সেই সাথে কবুতরগুলোকে ঠিকমতো ট্রেনিং দেয়া, বাড়তি একটি জিনিস নিয়ে উড়তে অভ্যস্ত করানো, জায়গামতো সে আসলেই যাবে কিনা, তার গতি ইত্যাদি নানা বিষয় কবুতর দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর নজরদারিকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।

গোপন সংকেত দেখানো আয়না

9

এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। একজন মহিলাকে যদি আপনার সামনে ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করেনিজের চেহারা সাজাতে দেখেন, তাহলে আপনি কী ভাববেন? নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিবেন, “আরে ভাই, এত ভাবার কী আছে? উনার সাজার ইচ্ছা হইছে, তাই আয়না বের করে সাজতেছে। আর কী?”

আসলে ঘটনার মোড় লুকিয়ে আছে এখানেই। কারণ নারী এজেন্টদের জন্য এমন আয়নাও ছিল (হয়তো এখনো আছে) যা দিয়ে সবার সামনে তিনি হয়তো সাজগোজ করতেন। কিন্তু আসলে সেটি থাকতো বিশেষ এক ধরনের আয়না যা একটু বিশেষ কোণে ধরলে ভেসে উঠতো তার মিশনের গোপন কোনো কোড! সেখান থেকে সহজেই পরবর্তী নির্দেশনা নিতে পারতেন তিনি।

পালিয়ে যাবার মানচিত্র

সিল্কের উপর প্রিন্ট করা এই মানচিত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন এজেন্টের পালিয়ে যাবার পথ চিনিয়ে দেয়া। তবে কাপড়ের উপর আঁকা বলে একজন চাইলে কৌশল হিসেবে এটিকে গায়ে জড়িয়ে কিংবা ভাঁজ করে রাখতে পারতেন। পানিরোধী রং দিয়ে এটি আঁকা হতো বলে যদি এজেন্টকে সাঁতরানো লাগতো, তাহলেও ভয়ের কিছু ছিল না। চুপচাপ জলাশয়ের অন্য পাড়ে গিয়ে শুকিয়ে নিলেই চলতো।

ফাঁপা কয়েন

10

বাইরে থেকে এ কয়েনটিকে নিরেট মনে হলেও আসলে এটি ফাঁপা! এর ভেতরে করে সহজেই কোনো ফিল্ম বা মেসেজ বিনিময় করা যেতো।

মিনক্স ক্যামেরা

11

লাটভিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্টার জ্যাপ ১৯৩৭ সালে এ ক্যামেরাটির ডিজাইন করেন। খুব সহজেই একে হাতের তালুর ভেতর লুকিয়ে রাখা যেতো। এর সাহায্যে তোলা ছবিগুলোর মানও ছিল বেশ ভালো। ফলে গোয়ান্দাগিরির কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলোর মাঝে এটিই শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

অনাহূত অতিথি দূরীকরণ

19

নিজের বাড়িতে অন্যের ছড়ি ঘোরানো কেউই সহ্য করতে পারে না। আর সেটা যদি হয় কোনো এলাকা বা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন, তাহলে তো কথাই নেই। অবৈধভাবে যেন একজন মানুষও কোনো বিশেষ স্থানে ঢুকে পড়তে না পারে এজন্য নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীর প্রচেষ্টার অন্ত নেই। ছবিতে দেখানো ডিভাইসটি এমন কাজেই ব্যবহার করা হতো। মেটে রঙের বলে সহজে কারো চোখে ধরাও পড়ে না এটি। ভূ-কম্পনের সাহায্য নিয়ে তিনশ মিটার দূর থেকে এটি মানুষসহ অন্যান্য যেকোনো কিছুর আগমনকে শনাক্ত করতে পারতো। ছোট ব্যাটারি দিয়ে চালিত এ ডিভাইসে থাকতো বিল্ট-ইন এন্টেনা। এটি কোড করা পালসের সাহায্যে কোনো তথ্য পাঠাতে পারতো।

সিগারেট ক্যারিয়ারে ক্যামেরা

12

যাদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাদের অনেকেই কেবল দোকানে কিনতে পাওয়া প্যাকেটের উপর নির্ভর করেন না। বরং নিজের খুশি মতো বাজার থেকে কিনে নেন চমৎকার কোনো বক্স। কোথাও যখন কেউ সেই বক্স থেকে সিগারেট বের করে, তখন কেউ ঐ বক্সের দিকে ওভাবে তাকায়ও না। আর এ জিনিসটি মাথায় রেখেই ছোট এ ক্যামেরাটি বানানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। একে সহজেই সিগারেটের বক্সে লুকিয়ে রাখা যেতো।

বোতামে লুকোনো ক্যামেরা

13

কোট-টাই পরে যখন আপনি সবার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন সবাই কিন্তু আপনার কাপড়ের রং-মান এসবই খেয়াল করে ঠিকমতো। কাউকে শোনা যায় না বোতামের দিকে তাকিয়ে থেকে সেটির ভালো-মন্দ বিচার করতে।

এ বিষয়টি খেয়াল করেই বিচিত্র এক কৌশল অবলম্বন করেছিল কেজিবি। গত শতকের সত্তরের দশকে তারা অ্যাজাক্স নামের বোতামের ভেতর লুকানো এ ক্যামেরার ডিজাইন করে। ক্যামেরার লেন্স থাকতো ডানদিকের মাঝের বোতামে। যখনই সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়তো, তখনই একজন গোয়ান্দা তার পকেটে থাকা ক্যামেরার শাটারে চাপ দিতেন। সাথে সাথে উঠে যেতো ছবি। কেউই বুঝতে পারতো না!

জুতার নিচে ট্রান্সমিটার

14

গোপন তথ্য সংগ্রহের কৌশল যে আসলে শরীরের সম্ভাব্য সব জায়গাকেই ব্যবহার করেছে এ জুতাটি তার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। ১৯৬০-৭০ সালের দিকে আমেরিকান কূটনীতিকদের উপর নজর রাখতে এটি ব্যবহার করতো রোমানিয়ার সিক্রেট সার্ভিস। কূটনীতিকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে ব্যবহার করতেন না। নিজেদের দেশ থেকেই দরকারি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। রোমানিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা সেগুলো পোস্ট অফিসে আটক করে আগে সেখানে ছবিতে দেখানো উপায়ে ট্রান্সমিটার লাগিয়ে তারপর ছাড়পত্র দিতো। এরপর সেই কূটনীতিকের যাবতীয় আলাপ-আলোচনা সহজেই তারা রেকর্ড করে রাখতে পারতেন!

বিষ্ঠার ভেতরেও ট্রান্সমিটার

15

রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় যখন গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি নানা প্রাণীর মল আমাদের চোখের সামনে পড়ে, তখন সাবধানে পা সরিয়ে হেঁটে যাই আমরা সবাই। দুর্গন্ধময় ওসব জিনিস কে ঘাঁটাতে যাবে? এজন্যই সিআইএ মলের মতো দেখতে এই ট্রান্সমিটারটি ডিজাইন করেছিল যেন কেউ এটা নাড়াতে আগ্রহী না হয়। শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোতে আগেই এগুলো রেখে আসা হতো। এরপর এগুলো সিগনাল পাঠাতো আকাশে থাকা পাইলটদের। সেখান থেকেই এ সিগনাল অনুসরণ করে তারা বোম নিক্ষেপ করে আবার নির্বিঘ্নে ফেরত যেতো।

ঘড়ির ভেতর ক্যামেরা

16

শার্টের বোতাম, হাতের তালু আর সিগারেটের বক্সে যদি ক্যামেরা রাখা যায়, তাহলে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ঘড়িই বা বাদ যাবে কেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির এক এজেন্টের কাছে এমন ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল। এর মূল সমস্যা হলো আন্দাজের উপর ভিত্তি করে ছবি তুলতে হতো। কারণ চোখ রেখে যার বা যে জিনিসের ছবি তোলা হচ্ছে সেটি দেখার ব্যবস্থা এতে রাখা হয়নি। একেকটি ফিল্মে আটটি করে ছবি তোলা যেতো।

গাছের ভেতর বাগ

17

এখন যে গোপন তথ্য চুরির পদ্ধতি বলতে যাচ্ছি সেটা বেশ চমৎকার। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুর দিককার কথা। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন একটি কৃত্রিম কাটা গাছের মতো অংশে একটি বাগ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর এটিকে তারা মস্কোর বাইরে এক গাছপালা ঘেরা জায়গায় এমনভাবে স্থাপন করলেন যেন সহজেই একটি সোভিয়েত মিসাইল সিস্টেমের রাডার ও কমিউনিকেশন সিগনালের উপর তারা নজরদারি করতে পারেন! প্রাপ্ত সিগনালগুলো এখানে সংরক্ষণ করে পরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানো হতো। এর উপরের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করে ভেতরের সোলার ব্যাটারিগুলো চার্জের ব্যবস্থা করতো। এতকিছু করেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কেজিবি একসময় ঠিকই বাগটির অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

ফাউন্টেন পেন

ক্যামেরা নিয়ে আজ বোধহয় বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, তাই না? কিন্তু কী করবো বলুন? কারণ এ ক্যামেরা লুকোনোর পদ্ধতিগুলোই যে ছিল বেশ চমৎকার।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে ফাউন্টেন পেনের ভেতর ট্রোপেল লেন্স লুকিয়ে রাখার কৌশল নেয় সিআইএ। বিভিন্ন দলিলপত্র কিংবা যন্ত্রের ছবি গোপনে তুলতেই একে কাজে লাগানো হতো। যেমন- এখানে যে ফাউন্টেন পেনটি দেখা যাচ্ছে সেটি ব্যবহার করতেন আলেকজান্ডার ওগোরোদনিক, যার কোড নেম ছিল ট্রাইগন। তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র সোভিয়েত কূটনীতিক। সিআইএ তাকে হাত করে নিয়েছিল। ওগোরোদনিক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি কেজিবির হাতে ধরা পড়ে যান। অবশ্য কেজিবি তার কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি। এর আগেই তিনি সিআইএর কাছ থেকে পাওয়া পয়জন পিল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

আপাতত বিদায় নিচ্ছি গোপনীয়তার জগত থেকে। পরবর্তী কোনো লেখায় আশা করি গোপনীয়তায় ভরপুর অন্য কোনো জগতের গল্প নিয়ে সবার সামনে আবার হাজির হবো।

লেখকঃ মুহাইমিনুল ইসলাম

সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি

fb.com/muhaiminul.islamantik