বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর প্রতিভা ম্যাক্সওয়েল

শুরু করা যাক একটি মজাদার প্রশ্ন দিয়ে। এমন ৩ জন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর নাম বলুন যারা পদার্থবিজ্ঞানের জগতটাকেই রাতারাতি পাল্টে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞানে যাদের নুন্যতম ধারণা আছে, তারা ২ জনের নাম সেক্ষেত্রে নির্দ্বিধায় বলবেন। একজন হলেন মহাকর্ষের সারথি স্যার আইজ্যাক নিউটন, অপরজন আপেক্ষিকতা তত্ত্বের অবতারণাকারী আলবার্ট আইনস্টাইন।

কিন্তু তৃতীয় ব্যাক্তিটি কে হবেন? এটা বলতে গিয়ে অনেকেই হয়তো বিভ্রান্তি বা সংশয়ে পড়ে গেছেন। এমনকি খোদ পদার্থবিদরাই এই প্রশ্নের উত্তরে একমত হতে পারেননি। তবে অধিকাংশ বিজ্ঞানীদের মতে এই দুইজনের নামের পাশে যার নাম সবচেয়ে বেশি শোভা পায়, তিনি হচ্ছেন আলোর তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্বের প্রণেতা জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।

১৮৩১ সালের ১৩ই জুন স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গের এক ধনাঢ্য স্কটিশ পরিবারে ম্যাক্সওয়েলের জন্ম। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে তার নাম রেখেছিলেন ক্লার্ক। পরবর্তীতে তার বাবা তার নামের শেষে ম্যাক্সওয়েল যোগ করে দেন।

ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কৌতুহলী মনের অধিকারী। ৩ বছর বয়স থেকেই চারপাশের বিভিন্ন ঘটনার কারণ সম্পর্কে মায়ের কাছে জানতে চাইতেন। শৈশবেই তার তীক্ষ্ণ মেধার পরিচয়ও পাওয়া গিয়েছিল। মাত্র ৮ বছর বয়সেই তিনি কবি জন মিল্টন রচিত দীর্ঘ অনুচ্ছেদগুলো অনায়াসে পড়তে পারতেন।

চিত্র: জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল

১৮৩৯ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ম্যাক্সওয়েলের মা মারা যান। বাবা এবং চাচী তার দেখাশোনা ও পড়ালেখার দেখভাল করেন। তবে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাশুরুর অভিজ্ঞতা খুব সুখকর ছিল না।

ম্যাক্সওয়েলের প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং অজানাকে জানার প্রবল ইচ্ছা ছিল প্রবল। কিন্তু তার পড়াশোনায় মন ভরছিল না শিক্ষকের। তিনি ধারণা করেছিলেন, ম্যাক্সওয়েল সাধারণ বাচ্চাদের মতো কোনো জিনিস দ্রুত শিখতে পারে না। এই নেতিবাচক মনোভাবের কারণে পড়ানোর সময় তিনি মাঝে মাঝে ম্যাক্সওয়েলের সাথে রুক্ষ ব্যবহার করতেন। এ ঘটনা জানার পর সেই শিক্ষককে ছেড়ে দেয়া হয় এবং ১৮৪১ সালে তিনি বিখ্যাত এডিনবার্গ একাডেমির স্কুল শাখায় ভর্তি হন। সেখান থেকেই তার বিখ্যাত কর্মকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে।

চিত্র: এডিনবার্গ একাডেমি

স্কুলে ভর্তি হলেও স্কুলের গৎবাঁধা নিয়ম আর সীমাবদ্ধ পড়াশোনায় তার তেমন আগ্রহ ছিল না। এমনকি পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও তিনি বেশ উদাসীন ছিলেন। তবে তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনুসন্ধিৎসু মনটি ছিল সদা জাগ্রত।

শুনতে অবাক লাগলেও ম্যাক্সওয়েল যখন তার প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর! তার প্রথম বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু ছিল জ্যামিতিকেন্দ্রিক। গবেষণাপত্রে সরু দড়ির কুণ্ডলীর সাহায্যে গাণিতিক বক্ররেখাগুলোকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে উপস্থাপনের পদ্ধতি বর্ণনা করেন।

এছাড়াও তিনি দুইয়ের অধিক কেন্দ্র সম্পন্ন সাধারণ উপবৃত্ত, কার্তেসীয় উপবৃত্ত সহ বিভিন্ন বক্ররেখার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণাপত্রে আলোচনা করেন। তার এই গবেষণালব্ধ ফলাফল এডিনবার্গ রয়েল সোসাইটিতে পর্যন্ত উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু সে সময় তার বয়স ছিল খুব কম। শিক্ষকেরা এই তরুণ বয়সে এত বড় কাজের ভার তার উপর দিতে চাননি। তাই তার অনুসন্ধানের পুরো বিষয়টি মঞ্চে উপস্থাপন করেছিলেন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক দর্শন বিভাগের অধ্যাপক জেমস ফোর্বস। তৎকালীন সময়ে

চিত্র: এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়

পদার্থবিজ্ঞানকে ‘প্রাকৃতিক দর্শন’ বা ‘ন্যাচারাল ফিলোসোফি’ নামে ডাকা হতো। মজার বিষয় হলো, ম্যাক্সওয়েল তখনও কলেজের গণ্ডিই পার করতে পারেননি।

১৬ বছর বয়সে ১৮৪৭ সালে ম্যাক্সওয়েল এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারও সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে প্রথম টার্ম পরীক্ষার পর তিনি এডিনবার্গের স্নাতক শেষ করবেন বলে মনস্থির করেন। এডিনবার্গে থাকাকালীন সময়েও তার লেখা ২টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

১৮৫০ সালের অক্টোবরে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন এবং সেখানেই তার সৃষ্টিশীল কাজের পরিচয় ফুটে ওঠে। ২৫ বছর বয়সে তাকে অ্যাবার্ডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। মাত্র ২৫ বছর বয়সে একই সাথে অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান হবার নজির খুবই বিরল।

কয়েক বছরের মাঝেই গবেষক হিসেবে তার নাম বিজ্ঞানমহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠে। তিনিই সর্বপ্রথম শনির বলয়ের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ২০০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এই সমস্যার কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি বিভিন্ন গাণিতিক পরিসংখ্যান এবং শনি গ্রহের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ এবং সেগুলো যাচাই বাছাই করে বলেন, শনির বলয় আসলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তু দিয়ে তৈরি। এই বস্তুগুলো একসাথে শনির চারপাশে ঘুরপাক খাওয়ার কারণেই এই বলয় তৈরি করে থাকে।

তার আগে কোনো গবেষকই বিষয়টিকে এভাবে চিন্তা করেননি। তাদের ধারণা ছিল, শনির বলয় হয়তো অবিচ্ছিন্ন কোনো দৃঢ় বস্তু দিয়ে তৈরি। এরকম হলে সেগুলো ঘূর্ণনের সময় একে অপরের সাথে ধাক্কা লেগে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেত। এমনকি শনিগ্রহের সাথেও বলয়ের সংঘর্ষ হবার সম্ভাবনা থাকত। আবার বলয়টি তরল পদার্থের হলে প্রচণ্ড গতিতে ঘোরার কারণে সেগুলো একে অপর থেকে ছিটকে যাবার কথা। কিন্তু সেরকমও তো হচ্ছে না।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য ম্যাক্সওয়েল তখন গণিতের আশ্রয় নিলেন। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে তিনি বলেন, শনির বলয়টি যদি অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদার্থের সমন্বয়ে তৈরি হয়, তবেই সেটি মোটামুটি স্থিতিশীল ও অক্ষুন্ন থাকবে। প্রতিটি ক্ষুদ্র পদার্থ একেকটি উপগ্রহের ন্যায় শনি গ্রহের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে। একটি রিংয়ের সকল ক্ষুদ্র পদার্থ একটি নির্দিষ্ট দিকে নির্দিষ্ট বেগে ঘোরে। এমনটা না হলে বলয়ের পদার্থগুলো একে অপরের সাথে সংঘর্ষের ফলে পুরো ব্যবস্থাটিই ধ্বংস হয়ে যেত।

চিত্র: শনির বলয় নিয়ে লেখা ম্যাক্সওয়েলের গবেষণাপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা।

ম্যাক্সওয়েল শুধু শনির বলয় সৃষ্টির কারণই ব্যাখ্যা করেননি, তিনি এর ভবিষ্যতও অনুমান করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, শনির বলয়টি ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করবে এবং একপর্যায়ে সেটি অদৃশ্য হয়ে যাবে। শনিগ্রহের মহাকর্ষ বলের কারণেই মূলত এই ঘটনাটি ঘটবে।

প্রায় শতাধিক বছর পরে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। ভয়েজার মহাকাশযান শনিগ্রহকে ফ্লাইবাই করার সময় পাঠানো বিভিন্ন ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ম্যাক্সওয়েলের বিবৃতিটি সম্পূর্ণরূপে সঠিক ছিল।

১৮৬০ সালে ম্যাক্সওয়েল যে কলেজের শিক্ষক ছিলেন সেটি আরেকটি কলেজের সাথে মিলিতভাবে কাজ শুরু করে। তখন তাঁকে বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এই ঘটনার পর তিনি লন্ডনের কিংস কলেজের প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। এখানে অবস্থানকালেই তিনি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত আবিষ্কারটি করেছিলেন। তার সেই আবিষ্কারকে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা (আইনস্টাইন, ফাইনম্যান, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক প্রমুখ) বিংশ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার বলে মনে করেন।

তিনি ৪টি গাণিতিক সমীকরণ প্রতিপাদন করেন। এই সমীকরণগুলোর সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেন, আলো, বিদ্যুৎ এবং চৌম্বকত্ব- এরা একই বল থেকে সৃষ্টি। সেই বলের নাম তাড়িতচুম্বক বল। সমীকরণগুলো বর্তমানে ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ নামে পরিচিত। তার এই আবিষ্কার এখন পর্যন্ত পদার্থ বিজ্ঞানের সার্বিক ঐক্যবদ্ধ তত্ত্ব বা Grand Unified Theory of Physics তৈরিতে সবচেয়ে বড় সহায়ক।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ

বর্তমানে আমরা জানি, ইলেকট্রন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হবার মুহূর্তে আমরা বিদ্যুৎ শক্তি পাই। ইলেকট্রনগুলো যখন একই দিকে ঘুরতে থাকে তখন চৌম্বকত্ব পাওয়া যায়। আবার ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করে উচ্চ শক্তিস্তর থেকে নিম্ন শক্তিস্তরে গমনের সময় ফোটন নির্গত হয়। সেখান থেকেই আলোক শক্তি পাওয়া যায়।

এই তিনটি ঘটনাই বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বলের বাস্তব উদাহরণ। প্রকৃতপক্ষে ইলেকট্রন আমাদের চেনা জানা জগতকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটা এই ঘটনাগুলোর সাহায্যেই বোঝা যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ইলেকট্রন আবিষ্কারের প্রায় ৩০ বছর আগে।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের জন্মস্থান। এই বাড়িতেই তিনি জন্মেছিলেন।

তিনি মূলত ২টি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে এই সমীকরণগুলো প্রতিপাদন করেছিলেন। প্রথমটি হচ্ছে বিদ্যুৎ কীভাবে চৌম্বকত্বকে প্রভাবিত করে। দ্বিতীয়টি ঠিক তার উলটো অর্থাৎ চৌম্বকত্ব কীভাবে বিদ্যুৎকে প্রভাবিত করে। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেন, বিদ্যুৎ এবং চৌম্বকত্বের মাঝে প্রভাব বিস্তারকারী জিনিসটি হলো বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গটি তার উৎস থেকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি এই তরঙ্গের বেগ নির্ণয় করে দেখেন তা আলোর বেগের সমান। যেহেতু আলোর চেয়ে বেশি বেগে মহাবিশ্বে কোনো কিছু যেতে পারে না, তাই বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ এবং আলো অবশ্যই একই জিনিসের দুটি ভিন্ন রূপ হবে।

শূন্যস্থানের মধ্য দিয়ে শক্তির তরঙ্গরূপে ভ্রমণের ধারণাটি সে সময়ের সনাতনী নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানকে অনেক বড় ধাক্কা দেয়। কারণ নিউটন মনে করতেন, দুরে অবস্থিত কোনো বস্তুর উপর মহাকর্ষ বল ছাড়া আর কিছু প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

কিন্তু নতুন আবিষ্কার বলছে ভিন্ন কথা। নতুন এই ধারণাটির উপর ভিত্তি করে পদার্থবিজ্ঞানের আরেকটি নতুন শাখার জন্ম হয়। তার নাম কোয়ান্টাম মেকানিক্স।

ম্যাক্সওয়েলের এই বিদ্যুৎচুম্বকত্বের ধারণা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকেও প্রভাবিত করেছে। তার সমীকরণের উপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র (রেডিও, টেলিভিশন, রাডার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ইত্যাদি) তৈরি করা হয়।

তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ ছাড়াও ম্যাক্সওয়েলের আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার রয়েছে। গ্যাসের গতিতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। তার এই তত্ত্ব পরিসংখ্যানিক পদার্থবিজ্ঞানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে। এর সাহায্যে ক্ষুদ্র মৌলিক কণার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিসংখ্যানের মাধ্যমে উপস্থাপনের এক অভিনব উপায় বের করা সম্ভব হয়েছিল। যা ছিল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পূর্বশর্ত।

তিনিই বিশ্বে প্রথম রঙ্গিন ফোটোগ্রাফ তৈরি করেছিলেন। মানুষের চোখ যে লাল, নীল, সবুজ- এই তিনটি আলোর অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারে। এটাও তিনিই প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন। একারণে তিনি লাল, নীল ও সবুজ বর্ণের পৃথক ফিল্টার ব্যবহার করে তার ফটোগ্রাফার দিয়ে একটি পশমি কাপড়ের পটির ছবি তোলেন। পরবর্তীতে এই তিনটি ছবিকে স্তরীভুত করে ফিতার একটি পরিপূর্ণ রঙ্গিন ছবি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন। আধুনিক ফটোগ্রাফিতে তার এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের প্রচেষ্টায় তৈরিকৃত পৃথিবীর প্রথম রঙিন ফটো।

ম্যাক্সওয়েল ১৮৭৯ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তার মায়ের মতোই পেটের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি পদার্থবিজ্ঞানের জগতে অনেক বড় প্রভাব রেখে গিয়েছেন। আরো ২০-৩০ বছর বেঁচে থাকলে হয়তো পদার্থবিজ্ঞানকে আরো অনেক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন।

বিজ্ঞানী ও গবেষকরা তার অবদানকে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তার তড়িৎচুম্বকীয় ধারণার উপর ভিত্তি করে Electric Fields and Waves নামে তড়িৎকৌশল একটি শাখা তৈরি করা হয়েছে। তার এই ধারণাটি এতটাই মৌলিক ও চমৎকার ছিল যে প্রযুক্তিবিদদের সবচেয়ে বড় সংগঠন IEEE-র লোগোতে সেটি স্থান পেয়েছে।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের প্রচেষ্টায় তৈরিকৃত পৃথিবীর প্রথম রঙিন ফটো।

লোগোটিতে সোজা তীরচিহ্ন দিয়ে বিদ্যুৎ এবং বাঁকানো তীর চিহ্ন দিয়ে তড়িৎ চৌম্বকীয় ক্ষেত্রকে বোঝানো হয়েছে। এর পেছনের মূল কারিগর নিঃসন্দেহে ম্যাক্সওয়েল। তিনিই ফ্যারাডে এবং অ্যাম্পিয়ারের সূত্র দুইটিকে একীভূত করতে পেরেছিলেন।

তার নামানুসারে সিজিএস পদ্ধতিতে চৌম্বক ফ্লাক্সের এককের নাম রাখা হয়েছে ম্যাক্সওয়েল। তার অসামান্য অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সাবমিলিমিটার টেলিস্কোপটির নাম রাখা হয়েছে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল টেলিস্কোপ।

এছাড়াও শনির বলয়ের C রিংয়ের মধ্যবর্তী সবচেয়ে প্রশস্ত (২৭০ কিলোমিটার চওড়া) ফাঁকা স্থানের নাম রাখা হয়েছে ম্যাক্সওয়েল গ্যাপ।

তথ্যসূত্র

  1. https:// britannica.com/biography/James-Clerk-Maxwell
  2. https://iaus.archive.org/8/items/onstabilityofmot00maxw/onstabilityofmot00maxw.pdf
  3. https://youtube.com/watch?v=b2cVLHozb9k
  4. https://owlcation.com/humanities/The-Contributions-of-James-Clerk-Maxwell-to-Science

পৃথিবীর অদ্ভুত কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

মাঝে মাঝে প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়েও নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিজ্ঞানী তাদের গবেষণার স্বার্থে বিভিন্ন পাগলাটে পরীক্ষার আশ্রয় নিয়েছিলেন। তেমনই কিছু অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সম্বন্ধে আলোকপাত করা হলো এখানে।

ঘটনা ১

বিজ্ঞানপ্রেমীদের নিকট স্যার আইজ্যাক নিউটনের নাম সুপরিচিত। মহাকর্ষের সাথে জড়িয়ে আছে তার নাম। মহাকর্ষ বলের পাশাপাশি তিনি আলোকবিজ্ঞান নিয়েও বেশ কিছু গবেষণা করেছিলেন। ১৬৬৫ সালে প্রিজম এবং সূর্যালোকের উপর প্রিজমের প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আলো এবং রং নিয়ে তার কৌতুহলের মাত্রা পদার্থবিজ্ঞানের সকল সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। মানুষের মন কীভাবে বিভিন্ন রঙের ধারণাগুলো উপলব্ধি করে, তা-ই ছিল তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

আগ্রহ থেকে জন্ম নেয়া প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনি এক ভয়ানক পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন। একটি লম্বা সরু সূচ তার নিজের চোখের মধ্যে প্রবেশ করানোর সিদ্ধান্ত নেন। চোখের অক্ষিগোলক এবং অক্ষিকোটরের পেছনে থাকা হাড়ের মধ্যবর্তী স্থানের মধ্যে সূচটি প্রবেশ করাতে চেয়েছিলেন তিনি।

তার মতে বিষয়টি ছিল একটি অভিনব চিন্তা। তিনি সূচ দিয়ে তার অক্ষিগোলকের বিভিন্ন অংশে খোঁচা দেন। সে সময় তিনি বিভিন্ন রঙ্গের ছোপ দেখতে পান। তিনি হিসাব নিকাশ করে দেখেন, রংয়ের পরিবর্তন চোখের উপর প্রয়োগকৃত বল এবং গবেষণাকক্ষের আলোর উপর নির্ভরশীল।

আইজ্যাক নিউটন

এই পরীক্ষাটি আমরাও করে দেখতে পারি। তবে তার জন্য বিপজ্জনক পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে না। চোখ বন্ধ করে চোখের পাতা ঘষলে আমরা নিউটনের মতো সেই একই অনুভূতি পাবো। কারণ এখন আমরা জানি, নিউটনের এই উপলব্ধির মূল উৎস হলো আমাদের চোখের রেটিনার এক বিশেষ আলোকসংবেদী কোষ। এর নাম কোন কোষ

আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর ভিত্তি করে চোখে বিভিন্ন বর্ণের অনুভূতি সৃষ্টি করাই কোন কোষের কাজ। অক্ষিগোলকের উপর চাপ প্রয়োগের ফলে নিউটন আসলে এই কোন কোষগুলোকে উদ্দীপিত করে তুলেছিলেন। সুই দিয়ে করা তার পরীক্ষাটি নিঃসন্দেহে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সৌভাগ্যবশত বিজ্ঞানী নিউটন সেই আশঙ্কাটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পরীক্ষাটি আর অব্যাহত রাখেননি।

ঘটনা ২

সুঁইয়ের ঘটনাটিই নিউটনের জীবনের একমাত্র পাগলামি নয়। তিনি তার চোখকে আরো একবার গবেষণার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। কোনো জিনিস দর্শনের পর আমাদের মস্তিকে তার রেশ কতটুকু সময় থাকে সেটা নিয়ে তিনি একবার অনুসন্ধান করছিলেন।

কোনো উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকানোর পর আমরা যে ঝাপসা অবয়ব দেখতে পাই তাকে আফটার ইমেজ ইফেক্ট বলে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের দিকে যারা কখনো তাকিয়েছেন তারা বিষয়টি খুব ভালভাবে বুঝতে পারবেন। চোখের রেটিনার আলোক সংবেদী কোষসমুহ অতিমাত্রায় উদ্দীপ্ত হলে আফটার ইমেজ ইফেক্ট দেখা যায়। যার কারণে আলো চলে গেলেও অধিক উদ্দীপনার কারণে আলোক সংবেদী কোষগুলো তখনো সক্রিয় থাকে।

এই আফটার ইমেজ ইফেক্ট পরীক্ষার জন্য নিউটন একটি অন্ধকার রুমের এক কোনায় একটি আয়না রাখেন। এরপর সেই আয়নার উপর সূর্যের আলো ফেলার ব্যাবস্থা করেন। এরপর ডান চোখ দিয়ে আয়নার উপর আপতিত সূর্যের আলোর প্রতিফলন দেখেন। যখন আয়না থেকে চোখ সরিয়ে ফেলেন, তখন সূর্যের একটি স্পট বা ছোপ দেখতে পান।

সূর্যের প্রতিফলিত প্রতিকৃতির দিকে বার বার দৃষ্টিপাত করতে থাকেন। কিছু সময় পর তিনি দেখতে পান, সূর্যের আলোর বিম্ব তার চোখকে এতটাই প্রভাবিত করে ফেলেছে যে ডান চোখ বন্ধ করে তাকালেও সেই ঝাপসা বিন্দুটি দেখতে পাচ্ছেন। ঠিক তখনই নিউটন ঘাবড়ে যান।

তিনি যেদিকেই তাকাচ্ছিলেন, সবখানেই শুধু সূর্যের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তার চোখ হয়ত নষ্ট হয়ে গেছে। এ সমস্যা থেকে পরিত্রানের জন্য তিনি নিজেকে টানা তিনদিন একটি অন্ধকার রুমে তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তিনদিন পর তার দৃষ্টিশক্তি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পুরোপুরি সেরে উঠতে বেশ কয়েক মাস লেগে যায়।

বর্তমানে অনেকে মনে করেন সূর্যের উজ্জ্বল আলো ও অতিবেগুনি রশ্মি আপতিত হওয়ার কারণে নিউটনের চোখের রেটিনা সম্ভবত সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ঘটনাকে সোলার রেটিনোপ্যাথি বলা হয়। এ সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ বা ধাতব ওয়েল্ডিংয়ের সময় চোখে আলো প্রতিরোধকারী চশমা পরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চিত্র: ক্ষতিকর আলোকরোধী চশমা, সূর্যগ্রহণের সময় ব্যবহার করা হয়।

ঘটনা ৩

পরীক্ষাগারে কাজ করার সময় নিরাপত্তার দিকে সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হয়। কিন্তু ব্রিটিশ রসায়নবিদ স্যার হামফ্রে ডেভি সেই নিয়ম লঙ্ঘন করেন। ডেভি তখন ইংল্যান্ডের নিউম্যাটিক ইন্সটিটিউটের ল্যাব সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে সেখানে কাজ করেন।

তার পরীক্ষণ পদ্ধতি ছিল ব্যাতিক্রমধর্মী ও চমকপ্রদ। প্রথমে গ্যাসসমূহের মাঝে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতেন। তারপর বিক্রিয়ায় উৎপন্ন অজানা গ্যাসীয় উৎপাদগুলো শ্বাসের মাধ্যমে নিজের শরীরে গ্রহণ করতেন এবং সেই গ্যাসগুলোর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতেন। ভয়ের বিষয় হলো, যে সকল গ্যাস তার শরীরে প্রবেশ করতো তাদের সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না ডেভির।

গ্যাসগুলো ক্ষতিকর নাকি উপকারী সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। ডেভির শিক্ষক একবার আশ্চর্য এক গ্যাস নিয়ে কাজ করেছিলেন। গ্যাসটির নাম নাইট্রাস অক্সাইড। ডেভি এ গ্যাসটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করার সাথে সাথে তার মাঝে এক তীব্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। শুধু তা-ই নয়, তার অনুভূতি এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি কারণে অকারণে হাঁসতে শুরু করেন।

হামফ্রে ডেভি

নাইট্রাস অক্সাইড সেবনে মানুষের শরীরে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এ কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা বা ব্যাথার উপশমে এ গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ডেন্টিস্টরা রোগীদের দাঁত তোলার পর ব্যাথা নিবারনের ডোজে নাইট্রাস অক্সাইড ব্যবহার করেন।

এক পরীক্ষায় হামফ্রে ডেভি মাত্র ৭ মিনিটে ১৫ লিটার বিশুদ্ধ নাইট্রাস অক্সাইড গ্রহণ করে ফেলেছিলেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, সে যাত্রায় তার কিছু হয়নি। তবে পরীক্ষা চালিয়ে যে অনুভূতি পেয়েছিলেন সেটি তার খুব পছন্দ হয়েছিল। এমনকি তার বন্ধু বান্ধবদেরকেও এ গ্যাস গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করে তোলেন। এটি রীতিমতো একটি প্রথার পর্যায়ে চলে যায়। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ ক্ষণিকের জন্য সুখের অনুভূতি পেতে এ গ্যাস সেবন করতে শুরু করে।

ডেভির এই ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষাই তাকে রসায়নবিদ হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল। এ পরীক্ষার কয়েক বছরের মাঝেই তিনি পর্যায় সারণির কিছু গুরুত্বপূর্ণ মৌল আবিষ্কার করেন। সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, স্ট্রনসিয়াম এবং বেরিয়াম ছিল তালিকায়। এ মৌলগুলো অবশ্য তিনি এই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে পরীক্ষা করে আবিষ্কার করেননি।

এমনিতে নাইট্রাস অক্সাইড ছাড়াও তিনি আরো অনেক গ্যাস শুঁকেছিলেন। সেসবের মাঝে অনেক গ্যাসই ছিল বিষাক্ত ও ক্ষতিকর। তাদের ক্ষতিকর প্রভাবে ধীরে ধীরে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। ৫০ বছরের কিছু বয়স পরে তিনি দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাতেই মারা যান।

বিজ্ঞানের জগতে হামফ্রে ডেভির সাফল্য অবিস্মরণীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যে পরীক্ষা তাকে সাফল্যের স্বর্ণচূড়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সে পরীক্ষাই ছিল তার মৃত্যুর কারণ।

ঘটনা ৪

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইলফলক সৃষ্টিকারী এক ব্যক্তির নাম স্টাবিন্স ফার্থ। নিজের মনে জমে থাকা কৌতুহল মেটাতে তিনি যা করেছিলেন তা অবিশ্বাস্য। ১৮০৪ সালে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় ইয়েলো ফিভার বা পীতজ্বর নিয়ে থিসিস করছিলেন। এটি একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে প্রচণ্ড জ্বর হয়। এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যাথা এমনকি জণ্ডিসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও রয়েছে।

স্টাবিন্স ফার্থ

১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াতে এ রোগের মহামারি দেখা দেয়। সেই মহামারীতে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। প্রসিদ্ধ ডাক্তাররা অভিমত দেন, পচা কফি আমদানি, লোনা পানি কিংবা দুষিত বাতাসের কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটে। কিন্তু বিজ্ঞানী ফার্থ এ অভিমতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি রোগের মূল কারণ অনুসন্ধানে সচেষ্ট হন।

তিনি খেয়াল করেন ইয়েলো ফিভার তাণ্ডব চালায় মূলত গ্রীষ্মকালে। কিন্তু শীতকালে এ রোগের তেমন কোনো প্রভাব থাকে না। এখান থেকে তিনি ধারণা করেন ইয়েলো ফিভার আসলে সংক্রামক কোনো ব্যাধি নয়।

তিনি আক্রান্ত রোগীদের বমি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। প্রথমে কুকুরকে বমি খাওয়ান। কিন্তু কুকুর ইয়েলো ফিভারে আক্রান্ত হলো না। তারপর কুকুর এবং বিড়ালের শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে বমি প্রবেশ করান। এবারও কাজ হলো না। এরপর পরীক্ষাটি নিজের উপর চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

প্রথমে চোখে বমি নেন। কাজ হলো না। এরপর বমিকে উত্তপ্ত করে গ্যাসে পরিণত করেন এবং তা নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করেন। কিন্তু তাতেও কোনো ফল পাওয়া গেল না। এবার মুখ দিয়েই গ্রহণ করে ফেলেন। এবারও সংক্রমিত হলেন না। এরপর আক্রান্ত রোগীর দেহের অন্যান্য তরল পদার্থ নিয়েও কাজ শুরু করেন। এতেও তিনি আক্রান্ত হলেন না। এরপর তিনি ঘোষণা দেন, ইয়েলো ফিভার কোনো সংক্রামক ব্যাধি হতে পারে না।

ঘটনা ৫

চল্লিশের দশক। ২য় বিশ্বযুদ্ধে পুরো বিশ্ব তখন টালমাটাল। সে সময় কতিপয় বিজ্ঞানী ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র আবিষ্কারে মনোনিবেশ করেন। তারই ফলশ্রুতিতে নিউক্লিয়ার অস্ত্রের উত্থান ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরে নিউ মেক্সিকোর গোপন পারমাণবিক গবেষণাগার তাদের তৃতীয় নিউক্লিয়ার চুল্লি নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করে। এখানেই পারমাণবিক বোমা বানানোর গোপন মিশন ম্যানহাটান প্রোজেক্ট শুরু করা হয়। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত দুইটি অ্যাটম বোমা লিটল বয় আর ফ্যাট ম্যান এই লস আলামস ল্যাবরেটরিতেই তৈরি করা হয়েছিল।

তবে ঘটনাটি যার সাথে ঘটেছিল তার নাম লুইস স্লটিন। কানাডার এই পদার্থবিদ তৃতীয় চুল্লিতে গবেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এই চুল্লি থেকে হয়তো আরো একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হতো।

যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়াতে সেখানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর সুপার ক্রিটিক্যাল অবস্থায় উপনীত হলে কী ঘটে সেটিই ছিল তাদের আগ্রহের বিষয়। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের মুক্ত নিউট্রনের প্রভাবে স্বতঃস্ফূর্ত চেইন বিক্রিয়া ঘটতে থাকে। বিক্রিয়ার হার বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে তা সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায়। তখন নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া ঘটে। রিয়্যাক্টরে থাকা প্লুটোনিয়ামের পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়।

লুইস স্লটিন

লুইস স্লটিন তৃতীয় পারমাণবিক চুল্লিতে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের নেতৃত্ব দেন। তাদের মূল কাজ ছিল চেইন বিক্রিয়াটি যতটুকু সম্ভব সুপার ক্রিটিক্যালের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং সেই মুহূর্তের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা।

চুল্লিটি বেরিলিয়ামের তৈরি একটি গোলকের ২টি অর্ধাংশ দ্বারা আবৃত ছিল। চুল্লির ভেতরে নিউট্রনের চলাচল ও প্রতিফলনে অর্ধগোলক দুইটি খুব কার্যকর ভূমিকা পালন করত। চেইন বিক্রিয়াটি সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায় যাওয়া থেকে রক্ষা করতে এ দুটি অর্ধগোলককে পরস্পর থেকে পৃথক রাখাটা জরুরী ছিল। অর্ধগোলক দুটিকে আলাদা করার জন্য এক ধরনের ব্লক ছিল। কিন্তু লুইস স্লটিন সেই ব্লক ব্যবহার করতেন না। অর্ধগোলক দুটিকে পৃথক রাখার জন্য তিনি স্ক্রু ড্রাইভার ব্যবহার করতেন।

কিন্তু এ কাজের পেছনে থাকা ভয়াবহ ঝুঁকিটা তিনি ঠিকভাবে আঁচ করতে পারেননি। কয়েক মাস আগেই তার এক পূর্বসূরি এই চুল্লিতেই তেজস্ক্রিয় বিষক্রিয়ায় মারা গিয়েছিলেন। অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি স্ক্রু ড্রাইভারের সাহায্যে এই বিপদজনক কাজটি নিয়মিতভাবে করতেন।

এক দিন পর্যবেক্ষণের সময় অর্ধগোলক দুটিকে একে অপরের খুব কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার হাত থেকে স্ক্রু ড্রাইভারটি ছিটকে পড়ে যায়। মুহূর্তেই নিউক্লিয়ার চুল্লিটিতে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। নীল বর্ণের তেজস্ক্রিয় আলোয় চারদিকে ছেয়ে যায়। মাত্র ৯ দিনের মাথায় তিনি মারা যান।

চিত্র: বেরিলিয়ামের দুই অর্ধগোলক ও স্লটিনের ব্যবহৃত সেই স্ক্রু ড্রাইভার

হিসাব করে দেখা যায়, তিনি প্রায় ১০০০ র‍্যাড তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হন। সর্বনিম্ন যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট, তিনি তার দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

তার মৃত্যুর পরে সে চুল্লিকে ‘পিশাচ চুল্লি’ বা Demon core নামে আখ্যায়িত করা হয়। এছাড়াও লস আলামসে সুপারক্রিটিক্যালিটি নিয়ে সকল ধরণের গবেষণা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

তথ্যসূত্র

  1. https://nature.com/articles/494175a
  2. http://www.slate.com/articles/health_and_science/science/2017/08/html
  3. http://www.madsciencemuseum.com/msm/pl/stubbins_ffirth
  4. https://youtube.com/watch?v=_CMql2TRQV8

featured image: allthatsinteresting.com/