শীত ও গ্রীষ্মে ভিন্নভাবে কাজ করে মানুষের মস্তিষ্ক

একটি নতুন গবেষণা বলছে আমাদের মস্তিষ্ক একেক ঋতুতে একেকভাবে কাজ করে। এই গবেষণার সাথে যুক্ত গবেষক গিলস ভেনডেওয়ালের ভাষ্যে, মস্তিষ্কের কার্যকলাপের চলমান প্রক্রিয়া ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন। বেলজিয়ামের গবেষকরা ২৮ জন মানুষেকে নিয়ে বিভিন্ন ঋতুতে এই পরীক্ষাটি করেন।

পরীক্ষায় প্রতিবার একজন ব্যক্তি ৪/৫ দিন শুধুমাত্র একটি গবেষণাগারে কাজ করেন। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকেন। এরপর প্রত্যেকের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখা হয়। তাদের কর্মদক্ষতা, কাজের প্রতি মনোযোগ বজায় রাখা, তথ্য সংগ্রহ ও তুলনা করার দক্ষতা, স্মৃতিতে তথ্য ধারণ করার ক্ষমতা ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখা হয়।

গবেষকরা দেখতে পান বিভিন্ন সময়ে মানুষের কর্মদক্ষতার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু দেখা যায়, এই গবেষণায় কাজগুলো সম্পাদন করতে ‘নিউরাল কস্ট’ ও মস্তিষ্কের কার্যাবলির প্রক্রিয়ার পরিবতর্ন হয়। এটি বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন রকম হয়। যেমন, মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা মনোযোগ বজায় রাখার সমানুপাতিক।

বছরের জুন মাসের দিকে, অর্থাৎ শীতকালে মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা থাকে উপরে। অন্যদিকে ডিসেম্বর মাসে গ্রীষ্মের সময়ে মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা থাকে নিচের দিকে। আবার আরেকটি ব্যাপার, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার পর্যায়, স্মৃতিতে ধারণক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত। কার্যক্ষমতা শরতে থাকে শীর্ষে এবং বসন্তে থাকে সর্বনিম্নে।

পূর্ববর্তী কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঋতুর পরিবর্তনের সাথে মানুষের দৈনন্দিন কার্যাদির সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকেরা মনে করেন, শীতকালে মানুষের ক্যালরি গ্রাস করার ঝোঁক গ্রীষ্মকালের তুলনায় বেশি। ২০১৫ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের জিনের সক্রিয়তা ঋতুর সাথে পরিবর্তিত হয়।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, মানুষের মেজাজ এবং ঋতুর মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। শীতকালে মস্তিষ্কের সিজনেবল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD) এর লক্ষণ দেখা যায়।

গবেষক ভেনডেওয়ালে বলেন, যদিও গবেষকরা মস্তিষ্কের সক্রিয়তা এবং ঋতু পরিবর্তনের সাথে মানুষের মেজাজ পরিবর্তনের সম্ভাব্য সম্পর্ক এই নতুন গবেষণায় পরীক্ষা করেননি, কিন্তু যারা SAD-এ ভুগছেন, তাদের ঋতু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের জ্ঞান সম্বন্ধীয় কার্যাবলীর প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গবেষকরা আরো বলেন, নতুন গবেষণায় পাওয়া ঋতু পার্থক্যের সাথে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের পরিবর্তনের পেছনে দায়ী মূল কারণ ও প্রক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আগের গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নিউরোট্রান্সমিটার যেমন সেরোটোনিনের মাত্রা এবং সেই সাথে মস্তিষ্কের শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় জড়িত প্রোটিনের মাত্রা ঋতু পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়।

গবেষকরা এই নতুন গবেষণা থেকে উপনীত হন যে, ঋতুর পরিবর্তনের সাথে মস্তিষ্কের সক্রিয়তার বৈচিত্রময় পরিবর্তন হয়। এই নতুন গবেষণাটি ৮ ফেব্রুয়ারিতে ‘ন্যাশনাল একাডেমী অব সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।

তথ্যসূত্রঃ লাইভ সায়েন্স, http://www.livescience.com/53643-your-brain-works-differently-seasons.html

featured image: edition.cnn.com

মানুষের অন্যান্য ইন্দ্রিয়

পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা মানুষের স্নায়বিক উত্তেজনাগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। কিন্তু এই পঞ্চ ইন্দ্রিয় ছাড়াও মানুষের আরও বেশ কিছু স্নায়ু রয়েছে যা আমাদের অগোচরে কাজ করে। ধরুন, আপনি ডাইনিং রুমে চেয়ারে বসে রাতের খাবার খাচ্ছেন। চেয়ারে বসা, খাদ্যের স্বাদ ও সুগন্ধি গ্রহণ এবং তা সম্পর্কে অনুভূতি ও খাদ্যের চিবানোর শব্দ – এই সব কিছুই আপনার পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, অন্যান্য কিছু স্নায়ু দ্বারা এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়সমূহ নিয়ন্ত্রিত।

আমাদের পরিচিত ইন্দ্রিয়সমূহ; image source: qsstudy.com

সাধারণত চেয়ারে বসা এবং খাদ্যের গ্রহণের বার্তা মস্তিষ্কে প্রেরণ করা সেন্সরি স্নায়ুর কাজ। খাওয়ার সময় আপনার দৃষ্টি কখনোই অঙ্গ-প্রতঙ্গের দিকে থাকে না। পেশির কাজ এবং হাঁটুর অবস্থানের দিকেও আপনার মনোযোগ থাকে না। কিন্তু আপনার মনোযোগের অজান্তেই এদের কাজগুলো সংঘটিত হয়। আপনি যখন খাবার টেবিলে যান, তখন সেন্সরি স্নায়ু অভ্যন্তরীণ কর্ণকে খাদ্যের গ্রহণের পরিমাণ সম্পর্কে সাবধান করে দেয়।

খাদ্যের গ্রহণের সময় একগুচ্ছ সেন্সরি স্নায়ু একগুচ্ছ নসিসেপ্টারকে (এক ধরনের স্নায়ু যা সেন্সরি স্নায়ু হতে বার্তা গ্রহণ করে) খাদ্যের তাপমাত্রার অবস্থা সম্পর্কে বার্তা প্রেরণ করে এবং নসিসেপ্টার এই বার্তা মুখের অভ্যন্তরের স্নায়ুগুলোকে প্রেরণ করে। একই সময়ে রক্ত এবং রক্তরস কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অক্সিজেনের অনুপাত নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের অজান্তেই এই কাজগুলো সম্পন্ন হয়।

আমরা যখন খাদ্য গ্রহণ করি,তখন মস্তিষ্ক সেন্সরি স্নায়ুকে নির্দেশ দেয় যাতে খাদ্য পাকস্থলীতে প্রবেশ করে এবং খাদ্য পরিপাক ক্রিয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে পাকস্থলী পূর্ণ হতে থাকে এবং পরিপাককৃত খাদ্য যখন ক্ষুদ্রান্তে প্রবেশ করে, তখন এক প্রকার হরমোন নিঃসৃত হয় যা আমাদের খাদ্য গ্রহণ হতে বিরত রাখে। পরে এই খাদ্য পরিপাক হয়ে রেচন পদার্থে পরিণত হয় এবং ক্ষুদ্রান্ত হতে মূত্রথলিতে জমা হয়। মূত্রথলি পরিপূর্ণ হলে,তা নিষ্কাশনের জন্য সেন্সরি স্নায়ু মস্তিষ্কে বার্তা প্রেরণ করে।

প্রকৃতপক্ষে,পঞ্চ ইন্দ্রিয় আমাদের সজ্ঞানে কাজ করে। অথচ আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অন্যান্য স্নায়ু কর্তৃক আমাদের অজান্তেই সংঘটিত হয়।

featured image: doctorsimpossible.com